চকিতা চট্টোপাধ্যায়

একটু আগেই ফোনটা পেয়েছে দেবী। কলকাতা থেকে ইনভেস্টিগেটর তাকে ফোন করে জানিয়েছে নীলের গোপন অভিসারের কথাটা! ওর সন্দেহটা তাহলে ঠিকই ছিল! বাঃ! নীল বর্মা! শেষপর্যন্ত তাহলে তুমি খুঁজে পেলে তোমার সেই হারিয়ে ফেলা প্রেমিকাকে! যার জন্য সারা জীবন ধরে মনে মনে অপেক্ষা করেছিলে তুমি! যার জন্য তুমি আমার মতো সুন্দরী সেক্সি নারীকেও অনায়াসে উপেক্ষা করার স্পর্ধা দেখাতে পেরেছিলে! মনে মনে এই কথাগুলো দেওয়ালে টাঙানো নীলের ফটোর দিকে চেয়ে বলল দেবযানী। চোখের সামনে ভেসে উঠল ওদের ক্যামোফ্লেজড দাম্পত্যের একটা টুকরো দৃশ্য!
সেদিন বিছানায় ছিটকে উঠেছিল দেবী! ওর মুখে ছিল একরাশ হতাশা! হিসহিসিয়ে বলেছিল, ‘বার বার একই ঘটনা! আমারও তো ধৈর্যের একটা সীমা আছে নীল! আফটার অল আমিও একজন রক্তমাংসের মানুষ!’
বিছানায় আধশোয়া অবস্থাতেই নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নীল একটা সিগারেট ধরিয়েছিল শুধু। কোনও উত্তর দেয়নি। এতে দেবীর ক্রোধ আরও বেড়ে গিয়েছিল! সে নীলের চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আমি কি এতটাই অপছন্দ করার মতো নীল?’
ফোটোর ভেতরের নীল বর্মার হাস্যরত মুখটার ওপর হাতের খালি মদের গ্লাসটা ছুড়ে মারে দেবযানী! ঝনঝন শব্দে ভেঙে পড়ে কাচগুলো! চাপা গলায় নিজের মনেই বলে ওঠে দেবী, “তুমিও দেবীকে চেনো না নীল বর্মা! এটা যে আমার কতখানি হার ওই মেয়েটার কাছে, তা তুমি জানো না! আর দেবযানী কোনওদিনও হারতে পছন্দ করে না!”
একটা অন্ধকার ফাঁকা রাস্তা। গভীর রাত। চারিপাশে জনপ্রাণী নেই। মৌতাতটা আজ বেশ ভালোই জমেছিল রাজেন্দ্র ত্রিবেদীর ক্লাবে! দীপায়ণবাবুকে বলে যে মেয়েগুলোকে উপস্থিত করিয়েছিল সে আজ, তাদের দেখে রাজেন্দ্র যে বেশ লোভে পড়ে গেছে তা ওর মুখচোখ দেখেই টের পাচ্ছিল দীপ! তবে ও সব দিকে নজর দেবার সময় ছিল না ওর। কারণ তখন দামি স্কচের বোতলগুলো যে ওকে হাতের ইশারায় ডাকছিল! পরের পয়সায় স্কচ খাওয়ার সুযোগ পেলে কোন শালা আবার অন্য কোনও দিকে মন দেয় অ্যাঁ? এমন বোকা… তো দীপ সরকার নয়! তাই তো আকণ্ঠ গিলতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল ও। একটু আগে রাজেন্দ্র ওকে এইখানে নামিয়ে দিয়ে মেয়ে দুটোকে নিয়ে চলে গেল! বোধহয় আজ সারারাত মেহফিল বসবে! দীপায়ণবাবু তো ওদের দু’জনকে এনেছিল ফিল্মে চান্স দেবার নাম করে! এরপর যা হবে ওরা নিজেরা বুঝে নেবে! তাতে দীপ সরকারের কোনও দায় নেই! আফটার অল সবাই তো অ্যাডাল্ট!
টলমল পায়ে এগিয়ে চলল দীপ। হঠাৎ ওর কোমরের কাছে একটা ঠান্ডা ধাতব স্পর্শ টের পেল ও! কী এটা? হাত দিয়ে স্পর্শ করল ও।
দীপ ঘুরে দাঁড়াতেই দেখে তার ঘাড়ের কাছে এক আগন্তুক! নেশাগ্রস্ত চোখ টান করে দীপ চিনতে চেষ্টা করল আগন্তুককে!
এক ঝটকায় দামি স্কচের নেশাটা কেটে গেল দীপ সরকারের! বিস্ফারিত চোখে সে দেখল ল্যাম্প পোস্টের আলোয় চকচক করছে তার দিকে তাক করে রাখা রিভলবারের নলটা!
আগন্তুক একটু দূরে পার্ক করে রাখা একটা গাড়িকে দেখাল। কথা না বাড়িয়ে বাধ্য ছেলের মতো গাড়িতে উঠে পড়ল দীপ। তার কপাল দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে ভয়ে আর উত্তেজনায়!
আগন্তুক উঠে বসতেই চলতে শুরু করল গাড়িটা। আউটস্কার্টসে এসে থামল একেবারে।
হিমলীতল কণ্ঠে হুকুম করল অগন্তুক। দীপ আবারও বাধ্য ছেলের মতো নামল গাড়ি থেকে। নামল আগন্তুকও। এবার সরাসরি পিস্তল তাক করল সে দীপের বুক লক্ষ করে! দীপের গলা দিয়ে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল!
বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ছিটকে উঠল দীপ! ওর বিস্মিত হতভম্ব দৃষ্টি দেখে হেসে উঠল আগন্তুক!
জয় রিভলবার তুলে ধরল। প্রাণভয়ে চিৎকার করে উঠল দীপ!
জয় শব্দ করে হেসে ওঠে!
জয় এবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে! চারিদিকের নির্জনতায় ওর সেই অট্টহাসিটা যেন প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে ফিরে আসতে থাকে!
এবার চিৎকারটা দীপের কাছ থেকে এল না! এল ওদের পেছন দিক থেকে। জয় চমকে তাকিয়ে দেখল, কখন যেন জয়িতা এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে! তার চোখে অবিশ্বাস! ভয়ার্ত চোখে সে চেয়ে আছে জয়ের দিকে!
জয়িতা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে পেছন ফিরে দৌড়তে শুরু করে!
এবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে দীপ!
জয়িতা ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে…. জয় আর ওর নাগাল পাচ্ছে না ওর পেছন পেছন ছুটেও! পেছন থেকে কানে ভেসে আসছে দীপ সরকারের ব্যঙ্গের হাসি! আঃ!
ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল জয়! নাইট ল্যাম্পের আলোয় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত দুটো! এ.সি. রুমের ভেতরেও ঘেমে জল হয়ে গেছে জয়! গলা শুকিয়ে কাঠ! তার মানে এতক্ষণ ধরে স্বপ্ন দেখছিল ও! ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জলের বোতল বের করে সরাসরি গলায় ঢালল জয়। তারপর আস্তে আস্তে জানালায় এসে দাঁড়াল ও। কিন্তু ও কী! এত রাতে জানালায় যে জয়িতা দাঁড়িয়ে আছে! তার মানে ও ঘুমোয়নি? জয়কে দেখতে পেয়েই জয়িতা সন্তর্পণে হাত নাড়ল! জয়ও ওর দিকে হাত নাড়ল!
না না! জয়িতার মনে ওর সম্পর্কে নতুন করে যে বিশ্বাস, যে নির্ভরতা জন্মেছে, তাকে ও কিছুতেই নষ্ট হতে দিতে পারে না! ওর আসল পরিচয়টা জানলে এবার যে চিরকালের মতো ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেবে জয়িতা! কিন্তু–কিন্তু কী করবে তাহলে ও?
