নিরুদ্দেশ

প্রেমেন্দ্র মিত্র

পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার! পাঁচশো সাতশো নয় একেবারে পাঁচ হাজার! ব্রজবিনোদবাবুর চোখে আর ঘুম নেই। ঘুম যদি আসে তাহলে পাঁচ হাজার করকরে ঝকঝকে টাকা ছাড়া আর কিছুর স্বপ্ন নেই। কখনও সে পাঁচ হাজার টাকা ঝনঝন করে তাঁর সিন্দুকে পড়ে রুপোর ঝরনার মতো, কখনও বা খসখসে খাস্তা নোট হয়ে রাশি রাশি তাঁর বিছানাময় ছড়িয়ে পড়ে চৈতি হাওয়ার বনের ঝরাপাতার মতো।

তা স্বপ্ন দেখা আর আশ্চর্য কী? পাঁচ হাজার টাকা তো বলতে গেলে ব্রজবাবুর হাতের মুঠোয়। হাতের মুঠোয় মানে এই পাশের ঘরের আরাম-কেদারায়; তাঁর সেই বড়োসাধের আরাম-কেদারায়—যে কেদারায় কারুর এ পর্যন্ত বসা দূরের কথা ছোঁয়ার পর্যন্ত হুকুম ছিল না।

সেই আরাম-কেদারায় পাঁচ হাজার টাকা জলজ্যান্ত হয়ে বসে আছে মনে করতেও ব্রজবাবুর সারাগায়ে কেমন একটা কাঁটা দিয়ে ওঠে আনন্দে! ব্রজবাবু পাঁচ হাজার টাকা যেন অনুভব করতে পারেন, এ-ঘর থেকেই চোখে না দেখেই শুধু নাকে গন্ধ শুঁকেই। গন্ধ অবশ্য ঠিক পাঁচ হাজার টাকার বোধ হয় না— তাঁর আর একটি বড়ো শখ — তাঁর দেরাজে রাখা দামি হাভানা চুরুটের গন্ধের সঙ্গেই তার যেন কেমন একটা সাদৃশ্য আছে বলে সন্দেহ হয়। মূর্তিমান পাঁচ হাজার কি তাঁর দেরাজ খুলে তাঁরই দামি চুরুটের শ্রাদ্ধ করছে নাকি!

ব্রজবাবুর বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। অন্য সময় হলে বুঝি রক্তটাও মাথায় চড়ে যেত। কিন্তু এখন অমন ধৈর্য হারাবার সময় নয়। একটা বেফাঁস কিছু হয়ে গেলেই পাঁচ হাজার ফসকে যেতে কতক্ষণ!

তবু চুরুটের ব্যাপারটার একটু তদন্ত না করলে মন মানে না। ব্রজবাবু ধীরেসুস্থে কিছুই যেন হয়নি এমনিভাবে পাশের ঘরে গিয়ে ঢোকেন—মুখে একটি সাদর আপ্যায়নের হাসি টানতেও ভোলেন না।

আরাম-কেদারার মূর্তিমান পাঁচ হাজার তাঁর দিকে কিন্তু ভ্রূক্ষেপও করে না। নিজের মনেই চুরুট টেনে যায়—তাঁর সেই দামি হাভানা চুরুট!

ব্রজবাবু আরও একটু কাছে এগিয়ে যান এবং ওই অবস্থায় কন্ঠে যতখানি মধু রাখা সম্ভব ততখানিই ঢেলে বলেন,— এই যে শিশির—তোমার কী বলে, চুরুট খাওয়াও অভ্যেস আছে নাকি?

শিশির, ওরফে ব্রজবাবুর মূর্তিমান পাঁচ হাজার, তাঁর দিকে এতক্ষণে একবার কৃপা-কটাক্ষ করে সংক্ষেপে জানায়,—না।

চুরুটে টান কিন্তু তার সমানে চলতে থাকে।

না! ব্রজবাবুকে একসঙ্গে মুখের ও হৃদয়ের মাসল কন্ট্রোল করতে হয়। হেসে বলেন,—ও! অভ্যেস নেই! শখ করে একটু চেখে দেখছ বুঝি?

আবার সংক্ষিপ্ত জবাব,—হ্যাঁ।

কী জানো শিশির,—ব্রজবাবু স্নেহের উপদেশ দেবার চেষ্টা করেন,—অভ্যেস না থাকলে চুরুট খাওয়াটা আবার ভালো নয়। কী বলে, মাথা ঘুরতে পারে। তা ছাড়া তোমাদের এই বয়সে...।

কথাটা শেষ করা হয় না। শিশির হাতের চুরুটটা—সবেমাত্র ধরান আস্ত চুরুটটা, নেহাত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বাইরে জানলা গলিয়ে ফেলে দিয়ে বলে,—না এ চুরুটটা ভারি কড়া!

চুরুটটার সঙ্গে ব্রজবাবুর হৃৎপিন্ডটা যেন জানলা দিয়ে বাইরে ছিটকে পড়ে। এই নিদারুণ যুদ্ধের বাজারে একটা দুর্মূল্য, দুষ্প্রাপ্য চুরুট মাত্র কটা টান দিয়ে যে বাইরে ফেলে দেয়, কান ধরে তাকেও তৎক্ষণাৎ চুরুটের পেছনে পাঠাবার একটা প্রবল অভিলাষ হয় কিন্তু সে অভিলাষ কোনোরকমে দমন করে তিনি বলেন,—হেসেই বলেন,—কেমন বলেছিলাম কিনা!

কী বলেছিলেন— শিশিরের গলায় বেশ ঝাঁঝ।

ওই যে! ব্রজবাবু অত্যন্ত অপরাধীর মতো বলেন,—অভ্যেস না থাকলে চুরুট খাওয়া ভালো নয়।

বেশ, কাল থেকে সিগারেট আনিয়ে দেবেন। একটু একটু করে অভ্যেস করতে হবে। শিশির আদেশ জারি করে।

সিগারেট আনিয়ে দেব!—ব্রজবাবু খানিকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে থাকেন। একেবারে বিস্ময়ে নির্বাক।

না আনিয়ে দেন দেবেন না। দরকার নেই আমার! —শিশির আরামকেদারা থেকে উঠে পড়ে বেশ রাগের সঙ্গেই।

ব্রজবাবুর তৎক্ষণাৎ হৃৎকম্প হয়। পাঁচ হাজার টাকা বুঝি হাতছাড়া হয় এখুনি! শশব্যস্ত হয়ে তিনি বলেন,—আহা রাগ করছ কেন? আমি কি আনিয়ে দেব না বলেছি! তুমি যাচ্ছ কোথায়?

একটু বায়োস্কোপে যাব ভাবছি। কাজ নেই কর্ম নেই, চুপ করে রাতদিন ঘরে বসে থাকতে তো পারি না।

তা তো নিশ্চয়!—একদিকে আশ্বস্ত হলেও আবার একটা বাড়তি খরচের সম্ভাবনায় মনে মনে বিচলিত হয়ে ব্রজবাবু বোঝাবার চেষ্টা করেন,—

কিন্তু বায়োস্কোপের বদলে ঘরে বসে বই পড়লেই তো পারো, ভালো ভালো বই। আমি না হয় লাইব্রেরি থেকে আনিয়ে দিচ্ছি।

বই পড়লে আমার মাথা ধরে। —সোজা জবাব দেয় শিশির আলনা থেকে শালটা—ব্রজবাবুরই দামি শালটা গলায় জড়িয়ে। তার পর হাত বাড়িয়ে বলে,— দিন পাঁচটা টাকা।

পাঁচ টাকা! বায়োস্কোপে যেতে পাঁচ টাকা কেন? পাঁচ আনার টিকিটে গেলেই তো হয়। ব্রজবাবু কাতরভাবে নিবেদন করেন।

না হয় না। টিকিটের দাম দেড় টাকা ছাড়া চা খাওয়া আছে আরও খুচরো খরচ আছে। পাঁচ টাকায় হবে কি না তাই ভাবছি।

শিশিরকে আর ভাববার অবসর দিতে ব্রজবাবুর সাহস হয় না। চটপট তিনি পাঁচ টাকা বার করে দেন। শিশির অম্লানবদনে সেটি পকেটস্থ করে বলে,—আমার চাকরির ব্যবস্থা আপনি কিন্তু এখনও করলেন না। এরকম রোজ রোজ হাত পেতে আপনার কাছে টাকা নিতে কিন্তু আমি পারব না বলে দিচ্ছি।

গোদের ওপর এই বিষফোঁড়াটুকুই ব্রজবাবুর পক্ষে অসহ্য। পাছে নিজেকে সামলাতে না পারেন এই ভয়ে তিনি তাড়াতাড়ি যা হোক একটা আশ্বাস দিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এসে হিসেব করতে বসেন। পাঁচ হাজার টাকার এই দাঁওটা গেঁথে ডাঙায় তুলতে এ পর্যন্ত চারে, সুতোয়, ছিপে, বড়শিতে তাঁর কী পর্যন্ত গেছে তারই হিসেব।

ব্রজবাবু যতক্ষণ হিসেব করছেন ততক্ষণে এ গল্পের গোড়াকার কথাটা বোধ হয় সেরে নেওয়া যেতে পারে।

ব্রজবাবুর পরিচয় নিশ্চয়ই দিতে হবে না। তাঁর নাম এ পাড়ায় কে না জানে এবং কেই বা মুখে আনে অন্তত একবেলার খাওয়া-দাওয়া না সেরে নয়। মাত্র তিন বছর তিনি মোটা পেনশন নিয়ে এ পাড়ায় এসে ডেরা বেঁধেছেন, কিন্তু এই তিন বছরেই পাড়ার ছেলে-বুড়ো সবাই তাঁকে হাড়ে হাড়ে চিনেছে। তিনকুলে কেউ নেই, অবস্থাও বেশ ভালো, কিন্তু এমন হাড়-কঞ্জুস দুনিয়া আর দুটি আছে কি না সন্দেহ। এই সেদিন পাড়ার ছেলেরা সাত দিন তাঁর দোরে হাঁটাহাঁটি করে সরস্বতী পুজোর জন্যে নগদ একটা সিকি চাঁদা হিসেবে আদায় করেছিল — পরে অবশ্য দেখা গেছল সিকিটা অচল।

তা বলে ব্রজবাবু খরচ করেন না, এমন নয়, কিন্তু সে শুধু দুটি ব্যাপারে ; এক তাঁর নিজের সুখ আর শখের জন্যে, আর ফাঁকিতে যদি কোথাও মোটা কিছু দাঁও মারা যায় তারই ফিকিরে। দাঁও মারবার ফিকিরে হেন ক্রসওয়ার্ড পাজল নেই যাতে তিনি একটা দুটো জবাব পাঠান না ; এমন, ‘ঘরে বসিয়া এক হইতে পাঁচশো টাকা’ উপার্জনের বিজ্ঞাপন নেই যা নিয়ে দু-একবার চিঠি-চালাচালি না করেন ; এমনকি, আর্থিক উন্নতির ভরসা দেয় এমন কবচের খবরা-খবরও তিনি রাখতে ছাড়েন না।

কিন্তু এই দুটি ব্যাপার ছাড়া, পরস্মৈপদী হবার সুযোগ পেলে বাজে খরচের ধার দিয়ে তিনি যান না। পাড়ায় ভুবনবাবুর বাড়িতে সকালে চা-টা ভালো হয়, টোস্টও থাকে বুঝি সঙ্গে। ব্রজবাবুর তাই সকালে একবার ভুবনবাবুর সঙ্গে দেখা না করলে দিনটাই খারাপ যায়। বিকেলে ভবতোষবাবুর বাড়ির তিনি নিত্য অতিথি। সেখানে একটু রাজনীতি আলোচনা না করলে তাঁর নাকি ঘুমই হয় না। বলা বাহুল্য, জল-খাবারটা সেখানেই সারেন। সূর্যবাবুর বাড়ির পেছনে ছোটো একটা বাগান আছে। প্রায়ই সেখানে ব্রজবাবু পায়ের ধুলো দেন কচি ঢেঁড়শ বা পাকা পেঁপেটা কলাটা মুলোটা বেগুনটা শসাটা তারিফ করতে। ঠিকমতো তারিফ করতে কিছু তাঁকে নিয়েও আসতে হয় সঙ্গে — নিদেনপক্ষে দুটো কাঁচালংকা না নিয়ে তিনি ফেরেন না।

কিন্তু ব্রজবাবুর এমনই দুর্ভাগ্য যে পাড়ার লোকের পালটা খাতির করবার সুযোগ তাঁর এপর্যন্ত হল না। বাড়িতে কেউ কদাচিৎ যদি আসে, তাহলে ঠিক সেই দিনই তাঁর চাকরটা কোথায় যে পালিয়ে থাকে তার ঠিকানা মেলে না ; চাকরটা থাকলেও উনুন আর ধরতে চায় না ; আর যদি বা উনুন ধরে হঠাৎ সেই দিন চায়ের টিন, চিনির বোয়াম এমন খালি থাকে যে চাকরকে ধমক দিয়ে বাজারে পাঠাতে হয় তৎক্ষণাৎ। ব্রজবাবুর চাকর সে বেলা যে আর বাজার থেকে ফেরে না, তা বোধ হয় বলাই বাহুল্য।

এই আমাদের ব্রজবাবুর জীবনে হঠাৎ পাঁচ হাজার টাকার দাঁও কেমন করে দেখা দিল, এবার বলি। সকালে ভুবনবাবুর বাড়ি চায়ের পাট সেরে ব্রজবাবু সেদিন পাড়ার লাইব্রেরির ফ্রি রিডিং-রুমে বসে খবরের কাগজগুলির সার সংগ্রহ করছেন। এটিও ব্রজবাবুর নিত্য-নৈমিত্তিক কাজ। রিডিং-রুমে ঢুকে সকাল বেলা সর্বপ্রথম তিনি খবরের কাগজগুলি হাত করেন। সে খবরের কাগজ একটির পর একটি একেবারে নিংড়ে নি:শেষ না করে তিনি কাউকে ছাড়েন না। খবরের ওপর তাঁর অবশ্য কোনো টান নেই। তিনি পড়েন শুধু বিজ্ঞাপন।

সেদিন বিজ্ঞাপনের পাতাগুলো পড়ে ব্রজবাবু একরকম হতাশই হয়েছেন। একটি ছাড়া আর কোনো বিজ্ঞাপন তাঁর মনে দাগ দেয়নি। বিজ্ঞাপনটি টাকে চুল ওঠবার কোনো এক অত্যাশ্চর্য তেলের। ব্রজবাবুর মাথায় টাক আছে সত্য কিন্তু সে টাক সারবার ব্যাকুলতায় ও বিজ্ঞাপনের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হননি। তাঁর আকর্ষণের কারণ আলাদা। টাকের তেলের আবিষ্কারক সগর্বে ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর এই তেলের দাবি মিথ্যে বলে কেউ প্রমাণ করতে পারলে তিনি এক হাজার টাকা পুরস্কার দিতে প্রস্তুত। নিজের মাথার টাকে ওই তেলকে বিফল প্রমাণ করে আইনের ফেরে হাজার টাকা হাত করা যায় কি না, প্যাঁচ কষতে কষতে পাশের আর একটি বিজ্ঞাপনে ব্রজবাবুর চোখ পড়ে। সাধারণ নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন, কিন্তু পুরস্কারের বহর একেবারে পাঁচ হাজার! জোয়ান বয়সের একটি ছেলের ছবির নীচে সেই মামুলি ভাষায় বিজ্ঞপ্তি — এই নিরুদ্দিষ্ট ছেলেটির সন্ধান বক্স-নম্বর...তে পৌঁছে দিলে পাঁচ হাজার টাকা নগদ পুরস্কার!

লুব্ধ দৃষ্টিতে ছবিটির দিকে ব্রজবাবু তাকিয়ে আছেন, এমন সময় হ্যাঁ ঠিক সেই আশ্চর্য মুহূর্তেই ঘরে যে ছেলেটি এসে ঢোকে তার দিকে ফিরে ব্রজবাবু একেবারে স্তম্ভিত হয়ে যান! নিজের চোখকেই তাঁর বিশ্বাস হয় না। এও কি সম্ভব! দুরু-দুরু বুকে তিনি আর একবার খবরের কাগজের ছবিটার ওপর ভালো করে চোখ বুলিয়ে নেন, তারপর ছেলেটিকে তন্ন তন্ন করে পর্যবেক্ষণ করেন। হ্যাঁ, কোনো ভুলই নেই, এমনকি ডান দিকের কপালের কাটা দাগটি পর্যন্ত।

ছেলেটি তখন তাঁর কাছেই একটা চেয়ারে বসে একটা খবরের কাগজ টেনে পড়তে শুরু করেছে। এমন সুযোগ জীবনে আর দুবার আসে না। ব্রজবাবু আর দ্বিধা না করে পাশে সরে যান। একটু ইতস্তত করে ব্রজবাবু যথাসম্ভব মধুর কন্ঠে আলাপ শুরু করেন,—আপনাকে তো আগে এখানে দেখিনি।

ছেলেটি অত্যন্ত গম্ভীর প্রকৃতির বলে মনে হয়। ব্রজবাবুর দিকে না তাকিয়ে সে বলে,—আমিও আপনাকে দেখিনি।

ব্রজবাবু দমবার পাত্র নয়, বলেন,—তা তো বটে। তা এখানে বুঝি কাগজ পড়তে এসেছেন?

জবাব আসে,—না, চাকরির বিজ্ঞাপন দেখতে।

চাকরি! আপনি চাকরি খুঁজছেন নাকি?

এবার ছেলেটি ব্রজবাবুর দিকে ভ্রূকুটি করে তাকায়,—হ্যাঁ, খুঁজছি, দেবেন নাকি একটা?

ব্রজবাবু একটু বুঝি হকচকিয়ে যান। তক্ষুনি কিন্তু সামলে নিয়ে বলেন,— তা চাকরি একটা চেষ্টা করলে কি আর দেওয়া যায় না?

কথাটা খুব নীচু গলাতেই ব্রজবাবু বলবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কেমন করে টেবিলের ওধারে কজনের সেটা কানে গেছে দেখা যায়। একজন বলে ওঠে, ব্রজবাবু আজকাল চাকরি বিলোচ্ছেন নাকি?

পাড়ায় চাঁদা-চাওয়া এই ফাজিল ছেলেগুলোকে ব্রজবাবু দুচক্ষে দেখতে পারেন না, কিন্তু এখন বাজে ঝগড়ায় সময় নষ্ট করা চলে না।

না, না, এই বলছিলাম!—বলে একটু হেসে সে প্রসঙ্গে দাঁড়ি টেনে ব্রজবাবু আবার তাঁর নতুন শিকারের প্রতি মনোযোগ দেন—তা আপনি থাকেন কোথায়?

কোথাও না, যখন যেখানে সুবিধে হয়।

ব্রজবাবুর নাড়িটা ডবল কদমে চলতে শুরু করে। সহানুভূতিতে একেবারে গলে গিয়ে তিনি বলেন, জানাশোনা কেউ নেই বুঝি এখানে? ভারি দুঃখের কথা তো!

চাঁদা-চাওয়া ফাজিল ছেলেদের একজন বলে ওঠে, —অত যদি দুঃখু, তাহলে ভদ্রলোককে আপনার বাড়িতেই জায়গা দিন না দুদিন।

ফাজিল ছেলেটাকে এবার ব্রজবাবুর আশীর্বাদ করতে ইচ্ছে হয়। কথাটা একেবারে লুফে নিয়ে তিনি বলেন,—তা কি আর দিতে পারি না! বিপদের দিনে লোককে যদি জায়গা দিতে না পারলাম তো বাড়িঘর আছে কী জন্যে?

খানিকক্ষণ সমস্ত ঘর একেবারে স্তব্ধ, স্তম্ভিত। দেয়ালের টিকটিকিটার নাকের কাছ দিয়ে একটা সুপুষ্ট মাছি অকুতোভয়ে হেঁটে চলে যায়।

সে অস্বাভাবিক স্তব্ধতা নিজেই একটু সলজ্জ হাস্যে বিচূর্ণ করে ব্রজবাবু বলেন, কিন্তু উনি কি আর তা থাকবেন!

সুবিধে হলেই থাকতে পারি। —ছেলেটি তাচ্ছিল্যভরে জানায়, কিন্তু ব্রজবাবু হাতে স্বর্গ পান।

সেই সকাল থেকেই পাঁচ হাজার টাকার সেই রত্ন অর্থাৎ শিশির ব্রজবাবুর বাড়িতে অধিষ্ঠিত। ব্রজবাবু শিশিরকে বাড়িতে তুলেই খবরের কাগজের বক্স নম্বরের ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছেন—এক মুহূর্ত বিলম্ব করেননি। পাঁচ হাজার টাকা সিন্দুকে তুলতে আর কতক্ষণই বা বাকি! কিন্তু সেই ততক্ষণই শিশিরকে ধরে রাখা এমন সমস্যা হবে কে জানত!

সকাল বেলা খেতে বসেই শিশির গোলমাল শুরু করেছে,—ছো:, এরকম চাল খাওয়া যায় নাকি! আর ঘি কোথায়?

ব্রজবাবু সংকুচিতভাবে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন যে বাজারে সব ঘি ভেজাল, সেই ভয়েই তিনি ঘি খাওয়া ছেড়েছেন।

বেশ তো! মাখন গালিয়ে নিলেই পারেন, ঘি নইলে আমার খাওয়া হয় না। —অম্লানবদনে বলেছে শিশির। তারপর এক এক করে সব রান্নারই খুঁত ধরে জানিয়ে দিয়েছে যে মাছ-মাংস তরিতরকারি দুবেলা তার ভালোমতো চাই, নইলে সে এখানে থাকতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, রাত্রে লুচির সঙ্গে রাবড়ির বদলে ভালো কাঁচাগোল্লা হলে তেমন কিছু আপত্তি তার নেই।

পাঁচ হাজারের খাতিরে ব্রজবাবুকে তারপর সব বন্দোবস্তই করতে হয়েছে। কিন্তু তাতেও রেহাই আছে কি? এক এক করে শিশিরের বায়না মেটাতে মেটাতে নিজের শোবার ঘর আসবাব-পত্র বিছানা ছেড়ে ব্রজবাবু পাশের এই ছোট্ট কুঠুরিতে এসে উঠেছেন। যা কিছু তাঁর ব্যবহারযোগ্য কাপড় চাদর, সে সবে তাঁর নিজের অধিকার আর নেই। শিশিরই ইচ্ছামতো তার সদব্যবহার করে। নেহাত জামাটা জুতোটা মাপে মেলে না বলেই বোধ হয় ছোঁয় না। এর ওপর রোজ তার হাতখরচা আছে,—বায়োস্কোপ থিয়েটার যেতে, এটা-সেটা কিনতে। ব্রজবাবু একবার একটু আপত্তি জানিয়েছেন কি তৎক্ষণাৎ সে বাড়ি ছেড়ে যেতে প্রস্তুত। কাজেই ব্রজবাবু নি:শব্দেই সব হজম করে যান, এমনকী শিশিরের মন রাখতে তাঁর পুরোনো অফিসে গিয়ে একদিন তিনি শিশিরের চাকরির জন্য সুপারিশ পর্যন্ত করে এসেছেন! মনে মনে গুমরে ব্রজবাবু শুধু দিন গোনেন। দিন গোনেন চিঠির উত্তরটা আসার অপেক্ষায়। একবার পুরস্কারটা হাতের মুঠোয় এলে হয়। কিন্তু উত্তরটা আসতে যেন বড়ো দেরি হয়ে যাচ্ছে! নিরুদ্দিষ্ট ছেলের জন্য অমন ব্যাকুল বিজ্ঞাপন যারা দেয় তাদের জবাবটা আরও একটু চটপট আসা উচিত ছিল নাকি?

ব্রজবাবুর হিসেব ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। দেখা যায় খাই-খরচা, এমনকি চুরুটের দামটাও ধরে শিশিরের জন্যে এ পর্যন্ত খরচা হয়েছে একশো তিয়াত্তর টাকা সওয়া তেরো আনা। সুতরাং এখনও চার হাজার আটশো ছাব্বিশ টাকা পৌনে তিন আনা ব্রজবাবু লাভ বলে ধরতে পারেন। কিন্তু শিশিরকে আর কিছুদিন এমন করে রাজার হালে রাখতে হলে সে লাভ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভেবে ব্রজবাবু একটু বিচলিত হয়ে পড়েন।

না, আরকটা চিঠি বক্স-নম্বরের ঠিকানায় না পাঠালেই নয়। এমনও তো হতে পারে যে তাঁর আগের চিঠি ঠিক জায়গায় পৌঁছোয়নি।

ব্রজবাবু সন্তর্পণে তাঁর নিজের,— আপাতত অবশ্য শিশিরের ঘরের দিকে পা বাড়ান। শিশির আবার আজকাল এঘরে তাঁর যখন-তখন আসা পছন্দ করে না, তাই এই সাবধানতা।

ব্রজবাবু সবে টেবিলে গিয়ে বসেছেন, এমন সময় বাইরে শিশিরেরই সাড়া পাওয়া যায়। তাড়াতাড়ি সরে পড়বার আগেই শিশির শিস দিতে দিতে ঘরে ঢুকে উৎফুল্লভাবে বলে,—ধন্যবাদ ব্রজবাবু, ধন্যবাদ।

ব্রজবাবু বেশ একটু বিমূঢ় হয়ে পড়েন। শিশিরের এ চেহারা তাঁর কাছে একেবারে নতুন।

অবাক হয়েই তিনি জিজ্ঞাসা করেন,—তুমি—মানে, ফিরে এলে যে এত তাড়াতাড়ি?

একটা চিঠি ব্রজবাবুর নাকের সামনে দুবার নেড়ে শিশির বলে,—না এতবড়ো সুখবরটা পেয়ে আর বায়োস্কোপে যেতে ইচ্ছে হল না।

সুখবর! চিঠিটার দিকে চেয়ে ব্রজবাবুর বুকটা আশায় দুলে ওঠে। হাত বাড়িয়ে চিঠিটা ছিনিয়ে নেবার প্রবল বাসনাটা দমন করে তিনি বলেন,—সুখবর!

সুখবরটা কীসের?

এই যে দেখুন না। ব্রজবাবুর সামনে চিঠিটা ফেলে দিয়ে শিশির বলে,—এই মাত্র পিয়োন দিয়ে গেল। যাক, চাকরিটা পাওয়ার জন্যে আপনাকেই আগে কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত।

চাকরি! ও তুমি চাকরি পেয়েছ বুঝি?— হতাশভাবে জিজ্ঞাসা করেন ব্রজবাবু, চিঠিটায় একবার চোখ বুলিয়ে।

হ্যাঁ, পেলাম তো আপনারই সুপারিশে। আপনারই অফিসের সেই চাকরিটা। চলে যাবার আগে আপনাকে তাই ধন্যবাদ দিয়ে যাচ্ছি।

যাবার আগে! ব্রজবাবু যেন চাবুক খেয়ে উঠে দাঁড়ান। তুমি চলে যাচ্ছ নাকি?

তা যেতে হবে বইকী! ভাবছি চাকরি যখন পেয়েই গোলাম তখন মামার বাড়িতেই গিয়ে উঠি। আর মামার বাড়ি যখন এত কাছে!

এত কাছে তোমার মামার বাড়ি! —ব্রজবাবু রাগে, দুঃখে, বিস্ময়ে প্রায় ফেটে পড়েন।—কই সে কথা তো আমায় আগে বলোনি!

আপনি জিজ্ঞেস করলে তো বলব! অবশ্য আমার মামাকে আপনি ভালো করেই চেনেন। অন্তত তাঁর বাগানের তরিতরকারি তো বটেই। আমি সূর্যবাবুর ভাগনে।

তুমি সূর্যবাবুর ভাগনে? তাহলে—তাহলে—! ব্রজবাবুর খানিকক্ষণ বাকরোধ হয়ে যায়।—তাহলে কাগজের ওই নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনের মানে?

মানে আর কী এমন শক্ত! ও বিজ্ঞাপন আমি নিজেই দিয়েছিলাম।

তুমি নিজেই দিয়েছিলে!— ব্রজবাবুর মুখ দিয়ে তারপর সত্যি আর কোনো কথা বার হয় না।

আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি ছাড়া আর কে দেবে বলুন! আমি যে নিরুদ্দেশ একথা আমার চেয়ে আর বেশি কে জানবে?

ব্রজবাবুর ঠোঁট দুটো একটু নড়ে মাত্র। অর্থহীন দু-একটা অব্যয় পদ তা থেকে বার হয়।

তারই উত্তরে বিশদভাবে নিজের কথা ব্যাখ্যা করে শিশির বলে,—নিরুদ্দেশ হওয়া আশ্চর্য আর কী বলুন! এতকষ্টে লেখাপড়া শিখে ও বেকার হয়ে বসে থেকে থেকে নিজের ঠিক উদ্দেশ—উদ্দেশ্যও বলতে পারেন খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাই ওই নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন।

তাহলে ওই পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার! —এতক্ষণে ব্রজবাবুর কন্ঠ থেকে যেন একটা অস্ফুট আর্তনাদ বার হয়।

হ্যাঁ, পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার একটা সমস্যা বটে!—শিশির বেশ একটু চিন্তিতভাবেই বলে।—পাঁচ হাজার টাকা তো আর সোজা কথা নয়! অত টাকা আমি এখন পাব কোথায়! তবে টাকাটা জোগাড় করতে পারলেই আমি দিয়ে দেব ঠিক করছি, শেষপর্যন্ত অনেক ভেবে ঠিক করেছি টাকাটা আমি নিজেকেই দিয়ে দেব। কারণ, সত্যি কথা বলতে গেলে আমি নিজেই নিজেকে খুঁজে পেয়েছি। হঠাৎ এই চাকরিটা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশ্চর্যভাবে আবিষ্কার করে ফেলেছি নিজেকে। সুতরাং পুরস্কারটা ন্যায়ত আমারই প্রাপ্য। অবশ্য চাকরির জন্যে ধন্যবাদটা সম্পূর্ণ আপনার পাওনা।

এই চরম আঘাত ব্রজবাবুকে বসিয়ে দেয় একেবারে,—শিশিরের এগিয়ে দেওয়া তাঁরই নিজের আরাম-কেদারায়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%