নবম অধ্যায়

চকিতা চট্টোপাধ্যায়

‘বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছ?’

চমকে উঠেছিল জয়! কিছুক্ষণ আগেই বিনা টিকিটে ট্রাভেল করার অপরাধে ওকে ট্রেন থেকে নামিয়ে নিয়ে রায়পুর থানায় আনা হয়েছে আরও কয়েকজনের সঙ্গে। সেই সুদূর ছত্তিশগড়ের রাজধানীতে বসে বাংলা ভাষা শুনতে পাবে এটা ও একদমই আশা করেনি! সে চমকে মুখ তুলে তাকিয়েছিল থানার ইন্সপেক্টরের দিকে! ইন্সপেক্টর মৃদু হেসে বলেছিলেন, ‘অবাক হচ্ছ? আমি বাঙালি। বাড়ি ফিরে যাও। ভুল কোরো না!’

তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু জয় বাড়ি ফেরেনি। আবারও নিরুদ্দেশ যাত্রা করেছিল। আবারও বিনা টিকিটের কারণে ধরা পড়তে হয়েছিল। তবে এবার আর সহানুভূতি দেখানোর জন্য কাউকে পায়নি জয়। সোজা চালান হয়ে গিয়েছিল। কয়েকটা মাস কাটাতে হয়েছিল গরাদের পেছনে! জীবনে সেই প্রথম তার কয়েদি হওয়া! প্রথম রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর খুব কেঁদেছিল ও জয়িতার নাম করে! কাঁদতে কাঁদতে শুধু বলেছিল, ‘জয়িতা, তুই হয়তো কোনওদিনও জানতেই পারবি না তোকে আমি ঠিক কতখানি ভালোবেসেছিলাম! জানলে এভাবে কিছুতেই আমাকে কষ্ট দিতে পারতিস না! বেশ ঠিক আছে! এই তো প্রথম আমার গায়ে আসামীর ছাপ পড়ল! আমাকে তো সবাই ভাবল আমি খুব খারাপ! ঠিক আছে। এবার থেকে সত্যিই আমি খারাপ হব! খুব খুব খুব খারাপ!’

হঠাৎ কাঁধে একটা হাতের স্পর্শে চমকে তাকিয়েছিল জয়! দেখেছিল ওর চেয়ে কিছুটা বড় একটা ছেলে অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে!

‘ইয়ে… জয়িতা কৌন হ‍্যায়?’

চমকে তাকিয়েছিল জয় ছেলেটির মুখের দিকে! তারপর মুখ নামিয়ে নিয়ে নিজের মাথা দু’পাশে নাড়িয়ে ‘না’ বলেছিল। ছেলেটা মৃদু হেসে বলেছিল, ‘সমঝ গয়া। মাশুকা হ‍্যায় না তেরা?’ এই প্রশ্নে জয় হঠাৎ কেঁদে ফেলেছিল! আর ওকে অবাক করে দিয়ে সেই ছেলেটা ওকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে পিঠে সমবেদনার হাত বুলিয়ে দিয়েছিল সেদিন!

ছেলেটার নাম রঞ্জিত। ছোটখাটো অপরাধী হিসেবে পুলিশের খাতায় আগেই নাম উঠেছিল ওর। রঞ্জিতের কাছে নিজের জীবনের সব কথা উজাড় করে বলেছিল জয়! মন দিয়ে সবটা শুনেছিল ও। তারপর বলেছিল এখান থেকে বেরোনোর পর যদি কোনও প্রয়োজন হয় যেন ওকে বলতে সঙ্কোচ না করে। আরও একটা কথাও অবশ‍্য বলেছিল, ‘অগর জিন্দেগি মে কভি ভি তুঝে জয়িতা কঁহি ভি মিল যায়ে, তো ইসবার দের মাত্ করনা মেরি ইয়ার—সিধা উসকি মাঙ্গ সিন্দুর সে ভর্ দে না!’

ওর এই কথায় ম্লান হেসে জয় বলেছিল, ‘না রঞ্জিত, ও যেখানে আছে ভালো থাকুক। আমি শুধু এইটুকুই চাই! তাছাড়া, জয়িতার চোখে তো আমি চিরকালের মতোই অপরাধী হয়ে গেছি!’

রঞ্জিত জোরের সঙ্গে বলেছিল, ‘নেহি দোস্ত! জরুর কুছ গলতফ্যামি হুয়া হোগা তুম দোনো কে বিচ মেঁ! অগর জিন্দেগি দোবারা কভি ভি তুম দোনোঁ কো মিলায়েঁ, তো সমঝ লেনা সেকেন্ড চান্স দেনে কে লিয়েই শায়েদ মিলায়া হোগা রব নে! কুছ জরুরত্ অগর পড়ে তো মুঝে একবার জরুর ইয়াদ কার লেনা ইয়ার! ভুলনা মাত্! ইয়ে মেরা ওয়াদা রাহা!’

এই অপরাধ জগতের কাজ ছাড়া রঞ্জিতের হাতে ওকে দেবার মতো আর কোনও কাজ তো ছিল না। আর এই নির্বান্ধব জীবনে আর কাউকেই জয় চিনত না। তাই রঞ্জিতের সঙ্গেই সে একদিন পৌঁছে গিয়েছিল কাজের খোঁজে ওর বসের কাছে।

— “তারপর?”
— “তারপর আর কী? আমার হাতেখড়ি হল অন্ধকার জগতে!”
— “না!”
— “হ‍্যাঁ। এটাই সত্যি! তোর কাছে মিথ‍্যে বলব না জয়িতা—একটা একটা করে অন্ধকার জগতের সিঁড়ি বেয়ে আমি এরপর নেমে গেলাম!”
— “এর জন্যে পরোক্ষে ভাবে আমিই দায়ী জয়!”

জয়িতার বেদনাক্লিষ্ট চোখদুটো দিয়ে জল গড়িয়ে এল!

— “না রে! এরজন‍্য আমার ভালোবাসাই একমাত্র দায়ী! বুকভরা অভিমানে আমি যেন জেদ করে নিজের ক্ষতি নিজেই করবার নেশায় একটার পর একটা অপরাধের সঙ্গে জড়ালাম নিজেকে! আর তাই ফেরাও হল না আর কোনওদিন নিজের চেনা মানুষগুলোর কাছে!”
— “তোর মা-বাবা?”
— “দু’জনের কেউই বেঁচে নেই। জানিস বাবা আমাকে বলেছিল, তোমার নামের সঙ্গে অজিত চ‍্যাটার্জীর নাম যেন কোনওদিনও না জোড়ে! এটা মনে রেখো! কারণ, আমি তোমাকে আমার সন্তান বলে আর স্বীকার করি না!”
— “সে কী!”
— “সেই অপরিণত বয়সে, বুঝিনি কতটা কষ্ট নিয়ে কথাগুলো বাবা সেদিন বলেছিল! মুখের কথাগুলোই সেদিন বড় করে ধরেছিলাম! আর তাই পালটে ফেলেছিলাম নিজের নামটুকুও!”
— “মানে?”

বিস্মিত মুখে প্রশ্ন করেছিল জয়িতা!

— “আমার নাম এখন জয় চ‍্যাটার্জী না!”
— “তাহলে?”
— “নীল বর্মা!”
— “না!”
— “হ‍্যাঁ। এটাই সত্যি। এই নামেই তোদের আবাসনে ভাড়া এসেছি আমি! এমনকি…”
— “এমনকি?”
— “পুলিশও আমাকে চেনে এই নীল বর্মা নামেই!”

জয়িতা জয়ের হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখল।

— “ক্ষমা করতে পারবি আমায় জয়? হয়তো এই অপরাধেই আজ আমি জ্বলেপুড়ে মরে যাচ্ছি রে!”
— “জয়িতা! এসব কী বলছিস তুই!”
— “ঠিকই বলছি!”

জয়িতা এবার ভেঙে পড়ে কান্নায়!

— “জয়িতা প্লিজ! কাঁদিস না এভাবে! তুই তো জানিস, তোকে কাঁদতে দেখতে আমার ভালো লাগে না! তোর মনে আছে? ছোটবেলায় তোর মন খারাপ হলে আমি তোকে নানান রকম জোকস বলে হাসাতে চেষ্টা করতাম? বলব জোকস?”

জয়িতা এবার হেসে ফেলে! তার চোখে জল, মুখে হাসি! সে হাসতে হাসতে জয়ের পিঠে ঠিক সেই ছেলেবেলার মতোই কিল মারতে মারতে শুধু বলে, “তুই একটুও বদলাসনি!”

জয় বলে, “আজ এত বছর পর তোর এই মারটা যে কী মিষ্টি লাগছে কী বলব! এত কাছাকাছি দু’জনে বসে যে আছি এটা ভাবলে আমার এখনও মনে হচ্ছে এটা হয়তো সত্যি নয়, আমার কল্পনা! আচ্ছা, যে প্রশ্নটার উত্তর আজ কুড়ি বছর ধরে খুঁজে গেছি আমি, কিন্তু পাইনি—আজ সেই প্রশ্নটার জবাব চাইলে দিবি?”

— “দেব।”
— “যদি সেদিন সেই অঘটনটা না ঘটত, তাহলে আমার চিঠির জবাব কী হত?”

জয়িতা মুখ নিচু করে।

— “না জয়িতা, চুপ করে থাকিস না! আজ অন্তত আমার প্রশ্নের উত্তর দে… তুইও কি আমায় ভালোবাসতিস? বল হ‍্যাঁ কি না?”
— “হ‍্যাঁ। ভালোবাসতাম!”
— “জয়িতা! একবার যদি মুখ ফুটে বলতিস এই কথাটা তাহলে হয়তো কেউ আমাদের আলাদা করতে পারত না! আর এভাবে সব কিছু ওলোট-পালোটও হয়ে যেত না!”

নৌকাটা তখন মাঝগঙ্গায়। ওরা জানতেও পারে না পাড়ে একজন নিবিষ্ট চোখে বাইনোকুলার দিয়ে লক্ষ করছে ওদের নৌকাটাকে! দেবযানীর অ‍্যাপয়েন্ট করা সেই ইনভেস্টিগেটর। আজ এই নতুন তথ‍্য ম‍্যাডামকে দিলে উনি নিশ্চয়ই খুব খুশি হবেন! এত দিনে একটা খবরের মতো খবর সে দিতে পারবে! কিন্তু, অনেকক্ষণ তো হয়ে গেছে স‍্যার আর ওই মহিলা নৌকা ভ্রমণে গেছেন! এতক্ষণে তো ওঁদের ফিরে আসা উচিত! ইনভেস্টিগেটর একটু অবাকই হয়! ভাবে এই ভরদুপুরবেলাও কেউ গঙ্গাবক্ষে এমন করতে পারে! তাও আবার এতক্ষণ ধরে! সে এবার কিছুটা অসহিষ্ণুভাবে ব‍্যস্ত চোখে চায়ের দোকান খোঁজে। এঁদের ফূর্তির জন্য তাকে কি পেটে কিল মেরে ডিউটি করতে হবে নাকি সে যত টাকাই দিক ম‍্যাডাম! ইনভেস্টিগেটর একটা খাবারের দোকানের সামনের বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়ে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%