রামরাজ্যে বিদ্রোহ

প্রেমেন্দ্র মিত্র

বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো হঠাৎ নগরে সিং দরজায় কাড়া-নাকড়ায় পড়ল ঘা।

মাঘমাসের ভোরবেলা। শহরের এখনও বলতে গেলে আলিস্যি-ই ভাঙেনি। শেষ রাত্রের দিকে স্বপ্নের মতো হালকা-কুয়াশা এখনও রাস্তার গাছগুলোর গায়ে জড়ানো। এমন সময় এক বিতিকিচ্ছির কান্ড!

নগরের যে যেখানে ছিল বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। পাত্রমিত্র সভাসদসমেত স্বয়ং মহারাজ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন সভাঘরের ছাদে। সবারই মুখ শুকিয়ে যেন আমসি।

শহরের যারা নতুন বাসিন্দা, তারা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলে, ব্যাপার কী? তিনকাল যাদের শহরে কেটেছে তারা গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বললে, ব্যাপার সঙ্গিন। এ-রাজ্যের পত্তন ইস্তক যা হয়নি সেই অঘটনই ঘটেছে এতদিনে। রাজ্যে বিদ্রোহ লেগেছে। আসছে বিদ্রোহীর দল নগর চড়াও হয়ে।

বিদ্রোহী আসছে নগর চড়াও হয়ে!

শহর-ঘেরা দেওয়ালের ওপর যারা ইতিমধ্যে গিয়ে চড়ে বসেছিল তারা চোখের ওপর হাত আড়াল দিয়ে তেপান্তরের হারিয়ে যাওয়া রাস্তাটা তখন তন্ন তন্ন করে খুঁজছে।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই তো ধুলো উড়ছে বটে বাদামতলার বাঁকটার কাছে!

আর ওই তো উড়ছে বিপ্লবের রাঙা নিশান সকালের সূর্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে!

আসছে, আসছে, সত্যি আসছে বিদ্রোহী, সটান নগরের ওপর চড়াও হয়ে। ওই তো ঝকঝকে বল্লমের ডগা জ্বলছে বিদ্যুতের মতো থেকে থেকে!

কিন্তু বিদ্রোহীরা যে আসছে, আমরা তার করছি কী?.. শুধোয় নতুন শহুরেরা।

কোথায় সেপাই? কোথায় বরকন্দাজ? কোথায় লোক-লশকর ঢাল-তলোয়ার বল্লম-ধনুক?

কোথায় সব বীর সেনাপতি? মহারাজ যা করবার ঠিকই করছেন। এ-রাম রাজ্যে এলে সব বিদ্রোহীই শায়েস্তা হয়ে যায়।

তা কথাটা নেহাত মিথ্যে নয়। ওই তো সারবন্দি হয়ে চলেছে সৈন্যের দল সিংদরজার দিকে। স্বয়ং রাজা সেনাপতি চলেছেন সাদা-ঘোড়ায় চড়ে তাদের আগে আগে। একটা দিলখোশগোছের রক্তারক্তি না হয়ে আর যায় না!

কিন্তু এ কী তাজ্জব ব্যাপার!

কোথায় বিদ্রোহীর দলবল? দূরে বাদামতলার বাঁকে যে রাঙা নিশান দেখা গিয়েছিল তা এখন সামনাসামনি এসে পড়েছে। কিন্তু সে নিশানের পেছনে কোথায় সেই বিদ্রোহী জনতরঙ্গ, নগরের ওপর যারা ঝাঁপিয়ে পড়বে দুর্বার বেগে। ভোরের কুয়াশার মতোই তারা রোদ ওঠার সঙ্গে মিলিয়ে গেল নাকি বাতাসে?

লাল নিশান তবু এগিয়ে আসে সিংদরজার দিকে। নিশান-ই বা তাকে বলে কোন লজ্জায়! লাঠির গায়ে লাগানো এক টুকরো ছেঁড়া লাল ন্যাকড়া। আর সে-নিশান যে বয়ে আনছে, যেমন তার নিজের চেহারা, তেমনি তার বাহনটির। কোথাকার বেতো বুড়ো খোঁড়া তেপেয়ে এক ঘোড়ার ওপর উইয়ে-খাওয়া ডিগডিগে এক তালপাতার সেপাই। রামঃ, রামঃ, এর নাম বিদ্রোহী!

কিন্তু তেপেয়ে ঘোড়ার সওয়ার, তালপাতার সেপাইয়ের তেজ তা বলে তো কম নয়। খোঁড়া ঘোড়ায় ন্যাংচাতে-ন্যাংচাতে সোজা যে সিংদরজার সামনে এসে হাঁক দেয়। ‘খোলো দরজা, আমি বিদ্রোহী!’

আরে কোথাকার খ্যাপা এটা! পালা, পালা, নইলে ছাতু হয়ে যাবি যে এখুনি!

কিন্তু তালপাতার বিদ্রোহী-সেপাই, আহাম্মকের মতো তবু ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সিংদরজার দিকে বল্লম উঁচিয়ে।

বিরাট সিংদরজা এবার সত্যি ধীরে ধীরে খুলতে থাকে। তার মরচে পড়া গাঁঠে-গাঁঠে কবজায়-কবজায় যেন আর্তনাদ ওঠে। ঝড়ের আগে ছেঁড়া কুটোর মতো ওকে উড়িয়ে কোথায় ফেলে দেবে!

কিন্তু এ আবার কী আজগুবি কান্ড-কারখানা! কোথায় লড়াই? কোথায় রক্তারক্তি খুনোখুনি?

নগরের সেপাই-সান্ত্রি কোথায় ঝাঁপিয়ে পড়বে বিদ্রোহীর ওপর, না, সবাই দু-সার হয়ে গিয়ে তাকে পথ ছেড়ে দেয়! স্বয়ং রাজসেনাপতি তলোয়ার হাতে তাকে সেলাম করে বলেন, ‘আজ্ঞা করুন, বিদ্রোহীবাহাদুর, বলুন কী আপনার জন্যে করতে পারি।’

বিদ্রোহীবাহাদুর ঘাড় তুলে একবার সেনাপতির মুখের দিকে অবজ্ঞাভরে তাকিয়ে কড়া-গলায় বলেন, ‘তুমি সেনাপতি বুঝি এ-রাজ্যের?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ অধীনকে সবাই তাই বলেই জানে।’

আর-একবার সাদা ঘোড়া-সমেত সেনাপতিকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে বিদ্রোহীবাহাদুর বলেন, ‘বেড়ে দুধে-ঘোড়াটি বাগিয়েছ দেখছি তো’! বলি রংটা সত্যিই সাদা, না চুনকাম করেছ?’

সেনাপতি কিছু জবাব দেবার আগেই বিদ্রোহীবাহাদুর হাত বাড়িয়ে ঘোড়ার গায়ে কষে একটা চিমটি কেটে নিজেই পরখ করে দেখেন।

নেহাত শিক্ষিত ঘোড়া, আর সেনাপতির লাগামও কড়া, তাই সামনের দু-পা একটু তুলে একবার চিঁহি ডাক ছেড়েই সাদা-ঘোড়া আবার ঠাণ্ডা হয়ে দাঁড়ায়।

বিদ্রোহীবাহাদুরের তেপেয়ে-ঘোড়া তখন তিন লাফে সওয়ার সমেত রাস্তার ধারের মনিহারি দোকানের রোয়াকে গিয়ে উঠেছে। দোকানের সওদা কিঞ্চিৎ লন্ডভন্ড করে সেখান থেকে গম্ভীরভাবে ঘোড়া নামিয়ে নিয়ে এসে বিদ্রোহীবাহাদুর ভারিক্কি চালে বলেন, ‘বড়ো বেয়াদপ ঘোড়া তো হে তোমার! দুরস্ত করতে না পারলে, ঘোড়া চড়ো কেন?’

ঘোড়ার বেয়াদপির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে সেনাপতি সবিনয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘এখন আপনার জন্যে কী করতে পারি যদি অনুগ্রহ করে জানান।’ সেখানে আমরা পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারি।

বিদ্রোহীবাহাদুর খানিক ভুরু কুঁচকে কী ভেবে নিয়ে বলেন, ‘বেশ, রাজসভাতেই আমি যাচ্ছি। কিন্তু খবরদার, মহারাজকে খাতির করছি কেউ যেন না ভাবে।’

‘আজ্ঞে, তা কখনো আমরা ভাবতে পারি!’—সেনাপতির সঙ্গে সমস্ত সৈন্যবাহিনী লজ্জায় জিভ কাটে।

বিদ্রোহীবাহাদুর এবার সদর্পে রাজসভা অভিমুখে যাত্রা করেন। তাঁর তেপেয়ে-ঘোড়া ন্যাংচাতে-ন্যাংচাতে চলে সবার সামনে। তাঁর বাঁ-হাতে লাগাম আর ডান-হাতে লাল ন্যাকড়ার নিশান! সেনাপতি ও সৈন্য-সামন্তেরা সসম্ভ্রমে তাঁর পিছু পিছু চলেন।

রাজসভার সামনে এসে এই অদ্ভুত মিছিল থামে। পাত্র-মিত্র-সমতে স্বয়ং মহারাজা নেমে আসেন সভা-ঘরের চওড়া সিঁড়ি বেয়ে বিদ্রোহীবাহাদুরকে অভ্যর্থনা করতে। বিদ্রোহীবাহাদুর প্রথমটা ঘোড়া থেকে নামবেন কি না ঠিক করতে পারেন না। তেপেয়ে-ঘোড়া নিজেই কিন্তু সমস্যাটা মিটিয়ে দেয়। মন্ত্রী মশাইয়ের পাগড়িটার রং সবুজ এবং বেশ আঁটসাঁট করে তাঁর প্রকান্ড মাথায় বাঁধা। সেটাকে বোধ হয় বাঁধাকপি বলে ভুল করে তেপেয়ে-ঘোড়া হঠাৎ গলা বাড়িয়ে সেদিকে ধাবমান হয়। আচমকা টাল সামলাতে না পেরে বিদ্রোহীবাহাদুর একটু বেকায়দা মাফিকই ভূমিতলে অবতীর্ণ হন। মন্ত্রীমশাইয়ের পাগড়িটি হঠাৎ ঘোড়ার কামড়ে খোয়া যাওয়ায় যেটুকু শোরগোল বাঁধে, তার মধ্যেই নিজেকে সামলে নিয়ে বিদ্রোহীবাহাদুর গম্ভীরভাবে উঠে দাঁড়ান। তাঁর ভাবগতিক দেখে মনে হয় যে, ব্যাপারটা এমন কিছু নয়। ঘোড়া থেকে এইভাবে নামাই যেন তাঁর দপ্তর। নগর-কোটাল শশব্যস্ত হয়ে তাঁর গায়ের ধুলোবালি ঝেড়ে দিতে ছুটে এসেছিলেন। তাচ্ছিল্যভরে বাঁ-হাতে তাকে পরিয়ে দিয়ে বিদ্রোহীবাহাদুর স্বয়ং মহারাজের দিকে ভ্রূকুটিকুটিল চোখে চেয়ে বলেন, ‘আপনিই এখানকার মহারাজ, না!’

মহারাজ অপরাধীর মতো সেকথা স্বীকার করতে বাধ্য হন।

মহারাজের আপাদমস্তক বার-দুই নিরীক্ষণ করে বিদ্রোহীবাহাদুর যেন কিঞ্চিৎ সন্তুষ্ট হয়ে বলেন, ‘তা, মহারাজ হিসেবে অবশ্য আপনাকে মঞ্চে মানায়নি।’

মহারাজের কথা শেষ হতে না হতেই বিদ্রোহীবাহাদুরের মুখের চেহারা বদলে যায়। অত্যন্ত ঝাঁঝালো-গলায় তিনি বলেন, ‘তবু এ-রাজ্যের সিংহাসন আপনার ছেড়ে দেওয়া উচিত, জানেন?

মহারাজা অত্যন্ত লজ্জিতভাবে স্বীকার করেন যে, কথাটা তিনি ঠিকমতো এখনও জানেন না।

‘এখনও জানেন না?’ বিদ্রোহী বাহাদুরের গলা ও মেজাজ দুই-ই আরও চড়া। ‘সেইকথা জানাতেই আমি এসেছি! আপনার রাজাগিরি খতম করবার জন্যেই আমার বিদ্রোহ-ঘোষণা!’

‘কিছু মনে করবেন না’ মহারাজ অনুরোধের সুরে বলেন, ‘এরকমভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিদ্রোহটা নাই ঘোষণা করলেন! এতখানি পথ আসতে শরীরের ওপর ধকল তো বড়ো কম হয়নি। খেয়ে-দেয়ে একটু বিশ্রাম করে নিয়ে দুপুর-বেলা নাগাদ রাজসভায় আরাম করে বসে বিদ্রোহটা ঘোষণা করলে হত না?’

বিদ্রোহীবাহাদুর খানিক কপাল কুঁচকে ব্যাপারটা চিন্তা করে নিয়ে সজোরে মাথা নেড়ে বলেন, ‘না, আমি বিদ্রোহী! আমার বিদ্রোহের একটা হেস্তনেস্ত না করে আপনাদের এখানে আমি জলগ্রহণ পর্যন্ত করব না।’

মহারাজের মুখ দেখে বোঝা যায় তিনি অত্যন্ত ক্ষুণ্ণ হয়েছেন। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলেন, ‘আপনার ঘোড়াও কি আপনার মতো বিদ্রোহী? তাকেও কিঞ্চিৎ দানাপানি কি দিতে পারি না?’

‘আমার ঘোড়াকে?’ বিদ্রোহীবাহাদুর একটু ইতস্তত করে বলেন, ‘হ্যাঁ, ঘোড়াকে আমার ইচ্ছে করলে দানাপানি দিতে পারেন। আমার ঘোড়াও অবশ্য বিদ্রোহী, কিন্তু সে আপনার বিরুদ্ধে নয়! ওর বিদ্রোহ শুধু আমার বিরুদ্ধে। সুতরাং ওকে খাওয়াতে চাইলে আমার আপত্তি করবার কিছু নেই। তবে দানাপানি নয়, স্রেফ বাঁধাকপি। বাঁধাকপি ছাড়া আমার ঘোড়া কিছু খায় না।’

নগর-ভান্ডারী স্বয়ং তৎক্ষণাৎ বিদ্রোহীবাহাদুরের বাহনের জানা বাঁধাকপি সংগ্রহের চেষ্টায় বেরিয়ে যান।

‘বিদ্রোহীবাহাদুরকে বাধিত করতে পারবেন ভেবে থাকেন, তাহলে কিন্তু অত্যন্ত ভুল করেছেন! আমার বিদ্রোহ বাঁধাকপিতে বশ হবার নয়।’

‘আজ্ঞে, তা কী আর জানি না! এখন কীসে আপনার বিদ্রোহ শান্ত হবে অনুগ্রহ করে যদি জানান...।’

মহারাজকে প্রায় ধমক দিয়ে থামিয়ে বিদ্রোহীবাহাদুর বলেন, ‘শান্ত হবে এ রাজসিংহাসন আপনি ত্যাগ করলে!’

মহারাজ করুণস্বরে বলেন— ‘দেখুন, প্রায় চোদ্দোপুরুষ ধরে এই সিংহাসনে আমরা বসে আসছি....’

‘চোদ্দোপুরুষ ধরে যদি বসে থাকেন, তাহলে পা ছাড়াবার জন্যেই এখন উঠে দাঁড়ানো দরকার।’ বিদ্রোহীবাহাদুরের কন্ঠ একেবারে নির্মম।

মহারাজ আবার অনুনয় করে বলেন, ‘কিন্তু, ভেবে দেখুন, আমার অতিবৃদ্ধ-প্রপিতামহ রাজাচক্রবর্তী শ্রীল শ্রীযুত দিব্যাদিত্য....’

‘রেখে দিন আপনার আপনার দিব্যাদিত্য! জানেন—আমার অতি-বৃদ্ধ প্রপিতামহ কে ছিল?’

‘আজ্ঞে, না!’ মহারাজ অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।

‘কে ছিল আমিও অবশ্য জানি না, কিন্তু কেউ একজন নিশ্চয় ছিল। বংশে ওরকম আপদ এক-আধজন থাকেই। তবে সে তো আর আপনার অপরাধ নয়!’

‘আমার অপরাধটা কী যদি জানতে পারতাম!’

‘আপনার অপরাধ?’ বিদ্রোহীবাহাদুর গর্জন করে ওঠেন, ‘নিজের রাজ্যের কতটুকু খবর আপনি রাখেন?’

‘আজ্ঞে, যথাসাধ্য খবর রাখবার চেষ্টাই করি।’

‘যথাসাধ্য চেষ্টা করেন, তবু রাজকার্যের এতবড়ো গাফিলতির খবর আপনি জানেন না!’

মহারাজ এবার মন্ত্রীর দিকে চান। মন্ত্রীমশাই পাগড়িহীন মাথার টাকে হাত বুলিয়ে আমতা-আমতা করে বলেন, ‘আজ্ঞে কোনো গাফিলতির কথা তো পাশের খাদে পড়ে গিয়েছিল। সে সংবাদ পাওয়ামাত্র বলদটিকে আহত-পায়ের শুশ্রূষার জন্যে আরোগ্যগারে পাঠানো হয়েছে, রাস্তা মেরামতের জন্যেও পূর্ত-বিভাগের ঝটিকা-বাহিনী সেখানে যাত্রা করেছে।’

‘শুধু বই খবরটুকুই আপনারা তাহলে রাখেন?’ বিদ্রোহীবাহাদুর ধমক দিয়ে ওঠেন।

মন্ত্রীমশাই সভয়ে বলেন, ‘আজ্ঞে, শুধু এই নয়, পশ্চিম মহলের পারঘাটে সরকারি খেয়া-নৌকো যথাসময়ে না পৌঁছোবার দরুন জনৈক গোয়ালার হাটে বেচবার দই একটু টকে গিয়েছিল, তৎক্ষণাৎ স্থানীয় অর্থসচিব তার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করেছেন।’

‘তবে আর কী? আমাদের একেবারে কৃতার্থ করেছেন! বিদ্রোহীবাহাদুর দাঁত খিঁচিয়ে ওঠেন, ‘অনেক খবরই তো রাখেন দেখছি। কোনো খোঁজ রাখেন, দশানি গাঁয়ের?’

‘দশানি গাঁয়ের!’ মন্ত্রীমশাই বিমূঢ়ভাবে মহারাজের দিকে তাকান।

‘ও, দশানি গাঁয়ের নামটাও বুঝি জানা নেই!’

বিদ্রোহীবাহাদুর একেবারে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।

‘বলেন কী! খুব জানা আছে!’ মহারাজাই এবার মন্ত্রীর সাহায্যে এগিয়ে আসেন, ‘ওইতো’ কাঁসাই নদীর ধারে দশানি গাঁ। অমন মিঠে ফুটি আর কোনো গাঁয়ে হয় না।

কুটির নাম শুনে বিদ্রোহীবাহাদুর একটু যেন খুশি হয়ে ওঠেন, ‘খেয়েছেন আপনি দশানির ফুটি?’

অগাধ জলে ডুবতে-ডুবতে কুটি পাওয়ার মতো, এই দশানির ফুটিটুকুই প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে মহারাজ সোৎসাহে বলেন, ‘খাইনি আবার! ফুটিত নয়, যেন চিনি মাখানো ননী!’

এতখানি উচ্ছ্বাসে এমন হিতে বিপরীত হবে কে জানত। বিদ্রোহীবাহাদুর হঠাৎ আবার দপ করে উঠল।

মহারাজের মুখ একেবারে চুন, বলবার কথা তিনি আর খুঁজে পান না।

বিদ্রোহীবাহাদুরই আবার বলেন, ‘জানেন, তিন রাত্রি দশানির কারুর চোখে ঘুম নেই!’

মহারাজ থেকে শুরু করে পাত্র মন্ত্রী পরিষদবর্গ সবাই স্তম্ভিত, নির্বাক। অনেকক্ষণ বাদে মহারাজ ক্ষীণ দুর্বলকন্ঠে উচ্চারণ করেন, ‘এ অনিদ্রার কারণ?’

‘কারণ, আপনার গাফিলতি। কাঁসাই নদীর বাঁধ দেবার জন্যে আর-বছরে যেখানে মাটি কাটা হয়েছিল সে-সব জায়গার খানাখন্দ ভালো করে ভরাট করা হয়েছে? বর্ষার জলে সেখানে পচে উঠে মশার বংশ যে বেড়েছে আর তাদের উপদ্রবে গাঁয়ের লোকের চোখে যে ঘুম নেই, বলুন এ গাফিলতির জন্যে আপনার সিংহাসন যাওয়া উচিত কি না?’

বিদ্রোহীবাহাদুর লাল নিশানের। মহারাজের একেবারে নাকের সামনে তুলে ধরেন।

মহারাজ এবার শূন্যদৃষ্টিতে তাকান মন্ত্রীর দিকে, মন্ত্রী চান সেনাপতির দিকে....সবাই পরম অপরাধীর মতো মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।

তারপর ধীরে ধীরে মহারাজ মাথা থেকে মুকুট খুলে নামিয়ে রাখেন বিদ্রোহের নিশানের তলায়। বলেন, ‘যতদিন দশানি মশার উপদ্রব না দূর হয় ততদিন এ মুকুট রইল আপনার কাছে বন্ধক।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%