প্রথম অধ্যায়

চকিতা চট্টোপাধ্যায়

লুটিয়ে পড়ল লোকটা। সাইলেন্সার লাগানো রিভলবারের মাত্র একটা গুলির অব‍্যর্থ নিশানা… শেষ করে দিল একটা বিশ্বাসঘাতকের জীবনকে! অন্তত তার কাছে তো এই কেসের ব্রিফিংটা এমনটাই ছিল। লোকটা নাকি ঠকিয়ে বিয়ে করত একটার পর একটা, আর তারপর মওকা বুঝে বেচে দিত বউগুলোকে। এই শেষ বউটা, বোধহয় পাঁচ কী ছয় নম্বর হবে, সব টের পেয়ে গোপনে শেষ করে দিতে চেয়েছিল নিজের স্বামীকেই, যাতে আর কোনও মেয়ের সর্বনাশ সে করতে না পারে ভবিষ্যতে! হ‍্যাঁ, হয়তো আইনের পথে হাঁটতে পারত লোকটার এই শেষ বউটা, কিন্তু তার এই ধুরন্ধর পতিদেবতাটি যে নানান কৌশলে ঠিকই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসত, সেটা হয়তো সে আন্দাজ করেছিল। আর তাই আজ প্রয়োজন পড়েছে তার মতো একজন ‘সুপারি কিলার’-এর!

কিন্তু, এক্ষুনি এই জায়গা থেকে বেরোতে হবে! ভিড়ের মধ্যে থেকে অব‍্যর্থ লক্ষ্যভেদটা সে করেছিল কাছেই পার্ক করে রাখা ভুয়ো নেমপ্লেট লাগানো একটা গাড়ির ভেতর থেকে। কিন্তু যদি কেউ তাকে দেখে থাকে! এই রাস্তার সিসিটিভিগুলো যে অকেজো সে’ খবর অবশ‍্য আগেই তার দলের হোমওয়ার্ক থেকে সে জানতে পেরেছিল। কিন্তু তবু, আইউইটনেস বলেও তো একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়! লোকটা হঠাৎ লুটিয়ে পড়তেই অলরেডি আশেপাশের কয়েকজন পথচারী থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। আজকাল যদিও চট করে কেউ অন‍্যের উড়ো ঝামেলায় জড়াতে চায় না, কিন্তু… না তবুও দু’-চারজন করে লোক জমা হতে শুরু করে দিয়েছে এর মধ্যেই! এই বেলা সরে পড়তে হবে… পুলিশ এসে পড়ার আগেই। এক্ষুনি স‍্যারজিকে জানিয়ে দিতে হবে যে মিশন সাকসেসফুল! দ্রুত গাড়িতে স্টার্ট দিল নীল। সুপারি কিলার নীল বর্মা।

বিশ্বাসঘাতকগুলোকে মারতে বড় ভালো লাগে তার। কোথাও যেন একটা আত্মশ্লাঘা অনুভব করে সে। তার নিজের জীবনের বিশ্বাসঘাতকগুলোর একজনকেও তো শাস্তি দেওয়া হল না আজ পযর্ন্ত, তাই হয়তো অন্যের জীবনের বিশ্বাসঘাতকদের সে নিজের হাতে শেষ করে অদ্ভুত একটা আনন্দ পায়! ড‍্যাশবোর্ডে রাখা ফোনটা বেজে উঠল। দেবী ফোন করছে। ফোনটা রিসিভ করল নীল।

‘আর ইউ ওকে বেবি?’

দেবীর গলায় উৎকণ্ঠা লক্ষ করল নীল।

‘অ‍্যাবসোলিউটলি!’

‘থ‍্যাঙ্ক গড!’

দেবীর গলায় স্বস্তি ঝরে পড়ল। ফোনটা কেটে দিল নীল। ওর প্রতি দেবীর এই অতিরিক্ত কনসার্ন দেখানোটা একদম সহ‍্য হয় না নীলের আজও। নিজের ব‍্যবহারে সেটা প্রকাশও করে নীল। কিন্তু, তা সত্ত্বেও কেন যে দেবীর এই আদিখ‍্যেতা এটাই বোঝে না নীল! আদিখ‍্যেতা ছাড়া একে আর কী-ই বা বলা যায়? তারা দু’জনেই যে একটা সাজানো চিত্রনাট্যের কুশীলব মাত্র সেটা তো তারা দু’জনেই জানে! দেবী ওরফে দেবযানী যে শুধুমাত্র তার সাজানো বউ! সমাজের চোখে তারা দু’জন স্বামী-স্ত্রী হলেও বাস্তবে যে সেটা জাস্ট একটা আইওয়াশ সেটা তো অজানা নয় ওর! তবুও যে কেন মাঝে মাঝে সত‍্যিকারের বউয়ের মতো বিহেভ করার চেষ্টা করে যায় দেবী সেটাই বোঝে না নীল! দেবীর মতো কঠিন মনের দীর্ঘদিনের আন্ডারওয়ার্ল্ড ওয়ার্কারের কাছে এই বিহেভিয়ারটা যেন ঠিক নেওয়া যায় না! অসহ‍্য ন‍্যাকামি ছাড়া আর কিছু মনে হয় না! নাঃ! এই নিয়ে স‍্যারজির সঙ্গে একবার কথা বলা দরকার ওর!

“তুম কনফিডেন্ট তো হো… মগর ওভার কনফিডেন্স ইস নট ফেয়ার বর্মা!”

“বাত্ কেয়া হ‍্যায় স‍্যারজি?” স‍্যারজির মন্তব‍্যে উৎকন্ঠিতভাবে বলে ওঠে নীল। মিশন শেষ করে সে এসেছে স‍্যারজির ডেরায়।

“স্পট মে কোই তুমহারি গাড়িকো দেখ লিয়া থা বর্মা!”

চমকে ওঠে নীল বর্মা! এটা কী করে হল! সে তো অত্যন্ত সতর্ক ছিল!

“ভিকি, জরা সমঝাও বর্মা কো।”

ঘরে উপস্থিত তাঁর ডানহাত ভিকিকে ইশারা করলেন স‍্যারজি। ভিকি তাঁর আজ্ঞা পালন করতে নীলকে বলল, “নীল, একজন লোক একটা গাড়িকে অনেকক্ষণ ধরে রাস্তার উলটোদিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল। যদিও সে আর কিছু দেখেছে বলে এখনও কোনও খবর নেই। গাড়ির নেমপ্লেট তো চেঞ্জ করা হয়ে গেছে অলরেডি আর এতক্ষণে রংও বদলে ফেলা হয়ে গেছে, তবুও… সাবধানের তো মার নেই… তাই—।”

এই পযর্ন্ত বলে ভিকি চুপ করে গেল। নীল টেনশনে পড়ে গেল! তাহলে তো রিস্ক অবশ্যই একটা থেকেই যাচ্ছে!

“বর্মা, তু নিকল পড় হিঁয়াসে!”

“নিকল পড়ুঁ? মতলব? কাঁহা?”

নীলের বিস্মিত প্রশ্নের উত্তরে ভিকি এবার এগিয়ে এসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল, “শোন, স‍্যারজি ঠিক করেছেন কিছুদিনের জন্য তুই অন্য শহরে গিয়ে গা ঢাকা দিবি যেন অফিসের কাজে বাইরে গেছিস। তারপর পরিস্থিতি ঠিকঠাক হলে ফিরবি।”

“দেবী আর টুসি? ওদেরও কি নিয়ে যাব?”

“না না! একদম না! তাহলেই বরং সন্দেহ হতে পারে। ওরা যেমন এখানে আছে তেমন থাকবে। আরে বাবা, এইরকম পরিস্থিতির জন্যই তো আমাদের এতসব প্রিপারেশন আগে থেকেই নিয়ে রাখতে হয় তা তো জানিসই, তুই তো আর নতুন না আমাদের এই ওয়ার্ল্ডে, তোকে কি আমায় বোঝাতে হবে নাকি?”

“কিন্তু যাবটা কোথায়?”

“তু ফিকর মত্ কর বর্মা, উয়ো সব তৈয়ারিয়াঁ হো চুকা হ‍্যায়। ইয়ে হামারি জিম্মেদারি!”

“মগর যাউঙ্গা কাঁহা স‍্যারজি?”

“কলকাত্তা।”

“নেহি!!” হঠাৎ গলা দিয়ে নিজের অজান্তেই একটা আর্তচিৎকার বেরিয়ে আসে নীলের! চমকে বিস্মিত ভাবে তীব্র চোখে তাকায় ভিকি আর স‍্যারজি!

“বাত্ কেয়া হ‍্যায় বর্মা?” স‍্যারজি স্থির চোখে নীলের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করেন।

“আর যে শহরে যেতে বলবেন আমি যেতে রাজি স‍্যারজি, শুধু প্লিজ আমাকে কলকাতায় যেতে বলবেন না!” মরিয়া অনুরোধ বেরিয়ে আসে নীলের মুখ দিয়ে। এবার কথা বলল ভিকি। “কিন্তু স‍্যারজি যে ওখানেই যাওয়া ফাইনাল করেছেন তোর। তুই তো জানিস নীল, স‍্যারজি আমাদের বস্। তাই ওঁর সিদ্ধান্তের বাইরে তো আমরা কেউই যেতে পারি না। আর স‍্যারজি অনেক ভেবেই এই সিদ্ধান্তটা নিয়েছেন, কারণ, ওটা তোর হোমটাউন। ওখানে আত্মগোপন করে থাকাটা তোর পক্ষে বরং সুবিধারই হবে ইয়ার!” নীল আর কিছু বলে না কারণ সে জানে এই সিদ্ধান্তের নড়চড় হবে না। এটাই যে দলের নিয়ম। সে এবার শুধু নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে, “কবে যেতে হবে?”

“কাল সকালেই যেতে হবে?”

ফ্রিজ থেকে একটা চিলড বিয়ারের ক‍্যান বের করে গলায় ঢালতে ঢালতে রুক্ষ ভাবে নীল জবাব দিল, “হ‍্যাঁ। তখন তো বললাম। এক কথা বারবার জিজ্ঞেস করছ কেন?”

দেবযানী এবার নীলের সামনে এসে দাঁড়াল। তার শরীরে খোলামেলা পোশাক, মুখে উগ্র প্রসাধন। চেহারায় আবেদন যথেষ্ট। কিন্তু সেদিকে নীল ফিরেও চাইল না। অন্য দিকে তার দৃষ্টি সরিয়ে নিল। দেবযানী লক্ষ করল সবটাই। ভেতরে ভেতরে আরও জ্বলে গিয়ে বলল, “কিছু জিজ্ঞেস করলেই এইরকম রুডলি জবাব দাও কেন বলো তো?”

“কারণ, আই জাস্ট কান্ট টলারেট ইয়োর ওয়াইফ-লাইক বিহেভিয়ার দেবী!”

“হোয়াট? ওয়াইফ-লাইক!?” দেবীর মুখ আহত।

“কথাটা যে সত্যি তা তো তুমিও জানো! আমরা দলের স্বার্থে, স‍্যারজির ডিসিশনে এক ছাদের নীচে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে থাকি! জাস্ট টু শো, যে উই আর কাপল। নট ওনলি দ‍্যাট, বাট হ‍্যাপি কাপল! আর সেটা আরও বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য অনাথ একটা বাচ্চাকে পযর্ন্ত অ‍্যাডপ্ট করার নাটকটা করতে হয়েছে! আর আমরা দু’জনেই যখন সবটাই ক্লিয়ারলি জানি, তখন তোমার এই বউ সাজার ন‍্যাকামিটা যে আমার অসহ‍্য লাগে সেটা তুমি বোঝো না দেবযানী?”

এই কথায় প্রথমে দেবযানীর মুখটা কালো হয়ে যায়। পরক্ষণেই জ্বলে ওঠে ওর চোখদুটো হিংস্র ভাবে! সে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলে ওঠে, “জানি। বউয়ের জায়গায় তো তুমি আর কাউকেই বসাতে পারো না কোনওদিন… বিকজ অফ দ‍্যাট ব্লাডি বিচ্!”

“শাট আপ” আচমকা একটা থাপ্পড় এসে পড়ে দেবযানীর গালে! নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারে না নীল। বিস্ফারিত চোখে নীলের দিকে তাকায় দেবযানী!

“হাউ ডেয়ার ইউ নীল বর্মা! ইউ স্ল‍্যাপড এ‍্যাট মি! ইউ হ‍্যাভ টু পে ফর ইট! ইয়েস! ইউ হ‍্যাভ টু!” চিৎকার করে ওঠে দেবযানী!

“মেমসাব! বেবি রো রাহি হ‍্যায়!”

ক্রন্দনরতা টুসিকে নিয়ে ঘরে ঠিক সেই মুহূর্তে এসে ঢোকে টুসির ন‍্যানি পূজা। দেবী হিংস্র ভাবে এগিয়ে যায় পূজার দিকে।

“তো? ম‍্যায় কেয়া কারুঁ? তুম উস্কি ন‍্যানি হো! প‍্যায়সে তুমহে মিলতি হ‍্যায়! ইয়ে তুমহারি ডিউটি! সমঝি?” কথাগুলো বলেই ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল দেবী। নীল এগিয়ে এসে পূজার কোল থেকে তুলে নিল ক্রন্দনরতা টুসিকে। হতে পারে অনাথ, কিন্তু তবু ওর মেয়ের পরিচয়েই তো পরিচিত টুসি। শিশুর মায়া বড় মায়া। একবার সে মায়ায় পড়ে গেলে তা কাটানো বড় মুশকিল! বুক থেকে হঠাৎই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল নীলের। এই শিশুটা তো ওর নিজেরও হতে পারত! ওর নিজের রক্ত বইত তাহলে টুসির ধমনীতে! আজ এই সারা পৃথিবীটাতে ওর রক্তের সম্পর্কের কেউ বেঁচে নেই! না মা—না বাবা! এই পৃথিবীতে সে একা! একদম একা!

অধ্যায় ১ / ১৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%