প্রেমেন্দ্র মিত্র

‘ওরে ভোঁদড় ফিরে যা...’
কিন্তু ভোঁদড় ফিরবে কী করে? খোকার নাচন দেখে—তো আর তার পেট ভরবে না! তার এখন পেয়েছে খিদে। এখন কী আর নাচন দেখা যায়। তা খোকার খুদে খুদে পায়ের নাচন যত মিষ্টিই হোক ভোঁদড়ের খিদে অবশ্য রাক্ষুসে। অরুচি কাকে বলে সে জানে না। খেতে পেয়ে সে ‘না’ বলেছে একথা অতিবড়ো শত্তুর যে ভাম সেও বলবে না।
ভামের মুখে ভোঁদড়ের নিন্দে লেগেই আছে, ভোঁদড়ের দুটো কেচ্ছার কথা না বলে ভাম হাই পর্যন্ত তোলে না।
‘আরে ওটা আবার জানোয়ার নাকি। চারটে পা আছে বলে ভোঁদড় যদি জানোয়ার হয়, দাঁতের জোরে বরাও তাহলে হাতি।
কখনও বা গোঁফের ফাঁক দিয়ে ভ্যাঁস করে হেঁচে ভাম বলে ‘আরে ছো: আঁশটে গন্ধে যাওয়া যায় না—ও শুশুকের ডাঙায় আবার কীসের খাতির। আঁশের বদলে লোম কেন হল ও .....।
এসব নিন্দে অপবাদ ভোঁদড়ের যায় না এমন নয়। জঙ্গলে কত অভাব নেই। জলের ইজারা করে নিতে হয় ফলে সিড়িঙ্গে আক্রোশটা কিছু বেশি ভোঁদড়ে ভামের সঙ্গে দাঁতাদাঁতি হয়ে তার ভালো মন্দ কিছু হলে বক সুবিধে পেলেই তাই ফলিয়ে ভামের গালাগালগুলো শোনাতে ছাড়ে না।
জলের ধারে ধ্যানস্থ হয়ে হয়তো যে বসে আছে, নজর আছে গুড়জাওয়ালি ছা-টার ওপর। এমন মিঠে মাছ বহুদিন তার ঠোঁটে পড়েনি, একবার নাগাল পেলে হয়। হঠাৎ জলের ওপর একটা ঢেউ দেখা গেল। তারপর খানিকটা তোলপাড়। জলের ভেতর সাদা একটা বিদ্যুৎ যেন খেলে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সে আর কতক্ষণ। হঠাৎ জল ফাঁক করে গোঁফসমেত একটা থ্যাবড়া মুখ বেরোল।
গুড়জাওয়ালির ছা ধরা পড়েছে। এমনি ঠোঁটের গ্রাসে ফসকা পর্যন্ত জ্বলে ওঠে কি না? কিন্তু সিড়িঙ্গের বোঝবার জো নেই কিছু। বক একেবারে পরমহংসদেবের মতো উদাসীনভাবে বললে,—‘কী ধরলে ওটা?’ গুড়জাওয়ালি বুঝি! বলে মিষ্টি মিষ্টি! আমার তো অরুচি ধরে গেছে।’
গুড়জাওয়ালিটাকে একগ্রাসে গিলে ভোঁদড় জলে বুঝি নেমে যাচ্ছিল। সিড়িঙ্গে গলা খাঁকারি দিয়ে উঠল—‘ককক। জানোতো ওকে লাগানো, ওর কথা একে লাগানো— পছন্দ করি না মোটেও। আমি কারও সাতেও নেই, পাঁচেও নেই। হক কথা কহি বলে বকের বনে না কারুর সঙ্গে। আজ তাই বলে দিয়ে এসেছি’....।
ভোঁদড় গলাখাঁকার শুনে একবার তাকিয়েছিল। কিন্তু বকের কথা শেষ না হতেই জলের ভেতর একটা ডিগবাজি খেয়ে গেল তলিয়ে, এসব কথায় তার ভ্রূক্ষেপ নেই, এমন ভণিতাটা নষ্ট হলে রাগত হবারই কথা। হঠাৎ রাগে নিশপিশ করে বক নিজের মনে মনে চু বলে— ‘দেমাক। একেবারে ফেটে পড়ছে! সেদিন ধেড়ে কুমির গো-বাঘটাকে ধরল আর এটাকে দেখতে পায় না, গা।’
কিন্তু মিছে রাগে তো লাভ নেই। কাদা বাঁচিয়ে গুটি গুটি পা ফেলে সিড়িঙ্গে আবার আর এক জায়গায় জলের ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। জলের ওপর ছোট ঢেউয়ের দোলা দেখে ভোঁদড় কোথায় আছে জানতে তার বাকি নেই।
খানিক বাদেই ভোঁদড় আবার— জল থেকে ডাঙায় ওঠে। এবার—মুখ তার খালি।
সিড়িঙ্গে দরদের সুরে বলে,— ‘আহা, ফসকে গেল বুঝি?’
ভোঁদড় গা ঝাড়া দিয়ে জল ছিটিয়ে বলে — ‘উহু, ধরবকি! খালি কুচো মাছ— এখানটায়।’
‘যা বলেছ, নদীর জল বেড়ে অবধি মাছের আর মুখ নেই। হুঁ, তখন কী যেন বলছিলুম!’—
হ্যাঁ হ্যাঁ ওই হাঁড়িমুখো ভামের আস্পর্ধাটা শোনো একবার। ডেকে-সেদিন বলে কিনা, কী মাসি, তোমাদের শুশুকের স্যাঙাতের গায়ে নাকি আঁশ বেরিয়েছে।’ আমিও ছেড়ে কথা কইব কেন? হাজার হলেও তোমায় আমায় এক জলে ঘর করিত। ভামের সঙ্গে সম্পর্কটা কীসের? বললাম তাই—‘আঁশ কী কাঁটা একবার শুঁকে এসো না সে মুরোদও নেই’!
ভোঁদড় কিন্তু এসব কথা গায়েই মাখে না। জঙ্গলের এসব ঘোঁটঘাঁটের মধ্যে সে নেই, পেটটা ভরা থাকলেই হল। নেচে কুঁদে সে দিন কাটায়। সবকথা কানে গেল কী না গেল। ডাঙায় দুবার গড়াগড়ি খেয়ে দুটো ডিগবাজি খেয়ে সে বলল— ‘বলুক না মাসি। গালাগালিতে গায়ে ফোসকা পড়বে না, নদীর মাছও কমে যাবে না, ‘তা তো বটেই, তা তো বটেই। আমিও তো তাই বলি কী জান, ছোটোমুখের বড়োকথা, গা জ্বলবার উপক্রম ডিম আর ছানাচুরি করেও দিন চলে,’—
উনি আবার নাকি বড়ো ঘরোয়ানা, মস্ত কুলীন। কেঁদো বাঘের কোনো সইয়ের বোনের বকুল ফুলের বোনঝি-জামাই বলে গুমর আর ধরে না...’ কিন্তু বকের ঠোঁট নাড়াই সার। ভোঁদড় তখনও— অনেকদূরে।
আজ ভোঁদড়ের খিদে পেয়েছে একটু বেশি। কিন্তু খিদের চেয়ে বেশি হয়েছে ভাবনা। সারাদিন নদীতে বলতে গেলে দাঁতে একটা কাঁটা কাটেনি। নদী উঠেছে ফুলে। দারুণ টান। মাছ কি উঠেছে যে ধরবে? তাই এখন ভোঁদড় চলেছে শালুক ডোবায়। যেখানে মাছ ধরে সুখ নেই, খালি শোল আর চুনোপুঁটি। কিন্তু শৌখিন হবার সময় তো এ নয়।
ফি বছর বাদলার দিনে নদী এমন বেড়ে ওঠে। কিন্তু এবারের ব্যাপার একটু আলাদা। জলের ধারে ব্যাঙের পাড়ায় সব চুপচাপ ; সেখান থেকে মাঠে উঠে দেখে একেবারে অবাক কান্ড। মেঠো ইঁদুরের দল বাচ্চাকাচ্চা সমেত বাসা ছেড়ে কোথায় চলেছে। না, আজ সেরেফ উপোস। দিনের বেলা একটা মেঠো ইঁদুর দেখলেই বলে দিন খারাপ যায়, আর এ একেবারে ইঁদুরের ঝাঁক! কিন্তু ব্যাপারটা কী! —মেঠো ইঁদুর সব দলবেঁধে দেশান্তরী— হচ্ছে কোন দুঃখে? না: ভোঁদড়কে কথাটা জানাতেই হয়।
পথে যেতে সবাইকে সে জিজ্ঞাসা করে, হ্যাঁগা ব্যাপার কী? কিন্তু মেঠোইঁদুরের কথা কইবার ফুরসৎও নেই। পড়ি কী মরি করে তা সব একদিকে। উত্তর কেউ দেয় না। দিলেও বলে,—‘আমরা মরছি নিজের জ্বালায়, উনি ব্যাপার শুধোতে।’
লিকলিকে এক লম্বা ল্যাজের শেষকালে বুঝি দয়া হল, আহা কে না বাপু বলে! ভোঁদড় যাই বলো বাপু ভালো মানুষের পো। আমাদের ক্ষতি তো করে না’।
কথাটা শেষপর্যন্ত ভোঁদড় শুনল ভাবনার কথা, কিন্তু মেঠো ইঁদুরের ভুলও কখনও হয় না।
শালুক ডোবায় যাওয়া এখন থাক। ভোঁদড় তাড়াতাড়ি জঙ্গলে গিয়ে খবরটা আগে দিয়ে এইবেলা বাসা-টাসা না সামলালে সারা হবে না, কিন্তু খবর দেওয়া আর হল না, দূর যেতেই শজারুর সঙ্গে দেখা। পায়ে কাঁটা হলে কী হবে মনটা একেবারে সাদা। নেহাত ভালো মানুষ বারদুয়েক নাকের আওয়াজ করে অত্যন্ত ‘কিন্তু’ ইয়ে বললে, ‘তোমার কাছেই আসছিলাম। ওরা পাঠালে ভাই’।
‘কেন বলো ত?’
শজারু প্রথমটা বলতেই চায় না। তারপর অনেক কষ্টে তার কাছ থেকে ব্যাপারটা জানা গেল। জঙ্গলের ছোটোদলের আজ পঞ্চায়েত বসেছে। ভোঁদড়কে একঘরে করা উচিত কি না তাই বিচার হবে।
‘কেন, অপরাধটা কী?’ ‘কী জানি ভাই, ঘোঁটটা—ভালোই পাকিয়েছে বকের সঙ্গে জোট করে। জল না ছাড়লে তোমায় নাকি ডাঙায় আমল দেওয়া হবে না।’
ভোঁদড়ের চোখদুটো রাগে চকচক করে উঠল। গোঁফটা উঠল ফুলে। বটে, আচ্ছা চল যাচ্ছি।’
কাঁটানটের জঙ্গলে খেজুর গাছের কোলে আসর বসেছে মস্ত। বনের হোমরা-চোমরা বাঘ-ভালুক বাদে আসতে—আর কারুর বাকি নেই। ধেড়ে কুমির সভাপতি। খেজুর গুঁড়িটায় ঠেস দিয়ে বসেছে সে।
ভোঁদড় যেতেই বেশ একটু শোরগোল উঠে হঠাৎ থেমে গেল। চুপ চুপ। ভাম অনেকক্ষণ ধরে তৈরি হয়ে আছে। দাঁড়িয়ে উঠে এবার বলল—
‘তোমাদের সকলকে ভাই বলতে পারলে আমি খুশি হতাম, কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আমার তা বলবার উপায় নেই। আমাদের ভেতর এমন অনেকে আছে যাদের ভাই বললে জঙ্গলের অপমান করা হয়। তারা জলের নয়, জঙ্গলেরও নয়....’
কে একজন চাপাগলায় বলল,— ‘আমাদের সভায় মাটিতে লেজের এক প্রচন্ড বাড়ি মেরে কুমির ভর দিয়ে খাড়া হয়ে উঠল।’
সবাই একেবারে থ। সভা বুঝি এইখানেই পন্ড। খেঁকশেয়ালি অনেক কষ্টে সভাপতিকে ঠান্ডা করল। ‘যতসব চ্যাংড়ার কান্ড। আপনার কী ওসবে কান দিতে আছে?’
কোনোরকমে আবার সভা শান্ত হল। ভামের একটানা একঘেয়ে বক্তৃতা। সভাপতির পর্যন্ত হাই উঠছে, শেষকালে খেঁকশেয়ালি গিয়ে ভামের কানে কী বলতে সে থামে। তার আসল কথাটা তখন বলা হয়েছে, আসল কথা আর কিছু নয়। ভোঁদড় যদি জল না ছাড়ে তা হলে ডাঙায় তাকে একঘরে করা হবে।
শজারু হঠাৎ ভালোমানুষের মতো বলে—‘ভোঁদড় জল ছাড়বে, কিন্তু ঘোঁটের সর্দার বক তারবেলা কী হবে?’
বক এতক্ষণ মাথাগুঁজে—চোখবুজে চুপটি করে শুনছিল। এবার চট করে গলা বাড়িয়ে ঝাপটা দিয়ে খাড়া হয়ে উঠল। হেঁ, বকের পেছনে না লাগলে সুখ হবে কেন! বকের দোষটা কোনখানে শুনি? ঢাক-ঢাক—গুড়-গুড় আমার নেই তো। জলের মাছ ধরে খাই— সেকথা দেশে জানে, দশে জানে। কী বলুক — দেখিনি কেউ কখনও গা ডুবিয়েছি জলে। তার আগে যেন পায়ে আঁশ বেরোয়। আমিও আর পানকৌটি নই, ভোঁদড়ও নয়।’
সভাপতি লেজ ঝাপটা দিয়ে এবার বলল— ‘চুপচুপ। ভোঁদড়ের এখন কী বলবার আছে শোনা যাক।’
ভোঁদড় এতক্ষণে বক্তৃতা কিছু শোনেনি বললেই হয়। সে কানখাড়া করে ছিল অন্য কিছুর আশায়। এবার সে উঠবে সবাইকে অবাক করে দিল,— ভাই সব, তোমরা আমায় জল না ডাঙা দুটোর একটা বেছে নিতে বলেছ। কিন্তু তার আগে আমি-ই তোমাদের সেই প্রশ্ন করছি। জল না ডাঙা কী তোমরা বেছে নিতে চাও।’
সবাই একেবারে হতভম্ব।
খেঁকশিয়ালি সবার আগে বুঝি নিজেকে সামলে নিয়ে খেঁকিয়ে উঠল — ‘ভাঁড়ামি করার আর জায়গা পাওনি, না!’
ভোঁদড় গম্ভীরভাবে বলল,— ‘বাজে তর্ক করবার সময় আমার নেই, তোমাদের জবাব আমি এক্ষুনি চাই।’
ভামের গোঁফ রাগে ফুলে উঠে খেঁকশিয়ালির লোম খাড়া হয়ে উঠে রক্তারক্তি কান্ড বুঝি এইখানেই বাঁধে। ভোঁদড় তবু শান্তভাবে বলল,—‘ডাঙা যদি চাও তো জেনো আর সময় নেই।’
এবার সবাই যেন একটু ভয় পেয়েছে মনে হল। ভোঁদড়ের হেঁয়ালির মানে কী! হঠাৎ খরগোশের দল চনমন করে উঠল। তারা শুনতে পেয়েছে। দূর থেকে কীসের ভয়ংকর আওয়াজ। দেখতে দেখতে সবারই কান খাড়া হয়ে উঠল। সবাই সরে পড়বার জন্য ব্যস্ত। বক পাখা নেড়ে সবাইকে ঠান্ডা করবার চেষ্টা করল। ‘কিছু নয়, ভয় পাবার কিছু নেই—। এ শুধু সবাইকে বোকা বানাবার ফিকির ভোঁদড়ের।’
কিন্তু কে কার কথা শোনে! আওয়াজ— এবার আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। খরগোশের দল আগেই সরতে আরম্ভ করেছে। খেঁকশিয়ালি লেজ গুটিয়ে পাশ কাটাচ্ছে।
সভা ছত্রভঙ্গ। ভাম পর্যন্ত ছটফট করছে পালাবার জন্য। সিড়িঙ্গে বকের চোখে যা লজ্জা।
কিন্তু সে লজ্জাও আর বেশিক্ষণ রইল না। এবার আর বুঝতে কিছু বাকি নেই। জলের ভয়ংকর আওয়াজ নদীতে বান আসছে জঙ্গল ভাসিয়ে। ভাম তিন লাফে কাঁটানটের জঙ্গল পার হয়ে একেবারে দূরের গাছের আবডালে। পেছন থেকে ভোঁদড় কী করে বলল,— ‘আহা চললে কোথায়, শুশুকের স্যাঙাতের জবাবটা নিয়ে গেলে না।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন