প্রেমেন্দ্র মিত্র

চিনের পিকিন শহরের নাম নিশ্চয়ই শুনেছ। বিশাল শহর পিকিন, সুন্দর শহর পিকিন, প্রাচীন পবিত্র শহর পিকিন।
সে পিকিন কিন্তু আর নেই—নির্মম শত্রুর অত্যাচারে আজ তার দুর্দশার একশেষ হয়েছে। ছেলেমেয়েরা যেখানে খেলা করত সে সব রাস্তাঘাট আজ বোমার আঘাতে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে, বাড়িঘর মন্দির আজ ধ্বংসস্তূপ। পিকিনের মন্দিরে বিখ্যাত ঘণ্টার ধ্বনি আর প্রহরে প্রহরে শোনা যায় না।
এই বিখ্যাত ঘণ্টার কথা কিছু জানো? দু-হাজার বছর ধরে সে ঘণ্টার অপরূপ ধ্বনি শুধু পিকিন নয়, দূর দূরান্তরের লোককে ভোরের আলোয় জানিয়েছে, ঘুম পাড়িয়েছে মাঝরাতে।
এ ঘণ্টা কে তৈরি করিয়েছিলেন জানো? মহামান্য সম্রাট শি-হোয়াংতি। উত্তর আর দক্ষিণ, পূর্ব আর পশ্চিমের সমস্ত দেশ যাঁর রাজছত্রতলে এক হয়েছিল, যিনি উত্তরের মরুভূমির বর্বর শত্রুদের ঠেকাবার জন্যে চিনের বিখ্যাত প্রাচীর তৈরি করেছিলেন, যিনি পৃথিবীর সমস্ত বিদ্যা সমস্ত জ্ঞান সংগ্রহ করে রাখবার জন্য এমন গ্রন্থাগার তৈরি করেছিলেন যার তুলনা নেই।
তাহলে, এ ঘণ্টা কী খুব প্রকান্ড! না, প্রকান্ড হবে কেন? যা শুধু আকারে বড়ো, চিন দেশ তো তাকে আদর করে না, চিন শুধু সুন্দর জিনিসের সম্মান করতে জানে। এর চেয়ে অনেক বড়ো বড়ো ঘণ্টা পৃথিবীতে আছে, কিন্তু এমন মধুর করে কোনো ঘণ্টা গান গেয়ে উঠবে না,—কো-আই, কো-আই। চুপি চুপি আকাশের কানে কানে বলবে না,—সিয়ে, সি-য়ে!
কো-আই! কো-আই! কেন পিকিনের ঘণ্টা ওই-নামে বেজে ওঠে? কেন কিশ কিশিয়ে বলে—সি-য়ে, সি-য়ে? বলছি, শোনো না—
সম্রাট শি-হোয়াংতির মন সেদিন বড়ো খারাপ। অনেক বড়ো বড়ো কাজই তো সাঙ্গ করেছেন এ পর্যন্ত, কিন্তু তবু তাঁর সাধ মেটেনি। এ পৃথিবী ছেড়ে যাবার আগে প্রজাদের জন্যে আর কিছু ভালো কাজ তিনি করে যেতে চান, কিন্তু খুঁজে পাচ্ছেন না কী করবেন।
সবচেয়ে বিশ্বাসী মন্ত্রী মিং-লিনকে তিনি ডেকে পাঠিয়েছেন তাই।
আমার প্রজারা কি সব সুখী মিং-লিন?—সম্রাট শুধোলেন।
হ্যাঁ সম্রাট! তারা সবাই সুখী। খেত-ভরা তাদের সোনার ফসল, ঘর ভরা তাদের হাসিখুশি ছেলেমেয়ে।
আমার শত্রুরা সব হার মেনেছে মিং-লিন?
হ্যাঁ সম্রাট! শত্রুরা সব হার মেনেছে। চিনের প্রাচীর তাদের দুঃসাহসের চেয়ে দুর্গম, তাদের লোভের চেয়ে উঁচু।
আর কি কিছু করবার নেই তাহলে মিং-লিন?—সম্রাট যেন তাঁর মর্যাদা ও গাম্ভীর্য ভুলে গেলেন কাতরতায়।
মিং-লিন নিরুত্তর।
বলো, মিং-লিন ; আর কি কিছু করবার নেই?
