চকিতা চট্টোপাধ্যায়

টিচার্স কোয়ার্টারের সিঁড়ির আলোটা সেদিন জ্বলছিল না। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠে কোয়ার্টারের দরজায় হাত ছোঁয়াতেই ও টের পেয়েছিল যে সেটা খোলা! ভেতরে ঢুকে কাউকে দেখতে পায়নি ও। কী হল? দীপ, ফ্লেকা, মাইকেল, কেভেনরা কি কেউই আসেনি এখনও? মুখ ফেরাতে হঠাৎ চোখ পড়েছিল বাইরের ঘরের সোফার ওপর দুটো ব্যাগ রাখা আছে। আরে! ও দুটো তো দীপ আর ফ্লেকার ব্যাগ! কিন্তু কোথায় ওরা? জয় যে আজ ফ্লেকার সঙ্গে আলাদা কথা বলতে চায় সেটা কি দীপ জানিয়েছে ফ্লেকাকে? ওর আজ ফ্লেকার সঙ্গে কথা বলে সবটা বোঝানো খুব জরুরি। কোনও ভুল বোঝাবুঝি যাতে আর না থাকে ওদের মধ্যে ভবিষ্যতে! কিন্তু গেল কোথায় ওরা ব্যাগ রেখে? স্যার কি নেই নাকি? হঠাৎ কানে একটা শব্দ ভেসে এল—যে শব্দটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল এখন এখানে শোনাটা! শব্দটা, নারীকণ্ঠের শীৎকারের…! সেই শব্দে শরীরের প্রত্যেকটা রোমকূপ জেগে উঠল জয়ের! নারীকণ্ঠটা চিনতে তার ভুল হল না! কিন্তু… এ কী করে সম্ভব! যন্ত্রচালিতের মতো তার পা এগিয়ে গেল ডাইনিং স্পেস ছাড়িয়ে একদম কোণে মিঃ ও’ব্রায়েনের বেডরুমের দিকে… আরও স্পষ্ট হল নারীকণ্ঠটি! বেডরুমের দরজাটা ভেজানো… কাঁপা হাতে দরজাটা স্পর্শ করল জয়… একটা ক্যাঁচ শব্দ করে ফাঁক হয়ে গেল দরজাটা… কিন্তু... এ কী দেখছে ও! নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না! দরজার দিকে পেছন করা ফ্লেকার নগ্ন পীঠ… আর ফ্লেকার সামনে দরজার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে দীপ আর মিঃ ও’ব্রায়েন… ওদের কারও শরীরেই একটা সুতোও নেই! হতভম্ব জয়ের গলা দিয়ে একটা অস্ফুট আওয়াজ বেরিয়ে এল! সেই শব্দে চমকে তাকাল ওরা দরজার দিকে! ফ্লেকা চকিতে বিছানার ওপর ছেড়ে রাখা ওর স্কার্টটা টেনে নিল নিজের শরীরের ওপর। জয়ের পা যেন মাটিতে কেউ গেঁথে দিয়েছে… সে এক পাও নড়তে পারে না! মিঃ ও’ব্রায়েন আর দীপ দু’জনেই টাওয়েল দিয়ে শরীরের নিম্নাংশ ঢাকতে ঢাকতে এগিয়ে এল ওর দিকে। এতক্ষণে যেন হুঁশ ফেরে জয়ের। সে চিৎকার করে ওঠে, ‘What are You people doing here!’ মিঃ ও’ব্রায়েন জয়ের শার্টের কলার ধরে ঝাঁকানি দিতে দিতে বলে ওঠেন, ‘That’s none of your business! You Bastard!’ জয় দীপের দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘দীপ! তুই! ছিঃ! তোকে আমার বন্ধু ভাবতে ঘেন্না করছে! And You! Miss Fleka Welcome! You are such a cheap type of a girl! I couldn’t ever even dream of!’ এই কথায় ফ্লেকা আহত ফণিণীর মতো জ্বলন্ত চোখে তাকাল জয়ের দিকে!
আর একমুহূর্তও ওখানে দাঁড়ায়নি জয়। যেতে যেতে শুধু শুনতে পেয়েছিল পেছন থেকে মিঃ ও’ব্রায়েনের হিসহিসিয়ে বলা একটা কথা, ‘You have to pay for it! Joy Chatterjee! You must get a T.C.! And I am ensuring you to get that!
ঝনঝন শব্দে কাচ ভেঙে পড়ল! সেই শব্দে চমকে উঠল নীল বর্মা! এক ঝটকায় অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে এল সে! তার নেশাগ্রস্ত চোখ ঠাওর করার চেষ্টা করল শব্দের উৎসটা। আরে! ওই তো! তার উলটোদিকের বিল্ডিংটার দোতলার ওই জানালাটার কাচটাই তো ভেঙেছে বলে মনে হচ্ছে! আলো জ্বলছে ঘরটায়। ভাঙা কাচের ভেতর দিয়ে ফ্ল্যাটের ভেতরটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নীল বর্মার সতর্ক মন মুহূর্তে সজাগ হয়ে গেছে! ডানহাতটা চলে গেছে প্যান্টের পেছনে গুঁজে রাখা রিভলবারের ট্রিগারে! পুলিশ কি তাহলে ওর অস্তিত্ব জানতে পেরে গেছে! তাই ভয় দেখাতে চাইছে ওকে? কথাটা মনে হওয়া মাত্র সে পৌঁছে গেছে এক লাফে ঘরের সুইচবোর্ডের কাছে। নিভিয়ে দিয়েছে ঘরের আলোটা! তারপর সতর্ক ভাবে রিভলবারটা বাগিয়ে ধরে তীক্ষ্ণ চোখে সে তাকাল সেই কাচভাঙা জানালাটার দিকে! কিন্তু এ কী দেখছে ও! একটা লোক একজন মহিলাকে চুলের মুঠি ধরে বেধড়ক ভাবে মারছে যে! দূর থেকে কারও মুখই যদিও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না ও, শুধু এটুকু দেখতে পেল যে মহিলার কপাল কেটে রক্ত পড়ছে! তাকে ছেড়ে দেবার জন্য কাকুতি মিনতি করছে মহিলাটি, কিন্তু লোকটি তা সত্ত্বেও নিষ্ঠুর ভাবে মেরে চলেছে তাকে! নেশা ছুটে গিয়ে রক্ত গরম হয়ে গেল নীলের! লোকটাকে এক্ষুনি আটকাতে হবে… নইলে তো ও মেরেই ফেলবে মহিলাটিকে! যাবার জন্য পা বাড়ানো মাত্রই নীল বর্মার কানে হঠাৎ বেজে উঠল স্যারজির গলাটা, ‘কিসিকো ভি তেরে বারে মে শক্ নেহি হোনা চাহিয়ে!’
পা আটকে গেল নীলের। না না! এটা কি করতে যাচ্ছিল সে? সে তো এখানে আত্মগোপন করে আছে! এখন তো অত্যন্ত সতর্কভাবে থাকতে হবে তাকে! হঠাৎ কোনও ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লে যদি কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে আসে! তাহলে যে শুধু সেই বিপদে পড়বে তা নয়, বিপদে পড়বে তার দলও! এটা তো সে করতে পারে না! ইচ্ছেয় হোক, অনিচ্ছেয় হোক, দলই তো তাকে আজ অবধি বাঁচিয়ে রেখেছে! তাছাড়া এটা তো ওই লোকটি আর মহিলাটির পারসোনাল ম্যাটার। সেখানে সে হঠাৎ নাক গলাবেই বা কোন অধিকারে? কিন্তু এইরকম একটা আপাত ভদ্রলোকের আবাসনে এইরকম ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের মতো ক্রাইম সবার চোখের সামনেই ঘটছে! অথচ কেউ কোনও প্রতিবাদ পযর্ন্ত করছে না! যত দোষ কি শুধু তাদের আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাসিন্দাদেরই? কিন্তু—নীল আবার কৌতূহলী চোখে তাকাল সেই জানালাটার দিকে। ঘরের আলোটা নিভে গেল এবার। মনে মনে একটু যেন স্বস্তি পেল ও। যাক, তাহলে ঝামেলা মিটে গেছে। দেওয়াল ঘড়ির দিকে চোখ পড়তে দেখল রাত দুটো! নেশাটা একদম কেটে গেছে। এখনও তো অনেকটা রাত বাকি! বোতল থেকে নিঃশেষে সবটুকু স্কচ গলায় ঢেলে দিল নীল। নাঃ! তবু তো ঘুম আসতে চায় না ওর! রোজ এত নেশা করে সে শুধু একটু ঘুমের আশায়! কিন্তু না—জয়িতা যে চিরকালের মতো ঘুমটা কেড়ে নিয়ে গেছে তার চোখ থেকে! তাই তো তার রাতগুলো এত দীর্ঘ মনে হয়!
পরদিন স্কুলে আসামাত্রই লক্ষ করেছিল যে বন্ধুরা ওর দিকে কেমন যেন একটা চোরা চাহনি দিচ্ছে! কিন্তু সে সব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় তখন জয়ের নেই। জয়িতা কোথায়? ওর জ্বর কি কমেছে? নাকি কমেনি? আজও কি স্কুলে আসবে না ও! জয়িতাকে যে আজ খুব দরকার! সমস্ত ঘটনাটা সবটা খুলে বলতে হবে ওকে। ফ্লেকা যে কেমন মেয়ে তা জানলে ও নিশ্চয়ই আর ভুল বুঝবে না জয়কে! চোখ ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ এক জায়গায় এসে আটকে গেল জয়ের। ওই তো জয়িতা! কিন্তু মাত্র একদিনে একি চেহারা হয়েছে ওর! এতটা কাহিল লাগছে কেন ওকে? একদিনের জ্বর ওকে এতটা বিধ্বস্ত করে দিয়েছে! জয়িতার মুখটা থমথম করছে, চোখগুলো কেমন ফোলা ফোলা! এ চোখ তো জয়ের চেনা! একবার কোনও কারণে প্রতিবছরের বাঁধা ভার্নাকুলার প্রাইজটা জয়িতার মিস হয়েছিল। সেবার কেঁদে কেঁদে চোখগুলো তো ঠিক এইভাবেই ফুলিয়ে ফেলেছিল ও! তার মানে… জয়িতা কান্নাকাটি করেছে! কিন্তু কেন? বুকটা কেমন কেঁপে ওঠে জয়ের, অজানা আশঙ্কায়!
অ্যাসেম্বলি লাইনে সেদিন দীপ বা ফ্লেকা কাউকেই দেখতে পেল না জয়। ওরা তার মানে আসেনি আজ। কোন লজ্জায়ই বা আসবে? আজ সে ইচ্ছে করলেই সব্বাইকে বলে দিতে পারে গতকালের জঘন্য ঘটনাটার কথা! কিন্তু বলতে চায় না জয়। আফটার অল ওরা তো বন্ধু! এতটা বেইমানি করবে কি করে ওদের সঙ্গে?
ক্লাসে ঢুকে দেখল সবাই কেমন গলা নিচু করে জটলা করছে। ওকে দেখেও কেউ তো আজ ডাকল না! কিন্তু কেন? নিজের সীটে এসে বসে, ব্যাগটা রাখার জন্য ডেস্কের ডালাটা খুলতেই দেখতে পেল একটা ভাঁজ করা কাগজ! ধক করে উঠল জয়ের বুকটা! জয়িতার উত্তর! গতকালের ঘটনার আকস্মিকতায় এই ইম্পর্টেন্ট কথাটাই মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল ওর! সে তাড়াতাড়ি চিঠিটা পকেটে পুরে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে এল। এখনও ওদের ক্লাসটিচার মিসেস তুঙ্গা ঢোকেননি ক্লাসে।
লম্বা টানা করিডোরের একদম শেষ প্রান্তে গিয়ে চিঠিটা পকেট থেকে বার করল জয়। তারপর দুরু দুরু বুকে খুলে ফেলল ওটা। জয়িতার হাতের লেখা।
জয়,
আমি কোনওদিনও দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি যে তুই এতখানি নীচে নেমে যাবি! তুই কোনও দিন যে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলি সেটা ভাবলেই আমার নিজের ওপর ঘেন্না হচ্ছে! আজকের পর থেকে I will only hate You forever, I swear! তোকে যে আমি কোনও দিনও চিনতাম এবার থেকে সেটাই ভুলে যেতে শুধু চেষ্টা করব!
জয়িতা
চিঠির হরফগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে জয়ের চোখের সামনে! চোখ ছাপিয়ে পড়া জলের ধারা অস্পষ্ট করে দিচ্ছে চিঠির লেখাগুলোকে! গলার কাছে পাক দিয়ে উঠছে একটা যন্ত্রণা! কিন্তু... কিন্তু কী করেছে সে? যে জয়িতা তাকে সারাজীবন শুধু ঘৃণাই করবে? কোন নীচে নেমে যাওয়ার কথা বলছে জয়িতা? ওকে জানতেই হবে! এভাবে জয়িতা ওকে ভুল বুঝতে পারে না বিনা কোনও কারণে!
‘Joy Chatterjee! Principal Sir is calling You! Come fast!’
কথাটা কানে যেতেই চমকে তাকাল জয়! দেখল ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে বেয়ারা জাহাঙ্গীর। হঠাৎ মিঃ ফ্লিন কেন ডেকে পাঠিয়েছেন তাকে? চিঠিটা বুকপকেটে রেখে পা বাড়াল ও জাহাঙ্গীরের পেছন পেছন।
মিঃ ফ্লিনের চেম্বারে ঢুকেই থমকে গেল জয় ওখানে দীপ, ফ্লেকা আর মিঃ ও’ব্রায়েনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে! ও ঢোকা মাত্র ওর দিকে তাকিয়ে আচমকা চিৎকার করে কেঁদে উঠল ফ্লেকা! তারপর কাঁদতে কাঁদতেই ওর দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘This! This is the one who had tried to molest me Sir!’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ল ফ্লেকা!
‘What! No! It’s a total lie!’
‘Don’t pretend to be an innocent! Joy Chatterjee! We two are the eyewitnesses of your nasty sin! Don’t forget that You Bastard!’ হিসহিস করে বলে উঠলেন মিঃ ও’ব্রায়েন!
‘Sir! Sir believe me Sir! These are the One’s who were playing that dirty game Sir! And it was me who caught three of them redhandedly yesterday evening!’ বিপন্নভাবে বলে জয়!
মিঃ ও’ব্রায়েন প্রিন্সিপালের উদ্দেশ্যে বলে ওঠেন, ‘ Look at the Chap’s audacity Sir! Trying to blame his teacher! In front of You!’
‘I was the victim Sir! So, my statement should have some priority Sir! I believe!’ জ্বলন্ত চোখে জয়ের দিকে একটা দৃষ্টি দিয়ে মিঃ ফ্লিনকে বলল ফ্লেকা।
‘Yes! My child! Don’t worry! You will get a proper justice!’
সেদিন মিঃ ফ্লিনের সামনে খুব সুচারু দক্ষতায় একটা নিটোল গল্প বলেছিল ওরা তিনজন! বলেছিল—সেদিন দীপ দেরিতে টিউশন ক্লাসে এসে পৌঁছেছিল। কারণ, ফ্লেকার সঙ্গে পারসোনাল কিছু কথা বলবে বলেছিল ওকে জয়। জয় আর ফ্লেকার মধ্যে যেহেতু একটা রিলেশন চলছিল কিছুদিন ধরে, তাই দীপ অবিশ্বাস করেনি ওকে। তাছাড়া মিঃ ও’ব্রায়েনেরও সেদিন কাজ থাকায় উনি দেরিতে আসবেন বলেছিলেন টিউশন ক্লাসে। দীপ সেইমতো কিছুটা দেরিতে স্যারের কোয়ার্টারে যখন পৌঁছেছিল, তখন বাইরের ঘরে ওদের কাউকেই দেখতে পায়নি। তারপর হঠাৎই শুনতে পায় বেডরুম থেকে ভেসে আসা ফ্লেকার চিৎকার! ছুটে মিঃ ও’ব্রায়েনের বেডরুমে দরজা ঠেলে দেখে জয় চ্যাটার্জী ফ্লেকাকে মলেস্ট করার চেষ্টা করছে! ঠিক সেই সময় বাইরে থেকে সেখানে এসে উপস্থিত হন মিঃ ও’ব্রায়েনও! দু’জনে মিলে জয়ের হাত থেকে উদ্ধার করে ফ্লেকাকে! ফ্লেকা তার বয়ানে বলে যে জয় চ্যাটার্জী তাকে সেদিন বলেছিল যে সে তার সঙ্গে শুধুমাত্র ফিজিক্যাল রিলেশন রাখতে আগ্রহী। ফ্লেকা সেই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় জয় ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল! দীপ বলেছিল, ‘ফ্লেকার সঙ্গে ফ্লার্ট করে শেষ পযর্ন্ত ও অন্য একজনকে প্রোপোজ করেছিল। আমি ওর এই অন্যায়টা মেনে নিতে পারিনি তাই বলেছিলাম ফ্লেকা খুব আপসেট এটা শুনে, তোর উচিত ওর সঙ্গে একবার কথা বলার। কিন্তু ও যে এই ভাবে সেই সুযোগ নেবে তা আমি বুঝতে পারিনি!’
এই মিথ্যে বানানো গল্পটা শুনতে শুনতে জয় যখন শুধু একটা কথাই চিৎকার করে বলে উঠেছিল সেইমুহুর্তে, ‘Lie! Lie! It’s a total lie! A very big conspiracy against me! Sir!’, ঠিক তখনই সপাটে একটা থাপ্পড় এসে পড়েছিল জয়ের গালে!
চমকে তাকিয়ে জয় দেখেছিল ওর বাবা অজিত চ্যাটার্জীকে! মিঃ ফ্লিনের জরুরি তলব পেয়ে সব কাজ ফেলে ছুটে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি একমাত্র সন্তানের স্কুলে! জয় মরিয়া হয়ে বাবার পায়ের ওপর পড়ে বলেছিল, ‘না বাবা—না! সম্পূর্ণ মিথ্যে বলছে ওরা! আসল সত্যি এটা না! তুমি অন্তত আমায় বিশ্বাস করো!’
‘কী বললে? বিশ্বাস? তোমাকে? আমি জানতাম এমনটাই কিছু হবে! অধঃপতন তো তোমার আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল যেদিন তোমার ঘর থেকে পাওয়া গিয়েছিল নোংরা ছবি আর নেশার বস্তুগুলো! সেদিনই আমি বুঝেছিলাম—নষ্ট হয়ে গেছ তুমি! তোমাকে নিজের ছেলে ভাবতে আমার আজ লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে! ছিঃ!’
মিঃ ও’ব্রায়েন তাঁর কথা রেখেছিলেন। তাঁর চাক্ষুষ সাক্ষ্যর ভিত্তিতে প্রিন্সিপাল মিঃ ফ্লিন সেদিন জয়ের টি.সি. ধরিয়ে দিয়েছিলেন জয়ের বাবা অজিত চ্যাটার্জীর হাতে!
সোফার ওপর মাথা রেখে স্কচের নেশায় চুর নীল বর্মা একলা নির্জন সেই আবাসনের ফ্ল্যাটে হাহাকার করে কেঁদে উঠল! তারপর জড়ানো গলায় নিজের মনেই বলে চলল, ‘সেদিন সবাই ভুল বুঝেছিল আমাকে! বাবা-মা—ক্লাসের বন্ধুরা—স্কুলের সব টিচাররা—সবাই—তবু হয়তো আমি লড়ে যেতাম—কিন্তু তুইও যে আমায় ভুল বুঝে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলি জয়িতা! সেই যে কালো ছাপ পড়ে গেল জীবনে—তারপর থেকে শুধু নামা—নামা—আর নামা—অন্ধকার জগতের একটা একটা করে সিঁড়ির ধাপ আমি নেমে গেলাম কেমন অনায়াসে! এতটাই নীচে নামলাম যে আর আলোয় ফেরার পথটাই রইল না! সেই কাঁচা বয়সের কাঁচা বুদ্ধিতে মনে হয়েছিল—বেশ—আমি যখন এতই খারাপ যে সবাই আমাকে ছেড়ে গেল—তখন আমি এবার সত্যি সত্যি খারাপ হব! খুব খুব খুব খারাপ! কী ভীষণ বোকা ছিলাম আমি! আমি তো আসলে বোকাই! নইলে এমন করে নিজের হাতে নিজের জীবনটা তছনছ করে দিই! তোর মনে আছে জয়িতা, তবুও আমি একদিন উদ্ভ্রান্তের মতো খুঁজতে খুঁজতে হাজির হয়েছিলাম তোদের বাড়িতে? আমাকে দেখে চমকে উঠেছিলি তুই! কানে এসেছিল তোর মায়ের গলা, ‘ও এসেছে কেন? ও খুব খারাপ ছেলে! তোকে বারণ করে দিয়েছি না ওর সঙ্গে মিশতে!’
তুই কাঠের পুতুলের মতো আমার কাছে জানতে চেয়েছিলি আমার আসার কারণটা। তোর স্টিফ মুখ দেখেই আমি সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম—তোর মনে আমার জন্য ঘৃণা আর অবিশ্বাস ছাড়া আর কিচ্ছু নেই!
না, আতিথেয়তার কোনও ত্রুটি অবশ্য তোর মা করেননি। কাজের লোককে দিয়ে চা পাঠিয়েও দিয়েছিলেন। তবে, তোর চোখের ওই অবিশ্বাস আর ঘৃণা সহ্য করতে পারছিলাম না আমি! বেরিয়ে এসেছিলাম তোদের বাড়ি থেকে। কিন্তু জানিস, সেদিন তোদের বাড়িরই রাস্তায় আমি আরও অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করেছিলাম! যদি আর একটিবার বারান্দায় বা জানালায় তোর দেখা পাই—! যদি কোনও সিগনাল তোর কাছ থেকে আসে, যা হয়তো তুই ভয়ে সকলের সামনে বলতে পারিসনি আমায়! কিন্তু না—তুই আর এলিই না বারান্দায় কিংবা জানালায়! শেষপর্যন্ত হতাশ হয়ে সেদিন আমাকে ফিরতে হয়েছিল!
সেই দিন থেকেই বোধহয় কষ্ট আর তুই সমার্থক হয়ে গিয়েছিলি আমার জীবনে! এখনও যখন খুব কষ্ট পাই, তাইতো তখন শুধু তোর নামটাই মুখে চলে আসে আমার! জানিস তুই! আমি পুরো ফিমেল স্পিসিসটাকেই তারপর থেকে শুধু হেট করতাম! তবে বিশ্বাস কর—সারাজীবন আমি কিন্তু কোনও দিনও তোর খারাপ চাইনি! সব সময় শুধু ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছি, আমার যা হয় হোক, শুধু তুই ভালো থাকিস—যেখানেই থাকিস—ভালো থাকিস—!’
জড়িয়ে আসে কথাগুলো। তারপর আস্তে আস্তে মাথাটা এলিয়ে পড়ে সোফার ওপর জয় চ্যাটার্জীর—না না! নীল বর্মার! আকাশটা ফরসা হয়ে আসে। ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন