ষষ্ঠ অধ্যায়

চকিতা চট্টোপাধ্যায়

দূর থেকে বিল্ডিংটার নামটা চোখে পড়তেই বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল! ব‍্যাম্বু ভিলা! কত যুগ পরে দেখল! সেদিনের সেই জ্বলজ্বলে স্মৃতিটা চোখের সামনে হঠাৎই যেন ভেসে উঠল! মনে হয় যেন এই তো সেদিনের কথা! জয় যেন জয়িতার শরীরের গন্ধ পেল হঠাৎ! সেদিন যদি ব‍্যাম্বু ভিলাতেই ওকে কথাটা বলে দিত ও তাহলে হয়তো সব কিছু এমন ওলোট-পালোট হয়ে যেত না! সেই বিশ্রী ঘটনাটা তো তখনও ঘটেইনি! ফ্লেকাকে কেন্দ্র করে দূরত্বও তৈরি হয়নি তার আর জয়িতার মধ্যে! হঠাৎ পেছনে কাদের হাসির শব্দ পেয়ে চমকে তাকাল সে! আরে! তাদেরই স্কুল ইউনিফর্ম পরা দুটো ছেলেমেয়ে! দেখে তো মনে হচ্ছে ক্লাস নাইন-টেনেরই। ওরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতে করতে পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে ফুটপাত ধরে। পরস্পরের শরীর হাঁটার গতিতে ছুঁয়ে যাচ্ছে একে অপরকে! আচ্ছা, আজ কি ওরাও যাচ্ছে ব‍্যাম্বু ভিলার সেই ন’তলার ওপরের রেস্টুরেন্টে? বলতে চাইছে পরস্পরকে তাদের মনের কথাগুলো? শেষপর্যন্ত যেন ওরা বলতে পারে! মনে মনে এই প্রার্থনাই জানাল জয়! তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও এগিয়ে গেল রাস্তা ক্রস করার জন্য।

‘বাপি! চিনে রাখো—এই হল কলকাতার গোলবাড়ি। এর বিখ্যাত কষা মাংস একবার খেলে আর কোনওদিনও ভুলতে পারবি না! উত্তর কলকাতার ছেলে হয়ে যদি গোলবাড়ি না চিনিস, তাহলে কিন্তু লোকে হাসবে!’

বাবার বলা সেই কথাগুলো যেন হঠাৎ কানে বেজে উঠল জয়ের! ও এখন দাঁড়িয়ে আছে শ‍্যামবাজারের পাঁচমাথার মোড়ে নেতাজির স্ট‍্যাচুর সামনে! বাবার কথাগুলো মনে পড়তেই নিজের মনেই হেসে ফেলল জয়! হঠাৎই যেন জিভে স্বাদ পেল সেই কষা মাংসের, আজ কত বছর বাদে! মনে মনে বাবাকে বলল, ‘বাবা ছেলেবেলায় যখন তোমার আর মায়ের সঙ্গে হাতিবাগানে সিনেমা দেখে কিংবা কেনাকাটা সেরে ফেরার সময় এখানে খেতাম, তখন কি একবারও ভাবতে পেরেছিলাম বলো যে জীবনে কোনওদিন তোমাদের ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হবে একা… বরাবরের মতো!’

হাঁটতে হাঁটতে মোড়ের মাথা ছেড়ে কিছুটা সরে এল জয়। এই উত্তর কলকাতাতেই তার জন্ম, তার বেড়ে ওঠা। তাদের পরিবারে কেউ কোনওদিন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েনি। কিন্তু, বাবা-মা দু’জনেরই খুব ইচ্ছে ছিল তাঁদের একমাত্র ছেলেকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ানোর। শেষপর্যন্ত অবশ‍্য অন‍্যান‍্য আত্মীয়স্বজনের কাছে তাঁদের এই নিয়ে কথা শুনতে হয়েছিল!

‘এসব হল ওই ট‍্যাঁশ স্কুলে পড়ানোর ফল! এমনটাই তো উশৃঙ্খলতা শিখবে সেখানে! মদ-গাঁজা-সিগারেট-মেয়েমানুষ! ছিঃ! ছিঃ! ও যে আমাদের রিলেটিভ এ-কথা ভাবতেও লজ্জায় আমাদের মাথা কাটা যাচ্ছে!’

বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল জয়ের! হঠাৎ কানে এল একটা ঘণ্টার ধ্বনি। চমকে তাকিয়ে দেখল পাঁচমাথার মোড় ছাড়িয়ে ও কখন যেন রাস্তার ধারে গড়ে ওঠা একটা শিবমন্দিরের সামনে চলে এসেছে। কয়েকজন মহিলা শিবের মাথায় জল ঢালছে। আজ কী বার? সোমবার কি? সোমবার তো শিবের বার। একসময় কী ভীষণ শিবভক্ত ছিল সে-ও! শিবের মাথায় জল ঢালবে বলে বাঁক নিয়ে একবার গিয়েওছিল তারকেশ্বরে। পাড়ার ছেলেরা তো প্রথমে অবাক হয়ে গিয়েছিল ও যেতে চায় শুনে! বলেছিল, ‘তুই আমাদের সঙ্গে যাবি বাপি? তুই না ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছেলে? কাকুর তো খুব ফাঁট ছেলে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে বলে! কথায় কথায় তো খুব নাজ নিয়ে বলে সে’কথা! উনি ছাড়বেন তো তোকে? যা যা আগে বাবা-মায়ের পারমিশন নিয়ে আয়!’

জয় তখন অপারগ হয়ে পাড়ার ক্লাবের সেক্রেটারি বাচ্চুদাকে বলেছিল, ‘আমাকে যে যেতেই হবে বাচ্চুদা! ভোলেবাবার কাছে একটা জিনিস যে চাওয়ার আছে আমার! তুমি প্লিজ রাজি করাও আমার মা-বাবাকে!’

মা ভয় পেয়েছিল ছেলের কষ্ট হবে ভেবে। অতটা পথ হেঁটে যাওয়া কী মুখের কথা! বাবাকে শেষপর্যন্ত বাচ্চুদা রাজি করাতে পেরেছিল বলেই তার যাওয়াটা হয়েছিল। কেন যে গিয়েছিল তা জানতেন শুধু ভোলানাথ! সে তো কষ্টের কোনও ত্রুটি করেনি! যা যা নিয়ম সবই তো নিষ্ঠাভরে পালন করেছিল! পা কেটে রক্ত বেরিয়েছিল অনভ‍্যাসে! তবুও থামেনি। ওদের সঙ্গে পা মিলিয়ে পৌঁছেছিল শ‍্যাওড়াফুলি। তারপর সেখান থেকে জল ভরে তারকেশ্বর! তাহলে কেন শুনলেন না ভোলানাথ তার প্রার্থনা? মনে আছে তারকেশ্বর থেকে ফিরে প্রথম যেদিন স্কুলে গিয়েছিল, সেদিন সঙ্গে প্রসাদও নিয়ে গিয়েছিল জয়িতার জন্যে। আর বাবার থানের সাদা সুতো। হঠাৎ জয়ের মনে পড়ে গেল তার আর জয়িতার সেই কথোপকথন!

জয়িতা প্রসাদটা মাথায় ঠেকিয়ে মুখে পুরে দিয়ে বাঁ হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছিল ওর দিকে সুতোটা বেঁধে দেবার জন্য। ও জয়িতার হাতে সুতো বাঁধবার সময় মনে মনে আরেকবার বাবা ভোলানাথের কাছে প্রার্থনা করেছিল।

— ‘তুই সেই অতদূর তারকেশ্বর সত্যিই গিয়েছিলি?’
— ‘মানে? সত্যি গিয়েছিলাম না তো কী? ঢপ দিচ্ছি নাকি?’

জয়িতা ফিক করে হেসে ফেলেছিল।

— ‘না… মানে… আসলে ঠিক যেন বিশ্বাস করতে পারছি না! তুই পারলি অতটা হাঁটতে? কষ্ট হল না?’
— ‘কষ্ট না করলে আর কেষ্ট পাব কী করে বল…’
— ‘কেষ্ট?’
— ‘থুড়ি ভুল বললাম। ওটা রাধা হবে!’

জয়িতার মুখটা এই কথায় কেমন যেন থমকে গিয়েছিল সেদিন।

— ‘রাধা? মানে?’
— ‘মানে… আমি একটা মেয়েকে ভালোবাসি। কিন্তু সেটা সে জানে না!’

জয়িতার থমকে যাওয়া মুখটা দেখে রহস‍্য করে ও বলেছিল।

— ‘রিয়েলি? কে? আমাদের স্কুলের কেউ? আগে বলিসনি তো আমাকে?’
— ‘সে আছে একজন।’
— ‘বল বলছি… আমি না তোর বেস্ট ফ্রেন্ড?’
— ‘উঁহু! এখন কেউ জানবে না শুধু ভোলেবাবা ছাড়া। তাই তো অত কষ্ট করে বাবার কাছে বলতে গিয়েছিলাম যে… যদি এ জীবনে আমি তাকে না পাই, তাহলে যেন…’
— ‘তাহলে যেন?’
— ‘তাহলে যেন আর কেউই তাকে না পায়!’
— ‘এ মা! কী স্বার্থপর ছেলে রে তুই!’
— ‘মোটেই না! জানিস না? যুদ্ধে আর প্রেমে সব কুছ চলতা হ‍্যায়?’
— ‘Of course, You are selfish! Man!’
— ‘সে তুই যা খুশি বল! কিন্তু এটাই আমার মনের কথা! আর দেখবি, বাবা ভোলানাথও আমার প্রার্থনাটা ঠিকই পূরণ করবেন!’

নিজের মনেই ম্লান হেসে মাথাটা নাড়ল জয়। নাঃ! পূরণ করেননি মহাদেব তার প্রার্থনা! হয়তো জয়িতাই ঠিক ছিল। এত স্বার্থপর প্রার্থনা কি কখনও ভগবান পূরণ করতে পারেন!

হঠাৎ ওর খেয়াল হল বেলা পড়ে এসেছে। এবার তো ওকে ফিরতে হবে ওর ডেরায়! হাত তুলে একটা হলদে ট‍্যাক্সিকে দাঁড় করিয়ে তাতে উঠে পড়ল নীল বর্মা!

সারাদিন ধরে ওর ওপর নজর রাখা গাড়িটাও সঙ্গে সঙ্গে ফলো করল ওর ট‍্যাক্সিটাকে। আজ সারাদিন স‍্যার কী কী করেছেন, কোথায় কোথায় গেছেন, সব কিছু যে ম‍্যাডামকে রিপোর্ট করতে হবে!

খবরটা পাওয়ার পর থেকেই ভেতরে ভেতরে কেমন একটা অস্থিরতা বোধ করছে দেবী! যা রিপোর্ট শুনল, তাতে তো মনে হচ্ছে নীলের খুব ডানা গজিয়েছে! নিজের খুশিতে ঘুরছে, ফিরছে, এনজয় করছে! আচ্ছা, যে যে জায়গাগুলোর কথা বলল ওই সিক্রেট গোয়েন্দা, সেই সেই জায়গাগুলো গুগলে সার্চ করে দেখবে নাকি ও? পরক্ষণেই মনে হল ধুর! কীসব আবোলতাবোল ভাবছে ও! দেখেই বা কী করবে? ও কি নিজে ধাওয়া করবে নাকি নীলের পেছন পেছন? তার চেয়ে ক’টা দিন অবজারভেশানে আরও থাকুক। ঘুরে বেড়াচ্ছে বেড়াক যত খুশি! একাই তো বেড়াচ্ছে শুনল। নিজের পৈতৃক শহরে এত বছর পর গেছে বলেই হয়তো কিছুটা নস্টালজিক হয়ে পড়ছে! নাঃ! এখনও পযর্ন্ত টেনশন করার মতো কিছু নেই। অযথাই একটু বেশিই ভাবছে সে! সেলার খুলে দেবযানী পোর্ট ওয়াইন বার করে গ্লাসে ঢালল। পরপর দু’ রাত সে ঘুমোয়নি এই ফালতু টেনশনে! আজ রাতে ঘুমোতেই হবে ওকে!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%