চকিতা চট্টোপাধ্যায়

আলো-আঁধারি একটা পুরনো হাভেলির উঁচু উঁচু সিঁড়ি পেরিয়ে একটা ঘরে এসে হাজির হল তিন জোড়া পা। তার মধ্যে মাঝের পা জোড়া একজন নারীর। ঘরের ভেতর দিকে আরেকটা ঘর দেখা যাচ্ছে। তবে সে ঘরের পর্দাটা ফেলা। পায়ের শব্দগুলো এসে থামতেই পর্দার ওপাশ থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—
“অন্দর আও!”
তিন জোড়া পা পর্দা সরিয়ে ভেতরের ঘরে প্রবেশ করল। এবার দেখা গেল রিভলভিং চেয়ারে বসে আছেন স্যারজি! স্যারজি তাকালেন ওদের দিকে। দু’পাশে তাঁর দু’জন খাস আদমি যাকে এসকর্ট করে নিয়ে এসেছে তাঁর সামনে, সে হল দেবী! স্যারজি এবার নিজের বাঁ হাতের ইশারায় লোক দু’জনকে চলে যেতে বললেন। হুকুম পাওয়া মাত্র দু’পাশ থেকে দু’জন বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। এখন ঘরে শুধু মুখোমুখি স্যারজি আর দেবী।
চেয়ারে এতক্ষণ এলিয়ে বসে থাকা স্যারজি এই কথায় এবার ছিটকে সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর চোয়াল শক্ত।
স্যারজির মুখ থেকে কয়েক সেকেন্ড আগের টেনশানটা এবার মুছে গেল। তাচ্ছিল্য ভরে হেসে উঠলেন স্যারজি।
দেবী ভেতরে ভেতরে বিপন্ন বোধ করে! স্যারজি বেল বাজানো মাত্র সেই লোক দুটি আবার ঘরে প্রবেশ করে। দেবী বাধ্য হয় ওদের সঙ্গে বেরিয়ে আসতে।
চলন্ত গাড়ির ভেতর চিন্তিত মুখে বসে আছে দেবী। সে ফিরতে আজ বাধ্য হচ্ছে স্যারজির কাছ থেকে, কারণ স্যারজি ওর কথাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ! কিন্তু সে মনে মনে ঠিকই বুঝতে পারছে যে কোথাও একটা গণ্ডগোল শুরু হয়ে গেছে! যেতে যেতে নিজের মনেই বলে ওঠে দেবযানী, ‘না না! স্যারজির মতো এত ক্যাসুয়ালি আমি কিছুতেই নিতে পারছি না ব্যাপারটা! আমাকেই এবার কিছু একটা করতে হবে! নীলকে আমি এত সহজে কিছুতেই ছেড়ে দিতে পারব না! স্যারজি হয়তো এটাকে নিছকই মহিলা নিয়ে ফূর্তি করার অ্যাঙ্গেলে দেখতে পারেন, কিন্তু আমি তো জানি, নীলের জীবনে ওর প্রাক্তন প্রেমিকার স্থানটা ঠিক কতখানি! যদি সত্যিই ওকে খুঁজে পেয়ে থাকে নীল, তাহলে কিছুতেই ওকে ও ছাড়তে পারবে না! যদি তাই হয় কী করবে তখন আমি? কী করা উচিত হবে আমার?’ অস্থির হয়ে ওঠে ভেতরে ভেতরে দেবযানী!
“কোথায় গিয়েছিলি বল—”
প্রশ্নটার সঙ্গে সঙ্গে জয়িতার গালে একটা থাপ্পড় এসে পড়ল! ঘুরে পড়ে গেল জয়িতা একটু দূরে রাখা সোফাটার ওপর।
“খুব পা হয়েছে তাই না? যখন খুশি বেরিয়ে চলে যাচ্ছিস! আমার পারমিশন নেবার প্রয়োজনটুকুও মনে পড়ছে না, না?”
জয়িতা আস্তে আস্তে এবার নিজেকে সামলে নিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। ওর চোখে আজ আর জল নেই। তার বদলে রয়েছে আগুন! দীপ ওর মুখের এই নতুন ভাব লক্ষ করে এগিয়ে আসে কয়েক পা। — “এই! অমন বড় বড় চোখ করে দেখছিস কাকে? অ্যাঁ? উত্তরটা দে—কোথায় ছিলি এতক্ষণ?”
জয়িতা এতক্ষণে দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে, “কৈফিয়ত দিতে আমি বাধ্য নই!”
“আলবাত বাধ্য! আমি তোর হাজব্যান্ড এটা ভুলে যাস না! আমাকে কৈফিয়ত দিবি না তো কাকে দিবি? অ্যাঁ?”
বিশ্রীভাবে হাসতে হাসতে আরও কয়েক পা এগিয়ে আসে দীপ। কিন্তু এবার জয়িতা রুখে দাঁড়ায়!
দীপ মারবার জন্য ওর দিকে হাত তুলতেই সেন্টার টেবিলের ওপর থেকে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে কাচের অ্যাশ-ট্রেটা হাতে তুলে নেয় জয়িতা। দীপ জয়িতার এই রণচন্ডী মূর্তি দেখে থতমত খেয়ে কয়েক পা পিছিয়ে যায়!
জয়িতার জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে গুটিয়ে গেল দীপ! বিস্মিত দীপের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকল—হঠাৎ কী এমন ঘটল যে এতখানি পরিবর্তন হয়ে গেল জয়িতার!
দুবাইয়ের একটা হাইরাইজড বিল্ডিংয়ের একদম টপ ফ্লোরে মিটিং চলছে। অন্ধকার জগতের একজন ডন তার খাস আদমিদের সঙ্গে সারছে সেই মিটিং। ঠিক সেই সময় ডনের প্রাইভেট নাম্বারে একটা মেসেজ ঢুকল। ‘Call me urgent.’ এক মুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে গেল সেই ডন। যে নাম্বারটা থেকে বার্তাটা এসেছে, সেই নাম্বারটা যার, সে তার জীবনের হাতেগোনা কাছের মানুষদের একজন! পেছনে ফেলে আসা তার জীবনের একটা অধ্যায়ের সঙ্গে যে একদিন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল!
মিটিং সারার পর নিজস্ব চেম্বারে বসে একান্তে ডন ফোন করল তাকে। ওপার থেকে ভেসে এল উদ্বিগ্ন চেনা কণ্ঠ!
আজ আর নিজেকে সংযত রাখতে পারে না জয়িতা, সে ভেঙে পড়ে! দীপ যে কিছু একটা আন্দাজ করছে সেটা ও আজ জানায় জয়কে। শুনে জয় বলে, “তুই দীপকে ডিভোর্স কর জয়িতা! তোকে তো বললাম আগের দিন! আমার জীবনে আয় জয়িতা! প্লিজ!”
চুপ করে যায় জয়। আসল সত্যিটা কি এবার তাহলে বলতেই হবে জয়িতাকে! নইলে যে জয়িতা কিছুতেই বুঝতে পারবে না! আর তাহলে আবারও সব কিছু ওলোট-পালোট হয়ে যাবে!
এক মুহূর্ত থমকায় জয়িতা। জয় বলে চলে।
জয়িতার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে ওর চোখে চোখ রেখে কথাগুলো বলে জয়। জয়িতার মুখ বলে দেয় যে সে মনে মনে ঠিক কতখানি দ্বৈরথে ভুগছে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন