কুরুক্ষেত্রে ভজা ওরফে বৃহদ্ধজ

প্রেমেন্দ্র মিত্র

বৃহদ্ধজের নাম কেউ শুনেছে? বোধ হয় শোনেনি।

কী করেই বা শুনবে! মহর্ষি ব্যাসদেব, মহাভারতে তার কথা লিখতে ভুলেই গেছেন। কুরুক্ষেত্রের আঠেরো অক্ষৌহিণী সেনার মধ্যে কোথায় সে যে অক্কা পেয়েছে, তা তিনি খেয়ালই করেননি। বৃহদ্ধজ পান্ডবদের না কৌরবদের দলে, তাও ঠিক করে বলা যায় না,—এমনকী বৃহদ্ধজ নিজেই তা জানত না।

তবু বৃহদ্ধজ যে ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে এসে পৈতৃক প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যে-কোনো পানের দোকানে কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের যে-কোনো ছবিতে তার প্রমাণ আছে। সেই যেখানে মহাবল ভীমসেন দুঃশাসনের বুকের ওপর চেপে বসে রক্তপান করছেন, তার পাশেই আমাদের বৃহদ্ধজের ছবি আঁকা। ভীমসেনের বিদঘুটে কান্ডে হতভম্ব হওয়ার দরুনই বোধ হয় সে ছবি আমাদের চোখে পড়ে না। কিন্তু একটু মনোযোগ দিলেই বৃহদ্ধজের ছবি নজরে আসতে বাধ্য। ভীমসেনের পেছনেই সেই যে ভেলভেটের জামা সুদ্ধু একটা রক্তমাখা কাটা হাত, আর তার পাশেই সেই যে মুন্ডু-ছাড়া এক কাটা-সৈনিকের ধড়—সেই হল আমাদের বৃহদ্ধজ।

কাটামুন্ড সেই চেহারার দিকে আমাদের যেমন চোখ পড়ে না, মহাভারত লিখতে বসে মহর্ষি বেদব্যাসেরও তেমনি তার কথা বোধ হয় মনে পড়েনি। নইলে এ গল্প তাঁরই লিখে যাবার কথা। অবশ্য বৃহদ্ধজের ব্যাপারটা লিখতে যাওয়া তেমন সুবিধের নয় বলেই তিনি ব্যাপারটা বেমালুম চেপে গেছেন, এমনও অবশ্য হতে পারে।

বৃহদ্ধজ নামটা অবশ্য পোশাকি, তার আসল আটপৌরে নাম হল ভজা। জন্মাবার পর পাঁজি-পুঁথি দেখে গণকঠাকুর দাঁতভাঙা ওই নামটি ঠিক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পাঁচজনের মুখে ধাক্কা খেতে খেতে বৃহদ্ধজের ভজা হতে দেরি হয়নি।

এই ভজা ওরফে বৃহদ্ধজের কথা মহর্ষি ব্যাসদেব স্রেফ ভুলে যান বা বেমালুম চেপে যান—যাই হোক, বিরাট কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধটাই আর একটু হলে তার জন্যে পালটে যেতে বসেছিল।

কর্ণকে সেনাপতি করে কৌরবদল সেদিন প্রচন্ড বিক্রমে যুদ্ধ করছে। শ্রীকৃষ্ণকে সারথি নিয়ে অর্জুন ওদিকে সংশপ্তক নারায়ণী-সেনাদের সামলাতে ব্যস্ত, এমন সময় খবর এল পান্ডব-বাহিনীর অবস্থা অত্যন্ত কাহিল। যুদ্ধিষ্ঠির দিশেহারা হয়ে শিবিরে গিয়ে শুয়েছেন, ভীমসেন দুঃশাসনের ধান্দায় কোনদিকে যে আছেন কেউ জানে না। নকুল সহদেব—দুই যমজ ভাইয়ের কে যে আছেন আর কে যে নেই, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। পান্ডব-বাহিনী যায় যায়! ‘বায়ব্য’ অস্ত্রে নারায়ণী সেনার চোখে ধুলো দিয়ে ‘ধাত্র’ অস্ত্রে ধোঁয়ার ছলনায় গা ঢাকা দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ প্রাণপণে রথ চালালেন পান্ডব আর কৌরব-বাহিনী যেখানে সবচেয়ে জট পাকিয়েছে সেদিকে।

বিদ্যুৎবেগে রথ ছুটে চলেছে, সভয়ে সৈন্যরা পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াচ্ছে, যে যেখানে পারে। হঠাৎ একী উপদ্রব!

শ্রীকৃষ্ণ প্রাণপণে রাশ টেনে রথ থামালেন। পাথুরে মাটিতে ঘোড়ার খুরে ঘষাঘষি হয়ে আগুনের ফুলকি উঠল। অর্জুন বেশ একটু গরম মেজাজে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে হে তুমি আহাম্মুক, রথের সামনে এসে দাঁড়িয়েছ যে বড়ো!’

‘আজ্ঞে—আমি ভজা—’

‘ভজা?’ অর্জুন রীতিমতো বিস্মিত।

‘আজ্ঞে, ভালো নাম বৃহদ্ধজ, তবে সবাই ভজা বলেই ডাকে।’

‘তা যাই ডাকুক, তুমি রথ থামালে কেন?’

‘আজ্ঞে কানাইদার সঙ্গে একটু দরকার ছিল’ বলে ভজা ওরফে বৃহদ্ধজ এবার শ্রীকৃষ্ণকে দেখিয়ে দিল।

‘কানাইদা!’—অর্জুন এবার রীতিমতো চটে উঠে বললেন,—‘উনি আবার তোমার কানাইদা হলেন কোন সম্পর্কে!’

‘আজ্ঞে তাঁর সঙ্গে আবার সম্পর্ক কীসের! একটা যা হোক পাতালেই হল।’

‘আচ্ছা উন্মাদের পাল্লায় পড়া গেছে তো! সরো সরো, পথ ছাড়ো। দেখছ না যুদ্ধ করতে যাচ্ছি।’

‘আজ্ঞে সেইজন্যেই তো রথ থামিয়েছি। যাবার আগে আমার একটা কথার জবাব দিয়ে যেতে হবে। নইলে এই চাকা ধরে রইলাম, রথ ছাড়ব না।’ ভজা ওরফে বৃহদ্ধজ সত্যিই রথের চাকা বেশ করে ধরল চেপে।

আরে পাগলটা করে কী! অর্জুন এবার সত্যিই প্রমাদ গণলেন। পান্ডববাহিনীর মধ্যে ইতিমধ্যে হাহাকার পড়ে গেছে। দুঃশাসনের পাত্তা পেয়ে বৃকোদর তাঁকে গদা হাতে তাড়া করে বেড়াচ্ছেন, আর কোনোদিকে তাঁর লক্ষ্য নেই। ছত্রভঙ্গ পান্ডব-বাহিনী অশ্বত্থামা, শল্য, কৃপাচার্যের হুমকিতে কোনদিকে পালাবে পথ খুঁজে পাচ্ছে না। সময় বুঝে কর্ণ ঝড়ের বেগে অর্জুনের দিকে রথ চালিয়ে একটি মোক্ষম গোছের অস্ত্র ছেড়েছেন। এ সময়ে রথের চাকা ধরে থাকলে যে ডাহা সর্বনাশ—

‘কী তোমার প্রশ্ন? সেরে ফেলো শিগগির!’ অর্জুন রীতিমতো উত্যক্ত।

‘আজ্ঞে যুদ্ধ তো খুব হচ্ছে, কিন্তু এ যুদ্ধ কীসের জন্যে বলতে পারেন?’

অর্জুন হাসবেন না কাঁদবেন, বুঝতে পারলেন না। শ্রীকৃষ্ণকে সামনে বসে মুচকে মুচকে হাসতে দেখে আরও মেজাজ গেল বিগড়ে।

‘আহাম্মুক! কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে এসেছ, তবু কীসের জন্যে যুদ্ধ তা জানো না!’

‘আজ্ঞে না। কত লোকে কত কথা বলে, ঠিক বুঝতে পারি না। তাই এবার অনেক কষ্টে আপনাদের ধরেছি। জবাব না নিয়ে আর ছাড়ছি না।’

কর্ণের বরুণাস্ত্রে ওদিকে সমূহ বিপদ ঘনিয়ে এসেছে। আকাশ মেঘে মেঘে অন্ধকার। আগুনের সাপের মতো তাতে বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে, ঘন ঘন বজ্রের হুংকার। আজ আর কেউ বুঝি রক্ষা পায় না! অথচ এ আহাম্মুককে না সরালে যুদ্ধে এগুনো যায় কী করে?

অর্জুন কাতরভাবে শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকালেন। বললেন,—‘দোহাই তোমার! একটা কিছু ব্যবস্থা করো। যুদ্ধের আগে আমায় তো লম্বা-চওড়া অনেক শ্লোক শুনিয়েছিলে। তারই দু-একটা ছেড়ে আপাতত এ বিপদ থেকে উদ্ধার করো।’

শ্রীকৃষ্ণ একটু হেসে বললেন, ‘তাতে চিঁড়ে ভিজবে বলে মনে হচ্ছে না। অত গভীর সূক্ষ্ম-তত্ত্ব সকলের মাথায় কি ঢোকে।’

তা হলে উপায়! দেব নাকি এক কোপে মাথাটা উড়িয়ে—ভাবলেন অর্জুন, কিন্তু সেটা আবার তখনকার যুদ্ধের আইনে বাঁধে। ওদিকে এ আপদকে না সরালে কর্ণের কাছে মান-প্রাণ কিছুই আর বাঁচানো যায় না।

মরিয়া হয়ে অর্জুন, ভজা ওরফে বৃহদ্ধজকে বোঝাবার চেষ্টা করলেন,—‘আরে এটা ধর্মযুদ্ধ তা বুঝতে পারছ না? মানুষের কল্যাণের জন্যে যুদ্ধ। পৃথিবীতে আর যাতে লড়াই না হয় সেই জন্যে যুদ্ধ বন্ধ করবার শেষ যুদ্ধ।’

‘যুদ্ধ বন্ধ করবার শেষ যুদ্ধ?’—ভজা ওরফে বৃহদ্ধজ শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকাল, ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘সত্যি তাই?’

কর্ণের বরুণাস্ত্র, অর্জুন ইতিমধ্যে বায়ব্য অর্থাৎ হাওয়াই অস্ত্র ছুড়ে নাকচ করে দিয়েছেন, কিন্তু কর্ণ তাতে মুষড়ে পড়বার পাত্র নন। তিনি এমন একটি ভার্গবাস্ত্র ছেড়েছেন যা পান্ডব-বাহিনীকে মই-মাড়ান করে জগদ্দল পাহাড়ের মতো ছুটে আসছে অর্জুনের দিকে। রথ আর না সরালে নয়।

‘পৃথিবীতে মারামারি—কাটাকাটি যুদ্ধ আর তাহলে সত্যি হবে না?’ বৃহদ্ধজের চোখ জ্বল জ্বল করছে আশায়। ‘বলুন, সত্যি বলুন!’

নারায়ণের চাবুকের একটা মৃদু শিস শোনা গেল। রথ-সমেত ঘোড়াগুলো লাফিয়ে গেল এক পাশে সরে। ভজা ওরফে বৃহদ্ধজের প্রশ্নের জবাব শোনা আর হল না। ভার্গবাস্ত্র গড়িয়ে গেল—তাকে থেঁতলে গুঁড়িয়ে কচু-কাটা করে। একটা হাত কোথায় গেল ছিটকে! ধড়টা রইল পড়ে, আর কোথায় গেল মাথাটা গড়িয়ে দেখাই গেল না।

দেখা গেলে, কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধের আঠেরো অক্ষৌহিণী সেনার এক কাটা সৈনিক, ভজা ওরফে বৃহদ্ধজ হাসিমুখে না হতভম্ব হয়ে মরেছে বোঝা যেত।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%