কালো দানোর আতঙ্ক

ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়

হেই...হেট্...হেট্...

একপাল ভেড়া নিয়ে এগিয়ে চলেছে টেড আয়ারশায়ার৷ বয়সে কিশোর, ভেড়া চরানোই তার জীবিকা৷ ছন্নছাড়া অনাথ৷ তিনকুলে কেউ নেই৷ সকালে বিকেলে দুবার এই ভেড়ার পাল চরিয়ে, তাদের কচি ঘাস খাইয়ে সে ফেরত নিয়ে আসে খামারে৷ সেখানে এসে জন্তুগুলোর মালিক দেখে নেয়, গুনতিতে সব ঠিক আছে কিনা৷ বিনিময়ে দু-বেলা খাওয়া আর সামান্য কিছু টাকা৷

কিন্তু প্রতিবছরই এই সময়টা বড্ড মন খারাপ হয়ে যায় টেডের৷ শীত ক্রমশ এগিয়ে আসছে৷ প্রকৃতির সর্বত্র একটা রুক্ষ, ন্যাড়ান্যাড়া ভাব৷ কচি ঘাস আর কোথায়? ফলে কিছুটা জান হাতে করেই ওকে যেতে হয় গ্রাম ছেড়ে আরও দূরে, পাহাড়ের কাছে৷ সেখানে নেকড়ের উপদ্রব তো আছেই, তাছাড়া—

ভেড়াগুলো নিয়ে যে ও কোনদিকে এগোচ্ছে, ঘন কুয়াশায় ঠাহর করতে পারছে না৷ ওর সঙ্গী অন্য রাখালদের উদ্দেশ্যে ডাক দেয় ও,—এই জিম, টম, হ্যারি...শুনছিস? কোথায় তোরা?

প্রত্যুত্তর ভেসে আসে অনেকটা নীচে থেকে,—এই যে এখানে আমরা৷ তুই?

ইতিমধ্যেই রোদ্দুরের দাপটে কুয়াশা খানিকটা পাতলা হয়েছে৷ চোখ সরু করে তাকাতেই টেডের অন্তরাত্মা হিম হয়ে আসে, সর্বনাশ! ওরা তো পাহাড়ের নীচে৷ আর সে পাহাড়ের একেবারে চূড়োয়৷ আর এখানেই তো সেই গর্তগুলো...

হেই..হেট্...হেট্...!

হাতের ছিপটি শূন্যে ‘সাঁ-সাঁ’ করতে করতে পাগলের মতো ভেড়াগুলোকে তাড়া লাগায় টেড৷ দরকার নেই কচি ঘাস খাওয়ার৷ গত পরশুই ওর এক সঙ্গীর একটা ভেড়া খেয়েছে এই গর্তগুলো৷ তারপর মনিবের সে কী মার৷

ভেড়াগুলো তড়বড়িয়ে নীচে নামতে থাকে৷ তীক্ষ্ম দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে থাকে টেড, মনে মনে গুনে যাচ্ছে ও ভেড়ার সংখ্যা৷

আরে, আরে—হায় হায়! একটা ভেড়া অদৃশ্য হয়ে গেল!

টেড ছুটে গিয়ে দেখল, উপরে আলগা ঘাসের চাপড়া ভিতরে সেই গর্ত! ঘোর অন্ধকার! ভেড়াটা তার মধ্যেই ডুবে গেছে৷

এখন...এখন কী হবে? ভেড়াটা না নিয়ে ফিরলে ওর পিঠের চামড়া আস্ত থাকবে? আবার অন্যদিকে ওই ভয়াল কালো কালো গর্ত যার মধ্যে নাকি লুকিয়ে থাকে—

টেড উবু হয়ে বসে থাকে গর্তের সামনে৷ ফ্যালফেলে শূন্য দৃষ্টি৷ কী করবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না৷

এই ফাঁকে আমরা বরং এই কাহিনীর পটভূমিকা একটু শুনে নিই৷

এই কাহিনীর সময়কাল আজ থেকে ৬০০ বছর আগে৷ ঠিক ঠিক সন তারিখ হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে৷ শুধু ঘটনাটা আর তার নায়ক টেড আয়ারশায়ারের নামই থেকে গেছে চিরস্মরণীয় হয়ে৷

স্থান—স্কটল্যান্ড৷ বর্তমান ব্রিটিশ যুক্তরাষ্ট্রেরই একটা অঙ্গরাষ্ট্র৷ সেই স্কটল্যান্ডের দক্ষিণে উঁচু মালভূমি ঘেঁষে দু-দুটো পর্বত—নিন্টো আর পেন্টল্যান্ড৷ এই দুই পর্বতশিরার মাঝের উপত্যকায় ছোট্ট এক গ্রাম৷ নাম কাফে৷ উষর, বন্ধুর জমি৷ ফসল প্রায় ফলে না বললেই হয়৷ গ্রামবাসীদের প্রধান জীবিকা মেষপালন৷

ওই ‘কাফে’ গাঁয়ের অনেক কিশোরই রাখালগিরি করে নিজের পেট চালায়৷ টেড যে তাদের মধ্যে একজন সে আমরা আগেই জেনেছি৷ কিন্তু সবারই মানা আছে দূরের ওই পাহাড়ে ওঠার৷ শ্বাপদের কথা ছেড়ে দিলেও ওখানে যে বাস করে ভয়ঙ্কর ‘দানো’!

হ্যাঁ, ‘কালো দানো’৷ বড় বড় যেসব গর্ত ছড়িয়ে আছে পাহাড়ের ওপরে, ওগুলো গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ৷ গর্তের উপর থেকে নীচের দিকে তাকালে দেখা যায় শুধু জমাট অন্ধকার৷ মাঝে মাঝে ওই গর্তগুলোর মাথায় কালো ধোঁয়াশা জমে, আবার অদৃশ্য হয়ে যায়৷

গ্রামবাসীদের স্থির বিশ্বাস, ওই গর্তগুলোর মধ্যে বাস করে ‘কালো দানো’৷ তারই নিঃশ্বাসে ওরকম ধোঁয়া জমে গর্তের মাথায়৷ পশুপাখি মানুষ একবার ওর মধ্যে ঢুকলেই ‘দানো’ খেয়ে নেয় তাকে৷ তারপর সেই প্রাণীটার আত্মাই হয়ে যায় ‘দানো’-র সহচর—খারাপ আত্মা৷

সুতরাং ইতিমধ্যে বেশ কিছু ভেড়া ওই ‘দানো’ খেয়ে ফেললেও কেউই সাহস দেখায়নি ওই গর্তে ঢোকার৷

আজ মেষপালক টেড আয়ারশায়ারের ভেড়াটি হারিয়ে গেছে রহস্যময় ওই কালো গর্তে৷...

টেড কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে থাকে গর্তের বাইরে৷ নাঃ, কেউ তো বেরোল না৷ বারেক তাকাল নীচের দিকে৷ বাকি ভেড়ার পাল তড়বড় করতে করতে নেমে গেছে নিরাপদ উপত্যকায়৷

কী করবে ও? চলে যাবে এই ভেড়াটার মায়া ছেড়ে? তারপর তো সেই অতীতের পুনরাবৃত্তি—বেদম পিটুনি আর মজুরি, দানাপানি বন্ধ!

—হেই টেড, হেই—চলে আয়, চলে আয়...!

হই হই করতে করতে ছুটে আসছে টেডের সঙ্গীসাথী জিম, টম, হ্যারিরা৷ হাঁপাতে হাঁপাতে তারা টেডের কাছে এসেই ওর হাত ধরে টান মারে,—এই টেড, চল্! এখানে—এই দানোর গর্তের সামনে বসে কী করছিস? চল্ চল্!

নাঃ—! টেড মাথা নাড়ে: আমি যাব না৷

মানে??—বন্ধুরা হকচকিয়ে গেল৷

আমি এর ভেতরে ঢুকব৷ দানবের সঙ্গে লড়াই করে ভেড়াটাকে নিয়ে আসব৷—কঠিন কণ্ঠে টেড জবাব দেয়৷

কী! বন্ধুরা স্তম্ভিত৷ নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে বলে, মাথাটা ওর গেছে! ভেড়ার চিন্তায়! ওকে টেনে নিয়ে যেতে হবে৷

বন্ধুরা ঘিরে ধরে৷ সবাই মিলে ওকে জাপটে ধরে,—চল্ টেড চল্! তোর মালিককে আমরা বুঝিয়ে বলব! পাগলামি করিস্ নে!

না—আ—আ!—এবার চিৎকার করে ওঠে টেডঃ আমি দানোর সঙ্গে বোঝাপড়া করে তবেই যাব৷ যা, তোরা চলে যা—!

বলতে বলতে সে এমন জোরে ঝটকা মারে, বন্ধুরা সব ছিটকে যায় চতুর্দিকে৷

জিম বিড়বিড় করে বলে ওঠে,—ওরে, টেডকে নির্ঘাৎ দানোয় পেয়েছে! আর রক্ষে নেই৷

ওদের চোখেমুখে আতঙ্ক উদ্বেগ৷

টেড ততক্ষণে মোটা একটা খুঁটি পুঁতে ফেলেছে গর্তের মুখের কাছে৷ ভেড়া বাঁধার চামড়ার রজ্জু সে বেশ ভালোমতন পাকিয়ে নেয় খুঁটির সঙ্গে৷ দড়িটার অন্যপ্রান্ত ধরে টেড এগিয়ে যায় গর্তের দিকে...

অপেক্ষমান সাথীরা রুদ্ধশ্বাস৷

দড়ি ধরে টেড নামছে...আস্তে আস্তে দড়ি ছাড়ছে...আরও নীচে...হ্যাঁ, এই তো পা ঠেকেছে৷

দড়িটা আঁকড়ে কয়েক মুহূর্ত নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে টেড৷ উঃ, কী নিকষকালো অন্ধকার৷ কোথায়, কোথায়...দানো? কোথায় ওর ভেড়া?

ধীরে ধীরে টেডের চোখ সয়ে যাচ্ছে৷ ওই তো উপরের মুখ দিয়ে ক্ষীণ আলোর রেখা এসে ঢুকেছে৷

আবছা আলোয় টেডের চোখে পড়ল গর্তটা বোঝাই কালো কালো একরকম গুঁড়োয়৷ ওই তো—ওই তো! কোণের দিকে কী একটা নড়ছে না?

হামাগুড়ি দিয়ে সেদিকে এগোতে যেতেই টেডের পায়ে একটা কী ঠেকল৷ একটা কঙ্কাল৷ আগের কোনও হতভাগ্য ভেড়ার স্মৃতি৷

দু-হাত দিয়ে এবার টেড জাপটে ধরে ওর হারানিধিকে৷ ভেড়াটা এখনও বেঁচে আছে৷

টেডের সারা শরীর বেয়ে আনন্দের বাতাস বয়ে যায়, ও পেরেছে! ও পেরেছে ‘দানো’কে জয় করতে৷

ভেড়াটাকে একহাত দিয়ে বুকে জড়িয়ে অন্যহাতে টেড শক্ত করে ধরে চামড়ার রজ্জুটা, এবার ওপর ওঠার পালা৷

অমানুষিক কষ্ট! হাঁচড়ে-পাঁচড়ে গর্তের মুখ দিয়ে মুখ বাড়াল টেড৷ চিৎকার করে উঠল,—জিম, টম, দ্যাখ দ্যাখ আমি পেয়েছি! এই যে, এই যে আমার ভেড়াটা!

ও কী—ও কী! ওরা ছিটকে আরো দূরে সরে যাচ্ছে কেন?

বাঁ হাতে ভেড়াটাকে বাইরে তুলে দিয়ে শরীরে ঝাঁকুনি মেরে বাইরের খোলা বাতাসে এসে দাঁড়াল টেড! বুকভরে শ্বাস নিল৷

কিন্তু এ কী, এ কী! ওরা যে সব দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে! ওদের চোখেমুখে ভয়ানক ভয় আর আতঙ্ক৷ তাহলে—

পরক্ষণেই টেডের চোখ পড়ে নিজের আর ভেড়াটার দিকে৷ এ কী দশা হয়েছে ওদের? চেনাই যাচ্ছে না ভেড়াটাকে৷ কালো কুচকুচে, শুধু পিটপিট করছে চোখদুটো৷

আর নিজের অবস্থা? নিজেকেও চেনা যাচ্ছে না৷ সর্বাঙ্গ ঢেকে গেছে কালো গুঁড়োয়, পোশাক শরীরের খোলা অংশ মিলেমিশে একাকার৷ ঠিক যেন আগুনে পোড়া ভূত৷

তাহলে ওকেই নির্ঘাৎ ‘দানো’ ভেবেছে ওরা! তড়িঘড়ি আবার হেঁকে উঠল টেড,—ওরে শোন্ শোন্! আমি টেড, তোদের টেড, পালাস নে৷

কে শোনে কার কথা! ততক্ষণে ঊর্ধ্বশ্বাসে ‘দানো দানো’ চিৎকার করতে করতে ছুটে পালাচ্ছে টেডের সহকর্মী বন্ধুরা৷

টেড নিশ্চল হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে৷ কিংকর্তব্যবিমূঢ়৷ তারপর ভেড়াটা আর নিজের শরীর থেকে ঝাড়তে শুরু করে কালো গুঁড়োর রাশি৷

যতটা সম্ভব সাফসুতরো হয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক পর টেড রওনা দেয় গাঁয়ের দিকে৷ ইতিমধ্যে বেশ খানিকটা ধাতস্থ হয়েছে টেড৷ গাঁয়ে ফিরে ও সবাইকে বুঝিয়ে দেবে ‘দানো-টানো’ সব মিথ্যে, কল্পনা৷

উপত্যকা বেয়ে গ্রামের কাছাকাছি আসতেই দূর থেকে টেডের হঠাৎ চোখে পড়ে—কী ব্যাপার! রাস্তার মুখেই যে গাঁয়ের ছেলেবুড়ো মেয়েরা সব ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে৷

মনটা আনন্দে নেচে ওঠে টেডের৷ নিশ্চয়ই সবাই ওকে স্বাগত জানাতে এসেছে৷ বীরদর্পে ভারিক্কি চলে মেষশাবককে বুকে জড়িয়ে টেড এগিয়ে যায়৷

কয়েক পা এগোতেই হঠাৎ সম্মিলিত চিৎকার ভেসে এল৷ ঠিক ঢেউয়ের গর্জনের মতো৷ টেডের পা দুটো গেঁথে গেল মাটিতে৷

‘টেড, খবরদার তুমি আর এগিও না! ফিরে যাও৷ তোমায় দানোয় পেয়েছে৷ গাঁয়ে তোমার স্থান নেই৷...ফিরে যাও৷...খবরদার৷...’

না—না—না৷—শুনতে শুনতে টেডের মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে৷ সে আর্তনাদ করে ওঠে: তোমরা ভুল করছ৷ দানো-টানো সব বাজে কথা৷ শুধু কালো গুঁড়ো, আর কিচ্ছু নেই৷ বিশ্বাস করো, তোমাদের পায়ে পড়ি, আমি তোমাদেরই টেড৷ এই যে হারানো ভেড়াটা৷

কয়েক মুহূর্তের জন্যে নীরবতা নেমে আসে৷ টেড লক্ষ্য করে, ওদের গাঁয়ের ‘তুকতাক’ করা ওঝা মোড়লকে কীসব বলছে৷ তারপরই শোনা যায় মোড়লের গলা,—তোমায় বিশ্বাস করি না৷ তুমি চলে যাও৷ ওই ভেড়াটাও নিয়ে যাও৷ এ গাঁয়ে তোমার জায়গা হবে না৷ তুমি যেখানে ছিলে, সেখানেই থাকো৷

টেড কিছু জবাব দেবার আগেই হতভম্ব হয়ে দেখে, ওঝা চকমকি ঠুকে জড়ো করা ঘাসপাতায় আগুন জ্বালল৷ তারপর ঝোলা থেকে কীসব বের করে আগুনে ফেলতে লাগল আর চেঁচিয়ে বলতে লাগল,—হে টেড দানো! তুমি ফিরে যাও তোমার জায়গায়৷ আমরা তোমাকে কোদাল, কুড়ুল, শাবল দিচ্ছি৷ ঘর বানিয়ে তুমি ওখানেই থাকো৷ ভেড়াটা তোমায় উপহার দিলাম৷ রোজ তোমার খাবার দিয়ে আসব৷ চলে যাও টেড দানো৷ আমাদের একান্ত মিনতি৷...

এই কথার ফাঁকে ফাঁকেই ওদিক থেকে কোদাল শাবল শূন্যপথে উড়ে আসতে লাগল৷ টেড এবার নিশ্চিত হল, তার গাঁয়ে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে গেছে৷

ওগুলো কুড়িয়ে নিল টেড৷ একবার মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল৷ দ্রুত দুপুর গড়িয়ে আসছে৷ বিকেল, তারপরেই অন্ধকার রাত্রি৷

টেডের জীবনেও কি অন্ধকার নেমে আসছে? সম্পূর্ণ একা নির্জন পাহাড়ে তাকে বাকি জীবন কাটাতে হবে? ও কী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হবে?

সর্বাঙ্গে অসহ্য ক্লান্তি৷ বিপর্যস্ত টেড আবার পাহাড়ের দিকে রওনা হয়৷

মাসাধিকাল কেটে গেছে৷ পাতা ঝরা, রুক্ষ বনে প্রান্তরে আসন্ন শীতের পদধবনি৷

টেড বেঁচে আছে৷ বেঁচে আছে লড়াই করে৷ হ্যাঁ, সে বাঁচবেই, তাকে বাঁচতেই হবে৷ সে প্রমাণ করে দেবে, সববার ধারণা কত ভুল৷

কাঠকুটো দিয়ে মাথা গোঁজার ছোট্ট একটা ছাউনি বানিয়ে নিয়েছে টেড৷

দুপুরে খাবার নিয়ে আসে ওঝা৷ আর রোজই তার এক কথা—কি রে, কিছু মন্ত্রতন্ত্র পেলি? আমায় দে৷ দানো কী বলেছে, বল্৷

‘দানো’ যে নেই, তা সে বিশ্বাসই করে না৷

এইভাবে চলতে চলতে একদিনে ওঝার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়—তুই ব্যাটা মিথ্যেবাদী৷ ইচ্ছে করে আমায় মন্ত্র দিচ্ছিস না৷ ঠিক আছে, আজ কিছু না বললে, কাল থেকে আর ‘দানা’ পাবি না৷

তবে রে বদমাস বুজরুক!—টেডের সমস্ত সংযম ভেঙে যায়৷ সহসা হিংস্রভাবে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ চেপে ধরে ওঝার টুঁটি: মন্ত্র চাই! এই নে মন্ত্র৷ নে-নে—

বলতে বলতে সে ‘ক্যাত ক্যাত’ করে ওঝাকে লাথি মারতে থাকে,—দিতে হবে না খাবার! শয়তান নরকের কীট! বেরো বেরো!

ওঝা প্রাণভয়ে দৌড়োয়৷

ওঝা নাহয় পালিয়ে গেল, কিন্তু এবার কীভাবে চলবে? নিজেকেই নিজে ধিক্কার দিল টেড, কেন যে এত তাড়াতাড়ি মাথা গরম হয়ে গেল!

ওঝা খাবার নিয়ে আসত আর সেইসঙ্গে নিয়ে আসত গ্রামের জমানো কাঠকুটো৷ এবার তো ওকে ঠান্ডাতেই মরতে হবে৷

সন্ধে ঘনিয়ে এল৷ অবশিষ্ট সামান্য কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বালল টেড৷ এ কী—আজ এত ঠান্ডা লাগছে কেন?

ছাউনির বাইরে মুখ বাড়াতেই শিউরে উঠল টেড৷ টুপটুপ করে বরফ পড়া শুরু হয়েছে৷ এদিকে কাঠপাতা শেষ হয়ে এসেছে৷ নিবু নিবু আগুন৷ উ-হু-হু...কী শীত, অসাড় হয়ে যাচ্ছে হাত পা৷

চকিতে টেডের মনে পড়ল, আচ্ছা, ‘কালো দানো’র গর্তের মধ্যে যখন ও নেমেছিল, বেশ গরম লেগেছিল৷ নামবে একবার?

যেমন ভাবা, তেমনই কাজ৷ সেই চামড়ার রজ্জুটা তেমন ঝোলানো আছে, টেড চটপট ঝুলে পড়ল৷

আরে, ভেতরটা সত্যিই দারুণ গরম টেড গুটিসুঁটি মেরে পড়ে থাকে৷

কিন্তু একটু পরেই নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসে৷ ভেতরে যে একফোঁটা বাতাস নেই৷

নাহ্, ওকে প্রকৃতিই বাঁচতে দেবে না৷ রাগে দুঃখে টেড উঠে দাঁড়ায়৷

দড়ি বেয়ে আবার ছাউনির ভেতরে৷ বাইরে সমানে তুষারপাত চলেছে৷ অবর্ণনীয় হিমঠান্ডা৷ আগুনের দু-একটা ফুলকিই কেবল দেখা যাচ্ছে৷ দুচ্ছাই! এটাকেই আগুনে পোড়ানো যাক৷ তবু তো কিছুক্ষণ চলবে৷ কিন্তু গা থেকে ওটাকে খুলতে যেতে জ্যাকেটটার উপরে সদ্য লেগে থাকা যতরাজ্যের কালো বিশ্রী গুঁড়োগুলো আগুনের উপর পড়তে থাকে৷

পরক্ষণেই চমৎকৃত হয় টেড, তাজ্জব ব্যাপার তো! ওগুলো পড়তেই ফুলকি দিয়ে আগুন জ্বলে উঠল!

তাড়াতাড়ি ট্রাউজার, হাত মুখ ঝাড়তে থাকে টেড৷ আর চোখ বড় বড় করে দেখে, যত ওই কালো গুঁড়ো ঝরে পড়ছে, ততই নিভন্ত আগুন যেন জেগে উঠছে৷ ফুলকি ছড়াচ্ছে, বেশ গরমও হচ্ছে৷

তাহলে? তাহলে ওই দানোর ‘গুঁড়ো’ই তো আগুন জ্বালতে পারে! ওগুলোই এখন ওর বাঁচার রসদ৷

একটুও কালক্ষেপ না করে একটা বড় ঝুড়ি আর কোদাল নিয়ে টেড নেমে পড়ল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার গর্তটায়৷ কোদাল দিয়ে সে সজোরে কোপ মারতে আরম্ভ করল গর্তের গায়ে আর ঝুরঝুর করে কালো কালো চাঙড় আর ধুলো তুলতে লাগল ঝুড়িতে৷

এবার ঝুড়ি বোঝাই করে হাঁপাতে হাঁপাতে আবার আস্তানায়, আগুনের সামনে৷

প্রথম খানিক কালো গুঁড়ো ঢালতেই সতেজে জ্বলে উঠল আগুন৷ কী রং আগুনের! লাল টকটকে৷ তারপর ছোট ছোট টুকরোগুলো ফেলতেই আরিববাস! কী ধোঁয়া! তার সঙ্গে দারুণ গরম!

ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করলেও উষ্ণতায় শরীর জুড়িয়ে গেল টেডের৷ আর ধোঁয়া একটু কমতেই টেডের চক্ষুস্থির৷

কালো কালো টুকরোগুলো এরমধ্যেই আগুনের রং নিয়ে নিয়েছে৷ লাল টকটক করছে৷

আস্তে আস্তে ধোঁয়া একদম কমে গেল৷ কিন্তু আগুনের তেজ কী— গনগন করছে লাল লাল টুকরো! ছাউনির ভেতরটা এখন ফায়ারপ্লেসের চেয়েও অনেক গরম৷

টেড পরম আরামে ঘুমিয়ে পড়ল৷

পরদিন সকালে ওর ঘুম ভাঙল৷ ছাউনির বাইরে কিছু কণ্ঠস্বর,—নির্ঘাৎ মরেই গেছে৷ চল্ দেখে আসি৷ যা বরফ পড়েছে কাল৷

তড়াক করে লাফিয়ে উঠল টেড৷ উঁকি মেরে দেখল, গাঁয়ের মোড়ল আর সঙ্গে ওরই সঙ্গীসাথী, কিশোর যুবকরা৷

মরে গেছি? দাঁড়াও, দেখাচ্ছি তোমাদের৷ চট করে চিমটে দিয়ে একখণ্ড জ্বলন্ত কালো টুকরোকে ধরে ছিটকে বাইরে এল টেড—এই যে আমি৷ আর এই দেখো, দানোর কলজে জ্বালিয়েছি৷ লাল টকটক করছে, জ্বলছে৷

বলতে বলতে সে দৌড়ে গিয়ে মোড়লের হাত ধরে,—এসো, এসো, ভয় কী! দেখো ভেতরটা কেমন গরম! পারবে তোমাদের ওই বুজরুক ওঝা এমন গরম করতে? পারবে এমন ধোঁয়াছাড়া লাল আগুন জ্বালাতে?

মোড়ল শুধু নয়, তার দলবলও বিস্ময়ে হতভম্ব৷

কয়েক মুহূর্ত পরে মোড়ল টেডের সামনে এসে হাতজোড় করে দাঁড়াল,—আমরা অন্যায় করেছি টেড৷ আমাদের ক্ষমা করো৷ আজ থেকে তুমি হবে গাঁয়ের ওঝা৷ আর এ জায়গাটাও তোমাকেই আমরা দিলাম৷ দানোর সবকিছু তোমারই সম্পত্তি৷

টেডের এখন মহা আরামের জীবন৷ কাফে গ্রামের সবাই-ই ওকে পালা করে খাওয়ায়, ওর পোশাক পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করে৷ টেড আয়ারশায়ারকে আর একটুও পরিশ্রম করতে হয় না৷

বিনিময়ে ও সবার ভালোমন্দ দেখে, ওই ‘দানো’-র টুকরো দান করে৷ ‘দানো’র টুকরো এখন গাঁয়ের অত্যন্ত জরুরি বস্তু! যেকোনও কাজের জন্যে আগুন জ্বালাতে হলে, বিশেষ করে যেখানে খুব তাপ দরকার, তখন টুকরো চাই-ই৷ আগুন থাকেও অনেকক্ষণ৷

টেড টুকরোগুলো এনে দেয় পাহাড় থেকে৷

এদিকে বেচারি ওঝার দশা নিতান্তই করুণ৷ রুটি-রুজি বন্ধ, কেউ তাকে পোঁছেও না৷ এমনসময় একদিন গ্লাসগো থেকে ওঝার লেখাপড়া জানা ভাগ্নে মামার গাঁয়ে বেড়াতে এল৷ নিরুপায় ওঝা সব বলল তাকে৷ দুটো ‘কালো টুকরো’ও দিল৷

ভাগ্নে আর দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে রওনা হল গ্লাসগোয়৷

আর ঠিক এর মাসখানেক পরে সরকারি উর্দিপরা একদল লোক রাজার ফরমান নিয়ে এসে হাজির হল অখ্যাত অজ্ঞাত কাফে গাঁয়ে,—রাজার আদেশ৷ আমরা খবর পেয়েছি এই গাঁয়ের পাশেই মূল্যবান ধাতু ‘কয়লা’র খনি আছে৷ খনির মালিককে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে আমরা সম্পত্তিটা রাজার নামে লিখে নেব৷

সম্পত্তি মূল্য ধার্য হল কয়েক লক্ষ পাউন্ড৷ আর তার মালিক হল, নিঃস্ব ভ্যাগাবন্ড টেড আয়ারশায়ার!

অধ্যায় ১ / ১৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%