পরিরা কেন আসে না

প্রেমেন্দ্র মিত্র

পরিরা আর আসে না। জামতাড়া কি জাঞ্জিবার, —কোথাও না। মেঘলা দুপুর কী জোছনা রাত,—কক্ষনো না। পরিরা বলতে গেলে একেবারে ফেরারি। তাদের আর পাত্তাই নেই। গা-ই তাদের নেই, তবু বলা যায় তারা বেমালুম গা-ঢাকা দিয়েছে।

অথচ এই সেদিন পর্যন্ত তাদের কখন না দেখা যেত, কোথায় বা নয়!

একটু নিরালা নির্জন জায়গা পেলে তো কথাই নেই! ঝিলের ধারে ঝাউতলা, কী বনের পাড়ে বড়ো জলা গিয়েছ কী, কোনো-না-কোনো পরি হাজির আছেই।

আর পরি দেখেছ কী, অমনি বর পেয়েছ। বর দেওয়া সম্বন্ধে তারা একেবারে মুক্তহস্ত, মানে মুক্তকন্ঠ। বর দেবার জন্যে রীতিমতো তাদের গলা সুড়সুড় করছে রাতদিন।

আর বর বলতে সে কী যেমন তেমন বর!

রাজ্য, রাজকন্যে তো কথায় কথায়! এমনকি হাঁচি কাশি দাঁত-কনকন পর্যন্ত সারাবার বর তারা আপনা হতে, না চাইতেই দিয়ে বসে আছে।

তখন তাই ভাবনা-চিন্তা একরকম ছিল না বললেই হয়।

থাকবে কোথা থেকে?

গরিব গেরস্তের বউ হয়তো শাশুড়ির ভয়ে ভেবে সারা—বেড়ালে মাছ খেয়ে গিয়েছে হেঁসেল থেকে, এখন দজ্জাল শাশুড়িকে বোঝায় কী?

কিন্তু পরিরা থাকতে আবার ভাবনা!

ঠিক সময় বুঝে এক জল-পরি কোথা থেকে এসে হাজির!

কাউকে কাঁদতে দেখলে তো আর রক্ষে নেই। জল-পরি বর দেবার ফিকিরেই ঘুরে বেড়াচ্ছিল। গেরস্ত-বউয়ের চোখের জল দেখেই দাঁড়িয়ে পড়ে বলে,—কাঁদছ কেন গা?

গেরস্ত-বউ হয়তো অতটা খেয়াল করেনি, কে এসেছে না এসেছে। তা ছাড়া পরিদের আসাটাও নেহাত নি:সাড়ে আবছা রকম তো! সে ঝংকার দিয়ে বলে,— আমি কাঁদছি তা তোমার কী গা? আমি তো আর তোমার ছেরাদ্দের পিন্ডি কেঁদে ভাসাইনি!

জল-পরি এবার রেগে আগুন হয়ে ওঠে ভাবছ?

উঁহুঃ—তাদের চটানো অত সোজা নয়। অত চটলে তাদের চলে-ই না। একেবারে মধুর মতো মিষ্টি গলায় সে বলে,—আহা রাগ করো কেন? আমায় বলো-ই-না কী তোমার দুঃখ!

গেরস্ত-বউ এতক্ষণে জল-পরিকে চিনতে পারে। চিনতে পেরে একেবারে জিভ-কেটে লজ্জায় জড়সড়ো, প্রথমে তো কথাই বলবে না, তারপর জল-পরির অনেক পেড়াপীড়িতে অনেক কষ্টে জানায় যে তার হেঁসেল থেকে বেড়ালে মাছ চুরি করে খেয়ে গেছে। শাশুড়ি জানলে আর রক্ষে থাকবে না।

গেরস্ত-বউয়ের মুখ থেকে কথাটা সবে খসেছে কিনা,—ব্যাস—জল-পরি আর সেখানে নেই। তারপর চক্ষের পাতা পড়েছে কি না-পড়েছে আবার সে এসে হাজির।

আর হাজির কি শুধু হাতে?

মোটেই না।

তার সঙ্গে মস্ত একটা—

—ও মা, তাইতো! সঙ্গে মস্ত একটা হুলোবেড়াল!

গেরস্ত-বউ খানিক ফ্যাল-ফেলিয়ে তাকিয়ে থাকে। জল-পরির মুখে হাসি আর ধরে না। ভাবটা এই আর কী— কেমন বলেছিলাম না, আমি থাকতে আর ভাবনা নেই!

পরিই হোক আর যে-ই হোক, গেরস্ত-বউ তার তোয়াক্কা রাখে না। তার মেজাজ দস্তুরমতো বিগড়ে গেছে। খর-খরিয়ে উঠে বলে,—বলি, কেমনতর পরি গা তুমি!

জল-পরি বেশ একটু হকচকিয়ে যায়, বলে,—কেন? এইতো,—মানে এইতো সেই হুলোবেড়াল, যে তোমার হেঁসেলের মাছ খেয়েছে!

—তা, আমি কি ওই হুলোবেড়াল ভেজে শাশুড়িকে দেখাব?—খেঁকিয়ে ওঠে দুখিনি গেরস্ত-বউ।

জল-পরি একেবারে অপ্রস্তুত।

—তাইতো! তাইতো! বড়ো ভুল হয়ে গেছে! বলে,—তৎক্ষণাৎ সে আবার উধাও।

ছাড়া পেয়ে হুলোবেড়াল তখন আড়াই পা গেছে কি না-গেছে, জল-পরি মস্ত বড়ো এক মাছ— জলজ্যান্ত, জলের মাছ নিয়ে এসে হাজির।

সে মাছ নিয়েও কম ফ্যাসাদ নয়।

মাছ বলে মাছ! সে মাছে অমন দশটা গেরস্তের জ্ঞাতি-ভোজন হয়ে যায়!

এত বড়োমাছ নিয়ে গেরস্ত-বউ এখন করে কী!

যাই করুক, আমাদের এখন তা ভাবলে তো চলবে না। আমাদের এখন আসল কথাই বাকি।

হ্যাঁ, তারপর যা বলছিলাম,—পরিরা আসে না। আসে না আজ অনেক দিন।

পরিদের শেষ আবির্ভাবের তারিখ হল ১৮ অগ্রহায়ণ ১১১৯ খ্রিস্টাব্দ। এখানে অবশ্য জানিয়ে রাখা ভালো যে, এই তারিখ নিয়ে সামান্য একটু মতভেদ পন্ডিত-মহলে আছে। বিশ্ববার্তা-সংগ্রহের সম্পাদকের মতে পরিদের শেষ আবির্ভাব ঘটে ৭ অগ্রহায়ণ ১১১৯ খ্রিস্টাব্দ। খ্রিস্টাব্দ ও মাস সম্বন্ধে কোনো আপত্তি না করলেও বিজ্ঞান-কল্পতরুর রচয়িতা বিশ্ববার্তা-সংগ্রহ-এর দেওয়া তারিখ সম্পূর্ণ কাল্পনিক বলে মনে করেন। তাঁর মতে পরিরা শেষ পৃথিবীতে দেখা দেয় ৭ নয় ১১ অগ্রহায়ণ ১১১৯ খ্রিস্টাব্দ।

বিশ্ববার্তা-সংগ্রহ ও বিজ্ঞান-কল্পতরুর মধ্যে এই তারিখের তর্ক নিয়ে দু বৎসর ধরে যা যা লেখা হয়েছিল এবং পরে এই তর্ক মানহানির মোকদ্দমায় গড়ালে তাতে উভয় পক্ষ থেকে, যা যা জেরা ও জবানবন্দিতে বলা হয়েছিল, সমস্ত পর্যালোচনা করে আমি এই সিদ্ধান্তই করেছি যে, ৭ এবং ১১ এই দুই তারিখ নিয়ে যে গোলোযোগ, তা এই তারিখ দুটি যোগ করে দিলেই মীমাংসা হয়ে যায়। কারও তখন কিছু আপত্তি করবার থাকে না। এবং আপত্তি করলেই বা শুনছে কে?

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, ১৮ অগ্রহায়ণ ১১১৯ খ্রিস্টাব্দেই সর্ববাদি-সম্মতরূপে শেষপরি শেষবার পৃথিবীতে দেখা দেয়।

কোথায় দেখা দেয় জানো? বিষমগড় রাজ্যের রাজপ্রাসাদ-সংলগ্ন উদ্যান-বাটিকায় যুবরাজ পরম ভট্টারক শ্রীশ্রীধুরন্ধররাম ধনুষ্টংকারের সামনে।

পরির আবির্ভাবের কাহিনি শুরু করবার আগে বিষমগড় রাজ্যের একটু বর্ণনা বোধ হয় করা দরকার।

বিষমগড় রাজ্যটি হল ঠিক রামখেলখন্ড রাজ্যের দক্ষিণে। রামখেলখন্ড রাজ্যটি কোথায় যদি না জানা থাকে, তাহলে অবশ্য আমি নাচার! তবে নিতান্ত অজ্ঞ ও অনভিজ্ঞদের জন্যে বিষমগড় রাজ্যের একটি চৌহদ্দি এখানে দিয়ে দেওয়া হল।

বিষমগড় রাজ্যের দক্ষিণে বিরাট মরুভূমি। তার পূর্ব দিকে এক বিশাল তৃণপাদপহীন বালুকাময় প্রদেশ, তার পশ্চিমে যতদূর দেখা যায়—শুধু, বন্ধ্যা বালির সমুদ্র এবং তার উত্তরে—ওঃ! উত্তরে—রামখেলখন্ড বুঝি আগেই বলেছি? তা যাই বলে থাকি, রামখেলখন্ড আসলে এমন একটি জায়গা—যেখানে কী আকাশে, কী নীচে, কোথাও জলের বাষ্পটি নেই। সেখানে না জন্মায় কিছু, না থাকে জনমনিষ্যি। সত্যি কথা বলতে কী, রামখেলখন্ডকে মরুভূমি বলে কেউ বর্ণনা করলে তার নামে মামলা আনা যায় না।

বিষমগড় রাজ্যের চারধার যেমন সরস, সে রাজ্যের বাসিন্দাদের ভেতরটাও প্রায় তাই। তারা খায় দুবেলা দুমুঠো ভুট্টার দানা, আর চেনে শুধু সোনা। সে সোনা তাদের মাঠে ফলে না ; তবু সিন্দুকে কেমন করে জমা হয়, সেইটাই তাজ্জব ব্যাপার!

এই সোনা-সর্বস্ব দেশের মধ্যে সব চেয়ে সোনা-সেয়ানা হলেন কুমার শ্রীশ্রী ইত্যাদি ধুরন্ধর ইত্যাদি। এই কুমার ধুরন্ধরের সামনেই সেই ১১১৯ খ্রিস্টাব্দের অগ্রহায়ণের স্নিগ্ধ অপরাহ্ণে শেষপরির আবির্ভাব। তখন অস্তগামী সূর্যের স্বর্ণাভ কিরণে আকাশ পৃথিবীর,—মানে,—যা-যা হবার হয়েছে, বাগানের ফুলের গন্ধ নিয়ে বাতাস যা-যা করবার করেছে, এবং সাধারণত এ-রকম সময় আর যা-যা ঘটে থাকে, সবই ঘটেছে।

কুমার ধুরন্ধর তন্ময় হয়ে সূর্যাস্তের আলোয় রঙিন একটি মেঘের দিকে চেয়ে ছিলেন। (কেন চেয়েছিলেন সেটা পরে প্রকাশ পাবে) হঠাৎ কাছেই মধুর গলায় তাঁর নাম উচ্চারিত হতে শুনে চমকে ফিরে তাকিয়ে দেখেন এক পরি।

এমন পরি দেখা কিছু অদ্ভুত নয়, কিন্তু এ পরি আবার ডাকল,—কুমার ধুরন্ধর!

বোঝা গেল পরি কুমারকে চিনে ফেলেছে। চিনে ফেলাটা সত্যিই অবশ্য আশ্চর্য। কারণ চেহারা দেখে ধুরন্ধরকে রাজকুমার বলে সন্দেহ করা অত্যন্ত কঠিন,—প্রায় অসম্ভব বললেই হয়। মাথায় কেলে হাঁড়ি ঝোলানো সগাঁঠ এবং সুদীর্ঘ একটি বংশদন্ড, না তিনি,—দেহ-সৌষ্ঠবে কে যে শ্রেষ্ঠ, তা বলা যায় না। তার ওপরে তাঁর একটি পা একটু খোঁড়া ও একটি চোখ কানা।

পরিদের সেই প্রচন্ড প্রাদুর্ভাবের দিনে এ-হেন পেটেন্ট চেহারা কেমন করে যে পরিদের নজর ও বর বাঁচিয়ে এতদিন তিনি মজুদ রেখেছেন, তা ভাবলে অবাক হবারই কথা। তবে শোনা যায়, দশ মাসের জায়গায় আট মাসেই ভূমিষ্ঠ হওয়ায় পরিরা গোড়াতেই তাঁর পাত্তা পায়নি। তারপর থেকে একটু জ্ঞান হতেই তিনিও তাদের আমল দেননি। প্রথমত বিষমগড়ের রাজা অর্থাৎ তাঁর বাবার খেয়ালে কুমার ধুরন্ধর ছেলেবেলা থেকেই দেশ-দেশান্তরে ঘুরেই বেড়িয়েছেন এতদিন। সৌরাষ্ট্রের পরিরা তাঁর সন্ধান পেতে না-পেতেই তিনি ঠিকানা বদলে গেছেন কোশলে, আর কোশলের পরিরা বাড়ি ঘেরাও করতে এসে দেখেছে তিনি বাসা তুলে নিয়ে গেছেন কপিশায়।

এ-রকম ঘন ঘন ঠিকানা বদলের মূল অবশ্য কুমারের বাবা, স্বয়ং বিষমগড়ের রাজা। মন্দ লোকে বলে যে বাড়ি-ভাড়া ফাঁকি দেবার জন্যেই নাকি তাঁর এই ফিকির। দেশে থাকলে রাজার উপযুক্ত ঘটা করে থাকতে যে খরচটা হত, বিদেশে বেনামিতে থাকার দরুন সেটা তো বেঁচে যায়ই, তার ওপর বাড়ি-ভাড়াটা ফাঁকি দিতে পারলে সোনায় সোহাগা। মন্দ লোকের এ-সব কথা অবশ্য কানে না তোলাই উচিত। আমরা যতদূর জানি ছেলেকে গোড়া থেকে দেশ-বিদেশের ব্যাবসা-বুদ্ধিতে পাকা করবার জন্যেই বিষমগড়ের রাজার এই বন্দোবস্ত।

এত সব বাধা সত্ত্বেও দু-একটা উটকো পরি কখনো-সখনো কুমার ধুরন্ধরকে আচমকা ধরে যে না ফেলেছে এমন নয়, কিন্তু কুমারকে কায়দা করতে পারেনি কেউ। ছেলেবেলা থেকেই ধুরন্ধরের কেমন পরি-টরির ওপর কোনো প্রীতি নেই। আর সব ছেলে যখন খেলার নেশায় পরিদের সঙ্গে মেঘের দেশে উধাও হয়ে গিয়েছে, তখন কুমার ধুরন্ধর ঘরের কোণে বসে বসে নামতা মুখস্থ করেছেন চক্র-বৃদ্ধি সুদের। পরিরা পরিচয় করতে এসে ধমক খেয়ে গেছে ফিরে। বহুদিন বাদে দেশে ফেরবার পর আজ এই প্রথম তাঁর পরির হাতে পড়া।

আজকেও পরি বলে চেনামাত্র ধুরন্ধরের মুখের চেহারা যা হয়ে ওঠে—তাতে সে বেচারির বুক শুকিয়ে যায়। কিন্তু তারও আজ বড়ো দায়। সারাবেলাটা একদম বরবাদ গেছে। কাউকে বর দেবার সুযোগ মেলেনি। সেই দুঃখেই গতিক বিশেষ সুবিধের নয় বুঝেও, চট করে সে ‘উবে’ যেতে পারে না। কোনোরকমে সাহস করে দাঁড়িয়ে থেকে আপ্যায়িত করবার চেষ্টায় হেসে বলে,—আপনি মেঘের বাহার দেখছিলেন বুঝি!

—দেখছিলাম তা হয়েছে কী?—খেঁকিয়ে ওঠে ধুরন্ধর।—মেঘের বাহার বুঝি আমাদের দেখতে নেই? ওরকম একখানা মেঘে-পাড় বসাতে ক-ভরি সোনার জরি লাগে কষে বলুন দেখি, কে কেমন ওস্তাদ দেখি!

আস্ফালনটা করে ফেলার পর ধুরন্ধরের বোধ হয় খেয়াল হয়, সামান্য একটা পরির কাছে এ-সব গভীর কথার কোনো কদর নেই! ধমক দিয়ে তাই তিনি বলেন,—কিন্তু তুমি এখানে কী মনে করে এসেছ বাপু?

পরি থতোমতো খেয়ে একটু শুকনো হাসি হেসে বলে,—আমি সন্ধ্যাপরি! আপনার যদি কোনো বর-টর দরকার থাকে,—

ধুরন্ধরের ধমকে পরিকে আর কথা শেষ করতে হয় না ; —যাও—যাও—যাও —যাও! ও-সব বর-টর নিয়ে আমার কাছে সুবিধে হবে না। সরে পড়ো এই বেলা।

সন্ধ্যাপরি তবু একেবারে আশা ছাড়ে না। মিনতি করে বলে,—কিন্তু দেখুন, এই আপনার চেহারা...।

—কেন আমার চেহারাটা কি খারাপ?—বাঁকা সুরে জিজ্ঞেস করেন ধুরন্ধর।

অত্যন্ত বিপন্ন হয়ে সন্ধ্যাপরি আমতা আমতা করে বলে, —না তা ঠিক নয়, মানে কিনা...।

—থাক আর অত ঢোঁক গিলতে হবে না। আমার চেহারার ছিরি কি আর আমি জানি না? কিন্তু এ চেহারা বদলাব কেন বলো তো বাপু! বদলে আমার লাভ?

এমন কথা পরি তার পাখার জন্মে শোনেনি। সে একেবারে থ হয়ে যায়।

ধুরন্ধর বলে চলেন,—তুমি বর দিয়ে আমার চেহারাটি ভালো করে দিতে চাও এই তো? কিন্তু ভালো চেহারার ফ্যাসাদ জানো? এমন নির্বিঘ্নে নিশ্চিন্তে নিজের ব্যাবসা তাহলে আর করতে হবে না। আজ অমুক রাজকুমারীর উদ্যান-সভা, কাল অমুক রাজার সঙ্গে নৌকো-বিহার, এখানে নেমন্তন্ন, ওখানে বৈঠক—সবার ভালোবাসার টানাটানিতে প্রাণ একেবারে যায় আর কী! চেহারা এমন বলেই না কেউ আর কাছে ঘেঁষে না! উঁহু বাপু, এ চেহারা আমি লাখ টাকাতেও বদলাচ্ছি না!

সন্ধ্যাপরি হতাশভাবে শেষ চেষ্টা করে বলে,—তাহলে আর কোনো বর?

—কী বিরক্ত করো বলোতো তোমরা! —রীতিমতো চটে ওঠেন কুমার ধুরন্ধর : কটা বর তোমরা দিতে পারো? কী বর? দুনিয়ার সেরা চুনি, চুনারের আঞ্জনি আমায় এখুনি এনে দিতে পারো?

সন্ধ্যাপরি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলে,—এনে দিতে পারতুম, কিন্তু এইমাত্র আর এক পরি সেটা মদ্র-দেশের এক ময়রাকে বর দিয়ে ফেলেছে। এখন সেটা টানাটানি করতে গেলে মাঝখানেই আটকে যাবে, কারুর কাছে পৌঁছোবে না। এ সব হিরে-জহরতের দোষই এই! সবাই রাতদিন টানা-হ্যাঁচড়া করছে।

কুমার ধুরন্ধর দাঁত খিঁচিয়ে ওঠেন—থাক থাক! ওসব বক্তৃতা আর শুনতে চাই না। মুরোদ যে তোমাদের কত, তা বেশ বোঝা গেছে!

মুখখানি কাঁচু-মাচু করে সন্ধ্যাপরি বলে,—কিন্তু আর কিছু যদি চান, তাহলে আপনাকে তিন-তিনটে ইচ্ছে...।

ধুরন্ধর ইতিমধ্যে কী যেন ভেবে নেন। তাঁর কোটরে ঢোকা খুদে চোখটি যেন চকচক করে ওঠে। অত্যন্ত প্যাঁচাল এক হাসি হেসে ধুরন্ধর বলেন,—তিন তিনটে বর দিতে পারো?

ভালো-মানুষ পরি অত-শত হাসির মর্ম বোঝে না ; খুশি হয়ে বলে,—নিশ্চয়ই! তিনটে বর দিতে পারি এখুনি।

—হুঁ!—ধুরন্ধর খানিক পায়চারি করে বলেন : আচ্ছা, বলো দেখি সমতটে সোনামুগের ভাও এখন কত?

সন্ধ্যাপরি সাধুভাষায় যাকে বলে, ভ্যাবাচাকা!

এমন বর কেউ কখনও ত্রিভুবনে শুনেছে! হতভম্ব হয়ে সে জিজ্ঞেস করে —কী বললেন?

—কেন, এই সহজ কথাটা আর বুঝতে পারলে না!—ধুরন্ধর হেঁকে ওঠেন, বলছি, সমতটে সোনামুগের এখন দর কত? সৌরাষ্ট্রের ব্যাপারীদের কাছে ধরো যদি এখন বায়না নিই, সঠিক দরটা জানা থাকলে সুবিধে কি কমখানি!

—কিন্তু এরকম বর তো হয় না!—সন্ধ্যাপরি কাতরভাবে জানায়।

—হয় না কীরকম! বাঁকা নাক সোজা হয়, কানা চোখ ভালো হয়, আর সোনামুগের দর ঠিক হয় না! আলবত হয়!—ধুরন্ধরেরর চোখ রাঙা হয়ে ওঠে— অবশ্য একটিমাত্র চোখ।

সন্ধ্যাপরি নিরুপায়। কী কষ্টে ধুরন্ধরের বায়না তাকে যে মিটোতে হয় সেই জানে! এ বর দান করে তাকে রীতিমতো হাঁপাতে হয়।

কিন্তু ধুরন্ধরের কি তা বলে দয়া-মায়া আছে! তাঁর উৎসাহ এখন দেখে কে! এক গাল হেসে বলেন,—এবার আমার দ্বিতীয় বর, কেমন? আচ্ছা বলো তো বাপু,—

তের টঙ্কা মন সাচ্চা,

ভেজাল সেরে সতেরো কাঁচ্চা।

যায় নৌকোয়,

মনে ছটাক কলশিতে খায়।

কেরায়া যোজনে আধ পণ,

যায় দু কুড়ি সাত যোজন।

কোটালের ঘুস গন্ডায় তিন কাক,

বাটখারায় টানি সেরে ছটাক।

কী দরে বেচে ঘি,

কাহনে তের পণ গুনেনি!

সন্ধ্যাপরি এবার কেঁদে ফেলে আর কী! বলে,—এ বর কিছুতেই সই নয়। কিন্তু ধুরন্ধরও না-ছোড়-বান্দা।

সন্ধ্যাপরিকে এ বরও দিতে হয়। উড়ে যাওয়া তো দূরের কথা, তার আর বুঝি দাঁড়াবারও ক্ষমতা নেই।

নেহাত মরণ নেই বলেই বুঝি ঠোঁটের ডগায় তার প্রাণটি এসে ঠেকে থাকে।

কুমার ধুরন্ধর ধনুষ্টংকার খুশি হয়ে হেসে বলেন,—যাক খুব একটা হ্যাঙ্গাম ঘুচল। এই হিসেব নিয়ে তেরোজন সরকার আজ তিনদিন হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে।

—নিন শেষ বর চেয়ে, তারপর এবার আমায় রেহাই দিন।—করুণ স্বরে মিনতি করে পরি।

—এই যে দিচ্ছি!—বলে ধুরন্ধর হেসে ওঠেন। তারপর বলেন,—

বরের হোক এমনি গুণ

যত পেলাম পাই তার তিনগুণ!

সন্ধ্যাপরি একেবারে আঁতকে উঠে বলে,—তার মানে?

—তার মানে যত বর পেয়েছি, এখন তার তিনগুণ অর্থাৎ তিন তিরিক্কে নটি বর আমার পাওনা। এই আমার তিনের ইচ্ছে।

—কক্ষনো না! কিছুতে না! এ আপনার জুয়াচুরি!—নেহাত প্রাণের দায়েই সন্ধ্যাপরি উঠে দাঁড়ায়!

ধুরন্ধর হেসে বলেন,—জুয়াচুরি নয়গো জুয়াচুরি নয়, এরই নাম ব্যাবসাদারি!

তোমাদের এত গুণ আগে কি বুঝেছি! এখন চলো দেখি, খাতায় হিসেবটা লিখিয়ে ফেলিগে। বর ফুরোবার আগেই আবার বাড়িয়ে নিতে না ভুলে যাই।

তারপর বিষমগড়ের রাজকুমারের ব্যাবসা দিন দিন যেমন ফেঁপে ওঠে, সন্ধ্যাপরির দুঃখের তেমনি আর সীমা থাকে না। দিনরাত নিজের কথার ফাঁদে, ধুরন্ধরের সেই কারবারি গদিতে সে বন্দি। এক দফা বর ফুরোতে না-ফুরোতে কুমার ধুরন্ধর তিন দফা বর বাড়িয়ে নেন—সন্ধ্যাপরির ছুটি পাবার আশা অনেক দিন আগেই ঘুচে গেছে।

সন্ধ্যাপরি কোনোদিন যদি মিনতি করে ছুটি চায়, কুমার ধুরন্ধর অমনি সরকারকে খাতা খুলে হিসেব দেখতে বলেন।

—দেখো তো সরকার, সন্ধ্যাপরির হিসেবটা! সরকারমশাই খাতা খুলে পড়ে,—জমা ২১০৬৮১, খরচ ১৭১৯৮।

কুমার ধুরন্ধর একটু হেসে বলেন,—এখনও যে অনেক বর বাকি! এ হিসেবটা চুকে যাক আগে, তারপর তো ছুটি!

সন্ধ্যাপরি জানে, এ হিসেব আর কোনোদিন চুকে যাবার নয়। মনের দুঃখে তার কাচবরণ রূপে কান্নার চিড় ধরে, তার সোনালি পাখায় পড়ে পেতলের কলঙ্ক।

এমনি করেই দিন হয়তো যেত। ধুরন্ধর ধনুষ্টংকারের কারবারের ভেতর গোটা দুনিয়াই যেত বাঁধা পড়ে। কিন্তু একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ এক কান্ড যায় ঘটে। সন্ধ্যাপরি তখন প্রায় সব আশাই ছেড়েছে। সারাদিন ব্যাবসাদারি হিসেব আর দেশ-বিদেশের বাজার-দর কষে তার মাথা ঝিমঝিম—চোখে সরষে ফুল!

ধুরন্ধর কিন্তু সারাদিনের লাভের হিসেব নিয়ে তখনও মশগুল!

নেহাত মরিয়া হয়েই পরি শেষবার ঝংকার দিয়ে ওঠে। কাঁদুনিতে কিছু হবার নয় সে বুঝেছে!

—আচ্ছা, তোমার প্রাণে কি একটু শখও নেই! আমোদ, আহ্লাদ, ফুর্তি—কিছু না! লাভের সোনা তো থাকে সিন্দুকে, চোখেও দেখতে পাও না ; শুধু খাতার হিসেব দেখেই সুখ!

ধুরন্ধর ধনুষ্টংকার এক গাল হেসে বলেন,—কী সুখ তা যদি বুঝতে! ইচ্ছে হয় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এই হিসেবের স্বপনই দেখি...।

অ্যাঁ!—সন্ধ্যাপরি হঠাৎ চমকে ওঠে। তারপর ধুরন্ধর হাঁ করবার আগেই বলে দেয়—তথাস্তু!

পরের দিন সকালে চাকর-বাকর গদি-ঘরে এসে দেখে কুমার শ্রীশ্রী ইত্যাদি, ধুরন্ধর ইত্যাদি হিসেবের খাতা বুকে করে হাসিমুখে ঘুমোচ্ছেন। সে ঘুম আজও তাঁর ভাঙেনি।

আর সন্ধ্যাপরি? সে আর সেখানে একদন্ড থাকে!

পরি-মুল্লুকে সেই যে সন্ধ্যাপরি ফিরে গেছে, তারপর থেকে কোথাও কোনো পরি আর মানুষের ত্রিসীমানায় ঘেঁষে না। সাহস করে না বোধ হয়!

সত্যি পরিরা আর আসে না!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%