শান্তনু দাশ
— “শঙ্করী মাছগুলো দে?” রান্নাঘরের ওভেনের উপর পিতলের বড় কড়াই চাপিয়ে তার মধ্যে সর্ষের তেল গরম করতে করতে দত্তবাড়ির বড় বউ প্রমীলা, বাড়ির কাজের মেয়ে শঙ্করীকে ডেকে বলে ওঠে। শঙ্করী স্ল্যাবের উপর ঢাকা দেওয়া মাছের পাত্রটা প্রমীলার দিকে এগিয়ে দিতেই প্রমীলা ঢাকা তুলে নিয়ে রুইমাছের একটা একটা করে কাটা টুকরো গরম তেলে ছাড়তে থাকে, অন্যদিকে শঙ্করী রান্নাঘরের সাদা মার্বেল বাঁধানো মেঝেতে বসে বটি নিয়ে মোচা কাটতে ব্যস্ত।
দত্তবাড়ির বহু নিয়মের মধ্যে একটি নিয়ম হল দুইবেলা রান্না। অর্থাৎ দিনে ও রাতে আলাদা আলাদা পদ রান্না করতে হবে বাড়ির বউদের। এই দত্তবাড়ির কর্তা হলেন শ্রী মহেন্দ্রনাথ দত্ত। বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই, উচ্চতায় পাঁচ এগারো তবে বয়স প্রৌঢ়পর্বে পদার্পণ করলেও চুলে সেই তুলনায় পাক ধরেনি বললেই চলে, বিপত্নীক। স্ত্রী মারা গেছেন প্রায় দশ বছর। মহেন্দ্রনাথ ব্যবসায়ী মানুষ। চা, চিনি ও চাল একটা নয়, মোট তিনটে ব্যাবসার অধিস্বামী এই দত্তকর্তা।
পিতলের খুন্তিটা দিয়ে মাছের টুকরোগুলো উলটাতে থাকে প্রমীলা। শঙ্করীর মোচা কাটা শেষ হলে সেটা প্রমীলার দিকে এগিয়ে দিয়ে, “বড় বউদি ডাল বাটব বড়ার জন্য?” জিজ্ঞাসা করে।
— “হ্যাঁ।” পিতলের বড়বাটিতে ভাজামাছ তুলতে তুলতে প্রমীলা উত্তরে জানায়।
রান্নাঘরের ডেক্সের থেকে মুসুরডাল নামিয়ে কাঁসার বাটিতে জল নিয়ে তার মধ্যে মুসুরডাল ভিজিয়ে রাখে শঙ্করী। মাছগুলো কড়কড়ে করে ভেজে নিয়ে, কড়াইয়ের তেল অন্য আর-একটি বাটিতে ঢেলে কড়াইটা আবার ওভেনে চাপিয়ে নতুন করে সর্ষের তেল দেয় প্রমীলা। ধিমি বুড়বুড়ি কেটে তেলগরম হলে লম্বা লম্বা করে কেটে রাখা আলুর টুকরোগুলি তেলে দেয়।
— “বড় বউদি এক কাপ চা হবে?”
ব্যস্ত রাতের অকস্মাৎ ডাক শুনে প্রমীলা পিছন ফিরতেই দেখে কৌশিক রান্নাঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কথাটা বলেছে। প্রমীলা মুখে কোনোরকম শব্দ না করে কেবল মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” করে। কৌশিক দরজার কাছ থেকে সরে গিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে যায়। অন্যদিকে মশলাযোগে আলুর টুকরোগুলোকে ভালোরকম ভাবে পাক দিয়ে নিয়ে তাতে জল ঢেলে কড়াইয়ের উপর কাঁসার থালা চাপা দেয় প্রমীলা। অন্য ওভেনে চায়ের জল চাপিয়ে প্রমীলা বলে ওঠে, “শঙ্করী চা করে কৌশিকের ঘরে দিয়ে আসবি।”
দত্ত পরিবারের কর্তা মহেন্দ্রনাথ দত্তের তিন ছেলে। বড়ছেলে আশীষ, মেজছেলে কৌশিক ও ছোটছেলে দেবাশীষ। বাপের তিনটে ব্যাবসা বর্তমানে এই তিন ছেলেই সামলায়। কিন্তু কোথাও গিয়ে মহেন্দ্রনাথ মেজছেলের প্রতি একটু বেশিই আস্থা রেখেছেন। আসলে যেটা প্রতিনিয়ত, প্রতি ঘরে ঘরে হয়ে থাকে। একের অধিক সন্তান হলে যে-কোনো একের সমাদর বেশি। দত্তবাড়ি নিয়মশৃঙ্খলায় বাঁধা। এই বাড়ির বউদের উচ্চশিক্ষিতা হতে হবে, রান্না-সেলাই জানতে হবে, কিন্তু বাইরে কোথাও কারোর অধীনে কাজ করতে পারবে না। চার দেয়ালের ভিতরে থেকেই গৃহলক্ষ্মী হয়েই তাদের শেষ পর্যন্ত থাকতে হবে। জানা যায় মহেন্দ্রনাথের স্ত্রী বিভা গণিতে স্নাতক ছিলেন।
দত্তবাড়ির বিভিন্ন নিয়মাবলীর মধ্যে বিশেষ কয়েকটি হল, ভোর পাঁচটার সময় বাড়ির বউদের ঘুম থেকে উঠে বাড়ির সুবৃহৎ মার্বেলের উঠোন জল দিয়ে ধুয়ে স্নান সেরে ঠাকুরঘরে গিয়ে পুজো দেওয়া। দত্তবাড়ির কুলদেবী মা ষষ্ঠী। একটি কালো বিড়ালের উপর মা লাল পাড়ের সাদা-শাড়ি পরে কোলের উপর একটি শিশু নিয়ে বসা। ষষ্ঠীর যাবতীয় আচারবিধি পালন করাই দত্তবাড়ির ধর্ম। পালাভাগে বাড়ির বউদের রান্নার পদ্ধতি। সকালের রান্না করবে এক বউ রাতের রান্না অন্য বউ। বাড়ির তিন ছেলেই বাপকে যমের মতো ভয় ও সমীহ করে চলে। ব্যাবসার থেকে যাবতীয় টাকা তারা মহেন্দ্রনাথের হাতে তুলে দেয়। মহেন্দ্রনাথ সেখান থেকে সংসার খরচের টাকা আর ন্যূনতম হাত খরচ ছেলেদের হাতে দেয় আর বাড়ির তিন বউয়ের সাধ আহ্লাদ নেই বলাই ভালো। বড় ছেলে আশীষ অনেকটা মহেন্দ্রনাথের আদলে তৈরি হয়েছে। গুরুগম্ভীর, রুক্ষ ও মেজাজী। মেজছেলে কৌশিক সবার সঙ্গে সমতা বজায় রেখে চলে আর ছোটছেলে দেবাশীষ খুবই শান্ত। দত্তবাড়ির তিন ছেলের প্রকৃতি তিন প্রকারের।
দত্তবাড়ির তিন বউদের মুখে হাসি প্রচ্ছন্নরূপেও নেই। কিন্তু লোকদেখানো হাসি তিন বউই খুব ভালোই দেখাতে পারে। গম্ভীর বিষাদের ছাপ মুখোপরে বয়ে নিয়ে ভোর পাঁচটার থেকে ঘুমাতে যাবার আগে পর্যন্ত সংসারের প্রতি খেটে চলে দত্তবাড়ির এরা তিনজনে। হুটপাট বাড়ির বাইরে বেরোবার অনুমতি নেই বউদের। মহেন্দ্রনাথ দত্তের অতিপ্রিয় ও বিশ্বস্ত হল চাকর শম্ভু। তিরিশ বছর হল এই দত্ত পরিবারের সঙ্গে সে নিজের সমতা বজায় রেখে চলেছে। এছাড়াও তিন ছেলের তিনজন কাজের লোক আর তিন বউয়ের তিনজন কাজের মেয়ে দত্তবাড়িতে বর্তমান।
চা বানিয়ে শঙ্করী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দোতলায় কৌশিকের ঘরের সামনে গিয়ে দরজায় টোকা মারতেই, “খোলা আছে” ঘরের ভিতর থেকে কৌশিক বলে ওঠে।
শঙ্করী দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে কৌশিকের টেবিলের উপর চায়ের কাপটা রেখে ঘর থেকে বেরোতে যাবে এমন সময় কৌশিক গম্ভীর স্বরে শঙ্করীকে বলে ওঠে, “বড় বউদি নিজে না এসে তোমাকে দিয়ে চা পাঠাল কেন?”
— “আসলে বউদি রাতের খাবার তৈরি করছে ওইজন্য...!” এটুকু বলে নিয়ে শঙ্করী কৌশিকের ঘর থেকে বেরিয়ে চলে আসে।
এ নতুন কিছুই নয়। এ হল দৈনন্দিন জীবন দত্তবাড়িতে বউদের। রাতে বাড়ির সকল পুরুষ একসঙ্গে খাবার টেবিলে খেতে বসে আর কাজের লোক ও কাজের মেয়েদের সমেত বাড়ির বউয়েরা পরিপাটি করে পরিবেশন করে। কাঁসার থালায় সুন্দর করে ভাত সাজিয়ে থালার বাঁদিকে লবণ ও লেবু, কাঁসার বাটিতে বাটিতে করে চার থেকে পাঁচ রকমের রান্নাইপদ ও কাঁসার গ্লাসে জল।
খেতে বসে খুব ধিমিস্বরে মহেন্দ্রনাথ বলে ওঠে, “আশু, ভবানীপুরের বিলাসজী আমায় ফোন করেছিল। ওঁর বক্তব্য এইবারে দশ কুইন্টাল মিনিকিট নাকি ভালো যাইনি।”
আশু মানে মহেন্দ্রনাথের বড়ছেলে আশীষ। চালের ব্যাবসাটা আশীষের দায়িত্বে। আশীষ সামান্য অপ্রস্তুতের মুখে পড়লেও বাপের সামনে না ঘাবড়ে বেশ স্বাভাবিকভাবেই উত্তরে বলে, “না বাবা, তেমন নয়। সবসময় তো এক কোয়ালিটি থাকে না। সেইজন্য...!”
— “স্কুল স্টুডেন্টের মতো এক্সকিউজ দিতে এসো না। লক্ষ্মী নিয়ে ব্যাবসা করতে গিয়ে এমন ঘোটালা করতে যেও না যাতে লক্ষ্মীর আমদানি হওয়াটা তো দূরের কথা টেবিলে বসে লক্ষ্মী দাঁতে কাটাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।”
— “মানেটা কী? তার মানে আমি ইচ্ছা করে…”
— “কালই দশ কুইন্টাল চাল পাঠিয়ে আগের পাঠানো চাল গোডাউনে নিয়ে আসবে, দ্বিতীয়বার যেন আমার কাছে ফোন না আসে।” আশীষের কথা থামিয়ে মহেন্দ্রনাথ বলে ওঠে। “প্রমীলা মোচার ঘন্টটা আর-একটু দাও তো, ভালো রেঁধেছ।”
বাকি দুইছেলে কৌশিক আর দেবাশীষ কোনোরকম কথা না বলে আপন মনে খেয়ে চলে। সত্যি বলতে আশীষ দুই-একটা কথা মহেন্দ্রনাথের সামনে বললেও এরা দুইজন বাপের সামনে আমরণ মৌনব্রত পালন করে চলে। ভূমিকম্পে মাটি দুই ফাঁক হলেও এদের ঠোঁট ফাঁক হয়ে বাপের সামনে “রা” কাটে না।
— “আর এই যে আমার মানিকজোড় মেজ-ছোট।” মহেন্দ্রনাথ চোখ ট্যারিয়ে বলতেই দুইছেলে একসঙ্গে খাবার টেবিলে কেশে ওঠে। দুইছেলে যেন আতঙ্কে ছিল কখন বাপে ঘেঁটি ধরবে। কাঁসার গ্লাস হাতে তুলে নিয়ে ঢকঢক করে জল খেয়ে দেবাশীষ বলে ওঠে, “হ্যাঁ বাবা।”
মহেন্দ্রনাথ রুইমাছ থালায় তুলে নিয়ে মাছের দিকেই দৃষ্টি রেখে মাছের ছাল ছাড়াতে ছাড়াতে বলে, “মিষ্টি ভালো। কিন্তু খুব বেশি হয়ে গেলে সেটা সুগারে গিয়ে দাঁড়াতে পারে।”
— “কী বললে বাবা?” অবাক ভঙ্গিতে দেবাশীষ জিজ্ঞাসা করতেই মহেন্দ্রনাথ, দেবাশীষের দিকে চোখ তুলে বলে ওঠে, “ব্যাবসার সময় ব্যাবসার ফোনটা এলেই ভালো। হাতে মোবাইল নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বউয়ের সঙ্গে কথা বলাটা ব্যাবসার জন্য ভালো নয়। এতে আমাকে চিনির ব্যাবসা উঠিয়ে উচ্ছে বা করলা নিয়ে বসতে হয়।”
বাপের কাছে এইরূপ কথা শুনতেই লজ্জায় মাথা নামিয়ে দেয় দেবাশীষ। মহেন্দ্রনাথ একটা বিদ্রূপসূচক হাসি হেসে বলে ওঠে, “বুঝি, বুঝি। নতুন বিয়ে, নতুন বউ, সবেমাত্র বিয়ের জলটা গায়ে পড়ল তো, এখন সবই রঙিন দেখাবে। বেশিদিন এইরকম ফোনাফুনি চলতে থাকলে রঙিন রঙ গুলে গিয়ে কালো হয়ে না দাঁড়ায়। দ্বিতীয়বার যেন কাজের সময় প্রেম না চলে। বুঝেছ?”
দেবাশীষ মাথা নামিয়ে কপাল কুঁচকে থালায় তর্জনী দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটতে থাকে।
— “আর বাবা কৌশিক, তোমার ভাবধারা বোঝা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার পক্ষে। তোমার হাতে চায়ের ডিপার্মেন্ট ছাড়ার পর থেকে ব্যাবসা আমার লাভের মুখ দেখছে কম অ্যাভারেজে রান করছে। কী সমস্যা সেটা দেখো।”
খাবার টেবিলে আর কোনোরকম কথা হল না সেইদিন। বাড়ির পুরুষদের খাইয়ে তারপর বাড়ির বউয়েরা খেতে বসল। সবার খাওয়া শেষ হলে শঙ্করী ও প্রমীলার সবকিছু পরিষ্কার পরিছন্ন করে ঘরে আসতে আসতে ঘড়িতে বাজল রাত্রি সাড়ে এগারোটা। শঙ্করী, প্রমীলার ঘরেই মেঝেতে শোয়। সুন্দর করে মশারি খাটিয়ে প্রমীলা আর শঙ্করী শুতে যাবে এমন সময় প্রমীলার পাশের ঘর থেকে, “মা গো...!” দীপিকার এক চাপা আর্তনাদ ভেসে আসে।
— “কী হল?” শঙ্করী বেশ অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে প্রমীলাকে জিজ্ঞাসা করতেই প্রমীলা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলে ওঠে, “হুঁ! ওই যা হয়।”
— “মারধর?”
— “আশীষ দত্তের মারও যা বউকে বিছানায় ফেলে সোহাগ করাও তাই। পাঁচটা বছর তো ওই ঘরের খাটের উপর আমার সাথেও চলত।”
— “ছিঃ!”
— “ছিঃ কী? দত্তবাড়ির ভাবীউত্তরসূরীকে পেটে ধরবে আর এটুকু বরের যাতনা সহ্য করবে না, সেটা কি হয়? কষ্ট করলে না ছেলে বিয়োবে! এই যুগে দাঁড়িয়েও সতীন নিয়ে ঘর করছি। সেই কষ্টটা আর কে বুঝবে, বাইরের লোক?”
— “কিন্তু তুমি প্রথমেই বাঁধা দিতে পারতে। এইভাবে মেনে না নিয়ে...।”
— “মেনে না নিয়ে উপায় কি ছিল? কী করতাম? গরীব ঘরের মেয়ে আমি। বাপের বাড়ির জোর দিয়ে যে দাঁড়াব সেই জোরটুকুও ছিল না। এত লেখাপড়া শিখেও কোনো লাভ হল না। বিয়ের পাঁচ বছর পরও যখন দত্তবাড়িকে তাদের কুলপ্রদীপ দিতে পারলাম না তখন বর আমার বাপের কথা শুনে দ্বিতীয়বার বিয়ে করে বউ ঘরে তুলল। দুই বছর হবার মুখে। কই ছেলে বেরোলো? আসলে আমি মেয়ে মানুষ তো তাই বাজা বলাটা খুব সোজা।
শঙ্করী, প্রমীলার মুখের দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকে। প্রমীলা সামান্য হেসে নিয়ে জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “কী দেখছিস? আমি রেগে আছি কিনা? না। যেমন ছিলাম তেমনই আছি। আর রাগ করবই বা কার উপর? ঘরের লোকটাই যদি পাশে না থাকে, চল রাত হয়ে গেছে কাল সকাল সকাল উঠতে হবে।”
শঙ্করী কপাল কুঁচকে বেশ আটঘাট নিয়ে বলে, “কাল তো আর তোমার কাজ নয়, দীপিকা বউদির কাজ। চলো শুয়ে পড়ো।”
নিত্যদিনের মতো দত্তবাড়িতে বউদের নিজ নিজ কর্মরীতি শুরু। আশীষের দ্বিতীয়া স্ত্রী দীপিকা, রান্নাঘরে কাজের মেয়ে রত্নাকে নিয়ে রান্নার আনাজপাতি ফ্রিজের ভিতর থেকে ধীরে ধীরে বের করতে থাকে। সকালের জলখাবার বাড়ির পুরুষদের হয়ে গেছে। দত্তবাড়ির বহু নিয়মবিধির মধ্যে একটি হল, বাড়ির সকল পুরুষরা সকালের জলখাবার, কাজের যাবার আগে বেলার খাবার, দুপুরের খাবার ও রাতের খাবার একসঙ্গে গোলটেবিলে বসে খায়। কারোর জন্য ব্যক্তিগতভাবে খাবার বা আঁশ নিজের নিজের শোবার ঘরে যাবে না। বাড়ির কর্তা মহেন্দ্রনাথ দত্তের কথা অনুযায়ী সকাল আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে চা-জলখাবার খেতে সবাইকে নীচের ডাইনিং প্লেসের ডাইনিং টেবিলে আসতে হবে। সাড়ে আটটার পর যদি কেউ ডাইনিং টেবিলে এসে উপস্থিত হয় তাহলে সে আর সেইদিন জলখাবার খেতে পারবে না। কাজে বেরোবার আগে ঠিক দশটার সময় আবার বাড়ির ছেলেরা ডাইনিং টেবিলে চলে আসে। খাওয়া সেরে ঠিক এগারোটায় যে যার কাজে বেরিয়ে পড়বে। মহেন্দ্রনাথ ব্যাবসা ছেলেদের হাতে তুলে দিলেও রশি সর্বদা নিজের হাতেই রেখেছে যাতে ছেলেরা বেগতিক কিছু করলে তখন মহেন্দ্রনাথ নিজে তা সামাল দিতে পারে। বাড়ির বউদের উপর আলাদা নিয়ম তো আছেই। বাড়ির ছেলেরা খেতে বসলে পরিবেশন করবে বাড়ির কাজের লোক বা কাজের মেয়েরা নয়, করবে বউয়েরা।
— “মাছ কী দিয়ে করবে বউদি, পিঁয়াজ না কালোজিরে?” ডিপফ্রিজের ভিতর থেকে মাছের পাত্র বের করে নিয়ে রত্না, দীপিকাকে প্রশ্ন করে।
দীপিকা ওভেনের উপর চাপানো পিতলের ভাতের হাঁড়ির ঢাকা খুলে, পিতলের হাতা দিয়ে কয়েকটা ভাত হাতায় তুলে ডান হাতের দুটো আঙুল দিয়ে চিপে নিয়ে বলে ওঠে, “তোর মাথা গেছে নাকি রে রত্না?”
— “কেন বউদি?” রত্না অবাক বদনে দীপিকাকে প্রশ্নটা করতেই দীপিকা হাঁড়িতে ঢাকা চাপা দিয়ে বলে, “কী বার আজকে?”
— “ওহঃ। মাথা থেকেই বেড়িয়ে গেছে আজ তো যা হবে সব নিরামিষ।”
হ্যাঁ! সপ্তাহের সাতদিনের মধ্যে কেবলমাত্র বৃহস্পতিবার দত্তবাড়িতে নিরামিষ রান্না হয়। মহেন্দ্রনাথের বিশ্বাস এতে নাকি ধনধান্যে লক্ষ্মীদেবী প্রসন্ন হন। কিন্তু কে বোঝাবে মহেন্দ্রনাথকে যে লক্ষ্মী স্বয়ং সধবার প্রতীকি। মাছে-আঁশে, লক্ষ্মী বাস।
দীপিকা কথা মনে করিয়ে দিতেই রত্না ফ্রিজ খুলে মাছ রাখতে যাবে এমন সময়, “দাঁড়া রত্না।” রান্নাঘরের দরজার দিক থেকে ডাক ভেসে আসে। দীপিকা আর রত্না দুইজনই দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে প্রমীলা।
— “আরে দিদি, এসো।” ঠোঁটের কোণায় একটা হাসি এনে দীপিকা বলে ওঠে। “আমি একটু পরেই তোমার কাছে যেতাম।”
— “কেন?” প্রমীলা প্রশ্ন করে।
গ্যাসের ওভেনে পিতলের কড়াই চাপিয়ে তাতে সর্ষের তেল ঢেলে নিয়ে দীপিকা বলে, “সুক্তোটা দেখিয়ে দেবার জন্য। বাবা তো তোমার হাতের রান্না খেতে খুবই ভালোবাসে তার উপরে আজ নিরামিষ।”
দীপিকার কথা শুনে সামান্য হেসে নিয়ে রত্নার কাছে এগিয়ে এসে প্রমীলা বলে, “তিনটে মাছের টুকরো তুলে রেখে ভেজে নিস।”
— “কেন দিদি?” দীপিকা জানতে চাইলে, প্রমীলা দীপিকার দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে উত্তরে জানায়, “আজ একাদশী। আর এই বাড়ির নিয়ম একাদশীর দিনে বাড়ির সধবা বউদের আঁশ মুখে দিতেই হবে। ভুলে গেছিস?” কথাটা বলেই রত্নার দিকে ফিরেই প্রমীলা বলে ওঠে, “তুই তিনতলার ছাদটা ঝাঁট দিয়ে আয়। এদিকে আমি দেখে নেব, যা।”
তিনটে মাছের টুকরো একটা কাঁসার বাটিতে আলাদা করে তুলে রেখে, ঢাকনা চাপা দিয়ে রত্না বেরিয়ে যেতেই প্রমীলা জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “সজনে কেটেছিস?”
— “হ্যাঁ দিদি। ওই যে থালায় ঢাকনা চাপা। ডাল, বেগুনভাজা, আলুভাজা, পটলভাজা আর আলুরদম আর আলুপটলের ঝোল হয়ে গেছে, সুক্তোটা বাকি।”
দীপিকার কথা শুনে প্রমীলা কপালটা কুঁচকে বলে ওঠে, “আমাকে ডাকতে পারতি। এতগুলো রান্না।”
— “আর কত করবে এই দত্তবাড়ির সংসারের জন্য? নিজের স্বামীকেও এই সংসারের জন্য আমার হাতে সঁপে দিয়েছ। ছোট সবে বিয়ে করে এসেছে। রান্নাবান্না তেমন পারে না। যেদিন ওর রান্না থাকে সেদিনও ওর বদলে তুমি করো। তোমায় দেখে আমার অবাক লাগে দিদি। সবকিছু এইভাবে মুখ বুঝে দিনের পর দিন কী করে মেনে চলেছ? তোমার নিজের বলে কিছুই নেই?”
— “কিচ্ছু নেই। যেদিন মাথায় সিঁদুর নিয়ে দত্তবাড়ির বড়বউ হয়ে এই বাড়িতে এসেছি সেইদিনই সব সাধ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছি।”
— “আর আশীষ?”
— “তুই নিজে বুঝতে পারছিস না ও কী? দুবছর তো হবার মুখে।”
— “সবই বুঝতে পারছি।”
— “যতই ওকে বুঝতে না দিয়ে ওষুধ খাওয়া, জীবন সংকটের দোহাই দিয়ে তাবিজ মাদুলি পড়া, ঢোঁড়াসাপ সেই জাতেরই থাকবে গোখরো হবে না। শুধু কামড়াবে।”
— “সাপই বটে।”
কড়াইয়ের তেলে কেটে রাখা আলুর টুকরোগুলো ছেড়ে খুন্তি নাড়তে নাড়তে প্রমীলা তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দীপিকার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “ছেলে দিতে পারবি তো দত্তবাড়িকে?”
কথাটা শুনে দীপিকা মাথা নামিয়ে বাটি বাটি করে আলুরদম তুলতে থাকে।
প্রমীলা সামান্য হেসে নিয়ে বলে, “আমাদের শ্বশুরঠাকুর আর একবছর দেখবে তারপর হয়তো আমাদের আর-একজন সতীন ঢোকাবে।”
— “যদি আনে, আনবে। বারণ তো আর করতে পারব না।”
— “কালরাতে ওইরকম মরার চিৎকার দিয়ে উঠেছিলি কেন? বর বুঝি নতুন পোজে করছিল?” বিদ্রূপভঙ্গিতে কথাটা বলা মাত্রই শঙ্করী আর রত্না একসঙ্গে রান্নাঘরে এসে দাঁড়ায়।
— “সকালের বাসন মাজা হয়ে গেছে?” প্রমীলা প্রশ্ন করতে শঙ্করী মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” করে। রান্নাঘরে না ঢুকেই শঙ্করী বাইরে থেকে জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “কাপড়গুলো কি এই বেলা কাচব নাকি দুপুরে।”
শঙ্করীর কথাটা শুনে দীপিকা বলে ওঠে, “না, না। এখনই করে দে আর রত্নাকেও সাথে নিয়ে যা। আমার এদিকে হয়ে গেছে ওকে এখন আর এখানে লাগবে না।”
বাড়ির দুই কাজের মেয়ে কথামতো রান্নাঘরের কাছ থেকে চলে যায়। অন্যদিকে দুই সতীনের মধ্যে আর কোনোরকম কথা না হয়ে যে যার নিজের কাজ করে চলে। প্রমীলা সুক্তো রান্না শেষ করে বলে ওঠে, “নে বাটি বাটি করে তুলে নিস।”
— “আচ্ছা দিদি, বাবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষমতা কি কারোর মধ্যে ভগবান দেয়নি?” দীপিকার কথাটা শুনে প্রমীলা বেশ গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, “আসল কারণ কী জানিস, ক্ষমতা সবার মধ্যেই আছে, সাহসটা নেই। সাহস আর ক্ষমতা দুটো এক নয়। আমরা তালেগোলে এক করে একাকার করে ফেলি। যা, খাবার বেড়ে দে টেবিলে। আমি আসছি। দেখি ছোটটা কোথায়?”
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি পেরিয়ে দোতলায় উঠে দোতলার বারান্দা দিয়ে প্রমীলা ঘরে যেতে যাবে এমন সময় কৌশিক নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এক ঝটকায় প্রমীলার হাত ধরে টেনে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে, প্রমীলাকে দেয়ালে ঠেসে ধরে প্রমীলার ঠোঁটের কাছে নিজের ঠোঁট এগিয়ে কৌশিক বলে ওঠে, “কী ব্যাপার? কাল সারারাত আমি ছাদে অপেক্ষা করলাম, আসলে না কেন?”
প্রমীলা কৌশিকের হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলে ওঠে, “এটা ঠিক নয় কৌশিক। ছাড়ো আমাকে।”
— “তাহলে কোনটা ঠিক? দাদার দ্বিতীয়বার বিয়ে করাটা? বলো।”
— “বাবা এই মুহূর্তে নীচে যাবেন। তিনি যদি জানতে পারে আমি তোমার ঘরে অনর্থ ঘটে যাবে। কৌশিক অবুজ হয়ো না, ছাড়ো।”
— “না প্রমীলা। আগে বলো আজ রাতে ছাদে আসবে?”
— “কেন বুঝতে পারছ না, আমাদের সম্পর্ক ঠিক নয়।”
— “কোনটা ঠিক কোনটা ভুল আমাকে বোঝাতে এসো না। আমি শুধু জানতে চাই তুমি আসছ কিনা।”
— “ঠিক আছে, আগে কাজে বেরোও। দেরি হয়ে যাবে। এমনি আজ দেবু সকালে জলখাবারের টেবিলে আসেনি। বাবার মেজাজ বিগড়ে। দয়া করে তুমি আলাদা করে কিছু কোরো না। তোমার দাদা দেখতে পেলে...!” এরপর প্রমীলা হয়তো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু কৌশিক, প্রমীলার নরম ঠোঁট নিজের ঠোঁটের মধ্যে চেপে ধরে প্রমীলাকে থামিয়ে দেয়।
খাবার টেবিল দেবাশীষ চেয়ার টেনে নিয়ে বসতেই মহেন্দ্রনাথ কড়া গলায় বলে ওঠে, “কী ব্যাপার, আজ সকালে তোমায় দেখলাম না।”
দেবাশীষ আমতা আমতা করে খুব ধীর গলায় উত্তরে বলে, “না! আসলে বাবা শরীরটাও ভালো ছিল না আর উঠতেও দেরি হয়েছে।”
— “তা তো হবেই বাবা। শরীরের আর দোষ কী? বউ পেয়ে রাত জেগে প্রেমপর্ব চললে শরীরের দোষ দিই কী করে?”
কথাটা শুনে বাড়ির সকলে মাথা নীচু করলেও দেবাশীষের স্ত্রী মানে দত্তবাড়ির ছোটবউ দ্যুতি কাউকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে জোর স্বরে মহেন্দ্রনাথকে বলে ওঠে, “আপনি কথায় কথায় বাড়ির বউদের খোঁচা মারেন কেন বলুন তো?”
দ্যুতি কথাটা বলায় কেবলমাত্র মহেন্দ্রনাথ নয়, আশীষ, কৌশিক, দেবাশীষ ও বাড়ির বাকি দুই বউয়ের চোখ অচম্বিত দৃষ্টি জ্ঞাপন করে। যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। বাড়ির ছেলেরাও যে মানুষটাকে সমঝে নিয়ে কথা বলে তাদেরকে উপেক্ষা করে মাত্র দুইমাসের নবাগতা পুত্রবধু জবাব চেয়ে ওঠে।
মহেন্দ্রনাথ, দ্যুতির দিকে নজর স্থির রেখে গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, “আমি কথা বলছি ছেলের সাথে। তোমাকে তো কিছু বলিনি। তোমায় কী বললাম?”
— “বলেননি? এটা আজ নয়, বিয়ে করে আসার পর থেকে শুনে যাচ্ছি। কী মনে করেন আপনি নিজেকে? উঠতে বসতে আপনি আমার স্বামীকে অপমান করে চলেন।”
— “তোমার স্বামী যে, সে আমার ছোট ছেলে। সেটা ভুলো না দ্যুতি।”
— “ছেলে যখন, তখন তাকে ছেলের মর্যাদাটাও দিন। আপনার পায়ের তলায় থাকা সাধারণ কর্মচারীর নয়।”
দত্তবাড়ির ছোটবউ দ্যুতির কথাগুলো মহেন্দ্রনাথের যেন গালের উপর সপাটে গিয়ে পড়ছে। এত বছরে কারোর যা সাহসে কুলোয়নি আজ সেই সাহস গণ্ডি ভেদ করে মহেন্দ্রনাথের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মহেন্দ্রনাথ মুহূর্তের মধ্যে খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে তীব্রস্বরে ছোটছেলে দেবাশীষের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “কী রে? তোর মান সম্মান বলে কিছু আছে? তোর বউ তোর সামনে আমাকে অপমান করছে আর তবুও তুই চুপ? লজ্জা করছে না তোর?”
দ্যুতিও মহেন্দ্রনাথের চোখ রেখে বলে ওঠে, “মানে লাগল? খুব লাগল? আর আপনি যাদের উঠতে বসতে ঠিক ওইভাবে অপমান করেন, তাহলে তাদের কীরকম লাগে ভেবে দেখুন।”
— “দেবু...!”
— “ওকে সাক্ষী রাখার চেষ্টা করছেন কেন, কথা হচ্ছে আপনার সঙ্গে আমার আর যা হচ্ছে সবার সামনে হচ্ছে।”
মুহূর্তের মধ্যে প্রমীলা দ্যুতির হাত টেনে, “চুপ কর। ছোট চুপ কর তুই।”
— “না। প্রথমদিন থেকে আমি দেখে চলেছি। এই মানুষটার অযুক্তিক শাসন সহ্যের বাইরে। আরে বাবা ছেলেদের যদি এতই অবিশ্বাস তাহলে কে মাথার দিব্যি দিয়েছিল ব্যাবসা ছেলেদের হাতে তুলে দিতে? সামলান নিজে, দেখি বুড়ো হাড়ে জোর কত, শাসনে তো ষোলোয়ানা।”
— “দেবু বউকে চুপ করতে বল। প্রেম করে বিয়েটা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মেনে নিয়েছি তো তার জন্য বুলি বেরোচ্ছে। যদি বাড়ির বাইরে বার করে দিতাম, তখন দেখতাম, বুলি কোথায় থাকত?”
— “সেটাই করতেন। কে বলেছিল আমাকে ঘরে তুলতে? একটা কথা কান খুলে শুনে রাখুন, আপনার ভয়ে, আপনার শাসনের দাপটে, বাড়ির ছেলেরা বা বাড়ির বাকি দুইবউ চুপ থাকতে পারে, দ্যুতি নয়। তেমন বাপের বেটি আমি নই।”
— “তুমি কি আমায় হুমকি দিচ্ছ?”
— “না। বুঝিয়ে দিচ্ছি, এরপর আমার আর দেবাশীষের ব্যাপারে ফালতু কথা বললে ফলটা ভালো হবে না।”
— “কী করবে?”
— “বেশি কিছু না, খাবারে বিষ মিশিয়ে অজান্তে খাইয়ে দত্তবাড়ি ভোগ করব। আশা করি সেটা করতে আপনি আমায় বাধ্য করবেন না।”
— “দেবু...!” মহেন্দ্রনাথ চিৎকার দিয়ে উঠতেই দ্যুতিও তেমন বেগে বলে ওঠে, “আর খাবার টেবিল ছেড়ে উঠছেন কোথায়? বাড়ির বউদের মাথা কিনে নিয়েছেন নাকি যে কারী কারী রান্না করিয়ে তারপর ফেলবেন? প্রত্যেকটা পদ একটা একটা করে গিলতে হবে। এবার ঠিক করুন আপনি নিজের হাতে গিলবেন নাকি আমি ঠেসে গিলাব?”
মহেন্দ্রনাথ কথা না বাড়িয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে চেয়ারে বসে পড়ে।
— “বাবার সাথে ওইরকমভাবে কথাগুলো না বললেই পারতে তোতা।” রাতেরবেলায় দেবাশীষ, দ্যুতিকে নিজের বুকের ভিতরে জড়িয়ে ধরে দ্যুতির কাঁধের কাছে নিজের ঠোঁট বোলাতে বোলাতে খুবই শান্ত গলায় বলে ওঠে। দুইজনের শোবার ঘরের আলো বহুক্ষণ আগেই নিভে গেছে। কাচের জানালা দিয়ে ভেসে আসা চাঁদের হালকা আলোয় ঘরের আঁধার যৎসামান্য দূর হলেও তাকে আলোকময় বলা চলে না। বিয়ের আগের থেকেই দেবাশীষ দ্যুতিকে আদর করে তোতা নামে ডাকে। দ্যুতি দেবাশীষের উন্মুক্ত পিঠে নিজের নরম দুই হাত ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে উত্তরে বলে, “কেন? আমি অন্যায় কিছু বলেছি?”
দ্যুতির কথা শেষ না হতেই দেবাশীষ মুহূর্তের মধ্যে দ্যুতিকে আরও সজোরে জড়িয়ে ধরে ঘুরিয়ে নিজের বুকের উপরে এনে দ্যুতির গলায় জিভ টানতে টানতে বলে, “ভুল নয়। আজ পর্যন্ত কেউ এরকমভাবে বাবাকে বলেনি, সেটাই বলছি। বয়স হয়েছে, খিটমিট তো একটু করবেই।”
— “করতে হয় অন্যদের সাথে করুক। আমার সাথে করতে যেন না আসে।”
— “উফফ এত রাগ না তোমার। কোনদিন দেখবে এই রাগের চোটে আমাকেই মেরে বসবে।”
কথাটা শুনে দ্যুতি সামান্য হেসে দেবাশীষের কানের কাছে ঠোঁট ঠেকাতেই দেবাশীষ নিজের কামত্তৌজনার দরুন একটানে দ্যুতির পিঠের উপরের দিকের ব্লাউজ দুইহাতের আঙুলের জোরে ফড়ফড় করে ছিঁড়ে ফেলে।
— “ধ্যাত! কী যে করো না তুমি।” দ্যুতি রেগে দেবাশীষের বুকের উপর থেকে একঝটকায় উঠে খাটের উপর বসে কথাটা বলে।
দেবাশীষ বিছানায় শুয়ে খুব ধিমিস্বরে জানতে চায়, “আমি আবার কী করলাম।”
— “কী করলে? আমার কটনের ব্লাউজটা গেল, ধুর!” দ্যুতির কথা শুনে দেবাশীষ দ্যুতির হাত ধরে নিজের দিকে টানতে গেলে দ্যুতি অভিমানের সুরে বলে, “ছাড়ো তো!”
— “একটা ব্লাউজ ছিঁড়লাম বলে এত রাগ?”
— “ভালো লাগছে না সরো।”
নিশুতি রাতে দত্তবাড়ির ছোটছেলের ঘরে প্রেম ও মান অভিমান দুটো একসাথেই পাল্লা দিয়ে চলছে।
বাড়ির নির্জন ছাদের চিলেকোঠার দেয়ালে কৌশিক, প্রমীলাকে ধরে প্রমীলার গলা থেকে বুক ও বুক থেকে গলা পর্যন্ত ক্রমাগত একনাগাড়ে ঠোঁট ও জিভ ঘষে চলেছে। প্রমীলা যেন কৌশিককে বাঁধা দিয়েও দিতে পারছে না। তার সারা শরীর কামনার উদ্দাম স্রোতে ভেসে যেতে চাইছে। কৌশিকের উষ্ণ নিঃশ্বাস আর উত্তপ্ত দেহের সংস্পর্শে প্রমীলার সারা দেহ আন্দোলিত হয়ে উঠেছে। নিজের স্বামী আজ অন্য মেয়ে নিয়ে বিছানা গরম করে চলেছে দুইবছর ধরে। এই একাকীত্বময়ী জীবনে কৌশিক যেন নতুন করে তার মধ্যে বাসা বেঁধে ফেলেছে। দত্তবাড়ির মেয়েদের অন্দরমহলের খবর কেইবা রাখে? সবাই তো বাইরের ঝাঁ চকচকে জীবনটা দেখেই আনন্দিত হয়।
কৌশিক হাঁটুগেঁড়ে বসে প্রমীলার নাভির অভ্যন্তরে নিজের জিভের অগ্রভাগ প্রবেশ করাবার মাত্রই প্রমীলা নিজের দুইহাতে কৌশিকের মাথার চুল উত্তেজনায় চিপে ধরে। চিলেকোঠার ভিতরে মাঝে মাঝে চাঁদের আলো উঁকি দিচ্ছে কখনওবা আড়াল হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ চাঁদের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে ভারী ভারী মেঘমালা।
— “আমি আর পারছি না, আমাকে এবার ছাড়ো!” খাটের মাথার দিকের তক্তাতে হাতে ভর দিয়ে, ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে দীপিকা, আশীষকে মিনতির সুরে বলে ওঠে। আশীষ, দীপিকার কথা শুনে আরও যেন ক্ষিপ্ত হয়ে দীপিকার উন্মুক্ত স্তনদ্বয়ের উপর কামড় বসাতে থাকে। আশীষ যেন মরিয়া হয়ে দীপিকার যৌবন নিংড়ে নেবার চেষ্টা করে চলেছে। দীপিকার বুক দুটো আশীষের কামড়ে কেটে ছিঁড়ে একাকার। অন্যদিকে খাটের দোলন ও সামান্য শব্দ তো আছেই। আশীষের কামাহত শারীরিক যাতনা যেন দীপিকাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। বারংবার দীপিকা, আশীষকে মিনতি করতেই আশীষ কামকর্ম অব্যাহত রেখেই শান্ত গলায় বলে ওঠে, “আমি থেমে গেলে দত্তবাড়িতে ছেলে আসবে কী করে?”
— “আমার কষ্ট হচ্ছে আশীষ।”
— “স্বামীর জন্য যদি এই কষ্ট সহ্য করতে না পারো তো স্ত্রী হয়ে লাভ কী?” কথাটা বলেই আরও তীব্রবেগে দীপিকার যোনিপ্রদেশে নিজ লিঙ্গ সঙ্গমে আশীষ সজোরে আঘাত করতে থাকে। দীপিকার সারা শরীর অগ্নিদহনের দাপটে জ্বলে চলেছে। দীপিকার অসহায়তা যেন আশীষকে আরও বেশি করে শক্তিপ্রদেয় করে তোলে। মুহূর্তের মধ্যে দীপিকার চুলের মুঠি চেপে ধরে, যোনিপ্রদেশে আঘাত করতে করতে আশীষ বলে ওঠে, “দেড়মাস ধরে তোমার মাসিক বন্ধ। এবার মনে হচ্ছে দত্তবাড়ি আশার মুখ দেখবে।” আশীষ কথাটা শেষ করতে না করতেই দীপিকা সামান্য ভয়ে ভয়ে বলে, “আজ দুপুর থেকে শুরু হয়েছে।” কথাটা শোনামাত্রই আশীষের মুখের আশা ও হাসি মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
নিজের ঘরের আরামকেদারাতে শুয়ে চোখ খোলা রেখে উপরের ঘুরন্ত পাখার দিকে তাকিয়ে মহেন্দ্রনাথ। চোখ থেকে যেন রাগ বেয়ে পড়ছে। এত বছরে যা কেউ পারেনি, দুইদিনে আসা এক পরের বাড়ির মেয়ে তা করে দেখিয়েছে। সবার সামনে দ্যুতির অপমান মহেন্দ্রনাথ ভুলতে পারছে না। মন চাইছে দ্যুতির চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে দত্তবাড়ির বাইরে বের করতে কিন্তু ছেলে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মহেন্দ্রনাথের সামনে। সহসা আরামকেদারার থেকে মহেন্দ্রনাথ উঠে, খাটের কাছে এগিয়ে মাথার বালিশের তলা থেকে একটা চাবির গোছা বের করে, নিজের ঘরের আলমারি খোলে। তার ভিতরে থাকার লকার খুলে একটা হালকা নীল রঙের কাঠের ছিপি দেওয়া কাচের শিশি বের করে। শিশির গায়ে একটা কঙ্কালের মুখ ও তার নীচে কাটা চিহ্ন আঁকা এবং তার ঠিক নীচেই বড় বড় ইংরাজী হরফে লেখা, “POISON!”
:::::::::::::::::::
দত্তবাড়িতে গোলটা বাঁধল ঠিক সকাল সাড়ে আটটায়। অন্যান্য দিনের মতোই আজকেও নিয়মানুসারে বাড়ির ছোটবউ দ্যুতি রান্নাঘরে কাজের মেয়ে পদ্মাকে সঙ্গে নিয়ে রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ দত্তবাড়ি কাঁপিয়ে রত্না “মাগো...!” বলে চিৎকার দিতেই সমগ্র দত্তবাড়ি কেঁপে ওঠে। আশীষ আর মহেন্দ্রনাথ তখনও খাবার টেবিল থেকে ওঠেনি। টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে দীপিকা আর শঙ্করী খাবার প্লেটগুলো তুলছিল। প্রমীলা ঠাকুরঘরে গিয়ে প্রভাতনৈবেদ্য তুলতে ব্যস্ত আর দেবাশীষ সকালের জলখাবার খেয়ে নিজের ঘরে গিয়ে ছোট সোফায় বসে আনন্দবাজার খবরের কাগজ পড়ছিল। রত্নার দায়িত্ব ছিল তিনতলার ছাদে গিয়ে ছাদ ঝাঁটানো আর জামাকাপড় শুকোতে দেওয়া। তেমনই কথামতো ছাদে গিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চিৎকার দিতেই বাড়ির সকলে চমকে উঠে ছাদের দিকে ছুটে চলে।
ছাদে যাওয়া মাত্রই সবাই দেখে রত্না জামাকাপড়ের বালতি উলটে ফেলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে আর তার ঠিক সামনেই ছাদের বড় লোহার রড থেকে নাইলনের দড়ি দিয়ে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলছে বাড়ির মেজছেলে কৌশিক দত্ত!
চোখ বোজা, ঠোঁটের কোণা থেকে রক্ত বেড়িয়ে এসে জমাট বেঁধে গেছে। কৌশিকের ঝুলন্ত দেহ দেখা মাত্রই বাড়ির মেয়েরা চিৎকার দিয়ে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে আশীষ আর দেবাশীষ দৌড়ে যায় কৌশিকের দিকে। আশীষ, কৌশিকের পায়ের দিকটা ধরে উপরে তুলতেই দেবাশীষ লোহার রড থেকে নাইলনের গিঁট খুলতে থাকে। মহেন্দ্রনাথের চোখ যেন পাথর হয়ে গেছে মৃত ছেলের দিকে তাকিয়ে। কৌশিকের প্রতি মহেন্দ্রনাথের বরাবর একটা দুর্বলতা কাজ করে এসেছে। বাকি দুই ছেলের থেকে এই ছেলের প্রতি মহেন্দ্রনাথের পিতৃটান একটু বেশিই ছিল। বহুকষ্টে নাইলনের গিঁট খুলে ছাদে শোয়ানো হয় কৌশিককে। অপরদিকে প্রমীলা ভিজে কাপড়ের থেকে জল নিংড়ে বের করে হাতের তেলোয় নিয়ে বারকয়েক জলের ঝাপটা মেরে রত্নার জ্ঞান ফেরাতেই রত্না আতঙ্কে “মে-মে-মে-মেজদা!” বলে ওঠে।

পাড়ার প্রতিবেশীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে দত্তবাড়িতে ব্রাঞ্চের থেকে পুলিশ এলো ঠিক সাড়ে নটায়। ব্রাঞ্চের সাব-ইন্সপেক্টর রূপম সেন। দত্তবাড়ির সামনে জিপ দাঁড় করিয়ে গাড়ি থেকে রূপম নামতেই দত্তবাড়ির বড় গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন সরে দাঁড়ায়। রূপম পরনে সিভিল ড্রেস। ইন করা হালকা আকাশী রঙের ফুলহাতা শার্ট আর নস্যি রঙের টাইটফিটিং ফর্মাল প্যান্ট, কোমরে চওড়া বাদামি পুলিশের বেল্ট ও বাদামি বুট, ফর্সা মুখে হালকা নীল রঙের সানগ্লাস। চোখের উপর থেকে সানগ্লাসটা খুলে বুকপকেটের ভিতরে ঢুকিয়ে জুতোর খটখট শব্দ করে দত্তবাড়ির ভিতরে ঢুকে যায়।
ড্রয়িংরুমে গিয়ে দাঁড়াতেই ব্রাঞ্চের বাকি কনস্টেবলরা রূপমকে দেখে স্যালুট মারতেই রূপম শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করে, “বডি কোথায়?”
— “ছাদে স্যার।” কনস্টেবল পরিমল উত্তরে বলে। “আর বাড়ির দুইজন বডি ছুঁয়েছে।”
— “কে কে?”
— “বাড়ির বড় ছেলে আশীষ দত্ত আর ছোটছেলে দেবাশীষ দত্ত। ভিকটিমের নাম কৌশিক দত্ত। দত্তবাড়ির মেজছেলে।”
— “সুইসাইড?”
— “সে রকমই তো লাগছে।”
— “কোনো সুইসাইডের চিঠি পাওয়া গেছে?”
— “এখনও পর্যন্ত না, তবে সার্চ চলছে।”
— “বাড়ির বাকিরা কোথায়?”
— “দোতলায় আর-একটা বসবার হলঘর আছে, ওখানে স্যার।”
আর বেশি কথা না বাড়িয়ে রূপম সোজা নীচের ড্রয়িংরুম পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে, দোতলার ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়ায়। দুইজন অফিসার হাতে ফাইল নিয়ে বাড়ির লোকেদের জবানবন্দি নিয়ে চলেছে। রূপম ঘরে ঢুকতেই দুইজন অফিসার স্যালুট মেরে বলে ওঠে, “স্যার, ইনি বাড়ির কর্তা, মহেন্দ্রনাথ দত্ত। এঁরই মেজছেলে কৌশিক দত্ত।”
মহেন্দ্রনাথ একটা বিদেশি কাঠের চেয়ারে মাথায় দুইহাত চেপে বসে রয়েছে। রূপম কোনোরকম ভূমিকা না করে সোজা মহেন্দ্রনাথের কাছে এগোতেই মহেন্দ্রনাথ মুখের উপর থেকে হাত সরায়।
— “নতুন করে জবানবন্দি নেব না। একটা প্রশ্ন।” রূপম গম্ভীর গলায় কথাটা বলতেই মহেন্দ্রনাথ ভাঙা স্বরে, “বলুন।” বলে ওঠে।
— “আপনার ছেলের আত্মহত্যা করার বিশেষ কোনো কারণ?”
— “আমি জানি না, কিচ্ছু জানি। কাল রাত পর্যন্তও আমার ছেলে ঠিক ছিল। একরাতের মধ্যে...!” কথাটা শেষ না করেই হাতের তেলোয় আবার মুখ ঢেকে ফেলে মহেন্দ্রনাথ।
রূপম বাড়ির অন্যদের দিকে এগোতে যাবে এমন সময় হঠাৎ রূপমের সেলফোনটা বেজে ওঠে দত্তবাড়ির দোতলার হলঘরে। প্যান্টের ডানপকেটের ভিতরে ডান হাতের তিনটে আঙুল ঢুকিয়ে সেলফোন বের করে নম্বরটা দেখে নিয়েই রূপম ঘরের বাইরে অর্থাৎ দোতলার করিডোরে এসে, সবার নজর এড়িয়ে ফোন রিসিভ করে।
— “হ্যাঁ বলো, স্পটে আমি।”
…
— “আরে সকালে দেরি হয়ে গিয়েছিল বলে ফোন করতে পারিনি।”
…
— “কখন বেরাল?”
…
— “যাওয়া কবে পরের মাসে?”
…
— “ও! ঠিকাছে আমি এদিকটা সামলে ফ্রি হয়ে ফোন করছি।”
…
— “তাই, উড়িবাবা এত রাগ? যাও আগে আমেরিকা থেকে হায়ার ওকালতির ডিগ্রিটা তো আনো তারপর কেস সামলাবে।”
…
— “উফফ দেহি, ভগবান তোমাকে যে কী ধাতু দিয়ে যে বানিয়েছে তা ভগবানও জানে না, রাখছি।”
ফোনে কথা শেষ করে, ফোন কেটে রূপম আবার ঘরে আসে দত্তবাড়ির বাকি পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে।
ঘরের মধ্যে এসে সবার দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে অফিসার পলাশ রায়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে শান্ত গলায় রূপম জিজ্ঞাসা করে, “পলাশ, বাড়ির সবাই এখানে আছে তো?”
পলাশ রূপমের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে “না” করে উত্তরে বলে, “স্যার, সবাই নেই। দত্তবাড়ির বড়বউ শ্রীমতি প্রমীলা দেবী আর ছোটবউ দ্যুতি নিজের নিজের ঘরে। বেশ শক পেয়েছেন।”
অফিসার পলাশ রায়ের কাছ থেকে যাবতীয় বিষয় শুনে নিয়ে রূপম একটা তাচ্ছিল্যরূপক হাসি হেসে বলে ওঠে, “বাহঃ। বাড়ির সবাই ঘুমাচ্ছিল আর বাড়ির মেজছেলে আত্মহত্যা করে বসল। সবার জবানবন্দিতে তো একই কথা। প্রমীলা দেবী আর দ্যুতি দেবী কী বলছেন?”
— “ওঁদের কাছে এখনও যাওয়া হয়নি। তবে...!”
— “তবে?”
— “বাড়ির এক পুরোনো চাকর, নাম শম্ভু তার জবানবন্দিতে হুট করে বলে ফেলে গত দুইদিন আগে দ্যুতি দেবীর সাথে বাড়ির কর্তা মহেন্দ্রবাবুর কথা কাটাকাটি হয়।” কথাটা শুনে রূপম একটা বিরক্তির ভঙ্গিমায় বলে ওঠে, “এ আর নতুন কী? বাড়িতে থাকতে গেলে শ্বশুর-বউমাতে ঝামেলা তো হয়েই থাকে।”
— “কিন্তু এই ঝামেলার মধ্যে দ্যুতি দেবী বলেছিল দরকার পড়লে মহেন্দ্রবাবুকে বিষ খাইয়ে মারবেন।”
— “তাই নাকি? তাহলে তো দ্যুতি দেবীর কাছেই প্রথমে যেতে হয়, আর বডি তুলতে গাড়িকে খবর দিয়েছ?”
— “হ্যাঁ স্যার।”
পলাশের কাছ থেকে ফিরে এসে রূপম মহেন্দ্রনাথের সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “কৌশিকবাবুর বডি তিন-চার দিন পর ফেরত পাবেন।”
— “কেন?” বেশ অবাকের সুরে মহেন্দ্রনাথ জানতে চাইলে রূপম বিনয়ীসুরে বলে, “পোস্টমর্টেম না হওয়া পর্যন্ত তো রাখতেই হবে মহেন্দ্রবাবু।”
কথাটা বলে নিয়ে হলঘরের বাইরে এসে দোতলার বারান্দা পেরিয়ে রূপম আর অফিসার পলাশ এসে দাঁড়ায় দত্তবাড়ির ছোটবউ দ্যুতির ঘরের দরজার সামনে।
— “আসতে পারি?” রূপম দরজার বাইরে থেকে অনুমতি চাইলে ঘরের ভিতর থেকে দৃপ্তকণ্ঠে উত্তর আসে, “আসুন।”
সাদা গোলাপি জালপর্দা সরিয়ে ঘরে প্রবেশ করতেই রূপম ও পলাশ দুইজনই দেখে দ্যুতি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। শোক তো দূরের কথা বিন্দুমাত্র শঙ্কাও দ্যুতির মুখের উপর এসে ধরা দেয়নি।
— “আপনি?” আয়নার থেকেই রূপমের উপর দৃষ্টি ফেলে দ্যুতি প্রশ্ন করে।
রূপম খুব শান্ত গলায় ঠোঁটের কোণায় একটা মৃদুহাসি হেসে বলে, “আমি সাবইন্সপেক্টর রূপম সেন। আপনার ভাসুর সুইসাইড করেছে আর সেই ব্যাপারে আপনার বিন্দুমাত্র হিল-দোল নেই দেখছি।”
ড্রেসিংটেবিলের উপর মোটা দাঁতের চিরুনিটা রেখে রূপমের দিকে ঘুরে দ্যুতি মুহূর্তের মধ্যে বলে ওঠে, “উত্তরটা তো আপনি নিজেই দিয়ে দিলেন। ভাসুর সুইসাইড করেছে। স্বামী নয় যে কেঁদেকেটে বাড়ি মাথায় করব।”
ঘরে আগত দুইজন আশা করতে পারেনি দ্যুতি এইরকম একটা উত্তর দেবে। রূপম ঘরের গোছানো জিনিসপত্র দেখতে দেখতে হঠাৎ প্রশ্ন করে ওঠে, “দেবাশীষবাবুর সাথে কতদিন বিয়ে হয়েছে?”
— “এই মাসের বাইশ এলে দুইমাস পূর্ণ হবে।”
— “লাভ ম্যারেজ?”
— “দ্যাট ইস নট ইয়োর বিজনেস ইন্সপেক্টর।”
— “না, জিজ্ঞাসা করলাম এই কারণে যে দেবাশীষবাবু আর আপনার বয়সের খুব একটা ফারাক লক্ষ করছি না।”
— “কাজের কথায় আসুন।”
— “আপনার ভাসুর কৌশিকবাবুর এইভাবে আত্মহত্যা করার কোনো কারণ আপনার জানা আছে?”
— “না।”
— “বাড়ির সাথে সম্পর্ক কেমন ছিল ওঁর?”
— “ভালোই।”
রূপম মাথা নাড়িয়ে হাসতে হাসতে প্রশ্নগুলো করতে করতে হঠাৎ দ্যুতির চোখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “শুনলাম আপনি নাকি আপনার শ্বশুরকে বিষ খাওয়াতে চান।” কথাটা শুনে দ্যুতি সামান্য কপালে ভাঁজ কেটে আবার স্বাভাবিক হয়ে বলে ওঠে, “আপনাকে কে বলল আর যদি বলেও থাকি তাহলে মনে করিয়ে দিই মারা গেছে কৌশিক দত্ত, মহেন্দ্রনাথ দত্ত নয়। আমি শাড়ি বদলাব, আসুন তাহলে? দরজাটা আপনার পিছনে।”
কটুক্তি না করেও দ্যুতির অপমান রূপম সহ্য করে নিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসতেই পলাশ বলে ওঠে, “কথার ভাঁজ কী! সাংঘাতিক ভদ্রমহিলা।”
পলাশের কথাটা শুনে রূপম হাসতে হাসতে বলে, “পলাশ এ কিছুই নয়। এর থেকেও ধারালো, সুতীক্ষ্ণ কথার ভাঁজে মানুষকে রাখতে পারে এমনও মেয়ে আছে। সময় পেলে একদিন দেখাব। প্রমীলা দেবীর ঘর কোনটা?”
— “সামনে এগিয়ে বাঁদিকে।”
রূপম আর পলাশ পায়ের গতি বাড়িয়ে প্রমীলা দেবীর ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজা খোলা, কোনোরকম পর্দা নেই। খাটের উপর বসে নিঃশব্দে প্রমীলা কেঁদে চলেছে। মুখ তুলে রূপমকে দেখামাত্রই দুইহাতে চোখের জল মুছে, “আসুন” বলে ওঠে প্রমীলা।
প্রমীলার অনুমতি পেয়ে রূপম ও পলাশ ঘরে মধ্যে প্রবেশ করে। দ্যুতির ঘরের মতো শৌখিন দ্রব্যসমূহে সাজানো গোছানো না হলেও ঘরের মধ্যে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ও সৌন্দর্য্যতা বিরাজ করছে। ঘরে ঢুকতেই রূপমের প্রথম যেটা নজরে পড়ল তা হল, ঘরের উত্তর দিকে থাকা একটা বইয়ে ঠাসা বুকসেল্ফ। উপন্যাস, কাব্য, ধর্মীয়গ্রন্থ, ভ্রমণ, প্রবন্ধসারি, গল্প, ছোটগল্প কী নেই তাতে?
— “বুকসেল্ফটা আপনার স্বামীর?” রূপম প্রশ্ন করে।
প্রমীলা সামান্য নাকটা টেনে স্বাভাবিক গলায় বলে ওঠে, “না।”
— “তাহলে?”
— “আমার।”
— “সংসার সামলে বই পড়বার সময় হয়?”
— “ওই, দুপুরে আর রাতে।”
কথা বলতে বলতেই রূপম বুকসেল্ফটার কাছে এগিয়ে গিয়ে গল্পের সারি থেকে একটা গল্পের বই বের করে হাতে নিয়ে বইয়ের শিরোনামটা পড়ে বলে ওঠে, “আপনার সাথে আপনার দেওরের সম্পর্ক কেমন ছিল?”
প্রমীলা বেশ স্বাভাবিকভাবেই উত্তরে জানায়, “নর্মাল। দেওর বউদির যেমনটা হয়।”
— “হাসিঠাট্টা?” মুহূর্তের মধ্যে হাতে নেওয়া বইয়ের পাতা উলটে রূপম প্রমীলাকে প্রশ্ন করতেই প্রমীলা সামান্য ইতস্তত ভাব প্রকাশ করলেও সেটা প্রকাশ না করে, “তেমন ভাবে না” বলে ওঠে।
— “কী বলে ডাকত আপনাকে, নতুন বউঠান?” হঠাৎ এইরকম একটা অদ্ভুত রকমের প্রশ্ন রূপম করতেই প্রমীলা কপালটা কুঁচকে নিয়ে উত্তরে বদলে প্রশ্ন করে ওঠে, “মানে?”
— “মানেটা এই ক্ষেত্রে উলটে গেছে প্রমীলা দেবী। সুইসাইডের পাত্রপাত্রীটা বদলে গেছে। বইগুলো কেনা নাকি উপহার পাওয়া?”
— “বেশিরভাগ কেনা, কিছু উপহার পাওয়া। আপনার কথার মানেটা কিন্তু এখনও পরিষ্কার হল না।”
প্রমীলার কথাটা শুনে রূপম একগাল হেসে হাতের বইটা বন্ধ করে প্রমীলার সামনে ধরতেই প্রমীলা দেখে রূপম যে বইটা নামিয়েছে সেটা হল, ‘কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট’। প্রমীলা মাথা নামিয়ে বেশ গম্ভীরস্বরেই বলে ওঠে, “আপনার কাছ থেকে এইরকম ইঙ্গিতের রসিকতা আশা করি না।”
রূপম যথাস্থানে বইটা রেখে “আমি দুঃখিত” পুরো স্বাভাবিকভাবে বলে ওঠে। “শেষ প্রশ্ন। আপনার দেওয়ের স্ত্রীয়ের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন?”
— “দ্যুতির সাথে?” প্রমীলা প্রশ্ন করতেই রূপম মাথা নাড়িয়ে “না” করে বলে, “না। মেজজায়ের সাথে। মানে কৌশিক বাবুর স্ত্রী দীপিকা দেবী।” নামটা শোনামাত্রই প্রমীলা আবার মাথা নামিয়ে শান্ত গলায় বলে, “আপনি ভুল করেছেন ইন্সপেক্টর। দীপিকা কৌশিকের নয়, আশীষের স্ত্রী।”
— “কী?” পলাশ অবাক হয়ে বেশ উত্তেজিত প্রবাহে বলে ওঠে। রূপমের মুখ গম্ভীর। বোঝা যাচ্ছে, দত্তবাড়িতে প্রবেশ করে এইরকম বিষয়েরও যে সাক্ষী থাকতে পারবে এটা তার ভাবনার অতীত ছিল।
— “ব্যাপারটা কী? তাহলে আপনি কে?” রূপম গম্ভীরস্বরে প্রমীলার কাছে জানতে চাইলে প্রমীলা জানায়, দুবছর আগে আশীষ দীপিকাকে বিয়ে করে কিছু ব্যক্তিগত কারণে, কিন্তু ব্যক্তিগত কারণটা কী সেটা প্রমীলা মুখ ফুটে বলে না। রূপমও আর কোনোরকম কিছু না জিজ্ঞাসা করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
ছাদে গিয়ে কৌশিকের দেহ ভালোরকমভাবে দেখে রূপম বলে, “বুঝলে পলাশ, না জানি কেন আমার মন বার বার অন্যদিকে ইশারা দিচ্ছে।”
— “কোনদিকে স্যার?”
— “সেটাই তো বুঝতে চাইছি। পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা এলে যদি কিছু পরিষ্কার হয়। কোনো সুইসাইড নোট পাওয়া গেল?”
— “না স্যার।”
হসপিটাল থেকে গাড়ি এসে থামতেই ওয়ার্ড বয়রা স্ট্রেচার নিয়ে সোজা উপরে চলে আসে। চারজন ধরাধরি করে কৌশিকের মৃতদেহ স্ট্রেচারে উঠিয়ে খুব সাবধানে নীচে নামতে থাকে। ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে নীচের গ্রাউন্ডপ্লেসে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্সের দিকে, একদৃষ্টে রূপম তাকিয়ে থাকতেই পাশ থেকে অফিসার পলাশ রায় জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “কিছু কি বুঝলেন স্যার?”
রূপম দৃষ্টি স্থির রেখে চোখের পলক না ফেলে উত্তরে বলে, “তিনটে প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে। এক, কৌশিকের মানসিক অবস্থা এমন কী হল যে তাকে সুইসাইড করতে হল? দুই, মহেন্দ্রনাথের মেজছেলের প্রতি এতটা টান কেন? সেটা কি কেবলই কৌশিকের স্বভাবের প্রভাব?”
— “আর তিন নম্বর?” পলাশ প্রশ্নটা করতেই রূপম কিছুটা থেমে নিয়ে বলে, “প্রমীলা। চোখের জল ফেলাটা দেওরের প্রতি কম, প্রণয়ীর মানে প্রেমিকের প্রতি বেশি ইন্ডিকেট করছে পলাশ। বাইরে থেকে দত্তবাড়ি শুদ্ধ মনে হলেও, এক বালতি দুধে চনা পড়ে গেছে। এবার চনা কী বা কেন সেটাই জানার পালা। পি.এম. রিপোর্ট যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আনো।”
দুইদিনের মাথায় কৌশিকের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পড়তেই রূপম চমকে ওঠে। মাটি খুঁড়েছিল কেঁচো পাবার আশায়, কিন্তু মাটি খুঁড়ে গর্তে হাত ঢোকাতেই ছোবল মেরে ওঠে কেউটে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে নিয়ে পুলিশ ভ্যান বের করতে বলে ছয়-সাত জন কনস্টেবল এবং দুই অফিসার পলাশ ও সাহিলকে নিয়ে রূপম উপস্থিত হয় দত্তবাড়িতে।
দত্তবাড়ির একতলার বৈঠকখানায় ঢুকে প্রথমেই রূপম যে কথাটা বলে ওঠে, তাতেই বাড়ির সবাই চমকে উঠে নিজেদের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় আর দণ্ডায়মান শ্রোতারা দুইপা পিছিয়ে যায়। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী কৌশিক দত্ত আত্মহত্যা করেনি বরং খুন করা হয়েছে তাকে। খুনের আগে তাকে ভারী মাত্রার ঘুমের ওষুধ প্রয়োগ করে তারপর তাকে ঝোলানো হয়েছে। খুনের সময় রাত্রি দেড়টা থেকে আড়াইটে। ঘুমের ওষুধ দেহে প্রবেশ করে কাজ করতে শুরু করে প্রয়োগের আধঘণ্টা পর থেকে।
— “কে খুন করেছে আমার ছেলেকে?” মহেন্দ্রনাথ বিস্ফারিত চোখে রূপমকে জিজ্ঞাসা করতেই রূপম উত্তরে বলে, “এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে বাইরের লোকযে খুনটা করেনি সেটা আপনিও বুঝতে পারছেন, আমিও পারছি। এবার প্রশ্ন বাড়ির কে খুনটা করেছে?”
— “কে আবার?” মহেন্দ্রনাথ তীব্রস্বরে চিৎকার করে ওঠে। “দেবুর বউ। হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই দ্যুতিই বিষ দিয়ে খুন করেছে আমার কুশকে।”
— “মুখ সামলে কথা বলুন।” দ্যুতি ক্ষিপ্তস্বরে গলা বাগিয়ে ওঠে। “মেজদার সাথে আমার কোনো শত্রুতা নেই যে মেজদাকে বিষ দিতে যাব। উলটে এই বাড়ির মধ্যে মেজদাই এমন একজন পুরুষমানুষ ছিল যে সবার সাথে সৎ ব্যবহার রেখে মান বাঁচিয়ে চলত।”
— “সৎ যখন তখন খুন হতে হল কেন?” রূপম বলে ওঠে। “তাহলে মানুষের সততাই এখন বিপদের কারণ? নিজেদের মধ্যে বিবাদ করার সময় অনেক পাবেন। আপাতত আমাদের কাজটা করতে দিন। সাহিল...।” রূপম ডানদিকে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা চওড়া একজন অফিসারকে নাম ধরে ডাক দিতেই সেই অফিসার কাছে এগিয়ে আসে। “আগেরদিন স্পট ভালো করে সার্চ করা হলে কিছু পাওয়া গিয়েছিল?”
— “না স্যার।”
— “ওকে।” বলে নিয়ে রূপম কনস্টেবলদের আদেশ দেয় নতুন করে বাড়ির কাজের লোকেদের আবার জবানবন্দি নিতে এবং এবার প্রশ্নগুলো যেন তারা খুন সংক্রান্ত নিয়ে করে, আত্মহত্যা নয়। অন্যদিকে দুই অফিসারকে নিয়ে রূপম সোজা চলে যায় দোতলায়। রূপম দোতলার বারান্দায় গিয়ে পলাশ আর সাহিলকে বলে ওঠে, “ছাদে ভালোরকম ভাবে সার্চ করো আর আমি কৌশিক দত্তের ঘরে যাচ্ছি।” বলে দুইদিকে তিনজন ভাগ হয়ে গেল।
নীচের বৈঠকখানায় দত্তবাড়ির পারিবারিক অশান্তি তুঙ্গে। মহেন্দ্রনাথ একনাগাড়ে দ্যুতির প্রতি বলে চলেছে, “এই মেয়ে আসার পর থেকে আমার বাড়ির সংসারে নজর লেগেছে। বলে না, নীচুজাতের মেয়ে ঘরে আনলে সংসার শেষ হয়, সেটাই হচ্ছে। বারবার বলেছিলাম, গঙ্গারজল ঘোলা ভালো জাতের মেয়ে কালো ভালো আর এই অপদার্থটা রঙ দেখে মজেছিল।”
দেবাশীষ আর দ্যুতিকে একনাগাড়ে সর্বসম্মুখে অপমান করতেই দ্যুতি আরও বীভৎস রূপে ক্ষিপ্ত হয়ে বলে ওঠে, “দেবা তোমার বাবাকে সমঝে কথা বলতে বলো। আমি চুপ থাকার মেয়ে নই। যে মেজদাকে বিষ দিল সে, মেজদাকে বিষ না খাইয়ে আপনাকে দিলে বেশি খুশি হতাম।”
— “তোতা চুপ করো।” দেবাশীষ শান্ত গলায় বলে ওঠে। “বাবা, দয়া করে থামো।”
— “তুই থাম। অপদার্থ একটা।” মহেন্দ্রনাথ বলে ওঠে। “বউয়ের সায়ার তলায় থেকে যেমন কামাক্ষ্যার ভেড়া হয়ে বসে আছিস তেমনই থাক। একটা কথা বলতে আসবি না। এই মেয়ে শেষ করল আমার ছেলেটাকে।”
বৈঠকখানার অশান্তি আর-একটু আঁচ পেলেই রণক্ষেত্র ধারণ করত কিন্তু আশীষ সামান্য ধমকের সুরে বাবা ও ভাইয়ের বউকে থামায়, “এই মুহূর্তে একে অপরের উপর আঙুল তোলা বন্ধ করো।” অন্যদিকে প্রমীলা আর দীপিকা নির্বাক দর্শকের মতো এই দত্তসদস্যদের দাহদৃশ্য দেখে চলেছে। হঠাৎ দোতলার করিডোরে রূপম এসে, “বাড়ির ওই কাজের মেয়েটি, কী যেন নাম, হ্যাঁ, রত্না, উপরে কৌশিক বাবুর ঘরে এসো তো, কিছু জিজ্ঞাসা করার আছে।”
রূপমের আদেশ পাওয়া মাত্রই রত্না সোজা সিঁড়ি পেরিয়ে দোতলায় কৌশিকের ঘরে আসতেই রূপম জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “তোমার মেজদা তো বিয়ে করেননি, তাই না?”
— “হ্যাঁ।”
— “কৌশিকবাবুর ঘর পরিষ্কার কে করত?”
— “মেজদা নিজেই।”
— “কেন?”
— “মেজদার হুকুম ছিল তার ঘর সে ছাড়া আর কেউ পরিষ্কার করবে না।”
— “তুমিই তো প্রথম কৌশিকবাবুর বডি দেখো?”
— “হ্যাঁ।”
— “বাড়িতে বউদের পোশাক কে কাচাকাচি করে?”
— “এই বাড়িতে তিনজন কাজের মেয়ে। শঙ্করীদি, পদ্মা আর আমি। আমরা তিনজনই।”
— “তোমার মেজদার সাথে এই বাড়িতে সব থেকে ভাব কার ছিল মানে কোন বউদির?”
প্রশ্নটা শুনেই রত্না মুহূর্তের মধ্যে মাথা নামাতেই রূপম বলে ওঠে, “লুকাতে যেও না রত্না তাতে বিপদটা বাড়বে বই কমবে না। কার ভাব ভালো ছিল?”
— “বড় বউদির।” খুব শান্ত গলায় রত্না কথাটা বলতেই রূপম একটা হাসি হেসে বলে, “কোন বড় বউদি? এই দত্তবাড়িতে তো দুইজন বড় বউদি।”
— “প্রমীলা বউদি।”
রত্না কথাটা শেষ করতেই ছাদ থেকে দুজন অফিসারই কৌশিকের ঘরে আসতেই রূপম তাদের দেখে, “কিছু পেলে?” জিজ্ঞাসা করে ওঠে।
— “আগেরদিন ছাদের চিলেকোঠায় ঢুকেছিলাম কিন্তু তেমনভাবে দেখিনি।” সাহিল বলে। “আজ ওইখানে ঢুকে একটা তক্তার পিছনে এই আংটিটা পাই।” কথাটা বলেই একটা ছোট সাইজের আংটি সাহিল রূপমের মুখের সামনে ধরে। রূপম সেটা ডানহাতের বুড়ো আঙুল ও তর্জনীতে নিয়ে হেসে বলে, “এইজন্য বলি সাহিল প্রেম করো। এটা আংটি নয়, এটাকে চুটকি বলে। এটা পায়ের আঙুলে মেয়েরা পরে। এটা কার রত্না, তুমি জানো?”
চুটকিটা দেখেই রত্না চোখ বড় বড় করে বলে ওঠে, “এটা তো প্রমীলা বউদির।”
কথাটা শুনে রূপম সামান্য হেসে মাথা নাড়িয়ে বলে, “রত্না তোমার মেজদার আলমারি আমি মাস্টার কী দিয়ে খুলে দুটো জিনিস পেয়েছি। আলমারি খুলে ওগুলো বার করো আর পলাশ, দীপিকা দেবী আর প্রমীলা দেবীকে এই ঘরে ডেকে নিয়ে এসো।” কথাটা শুনে পলাশ বাইরের করিডোরে এসে বলে, “প্রমীলা দেবী আর দীপিকা দেবী আপনারা দুইজনই উপরে আসুন।”
কথামতো প্রমীলা আর দীপিকা ঘরে ঢুকতেই রূপম বলে ওঠে, “পলাশ আর সাহিল তোমরা দুইজন বাইরে যাও। এখানে এমন কিছু কথা উঠবে যা বাড়ির দুইবউ তোমাদের সামনে বলতে নাও পারে বা লজ্জা পেতে পারে।”
রূপমের আদেশ পেয়ে দুই অফিসার বাইরে বেরিয়ে যেতেই রূপম প্রমীলার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “সতীন নিয়ে ঘর করছেন, বরের দুটো বিয়ে, আপনার বরের শ্রীঘরে ঢোকা কেউ আটকাতে পারবে না প্রমীলা দেবী।”
কথাটা শুনেই প্রমীলা সামান্য অহংকারের সাথেই বলে ওঠে, “শ্রীঘরে তখনই ঢুকবে যখন আমি বা দীপিকা যে কেউ আইনের কাছে গিয়ে আশীষের নামে রিপোর্ট করব। নিশ্চিন্তে থাকুন সেটা আমি করব না।”
— “আমিও করব না।” প্রমীলার বাঁপাশে দাঁড়িয়ে দীপিকাও বলে ওঠে।
কথাটা শুনে রূপম একটা গরিমার ভাব এনে বলে ওঠে, “বাহঃ কলিযুগে দাঁড়িয়েও যে কুন্তি মাদ্রীকে দর্শন করতে পারব তা জানা ছিল না। যাই হোক, এটা কার প্রমীলা দেবী?” বলেই চুটকিটা প্রমীলা আর দীপিকার সামনে ধরে রূপম।
— “এটা আপনি কোথায় পেলেন?” প্রমীলা প্রশ্ন করে।
— “প্রশ্ন নয়, উত্তর চাই প্রমীলা দেবী?”
— “আমার!”
— “বেশ। আমি আরও একবার আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি, আপনার সাথে কৌশিক বাবুর সম্পর্ক কেমন ছিল?”
— “দেওর বউদির যেমন হয় তেমনই।”
— “ও! তা দেওরের ঘরের আলমারিতে বউদির গুপ্ত অঙ্গের পোশাক পাওয়াটা আপনি স্বাভাবিক বলে মনে করেন?” কথাটা বলেই রূপম রত্নার দিকে তাকায়। রত্না রূপমের ইঙ্গিত পেয়ে পিছন থেকে হাত সামনে আনতেই দীপিকা আর প্রমীলা দুজনই চমকে ওঠে। দুটো দুই রঙের ইনার রত্নার হাতে।
— “আপনার বাড়ির এই কাজের মেয়েটি বলেছে এগুলো আপনার। এবার বলুন তো প্রমীলা দেবী, কৌশিকবাবুর ঘরে আপনার এগুলো এলো কী করে? নতুন করে পা গজালো বুঝি?”
রূপমের প্রশ্নে কৌশিকের ঘরে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা নেমে আসে। প্রমীলা ঘরের মেঝের দিকে চোখ নামিয়ে দাঁতে সামান্য ঠোঁটটা কেটে ইতস্তত করতেই রূপম রত্নার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “তুমি নীচে যাও দরকার পড়লে আবার ডাকব।”
রত্না কথাটা শোনামাত্রই বাধ্য মেয়ের মতো ঘর দিয়ে বেরোতে গেলে রূপম আবার ডেকে বলে ওঠে, “আর হ্যাঁ এই মুহূর্তে ঘর থেকে যা পাওয়া গেল সেটা যদি বাড়ির বাকিদের কানে ওঠে তাহলে সুন্দর করে সেলে নিয়ে ঢোকাব তোমাকেই। এবার এসো।” রত্না ঘর থেকে বেড়িয়ে যেতেই রূপম ঘরের একটা চেয়ার টেনে নিয়ে তাতে বসে ডান পায়ের উপর বাঁ পাটা তুলে সামান্য হেসে শান্তভাবে বলে ওঠে, “কী হল প্রমীলা দেবী, আমি অপেক্ষা করছি। বলুন কী করে এলো?”
প্রমীলা কিছু বলতে যাবে এমন সময় দীপিকা পাশ থেকে বলে ওঠে, “দেখুন স্যার, এই দত্তবাড়ির এমন কিছু ব্যাপার আছে যেটা বাইরের লোকেদের সামনে বলা যায় না।”
— “দীপিকা দেবী ব্যাপারটা আর বাড়ির নেই, বাইরের হয়ে গেছে।” রূপম বলে। “আপনারা বলতে যত দেরি করবেন ততই বিপদ বাড়বে আর আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে কৌশিকবাবুর সাথে যে প্রমীলা দেবীর একটা সম্পর্ক ছিল তা আপনি জানতেন? কারণ প্রমীলা দেবীর ওই পোশাক দেখামাত্রই আপনাদের দুইজনের মুখে ভয়ের নয়, ধরা পড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত পেয়েছি, যেটা আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।”
— “হ্যাঁ আমি জানতাম।” দীপিকা বলে ওঠে।
— “কী করে? আপনি ধরে ফেলেছিলেন?”
— “হ্যাঁ। কয়েকমাস আগে আমার মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। দরজা খুলে ছাদে যেতেই হঠাৎ দিদির গলার শব্দ আমি শুনতে পাই ছাদের চিলেকোঠা থেকে। আড়াল থেকে দেখি চিলেকোঠার মেঝেতে কৌশিক আর দিদি...!” এইটুকু বলে নিয়ে দীপিকা কিছুক্ষণ থেমে, আবার বলতে শুরু করে, “খুব রেগে গিয়েছিলাম। পরেরদিন দিদির কাছে গিয়ে কথাটা বলতেই দিদি কোনোকিছুই আমার কাছে লুকাইনি। কিন্তু দিদির সাথে কথা বলে বুঝতে পারি দিদি কোনো অন্যায় করেনি। হ্যাঁ সমাজের চোখে বা বাইরে এটা অবৈধ কিন্তু দিদি বা কৌশিকের কাছে সেই সম্পর্ক অবৈধ ছিল না।”
— “দীপিকা দেবী আমি সম্পর্কর বিষয়ে আলোচনা করতে বসিনি। এই বাড়িতে একটা পুরুষমানুষের দুই বউ। প্রথমা স্ত্রী দেওরের সাথে সম্পর্ক রেখেছে। এটা কি যথেষ্ট নয় আশীষবাবুর জন্য, কৌশিক বাবুকে খুন করার?”
— “এটা কী বলছেন আপনি?” প্রমীলা চমকে জিজ্ঞাসা করে ওঠে। “না! না! আশীষ খুন করতে পারে না।”
কথাটা শুনে রূপম ঠোঁটের কোণায় এক হাসি এনে বিদ্রূপের সঙ্গে বলে ওঠে, “কেন প্রমীলা দেবী আশীষবাবুর কি হাত নেই?”
— “আপনার মাঝে মাঝে এই রঙ্গতামাশাগুলো বন্ধ রাখলে ভালো হয় রূপমবাবু।” গম্ভীরস্বরে প্রমীলা বলে ওঠে।
— “হুঁ! আপনারা যা শুরু করেছেন তাতে রঙ্গতামাশা ছাড়া আর কিছুই পাচ্ছি না প্রমীলা দেবী। এটা একবারও মনে হচ্ছে না, যেভাবে দীপিকা দেবী আপনাদের দুইজনকে অন্তরঙ্গের মুহূর্তে দেখেছে সেই একইভাবে আশীষবাবুও দেখতে পারে। প্রথমা হোক কি দ্বিতীয়া, কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে অন্য পুরুষের সাথে মানতে পারে না।”
— “বিয়ে করেছেন?” রূপমের কথা শেষ হতে না হতেই প্রমীলা মুহূর্তের মধ্যে প্রশ্নটা করে বসে। রূপম সামান্য হেসে মাথা নাড়িয়ে “না” করে বুঝিয়ে দেয় শ্রীপ্রজাপতি তার মস্তকে এখনও পর্যন্ত কৃপা বর্ষণ করেননি। প্রমীলা উত্তরটা পেয়েই অহংকারের সাথে বলে ওঠে, “তাহলে আপনি বুঝবেন না। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা কেবলমাত্র বেড রিলেশন নয় রূপমবাবু। প্রতিটা স্ত্রী সবার কাছ থেকে সবরকম অপমান, গঞ্জনা সহ্য করে মুখ বুঝে মেনে নিতে পারে কিন্তু স্বামীর কাছ থেকে নয়। বেশি নয় অল্প একটু সম্মান আশা করে। যেদিন বিয়ে করবেন সেদিন বুঝবেন স্ত্রীরা সব কিছু বুঝেও চুপ করে থাকে। বলুন তো, রঙ্গতামাশা করে হলেও বিয়ের পর বাড়িতে বিয়ে করা বউকে ফেলে পারবেন অন্য মেয়ের সঙ্গে রাতের পর রাত কাটাতে? যদি পারেনও তাহলে এখনই বলে দিচ্ছি আপনার স্ত্রী সেটা জেনে হয় প্রতিবাদ করবে অথবা নীরবে মেনে নেবে, যেটা আমি করেছি। সত্যিটা কী সেটাই জানতে চান তো? পাঁচবছর আগে এই দত্তবাড়িতে বড়বউ হয়ে আসি। এসেই বুঝতে পারি এই বাড়িতে স্ত্রী-ইচ্ছা বলে কিছুই নেই। যাবতীয় অধিকার বাড়ির পুরুষমানুষদের। আশীষও ব্যতিক্রম নয়। দিনের পর দিন আশীষের সাথে ওই ঘরের বিছানায় ধর্ষিতা হতে থাকি। ইচ্ছার বিরুদ্ধে বার বার। স্বামীর দ্বারা স্ত্রী ধর্ষিত হচ্ছে। এটা আপনার কাছে রঙ্গতামাশা তাই না? পরিবারকে সন্তান দিতে পারলাম না দোষ আমার। কী এলো সবার সামনে, আমি বাজা। দোষটা যে আশীষের মধ্যে সেটা কেউ বিশ্বাস করবে না। পুরুষ মানুষও যে বাজা হতে পারে এটা পুরুষসমাজ মানতে পারে না কারণ তাদের অপমান। কিন্তু দিনের পর দিন আমাকে সন্তান না হবার যে অপমানটা করে গেছে সেটা অপমান নয়। কৌশিক বুঝেছিল। অজান্তেই কৌশিকের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। আর কিছু জানতে চান?”
কথাগুলো শুনে রূপম একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলে ওঠে, “শেষপ্রশ্ন দীপিকা দেবী বাদে আর কে জানত কৌশিক বাবু আর আপনার সম্পর্কের কথা?”
প্রমীলা একটুও সময় না নিয়ে উত্তরে বলে, “শঙ্করী। আমি ছাদে গেলে শঙ্করী পাহারা দিত ছাদে কেউ আসছে কিনা। দীপিকা যেদিন দেখতে পায় সেদিন শঙ্করীর শরীর খুব খারাপ ছিল তাই সে ছিল না।”
— “আর দ্যুতি দেবী?”
— “না। দ্যুতি সবেমাত্র এই বাড়িতে এসেছে। বাবার সাথে ওর বনিবনাতে সমস্যা। বাড়ির অন্য পুরুষমানুষদের সাথে নয়। একটু মাথা গরম তাড়াতাড়িতে হয়ে যায় তাও সেটা বাবার ব্যবহারে।”
— “আসুন।”
রূপমের আদেশ পেয়ে দুইবউ ঘর থেকে বেরোতেই ঘরে অফিসার পলাশ আর সাহিল এসে ঢোকে। দুইজনকে সাথে নিয়ে রূপম কৌশিকের ঘর থেকে বেরিয়ে নীচের হল ঘরে আসে। নীচে সকলে থাকলেও কেবলমাত্র দ্যুতি ছিল না। রূপম জিজ্ঞাসা করলে জানতে পারে মহেন্দ্রনাথের সাথে তুমুল ঝগড়া করে দ্যুতি নিজের ঘরে চলে গেছে। রূপম কোনো রকম ভূমিকা না করে সবার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে, “আমি আবারও সবাইকে বলছি, যে যা জানো যতটুকু জানো, এখনও সময় আছে বলে দাও। কারণ কৌশিক বাবুকে খুন বাড়ির লোকেরাই করেছে এতে সন্দেহ নেই। সুতরাং নিজে বাঁচতে চাইলে যা জানো আমাকে জানাও।”
দত্তবাড়ির বৈঠকখানায় কথাটা বলার পরও কেউ কোনোরকম কিছু বলল না। রূপম মহেন্দ্রনাথের কাছে এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, “আপনি সন্দেহ করেন আপনার বাড়ির ছোটবউ দ্যুতি দেবী আপনার মেজছেলেকে খুন করতে পারে।” কথাটা শুনে মহেন্দ্রনাথ সামান্য মাথা নাড়ায়।
— “এইরকম সন্দেহ হবার কারণ কি শুধুই দ্যুতি দেবীর ঔদ্ধত্য? মানে বিষ দেবার কথাটা বলেছিল বলে?”
— “না।” মহেন্দ্রনাথ বলে। “গত চারদিন আগে দ্যুতির সঙ্গে কৌশিকের কিছু একটা বিষয়ে তর্ক চলছিল।”
— “কী বিষয়ে?”
— “আমি বলতে পারব না।”
— “তাহলে আপনি জানলেন কী করে দ্যুতি দেবীর সাথে কৌশিকবাবুর তর্ক চলছিল?”
— “আমার কাজের লোক শম্ভু আমায় জানায়। শম্ভুই ওদের তর্কটা দেখেছিল।” কথাটা শোনামাত্রই রূপম বৈঠকখানায় কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা শম্ভুর দিকে তাকায়। বয়স ষাটের ঘর ছুঁইছুঁই, মাথার চুল কাঁচাপাকা মিশিয়ে পরনে সুতি হাতা কাটা সাদা পাঞ্জাবি আর ধুতি। শম্ভুর কাছে এগিয়ে রূপম গত চারদিন আগের কথা জানতে চাইলে শম্ভু জানায়, ছাদে বড়কত্তা মানে মহেন্দ্রনাথের শুকনো পোশাক আনতে যায় ওই বিকেলের দিকে। কৌশিক বিকেলের মধ্যেই বাড়ি চলে আসে। ছাদে যাওয়া মাত্রই শম্ভু শুনতে পায় দ্যুতি বেশ কড়া গলায় বলছে, “মুখ বুঝে থাকতে সে রাজী নয়। যা করার সেটাই সে করবে। প্রত্যুত্তরে কৌশিকও শান্ত অথচ ধমকের সুরে দ্যুতিকে বলে, দ্যুতির যা করার করে নিতে পারে কিন্তু এই বাড়িতে থাকতে গেলে নিয়মের মধ্যেই থাকতে হবে। দ্যুতি কোনো উত্তর না দিয়ে সোজা ছাদের থেকে নীচে নেমে আসে।
ঘটনাটা শুনে রূপম কপালে সামান্য ভাঁজ কেটে সিঁড়ির দিকে এগোতে থাকে। সিঁড়ি পেরিয়ে দোতলার বারান্দা অতিক্রম করে রূপম এসে দাঁড়ায় দ্যুতির ঘরের সামনে। পর্দার ফাঁক থেকে রূপম লক্ষ করল হাতে একটা কাচের ফুলদানি নিয়ে সেটা এক হাত থেকে অন্যহাতে নিতে নিতে দ্রুতপদে ঘরের মধ্যে পায়চারি করে চলেছে। মুখের উপর ক্রোধদেবী বিরাজময়ী। রূপম সুযোগ বুঝে একটা ইচ্ছাকৃত সৃষ্ট কাশি দিতেই দ্যুতি পায়চারি থামিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে, “এ কী, আপনি এখনও এখানে?” বলে ওঠে।
রূপম পর্দা সরিয়ে ঘরে প্রবেশ করে একটা ছোট্ট হাসি দিয়ে বলে, “কী করব দ্যুতি দেবী? কাজটাই এমন করি যে সহজে যেতে পারি না।”
— “তা আমার ঘরে কী মনে করে?” রূপমের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে দ্যুতি বলে।
— “ওই যা হয়। ক্যুইজ, প্রশ্নোত্তর।”
— “সব প্রশ্নের উত্তর নাও দিতে পারি।”
— “আগে প্রশ্নগুলো করি, তারপর ঠিক করবেন।”
কথাটা বলেই ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে রূপম বলে ওঠে, “শাড়ি বদলাবেন?”
— “মানে?” দ্যুতি রেগে কথাটা বলতেই রূপম সংকোচের সুরে বলে, “না! না! ভুল কিছু ভাববেন না। আগেরদিন কথা বলার সময় বললেন না শাড়ি বদলাবেন তাই জিজ্ঞাসা করছি, বদলাবেন কিনা। তাহলে আমি দরজার বাইরে অপেক্ষা করছি, বদলানো হলে আমি প্রশ্ন করব। কারণ আমি জানি দরজা আমার পিছনে। তাও আবার সুন্দর পর্দা নিয়ে।”
গতবারে দ্যুতির অপমানের শোধ এইভাবে যে রূপম নেবে সেটা দ্যুতি বুঝতে পারেনি। নিজেকে সামলিয়ে গম্ভীর গলায় দ্যুতি বলে, “আপনার কাজ আপনি শুরু করুন।”
রূপম সামান্য হেসে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এগিয়ে দ্যুতির যাবতীয় রূপসজ্জার সরঞ্জাম দেখতে দেখতে বলে, “আপনি এমনি সুন্দরী, আলাদা করে মেকআপ না করলেও চলে।”
— “এটাও কি আপনার কাজের মধ্যে পড়ে?”
— “এই হল মেয়েদের দোষ। প্রশংসা করলেও খারাপ, না করলেও খারাপ।”
— “সেটা ডিপেন্ড করে যে প্রশংসাটা কে করছে।”
— “বুঝলাম। তা মহেন্দ্রবাবুর সাথে এত বিবাদের কারণ কী?”
— “পোষায় না।”
— “মানে?”
— “মানেটা হল, নরকের টিকিট আমি কেটে রেখেছি কিন্তু জায়গা আমি ছাড়ব না। কী করে সবাইকে অপমান করব সেটার চিন্তা। এই চিন্তধারা আমার সাথে খাপ খায় না তাই বনে না।”
— “গত চারদিন আগে কৌশিকবাবুর সাথে ছাদে আপনার কী নিয়ে বচসা চলছিল?”
রূপমের কথাটা শুনে দ্যুতি একটু বিরক্তির সাথেই বলে ওঠে, “বোঝাতে এসেছিল যে মহেন্দ্রনাথের সাথে যেন একটু বুঝে কথা বলি। বাড়ির নিয়মের মধ্যে থাকি এই আর কী।”
— “তা বুঝেছিলেন?”
— “কী? মানে?”
— “না, আপনি তো বললেন কৌশিকবাবু আপনাকে বোঝাতে গিয়েছিল, সেটাই বলছি, আপনি বুঝেছিলেন?”
— “বুঝলে কি আর আপনার সামনেই শ্বশুরঠাকুরের সাথে নীচের বৈঠকখানায় বচন শুরু করি? আর আপনি আমাকে জেরা করে সময় ব্যয় না করে বড়দির কাছে যান। সব উত্তর পেয়ে যাবেন।”
— “মানে? প্রমীলা দেবী?”
— “হ্যাঁ। দত্তবাড়ির সবাই চোখ বুজলে বড়দি তো মেজদার সাথে রাতের পর রাত দেখা করতে যেত।”
দ্যুতির কথাটা শোনামাত্রই রূপম একটু চুপ করে আবার বলে ওঠে, “তার মানে আপনি...!”
— “জানতাম।” রূপমের কথা চেপে দিয়ে দ্যুতি বলে ওঠে। “সব জানতাম কিন্তু কাউকেই জানাইনি এমনকি নিজের স্বামীকেও না। আর আর-একটা কথা রূপম বাবু, মেজদার যদি সত্যিই খুন হয়ে থাকে তাহলে এই বাড়িতে সব থেকে লাভবতী হবে বড়দি।”
— “কী করে?”
— “এর থেকে বেশি আমি আর বলব না। বাকি কাজ আপনার, আসুন।”
আর কোনোরকম কথা না বাড়িয়ে রূপম ঘরের দরজার কাছে আসতেই দ্যুতি মুহূর্তের মধ্যে বলে ওঠে, “আর হ্যাঁ, আমি সুন্দরী বলেই দত্তবাড়ির ছোটবউ আমি।”
কথাটা শুনে রূপম সামান্য ঠোঁট চিপে হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন