অষ্টম অধ্যায়

চকিতা চট্টোপাধ্যায়

আস্তে আস্তে জয়িতাকে পার্কের বেঞ্চটার ওপর শুইয়ে দিল জয়! তারপর পার্কের পাথরের ফোয়ারা থেকে আঁজলা করে জল এনে ছিটোতে লাগল ওর চোখে মুখে! ঝুঁকে পড়ে দেখল, কত যুগ পরে অত কাছ থেকে সেই মুখ! যে মুখটা তার মনের ভেতর রয়ে গিয়েছিল আজ এতগুলো বছর ধরে! প্রতিদিন প্রতিনিয়ত যাকে সে দেখে এসেছে তার অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে, হাজার ঘাত-প্রতিঘাতেও এক মুহূর্তের জন্যও যে মুখ বিস্মৃত হয়নি সে! কিন্তু, এখানে এভাবে বেশিক্ষণ থাকলে তো দু’জনেরই বিপদ! জয় জয়িতার মুখে জলের ঝাপটা দিতে দিতে ওকে মৃদুস্বরে ডাকে—“জয়িতা! জয়িতা! চোখ খোল! জয়িতা!”

চেতন-অচেতনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে জয়িতার মনে হল কে যেন বহু যুগের ওপার থেকে ওকে ডাকছে! সে ডাকটা যেন ওর বড় চেনা! কতকাল আগে কে যেন এমন করে ওকে ডাকত! আস্তে আস্তে চোখ খুলল জয়িতা! দেখল, একটা মুখ তার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে! কিন্তু সে কোথায়? হঠাৎ পুরো ঘটনাটা মনে পড়ে যেতেই সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ধড়মড় করে সে উঠে বসতে চেষ্টা করতেই ওকে ধরে ফেলল একটা হাত! বলল, “আস্তে জয়িতা! আস্তে!” জয়িতা এবার ঘুরে সেই মানুষটার দিকে তাকাল। কিন্তু এ কী দেখছে ও! সত্যি না স্বপ্ন! জয়ের হাত থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্ত আর জলের ঝাপটা মিলেমিশে বড় অদ্ভুত সুন্দর লাগছে জয়িতার মুখটা—যেন মনে হচ্ছে সদ‍্য সিঁদুর খেলে উঠেছে সে!

জয়িতা জয়ের মুখের দিকে বিস্ফারিত নেত্রে চেয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। পরক্ষণেই ওর দু’চোখ বেয়ে নামল জলের ধারা! তারপরই ফুঁপিয়ে উঠে জয়ের জামাটার বুকের কাছটা খামচে ধরে ঝাঁকুনি দিতে দিতে বলল, “কোথায় চলে গিয়েছিলি তুই! কেন চলে গিয়েছিলি? কেন? কেন? কেন? তুই থাকলে তো আমাকে ও এত কষ্ট দিতে পারত না!”

জয় দু’-হাত দিয়ে ওর কাঁধ দুটো ধরে বলল, “আমি জানি। সব দেখেছি আমি! এই ক’দিন ধরে! ওই অমানুষটা তোর ওপর ঠিক কতখানি টর্চার করে!”

জয়িতা পাগলের মতো জয়ের বুকে এলোপাথাড়ি মারতে মারতে বলল, “তুই থাকলে কি আমাকে এত কষ্ট দিতে পারত দীপ!”

চমকে উঠল জয়।

— “দীপ?”
— “হ‍্যাঁ দীপ। দীপ সরকার। আমার স্বামী!”

জয়ের মাথায় কেউ যেন একটা হাতুড়ির ঘা মারল!

মাঝগঙ্গায় একটা পালতোলা নৌকা ভাসছে। নৌকার ছইয়ের ভেতর আছে শুধু দু’জন। একজন নারী, আরেকজন পুরুষ। আজ তারা একে অন‍্যের কাছে উজাড় করে বলছে তাদের জীবনের ফেলে আসা বছরগুলোর কথা… সাক্ষী থাকছে শুধু ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির ধারা আর গঙ্গার ঢেউ! আজ জয়িতা বেপরোয়া বেহিসেবী, তাই তার স্বামী আজ বেরিয়ে যাওয়া মাত্র সে-ও বেরিয়ে এসেছে! আর বেরিয়ে এসেছে নীলও। তবে তারা দু’জনেই আলাদা আলাদা বেরিয়েছে যাতে কারও দৃষ্টি আকর্ষণ না করে!

জয়ের অনুরোধে জয়িতা বলতে শুরু করেছে তার কথা।

— “এই অঘটনটা ঘটার আগে আরেকটা ঘটনা ঘটেছিল জয়!”
— “আরেকটা ঘটনা? মানে?”
— “একদিন, স্কুল থেকে আমাকে আনতে আসার আগে আমাদের ল‍্যান্ডফোনে আমার মা পেয়েছিল একটা ‘ঘোস্ট কল’! একটা মেল ভয়েস মাকে সাবধান করে বলেছিল আপনার মেয়েকে যদি ‘মা’ হওয়া থেকে আটকাতে চান তাহলে জয় চ‍্যাটার্জীর কবল থেকে পারলে এক্ষুনি বাঁচান!”
— “কী বলছিস কী!”
— “ফোন পাওয়া মাত্র মা পাগলের মতো ছুটে গিয়েছিল সেদিন স্কুলে! ঘটনা চক্রে সেই দিনই তুই প্রোপোজ করে লাভ-লেটার দিয়েছিলি আমায়! আমি অবশ‍্য এই ঘটনার বিন্দুবিসর্গও জানতাম না। মা আমাকে কিছুই জানায়নি। শুধু বলেছিল, জয় খুব খারাপ ছেলে। ওর সঙ্গে একদম মিশবে না! আমি মনে মনে ভীষণ নাভার্স হয়ে গিয়েছিলাম! ভেবেছিলাম মা হঠাৎ এই কথাটা বলল কেন! তবে কি মা বুঝে গেছে যে জয় আজই আমাকে প্রোপোজ করেছে! টেনশনে আমার মাইগ্রেনের মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়ে গিয়েছিল, আর তারপরই এসেছিল ধুম জ্বর! স্কুলে যেতে পারিনি পরদিন। রাতে সুপর্ণা ফোন করে জানিয়েছিল ফ্লেকার ঘটনাটা! তখন আমার মনের অবস্থাটার কথা চিন্তা করতে পারছিস জয়? মা যখন শুনেছিল, তখন শুধু বলেছিল, এবার বুঝতে পারছ নিশ্চয়ই কেন জয়ের সঙ্গে তোমাকে মিশতে বারণ করেছিলাম! মাকে কী উত্তর দিতাম আমি? উত্তর দেওয়ার কোনও মুখই তো আমার ছিল না! একটা অব‍্যক্ত বেদনা, অদম্য অভিমান আর অসম্ভব রাগ একই সঙ্গে ভেতর থেকে আমাকে ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছিল তখন!”
— “একটা সত্যি কথা বলবি? তুই কি বিশ্বাস করতিস আমি ওরকম একটা জঘন্য কাজ করতে পারি?”

কোলের ওপর আলগোছে ফেলে রাখা জয়িতার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে জিজ্ঞেস করল জয়! জয়ের হাতের মধ্যে থাকা জয়িতার হাতটা কেমন কেঁপে উঠল! ফুঁপিয়ে উঠল ওর শরীরটা!

জয় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল! বলল, “বুঝেছি। তোকেও দোষ দিতে পারি না! এই অবস্থায় বিশ্বাস রাখাটা কঠিন ছিল। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম তুই হয়তো আমাকে… যাক গে… থামলি কেন? বল… প্লিজ!”

নিজেকে একটু সামলে নিয়ে জয়িতা আবার শুরু করল।

“দিন যত এগোল, দীপও ততই ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করল আমার আর আমার পরিবারের। প্রথম প্রথম অন‍্য বন্ধুদেরও নিয়ে আসত আমাদের বাড়িতে। একসঙ্গে গল্প–আড্ডা–পিকনিক–ফাংশন-খাওয়া-দাওয়া-বেড়ানো! ততদিনে আমরা স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে। আমাদের বাড়ির সবার যে দীপকে পাত্র হিসেবে খুবই পছন্দ সেটা বুঝতাম। এরপর ও হায়ার স্টাডিস করবে বলে কয়েক বছরের জন্য চলে গেল বিদেশে। আমিও এদিকে পড়াশোনার পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছিলাম আমার কালচারাল কেরিয়ার। তুই তো জানতিস, আমি নাচে ‘প্রভাকর’ ছিলাম? তখন আমি সবে কোরিওগ্রাফার হিসেবে বিভিন্ন নামকরা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ শুরু করেছি, হঠাৎ আমার কাছে টেলিভিশন সিরিয়ালে অভিনয় করার একটা সুযোগ এসে গেল! আমি তো হাতে চাঁদ পেলাম! শুরু করলাম আমার অভিনয়ের কেরিয়ার! বিভিন্ন ফিল্মি ম‍্যাগাজিনে প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে আমার ফটোও ছাপা হল! যখন আমি সবে আমার কেরিয়ার নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি, ঠিক তখনই বেশ কয়েক বছর বিদেশে কাটিয়ে ফিরে এল দীপ! আরও যেন হ‍্যান্ডসাম হয়ে গেছে এই ক’বছরে! সঙ্গে আছে ওর ঝাঁ চকচকে কেরিয়ার! এক মুগ্ধতা ঘিরে ধরল আমাদের সবাইকেই! ও সরাসরি এবার প্রোপোজ করল আমায়! বলল, ও ছোটবেলা থেকেই আমাকে ভালোবাসে! কিন্তু নিজে যোগ্য না হয়ে বলতে চায়নি সে’ কথা! ইমপ্রেসড হয়ে গেলাম সবাই! আমার মনে অবশ্য আমার উদীয়মান কেরিয়ার নিয়ে একটা দ্বন্দ্ব কাজ করছিল। দীপের সঙ্গে কি আমাকেও চলে যেতে হবে বিদেশে সব ফেলে? সে দ্বন্দ্বও এক নিমেষে দূর করে দিল দীপ। বলল, ও তো দেশে থাকবে বলেই ফিরে এসেছে এখানে। ওর কথায় সায় দিলেন ওর মা-বাবাও। ব‍্যস! এরপর একদিন আমি হয়ে গেলাম মিসেস দীপ সরকার!”

অনন্ত ঢেউগুলোর দিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল জয়িতা!

— “থামলি কেন? তোদের সমস‍্যাটা ঠিক কী নিয়ে সেটা বলবি না?”
— “সব কথা কি একদিনেই শুনবি? এবার তোর কথা বল—”

জয় ভেতরে ভেতরে থমকাল। জয়িতার কাছে সে কি করে বলবে তার আসল পরিচয়! সে যে একজন প্রোফেশনাল সুপারি কিলার একথাটা কেমন করে বলবে ও জয়িতাকে? এখন জয়িতার চোখে যে ভালোলাগাটা ফুটে উঠতে দেখছে সে, এটা শোনার পর তার বদলে সেখানে হয়তো ফুটে উঠবে ঘৃণা আর আতঙ্ক! না না! এমনিতেই দুঃখী এই মেয়েটাকে জীবনের এতগুলো বছর পর সে কেমন করে আবার নতুন করে কষ্ট দিতে পারে!

“কী হল? চুপ করে রইলি যে! যদি আজও আমাকে তোর বেস্ট ফ্রেন্ড ভাবিস, তাহলে এই হেজিটেশন কেন?”

জয় একটু ম্লান হেসে বলতে শুরু করল তার জীবন কাহিনি। জীবনের এই অধ‍্যায়টা ও লুকোবে না জয়িতার কাছ থেকে—কারণ এই অধ‍্যায়ের সঙ্গে যে জয়িতাও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে!

বুক ঠেলে কান্না উঠে আসছে জয়ের! একবুক কান্না! সারা শরীরে বাবার বেদম মারের যন্ত্রণাকেও ছাপিয়ে গেছে এই অভিমানের বেদনা! সবাই—সবাই তাকে ভুল বুঝল! মা-বাবা-আত্মীয়স্বজন! এমনকি জয়িতাও! বাবারও দোষ নেই! ক্রমাগত অপমানিত হতে হতে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে বাবার! স্কুলে সবার সামনে অপমানিত হতে হয়েছে, সহ‍্য করতে হয়েছে আত্মীয় আর পড়শিদের বাক‍্যবাণ! এসব খবর যেন দাবানলের চেয়েও বেশি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে! কোণঠাসা বাবার সব রাগ তাই গিয়ে পড়েছিল নিজেরই এই কুলাঙ্গার ছেলেটার ওপরই! তার ওপর অনেক কষ্টে, অনেককে ধরে, মোটা টাকা ডোনেশানের টোপ দিয়ে যখন বাবা একটা অন‍্য সাধারণ স্কুলে ওর অ‍্যাডমিশনের ব‍্যবস্থা করে এসেছেন, তখন সে কিনা বলেছে যে সে আর পড়াশোনাই করতে চায় না! তাই কোনও স্কুলেই সে যেতে পারবে না! কথাটা শুনে ওর বাবা অজিত চ‍্যাটার্জী হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন শুধু! তারপর বলেছিলেন, ‘What is your problem?’ সে কোনও উত্তর দেয়নি। ঘাড় গোঁজ করে শুধু দাঁড়িয়ে থেকেছিল! বাবা বার বার প্রশ্ন করতে করতে শেষপর্যন্ত ধৈর্য হারিয়ে এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করেছিলেন! মা এসে না আটকালে হয়তো… কিন্তু তবুও জয়কে রাজি করাতে পারেননি অন্য কোনও স্কুলে যেতে! বাবাকে সে কেমন করে বলত যে অন্য কোনও স্কুলে তো আর জয়িতা থাকবে না! মারতে মারতে ক্লান্ত বাবা হাল ছেড়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় শুধু বলেছিলেন, ‘Then get out of my place!’

মা হয়তো কিছু আঁচ করতে পেরেছিল। কারণ, জয়িতার কথা মা জানত। একবার ওকে বলেওছিল ওদের বাড়িতে জয়িতাকে আনতে। কিন্তু মায়ের তো কোনও ভয়েস ছিল না! বাবার দাপটে এমনিতেই ওর স্বল্পশিক্ষিতা মা সব সময় কুঁকড়েই থাকত!

সে তখন দিনরাত কেমন যেন উদ্ ভ্রান্তের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত! কী এক অস্থিরতা যেন একদণ্ডও কোথাও বসতে দিত না জয়কে সুস্থির হয়ে! মা বলত, ‘বাপি! তুই যেন কেমন হয়ে গেছিস! বাড়িতে থাকলেও কোনও কথা বলিস না! এত কী ভাবিস নিজের মনে? যা হয়েছে সব ভুলে যা! বাবার কাছে ক্ষমা চা! আবার লেখাপড়াটা শুরু কর!’

নাঃ! সে এর কোনওটাই করেনি! কী করে কাউকে বোঝাত ও, যে এক মুহূর্তের মধ্যে ওর সমস্ত পৃথিবীটাই হঠাৎ শূন্য হয়ে গেছে! ফাঁকা! ফাঁকা! একদম ফাঁকা!

“তারপর?”

ব‍্যগ্রভাবে প্রশ্ন করল জয়িতা। জয় একটু হাসল।

— “একটা বছর চলে গেল। আই.সি.এস.ই. পরীক্ষা দিলি তোরা সবাই। শুধু আমি ছাড়া। একবার শেষ চেষ্টা করে দেখার জন্য আমি একদিন হঠাৎ পৌঁছে গেলাম তোর বাড়ি!”
— “আচ্ছা, সেদিন আমাদের বাড়ি থেকে চলে যাবার পরেও কি তুই আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছিলি? আমাদের বাড়ির কাজের লোক রাস্তায় কী একটা কিনতে গিয়ে তোকে দেখতে পেয়েছিল!”
— “কেন ঘুরছিলাম বল তো? যদি তোকে আর একবার দেখতে পাই! যদি তুই এমন কিছু আভাস দিস আমায়, তাহলে হয়তো আমি কোনওরকম চরম সিদ্ধান্ত নেব না! কিন্তু তুই…”

জয়িতার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে এল।

— “এই! কী হল? কাঁদছিস কেন?”
— “বিশ্বাস কর—সেদিন আমি চেয়েছিলাম তোর যাবার সময় বারান্দায় দাঁড়াতে! একবার তোকে বলতে… আবার আসিস… কিন্তু…”
— “জয়িতা! তুই সত্যিই চেয়েছিলিস? তাহলে বললি না কেন? তাহলে তো আমি বুঝতে পারতাম যে তুই অন্তত চাস আমি কলকাতায় থাকি! আবার দেখা করি তোর সঙ্গে! তাহলে হয়তো আমি এভাবে সব ছেড়ে চলে যেতাম না!”
— “পারিনি রে… কারণ মা আমাকে বারান্দায় বেরোতে দেখে বলেছিল, ও তো চলে গেছে। আর বারান্দায় দাঁড়াতে হবে না! যাও! ভেতরে যাও! কী হল?”
— “ও! তাই জন্য তোদের বাড়ির সামনে প্রায় দু’-ঘণ্টা ঘোরাঘুরি করেও তোর দেখা পাইনি সেদিন! বাড়ি ফিরে সেই প্রথম খুব কেঁদেছিলাম, জানিস!”
— “কিন্তু তারপরও তো তুই এসেছিলি আমাদের নাটক দেখতে! পরীক্ষার পর বন্ধুরা মিলে যে ফাংশনটা করেছিলাম তাতে?”
— “সে তো তুই ইনভাইট করেছিলি বলে! তোর বাড়ি যেদিন গিয়েছিলাম সেদিনই তো আমাকে কার্ড দিয়েছিলি! তবে না দেখতে গেলেই বোধহয় ভালো হত সেদিন!”
— “কেন?”
— “মেসোমশাই, মানে তোর বাবা আমাকে নিজে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছিলেন সিটে। প্রথম দিকে তোরা সবাই সোলো পারফরমেন্স করেছিলি নাচ-গান-কবিতার। তোর সোলো কথ্থক ডান্সও দেখেছিলাম।

তারপর শুরু হল নাটক। কিন্তু যখন দেখলাম তুই আর দীপ নাটকের হিরো-হিরোইন, তখন সমস্ত শরীর-মন আমার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল! এই জন্যই কি তুই ইনভাইট করেছিলি আমায়! সেই দীপ—যার জন্য আমার জীবনটা এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে—তারই সঙ্গে কিনা তুই… আমি আর সহ‍্য করতে পারিনি! বেরিয়ে এসেছিলাম হল্ থেকে! একটার পর একটা সিগারেট খাচ্ছিলাম দরজার সামনে দাঁড়িয়ে! হঠাৎ খেয়াল হয়েছিল তোর বাবা আমাকে লক্ষ করছেন! স্টেজে তখন তোদের লাভ সিন চলছিল—সেই মুহূর্ত থেকে আমি তোকে ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম! তারপর থেকে তো পুরো ফিমেল স্পিসিসটাকেই হেট করতাম আমি!”

— “জয়!”
— “সেই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম… আর কলকাতায় থাকব না! তুই তো জানতিস তোকে আমি ভালোবাসি! তা সত্ত্বেও ইচ্ছে করেই তাহলে এই দৃশ্য দেখানোর জন্য আমায় ইনভাইট করেছিলি!”
— “জয়!”
— “ভোররাতে যখন চিরদিনের মতো বাড়ি ছাড়লাম, তখনও এমনি ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল… আমার চোখের জল সেই বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল! হাওড়া স্টেশনে গিয়ে যে ট্রেন সামনে পেলাম তাতে উঠে বসলাম। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম পকেটে পড়ে আছে মাত্র দুটো টাকা!”
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%