পঞ্চদশ অধ্যায়

চকিতা চট্টোপাধ্যায়

রঞ্জিতকে বুকে জড়িয়ে ধরে জয়! জয়ের ফ্ল‍্যাটে আজ এসেছে রঞ্জিত। দুই বন্ধুতে প্রাণ খুলে কথা বলছে আজ!

— “তুই আমাকে চিরঋণী করে দিলি রঞ্জিত! তুই না থাকলে এত তাড়াতাড়ি জয়িতা কিছুতেই মুক্তি পেত না ওই স্কাউন্ড্রেলটার হাত থেকে! দীপ ফ্ল‍্যাট ছেড়ে চলে গেছে। যেতে অবশ্য ওকে হতই, কারণ ফ্ল‍্যাটটা তো জয়িতার, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। ফ্ল‍্যাটে এখন একাই আছে জয়িতা।”
— “মগর কব্ তক্ একেলি রহেগি মেরি ভাবী?”
— “ক‍্যাহেনা কেয়া চাহতা হ‍্যায় তু?”
— “জিন্দেগি ভর জিসে চাহাতা রাহা তু, উসকি হাত আব তো থাম লে মেরি ইয়ার!”
— “মগর দেবী—”
— “দেবী কেয়া? দেবী ক্যা তেরি আসলি বিবি হ‍্যায়?”
— “মানে?”

ওরা দু’জন চমকে তাকিয়ে দেখে ওদের অলক্ষ‍্যে কখন ফ্লাটে এসে ঢুকেছে জয়িতা!

— “আইয়ে আপ হিকা ইন্তেজার থা—”

জয়িতা এগিয়ে আসে। ওর মুখে সংশয়!

— “এটা আমি কী শুনলাম জয়? দেবী…”
— “ঠিকই শুনেছিস জয়িতা! দেবযানীর সঙ্গে আমার বিয়ের কোনও লিগাল ডকুমেন্টস নেই। আর সাক্ষী যারা ছিল তারাও সবাই ভাড়া করা কুশীলব মাত্র। ঠিক যেমন ভাবে সিনেমা বা সিরিয়ালে বিয়ে দেখানো হয়।”
— “ও! কিন্তু টুসি…”
— “সে তো আগেই বলেছিলাম তোকে।”
— “বাচ্চিকি ফিকর মাত্ কিজিয়ে ভাবীজি… উসে দুসরা কোই গোদ লেনে কা নওটঙ্কি কার লেগা ফিরসে… হামারি লাইন পে তো অ‍্যায়সা হোতা হি রহতা হ‍্যায়!”

জয়িতা যেন কিছুটা আস্বস্ত হল। জয়ের কাছে এগিয়ে এসে ও বলল, “বিশ্বাস কর জয়! এই ব‍্যাপারটাই আমাকে হন্ট করছিল! আমি শুধু ভাবছিলাম কারও ঘর ভাঙতে চাইছি না তো আমি!”

জয় কিছু বলার আগেই এবার রঞ্জিত এগিয়ে আসে জয়িতার দিকে।

— “আব তো কোই কনফিউশন নেহি রহা ভাবীজি?”

জয়িতা এই কথায় মুখ নিচু করে নেয়। ওর মুখে লজ্জা জড়ানো হাসি।

— “শুন্ জয়! ম‍্যায় কলকাত্তে মে জ‍্যায়দা দিন তো নেহি ঠ‍্যাহর সকতা। কাল সুবহ্ শিউজি কি মন্দির মে তুম দোনো কি শাদি হোগি!”
— “কালই?”

একসঙ্গে বলে ওঠে জয় আর জয়িতা। পরক্ষণেই পরস্পরের দিকে তাকায় ওরা… আস্তে আস্তে দু’জনের মুখেই ফুটে ওঠে হাসি… সব পাওয়ার হাসি!

