পঞ্চম অধ্যায়

চকিতা চট্টোপাধ্যায়

বেশ বেলায় ঘুম ভাঙল নীলের। আসলে কোনও কাজ নেই, তাই তাড়াও নেই ওর। গতরাতের কথাটা হঠাৎ মনে পড়ে যেতেই সে তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে তাকাল উলটোদিকের ফ্ল‍্যাটের সেই জানালাটার দিকে। ওই তো! ভাঙা কাচ এখনও আটকে আছে জানালার লোহার ফ্রেমে! সেই গর্ত দিয়ে ঘরের ভেতরটা দেখা যাচ্ছে। তবে খুব একটা স্পষ্ট না। সকালবেলা বলে তো ঘরে আলোও জ্বলছে না। হঠাৎ নীল বর্মার খেয়াল হল এভাবে অন‍্যের বাড়ির দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকাটা বোধহয় তার উচিত হচ্ছে না। কেউ যদি দেখে ফেলে তাহলে ব‍্যাপারটা ঠিক হবে না। অযথা লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তো কোনও লাভ নেই! ওর এখন আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন! কথাটা মনে হতেই সে সতর্কভাবে দ্রুত সরে এল জানালা থেকে। কিন্তু মনের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করছে! বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই অসহায় মহিলাটির হেনস্থার ছবিটা! শয়তান লোকটাকে যদি হাতের কাছে একবার পেত, তাহলে জন্মের মতো টের পাইয়ে দিত অসহায় একজন মহিলার ওপর অত‍্যাচার করার মজাটা!

আজ বহুদিন বাদে সে একা। একা থাকার অভ‍্যাসটা হঠাৎ করেই যেন চলে গিয়েছিল দেবযানী আর টুসির জন্য। নইলে প্রায় সারাটা জীবনই তো শুধু নিজের সঙ্গেই কাটিয়েছে ও। কখনও রাস্তায়, কখনও ফুটপাতে, কখনও রেল স্টেশনে, কখনও হোটেলের বারান্দায়, কখনও থানার লকআপে এমনকি কখনও আবার জেলেও! আজ সেই কলকাতা শহরে সে একা—যে শহরকে একদিন তাকে বাধ‍্য হয়ে ছেড়ে যেতে হয়েছিল! কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে আজ নীলের! আজ সারাটা দিন শুধু তার এই শহরটার সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করছে! নতুন করে চিনে নিতে ইচ্ছে করছে সেই পুরনো রাস্তাঘাট, গলিঘুঁজি, দোকানপাট! হয়তো সবটাই বদলে গেছে আজ এতগুলো বছরে! আবার হয়তো বা বদলায়নি অনেক কিছুই! বুক থেকে একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এল নীলের! নিজেকে যেন সেই ছোটবেলায় বইতে পড়া ‘রিপ ভ‍্যান উইঙ্কিল’ বলে মনে হচ্ছে হঠাৎ! সেই যে লোকটা ঘুমিয়ে পড়েছিল, আর তারপর তার ঘুম ভেঙেছিল কত বছর বাদে! এই শহরের অচেনা ভিড়ে আজ বড় হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে তার! কেউ তো তাকে চিনবে না! সে শুধু হাঁটবে-হাঁটবে-আর হাঁটবে—তারপর যেতে যেতে যেতে, যেতে যেতে যেতে, নদীর বদলে যদি ওর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যায় জয়িতার! ভাবনাটা মনে আসতেই নিজের মনে হেসে ফেলল নীল বর্মা! এসব কী দিবাস্বপ্ন দেখছে ও? জয়িতা কি ওকে দেখা দেবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে নাকি রাস্তার মোড়ে। হয়তো জয়িতা আর এই শহরে থাকেই না! হয়তো চলে গেছে ওরই মতো এই শহর ছেড়ে বরাবরের মতো! অন‍্য কোথাও, অন‍্য কোনওখানে, অন‍্য কারও সঙ্গে! তবে যেখানেই থাকুক, ও যেন খুব ভালো থাকে! খুব আনন্দে থাকে! কোনও দুঃখ যেন কখনও স্পর্শ না করতে পারে ওকে! এটাই তো সারাজীবন চেয়ে এসেছে সে!

স্নান সেরে তৈরি হয়ে ফ্ল‍্যাটে চাবি দিয়ে বেরিয়ে এল নীল। আবাসনটা ভালো করে তো কাল দেখাই হয়নি! আজ একবার ঘুরে দেখতে হবে বেরোনোর আগে। নীচের লনে গিয়ে কাউকে দেখতে পেল না নীল। শুধু দেখল গেটের কাছে একজন সিকিউরিটি বসে আছে। নীল আস্তে আস্তে পায়ে পায়ে আবাসনের ভেতরটা ঘুরে দেখতে শুরু করল। বাচ্চাদের দোলনা, ঢেঁকি, স্লিপ দিয়ে সাজানো একটা ছোট্ট পার্ক আছে এক পাশে। তার ঠিক সামনেই একটা উঁচু পারমানেন্ট মণ্ডপ। বোধহয় এখানে দুর্গাপুজো হয়। ঠাকুর-দেবতার রঙিন টাইলসও বসানো রয়েছে! মণ্ডপের মেঝে আর সিঁড়িতে মার্বেল বসানো। ওপরে সিলিং থেকে ঝুলছে একটা ঝাড়লন্ঠন। আর বাঁধা আছে একটা ঘণ্টা। বেশ সুন্দর ব‍্যবস্থা তো! মণ্ডপের ঠিক পাশেই একটা ঘর। বোধহয় অফিসঘর। দরজায় তালা দেওয়া। ঘরটার ঠিক সামনে দু’জন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। এতক্ষণে কোনও মানুষ দেখতে পেয়ে মনে মনে একটু অ‍্যালার্ট হয়ে গেল নীল বর্মা। এঁদের প্রশ্নের জবাব তৈরি রাখতে হবে তাকে, কারণ, বাঙালিদের আবার কৌতূহলটা বড় বেশি!

লোক দু’জনের একজনের হাতে ধরা একটা বাজারের ব‍্যাগ। তার ভেতর থেকে শাকপাতা উঁকি দিচ্ছে। কী শাক ওটা? লাউশাক না? ওর হঠাৎ মনে পড়ে গেল, ওর মা এই লাউশাক দিয়ে মুগের ডাল কী চমৎকার যে রান্না করত! মা জানত, এটা ওর প্রিয় ডিশ। তাইতো যেদিন এটা রান্না করত, সেদিন বলত, ‘বাপি! আজ তোর পছন্দের লাউশাক দিয়ে মুগের ডাল করেছি!’ আনন্দে সে এক লাফে খেতে বসে যেত তখন!

হঠাৎ কানে ভদ্রলোক দু’জনের কিছু কথাবার্তা আসতেই অতীত থেকে বতর্মানে ফিরে এল নীল বর্মা। থামের পেছন দিকটায় সরে এল ও। ওঁরা ওকে দেখতে পায়নি। কারণটা পেছন ফিরে থাকার জন‍্যও বটে, আবার নিজেদের মধ্যে কথায় ব‍্যস্ত থাকার জন্যও বটে! কথাগুলো কানে যেতেই কানটা আপনা থেকেই খাড়া হয়ে গেল নীলের! ওঁরা যে বিষয়ে কথা বলছেন, সেগুলো শোনার কৌতূহলই ওকে থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়তে বাধ‍্য করল।

— “বিশ্বাসবাবু, কাল কিন্তু মশাই খুব বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে! এভাবে চললে তো—”
— “কী ব‍্যাপারে বলছেন বলুন তো মিত্তিরমশাই?”
— “আরে মশাই! শুধু লাউশাক কিনে চচ্চড়ি খাওয়ার কথা ভাবলেই হবে? আপনি মশাই আমাদের সেক্রেটারি! সব দিকেই তো আপনার নজর থাকতে হবে নাকি বলেন তো মশাই?”
— “আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন, আমি কিন্তু সেটা এখনও বুঝতে পারিনি মিত্তিরমশাই!”
— “ধুর মশাই! কাল অত কাণ্ড হয়ে গেল! আপনি কি তখন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন নাকি?”
— “কাণ্ড? কাল রাতে? আসলে আমাদের বিল্ডিংটা তো একটু পেছনের দিকে… তাই… কিন্তু… কেন? কী হয়েছে কাল?”
— “আরে! আমাদের নীচের তলার কথা বলছি!”
— “ও! তাই বলুন! এ তো নিত‍্যনৈমিত্তিক ব‍্যাপার! এ আর নতুন কথা কী? কাল তার মানে আবার শুরু করেছিল?”
— “শুরু কী বলছেন মশাই? অ‍্যাঁ? সব শেষ হয়ে যাচ্ছিল আর একটু হলেই!”
— “অ‍্যাঁ? সে কী! এসব কী বলছেন?”
— “বলছি কী আর সাধে? আমি তো ভাবলাম না জানি কী একটা অঘটন না ঘটায়!”
— “খুব বাড়াবাড়ি করেছিল বুঝি?”
— “বাড়াবাড়ি বলে বাড়াবাড়ি! একেবারে যাকে বলে বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত! মারধর তো রোজকারের ব‍্যাপার… ও তো ভদ্রমহিলারও যেমন গা সওয়া হয়ে গেছে, তেমনি আমাদেরও! কিন্তু কাল রাতে জানালার কাচটাও তো ভাঙল!”
— “সে কী!”
— “তবে আর বলছি কী? আমরা তো ভাবলাম আজ একটা খুনোখুনিই না হয়ে যায়! তারপর আজ ভোরবেলা আবার সুইপারকে পয়সা দিয়ে সেগুলো ফেলাল!”
— “না না এবারের এ.জি.এম-এ তো এ প্রসঙ্গটা তুলতেই হবে! এ তো একটা নুইসেন্স হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন!”
— “সে মশাই যখন তুলবেন, তুলবেন। এখন তো আপাতত একটু কড়কে দেওয়া দরকার? কী বলেন আপনি? ভদ্রলোকের আবাসনে এমন ছোটলোকের মতো আচার ব‍্যবহার তো আর বরদাস্ত করা যায় না!”
— “আমি শুধু এটাই বুঝতে পারি না মিত্তিরমশাই, ওদের সমস‍্যাটা ঠিক কীসের? দু’জনেই শিক্ষিত। শুনেছি তো বিয়েও হয়েছে অনেক দিন। বয়সও তো দু’জনেরই নেহাত কম হয়নি, চল্লিশ ছোঁবে আর ক’বছর পর! তাহলে এখনও এসব কী ছেলেমানুষী? অ‍্যাঁ?”
— “একই বিল্ডিংয়ের ওপর-নীচ তো আমাদের। তাই শুনতে না চাইলেও কিছু কিছু কথা তো কানে এসেই যায়… দু’জনেই তো শুনি নানান রকমের অভিযোগের আঙুল তোলে পরস্পরের দিকে!”

কথা বলতে বলতে কয়েক পা এগিয়ে আসতেই ওরা এবার হঠাৎ দেখতে পেল নীলকে। নীল অবশ‍্য আগেই ওদের মুভমেন্ট লক্ষ করেই কিছুটা সরে গিয়ে যেন খুব মনোযোগ দিয়ে মণ্ডপটা পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে দিয়েছিল,যাতে ওদের মনে কোনও সন্দেহ না জাগে। ওঁদের কথাবার্তা হঠাৎ থমকে থেমে যাওয়া কানে আসতেই ও বুঝতে পারল যে ওকে ওঁরা এতক্ষণে দেখতে পেয়েছে। আড়চোখে নীল দেখল যে মিত্তিরমশাই ওরফে মিঃ মিত্র আবাসনের সেক্রেটারি মিঃ বিশ্বাসকে ইশারা করে দেখালেন ওকে। উত্তরে সেক্রেটারি একটু গলা নামিয়ে বললেন, “ভাড়াটে। আপনাদের উলটোদিকের পাঁচ নম্বর বিল্ডিংয়ের চার নম্বর ফ্ল‍্যাটে এসেছেন।”

কিন্তু এইটুকুতে কী আর মিত্তিরমশাইয়ের কৌতূহল মেটে? উনি জিজ্ঞেস করলেন, “একা?” উত্তরে বিশ্বাসবাবু বললেন, “হ‍্যাঁ। তবে ফ‍্যামিলি থাকে আসামের বরপেটায়।”

নাঃ! এতেও পুরোপুরি কৌতূহলের ক্ষিদে মিটল না মিঃ মিত্রের। তাই জানতে চাইলেন, “নাম?”

“নীল বর্মা।”

আর ওখানে দাঁড়াল না নীল। সে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল আবাসনের মেনগেটের দিকে। বলা তো যায় না… এঁদের যেমন কৌতূহলের ফর্ম দেখল ও, তাতে হয়তো এক্ষুনি নীলের ঠিকুজি-কুষ্ঠি বের করার চেষ্টা করবে!

সিকিউরিটির পাশ কাটিয়ে সে পায়ে পায়ে বেরিয়ে এল আবাসন থেকে।

নীল বর্মা খেয়াল করল না, তার পেছনে হাঁটা দিল আরও একজন। নীল বর্মার প্রতিটি পদক্ষেপের ব্রিফিং যাকে পৌঁছে দিতে হবে সেই সুদূর মুম্বাইতে! যেখানে একজন অদম্য টেনশন নিয়ে অপেক্ষা করছে নীলের গতিবিধির খবর পাওয়ার জন্য!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%