দশম অধ্যায়

চকিতা চট্টোপাধ্যায়

“সাইকোপ‍্যাথ! কী বলছিস তুই!”

— “ঠিকই বলছি। দীপ একজন সাইকোপ‍্যাথ। আমি ওর সঙ্গে ঘর করি তো তাই আমার থেকে বেশি কেউ জানে না এই অমোঘ সত্যিটা! একটা ঘটনা বললেই ব‍্যাপারটা ক্লিয়ার হবে তোর কাছে—”

বিয়ের ক’দিন আগেই আমার ফটো বেরিয়েছিল জনপ্রিয় ফিল্মি পত্রিকায়। সেটা দেখে ও আর ওর মা-বাবা সবাই খুব খুশি। আমার অভিনয় করা নিয়ে কারওরই যে কোনও আপত্তি নেই সেটা ভেবে আমি আর আমার মা-বাবাও নিশ্চিন্ত হলাম। কিন্তু…

— “কিন্তু?”
— “গোয়া থেকে হানিমুন সেরে ফেরার পর যখন জানতে পারল যে আমার সিরিয়ালের শুটিংয়ের ডেট পড়েছে, তখন হঠাৎই ওদের প্রত‍্যেকের মুখোশগুলো একসঙ্গে খসে পড়ল!”
— “কী বলছিস তুই!”
— “দীপ সেদিন এমন সিন ক্রিয়েট করবে তা আমি দুঃস্বপ্নেও কোনওদিন ভাবিনি! সে প্রবলভাবে আপত্তি করল আমার অভিনয় করা নিয়ে! এমনকি আত্মহত‍্যার করার চেষ্টাও করল রান্নাঘর থেকে বঁটি তুলে এনে! আর ওকে ফুল সাপোর্ট করল ওর মা-বাবা! যে পরিচালকের সঙ্গে আমার কাজ ছিল, তাঁর নম্বর আমাকে দিতে বাধ‍্য করাল ওর মা আর ও দু’জনে মিলে। তারপর ওর মায়ের হুকুমে ওর বাবা সেই পরিচালককে ফোন করে জানালেন যে হঠাৎ পড়ে গিয়ে আমার পা ভেঙে গেছে তাই আমার পক্ষে শুটিংয়ে যাওয়া সম্ভব নয়!”
— “জয়িতা! তুই সেই মুহূর্তে বেরিয়ে এলি না কেন?”
— “পারিনি রে! মাত্র দিন কুড়ি আগেই তো বিয়ে হয়েছিল! বাড়ির সবার কথা, সমাজের কথা ভেবে! আমার বাবা আমার বিয়ের ঠিক আগেই খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন! কুড়ি দিনের মাথায় একমাত্র মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে এল… এই ধাক্কাটা উনি হয়তো সামলাতে পারতেন না...!”
— “কিন্তু তাই বলে—”
— “আরেকটা কথা কী জানিস তো… আমাদের সমাজ আজও ডিভোর্স হলে, সেই ডিভোর্সি মেয়েটার দিকেই আঙুল তোলার চেষ্টা করে… তার দিকেই বাঁকা চোখে তাকায়… হাজারটা জবাবদিহির প্রক্রিয়ায় ফেলে তাকেই! এই পরম্পরার বদল আসতে এখনও ঢের দেরি রে! এই পযর্ন্ত আমি মেনেও নিয়েছিলাম, শুধুমাত্র বিয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখব বলে! বলতে পারিস সেই দিন সেই মুহূর্তেই বলিদান দিয়েছিলাম আমার কেরিয়ার! কিন্তু আফসোসটা কোথায় জানিস? এরপরও আমি শান্তি পাইনি!”

বোটওয়ালাটাও বোধহয় বুঝতে পেরেছে—আজ তার সওয়ারিদের মধ্যে ফেরার কোনও তাড়া নেই! তাই সেও উদ্দেশ্যহীন ভাবে বেয়ে চলেছে তার নাও! আর চারিদিকে ঢেউয়ের পরে ঢেউয়ের শব্দকে সাক্ষী রেখে এই দুই চিরবিরহী প্রেমিক প্রেমিকা অশ্রুসিক্ত নয়নে আজ পরস্পরের কাছে উজাড় করে দিতে চাইছে তাদের মনের এতদিনের বেদনার এক একটি ক্ষণকে!

— “বিয়ের একটা বছর পূর্ণ হবার আগেই পরপর এমন কয়েকটা আকস্মিক ঘটনা ঘটে গেল আমার জীবনে, যার জেরে সব কিছু ওলোট-পালোট হয়ে গেল!”
— “কী ঘটনা?”
— “যখন মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছি প্রথম সন্তানকে পৃথিবীতে আনার, বড়রা আশা করছেন কোনও সুখবর শোনার, ঠিক তখনই, কারও কোনও বারণ কানে না তুলে দুম করে নিজের ভালো চাকরিটা ছেড়ে দিল দীপ!”
— “সে কী! কিন্তু কেন?”
— “এই প্রশ্নটা বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে সবাইকে করেছিলাম! যে যার মতো চেষ্টাও করেছিলাম ওকে আটকাবার, যেহেতু ঘটনাটা ও ঘটিয়েছিল আমার বাপের বাড়িতে আমার সঙ্গে ওর থাকার সময়। আমার মা, বাবা, মামা, মামার বন্ধু, অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছিল ওকে। কিন্তু ও কারও কোনও কথা শোনেওনি, এমনকি আমার কথাও ভাবেনি!”
— “আর দীপের মা-বাবা? ওঁরা কিছু বলেননি?”
— “দীপের মা বাবা পরে জানতে পেরে খুব রিঅ্যাক্ট করলেন! দায়ী করলেন আমাকে আর আমার পরিবারকে—এই অঘটন না আটকাতে পারার জন্য, আর—নিজেদের ছোটছেলে-ছোটবউমার কাছে এখানকার ঘরবাড়ি বিক্রি করে দিয়ে রাতারাতি কানাডায় চলে গেলেন!”
— “আর দীপ?”
— “ও রয়ে গেল আমাদের বাড়িতেই আমাদের ওপর ডিপেন্ডেন্ট হয়ে!”
— “কিন্তু ওর এরকম করার কারণটা কি?”
— “অনেক পরে আস্তে আস্তে আরও অনেক কিছুই রিভিল্ড হয়েছিল আমাদের সামনে।”
— “কী?”
— “দীপ যখন বিদেশে হায়ার স্টাডিজের জন্য গিয়েছিল, তখন নাকি একটি মেয়ের সঙ্গে লিভ-ইন করত। পরে তাকে ওখানেই বিয়েও করেছিল!”
— “এসব কী বলছিস তুই!”
— “ঠিকই বলছি জয়! বললাম না—আমি প্রতিনিয়ত জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছি! সেই মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে ভেঙে ও দেশে ফিরে আমাকে বিয়ে করেছিল। ওর মা-বাবা অন‍্যান‍্য আত্মীয়স্বজন সবাই সবটাই জানত। কিন্তু তবুও কেউ কিচ্ছু জানায়নি। উলটে সবাই ভালোমানুষীর ভান করেছিল আমাদের সঙ্গে! আসলে সাইকোপ‍্যাথ ছেলের মুখের ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার ক্ষমতা ওদের কারোরই ছিল না! ওর কথা না শুনলেই ও সিন ক্রিয়েট করত!”
— “আমি জাস্ট আর নিতে পারছি না!”

জয় অসহিষ্ণুভাবে একটা সিগারেট ধরায়!

— “এখনই এত অস্থির হচ্ছিস? কাহানি আভি ভি বাকি হ‍্যায় মেরি দোস্ত!”

ম্লান হেসে বলল জয়িতা। জয় জয়িতার এই কথায় ওর দিকে চমকে চেয়ে দেখল ওর চোখদুটো জলে ভরে গেছে! নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলতে শুরু করল জয়িতা।

— “মাঝখানের বছরগুলো শুধু দীপের খামখেয়ালিপনার শিকার হলাম আমি আর আমার পরিবার। ওর খেয়াল চেপেছিল ফিল্ম ডিরেক্টর হবার। অথচ চেনা পরিচিতি কিংবা পুঁজি কিছুই ছিল না ওর! আমার অ্যাক্টিং কেরিয়য়ারটাকেও তো আটকে দিয়েছিল প্রথমেই তাই আমার চেনা শোনার পরিধিও তো খুব একটা ছিল না। তা সত্ত্বেও ভাগ‍্য ওকে দিয়ে কিছু কাজ করিয়ছিল—তথ‍্যচিত্র টেলিফিল্ম এমনকি সিনেমাও।”
— “সে কী! কিন্তু তাহলে—”
— “বলেছিলাম না, ও আসলে সাইকোপ‍্যাথ! যে আমি প্রতিটি কাজে ওর ছায়াসঙ্গিনী থাকতাম, সেই আমাকেই ও একসময় ছুড়ে ফেলার চেষ্টা করতে শুরু করল! ও মন থেকে চাইত না ওর সঙ্গে আমি উপস্থিত থাকি।”
— “কেন?”
— “বা রে! তাহলে যে উঠতি অভিনেত্রীদের কাছ থেকে সুযোগ নেবার পথে অন্তরায় হবে!”
— “ও তো তোকে ভালোবেসেছিল একসময়!”
— “না।”
— “না? মানে?”
— “মায়ের মুখে সেই ঘোস্ট কলের কথাটা আমি যখন অনেক পরে শুনেছিলাম, তখন আমার দীপের ওপরেই প্রথম সন্দেহটা গিয়ে পড়েছিল! ততদিনে ওর চরিত্র তো জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে আমার কাছে! সরাসরি তাই একদিন ওকে চার্জ করলাম! জানতে চাইলাম সেদিন স্কুলে যাবার আগে আমার মাকে কে ফোন করে জয়ের সম্মন্ধে মিথ্যে রটনা করেছিল!”
— “কী বলেছিল ও?”
— “দীপ শুধু অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল!”
— “জয়িতা!”
— “বলেছিল, হ‍্যাঁ গলা পালটে আমিই করেছিলাম ফোনটা। কারণ, আমি থাকতে কখনও ফার্স্ট গার্ল জয়িতা মুখার্জী ওই অর্ডিনারী জয় চ‍্যাটার্জীর প্রেমিকা হতে পারে? আমার কাছে তাই—জয় চ‍্যাটার্জীর কাছ থেকে ওর প্রেমিকাকে ছিনিয়ে নেওয়াটা একটা চ‍্যালেঞ্জ ছিল!”
— “স্কাউন্ড্রেল!”

দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে জয় চ‍্যাটার্জী ওরফে নীল বর্মা! ওর শিরায় শিরায় রক্ত গরম হয়ে উঠেছে! প্রচণ্ড ইচ্ছে হচ্ছে এই মুহূর্তে দীপকে উচিত শাস্তি দিতে!

সূর্য ঢলে গেছে পশ্চিমে। কথা বলতে বলতে ওরা কেউই এতক্ষণ খেয়াল করেনি! হঠাৎ ঘড়ির দিকে চেয়ে জয়িতা ব‍্যস্ত হয়ে ওঠে। দীপ ফেরার আগেই না ফিরলে আবার দীপের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে ওকে!

— “ও তোর গায়ে হাত দেয় কোন সাহসে জয়িতা? কেনই বা দেয়?”
— “আমাকে ওর সম্পত্তি বলে মনে করে বলে! ও তো জানে আমার মা বাবা নিকট কোনও আত্মীয়ই বেঁচে নেই! তাই এই জীবনটা বয়ে নিয়ে বেড়ানো ছাড়া আমারও আর কোনও উপায় নেই!”

জয় অসহায়ভাবে নিজের বাঁ হাতের ওপর ডানহাতটা দিয়ে একটা ঘুঁষি মারে! চোখের সামনে ওর সারাজীবনের কাঙ্ক্ষিতা স্বপ্নের নারী! অথচ জীবন এমনভাবে তাদের দু’জনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে—যে দু’জনেই অসহায় দৃষ্টিতে শুধু পরস্পরকে দেখছে! আর একটা দিন দেখা করার প্রতিশ্রুতি নেবার পর, একটা দীর্ঘশ্বাস বুকের মধ্যে চেপে জয় বোটওয়ালাকে পাড়ে ফিরে যাবার নির্দেশ দিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%