আজ বহুদিন বাদে জয়িতা প্রাণ খুলে সেজেছে! ওর পরণে আজ লাল টুকটুকে বেনারসি —গায়ে গয়না। না—এ বিয়েতে কোনও আড়ম্ভর নেই। একজনই মাত্র সাক্ষী, রঞ্জিত। আজ মা-বাবার কথা, বাড়ির প্রত‍্যেক আত্মীয়স্বজনের কথা মনে পড়ছে যেন বেশি করে! ওরা কেউ ওর এই দিনটার সাক্ষী হতে পারল না! তবে ও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে ওরা ঠিক দেখতে পাচ্ছে, যেখানেই থাকুক না কেন! মনে মনে ওদের সবার কাছেই আশীর্বাদ চাইল জয়িতা! অর্ধেকের ওপর জীবন তো ওর জ্বলে পুড়েই শেষ হয়ে গেল! বাকিটুকুতে অন্তত যেন শান্তি পায়! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে জয়িতা খেয়াল করে যে সে শিবমন্দিরের সামনে পৌঁছে গেছে। জয় আর রঞ্জিত কি এসে গেছে? এদিক ওদিক তাকাতেই এবার জয়িতা দেখতে পায় জয়কে নিয়ে রঞ্জিত রাস্তার উলটোদিকে গাড়ি থেকে নামল। জয়ের পরনে আজ বরবেশ। ওকে দেখে হঠাৎ যেন সেই বহু বছর আগের জয় বলে মনে হল জয়িতার! রঞ্জিত জয়কে ঝুঁকে পড়ে কিছু বলল। তারপর দ্রুত পায়ে ঢুকে গেল মন্দিরের ভেতর বিয়ের সব আয়োজনের তদারকি করতে। জয় এবার হাসল জয়িতার দিকে চেয়ে। জয়ের দৃষ্টিতে মুগ্ধতা দেখল জয়িতা! আর একটুক্ষণ, তারপরই ওরা বরাবরের মতো এক হয়ে যাবে! পৃথিবীর কোনও শক্তিই আর ওদের আলাদা করতে পারবে না! জয় পকেট থেকে বের করল একটা সিঁদুরের কৌটো। তারপর দূর থেকেই সেটা তুলে ধরে ইশারায় দেখাল জয়িতাকে! লজ্জা পেয়ে জয়িতা চোখ নামিয়ে নিল। ততক্ষণে জয় রাস্তা পেরিয়ে জয়িতার কাছে চলে এসেছে। জয়িতার কানের কাছে মুখ এনে ও বলল, ‘মাই ড্রিমগার্ল’! তারপর ওর হাতটা ধরে ওকে নিয়ে মন্দিরের দিকে যাবার জন্য পা বাড়াল, আর ঠিক সেই মুহূর্তে একটা কালো মার্সিডিস এসে ব্রেক কষল ওদের ঠিক সামনে! ওরা চমকে তাকাল। গাড়ির সামনে আর পেছনের জানালার কাচগুলো নেমে গেল… দুটো জানালার ভেতর থেকেই দুটো গুলি ছুটে এল… একটা লাগল জয়ের বুকে আরেকটা জয়িতার! জয় আছড়ে পড়ল মন্দিরের সামনের রাস্তার ওপর… আর জয়িতা ঘুরে গিয়ে পড়ল জয়ের বুকের ওপর! জয়ের হাত থেকে সিঁদুরের কৌটোটা ছিটকে শূণ্যে উঠে গেল… খুলে গেল কৌটোর ঢাকনাটা… আর তার ভেতর থেকে সিঁদুর এসে পড়ল রাস্তায় জয়ের বুকের ওপর পড়ে থাকা গুলিবিদ্ধ জয়িতার সিঁথিতে… গাড়িটা দ্রুতগতিতে টার্ন নিয়ে চলে যাবার সময় সামনের আর পেছনের জানালায় দেখা গেল স‍্যারজি আর দেবীর দুটো হিংস্র হাস‍্যরত মুখ! রাস্তার ওপর পড়ে থাকল রক্তাক্ত জয়িতা আর নীল বর্মা!

অপারেশন থিয়েটারের বাইরের লাল আলোটা জ্বলছে। ভেতরে যমে-মানুষে টানাটানি চলছে জয়িতা আর নীল বর্মার! প্রত‍্যক্ষদর্শীরা, যারা সেই কাকভোরে ওদের দু’জনকে হসপিটালাইজড করেছিল তারা ভিড় করে আছে ও.টি.-র সামনে। ঘটনার আকস্মিকতা নিয়ে চলছে চাপা গুঞ্জন! সেই ভিড়ের ভেতর আছে একজন বোরখা পরা নারী আর একজন আরবের শেখও। ঘটনাস্থলে দুজন পুলিশ অফিসারকে দেখা যায়। তাদের আসতে দেখে সবাই সচকিত হয়ে পড়ে! ওরা দু’জন হন্তদন্ত হয়ে এসে ও.টি.-র সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে চাপা স্বরে কথা বলে।

— “স‍্যার, শুনলাম ও.টি. টেবিলেই এক্সপায়ার করে গেছে!”
— “হুম। মিডিয়া এক্ষুনি চলে আসবে। তবে বডি দুটো ফরেনসিক ল‍্যাবে পাঠানোর বন্দোবস্ত করো!”

আরবের শেখ আর বোরখা পরিহিতা দু’জনেই অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করল। পুলিশ অফিসারদের কথোপকথন শুনেছে তারা দু’জনেই। হঠাৎ দেখা গেল কয়েকজন মিডিয়ার লোকজনকে ক‍্যামেরা আর বুম হাতে এগিয়ে আসতে।

— “স‍্যার! স‍্যার! কিছু বলুন—এদের পরিচয় কি জানতে পেরেছেন?”
— “শুনলাম নাকি মন্দিরে বিয়ে করতে এসে খুন হয়েছেন এঁরা?”
— “বড়সড় প্রশ্ন উঠছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে! এ বিষয়ে আপনারা কী বলবেন?”

বুম বাড়িয়ে ধরেন ওঁরা। সিনিয়ার পুলিশ অফিসারটি এবার জবাব দেন।

— “যিনি মারা গিয়েছেন তিনি কোনও সাধারণ মানুষ না—একজন সুপারি কিলার! মুম্বাইতে একটা খুনের ঘটনায় ফেঁসে গিয়ে এখানে আত্মগোপন করে ছিল। ঘটনাটা ওদের নিজেদের ভেতরের পুরনো শত্রুতার জের!”
— “দু’জনেই কি মারা গেছেন স‍্যার?”
— “হ‍্যাঁ। বডি এখন ফরেনসিকে যাবে। এর বেশি আর কিছু বলা যাবে না তদন্তের স্বার্থেই।”

পুলিশ অফিসার দু’জন চলে যাবার জন্য পা বাড়ান। পেছন থেকে একজন সাংবাদিক চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “স‍্যার! স‍্যার! সুপারি কিলারটির নামটা কি জানতে পেরেছেন?”

সিনিয়ার পুলিশ অফিসারটি দাঁড়িয়ে পড়েন। তারপর মিডিয়ার প্রশ্নের উত্তরে বলে ওঠেন, “হ‍্যাঁ। নীল বর্মা!” অফিসার দু’জন চলে যান। নারীটি মুখের বোরখা সরায় এবার। সে দেবী। আরবের শেখের কাছে সে সরে আসে। চাপা স্বরে বলে, “মিশন সাকসেসফুল স‍্যারজি!” ঠিক সেই মুহূর্তে ও.টি.-র দরজা খুলে যায়। সেখান থেকে দুজন ওয়ার্ড-বয় দুটো ট্রলি টানতে টানতে বেরিয়ে আসে। মিডিয়া হুমড়ি খেয়ে ক‍্যামেরা সেদিকে তাক করে। দেবী তাকিয়ে দ্যাখে, একটা ট্রলিতে শুয়ে আছে তার সাজানো স্বামী নীল! রক্তাক্ত—নিথর—নিস্পন্দ! কয়েক পা এগিয়ে যায় দেবী। তার চোখে প্রতিহিংসার আগুনের বদলে এই প্রথম বোধহয় জল আসে! সে নীলের মৃতদেহের কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে, “সরি! এছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না নীল! আমি কিছুতেই তোমাকে ওই মেয়েটার হতে দিতে পারতাম না!” পরক্ষণেই দ্বিতীয় ট্রলিটার দিকে চোখ পড়ে দেবীর। ওই তো! সেই মেয়েটা! যার জন্য নীল কোনওদিনও দেবীর হতে পারেনি! মনে মনে খুশি হয়ে উঠল দেবী! পারল না তো মেয়েটা ওর কাছ থেকে নীলকে কেড়ে নিতে! কিন্তু ও কী! মেয়েটার তো ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল বলে শুনেছে ও! তাহলে ওর সিঁথিতে সিঁদুর কী করে এল! তাহলে কি মৃত্যুর আগেই নীল ওই মেয়েটার হয়ে গিয়েছিল! না! আর এক মুহূর্তও এই দৃশ্য সহ‍্য করা সম্ভব হল না দেবীর পক্ষে! সে ছুটে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে গেল! ওর পেছনে বেরিয়ে গেলেন স‍্যারজিও। তাঁর কাজও তো শেষ। কমবক্ত নেমকহারামটাকে তো নিজের হাতে শেষ করে দিতে পেরেছেন!

তারাপীঠে তারামায়ের মন্দিরে আজ একটা বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। আরেক দিকে চলছে সেই উপলক্ষে ভান্ডারার আয়োজন। মায়ের প্রসাদী মালা বদল করল বরকনে। তারপর কনের সিঁথিতে বর পরিয়ে দিল মায়ের প্রসাদী সিঁদুর! মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে বরকর্তা নবদম্পতির সঙ্গে বেরিয়ে এল মন্দির থেকে।

— “নই জিন্দেগি মুবারক হো তুম দোনো কো!”

সহাস‍্যবদনে বলল বরকর্তা রঞ্জিত।

— “আজ সে নই জিন্দেগি কি সুরুয়াদ!”

ওর হাতদুটো জড়িয়ে ধরে নতুন বর জয় চ‍্যাটার্জী বলল, “নতুন জীবনই বটে! আমাদের দু’জনেরই নতুন জীবন তো তোরই দেওয়া! তুই যদি আগে থেকে ওদের প্ল‍্যানটা বুঝতে পেরে পালটা প্ল‍্যান সাজিয়ে আমাদের বুলেট-প্রুফ জ‍্যাকেট পরিয়ে মন্দিরে না পাঠাতিস, তাহলে তো ওদের প্ল‍্যানটাই সাকসেসফুল হত!”

— “ওরা হামার নওটঙ্কিটা বিলকুল বিসওয়াস করে নিয়েছে! ধরতেই পারেনি কি ডক্টর–নার্স-ওয়ার্ড-বয়-পুলিশ অফিসার এমনকি মিডিয়ার লোক সব কুছ নকলি থা! আরে! উনকো তো ম‍্যাহেসুস করানা জরুরি থা না কি নীল বর্মা সচমুচ হি মর গয়া!”

জয়িতা শিউরে ওঠে! জয় হেসে ওর পিঠে হাত রেখে বলে, “তুই কেন আঁতকে উঠছিস? মারা গেছে তো দেবযানীর সাজানো হাজব‍্যান্ড নীল বর্মা! জয়িতা চ‍্যাটার্জীর রিয়েল হাজব‍্যান্ড জয় চ‍্যাটার্জী তো দিব‍্যি বেঁচে আছে! নীল বর্মা না মরলে তো জয় চ‍্যাটার্জী কোনওদিনও বাঁচার সুযোগটাই পেত না, জয়িতা! তাই জয় চ‍্যাটার্জীকে বাঁচতে দেবার জন্য যে নীল বর্মাকে মরতেই হত!”

রঞ্জিত তাড়া দেয়।

— “আরে! ইয়ার! আব তো চলো ভি! জোরসে ভুখ লাগা হ‍্যায়!”

ড্রাইভারের সীটে বসে রঞ্জিত গাড়িতে স্টার্ট দিল। পেছনের সীটে জয়ের বুকের কাছটিতে জয়িতা। জয় শুধু অপলক চোখে চেয়ে থাকে ওর আজীবনের স্বপনচারিণীর সিঁদুর লেপে রাঙা হয়ে যাওয়া মুখখানার দিকে! আজ বোধহয় এই মুহূর্তে তার চেয়ে সুখী সত্যিই আর কেউ নেই এই পৃথিবীতে!


অধ্যায় ১৫ / ১৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%