সেই কিশোরবেলায় জয়িতাকে নিয়ে মন যখন কল্পনার পাখা মেলত, তখন জয় প্রায়ই ভাবত জয়িতা আর ও দু’জনে ভিক্টোরিয়ায় হাত ধরাধরি করে ঘুরছে! আজ এত যুগ পরে ওর সেই স্বপ্নটা সত্যি হয়েছে! ভিক্টোরিয়ায় বসে আছে ওরা দু’জনে। পাশাপাশি একটা বেঞ্চে। ঠিক যেমন করে দু’জনে ক্লাসে পাশাপাশি বসত! না—ওদের আশেপাশের সদ্য তরুণ কাপলদের মতো কোনও প্রগলভতা করার বিন্দুমাত্র কোনও আগ্রহ ওদের মধ্যে নেই। বরং জয় একটু অস্বস্তি বোধ করছে এই সব দৃশ্য দেখে। কিন্তু জয়িতার যেন কোনও দিকে ভ্রূক্ষেপই নেই! ওর মুখে কী অপরিসীম নির্লিপ্ততা! হয়তো জীবনযুদ্ধে বিধ্বস্ত, ক্লান্ত জয়িতার ভেতরে অন্য কোনও অনুভূতি আজ আর অবশিষ্ট নেই!
জয়ের প্রশ্নে ঈষৎ চমকে তাকাল জয়িতা। তারপর আচমকা জিজ্ঞেস করল, “তোর হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারের ডিপিতে দেখলাম তোর সঙ্গে তোর বউ আর মেয়ের ছবি—”
উত্তরটা শুনে কি জয়িতার মুখটা ফ্র্যাকশান অফ সেকেন্ডের জন্য ম্লান হয়ে গেল?
জয় মনে মনে ভাবল। মুখে হাসি টেনে পরক্ষণেই জয়িতা বলে উঠল, “বাঃ! খুব ভালো! অ্যাটলিস্ট তুই তো সুখী হতে পেরেছিস!”
জয় থমকে গেল। কী বলতে যাচ্ছিল ও জয়িতাকে! ও যে একজন সুপারি কিলার—সমাজের চোখে আই ওয়াশের জন্য একটা মেকি ফ্যামিলিম্যান সেজে থাকতে হয়েছে বাধ্য হয়ে—এই কথা জয়িতা শুনলে তো—
কোলের ওপর জড়ো করে রাখা জয়িতার হাত দুটোর ওপর নিজের হাত দুটো রাখল জয়। তারপর ওর চোখে চোখ রেখে বলল, “তুই ছাড়া আমি মন থেকে কাউকে কোনওদিনও ভালোবাসিনি! আর স্ত্রী’র আসনেও বসাইনি জয়িতা! আজও আমি তাই মনে মনে রিগ্রেট করি একটাই কারণে—”
জয়িতা চমকে তাকাল জয়ের দিকে। ওর চোখ দিয়ে নেমে এল জলের ধারা!
বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল জয়িতার!
জয়িতার চোখের জল ওদের দু’জনের পরস্পরকে জড়িয়ে রাখা হাতের পাতার ওপর এসে পড়ল!
কথাগুলো বলার পর, এই প্রথমবার বাস্তবে জয়িতাকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল জয়! জয়িতার চোখের জলে জয়ের বুকের কাছটা যত ভিজে যেতে থাকল, ততই যেন নিজের বুকের ভেতর নতুন করে জয়িতাকে জীবনে ফিরে পাবার অদম্য আকাঙ্ক্ষাটার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা অনুভব করল জয় চ্যাটার্জী! সে শুধু ফিসফিস করে জয়িতার কানে কানে বলল, “আজ এই মুহূর্তে আমার থেকে সুখী আর কেউ নেই জয়িতা!”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন