প্রেমেন্দ্র মিত্র

বিশ্বনাথ পাড়াগাঁয়ের ছেলে।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে দুপুররাত্রে বাঁশবনের ভেতর দিয়ে সে তিন ক্রোশ অনায়াসে বেড়িয়ে আসতে পারে। অমাবস্যায় গ্রামের সীমানার শ্মশান থেকে মড়া পোড়ানো কাঠ সে কতবার বাজি ধরে নিয়ে এসেছে। কিন্তু ভয় তার শুধু কলকাতা শহরকে।
যেখানে দু-পা এগুতে হলে মানুষের গায়ে ধাক্কা লাগে, ইলেকট্রিক আর গ্যাস লাইটের কল্যাণে যেখানে দিন কী রাত চেনবার জো নেই বললেই হয়, সেইখানেই এক রাতে সে যা বিপদে পড়েছিল!
বিশ্বনাথ বলে—‘না, কলকাতার শহরে সন্ধ্যার পর বেরোনো নিরাপদ নয়।’
আমরা হেসে উঠলে, বলে, ‘না হে না, চৌরঙ্গি, সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউয়ের কথা বলছি না। কলকাতাটা তো আগাগোড়া চৌরঙ্গি নয়। শোন তাহলে—’
‘সেবার গাঁয়ের লাইব্রেরির জন্যে বই কিনতে কলকাতায় গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম একদিন থেকেই বইপত্র সব কিনে রাত্রের টেনে বাড়ি চলে আসব। কিন্তু কলকাতায় গেলে নতুন বায়স্কোপ থিয়েটার না দেখে কেমন করে ফেরা যায়। প্রথম দিনটা তাইতেই কেটে গেল। দ্বিতীয় দিনে কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে বইটই সব কিনে ফেললাম। সঙ্গে বিছানাপত্রের বা তোরঙ্গ বাক্সের ঝঞ্ঝাট ছিল না। শুধু একটি সুটকেশ তাতে বইগুলো ভরে একেবারে শিয়ালদা স্টেশনে গিয়ে উঠলেই হত।
কিন্তু হঠাৎ কী খেয়াল হল একবার অবিনাশের সঙ্গে দেখা করে যাই।
অবিনাশ আমাদের গ্রামের ছেলে। স্কুলে আমার সঙ্গেই পড়াশোনা করেছে। কলেজেও কয়েক বছর আমরা এক সঙ্গে পড়েছিলাম। অবিনাশ বেশি দিন অবশ্য কলেজে থাকেনি। অত্যন্ত খেয়ালি ছেলে— কোনো কাজে বেশি দিন লেগে থাকবার মতো ধৈর্য তার ছিল না। ছেলেবেলা থেকেই কেমন যেমন তার উড়ু উড়ু ভাব। বাড়ি থেকে যে কতবার সে ছেলেবেলা পালিয়ে গেছে তার ঠিকানা নেই। বড়ো হয়েও তার সে স্বভাব কাটেনি। কথা নেই, বার্তা নেই হঠাৎ একদিন হয়তো আমরা শুনলাম অবিনাশ হেঁটে সেতুবন্ধ যাবার জন্যে বেরিয়ে পড়েছে। তারপর হয়তো দুমাস তার দেখা নেই। আমরা কোনোরকমে প্রক্সি দিয়ে হয়তো সেবার তার কলেজের খাতায় কামাইয়ের সংখ্যা কমিয়ে রাখলাম। কিন্তু এমন করে কতদিন রাখা যায়। বছরের শেষে একজামিনেশনের সময়ে দেখা গেল অবিনাশ আমাদের প্রক্সি দেওয়া সত্ত্বেও কলেজে এত কম দিন এসেছে যে তার পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি পাওয়া অসম্ভব। আমরা দুঃখিত হলাম। ছেলেটা এত আমুদে মিশুক ছিল যে আমরা সবাই তাকে ভালোবাসতাম। কিন্তু অবিনাশের যেন স্ফূর্তিই হল। বললে ‘তবে আর কী ভাই ; বর্মাটা একবার ঘুরে আসি।’
তারপর অবিনাশের আর দেখা নেই। আমাদের তুলনায় তার ধাতই ছিল আলাদা।
পৃথিবীটা যে মস্ত বড়ো এই আনন্দেই তার মন ভরপুর হয়ে থাকত। পৃথিবীর এই বিশালতাকে দেশে দেশে, নতুন নতুন পথে ঘুরে ঘুরে উপভোগ করে, তার আশ মিটতে চাইত না। যে সব দেশ সে এখনও দেখেনি যে সব পথে সে যায়নি তার আকর্ষণের কথা সে মাঝে মাঝে এমন তন্ময় হয়ে বলত যে আমাদেরও কখনো কখনো মোহ ধরে যেত— কেমন যেন মনে হত এই ছোট্ট শহরের ছোট্ট জানা কটি রাস্তায় দুবেলা যাওয়া আসায় জীবনের কোনো সার্থকতাই নেই—পথ যেখানে অফুরন্ত, আকাশের যেখানে কূলকিনারা নেই, এমন জায়গায় বড়ো করে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে না পারলে যেন বাঁচাই বৃথা।
কিন্তু আমাদের এ ক্ষণিক মোহ অবশ্য খানিক বাদেই কেটে যেত কিন্তু অবিনাশেরও এই মোহই ছিল সব।
মাস তিনেক আগে আমার গ্রামের ঠিকানায় এই অবিনাশের একটা চিঠি পেয়েছিলাম বহুদিন বাদে। একটা গলির ঠিকানা দিয়ে লিখেছিল যে অনেক জায়গা ঘুরে ফিরে, সে কলকাতায় এই ঠিকানায় আপাতত আছে। আমি এসে তার সঙ্গে যেন দেখা করি। অনেক গল্প তার আমায় বলবার আছে। এতদিন বাদে তাকে সেই ঠিকানায় পাওয়া হয়তো যাবে না জেনেও একবার যেতে ইচ্ছে হল।
বাড়ির নম্বরটা ভুলে গিয়েছিলাম, কিন্তু গলিটা মনে ছিল। ভাবলাম কলেজ স্ট্রিট থেকে তো বেশি দূর হবে না ; ট্রেনেরও এখন দেরি আছে। একবার দেখা করেই যাই—যদি তাকে পাওয়া যায়।
একটু খোঁজাখুঁজির পর—একটা গলি রাস্তায় ঢুকে একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, আর একটু গেলেই অবিনাশ যে গলিতে থাকে তা পাওয়া যাবে।
রাত তখন বেশি নয়। বড়ো জোর আটটা হবে। কিন্তু গলি দিয়ে খানিক দূরে হেঁটেই একটু আশ্চর্য হয়ে গেলাম। গলিই হোক আর যাই হোক কলকাতার পথ তো বটে। অথচ এই আটটা রাত্রে সেখানে একটি জনপ্রাণী নেই।
ভেবেছিলাম খানিক দূর গিয়ে আবার কাউকে পথ জিজ্ঞেস করব। কিন্তু লোক কোথায়? তাছাড়া গলিটাও যেন ফুরোতে চায় না।
একবার সন্দেহ হল হয়তো ভুল পথে এসেছি। কিন্তু যে লোকটা আমায় খবর দিয়েছে আমার ভুল পথ দেখিয়ে তার লাভ কী? নির্জন রাস্তায় চুরি ডাকাতি? কিন্তু আমার কাছে কী এমন লাখ পঞ্চাশ টাকা আছে যে চোরেদের এত ষড়যন্ত্র করতে হবে? আমার সাজপোশাক দেখেও বড়োলোক বলে ভুল করবার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে?
আরও খানিকটা এমনি করে এগিয়ে গেলাম। পথ তেমনি নির্জন। বাতিগুলোও কি এ পথের মিটমিটে হতে হয়! একে গ্যাসপোস্টগুলো অত্যন্ত দূরে দূরে, তার ওপর কী কারণে জানি না আলো তাদের এত ক্ষীণ যে রাস্তা আলো হওয়া দূরের কথা সেগুলো যে জ্বলছে এইটুকুই বুঝতে কষ্ট হয়।
খাস কলকাতার ভেতর এমন রাস্তা আছে কে জানত! দুপাশের বাড়িগুলো যেন মান্ধাতার আমলের তৈরি। কোনোরকমে হাড় বেরুনো ইটকাঠের জীর্ণ দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে আছে। না আছে কোনো বাড়িতে একটা আলো, না জন-মানুষের একটু শব্দ। সে রাস্তার পাশে সারের পর সার পোড়ো বাড়ির মতো সব সাঁ সাঁ করছে।
ক্রমশ মনে হল একটা কেমন যেন ভাপসা গন্ধ নাকে আসছে। বহুদিন আলো বাতাস যেখানে ঢোকেনি, মানুষের বাস যেখানে বহুদিন ধরে নেই, এমনি ঘরে ঢুকলে যেরকম গন্ধ পাওয়া যায়, গলিটায় ঠিক সেই রকম একটা গন্ধ পাচ্ছিলাম।
লোকটা বলেছিল কিছু দূর গেলেই ডাইনে গলি পাওয়া যাবে। কিন্তু জনমানবহীন জীর্ণ গাড়ির সারের ভেতর ডাইনে বাঁয়ে কোথাও কোনো পথ নেই।
সামনের পথও খানিক দূর গিয়ে দেখলাম বন্ধ। যে পথে ঢুকেছি গলিটার ওই একটি মাত্রই তাহলে বেরুবার রাস্তা। আশ্চর্য ব্যাপার! লোকটা মিছিমিছি আমায় ভুল পথ দেখাল কেন?
সেখান থেকে ফিরলাম। গলিটা যেন আরও অন্ধকার মনে হচ্ছিল। এতক্ষণ যে গ্যাসগুলো মিটমিট করে জ্বলছিল তারই একটা একেবারে নিভে গেছে দেখলাম। মনে হল এ গলি থেকে বেরুতে পারলে বাঁচি। ভীতু আমি নই কিন্তু কলকাতার শহরের ভেতর এমন অভাবনীয় ব্যাপার দেখে গাটা কেমন ছমছম করছিল।
সবে তো প্রথম রাত! কলকাতা শহরের সমস্ত রাস্তা এখন লোকজনে গাড়ি ঘোড়ায় মানুষের শব্দে গম গম করছে। অথচ এই পথটা কেমন করে এখন নির্জন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মনে হল আমি যেন বহুকালের প্রাচীন একটা শহরে এসে পড়েছি। সে শহরের লোকজন বহুকাল আগে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। কত বছর যে মানুষের পা সে শহরে পড়েনি কেউ যেন জানে না। আমিই যেন প্রথম সে শহরের নিস্তব্ধতা ভাঙলাম। খট খট খট—আমার নিজের পায়ের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ কোথাও নেই। সে শব্দ অদ্ভুতভাবে নির্জন অন্ধকার বাড়িগুলোর দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। আমার চোখের ওপরই কটা রাস্তার বাতি দপ দপ করে নিভে গেল। ভাপসা গন্ধটা ক্রমশ যেন বেড়ে গিয়ে এখন অসহ্য মনে হচ্ছিল। না, এ গলি থেকে যত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়তে পারি ততই মঙ্গল। কাজ নেই আজ আর অবিনাশের খোঁজ করে। পরে একদিন আবার আসলেই হবে।
খানিক দূর গিয়ে আবার স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। এদিকেও গলির পথ যে বন্ধ! কিন্তু তা কেমন করে হতে পারে? আমি একটা পথে যে গলিতে ঢুকেছি এ বিষয়ে তো কোনো সন্দেহ নেই। এ গলি দিয়ে এগুবার সময়ে আশপাশে কোনো পথই তো দেখতে পাইনি। তাহলে গলির দুমুখ বন্ধ কেমন করে হয়?
ভাবলাম, হয়তো আরও একটা পথ ছিল। যাবার সময় আমার দৃষ্টি কোনোরকমে এড়িয়ে গেছে, এখন আসবার সময় ভুল করে সেইটেতেই ঢুকে পড়েছি। সেইটেরই মুখ এখানে বন্ধ। কিন্তু এরকম ভুলই বা হবে কেমন করে? আমি অন্যমনস্ক হয়ে তো ছিলাম না! আগাগোড়াই তো সজাগ হয়ে চলেছি! রাস্তায় লোক না যাক, একটা বাড়িতে যদি একটু আলো দেখা যেত! কাউকে না হয় ডেকেই জিজ্ঞেস করতাম।
যাইহোক, এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কোনো লাভ নেই জেনে আমি আবার ফিরলাম। গলি থেকে বেরুতে হবেই। আবার সেই নির্জন অন্ধকার গলি দিয়ে শুধু নিজের পায়ের শব্দ শুনতে শুনতে এগিয়ে চললাম। গলিটা যেন ক্রমশ দীর্ঘই হয়ে চলেছে। আমার অজান্তে কে যেন ইতিমধ্যে সেটা বাড়িয়ে আরও লম্বা করে দিয়েছে।
এবারেও যখন দেখলাম গলির মুখ বন্ধ, তখন সত্যিই বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। একে আমরা পাড়াগাঁয়ের লোক। ফাঁকা আকাশ ফাঁকা মাঠের মধ্যে মানুষ হয়েছি। শহরে এলে অমনিই আমাদের হাঁফ ধরে। তার ওপরে এই ভাপসা গন্ধভরা অন্ধকার গলি—চারদিক থেকে সে যেন আমাকে জেলখানার মতো বন্দি করে ফেলবার ষড়যন্ত্র করেছে। ওপরে চেয়ে যে একটু আকাশ দেখতে পাব তারও জো নেই। কেমন একটা ধোঁয়াটে কুয়াশার বাতাস আচ্ছন্ন হয়ে আছে। তার ভেতর দিয়ে একটা তারাও দেখা যায় না।
যত এই অদ্ভুত ব্যাপার ভাবছিলাম মাথাটা ততই গুলিয়ে আসছিল। কী করব কিছুই ভেবে পাচ্ছিলাম না। সুটকেশটা বইয়ের ভারে বেশ ভারীই ছিল। সেটা বয়ে বয়ে বেশ ক্লান্তই নিজেকে মনে হচ্ছিল। এমনি করে আর খনিকক্ষণ ঘুরতে হলে ক্লান্তিতেই তো বসে পড়তে হবে।
হঠাৎ বুকটা ধড়াস করে উঠল। দূরে একটা মিটমিটে গ্যাসের বাতির তলায় একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে না? তাড়াতাড়ি সেই দিকে এগিয়ে গেলাম। কাছে গিয়ে আরও অবাক হয়ে গেলাম—এই তো আমাদের অবিনাশ! এতক্ষণের ভয় ভাবনা নিমেষে ভুলে গেলাম।
আনন্দে চিৎকার করে তার নাম ধরে ডাকতেই সে চমকে ফিরে তাকাল। বললাম, ‘কী আশ্চর্য তোর খোঁজ করতেই এই এক ঘণ্টা এই গলির ভেতর ঘুরে হয়রান হচ্ছি যে। বাবা! কী অদ্ভুত গলিতে থাকিস তুই। ঢুকে আর বেরোনো যায় না!’
অবিনাশ একটু হেসে বললে, এসেছিস তাহলে ঠিক!
বললাম, ‘এসেছি আর কই! তোর দেখা না পেলে এই গলির ভেতর তোর বাড়ি কি খুঁজে বার করতে পারতাম।’
সে কথার কোনো উত্তর না দিয়ে অবিনাশ বলল, ‘আমায় তাহলে তোর মনে আছে ভাই!’
‘মনে থাকবে না কেন রে?’
‘না ভাই মনে থাকে না! অথচ মানুষ যেটুকু মনে করে রাখে তার ভেতরই আমরা বেঁচে থাকি।’
আমি হেসে বললাম—‘ছিলি তো ভূপর্যটক, আবার দার্শনিক হলি কবে থেকে। যাক এখন তোর বাড়ি চল দেখি। তোর সব গল্প শুনতে চাই।’
অবিনাশ কেমন যেন একটু নিরুৎসাহ হয়ে বলল, ‘আমার বাড়ি! আচ্ছা চল। আমার চিঠি পেয়েছিলি?’
‘হ্যাঁ, সে তো তিনমাস আগে।’
‘তোর জন্যে কতদিন অপেক্ষা করেছিলাম। তারপরে আবার বেরিয়ে পড়েছিলাম।’
‘আবার? তাহলে ফিরলি কবে?’
অন্যমনস্ক ভাবে অবিনাশ বললে—‘এই আজ।’
‘এই আজ? এবারে গেছলি কোথায়?’
‘বলছি চল।’
সেই নির্জন গলি দিয়েই তখন আমরা এগিয়ে চলেছি। কিন্তু আর তখন আগের কথা কিছু মাত্র মনে ছিল না।
অবিনাশ বলতে লাগল,—‘এবারে ভাই গেছলাম বহুদূর। খিদিরপুরের ডকে বেড়াতে বেড়াতে একদিন ভারি সুন্দর একটি জাহাজ দেখলাম। সুন্দর বলতে নতুন মনে করিসনে যেন। জাহাজটা অনেক পুরোনো। নোনা জল লেগে লেগে তার গায়ের রং চটে গেছে। মাস্তুলগুলো বহুদিনের পুরোনো। চিমনিগুলো ধোঁয়ায় কালো হয়ে গেছে। আগাগোড়া জাহাজটা দেখলেই মনে হয় বহুকাল ধরে পৃথিবীর কত সমুদ্রে সে যেন পাড়ি দিয়ে ঝুনো হয়ে গেছে। তার চেহারাতেই কেমন একটা ভবঘুরে রুক্ষ রুক্ষ ভাব। সেইটাই তার সৌন্দর্য। তার ওপর যখন শুনলাম যে এখান থেকে মাল নিয়ে যাবে যবদ্বীপে, তখন আর লোভ সামলাতে পারলাম না।
যবদ্বীপ! নারকেল আর তালগাছের সার তার তীর পর্যন্ত এগিয়ে এসেছে সমুদ্রকে অভ্যর্থনা করতে। বাতাসে তার জঙ্গলের মশলা গাছের গন্ধ! তার ওপর গভীর বনের মাঝে তার বোরোবুদর!
একেবারে মেতে উঠলাম ; যেমন করে হোক যেতেই হবে এই জাহাজে। জাহাজের ভাড়া দেবার মতো পয়সা নেই। অনেক কষ্টে জাহাজের হেডখালাসিকে খোঁজ করে, তার সঙ্গে ভাব করে, তাকে কিছু ঘুস দিয়ে, লুকিয়ে যাবার বন্দোবস্ত করলাম। জাহাজের একধারে বিপদের সময়. ব্যবহার করবার জন্যে ছোটো ছোটো কটা তেরপল ঢাকা বোট টাঙানো থাকে। ঠিক হল তারই একটি ভেতর আমি থাকব। কেউ তাহলে টের পাবে না। খালাসি কোনো এক সময়ে লুকিয়ে এসে আমায় খাবার দিয়ে যাবে।
গভীর রাত্রে জাহাজে চড়ে, সেই বোটের ভেতর গিয়ে হেডখালাসির নির্দেশমতো লুকিয়ে রইলাম। ভোর হবার আগে জাহাজ ছেড়ে দিল।
তারপর ক-দিন কী অদ্ভুতভাবেই না কাটিয়েছি। সারাদিন তার ভেতর লুকিয়ে থাকি। তেরপল একটু ফাঁক করে আকাশ দেখি আর জাহাজের শব্দ শুনি। গভীর রাতে সব যখন নির্জন হয়ে যায়, জাহাজের খোলে ক-জন ইঞ্জিনিয়ার আর ফায়ারম্যান আর ওপরে হাল ঘোরাবার হুইলে একজন নাবিক ছাড়া আর কেউ থাকে না তখন একবার করে বেরিয়ে নির্জন ডেকের একটি কোণে রেলিং ধরে দাঁড়াই।
এমনি করে ক-দিন বাদে জাভায় এসে পৌঁছোলাম। আগে ঠিক ছিল সবাই নেমে গেলে কোনো এক সময়ে হেডখালাসি আমার নামার ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু বন্দরে জাহাজটাকে সটান ড্রাইডকে রং করার জন্যে পাঠানো হবে ঠিক হয়েছে। সুতরাং সে ভাবে নামা যাবে না।
তাহলে উপায়? খালাসি বললে উপায় আছে। সবাই যখন জাহাজ ভেড়াবার সময় সেই কাজে ব্যস্ত থাকবে তখন যদি আমি জাহাজ থেকে জলে পড়ে একটুখানি সাঁতরে যেতে পারি তাহলেই হয়। তাতেই রাজি হলাম।
জাহাজ জেটিতে লাগাবার আয়োজন চলেছে, এমন সময় সন্তর্পণে আমি বোটের ঢাকনি সরিয়ে নেমে পড়লাম। পুঁটলিটা আমার পিঠে বাঁধাই ছিল। রেলিঙের ধারে গিয়ে জেটির উলটোদিকে ঝাঁপ দিতে আর কতকক্ষণ! কেউ দেখতেও পেল না। ঝাঁপ দিয়ে পড়েছিলাম ঠিক, কিন্তু সেই মুহূর্তে জাহাজটা জেটিতে ভেড়বার জন্যে পাশে সরতে আরম্ভ করল। জাহাজের বিশাল প্যাডলের ঘায়ে জল তোলপাড় হয়ে উঠল। কী ভীষণ তার টান! প্রাণপণেও আমি সে টান ছাড়িয়ে আসতে পারলাম না, সেই ঘূর্ণমান ভয়ংকর প্যাডলের দিকে তলিয়ে গেলাম।’
আমি শিউরে উঠে বললাম,—‘তারপর?’
‘তারপর সেই প্যাডলের ঘা! কী ভয়ংকর লেগেছে দেখবি।’
সামনে একটা গ্যাসের বাতি তখনও জ্বলছিল। অবিনাশ তার জামাটা তুলে দেখাল।
এ কী! আমার সমস্ত শরীর হিম হয়ে গেল। জামার নীচে যে কিছুই নেই—একেবারে ফাঁকা, শূন্য! ভালো করে আবার চেয়ে দেখলাম,—দেহ নেই, কিছু নেই; ওধারের গ্যাস পোস্টটা সে জামার তলা দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ওপরের দিকে চাইলাম। সেখানে অবিনাশের মাথা নেই—শূন্য শূন্য সব শূন্য!
অস্ফুট চিৎকার করে সুটকেশ হাতে আমি দৌড়োতে শুরু করলাম। কিন্তু কোথায় যাব। যে দিকে যাই নির্জন গলির মুখ বন্ধ। চিৎকার করে একটা পোড়ো বাড়ির দরজায় ঘা দিলাম। তার ভেতরের দরজা জানালাগুলো পর্যন্ত সে আঘাতের প্রতিধ্বনিতে ঝনঝন করে উঠল। কিন্তু কারও সাড়া নেই। অন্ধকার গলি মনে হল আমার চারধারে সংকীর্ণ হয়ে আসছে! অসহ্য তার ভাপসা গন্ধ। তারপরে আমার আর মনে নেই।
যখন জ্ঞান হল তখন দেখি কে একজন আমায় বলছে,—‘উতরিয়ে বাবু, ইয়ে শিয়ালদা স্টেশন হ্যায়।’
শিয়ালদহ স্টেশন! অবাক হয়ে দেখি আমি আমার সুটকেশ সমেত একটা রিকশায় বসে আছি। সামনে শিয়ালদা স্টেশন।
নেমে পড়ে তার ভাড়া চুকিয়ে দিলাম। কিন্তু কখন কেমন করে যে আমি রিকশায় উঠেছি, তাকে শিয়ালদায় আসতেই বা কখন বলেছি কিছুই মনে করতে পারলাম না।
—হ্যাঁ, তারপর খোঁজ নিয়ে জেনেছি অবিনাশ দু-মাস আগে জাভার বন্দরে অমনি করেই মারা গেছল।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন