পুতুলের লড়াই

প্রেমেন্দ্র মিত্র

ঘরসংসার গোছগাছ করে ইতনু পুতনু আর মিকাইকে বিছানায় শুইয়ে পুতুলের পিঠটা সেপটিপিন দিয়ে আটকে সবে খুকুর একটু ঘুম এসেছে—এখন সময় সদর দরজায় ঝন ঝন ঝনাৎ।

দু-চোখ রগড়ে খুকু উঠে গেল। ওমা! এত রাত হয়ে গেছে সে টের পায়নি তো! বাড়িতে তো কেউ কোথাও নেই। মা বাবার বিবেচনাটাও কেমন! বলে গেল এই এখুনি আসছি মালির বাড়ি থেকে। তাইনা খুকু রাজি হচ্ছিল পুতুলখেলা নিয়ে ঘরে থাকতে। এই এখুনি বলে গিয়ে এই এত রাত পর্যন্ত কিনা বাড়ি আসবার নাম নেই। এখন খুকু করে কী!

সদর দরজায় আবার ঝন ঝন ঝনাৎ। বিচ্ছু—বিচ্ছুই বা গেল কোথায়। দরজাটা খুলে বেত নিয়ে একটু খোঁজ করে আনতে পারে! যা কুঁড়ে বাড়ির চাকর। বাড়িতে কেউ নেই দেখে হয়তো নিজের ঘরে গিয়ে খিল দিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে।

কী আর কীরে! অগত্যা খুকুকে নিজে গিয়েই দরজাটার কাছে ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করতে হয়— ‘কে তুমি, কী চাও!’

দরজার বাইরে থেকে ভারী গলার আওয়াজ আসে,— ‘দরজা খোলো টেলিগ্রাম আছে।’

টেলিগ্রাম! এত রাত্রে টেলিগ্রাম এল আবার কার! খুকু এবার দরজাটা একটু ফাঁক করে খুলে উঁকি মেরে দেখে, বাইরের অন্ধকারে একটা লম্বা আবছায়া চেহারা দাঁড়িয়ে আছে। খুকুকে দেখে সে হাত বাড়িয়ে খাম আর কাগজ দিয়ে বলল ‘সই করো।’

‘সই তো করব, কিন্তু টেলিগ্রামটা কার!’

‘টেলিগ্রাম ইতনুর!’

ওমা! ইতনুর নামে টেলিগ্রাম আবার কী! আট বছর বয়স হল এমন কান্ড তো সে আগে দেখেনি। তুতুপুতু না করে টেলিগ্রামটা খুকুকে নিতেই হল। ঘরে ফিরে এলে টেলিগ্রামটা খুলতে সবাই অবাক। ইতনু পুতনু ফিকাই, তুতুল সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে বিছানা ছেড়ে দেখি কী টেলিগ্রাম!—বলে ইতনুই খামটা খুকুর হাত থেকে টেনে নিলে। তারপর টেলিগ্রামটা পড়ে তার যে কি মুখের চেহারা! পুতনু মিকাই আর তুতুল তো কেঁদেই আকুল। শুধু নেহাত কন্ঠ বলেই ইতনুর চোখে জল নেই যে একবারে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে।

‘আরে কী হয়েছে কী ব্যাপারটা?’ খুকু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

পুতনু মিকাই কেঁদে বলল, ‘ইতনুকে যুদ্ধে যেতে হবে।’

‘যুদ্ধে যেতে হবে? সে আবার কী!’

‘হ্যাঁ আমাদের সম্রাটের আদেশ।’ সম্রাটের উদ্দেশে ইতনু পেনাম জানাল।

‘সম্রাটের আদেশ তো বুঝলাম, কিন্তু যুদ্ধ করতে হবে?’

ইতনু এবার একটু যেন বিব্রত হয়ে বললে, ‘যুদ্ধ কাঠের সঙ্গে কাঁচকড়ার।’

পুতনু মুখখানি কাঁচুমাচু করে বলল, ‘আমি তো কাঁচকড়া। আমাদের সঙ্গে তোমাদের কীসের ঝগড়া?’

‘ঝগড়া চিনেমাটির খবরদারি নিয়ে। কাঠ আর কাঁচকড়া দুজনেই চিনেমাটিকে উদ্ধার করতে চায়। অথচ কেউ কাউকে আমল দিতে নারাজ।

মিকাই ছল ছল চোখে বলল,— ‘চিনেমাটি তো আমি, আমায় উদ্ধার করবার জন্যে তোমরা ঝগড়া করে মরবে কেন? আমার দায় আমি কি নিজে সামলাতে পারি না!’

ইতনু বলল, ‘তা জানি না তবে সম্রাটের যা আজ্ঞা, তা তো না পেলে আমার উপায় নেই। আমায় যুদ্ধে যেতেই হবে।’

খুকু এতক্ষণ হাঁ করে এদের কথাবার্তা সব শুনছিল। এবার কাঁদো কাঁদো ভাবে বলল কিন্তু লড়াই মানে কী তা জানো! আর কি তোমায় আমরা ফিরে পাব!’

ইতনু কাঠের মতোই শক্ত হয়ে বলল, ‘ফিরে যদি আর না আসি তা হলে জানবে সম্রাটের জন্যে জীবন দিয়ে আমি স্বর্গে গেছি।’

এর পর আর খুকু কী বলবে! ইতনুকে আর কিছুতেই যখন ধরে রাখা যাবে না তখন চোখের জল ফেলতে ফেলতে যাবার ব্যবস্থা তাকে করে দিতেই হল। এই সেদিন ইতনুর একটা পা খাট থেকে পড়ে আলগা হয়ে গেছল লোহার তার দিয়ে সেটা খুকু ভালো করে এঁটে দিল। রোদ লাগলে ইতনুর বড়ো গা চটে যায়। তাই সঙ্গে দিলে একটু যত্ন করতেন।

বিদায় নেবার সময় সকলের চোখে জল। নেহাত কাঠ বলে তার কাঁদতে নেই তবু ইতনুর চোখটা যেন চকচক করে উঠল। তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে আর সে তাই দাঁড়াল না। কাঠের পা নটখটিয়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।

পুতনু মিকাই তুতুলকে নিয়ে খুকু খানিক চুপ করে বসে রইল, কারুর মুখে কোনো কথা নেই। হঠাৎ পুতনু আর নিকাই দুজনেই উঠে দাঁড়িয়ে বলল,—‘আমরাও এবার চলি তাহলে।’

‘তোমরা কোথায় যাবে?’ —অবাক হয়ে বললে খুকু—।

‘যাও যে যার দলে, কাঁচকড়া হয়ে যখন জন্মেছি তখন জাতের মান তো রাখতেই হবে—।’ পুতনু সামনে পা বাড়াল।

সিকাই সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে বললে, ‘আমায় নিয়েই যখন এত কান্ড তখন আমিই বা যুদ্ধে না গিয়ে করি কী?’

তুতুল বেচারা নেহাত ভালোমানুষ, এতক্ষণ যে কোনো কথাই বলেনি, এবার কিন্তু সেও উঠে দাঁড়াল—‘তাহলে আমি কোথায় যাব?’

পুতনু আর সিকাই দুজনে কখন যেন তার দিকে তাকিয়ে বললে, ‘তুমি আর কোথায় যাবে! তোমার তো নিজের বলতে কিছু নেই শুধু খানিকটা সেলাই করা তুলো। তুমি তো ঝাড়পুতুল নও।’

তুতুল ফ্যাল ফ্যাল করে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। পুতনু আর ফিকাই বিদায় নিয়ে গেল চলে।

তারা যেতে না যেতেই হঠাৎ সমস্ত আকাশ যেন যন্ত্রণায় ডাক ছেড়ে কঁকিয়ে উঠল।

‘সাইরেন! সাইরেন! উড়ো জাহাজ আসছে বোমা ফেলবে। তাড়াতাড়ি মোমবাতিটা নেভাতে গিয়ে তুতুলের পিঠের তুলোয় আগুন প্রায় ধরে গিয়েছিল আর কী! খুকু কোনোরকমে সেটা সামলে তুতুলকে বুকে নিয়ে চুপ করে টেবিলটার তলায় গিয়ে বসল।

দুড়ুম! দড়াম দুম! বোমা পড়ছে চারধারে। দমাস করে একটা বোমা পড়ে খুকুর খেলার ঘরটাতেই আগুন ধরে গেছে। আর তুতুলই কোল থেকে নেমে খুকুকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে গেল! ‘শিগগির! শিগগির এল বেরিয়ে!’

কিন্তু বেরিয়ে এসে যাবে কোথায়। রাস্তাঘাট সব অন্ধকার। তারই মধ্যে আকাশে গোঁ গোঁ করতে করতে উড়ো জাহাজগুলো বিশাল সব খ্যাপা ভোমরার মতো পাল দিচ্ছে। আওয়াজ রাস্তা কাঁপিয়ে দৈত্যকার কচ্ছপের মতো ট্যাঙ্কগুলো গড়িয়ে চলেছে, মুহূর্তে মুহূর্তে গোলাগুলিতে আকাশ যেন ফেটে নিয়ে বজ্র ঠিকরে বেরোচ্ছে।

কোথাও একটু দাঁড়াবার জায়গা বুঝি নেই। যে দিকে চাও শুধু যুদ্ধের সেপাই। দলে দলে তারা গান গাইতে গাইতে চলেছে।

কাঠেরা গাইছে,

দেশ আমাদের চাঁদের হাট

আছেন যেথায় যিনি বিরাট

মানি এক শুধু সে সম্রাট :

কাঁচকড়ারা গাইছে, আমরা সেরা কাঁচকড়া

সবার চেয়ে দর চড়া।।

একে এই গোলমালে দিশাহারা, তার ওপর তুতুলের কথায় খুকু হাসবে না কাঁদবে ভেবে পায় না।

তুতুল তখন, তাকে টানতে টানতে বলছে, ‘তুমি কিছু ভেবো না খুকুমা, আমি কাছে থাকতে কোথাও কিছু ভয় নেই।

হুটোহুটিতে এদিকে তুতুলের পিঠের সেপটিপিন খুলে খানিকটা তুলো বেরিয়ে পড়েছে। খুকু তাড়াতাড়ি তুলোটা ভরে দিয়ে সেপটিপিন এঁটে দিতে যাবে এমন সময় কাছ থেকে কে হেঁকে উঠল ‘খবরদার!’

এখানে চুপটি মেরে এক কাঁচকড়ার সিপাই বলেছিল আগে তো চোখে পড়েনি। খুকু আর পুতুল দুজনেই ভয়ে থমকে দাঁড়াল।

সিপাই ধমক দিয়ে প্রশ্ন, জানতা নেই হিঁয়া ঠারনে কা হুকুম নেহি!’

‘আরে এনে পুতনু!’

খুকু আর তুতুল দুজনেই বলে উঠল,—‘আরে তুমি এখানে!’

পুতনুও এবার তাদের চিনতে পেরে বললে, হ্যাঁ আমি এখানে পাহারায় আছি কিনা! কিন্তু তোমাদের এখানে থাকা তো চলবে না। এ হল মিলিটারি এলাকা!

থাকা যদি না চলে তো আর উপায় কী? খুকু তুতুলকে নিয়ে চলে যাতে এমন সময় পুতনু তুতুলের পিঠ থেকে খানিকটা তুলো সামনে নিয়ে বললে, ‘কিছু মনে করো না ভাই একটু তুলো ধার নিলাম কাটা ছেঁড়ার জন্যে দরকার হয় কিনা!’

অতখানি তুলো হারিয়ে তুতুল বেশ কাবু তখন কাবু হয়ে কাছে তবু ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, এটা কীরকম ব্যবস্থা। আমার তুলো তুমি কেড়ে নিলে যে বড়ো!’

পুতনুর এক মুহূর্তে একবারে অন্য রকম চেহারা। চোখ রাঙিয়ে বলল, ‘নিয়েছি বেশ করেছি। জানো কত বড়ো আদর্শের জন্যে আমরা যুদ্ধ করছি। চাল নেই চুলো নেই তার আবার একটু তুলো দিয়ে এত দেমাক।’

খুকু তাড়াতাড়ি তুতুলকে নিয়ে ছুট না দিলে পুতনু তুতুলকে আরও খানিকটা হালকা করে দিত বোধ হয়।

বোবা হয়ে এদিক-ওদিক খানিক ছুটোছুটি করে হয়রান হবার পর তুতুল বলল, ‘চলো খুকুমা ইতনুর কাছে গিয়ে ধরা দিব। শুনেছি কাঠেরা শক্ত’

তুতুলের মুখের কথা খসতে না খসতেই —এক দল কাঠ সিপাই এসে তাদের ঘেরাও করে ফেলেছে। ভারী জমকালো পোশাকের একজন কেশপতি এগিয়ে এসে কড়া গলায় তাদের জিজ্ঞেস করলে, ‘কে তোমরা? কাঠ না কাঁচকড়া!’

খুকু অবাক হয়ে বলল,—‘সে কী! আমাদের চিনতে পারছ না ইতনু!’

ইতনু একটু যেন লজ্জিত হয়ে বললে, ‘তাইতো! ভারি ভুল হয়ে গেছে দেখছি। কিন্তু তোমরা এই লড়াইয়ের মাঝখানে কেন? যাও যাও এখান থেকে শিগগির সরে পড়ো। হ্যাঁ যাবার আগে একটু তুলো দিয়ে যাও দেখি।’

অনুমতির অপেক্ষা না করেই তুতুলের পেটটাকে প্রায় ফাঁক করে দিল। তুতুল তখন এমন চুপসে গেছে যে একটা কথা বলারও তার ক্ষমতা নেই।

খুকু আর কি সেখানে দাঁড়ায়। তুতুলকে নিয়ে তক্ষুনি সে ছুট দিল। কিন্তু কোন দিকে যে যাবে কিছুই যে জানা নেই। হন্তদন্ত হয়ে একজনকে ছুটে আসতে দেখে সে মিনতি করে জিজ্ঞেস করল ‘কোথায় গেলে একটু নিশ্চিন্তি হতে পারি বলতে পারো।’

‘আরে এইযে খুকুমা আর তুতুল দেখছি : তুতুল যেন বড়ো কাহিল হয়ে গেছে।’

সিপাইকে দেখে খুকু এবার সত্যি খুশ। কাঠও নয় কাঁচকড়াও নয়, সে হল চিনেমাটি। একটু মাটির মানুষ সুতরাং না হয়েই পারে না। খুকু তাই আবার বলল, ‘দেখছ তো তুতুলের কী হাল হয়েছে। বলো না সিকাই ওকে নিয়ে কোথায় গিয়ে দুদন্ড জিরোই।’

‘সেই তো হয়েছে মুশকিল! বলল সিকাই ‘আমি নিজেই কোথায় আছি জানি না। আমার অর্ধেক নিয়েছে কাঠ আর বাকি অর্ধেক সদ্দাকি করছে কাঁচকড়া। তা যেখানেই যাও একটু তুলো দিয়ে যাও দেখি তুতুল।

তুতুলের হয়ে খুকু বাধা দেবার আগেই সিকাই ছোঁ মেরে যথাসম্ভব হাতিয়ে নিয়ে বলল, দুঃখী চিনে মাটির জন্যে তোমার এ দান জীবনে ভুলব না তুতুল! আচ্ছা চলি তাহলে!’

তুতুল তখন ন্যাতা হয়ে একেবারে নেতিয়ে পড়ছে। খুকু হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে। চোখে তার জল পর্যন্ত যেন আর নেই।

অনেকক্ষণ বাদে তুতুলের ক্ষীণ গলার স্বরে তার যেন সাড়া ফিরে এল : তুতুল ধীরে ধীরে বলছে, ‘আমার জন্যে আর তুমি ভেবো না খুকুমা।

‘না আর ভাববার কিছু নেই কিন্তু কী করব এখন।’

‘কিছু আর করতে হবে না। এইখানে কামানের গোলা-কাটা এই শর্তে আমায় শুধু একটু শুইয়ে দাও। আমি জানি যাব আমার গেলেও কোথায় একটা বীজ এখনও আছে যা যাবার নয়। এই যুদ্ধ যখন শেষ হয়ে যাবে তখন সেই বীজ হয়তো একদিন উঠত, হয়তো সে চারা থেকে গাছ হয়ে একদিন তাতে সাদা মেঘের মতো তুলো ধরবে। তুমি তখন বড়ো হবে খুকুমা। হয়তো চরকা কাটতে। তুলো হয়ে আমি যেন সেদিন তোমায় চরকা গিয়ে বাড়াই। আমার দিয়ে তুমি এমন সুতো তুলো করবে যা দিয়ে সমস্ত পৃথিবীকে ভালোবাসার আর শ্রদ্ধায় রাখিবন্ধনে বাঁধা যায়। আর যেন কেউ এমন যুদ্ধ না করে।

তুতুলের কথা শেষ হতে না হতেই শোনা গেল দুম দুম দড়াম! ওকী গোলা পড়ছে না দরজায় কে ধাক্কা দিচ্ছে।

ও তাইতো, দরজায় ধাক্কাই তো। খুকু তাড়াতাড়ি উঠে দরজা খুলে দেয়। মা বাবা ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে বলেন, ‘ওমা খুকুমণি তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে। এই তো আধ ঘণ্টাও হয়নি, গেছি এরই মধ্যে দরজা দিয়ে ঘুম!’

মোটে আধ ঘণ্টা! খুকু অবাক হয়ে খেলাঘরের দিকে তাকায়। চোখে দেখেও তার বিশ্বাস হতে চায় না যে ইতনু, পুতনু, সিকাই, তুতুল যেখানে যেমন ছিল তেমনি শুয়ে আছে। কেমন যেন মনে হয় তুতুলের পিঠের সেপটিপিনটা আলগা হয়ে খানিকটা তুলো সেখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%