চতুর্দশ অধ্যায়

চকিতা চট্টোপাধ্যায়

চায়না টাউনের একটা পুরনো রেঁস্তোরার একটা নির্জন পর্দা ঢাকা কেবিনে বসে আছে ওরা দুই বন্ধু। জয় আর রঞ্জিত। রঞ্জিত সহাস‍্যে নিজের ড্রিংকসের গ্লাসটা জয়ের গ্লাসের সঙ্গে ঠুকে দেয়।

“চিয়ার্স!”

তারপর এক চুমুকে পেগটা শেষ করে।

“তুঝে ইঁয়াদ হ‍্যায়? ম‍্যায়নে তুঝে উসদিন বোলা থা—ইসবার ম‍্যায় ছোড়নেওয়ালা নেহি হুঁ! উয়ো তেরি হোকরই রহেগি!”

জয়ের মুখে এক ঝলক সলজ্জ হাসি ফুটে উঠেই পরক্ষণেই মিলিয়ে যায়। পরিবর্তে সেখানে দেখা দেয় চিন্তা!

“মগর গড়বড় হো গয়া হ‍্যায় ইয়ার! ইসি লিয়েই তো তুঝে ফরেন বুলায়া থা—শুন্—”

ওরা নিচু স্বরে ঘনিষ্ঠভাবে আলোচনা করতে থাকে। রাত গভীর হয়।

ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল জয়িতা। দীপ একটু দূরে খাটে শুয়ে শুয়ে গতকাল রাত্রের পুরো ঘটনাটা ভাবতে ভাবতে অন‍্যমনস্কের মতো সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎই লক্ষ করে জয়িতার হাতে শাঁখা-পলা-নোয়া কিচ্ছু নেই! এমনকি সিঁথিতে সিঁদুর পযর্ন্ত না! প্রথমে ভ্রূ কোঁচকায় দীপ—পরক্ষণেই ওর মুখটা হিংস্র, কঠিন হয়ে যায়! সে ভেবেছিল গতরাতে ও যা যা নিজের চোখে দেখেছে তার সত‍্যাসত‍্য আজ যাচাই করবে জয়িতার কাছে! এখন তো নিজেকে সত্যিই একটা আস্ত গাধা বলে মনে হচ্ছে! নাহলে নিজের বউয়ের এই ব‍্যাভিচারিতা একই বাড়িতে থেকেও ও টের পায়নি এতদিন! দীপের মুখটা ক্রমশ নিষ্ঠুর থেকে নিষ্ঠুরতম হয়ে ওঠে! দীপ আস্তে আস্তে উঠে জয়িতার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। আয়না দিয়ে জয়িতা ওকে দেখতে পেয়েই সচকিত হয়ে ওঠে। দীপ আচমকা এক হ‍্যাঁচকা টানে ওর চুলের মুঠি ধরে ওকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়! যন্ত্রণায় কাতরে ওঠে জয়িতা!

— “আঃ!”
— “সিঁদুর পরিসনি কেন? অ‍্যাঁ?”

জয়িতার বাঁ হাতটা মুচড়ে ধরে প্রশ্ন করে দীপ।

— “শাঁখা-পলা-নোয়া কোথায় তোর?”

জয়িতা দীপের হাত থেকে এক ঝটকায় ওর নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিতে নিতে তীব্রভাবে বলে ওঠে, “যে বিয়েটাই হয়েছিল একটা মিথ‍্যের ওপর দাঁড়িয়ে—আজ যেটা শুধুমাত্র একটা ফার্স ছাড়া আর কিচ্ছু না—সেই বিয়ের চিহ্নগুলো আর বয়ে নিয়ে বেড়াব না বলে ঠিক করেছি!”

জয়িতার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে চেয়ে হিসহিসিয়ে বলে ওঠে দীপ, “এতদূর! অ‍্যাঁ? এতদূর বেড়েছিস তুই! এত দুঃসাহস তোর আসছেটা কোথা থেকে সেটা আমি জানি না ভেবেছিস?”

জয়িতা এবার চমকে ওঠে! কী বলতে চাইছে দীপ? কী জানে ও?

— “ওই বাস্টার্ডটা আবার এতগুলো বছর পর ফিরে এসেছে! কী? তাইতো?”

বুকটা ধড়াস করে ওঠে জয়িতার! ওর মুখে ধরা পড়া ভাব। দীপ এবার বিশ্রীভাবে হাসতে হাসতে বলে ওঠে, “যেমনভাবে একদিন ওর জীবনের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিলাম, ঠিক তেমনভাবেই এবারও ওর জীবনের সাড়ে সর্বনাশ ঘটাব!”

— “না!”

আঁতকে ওঠে জয়িতা! দীপ নিজের হাতের মুঠোয় জয়িতার গালদুটো শক্ত করে ধরে।

— “খুব ইয়ারানা অ‍্যাঁ? পুরনো প্রেম একেবারে উথলে উঠছে! তবে শুনে রাখ—এবার আর ও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না, এমন ভাবেই ধ্বংস করব ওকে! বুঝেছিস?”

উত্তেজনায় হাঁফাতে হাঁফাতে জয়িতা মরিয়া হয়ে চিৎকার করে বলে ওঠে, “তাহলে তুইও শুনে রাখ—সেবার চালাকি করে বাজিটা জিতে গেলেও এই শেষ বাজিটা কিন্তু তুই জিততে পারবি না দীপ!”

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অন‍্যমনস্কের মতো রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল দীপ। জয়িতা মুখে যতই তড়পাক, ও বা জয় কেউই তো জানে না ওদের জন্য কী অপেক্ষা করছে! ম‍্যাডাম ওদের ঠিকই বুঝিয়ে ছাড়বেন পরকীয়া প্রেমের পরিণতিটা! কিন্তু ম‍্যাডাম তো বলেছিলেন যোগাযোগ করবেন ওর সঙ্গে—তাহলে কেন এখনও ওঁর দিক থেকে কোনও সাড়াশব্দ পাচ্ছে না দীপ? জয়িতার মতো মেয়ে, যাকে কিনা ও দাবিয়ে, দমিয়ে, ভয় দেখিয়ে রেখেছিল এতকাল ধরে, সেই মেয়েও আজ ওকে হুমকি দিতে সাহস পাচ্ছে শুধু জয়ের জন্য! আসলে সেদিনের জয় চ‍্যাটার্জীর সঙ্গে আজকের নীল বর্মার তো আকাশপাতাল তফাত আছে! আজ সে একজন অন্ধকার জগতের মানুষ! ওর সঙ্গে টক্কর নিতে গেলে তো তেমন পালটা শক্তিশালী কাউকে দরকার! ওর একার পক্ষে তা তো সম্ভব নয়! ঠিক সেই জন্যই আরও জয়ের থুড়ি নীল বর্মার ওয়াইফের হেল্প তো ওর লাগবেই! না হলে যে নীল বর্মাকে জব্দ করা যাবে না আর সেই সঙ্গে জয়িতাকেও! ওর বউ, ওই ম‍্যাডামও নির্ঘাত অন্ধকার জগতেরই মানুষ! ওঁর হাবভাব আর লোকজনদের দেখে তো অন্তত তাই মনে হয়েছে! মহিলা অসম্ভব প্রতিহিংসা পরায়ণা! এই মহিলাই পারবে ওদের দু’জনকে বরাবরের মতো টিট করতে! কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে হবে! এত বড় স্পর্ধা ওই জয় চ‍্যাটার্জীর! এত বছর পর কবর থেকে উঠে এসে ওর বউকে ভড়কানোর চেষ্টা করছে! না না ওকে কিছুতেই ছাড়া যাবে না! মজা ওকে টের পাওয়াতেই হবে! কিন্তু ম‍্যাডামের সঙ্গে যোগাযোগ না হলে তো—

আচমকা দীপের সামনে এসে একটা কালো মার্সিডিস ব্রেক কষল। দীপ ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল দু’-পা। গাড়ি থেকে নেমে এলো একজন লোক। সে সটান দীপের দিকে এগিয়ে এসে বলল, “আসুন স‍্যার! বস্ আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।”

সেদিন যেহেতু দীপ ম‍্যাডামের লোকজনদের কারওরই মুখ দেখতে পায়নি, তাই আন্দাজে বুঝল একে ম‍্যাডামই পাঠিয়েছে। আর এদের জগতে তো নারী-পুরুষ সবাই বস্! দীপের মুখে এতক্ষণে হাসি ফোটে। যাক বাবা! এবার নিশ্চিন্ত। সে অত‍্যুৎসাহী হয়ে ওঠে মনে মনে।

— “আমি আপনাদের কথাই ভাবছিলাম! আমিও খুবই ইগার ওঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য! চলুন—”

গাড়ির দরজা খুলে ধরে লোকটি। দীপ সোৎসাহে গাড়িতে উঠে পড়ে। লোকটি উঠে দরজা বন্ধ করে দেয়। গাড়ি তৎক্ষণাৎ চলতে শুরু করে। দীপ তাকিয়ে দেখে ঠিক সেদিনের মতোই ওর সামনে-পেছনে আর দু’পাশে লোকজন ঘিরে রয়েছে ওকে। তবে আজ আর দীপের ভয় করে না। ও তো এখন ওদের বসের খাস লোক হয়ে গেছে!

গাড়িটা লোকালয় ছাড়িয়ে হাইওয়ে ধরে ডায়মন্ডহারবারে চলে আসে। দূরে গঙ্গা দেখতে পায় দীপ। একটা নির্জন পাড়ে এসে দাঁড়ায় গাড়িটা। দীপ সতর্ক দৃষ্টি বোলায় চারিদিকে—কোনও মানুষ দেখতে পায় না ও! গাড়িতে কালো কাচ তোলা। তাই বাইরেটা খুব স্পষ্ট নয়।

— “এখানে?”
— “হ‍্যাঁ বস্ তো খুব ব‍্যস্ত, তাই ফোনেই কথা বলতে চান প্রথমে আপনার সঙ্গে। তারপর অবস্থা বুঝে—”
— “ও! আচ্ছা।”

যে লোকটি ওকে গাড়িতে তুলেছিল সে ফোন করে মোবাইলে।

— “উনি গাড়িতে বসে আছেন আমাদের সঙ্গে।”

লোকটি এবার মোবাইলটা বাড়িয়ে ধরে দীপের দিকে।

— “বস্ কথা বলবেন আপনার সঙ্গে।”

দীপ সহাস‍্যে হাত বাড়ায়।

— ‘হ‍্যালো ম‍্যাডাম! আপনার প্ল‍্যান কতোদূর? আমি তো আমার বউকে চার্জ করেছিলাম—আমার চোখে ধুলো দিয়ে ও আপনার স্বামীর সঙ্গে কেন এসব নষ্টামি করে বেড়াচ্ছে! সে জন‍্য ওকে আচ্ছা করে শাসনও করে দিয়েছি ম‍্যাডাম! তবে কী জানেন তো—জয়িতাও উলটে আমাকে শাসিয়েছে! জয় থুড়ি নীল বর্মা তো এখন একজন পাওয়ারফুল পার্সেন আমি ওর সঙ্গে একা লড়তে গেলে তো সেটা রিস্ক হয়ে যাবে—মানে যদি আমাকে অ‍্যাটাক করে—একমাত্র আপনিই তো ভরসা ম‍্যাডাম! তবে আমি সবরকম সাহায্য করতে রেডি!’

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দীপ থামতেই মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এল একটি পুরুষকণ্ঠ!

— ‘মিঃ দীপ সরকার! আপনাকে শুধু একটা কামই করতে হোবে—’
— ‘এ কী! আপনি কে? ম‍্যাডাম কোথায়?’
— ‘এত কথা আপনার না জানলেও হোবে! আপনি শুধু যে কামটা বলছি সেটা করে দিন ব‍্যস্! আপনার ছুট্টি!’
— ‘কাজ? কী কাজ?’
— ‘জ‍্যায়দা কুছ নেহি! আপনাকে সির্ফ খুশি খুশি আপনি বিবি কো তালাক দেনা পড়েগা!’
— ‘কী!’

চমকে ওঠে দীপ।

— ‘তালাক? মানে ডি-ডিভোর্স? না কক্ষনও না! কেন আমি ডিভোর্স দিতে যাব আমার বউকে! কে আপনি? ম‍্যাডামকে ফোনটা দিন তো! আমি ওঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলব!’
— ‘রেগে যাচ্ছেন কেন? দীপবাবু? তালাক দিবেন না তো দিবেন না! কেউ তো আপনাকে জোর করছে না!’
— ‘মানে? আপনার কথা আমি কিছু বুঝতে পারছি না!’
— ‘আপনি আপনার ওয়াইফকে তালাক দিবেন না এইটাই কি আপনার ফাইনাল ডিসিশন আছে?’
— ‘অবশ‍্যই! এটাই আমার ফাইনাল ডিসিশন!’
— ‘ভেরি গুড! কোই বাত্ নেহি! আপনি এখন শুধু জোর জোরসে নিজে মুখে এই কথাগুলো বলুন—’
— ‘মানে?’
— ‘মানে—হামি হামার বউকে ডিভোর্স দেব না! এই কথাগুলো যেই আপনি বলবেন আপনা মুহ সে—ব‍্যস্! সাথ সাথ হি হামারা জো আদমি আপকে আগে পিছে বৈঠে হুয়ে হ‍্যায়, উয়ো সব মিলকর আপকে উপর গোলি চালা দেংগে অউর আপকে লাশকো গঙ্গা মে ফেঁক দেঙ্গে! কিঁউকি উসকে উপর অ‍্যায়সাহি ইন্সট্রাকশন হ‍্যায়! ব‍্যস্! আপকা খেল খতম্! আপ সমঝদার আদমি হ‍্যায়—সমঝ গয়ে না আপ?’

দীপের গলা শুকিয়ে যায়! সে আড়চোখে চেয়ে দেখে ওকে ঘিরে ছ’জন লোক! চারপাশেও জনমনুষ‍্য নেই! একটু দূরেই গঙ্গা! ফোনের অপর প্রান্ত থেকে আবার ভেসে আসে সেই পুরুষকণ্ঠ।

— ‘কেয়া হুয়া দীপ সাব? বোলিয়ে বোলিয়ে জোর জোর সে বোলিয়ে! চুপ কিঁউ হো গয়ে আপ? ফয়েসলা তো আপ হি কি হাথোঁ মে হ‍্যায়!”

এবার হাসতে শুরু করে লোকটা! দীপ আরেকবার তাকায় ওর চারপাশের লোকগুলোর দিকে—আর তাকিয়েই ভীষণভাবে চমকে ওঠে! ওদের প্রত‍্যেকের হাতেই চেম্বার আর সেগুলো প্রত‍্যেকটাই ওরই দিকে তাক করা! গলার কাছে প্রাণ উঠে এল দীপ সরকারের! সে চোখ বন্ধ করে ফেলল! ওর শুকিয়ে আসা গলা দিয়ে এবার বেরিয়ে এল কয়েকটা শব্দ—

— ‘আ-আমি আমার বউকে ডিভোর্স দেব!’

পুরুষকণ্ঠ বলে ওঠে, ‘কেয়া? কেয়া বোলা আপনে? ম‍্যায়নে ঠিক সে শুনা নেহি! অউর এক্ বার জোরসে বোলিয়ে—’

— ‘আমি আমার বউকে ডিভোর্স দেব!’
— ‘গুড্ বয়! যান—বেঁচে গেলেন! এবার সইটা করে দিন তো পেপার্স সব রেডি আছে!’

দীপ দেখল গাড়িতে বসা লোকগুলো নিজেদের রিভলবারগুলো পকেটে পুরে ফেলেছে, বদলে ওর দিকে বাড়িয়ে ধরেছে কোর্টের পেপার!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%