বোহেমিয়ান জীবন

রোহণ কুদ্দুস

মায়ের কাছে অবশ্য একমাত্র একটা মিথ্যে বলেই থামেনি অ্যাডল্‌ফ্‌। স্কুল ছাড়ার জন্যে মূলত দুটো অজুহাত ব্যবহার করল সে। তার ভগ্নস্বাস্থ্য এবং বাবার অবর্তমানে বাড়িতে একমাত্র পুরুষ হিসাবে মাকে কাজকর্মে সাহায্য করা তার কর্তব্য। ক্লারা প্রতিবাদ করলেও শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে বাধ্য হন। অ্যাডল্‌ফের স্বাস্থ্য এমন কিছু খারাপ ছিল না। আর বাড়ির কাজকর্ম করাটা তার অসম্মানজনক মনে হত। কারণ মনেপ্রাণে সে তখন একনিষ্ঠ এক বোহেমিয়ান শিল্পী। সাধারণ গৃহকর্ম তার জন্যে নয়।

স্বামীর পেনশনের টাকায় সংসার চালাতে হয়। তাই লিওনডিং-এর বাড়ি ছেড়ে ক্লারা তাঁর সন্তানদের নিয়ে লিঞ্জের একটা ছোট অ্যাপার্টমেন্টে ঠাঁই নিলেন। মূল শোবার ঘরটা ভাড়ায় দিলেন। পলাকে নিয়ে নিজে থাকতেন লিভিং রুমে। অ্যাডল্‌ফের জায়গা হল ছোট একটা বাড়তি ঘরে। দেওয়ালে ঝোলানো অ্যালোইসের বিষণ্ণ পোর্ট্রেট। তাকে সযত্নে সাজিয়ে রাখা তাঁর ধূমপানের পাইপগুলো। প্রতাপশালী বাবার স্মৃতি নিয়ে অ্যাডল্‌ফ্‌ সেই ছোট ক্লোজেটে আঁকাআঁকি করে নিজের অবসর অতিবাহিত করতে থাকল। পড়াশোনা বলতে বরাবরের মতোই জার্মান লোককথা তার প্রিয় বিষয়। বাল্যবন্ধু অগাস্ট ক্যুবিজেকের স্মৃতিকথা অনুযায়ী ষোলো বছরের এক কিশোর লিঞ্জ শহরকে নতুন করে এঁকে ফেলতে চাইছিল। তার মাথায় তখন আর্কিটেক্ট হওয়ার ভূত সওয়ার। নিজের মতে সে নতুন এক পৃথিবীর রূপকার। ফলে স্বপ্নের বুদবুদে সামান্য টোকা পড়লেই রাগে অন্ধ হয়ে যেত অ্যাডল্‌ফ্‌। যেমন একবার সে লটারির টিকিট কেটেছিল দানিউবের ওপর একটা সেতু বানাবে বলে। স্বভাবতই সেই টাকা না জেতার দায় সে ঠেলে দিয়েছিল লটারি কোম্পানি এবং সরকারের ঘাড়ে। ‘মন্দভাগ্য’ শব্দটি অ্যাডল্‌ফের জন্যে নয়। সে লটারি জেতেনি কর্তৃপক্ষের অপদার্থতায়। সে পরীক্ষায় খারাপ ফল করেছে তার শিক্ষক আর সহপাঠীদের দোষে। তার সমস্ত ব্যর্থতার জন্যে আর কেউ দায়ী।

অগাস্ট ক্যুবিজেকের সঙ্গে অ্যাডল্‌ফের আলাপ হয় স্কুলে থাকাকালীন, ১৯০৪-এ লিঞ্জ অপেরা হাউসে। হিটলারের তরুণ বয়সের বোহেমিয়ানার নির্ভরযোগ্য একটা ছবি অগাস্টের স্মৃতিকথা থেকে পাওয়া যায়। বন্ধুতার পক্ষপাতদোষে সে বর্ণনা নিরপেক্ষ না হলেও হিটলারের গড়ে ওঠা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়। লিঞ্জ শহরকে নতুন করে সাজানোর ছবি আঁকতে আঁকতেই অ্যাডল্‌ফ্‌ পিয়ানো শেখা শুরু করল। তারপর তাতেও মন বসাতে না পেরে অপেরা যাওয়া শুরু করল। আজ সে রিচার্ড ওয়াগনারের অপেরার গুণমুগ্ধ, তো পরের দিনই আবার বসে পড়ে তার জলরঙের আঁকাআঁকি নিয়ে। এমন এক অস্থির মানসিক অস্থিরতার মধ্যে একদিন অ্যাডল্‌ফ্‌ নতুন এক স্বীকারোক্তি করল অগাস্টের কাছে।

“আমি রাজনীতিতে যোগ দিতে চাই। দেশের মানুষের জন্যে কিছু করতে চাই।”

প্রায় মধ্যরাত্রি। ফাইনবার্গ পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে অ্যাডল্‌ফ্‌ আর অগাস্ট। দূরে আলোয় মোড়া লিঞ্জ। মাথার ওপর তারায় ভরা আকাশ। নীরব উচ্চতায় দাঁড়িয়ে দুই বন্ধু। সেদিনও ওয়াগনারের ‘রিয়েনজি’ দেখেছে দুই বন্ধু। অপেরা থেকে বেরিয়ে নীরব অ্যাডল্‌ফ্‌। কোটের দু-পকেটে হাত দিয়ে চিন্তামগ্ন হেঁটে এসেছে শহরের প্রান্তসীমায়। নীরবে অনুসরণ করেছে অগাস্ট। ফাইনবার্গের ওপর দাঁড়িয়ে বন্ধুর দুই হাত ধরে অ্যাডল্‌ফ্‌ তার পরিকল্পনার কথা বলতে শুরু করল। “পরিকল্পনা নয়, যেন নিজের ভবিতব্য শোনাচ্ছে সে। রাজনীতিক হওয়া তার নিয়তি।”

“আজ ফিরে তাকালে অ্যাডল্‌ফ্‌ হিটলারের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের স্মৃতিতে তার বক্তৃতা বা তার রাজনৈতিক মতবাদের বদলে ফাইনবার্গের ওই একঘণ্টা উজ্জ্বল হয়ে আছে। সেই মুহূর্তে তার ভবিষ্যত নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।”

তারপর দুই বন্ধু নেমে এসেছে শহরের দিকে। কিন্তু অ্যাডল্‌ফ্‌ তার বাড়ির দিকে না গিয়ে আবার সেই পাহাড়ের দিকেই হাঁটতে শুরু করল নীরবে।

“আবার কোথায় চললে?”

অগাস্টের প্রশ্নে মৃদু উত্তর এল— “আমি একা থাকতে চাই।”

হিটলারের জীবনের এই ঘটনাটা তাঁর জীবনীকাররা যথেষ্ট সতর্কভাবে দেখে থাকেন। এক্ষেত্রে মোজেসের সেই গল্প মনে পড়ে যায়। পাহাড়ে আরোহণ, অজানার সেই ডাক, প্রভুর বার্তা নিয়ে নেমে আসা ইত্যাদি। স্মৃতি মাঝে মাঝেই বিশ্বাসঘাতকতা করে লোককথা থেকে উপকরণ খুঁজে নেয়। অথবা পুরো ঘটনাটাই নাজি প্রচারের অংশও হতে পারে। কারণ অনেক পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে হিটলার নিজেও এই ঘটনাকে অত্যাচারিত জার্মান জাতিকে মুক্ত করার প্রচেষ্টার শুরুবাদ বলে চিহ্নিত করেন।

১৯০৭-এর গ্রীষ্মে অ্যাডল্‌ফ্‌ ভিয়েনা পাড়ি দিল। তার আগের বছরও সে ভিয়েনা গিয়েছিল মে-জুন মাসে। সেখান থেকে ফেরা ইস্তক সে নিজের কল্পনাতেই ভিয়েনাতেই ছিল বেশিরভাগ সময়। কিন্তু অ্যাডল্‌ফের জীবনে নেমে আসে আরেক বিপর্যয়। ক্লারার স্তন ক্যানসার ধরা পড়ল। আগে বুকে ব্যথা হত। প্রথমে অগ্রাহ্য করে রোগ ধরা পড়ল শেষ ধাপে এসে। এডওয়ার্ড ব্লক নামে এক ইহুদি ডাক্তার চিকিৎসা শুরু করলেন। তাঁর থেকে খবর পেয়ে অ্যাডল্‌ফ্‌ বাড়ি ফিরল মায়ের শুশ্রূষা করার জন্যে। অস্ত্রোপচার হল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই করা গেল না। ১৯০৭-এর ২১ ডিসেম্বর ক্লারা মারা গেলেন। বড়দিনের দু-দিন আগে এক কুয়াশাধূসর সকালে মাকে লিওনডিং-এ সমাধিস্থ করে এসে অ্যাডল্‌ফ্‌ মানসিকভাবে দারুণ ভেঙে পড়ল। ডাক্তারের ফিজ মেটানোর মতো টাকা নেই, যদিও বেশিরভাগটাই তিনি মকুব করে দিয়েছেন। বাবার উইল থেকে পাওয়া অর্থ ভিয়েনায় খরচ হয়ে সামান্যই কিছু অবশিষ্ট আছে। আঠারো বছরের এক অনাথ তরুণের জীবনে সে বড় কষ্টের শীত। অস্ট্রিয়া সরকার ভদ্রস্থ একটা ভাতার ব্যবস্থা করলেও অ্যাডল্‌ফ্‌ তার প্রাপ্য অর্থের ভাগ ক্লারাকে দিয়ে ভিয়েনার ফিরে এল। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সে তার মায়ের ছবি কাছে রেখেছিল। বিষণ্ণ ক্লারা, তাঁর রোগাভোগা ছেলের শরীর নিয়ে সর্বদা উদ্বিগ্ন।

এবার পাকাপাকিভাবে অস্ট্রিয়ার রাজধানী শহরে সে পাড়ি জমাল। মাসখানেক পরে বন্ধু অগাস্টও তাকে অনুসরণ করল ভিয়েনায়। যদিও দুজন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। অগাস্ট সঙ্গীতকার হিসাবে নিজের একটা জায়গা খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তার পরিবারের লোকজন এ ব্যাপারে তাকে যথেষ্ট সহযোগিতাও করছেন। শান্ত ধীর স্থির অগাস্টের মোজার্টের মতো মুখের আদল তাকে অভিজাত একটা চেহারা দিয়েছে। অন্যদিকে অ্যাডল্‌ফ্‌ ফ্যাকাসে, রোগা এক তরুণ— ভিয়েনার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। লক্ষ্যহীন। আত্মীয়স্বজনকে চিঠি লেখে না ভয়ে, পাছে কেউ জিজ্ঞাসা করে সে কী করছে।

এর আগের বছর ভিয়েনা অ্যাকাডেমি অফ আর্টস্‌-এ সে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেছিল। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উতরোতে পারেনি। এবার আর পরীক্ষাতেই বসার সুযোগ পেল না সে। আর্কিটেক্ট হিসাবে শহরকে ঢেলে সাজানোর তার উদ্যম উৎসাহ ব্যর্থতার আগুনে জ্বলতে থাকে। স্টেফানি নামের এক তরুণীর প্রতি সে আকৃষ্ট হয়। কিন্তু তার ক্যাথলিক নীতিবোধ তাকে সংযমে বেঁধে রাখে।

ভিয়েনায় এরপর প্রায় বছর ছয়েক ছিল অ্যাডল্‌ফ্‌। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। এমনকী এক-দুবার ছন্নছাড়া মাতালদের থেকেও টাকা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাও করেছে সে। ফরমায়েশমতো কখনও বিজ্ঞাপনী পোস্টার এঁকে, কখনও জলরঙে পোস্টকার্ড এঁকে সেগুলো বিক্রির চেষ্টা করত বিভিন্ন ক্যাফেতে ঘুরে ঘুরে। যদিও সাধারণ ভিড় থেকে ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলত সে। সে জার্মান, অতএব সে আলাদা, সাধারণের থেকে সামান্য ওপরে— এই ধারণা ধীরে ধীরে তার মনে বদ্ধমূল হচ্ছিল। ভিয়েনার দিনগুলো জীবিকানির্বাহের ব্যাপারে দারুণ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এই শহর অ্যাডল্‌ফের হিটলার হয়ে ওঠার জন্যে ছিল বিশেষ রকম সহায়ক। এ ব্যাপারে দুটো জিনিস তাকে দারুণ রকম প্রভাবিত করে।

এক – রিচার্ড ওয়াগনারের অপেরা। এই জার্মান সঙ্গীতস্রষ্টা মৌলবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে বরাবরই দেশের শাসকদের থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। অ্যাডল্‌ফের জন্মের মাত্র ছ-বছর আগে তিনি মারা গিয়েছিলেন, অতএব ভীষণভাবেই তিনি সেই সময়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন। অ্যাডল্‌ফ্‌ নিয়মিত তাঁর অপেরা দেখত। ওয়াগনারের ‘পাসিফাল’ সে দেখেছিল কি না তার নিশ্চিত কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু হোলি গ্রেইল, স্পিয়ার অফ ডেসটিনি বা মেয়েদের সতীত্ব নিয়ে মতামত, এমনকী কারও কারও মতে ইহুদি-বিরোধিতার একটা চোরাস্রোত— এগুলো তরুণ অ্যাডল্‌ফ্‌কে প্রভাবিত করে থাকতেই পারে। তবে ওয়াগনারের অপেরার বিশালত্ব কোনোভাবেই পরে রাষ্ট্রনেতা হিটলার এড়িয়ে যেতে পারেননি। যেমন ‘রিয়েনজি’র ১২০০ পুরুষকণ্ঠ এবং ১০০ বাদ্যযন্ত্রের অর্কেস্ট্রা। হিটলারের জীবনীকার জোয়াকিম ফেস্টের মতে, থার্ড রাইখের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের চোখ ধাঁধানো গণসম্মোহন এই অপেরামাতৃক ট্রাডিশন ছাড়া সম্ভব ছিল না। সাধারণ যুক্তি-তর্ককে পাশে সরিয়ে রেখে শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার পেছনে হিটলারের জীবনে রিচার্ড ওয়াগনারের অপেরার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।

দুই – ভিয়েনার ইহুদি-বিরোধী আবহ। অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের রাজধানী ভিয়েনা তখন অতীতের ছায়ামাত্র। তবুও সে উজ্জ্বল, সুন্দর। হাবস্‌বার্গ বংশের শেষ সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফের অর্ধশতাব্দীব্যাপী রাজত্বের আর শেষ কয়েক বছর বাকি। ফ্রাঞ্জ তাঁর শাসনকালে ইহুদিদের সমানাধিকারই শুধু দেননি, ইহুদিদের জন্যে আগে বলবৎ হওয়া নানা বাধানিষেধও তিনি তুলে দিয়েছিলেন। ঊনবিংশ শতকের শেষ তিন দশকে ইহুদিরা সহনশীল পরিবেশে উন্নতি করেছিল এবং ভিয়েনায় তাদের জনসংখ্যা এক প্রজন্মের মধ্যেই প্রায় তিনগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একাধিক জাতীয়তাবাদী সংগঠন এই নিয়ে প্রচার চালাতে শুরু করে, ফলে অধিকাংশ জার্মান ইহুদিদের প্রতি এক অদ্ভুত ঈর্ষায় ভুগছিল। তারা হঠাৎ নিজেদের দেশেই নিজেদের সংখ্যালঘু এবং বিপন্ন হিসাবে আবিষ্কার করে। এমন সময় ভিয়েনার মেয়র হিসাবে নির্বাচিত হলেন কার্ল লুগা। জনপ্রিয় এই রাজনীতিক এর পরে বেশ কয়েকবার পুনর্নিবাচিত হয়ে আমৃত্যু মেয়র হিসাবেই কাজ করে গেছেন। তাঁর আমলে ভিয়েনা আধুনিক শহরের রূপ পায়। পরিকল্পনামাফিক বাসস্থান, শিল্প এবং চাষের জন্যে জমি বন্টন, জলের বন্দোবস্ত করা থেকে শুরু করে শহরের বাসিন্দাদের জন্যে আরও নানা সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করেন। অধিকাংশ ভোটারের কাছেই তাই তিনি প্রথম পছন্দ। লুগা লক্ষ করলেন মধ্যবিত্ত জার্মানদের মধ্যে যে কোনও সমস্যাতেই ইহুদিদের দোষারোপ করাটা একটা প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতিক হিসাবে নিজের সমর্থন ধরে রাখতে তিনি এটাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করলেন। পূর্ব ইউরোপ থেকে ইহুদিদের অভিবাসন রুখতে তিনি সাধ্যমত ব্যবস্থা নিতে শুরু করলেন। যদিও তাঁর আমলে ইহুদি নিপীড়ন সে অর্থে শুরু হয়নি। কিন্তু সরকারি কাজে ইহুদিদের নিয়োগে কড়াকড়ি শুরু হল। একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটতে লাগল স্কুল এবং ইউনিভার্সিটিতেও। লুগার নেতৃত্বে ভিয়েনা হয়ে উঠল ইউরোপের প্রথম ইহুদিবিদ্বেষী রাজধানী। তাঁর মতে, খ্রিস্টধর্ম এবং পিতৃভূমি অস্ট্রিয়া একদিন দাসত্ব থেকে মুক্তির দিন দেখবে। আসবে পীড়িত ও অত্যাচারিতের প্রতিহিংসার ক্ষণ। তরুণ অ্যাডল্‌ফের নতুন শহরের এই মেয়র মোরাভিয়ার এক জনসমাবেশে ঘোষণা করলেন— উদার সাংবাদিকতা শুধুমাত্র ইহুদিদের প্রতি উদার, আসলে তা পক্ষপাতদুষ্ট। খিস্টানদের ওপর ঘটে চলা অপরাধের প্রতি এরা উদাসীন। আরেক রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে জোর দিয়ে বললেন—বিচারক, রাজনৈতিক নেতা বা সরকারি কর্মচারী হিসাবে ইহুদিদের নিযুক্ত হওয়ার কোনও অধিকার নেই। তাদের যেনতেনপ্রকারেণ ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে হবে।

লুগার জীবনী খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায় তিনি সে অর্থে জাতিবিদ্বেষী ছিলেন না, বরং সুবিধাবাদী ছিলেন। কালের হাওয়ায় গা ভাসিয়ে নিজের জনসমর্থন দৃঢ় করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তাঁর এই মতামতের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা রেখেছিল। অ্যাডল্‌ফ্‌ হিটলার তাদের একজন। হিটলার পরে কার্ল লুগাকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ জার্মান মেয়র বলেও উল্লেখ করেছেন।

হিটলারের অন্যতম প্রামাণ্য জীবনীকার ইয়ান কারশ সেই সময় ভিয়েনায় সস্তা সাহিত্য ও চটুল ট্যাবলয়েডের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এরকম একটা প্রকাশনা ছিল অস্‌তারা। জোসেফ লাঞ্জ নামে তন্ত্রমন্ত্রে বিশ্বাসী মনাস্ট্রির এক প্রাক্তন মঙ্ক এই প্রকাশনার গোড়াপত্তন করেন। লাঞ্জের মতে সৃষ্টির গোড়া থেকেই নীল রক্ত শ্বেতাঙ্গ জাতির সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের সংগ্রাম চলছে। ইভ পিশাচের সঙ্গে মিলিত হয়ে এই কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জন্ম দেন। ফলে শ্বেতাঙ্গ মহিলাদের উচিৎ এই কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ না হয়ে শ্বেতাঙ্গ স্বামীর প্রতি দায়বদ্ধ থাকা। অবাঞ্ছিত এই কালো চামড়ার মানুষদের সম্পূর্ণ ধ্বংস না করলে শ্বেতাঙ্গদের শুদ্ধিকরণ সম্পূর্ণ নয়। বলাই বাহুল্য, হিটলারের আর্যজাতিতত্ত্বের মূলকথা একই। মজার ব্যাপার, ক্ষমতায় এসেই হিটলার এই প্রকাশনাটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কারণ প্রকাশক এর আগে হিটলারকে তাঁদের মতবাদ চুরি করে ইনটেলেকচুয়াল কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্যে অভিযুক্ত করেন।

হিটলার নিজেও ‘মাইন কাম্ফ’-এ বলেছেন, ভিয়েনার দিনগুলি মার্ক্সবাদী এবং ইহুদিদের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রামের ‘গ্রানাইট ভিত্তি’ তৈরি করে দিয়েছিল। তবে এই বক্তব্য সম্ভবত স্মৃতিকথার বদলে নিজেকে জন্মগত নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার প্রয়াস। হিটলার সমগ্র আত্মজীবনী জুড়েই নিজের উত্থানের ক্রম হিসাবে শিল্পী, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং দেশনেতা— এই স্বমহিমান্বিত সত্তাগুলোর মধ্যে একটা বৈপ্লবিক ধারাবাহিকতা আঁকতে আগ্রহী। সত্যি বলতে কী, ১৯১৩-তে হিটলার যখন ভিয়েনা ছেড়ে মিউনিখে যাচ্ছেন, তখন তাঁর কোনও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পরিকল্পনা বা সে অর্থে কোনও কাজ ছিল না। ঐতিহাসিক এবং জীবনীকার ভারনার মেসারের মতে, হিটলার ভিয়েনাতে শিখেছিলেন জীবন দুর্বল এবং শক্তিশালীর মধ্যে ধারাবাহিক তিক্ত লড়াই ছাড়া আর কিছু নয়। শক্তিশালীরা সবসময় জেতে আর সেইজন্যেই জীবন মানবিকতা নয়, হারা এবং জেতার মূল্যে চালিত হয়।

কিন্তু এই দর্শন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে কমবেশি সব ইউরোপীয়ই উপলব্ধি করেছিলেন, হিটলার এর ব্যতিক্রম নন। এমনকী জাতিগত শুদ্ধিকরণে ফ্রান্সিস গ্যালটনের ‘ইউজেনিকস্‌’ বা সুপ্রজনবিদ্যার তত্ত্ব সেই সময় উদারপন্থীদের মধ্যেও জনপ্রিয় ছিল। যদিও উচ্চতর জাতির মধ্যে প্রজনন এবং একই সঙ্গে নিম্নতর জাতিগুলোর নির্বীজকরণ— এই সাধারণ তত্ত্ব থেকে হিটলার সামান্য আলাদা ছিলেন। তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনায় উঠে এসেছিল শুধুমাত্র জার্মান জাতি। জার্মান শক্তির মাধ্যমে বিশুদ্ধ আর্যজাতির প্রতিষ্ঠা। জার্মান এবং আর্য তাঁর জন্যে মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল। ভিয়েনায় এই ভাবনার বীজ হিটলারের মধ্যে প্রোথিত হয়েছিল। সমগ্র বিষবৃক্ষ হিসাবে এর প্রকাশের জন্যে প্রয়োজন ছিল একটা বিশ্বযুদ্ধের ফলে বিষিয়ে ওঠা রাজনৈতিক পরিবেশ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%