রোহণ কুদ্দুস
“ফুয়েরার অ্যাডল্ফ্ হিটলার মৃত।”
এটুকু বলেই ক্লাউস থেমে গেলেন। ক্ষণেকের জন্য তাঁর চোখ জ্বলে উঠল। সামনে বসে নোট নিচ্ছিলেন সেক্রেটারি মার্গারেট। অপেক্ষায় তাকিয়ে আছেন তিনি। কিন্তু বক্তা হঠাৎ করেই ডুব দিয়েছেন অথৈ চিন্তাস্রোতে। ফুয়েরার অ্যাডল্ফ্ হিটলার মৃত!— বাক্যটা উচ্চারণ করতে একবারের জন্যেও থমকাননি তিনি। কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। তিনি, কর্নেল ক্লাউস ফন স্টফেনবার্গ, ফুয়েরারের প্রতি কর্তব্যনিষ্ঠ থাকার শপথ নিয়েছিলেন। পিতৃভূমি জার্মানিকে রক্ষা করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। তিনি তো বিশ্বাসঘাতক নন।
- হের স্টফেনবার্গ।
মার্গারেটের ডাকে চিন্তাসূত্র ছিন্ন হল। মুখ তুলে তাকান ক্লাউস। বাইরে অন্ধকার জমাট বেঁধেছে। ছোট ঘরটাতে একটা ছোট্ট টেবল, একটা টাইপরাইটার। অনুজ্জ্বল আলোর মধ্যে বসে দুটি মানুষ শুরু করলেন জার্মানির সর্বময় কর্তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র। সামান্য ভুল বলা হল, হত্যার ষড়যন্ত্র আগেই রচিত হয়েছে। এখন তৈরি করা হচ্ছে হিটলারকে হত্যা করার পরে তাঁর অনুগত এস এস-কে এবং সম্ভাব্য উত্তরসূরীদের পাশে সরিয়ে ক্ষমতা দখলের একটা গুরুত্বপূর্ণ নথি— অপারেশন ভ্যালকাইরি।
স্টফেনবার্গ আবার শুরু করলেন— “ফুয়েরার অ্যাডল্ফ্ হিটলার মৃত। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিশ্বাসঘাতক রাজনৈতিক নেতাদের একটা দল আমাদের যুযুধান সেনাবাহিনীকে পেছন থেকে আক্রমণ করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা করছে।”
১৯৪৩-এর অগাস্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয় প্রায় নিশ্চিত। এই যুদ্ধ এরপরও চলতে দিলে মিত্রশক্তির হাতে জার্মানির সার্বিক ধ্বংস অনিবার্য। তাই যত দ্রুত সম্ভব বিশ্বযুদ্ধের ইতি ঘটাতে হিটলারের অপসারণ জরুরি। শুধু হিটলারই নয়, তাঁর নাজি দলের উত্তরসূরীদেরও জার্মানির শাসনক্ষমতা থেকে দূরে রাখা দরকার। তাই হাত মিলিয়েছেন জার্মান সেনাদলের কিছু বরিষ্ঠ আর অভিজ্ঞ সদস্য। তাঁদের লক্ষ্য অবিচল— যে কোনও মূল্যে হিটলারের প্রাণনাশ। হিটলারকে হত্যার ষড়যন্ত্র এর আগেও করা হয়েছে। কখনও ব্যক্তিগত উদ্যোগে, কখনও দলগতভাবে। হিটলার নিজে ভাবেন তিনি ঈশ্বরের বরপুত্র। কেউ কেউ ভাবেন শয়তানের। প্রতিটা প্রাণঘাতী হামলাতেই ভাগ্য ফুয়েরারের সহায় হয়েছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। এর আগের ষড়যন্ত্রগুলো হিটলারের বিনাশের জন্যে রচিত হয়েছিল, কিন্তু এবারের এই প্রচেষ্টা জার্মানির সর্বনাশ ঠেকাতে।
কিন্তু এভাবে একটা ঐতিহাসিক কাহিনি শুরু করা যায় না। পাঠক, আসুন আমরা কিছুটা পিছিয়ে যাই। হিটলারের মতো ইতিহাসের এক কুখ্যাত চরিত্র কীভাবে জার্মানির সর্বময় কর্তা হয়ে উঠলেন আর কেনই বা তাঁর খাস তালুক জার্মানিতেই তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র রচিত হয়েছে অবিরত, সেটা বুঝতে হিটলারের উত্থানের ইতিহাসে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন