ত্রয়োদশ অধ্যায়

চকিতা চট্টোপাধ্যায়

রঞ্জিতকে আজ খুব দরকার জয়ের। তার অন্ধকার জীবনের পথ চলার একদা সঙ্গী রঞ্জিত দেশ ছেড়ে বহুদিন বিদেশে। একবার একটা কেসে ফেঁসে ওকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। কিন্তু তারপর সেখানেই ও গড়ে তুলেছিল ওর নতুন সাম্রাজ্য! সেখানে ও একজন ছোটখাটো ডন! তবে জয়ের সঙ্গে ওর বন্ধুত্বে কখনও চির ধরেনি। যখনই সুযোগ পেয়েছে ও নিজেই যোগাযোগ করেছে। তবে অনেকবার বলা সত্ত্বেও স‍্যারজির দল ছেড়ে জয় রঞ্জিতের কাছে বিদেশে চলে যেতে পারেনি। তার একটা কারণ, অসময়ে স‍্যারজিই ছিলেন ওর অন্নদাতা। তাই বেইমানি করার কথা ও ভাবতে পারেনি স‍্যারজির সঙ্গে। আর একটা কারণ অবশ্য ছিল—ও দেশ ছেড়ে চলে গেলে যে জয়িতাকে খুঁজে পাবার এক পার্সেন্ট চান্সটুকুও শেষ হয়ে যেত চিরকালের মতো! তাই ও রঞ্জিতের ডাকে সাড়া দিতে পারেনি! তবে এজন্য রঞ্জিতের সঙ্গে বন্ধুত্ব ওর নষ্ট হয়নি। কারণ রঞ্জিত নিজেও চেয়েছে বরাবর যাতে জয়িতার সঙ্গে জয়ের আবার দেখা হয়! তাই জন্যই জয় মনে মনে জানে রঞ্জিত যখন কথা দিয়েছে যে ও আসবে কলকাতায় তখন ও আসবেই!

নিজের অ‍্যাপার্টমেন্টে বসে স্কচে চুমুক দিয়ে টেনশান কাটানোর ব‍্যর্থ চেষ্টা করতে থাকে জয়। জয়িতাকে সে টেনে আনতে চাইছে ঠিকই তার জীবনে কারণ এটাই তার আজীবনের একমাত্র চাওয়া! কিন্তু এর ফলে জয়িতাকে বিপদের মধ্যে এনে ফেলা হবে না তো? স‍্যারজি কি এত সহজে ছেড়ে দেবেন ওকে? আর এ কথা তো কারওরই অজ্ঞাত নয় যে এই অন্ধকার জীবনে একবার প্রবেশ করলে আলোয় ফেরা কতখানি কঠিন! মূল স্রোতে কি তার আদৌ ফেরা সম্ভব? আর দেবী? দেবী কি এত সহজে মেনে নিতে পারবে পুরোটা? ও যেরকম হিংস্র! যদি জয়িতার কোনও ক্ষতি ও করে দেয়? নাঃ! ওর একার পক্ষে এর সমাধান করা অসম্ভব! রঞ্জিত—এই মুহূর্তে ওর রঞ্জিতকে চাই! রঞ্জিত তো বলেছিল কলকাতা পৌঁছে ফোন করবে ওকে—কিন্তু এখনও কেন করছে না ফোন! ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে থাকে জয়! এমন উভয় সংকটে জীবনে কখনও পড়েনি ও! নেশা হচ্ছে না একটুও! তবুও গ্লাস তুলে আবারও চুমুক দিতে যেতেই সামনে রাখা মোবাইলটা এবার বেজে উঠল! ওই তো! রঞ্জিত এসে গেছে তাহলে আর কোনও চিন্তা নেই!

তাড়াহুড়ো করে মোবাইল স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়েই ফোনটা ধরে ফেলে জয়!

— ‘হ‍্যালো! রন্জ—’
— ‘কেয়া কর রহা হ‍্যায় রে তু?’

সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলো এক ঝটকায় সজাগ হয়ে গেল জয়ের! রঞ্জিত তো নয়! ফোনের অন্য প্রান্তে আছেন স‍্যারজি!

— ‘স‍্যারজি!’
— ‘কিঁউরে? মত্ লব কেয়া হ‍্যায় তেরা?’
— ‘ম‍্যা-ম‍্যায় কুছ সমঝা নেহি স‍্যারজি!’
— ‘আনাব-শানাব কোই চক্কর তো নেহি চল্ রহা হ‍্যায় তেরি দিমাগ মে?’
— ‘ম-মত্ লব?’
— ‘শুনা হ‍্যায় আজকাল কলকাত্তে মে বহুত আশিকি মানা রাহা হ‍্যায় তু? আঁ?’

জয়ের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল!

— ‘শুন্—তেরে ওয়াইফ নে মেরে পাস কমপ্লেন কিয়া হ‍্যায় তেরে বারে মে—’

জ্বলে ওঠে জয়ের চোখদুটো! তবু সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে।

— ‘কাঁহি ভাগ যানে কা মত্ লব তো হ‍্যায় নেহি তেরে কো?’
— ‘অগর চাঁহু ভি, ফির ভি তো ম‍্যায় ভাগ নেহি সকতা—ইয়ে তো আপ কো ভি মালুম হ‍্যায় না স‍্যারজি?’
— ‘হাঁ—ইয়ে হুই না অকলমন্দি কি বাতেঁ! ইয়ে বাৎ ধেয়ান মে রাখনা হামেশা—নীল বর্মা! কভি ভুল না মাত্! নেহি তো মিট যাওগে ইয়ে দুনিয়া সে! সমঝা?’

ফোন কেটে দেয় স‍্যারজি। তার মানে জয়ের সংশয়টা মিথ্যে নয়! দেবী ওর পেছনে স্পাই লাগিয়ে রেখেছে! সারা জীবন ধরে সে যাকে খুঁজেছে, তাকে পেয়ে গেছে শেষপর্যন্ত এই খবরটা জানতে পেরেই তাহলে মনে মনে ইনসিকিয়োর্ড হয়েই স‍্যারজির দ্বারস্থ হয়েছে দেবযানী! রাগে, ক্ষোভে থরথর করে কাঁপতে থাকে জয় চ‍্যাটার্জী ওরফে নীল বর্মা!

রাত বেশ অনেকটা গড়িয়ে গেছে। শুভাঞ্জনের দেওয়া পার্টিটা আজ সত্যিই দারুণ জমেছিল! মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে দীপের। নাঃ! কথায় বলে না, যে খায় চিনি, তাকে জোগান চিন্তামণি! জয়িতার মতো সোনার ডিম পাড়া হাঁস থুড়ি মুরগি পেয়েছিল বলেই না ওর জীবনটা দিব‍্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে কেটে গেল! আজ জয়িতার বাপের বাড়ির টাকাতেই তো ওর এত মৌজ-মস্তি! এই রকম ‘হ‍্যাপি গো লাকি’ জীবনযাপন! সেদিনের সেই জব্বর প্ল‍্যানটা কষার জন্য নিজেকেই নিজে তারিফ না করে পারল না দীপ! অবশ‍্য সে একা নয়, প্ল‍্যানটা চক-আউট করার জন্য ফ্লেকা আর মিঃ ও’ব্রায়েনও ইনপুটস দিয়েছিল! নইলে আর একটু হলেই তো ওই নিরেট বোকাচন্দর জয় চ‍্যাটার্জীর হতে বসেছিল জয়িতা! কেমন সেদিন এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছিল ওরা! আঃ! সেই পাখির মাংস তো আজও দিব‍্যি র‍্যালিশ করে চিবিয়ে চলেছে! কারণ পাখিটাই তো তার হাতের মুঠোর মধ্যে তার খাঁচায় বরাবরের মতো বন্দি! মদিরার মৌতাতে নিজেরই পিঠ চাপড়াতে ইচ্ছে করল দীপের। এখন কোথায় আছে সেই হতচ্ছাড়াটা কে জানে! বেঁচে আছে না মরে গেছে! তখন তো দেবদাসের মতো দেশ ছেড়ে বিবাগী হয়ে গিয়েছিল শালা! শুনেছিল নাকি অ‍্যান্টিসোশ্যালদের দলে ভিড়ে গিয়েছিল! এছাড়া আর করবেটাই বা কী? লেখাপড়াটাও তো শেষ করতে পারেনি! মনে মনে জয় চ‍্যাটার্জীর উদ্দেশে চার অক্ষরের খিস্তি দিতে দিতে অন্ধকার নির্জন রাস্তা দিয়ে টলমল পায়ে এগিয়ে যেতে যেতে জোরে জোরে হাসতে থাকে দীপ সরকার। হঠাৎ পেছন থেকে কয়েক জোড়া পায়ের শব্দ শোনা যায়। প্রথমটা খেয়াল করে না দীপ। তারপর হঠাৎ খেয়াল হতেই ওর হাসি থেমে যায়। দেখে ওর পাশাপাশি আস্তে আস্তে একজন-দু’জন-তিনজন–চারজন লোকও হাঁটছে! আরে! এই লোকগুলো কোথা থেকে এল! নেশাগ্রস্ত চোখ মেলে দীপ দেখল ওর ডানপাশ, বাঁ পাশ, সামনে এমনকি পেছনেও দু’জন করে লোক হাঁটছে ওর সঙ্গে সঙ্গে! ওদের প্রত‍্যেকেরই গায়ে কালো রঙের হুটার! হুটারের ক‍্যাপ মুখের অর্ধেক ঢেকে রেখেছে! এবার মনে মনে ভয় পেয়ে যায় দীপ! কারা এরা? কী চায়? আড়চোখে চেয়ে দীপ দেখে ওর সঙ্গে ওদের দূরত্বটা ক্রমশ কমে আসছে! হাঁটতে হাঁটতে দীপ হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে লোকগুলোও দাঁড়িয়ে পড়ে ওকে ঘিরে ধরে! ধড়াস করে ওঠে দীপের বুকটা! তার সন্দেহই তাহলে ঠিক! মরিয়া হয়ে এবার দীপ চেঁচিয়ে ওঠে!

— “কে আপনারা? কী চান?”
— “বেশি কিছু নয়—শুধু চাই আপনি আমাদের কথা মতো চলুন—”

ওদের মধ্যে থেকে বলে উঠল একজন। দীপ ওর আঙুলের সোনার আংটিদুটো খুলতে খুলতে বলে, “আমার কাছে যা আছে নিন—”

আংটি দুটো বাড়িয়ে ধরে দীপ।

— “না।”
— “না? ও হ‍্যাঁ আর এই হাতঘড়িটা আছে—দাঁড়ান খুলে দিচ্ছি—”
— “আঃ! বলছি তো! ওসব কিছু লাগবে না! শুধু চুপচাপ চলুন আমাদের সঙ্গে যেখানে নিয়ে যাব!”
— “মানে? কোথায়? কেন?”

দীপের কোনও প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে ওরা ওকে প্রায় ঠেলে তুলে ফেলল কাছেই পার্ক করে রাখা একটা কালো গাড়িতে! ওর সামনের সীট, পেছনের সীট আর দু’পাশে বসল ওরা। ভয়ে দীপের তখন গলার কাছে প্রাণ! কারা ওরা? টাকা পয়সা কিছু চায় না— কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওকে! জানালা দিয়ে তাকিয়ে দীপ দেখতে পায় গাড়িটা হাইওয়ে দিয়ে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলেছে!

একটা আলোআঁধারি ঘর। দীপকে নিয়ে সেখানে ঢুকে একটা চেয়ারে বসায় ওরা। একজন বলে ওঠে, “চালা!” ভয় পেয়ে যায় দীপ। কী চালানোর কথা বলছে ওরা? গুলি! কিন্তু ওকে মেরে ওদের কী লাভ? ও তো ওদের চেনেই না! ভয়ে দীপ চোখ বন্ধ করে ফেলে! চোখ বন্ধ করা অবস্থাতেই ওদের একজনের গলা শুনতে পায় দীপ, “কী হল? চোখ বন্ধ করলেন কেন? চোখ খুলুন—না হলে দেখবেন কী করে?”

— “না না! আমি দেখতে চাই না! দেখতে পারব না!”
— “পারব না বললে তো হবে না স‍্যার! চোখ যে আপনাকে খুলতেই হবে! না হলে দেখবেন কী করে?”
— “কী? কী দেখার কথা বলছেন?”
— “সিনেমা!”

হতভম্ব দীপ চমকে উঠে চোখ খোলে! বিস্মিত ভাবে প্রশ্ন করে, “সিনেমা? মানে?”

আর একজন এবার বলে ওঠে, “চালালেই বুঝতে পারবেন! এই তো চালাচ্ছি—দেখুন দেখুন—ভালো করে দেখুন—”

দীপ সামনে তাকিয়ে দেখে আলোআঁধারি ঘরে ওর ঠিক সামনে একটা স্ক্রিন স্ট‍্যান্ড। একটা লোক তার সামনে বসে অপারেট করছে। এদের মতলবটা কী? এভাবে জোর করে ধরে এনে কেন ওকে সিনেমা দেখাচ্ছে! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে অন‍্যমনস্কের মতো সামনে রাখা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই চমকে ওঠে দীপ! স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের স্টিল স্লাইড। পরক্ষণেই পালটে গেল স্লাইডটা। এবার ও দেখল ভিক্টোরিয়ার বেঞ্চে বসে আছে একজন নারী আর একজন পুরুষ। কিন্তু—এ কী! এ তো জয়িতা! ছিটকে চেয়ারে সোজা হয়ে বসে দীপ! কার সঙ্গে বসে আছে ও? পুরুষটির ফটোর দিকে তাকায় দীপ। এ কাকে দেখছে ও! এত বছর পরেও জয় চ‍্যাটার্জীকে চিনতে ভুল হয় না দীপের! ততক্ষণে আবার স্ক্রিনে পালটে গেছে ফটো স্লাইড। এবার দেখা যাচ্ছে গঙ্গার ঘাটে নৌকায় উঠছে ওরা দু’জন হাত ধরাধরি করে! পরপর স্লাইড ভেসে উঠতে থাকে স্ক্রিন জুড়ে—রাস্তা দিয়ে পাশাপাশি ঘনিষ্ঠ ভাবে হাঁটছে ওরা হাসতে হাসতে—ট‍্যাক্সির ভেতর পাশাপাশি বসে আছে কাছাকাছি—রেস্টুরেন্টে বসে খাচ্ছে একসঙ্গে! দেখতে দেখতে বিস্ময়ে কিংকর্তব‍্যবিমূঢ় দীপ সরকার এবার চিৎকার করে ওঠে!

“না! এ হতে পারে না! এ অসম্ভব!”

স্ক্রিনটা ব্ল‍্যাঙ্ক হয়ে যায়। স্ক্রিনের সামনে স‍িল‍্যুটে এসে দাঁড়ায় এক নারীমূর্তি! চমকে তাকায় দীপ!

“কে? কে আপনি? এসবের মানে কি?”

এবার দীপের সামনে রাখা আরেকটি চেয়ারে এসে বসে সেই নারীমূর্তি। আলোআঁধারিতে তার মুখ স্পষ্ট দেখতে পায় না দীপ। তবে তার তীক্ষ্ণ কণ্ঠ ভেসে আসে—“আপনার স্ত্রী একজন ব‍্যাভিচারিণী মিঃ সরকার! সে ব‍্যাভিচারে লিপ্ত আমার স্বামীর সঙ্গে!”

চমকে ওঠে দীপ!

— “কী বললেন? জয় চ‍্যাটার্জী আপনার স্বামী?”
— “না! জয় চ‍্যাটার্জী আমার স্বামী না! আমার স্বামীর নাম নীল বর্মা!”
— “নীল বর্মা? কিন্তু আমার তো মনে হল ও—”
— “ঠিকই মনে হয়েছে।”
— “আপনার কথা আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না!”
— “একসময় ওর নাম জয় চ‍্যাটার্জীই ছিল। কিন্তু এখন নীল বর্মা নামেই সবাই চেনে!”
— “আমি শুনেছিলাম ও অন্ধকার জগতে—”
— “আঃ! বাজে কৌতূহল থামান মিঃ সরকার!”

দীপকে মাঝপথে থামিয়ে দেয় সেই রহস্যময়ী নারী।

— “এখন আপনি ঠিক করুন আপনার স্ত্রী’র এই ব‍্যাভিচার কি মেনে নেবেন নাকি এর প্রতিশোধ তুলবেন?”
— “প্রতিশোধ?”
— “হ‍্যাঁ প্রতিশোধ! কীভাবে?”

দীপ সংশয়পূর্ণ চোখে দেখে, সেই নারীমূর্তি ওর দিকে নিজের ডানহাতটা বাড়িয়ে ধরেছেন — “আমার সঙ্গে হাত মিলিয়ে!”

দীপ বিমূঢ়ের মতো চেয়ে থাকে!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%