মিং-লিন সাহস করে বললে,—আছে সম্রাট!
সম্রাট উদগ্রীব হয়ে উঠলেন—কী বলো বলো!
মিং-লিন ধীরে ধীরে বলল, —আপনার শক্তির চেয়ে যে আপনার করুণা বড়ো, শাস্তির চেয়ে ক্ষমা যে আপনার শাসনের বিশেষত্ব, ভয়ের চেয়ে ভালোবাসা যে আপনার কাম্য, রাজ্যজয়ের গৌরবের চেয়ে প্রজাদের শান্তি যে আপনার লক্ষ্য, নিত্য তাই ঘোষণা করুন সম্রাট! সেই হবে সবচেয়ে প্রজাদের বড়ো উপকার।
সম্রাট অবাক হলেন,—বলো কি মিং-লিন? আমি রোজ রোজ সভায় দাঁড়িয়ে এই সব কথা বলে চিৎকার করব! সেটা কি ভালো শোনাবে, না, আমার সে বয়স, আর গলার জোর আছে!
আপনি কেন চিৎকার করবেন সম্রাট!
আমি না হয় আমার মাইনে-করা বৈতালিকেরা চ্যাঁচাবে। না মিং-লিন। ওটা কোনো কাজের কথা হল না। তাদের পেশাদার গলায় মিষ্টি কথাও তেতো হয়ে যায়। এসব ভালো কথা, খেলো খোশামোদের মতো শোনাবে।
না সম্রাট, আমি যে বৈতালিকের কথা বলছি, তার গলায় ভালো কথা খেলো হয় না, আরও মধুর হয়ে ওঠে। যে তোষামোদ জানে না।
কে সে! দেখাও তাকে!
তাকে আগে তৈরি করতে হবে সম্রাট! আশ্চর্য এক ঘণ্টা, এমন সুর তার ভেতর থেকে বেরুবে যা কেউ কখনও শোনেনি—মেঘের গর্জন আর ঝাউবনের নিশ্বাস মিলিয়ে, সমুদ্রের কল্লোল আর ভ্রমরের গুঞ্জন মিশিয়ে হবে তার স্বর।
এ আশ্চর্য ঘণ্টা তৈরি করবে কে? কে এমন কারিগর!
আমায় সাত দিন সময় দিন সম্রাট! আমি তাকে খুঁজে বের করব।
মিং-লিন তাকে সত্যিই খুঁজে বার করলেন সাত দিনের মধ্যে। ভাবছ, সে বুঝি নগরের কোনো নামজাদা কাঁসারি! মোটেই নয়। নগরের বাইরে তার ভাঙা কুঁড়ে। যে সামান্য একজন কামার। কোয়ান-উ তার নাম।
মিং-লিন কী বুঝে যে তাকে এত বড়ো কাজের জন্যে ঠিক করলেন কে জানে। কোয়ান-উ নিজে তো কিছুতেই রাজি নয়।
মাকড়সা দিয়ে কি রেশম তৈরি হয়! চড়াই কি পারে বুলবুলের গান গাইতে।—সে বললে মাথা নেড়ে।
কিন্তু তার মেয়ে শুনে ভারি খুশি। সংসারে ওই মেয়েটি ছাড়া কোয়ান-উর কেউ নেই। মেয়েটি যেন ভোরের শুকতারা,—কোয়ান-উর চোখের তারা। নাম তার কো-ই। কো-আই আবদার করে বললে,—হ্যাঁ বাবা একটা ঘণ্টা বানাও, লক্ষ্মীটি! যে ঘণ্টা বাজবে আর বাতাস মিষ্টি হয়ে যাবে শরবতের মতো, যেখানে পাখিরা যেতে পারে না; তার শব্দ সেই তারাদের কাছে উড়ে যাবে।
আনন্দে সে হাততালি দিয়ে উঠল।
কোয়ান-উ হেসে তাকে আদর করে বলল,—পাগল মেয়ে, তোর বাবা কি জাদু জানে?
জাদু তোমার শিখতে কতক্ষণ!—কো-আই বায়না ধরল।
শেষপর্যন্ত সহজ কথা তো নয়। মহামান্য সম্রাট শি-হোয়াংতির ফরমাশ-মাফিক ঘন্টা, সমস্ত চিন, সমস্ত পৃথিবীর অবাক-করা ঘণ্টা, বজ্রের মতো গম্ভীর, নদীর স্রোতের ছল-ছলানির মতো মিষ্টি ঘণ্টা—কী দিয়ে তা তৈরি হয়? কোন ধাতুর সঙ্গে কোন ধাতু মিশিয়ে, কেমন করে ঢালাই করে তাকে গড়ে তোলা হয়? দিনের পর দিন কোয়ান-উ সেই ভাবনায় কাটায়, পরীক্ষা করে দেখে সোনা আর কাঁসা, রুপো আর লোহা মিশিয়ে।
মহামান্য সম্রাটের কাছ থেকে দূত আসে খবর নিতে—ঘণ্টার এখনও কতদূর?
আর বেশিদূর নয়।—উত্তর দেয় কোয়ান-উ, কিন্তু কূল পায় না সমস্যার। কো-আই এসে জিজ্ঞেস করে,—কবে ঘণ্টা তৈরি হবে বাবা? কবে বাজতে শুনব?
কোয়ান-উ হেসে বলে—আর তো দেরি নেই মা!
কিন্তু তবু দেরি হয়। শেষে একদিন সম্রাটের দূত এসে বলে, বিরক্ত হয়ে— ঘণ্টার বদলে তুমি কি নিজের বেড়ি বানাতে চাও কোয়ান-উ?
কোয়ান-উ বিনয় করে বলে,—সম্রাটের দেওয়া বেড়ি সেও তো গর্বের জিনিস, কিন্তু তার আগে ঘণ্টাই তৈরি করতে চাই। আমার আয়োজন শেষ হয়েছে! এবার ছাঁচে ঢালাই করার পালা।
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ঘণ্টা ঢালাই হবে। পিকিন শহরে উৎসব পড়ে যায়। স্বয়ং সম্রাট আসেন রাজ-সভাসদদের নিয়ে ঢালাই দেখতে।
মস্তবড়ো উনুনে দৈত্যদের গামলার মতো কড়াইয়ে নানা ধাতু মিশিয়ে গলানো হয়। সে গলানো ধাতু ঢালা হয় প্রকান্ড মাটির ছাঁচে। রুদ্ধ নিশ্বাসে সবাই অপেক্ষা করে ফলাফল দেখবার জন্যে। বেদির ওপর বসানো রাজাসনে সম্রাট শি-হোয়াংতি, ছাঁচের ধারে কো-আই-এর হাত ধরে কোয়ান-উ, কারখানাময় পিকিনের ছেলে বুড়ো, যে পেরেছে ঢুকতে।
কিন্তু হায় সবই বৃথা। মাটির ছাঁচ খোলবার পর কোয়ান-উর বুক কেঁপে ওঠে ভয়ে। গলানো ধাতু ঠান্ডা হয়ে জমেছে, কিন্তু মিশ খায়নি সোনায় আর রুপোয়, তামায় আর কাঁসায়।
সম্রাটের কাছে চরম শাস্তির জন্যে প্রস্তুত হয়ে, কোয়ান-উ তার বিফল হওয়ার কথা নিবেদন করে।
কিন্তু শি-হোয়াংতি তো যেমন তেমন সম্রাট নন। তিনি আন্তরিক চেষ্টার মূল্য বোঝেন, ব্যর্থতাকে ক্ষমা করতে জানেন।
তিনি হেসে কোয়ান-উকে অভয় দিয়ে বললেন,—তোমার এ ছাঁচ যেন চিনের রূপক, সস্তা আর দামি সব রকম ধাতু তাতে আছে কিন্তু তারা মিশ খায়নি। যার ডাকে দেবতারা স্বর্গ থেকে সাড়া দিতেন সে ঘণ্টাও তাই তৈরি হল না। কিন্তু তুমি আবার চেষ্টা করো, সফল তোমায় হতেই হবে।
আবার দিনের পর দিন যায়। কোয়ান-উর কপালে দুর্ভাবনার রেখা পড়ে গভীর হয়ে। কো-আই-এর দুঃখের শেষ থাকে না। সে এখন বড়ো হয়েছে আরও। তারই আবদার রাখতে বাবার যে এই বিপদ তা সে বোঝে।
কিন্তু কী সে করতে পারে! সোনার সঙ্গে রুপো, লোহার সঙ্গে কাঁসা মেশাবার কোনো মন্ত্র যদি সে জানতে পারত!
যেদিন কোয়ান-উ আবার সম্রাটকে খবর পাঠায় ঢালাইয়ের আয়োজন শেষ হয়েছে বলে, সেদিন সারা সকালটা কো-আই-এর কী ভয়ে ভয়েই কাটে। আবার যদি ধাতুগুলি না মিশতে চায়!
এবার কিন্তু গলানো ধাতু বেশ সহজেই মিশ খেয়েছে দেখা গেল। সম্রাট থেকে সাধারণ লোক পর্যন্ত সকলের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আনন্দে। কো-আই তো নেচেই উঠল খুশিতে। হয়েছে, ঘণ্টা তৈরি হয়েছে! চিনের গৌরব, —পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য ঘণ্টা!
কিন্তু সে খুশি মিলিয়ে গেল দেখতে দেখতে। অন্ধকার হয়ে এল সকলের মুখ, সম্রাটের মুখ বজ্রভরা মেঘের মতো অন্ধকার।
এই কি সেই আশ্চর্য ঘণ্টার আওয়াজ! সমুদ্রের কল্লোল আর ঝাউবনের নিশ্বাস কোথায়, কোথায় মেঘের গর্জন আর ভ্রমরের গুঞ্জন?
এ যেন রাত-দুপুরে কুকুরের কান্না আর ঝগড়াটে বেড়ালের ফ্যাঁস ফ্যাঁস। এ যেন করাত দিয়ে কাঠ-চেরা, আর কাঁসারি পাড়ার হাতুড়ি পেটা!
সবাই প্রথম হতভম্ব হয়ে গেল, তারপর উঠল হেসে। সম্রাট আগুনের মতো জ্বলে উঠে বজ্রস্বরে হাঁক দিলেন—কোয়ান-উ।
কোয়ান-উ তাঁর আসনের তলায় গিয়ে লুটিয়ে পড়ল, লজ্জায় দুঃখে ভয়ে।
সম্রাটের রাগ তবু পড়ল না, বললেন— তোমার এ ঘণ্টা আমার অপমান, সমস্ত চিন দেশের লজ্জা। দু-দুবার সুযোগ পেয়েও তুমি তা নষ্ট করেছ—কী তোমার কৈফিয়ত দেবার আছে!
কোয়ান-উ কাতরভাবে বলল—আমায় আর একবার সুযোগ দিন সম্রাট!
সম্রাট খানিক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। সবাই রইল নিশ্বাস বন্ধ করে উদবেগে। কী আছে কোয়ান-উর ভাগ্যে?
সম্রাট খানিক বাদে বললেন—বেশ শেষবার তোমায় সুযোগ দিলাম। এবার যদি না পারো তো বুকের রক্ত দিয়ে চিনের লজ্জা আর আমার অপমান তোমার মুছে দিতে হবে এ কথা যেন মনে থাকে।
কোয়ান-উ নীরবে মাথা নীচু করে রইল, কো-আই কেঁদে ফেললে এ কথা শুনে।
দেখতে দেখতে কোয়ান-উ কদিনে যেন বুড়ো হয়ে গেল। তাঁর সব কটা চুল সাদা হয়ে গেল, মুখের চামড়া গেল কুঁচকে দুশ্চিন্তার ভারেই সে যেন কুঁজো হয়ে হাঁটে।
বাবার দিকে চাইতে কো-আই-এর যেন বুক ফেটে যায়, কান্না উথলে ওঠে বুকের ভেতর থেকে। কেন সে অমন বেয়াড়া আবদার করেছিল! তার জন্যে তো আজ তার বাবার এই বিপদ!
কো-আই ঘরে থাকতে পারে না। নদীর ধারে ধারে সে ঘুরে বেড়ায় শরবনের ভেতর দুঃখিনী জলকন্যার মতো, মন্দিরে গিয়ে ধরনা দেয় বুদ্ধের মূর্তির পায়ের কাছে।
সাদা পাথরে গড়া তোমার বুক, তবু তুমি সকলের ব্যথা তো বোঝ ; নীল পাথরে তৈরি তোমার চোখ তবু তো তুমি সব দেখতে পাও। তুমি তো জানো এ তোমারই মন্দিরের ঘণ্টা। তোমার ঘণ্টায় তুমি নিজে সুর দিতে কি পারো না?
কিন্তু বুদ্ধমূর্তি নিস্পন্দ হয়ে থাকেন। কো-আই-এর কান্না বুঝি তাঁর কানে যায় না।
একদিন প্রার্থনা করতে করতে কো-আই বুদ্ধের পায়ের তলাতেই পড়ল ঘুমিয়ে। গভীর রাত্রে নির্জন মন্দিরে তার মনে হল দেবতা যেন তাকে ডেকে বলছেন—কেমন করে ঘণ্টা বাজবে! প্রাণহীন সোনা আর রুপো আর কাঁসা থেকে কি মানুষের আত্মার সুর বেরোয়। ও-ঘণ্টায় প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পারবে তুমি?
কো-আই গভীর আনন্দে বললে উঠল—পারব পারব!
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে কো-আই বাড়ি ফিরে গেল। উৎসাহে উজ্জ্বল মুখে কোয়ান-উকে বলে—বাবা আবার তুমি ঘণ্টা ঢালাই করো, এবার ঘণ্টা বাজবে!
কোয়ান-উ বিষণ্ণ মুখে মাথা নাড়ল। সে যেন একেবারে বাজ-পড়া গাছের মতো ভেঙে পড়েছে। মেয়ে যে সারারাত বাড়ি ছিল না, সে খেয়াল তো তার নেই। মাথা নেড়ে হতাশভাবে সে বললে—না মা, ঘণ্টা আর ঢালাই করব না আমি ঠিক করেছি। সম্রাটের কাছে আমার শাস্তি আজ আমি নিতে চললাম। তোমার জন্যে এই কামারশাল আর কুঁড়েঘর রইল। তোমার অক্ষম বাবা এর বেশি যৌতুক তোমার বিয়ের জন্যে রেখে যেতে পারল না, এই তার দুঃখ।
কো-আই হেসে উঠল—আমার বিয়ের যৌতুকের ভাবনা তোমায় ভাবতে হবে না বাবা। আমার বিয়েতে যৌতুক লাগবে না।
সে কী কথা কো-আই!—কোয়ান-উ অবাক হয়ে বলল।
বলছি তো সে ভাবনা তোমায় ভাবতে হবে না। তুমি আবার ঢালাই করার জোগাড় দেখো। শাস্তি যখন নিতে তুমি প্রস্তুত, তখন আর একবার চেষ্টা করতে ক্ষতি কী?
কোয়ান-উকে অগত্যা তাই করতে হল। কিন্তু মনে তার কোনো ভরসা নেই। ঘণ্টা যে ঠিক সুরে বাজবে না, সে জানে। কেমন করে বাজবে? কোনো নতুন কৌশল সে তো বার করতে পারেনি।
আবার সম্রাট এলেন ঢালাই দেখতে। শহরসুদ্ধ লোক ভেঙে এল কামার-শালে।
মাটির নীচে বিশাল ঘণ্টার ছাঁচ বসানো,—যেন পাতালের গহ্বর। জ্বলন্ত অজগরের মতো গলানো ধাতুর স্রোত তার ভেতর গর্জন করে এসে নামল। তারপর যেন ঘুমিয়ে পড়ল কুন্ডলী পাকিয়ে।
ক্রমশ উত্তাপ ঠান্ডা হয়ে গেল। এবারও ধাতুরা মিশ খেয়ে জমে গেছে। ছাঁচ ভেঙে বিশাল শিকলিতে প্রকান্ড ঘণ্টা টেনে তোলা হল ওপরে।
কোয়ান-উ বিষণ্ণমুখে সেখানে এসে দাঁড়াল। কোনো আশা যে নেই সে জানে। এ যেন তার শবযাত্রার ঘণ্টা এমনি করে তাতে ঘা দিলে সে—
একবার—দুবার।
কিন্তু একী! সবাই মন্ত্র-মুগ্ধের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এমন অপরূপ ধ্বনি পৃথিবীতে মানুষের কানে কখনো শোনা সম্ভব।
আকাশে আনন্দের শিহরন তুলে ঘণ্টা বেজে উঠেছে—কো-আই! কো-আই!
কোয়ান-উর বুঝি প্রথম চমক ভাঙল। কো-আই! এমন আনন্দের মুহূর্তে কো-আই গেল কোথায়! ঘণ্টা তৈরি সার্থক হয়েছে, সম্রাট খুশি হয়েছেন, কো-আই-এর বিয়ের যৌতুকের আর ভাবনা নেই। রাজপুত্রের সঙ্গে তার বিয়ে হবে। সত্যিকার রাজপুত্র।
কিন্তু কোথায় কো-আই? স্বয়ং সম্রাট শি-হোয়াংতি থেকে রাস্তার ভিখিরি পর্যন্ত আনন্দে মেতে উঠেছে। তাদের ভিড়ের মধ্যে ব্যাকুলভাবে পাগলের মতো কোয়ান-উ তার মেয়েকে খুঁজে বেড়াতে লাগল।
কো-আই-এর কোথাও কোনো চিহ্ন নেই। না, এই যে তার ছোটোপায়ের এক পাটি রেশমি জুতো, ঘণ্টার ছাঁচের গভীর গহ্বরের ধারে।
কোয়ান-উ ব্যাকুল কন্ঠে চিৎকার করে উঠল—কো-আই!
স্বয়ং সম্রাট উৎসাহের চোটে তাঁর আসন থেকে নেমে এসে ঘণ্টায় তখন ঘা দিচ্ছেন। ঘণ্টা বেজে উঠল—কো-আই! কো-আই!
যেন সে বলতে চায়— কো-আই! কো-আই! এই যে আমি।
সেই সঙ্গে একটু ফিসফিস—শিয়ে, শিয়ে—আমার জুতো, ছোট্ট জুতো! কো-আই বুঝি তাড়াতাড়িতে এক পাটি জুতো ফেলে গেছে।
দু-হাজার বছর ধরে পিকিন শহরের ওপর সেই ঘণ্টা বেজে এসেছে। যতদূর সে ঘণ্টার ধ্বনি গেছে ততদূর আকাশ পবিত্র হয়ে গেছে, যেন শব্দের সৌরভে। সে ঘণ্টার ধ্বনি যার কানে গেছে নিষ্পাপ, নিষ্কলঙ্ক, ভোরের শুকতারার মতো সুন্দর, একটি মেয়ের ছোঁয়ায় তার মনের সমস্ত গ্লানি মুছে গেছে ; সে ধন্য হয়েছে।
সে ঘণ্টা আর নেই, কিন্তু কো-আই-এর কাহিনি কোনোদিন মানুষ ভুলবে না। ঘণ্টার ধ্বনি যতদূর যায়, তার চেয়ে অনেক দূরে মানুষের মুখে মুখে তার নাম আছে ছড়িয়ে। ঘণ্টার যতদিন পরমায়ু তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি তার গল্প থাকবে বেঁচে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন