শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ও মিছরি, তোর নামে একটা উকিলের চিঠি এসেছে দেখ গে যা। এই বলে মিছরির দাদা ঋতীশ টিয়ার ঝাঁক তাড়াতে খেতের মধ্যে নেমে গেল।
গোসাবা থেকে দুই নৌকা-বোঝাই লোক এসেছে অসময়ে। লাট এলাকার ভিতরবাগে কোন বিষয়কর্মে যাবে সব। এই অবেলায় তাদের জন্য খিচুড়ি চাপাতে বড়ো কাঠের উনুনটা ধরাতে বসেছিল মিছরি। কেঁপে উঠল। তার ভরন্ত যৌবনবয়স। মনটা সব সময়ে অন্য ধারে থাকে, শরীরটা এই এখানে। আজকাল শরীরটা ভার লাগে তার। মনে হয়, ডানা নেই মানুষের।
উকিলের চিঠি শুনে যে উনুন ফেলে দৌড়োবে তার জো নেই। বাবা গুলি-পাকানো চোখে দেখছে উঠোনের মাঝখানে চাটাইতে বসে। বড়ো অতিথিপরায়ণ লোক। মানুষজন এলে তার হাঁকডাকের সীমা থাকে না। তা ছাড়া দাদু, ঠাকুমা, মা, কাকা-জ্যাঠারা সব রয়েছে চারধারে। তাদের চোখ ভিতর-বার সব দেখতে পায়। উটকো লোকেদের মধ্যে কিছু বিপ্রবর্ণের লোক রয়েছে, তারা অন্যদের হাতে খাবে না। সে একটা বাঁচোয়া, রান্নাটা করতে হবে না তাদের। চাল ডাল ওরাই ধুয়ে নিচ্ছে পুকুরে। বাঁকে করে দু-বালতি জল নিয়ে গেছে কালমারা। উনুনটা ধাঁধিয়ে উঠতেই মিছরি সরে গিয়ে আম গাছতলায় দাঁড়াল।
কালও বড্ড ঝড়জল গেছে। ওই দক্ষিণ ধার থেকে ফৌজের মতো ঘোড়সওয়ার ঝড় আসে মাঠ কাঁপিয়ে। মেঘ দৌড়োয়, ডিমের মতো বড়ো বড়ো ফোঁটা চটাসফটাস ফাটে চারধারে। আজ সকালে দশ ঝুড়ি পাকা জাম, গুটি দশেক কচি তাল কুড়িয়ে আনা হয়েছে খেত থেকে। ঘরের চালের খড় জায়গায় জায়গায় ওলটপালট। মাটির দেয়াল জল টেনে ডোস হয়ে আছে, এখন চড়া রোদে শুকোচ্ছে সব। আমতলায় দাঁড়িয়ে মিছরি দেখে, ঋতীশদাদা টিয়ার ঝাঁক উড়িয়ে দিল। ট্যাঁ ট্যাঁ ডাক ছেড়ে সবুজ পাখিরা উড়ে যাচ্ছে নদীর দিকে। মনে হয়, মানুষের ডানা নেই।
যারা এসেছে তারা সব কেমনধারা লোক যেন! রোগা-রোগা ভিতু-ভিতু চেহারা, পেটে সব খোঁদল-খোঁদল উপোসি ভাব। জুলজুল করে চারধারে চায় আর লজ্জায় আপনা থেকেই চোখ নামিয়ে নেয়। তাদের মধ্যে একজন আধবুড়ো লোক এসে উনুনটায় দুটো মোটা কাঠ ঢুকিয়ে দিল, ফুলঝুরির মতো ছিটকে পড়ল আগুনের ফুলকি। একটা কাঠ টেনে আধপোড়া একটা বিড়ি ধরিয়ে নিল লোকটা। এই গরমেও গায়ের ময়লা ঘেমো তেলচিটে গেঞ্জিটা খুলছে না, বুকের পাঁজর দেখা যাবে বলে বোধহয় লজ্জা পাচ্ছে। তাকে দেখে হাসি পেল মিছরির।
সেই লোকটা চারধারে চেয়ে মিছরিকে দেখে কয়েক কদম বোকা পায়ে হেঁটে এসে বলল, আনাজপাতি কিছু পাওয়া যায় না?
খেত ভরতি আনাজ। অভাব কীসের? মিছরি বলল, এক্ষুনি এসে পড়বে। খেতে লোক নেমে গেছে আনাজ আনতে।
—একটু হলুদ লাগবে, আর কয়েকটা শুকনো লঙ্কা। যদি হয় তো ফোড়নের জন্য একটু জিরে আর মেথি।
যদি হয়! যদি আবার হবে কী! খিচুড়ি রাঁধতে এসব তো লাগেই সে কি আর গেরস্তরা জানে না। মা সব কাঠের বারকোশে সাজিয়ে রেখেছে।
লোকটার দিকে চেয়ে মিছরি বলল, সব দেওয়া হচ্ছে। ডাল-চালটা ধুয়ে আসুক।
লোকটা আকাশের দিকে একবার তাকাল। খুব সংকোচের গলায় বলল, বেলা হয়েছে।
সে কথার মধ্যে একটা খিদের গন্ধ লুকিয়ে আছে। শত চেষ্টা করেও লোকটা খিদের ভাবটা লুকোতে পারছে না। গেঞ্জিতে ঢাকা হলেও ওর পাঁজরা দেখা যায়। কারা এরা? কোত্থেকে এল, কোথায়ই-বা যাচ্ছে? ছোটোবোন চিনি যদিও মিছরির পিঠোপিঠি নয় তবু বোনে বোনে ঠাট্টা-ইয়ারকির সম্পর্ক। ফ্রক-পরা চিনি তিনটে ব্যাং-লাফ দিয়ে মশলার বারকোশ নিয়ে এসে ঠক করে উনুনের সামনে উঠোনে রেখে ঝুপসি চুল কপাল থেকে সরিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, এই যে মশলা দিয়ে গেলাম কিন্তু। দেখ সব, নইলে চড়াই খেয়ে যাবে।
রোগা লোকটা তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে বারকোশ নিচু হয়ে দেখল।
বলল, উরেব্বাস, গরমমশলা ইস্তক। বাঃ, বাঃ, এ না হলে গেরস্ত।
চিনি দুটো নাচুনি পাক খেয়ে মিছরির ধারে এসে জিভ ভেঙাল, বলল, যা দিদি, তোর নামে উকিলের চিঠি এসেছে। বড্ড মকদ্দমায় পড়ে গেছিস ভাই। চিঠিটা ভিজিয়ে একটু জল খাস শোয়ার সময়, মিষ্টি লাগবে।
বলে নিচু ডালের একটা পাকা আম দুবার লাফ দিয়ে পেড়ে ফেলল চিনি। শিঙে দিয়ে চুষতে চুষতে যেদিকে মন চায় চলে গেল।
উকিলের চিঠি বলে সবাই খেপায়। আর মকদ্দমাও বটে। এমন মকদ্দমায় কেউ কখনো পড়েনি বুঝি।
ধীরপায়ে লাজুক মুখে মিছরি ঘরে আসে। এমনিতে কোনো লাজলজ্জার বালাই নেই। বাপের বাড়িতে হেসে-খেলে সময় যায়। কিন্তু ওই চিঠি যেদিন আসে সেদিন যত লজ্জা। বরের চিঠিই যেন বর হয়ে আসে।
মিছরির বর উকিল।
ছোটোকাকা প্রায় সমবয়সি। দাদা ঋতীশের চেয়েও ছ-মাসের ছোটো। আগে তাকে নাম ধরেই 'শ্যামা' বলে ডাকত মিছরি, নিজের বিয়ের সময় থেকে 'ছোটোকাকা' বলে ডাকে।
ছোটোকাকা মিছরির নাকের ডগায় দুবার নীলচে খামখানা নাচিয়ে ফের সরিয়ে নিয়ে বলল, রোজ যে আমার কাপড় কাচতে খিটখিট করিস, আর করবি?
অন্য সময় হলে মিছরি বলত, করব, যাও যা খুশি করো গে!
এখন তা বলল না। একটু হেসে বলল, কাপড় কাচতে খিটখিট করব কেন, তোমার নস্যির রুমাল বাবু ও কাচতে বড়ো ঘেন্না হয়।
—ইঃ ঘেন্না! যা তাহলে, চিঠি খুলে পড়ে সবাইকে শোনাব।
—আচ্ছা, আচ্ছা কাচব!
—আর কী কী করবি সব বল এইবেলা। বউদি রান্না করে মরে, তুই একেবারে এগোস না, পাড়া বেড়াস। আর হবে সেরকম?
—না।
—দুপুরে আমার নাক ডাকলে আর চিমটি কাটবি?
—মাইরি না।
—মনে থাকে যেন! বলে ছোটোকাকা চিঠিটা শুঁকে বলল, এঃ, আবার সুগন্ধি মাখিয়েছে! বলে কাকা চিঠিটা ফেলে দিল সামনে। পাখির মতো উড়ে চিঠিটা তুলে নিয়ে মিছরি এক দৌড়ে বাগানে।
কত কষ্ট করে এত দূর মানুষ আসে, চিঠি আসে। রেলগাড়িতে ক্যানিং, তারপর লঞ্চে গোসাবা, তারপর নৌকায় বিজয়নগরের ঘাট, তারপর হাঁটা-পথ। কত দূর যে! কত যে ভীষণ দূর!
খামের ওপর একধারে বেগনে কালিতে রবার স্ট্যাম্প মারা। কালি জেবড়ে গেছে, তবু পড়া যায়— ফ্রম বসন্ত মিদ্দার, বি.এ. এল. এল. বি., অ্যাডভোকেট। আর বাংলায় মিছরির নাম-ঠিকানা লেখা অন্য ধারে। রবার স্ট্যাম্পের জায়গায় বুঝি এক ফোঁটা গোলাপগন্ধী আতর ফেলেছিল সুবাস বুক ভরে নিয়ে বড়ো যত্নে, যেন ব্যথা না লাগে এমনভাবে খামের মুখ ছিঁড়ল মিছরি। এ সময়টায় তাড়াতাড়ি করতে নেই। অনেক সময় নিয়ে, নরম হাতে, নরম চোখে সব করতে হয়। মা ডাকছে, ও মিছরি, আনাজ তুলতে বেলা গেল। লোকগুলোকে তাড়া দে, বিপিনটা কি আবার গ্যাঁজা টানছে বসে নাকি দেখ।
বড়ো বিরক্তি। লোকগুলোর সত্যি খিদে পেয়েছে। আকাশমুখো চেয়ে উঠোনে হাভাতের মতো বসে আছে সব। তাদের মধ্যে যারা একটু মাতব্বর তারা বাবুর সঙ্গে এক চাটাইতে বসে কথাবার্তা বলছে। রান্নার লোকটা বিশাল কড়া চাপিয়ে আধ সেরটাক তেল ঢেলে দিল।
মিছরি খেতে নেমে গিয়ে কুহুস্বরে ডাক দিল, বিপিনদা, তোমার হল? রান্না যে চেপে গেছে।
অড়হর গাছের একটা সারির ওপাশ থেকে বিপিন বলল, বিশটা মন্দ খাবে, কম তো লাগবে না। হুট বলতে হয়ে যায় নাকি! যাচ্ছি, বলো গে হয়ে এল।
মিছরি চিঠিটা খোলে। নীল, রুল-টানা প্যাডের কাগজ। কাগজের ওপরে আবার বসন্ত মিদ্দার এবং তার ওকালতির কথা ছাপানো আছে। নিজের নাম ছাপা দেখতে লোকটা বড়ো ভালোবাসে।
হুট করে চিঠি পড়তে নেই। একটু থামো, চারদিক দেখো, খানিক অন্যমনে ভাবো, তারপর একটু একটু করে পড়ো, গেঁয়ো মানুষ যেমন করে বিস্কুট খায়, যত্নে ছোট্ট ছোট্ট কামড়ে।
চিঠি হাতে তাই মিছরি একটু দাঁড়িয়ে থাকে। সামনের মাঠে একটা ছোট্ট ডোবায় কে একজন কাদা-মাখা পা ধুতে নেমেছিল। জলে নাড়া পড়তেই কিলবিলিয়ে একশো জোঁক বেরিয়ে আসে। মিছরি দেখতে পায়, লোকটা মাঠে বসে পায়ের জোঁক ছাড়াচ্ছে। খেতের উঁচু মাটির দেয়ালের ওপর কোন কায়দায় একটা গোরু উঠে পড়েছে কে জানে। এইবার বাগানের মধ্যে হড়াস করে নেমে আসবে।
নামুক গে। কত খাবে। বাগান ভরতি সবজি আর সবজি। অঢেল, অফুরন্ত। বিশ বিঘের খেত। খাক।
উকিল লিখেছে—হৃদয়াভ্যন্তরস্থিতেষু প্রাণপ্রতিমা আমার...। মাইরি, পারেও লোকটা শক্ত কথা লিখতে। লিখবে না! কত লেখাপড়া করেছে।
হু হু করে বুক চুপসে একটা শ্বাস বেরিয়ে যায় মিছরির। লোকটা কত লেখাপড়া করেছে তবু রোজগার নেই কপালে! এ কেমন লক্ষ্মীছাড়া কপাল তাদের!
উকিল লিখেছে—ঘুমিয়া জাগিয়া কত যে তোমাকে খুঁজি! একটু থমকে যায় মিছরি। কথাটা কী! ঘুমিয়া? ঘুমিয়া মানে তো কিছু হয় না। বোধহয় তাড়াহুড়োয় ঘুমাইয়া লিখতে গিয়ে অমনটা হয়েছে। হোক গে, ওসব তো কত হয় ভুল মানুষের। ধরতে আছে?
ছ্যাঁক করে ফোড়ন পড়ল তেলে। হিং ভাজার গন্ধ। রান্নার লোকটা বুঝি কাকে বলল, এর মধ্যে একটু ঘি হলে আর কথা ছিল না।
জ্যাঠা বোধহয় সান্ত্বনা দিয়ে বলল, হবে হবে। তা মিছরি, পাথরবাটিতে একটু ঘি দিয়ে যা দিকিনি!
মিছরি আর মিছরি! ও ছাড়া আর বুঝি কারো মুখে কথা নেই! মিছরি নড়ল না। চিঠি থেকে চোখ তুলে উদাসভাবে আকাশ দেখল। আবার একটা টিয়ার ঝাঁক আসছে গাং পেরিয়ে। আসুক।
ছোটোকাকার এক বন্ধু ছিল, ত্র্যম্বক। মিছরির বিয়ের আগে খুব আসত এ বাড়িতে। বিয়ের পর আর আসে না। কেন বলো তো! মিছরি উদাস চেয়ে থাকে। কোনোদিন মনের কথা কিছু বলেনি তাকে ত্র্যম্বক। কিন্তু খুব ঘন ঘন তার নাম ধরে ডাকত। সিগারেট ধরাতে দশবার আগুন চাইত।
কেন যে মনে পড়ল!
উকিল লিখেছে—ত্রিশ টাকার মধ্যে কলিকাতায় ঘর পাওয়া যায় না। অনেক খুঁজিয়াছি। মাঝে মাঝে ভাবি, বনগাঁ চলিয়া যাইব। সেখানে প্র্যাকটিসের সুবিধা হইতে পারে। বাসাও সস্তা।
তা-ই যদি যেতে হয় তো যাও। আমি আর পারি না। বিয়ের পর এক বছর চার মাস হল ঠিক ঠিক। আর কি পারা যায়, বলো উকিলবাবু। তোমার পাষাণ হৃদয়, তার ওপর পুরুষমানুষ, লাফঝাঁপ করে তোমাদের সময় কেটে যায়। আর আমি মেয়েমানুষ, লঙ্কা গাছে জল ঢেলে কি বেলা কাটে আমার, বলো? চোখের নোনা জলে নোনা গাঙে জোয়ার ফেলে দিই রোজ। উকিলবাবু, পায়ে পড়ি...
খিচুড়িতে আলু, কুমড়ো, ঢ্যাঁড়শ, ঝিঙে, পটোল সব ঢেলে দিয়ে রোগা বামুনটা আম গাছের তলায় জিরেন নিচ্ছে। গলার ময়লা মোটা পইতেটা বেরিয়ে গেঞ্জির ওপর ঝুলে আছে। বড্ড রোগা, ঘামে ভিজে গেছে তবু গেঞ্জি খোলেনি পাঁজর দেখা যাওয়ার লজ্জায়। বিড়ি ধরিয়ে ছোটোকাকাকে বলল, বউ আর ছেলেপিলেদের সোনারপুরে ইস্টিশানে বসিয়ে রেখে আমরা বেরিয়ে পড়েছি। তারা সব কদিন ভিক্ষে-সিক্ষে করে খাবে। ঠিক করেছি, বাদার যেখানে পাব, জমি দখল করে ঘর তুলে ফেলব আর চাষ ফেলে দেব। মশাই, কোনোখানে একটু ঠাঁই পেলাম না আমরা। বাঁচতে তো হবে নাকী!
ছোটোকাকা বলে, কত দূর যাবেন? ওদিকে তো সুন্দরবনের রিজার্ভ ফরেস্ট আর নোনা জমি। বাঘেরও ভয় খুব।
লোকটা বিড়ি টেনে হতাশ গলায় বলে, আসতে আসতে এত দূর এসে পড়েছি, আর-একটু যেতেই হবে। বাঘেরও খিদে, আমাদেরও খিদে—দুজনাকেই বেঁচে থাকতে হবে তো।
উকিলবাবু আর কী লেখে? লেখে— সোনামণি, আমার তিনকুলে কেহ নাই, নইলে তোমাকে বাপের বাড়ি পড়িয়া থাকিতে হইত না। যাহা হউক, লিখি যে আর কয়দিন ধৈর্য ধরো। কোথাও-না-কোথাও কিছু-না-কিছু হইবেই। ওকালতিতে পসার জমিতে সময় লাগে।
বুঝি তো উকিলবাবু, বুঝি। তোমার যেদিন পসার হবে ততদিন আমি থাকব তো বেঁচে! যদি মরে যাই, তবে তোমার লক্ষ্মীমন্ত ঘরে আর কোন-না-কোন পেতনি এসে আমার জায়গায় ডেঁড়েমুশে সংসার করবে। বালা বাজিয়ে হাওয়া খাবে, মাছের মুড়ো চিবোবে, গাল ভরতি পান খেয়ে রুপোর বাটায় পিক ফেলবে। ততদিন কি বাঁচব, উকিলবাবু?
বিপিন কলাপাতা কেটে উঠোনে ফেলেছে। ঠেলাঠেলি পড়ে গেছে দলটার মধ্যে। ঝপাঝপ পাতা টেনে বসে পড়ল সব। বাঁ হাতে সকলের পাঁচ-ছ-টা করে কাঁচালঙ্কা, পাতে একথাবা নুন। খিচুড়ি এখনও নামেনি। সবাই কাঁচালঙ্কা কামড়াচ্ছে নুন মেখে। ঝালে শিস দিচ্ছে!
উকিলবাবু কী লেখে আর? লেখে—বন্ধুর বাসায় আর কতদিন থাকা যায়? ভালো দেখায় না। ধারও অনেক হইয়া গেল। লজ্জার মাথা খাইয়া লিখি, কিছু টাকা যদি পারো...
গরম খিচুড়ি মুখে দিয়ে একটা বাচ্চা ছেলে চেঁচিয়ে ওঠে জিভের যন্ত্রণায়। একজন বুড়ো বলে, আস্তে খা। ফুঁইয়ে ফুঁইয়ে ঠান্ডা করে নে।
—উঃ, যা রেঁধেছ না হরিচরণ, লাটবাড়ির বাস ছেড়েছে।
মিছরি আমতলায় দাঁড়িয়ে থাকে। বেলা হেলে গেছে। গাছতলায় আর ছায়া নেই। রোদের বড়ো তেজ।
দলের মাতব্বর জিজ্ঞেস করে মিছরির বাবাকে, ওদিকে কি কোনো আশা নেই, মশাই? অ্যাঁ! এত কষ্ট করে এত দূর এলাম।
মিছরি ঘরে চলে আসে। চোখ জ্বালা করছে। বুকটায় বড়ো কষ্ট।
পড়ন্ত বেলায় মিছরি তার উকিলকে চিঠি লিখতে বসে—আশা হারাইয়ো না। পৃথিবীতে অনেক জায়গা আছে...।
আনন্দবাজার পত্রিকা—৬ জুন ১৯৭৬
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন