প্রেমেন্দ্র মিত্র

তোমাদের যদি বলি, গত বছরের গোড়ার দিকে আলিপুরের হাওয়া অফিসের ভূকম্পমান যন্ত্রে, শ-তিনেক মাইল দূরের পৃথিবীর মাটির ওপরে নয়, বঙ্গোপসাগরের জলের নীচে এমন একটা দারুণ ভূমিকম্প ধরা পড়ে, যাতে সমুদ্র তোলপাড় হয়ে গেছল এবং তারই সঙ্গে যদি বলি চাটগাঁয়ের কক্সবাজারের শুঁটকি মাছের বাজার বছরের মাঝামাঝি অত্যন্ত চড়ে যায়, এবং এই দুই অসংলগ্ন কথার সঙ্গে যদি জুড়ে দিই যে জল-ঝড় নেই—পৌষ মাসের শেষাশেষি একদিন কক্সবাজারের জেলে-নৌকোর এক বিরাট বহর আশ্চর্যভাবে সমুদ্রের মাঝে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়—তাদের কারও কোনো পাত্তাই পাওয়া যায় না, —তাহলে তোমরা এই তিনটি ছাড়া-ছাড়া ব্যাপারের মধ্যে কোনো সম্বন্ধ না পেয়ে নিশ্চয়ই আমায় পাগল ভাববে।
কিন্তু এই তিনটি পৃথক ব্যাপারের ভেতর কী ভয়ংকর সম্বন্ধ যে আছে, তাই তোমাদের আজ বলতে বসেছি।
সেবার চট্টগ্রাম বেড়াতে গিয়ে রমানাথবাবুর সঙ্গে সৌভাগ্যক্রমে আমার আলাপ হয়। রমানাথ বাজপেয়ীর নাম তোমরাও হয় কেউ কেউ শুনেছ। যারা শোনেনি তাদের জন্যে তাঁর একটু পরিচয় দিচ্ছি। রমানাথবাবু বাঙালি হয়েও নেপলসের বিখ্যাত ‘অ্যাকোয়ারিয়ামের’ তিন বছর প্রধান কার্যাধ্যক্ষ ছিলেন। নেপলসের ‘অ্যাকোয়ারিয়ামের’ মতো আশ্চর্য জিনিস পৃথিবীতে আর নেই। চিড়িয়াখানায় যেমন পৃথিবীর জীবজন্তু ধরা থাকে এই ‘অ্যাকোয়েরিয়ামে’ তেমনি সমুদ্রের সব অদ্ভুত জীবন্ত প্রাণী সাধারণের দেখবার জন্যে ধরে রাখা আছে। এই জলচর-নিবাসের অধ্যক্ষের পদ যে সে লোক পায় না। বাজপেয়ী মশাই-এর মতো সামুদ্রিক প্রাণীতত্ত্বে বিশেষজ্ঞ পন্ডিত ইউরোপেও খুব কম আছে বলেই তাঁকে এ পদ দেওয়া হয়।
আপাতত তিনি সে-কাজ ছেড়ে দিয়ে বিলেতের এক বৈজ্ঞানিক সভার অনুরোধে বঙ্গোপাসাগরের সামুদ্রিক প্রাণী সম্বন্ধে গবেষণা করবার ভার নিয়ে চট্টগ্রামে আস্তানা পেতেছিলেন—সেইখানেই তাঁর সঙ্গে আলাপ।
অত্যন্ত অমায়িক লোক। আমি তাঁর কাছে অত্যন্ত নগণ্য ব্যক্তি হলেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আমাদের দেশের সামুদ্রিক জীবজন্তু সম্বন্ধে কিছু কিছু গবেষণা করবার চেষ্টা করেছি শুনে তিনি অত্যন্ত আদর করে ডেকে আমার সঙ্গে এসব বিষয়ে নিজে থেকে আলাপ করতেন। তাঁর সব কথা বুঝতাম এমন গর্ব করতে পারি না, কিন্তু তাঁর কাছে যে অনেক কিছু শিখেছি এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
কক্সবাজারের জেলে-নৌকোর বহর যখন আশ্চর্যভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়, তার কিছুদিন আগের কথা বলছি।
সকাল বেলা তাঁর বাইরের ঘরে বসে আছি। তিনি শীঘ্রই সমুদ্রে তাঁর গবেষণার জন্যে সামুদ্রিক প্রাণী-শিকারে যাবেন ঠিক হয়েছে। তারজন্যে ইতিমধ্যে একটি মাঝারি আকারের মোটর-লঞ্চও জোগাড় করা হয়েছিল, আপাতত তাতে জাল ফেলার সরঞ্জাম খাটিয়ে কয়েকজন ভালো জেলে সঙ্গে নেবার ব্যবস্থা হচ্ছিল। জেলেদের একজন সর্দারকে ডাকিয়ে তিনি তার সঙ্গে কথা কইছিলেন। আমি তাঁর লেখা একখানি বইয়ের পাতা উল্টোচ্ছিলুম।
হঠাৎ তিনি আমায় ডেকে বললেন— ‘শুনছ সুধীর! সমুদ্রে যাদের চোদ্দো পুরুষ একরকম ঘর-বাড়ি করে বাস করছে তাদেরও সমুদ্র সম্বন্ধে কীরকম কুসংস্কার এখনও আছে শুনলে?’
আমি তাঁদের কথাবার্তা এতক্ষণ অনুসরণ করিনি। জিজ্ঞেস করলাম— ‘কী বলছে?’
‘বলছে, সমুদ্রে মাছ-টাছ আজকাল ভয়ানক দুষ্প্রাপ্য হয়েছে, জেলেদের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ, তা সত্ত্বেও অনেকে আজকাল কাজে বেরুতে চায় না— ওদের বিশ্বাস সমুদ্রে দানো জেগেছে।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘সে আবার কী?’
এবার জেলে-সর্দার নিজেই উত্তর দিল এবং সে যা বলল তার মর্ম বুঝে অবাক হয়ে গেলুম। জেলেরা নাকি মিছে মিছে ভয় পায়নি। যেখানে মাছের ভারে সেদিন পর্যন্ত জাল ছিঁড়ে পড়ত, সেখানে একটি মাছও যে পড়ে না এটাই তো একটা ভয়ের ব্যাপার; কিন্তু এ-ছাড়া তাদের অনেকে স্বচক্ষে এমন জিনিস দেখেছে যা বললে লোকে বিশ্বাস করবে না।
সর্দারকে আবার প্রশ্ন করায় সে যা বলল তা সত্যিই অদ্ভুত। মাছ ধরে ফিরতে অনেকে দেখেছে, দূরে সমুদ্রের জল থেকে আশ্চর্য রকমের রোশনাই উঠছে—সে আলো নাকি এমন তীব্র যে মনে হয়, সমুদ্রে কে বিজলি বাতির সার জ্বেলে রেখেছে।
হেসে বাজপেয়ী মশাইকে ইংরেজিতে বললাম—‘এসব সর্দারের মাইনে বাড়াবার ফিকির নয় তো?’
বাজপেয়ী মশাই বললেন—‘না ; এর ভেতর কিছু সত্য আছে বলে সন্দেহ হচ্ছে। কক্সবাজারের সমুদ্রে মাছ দুষ্প্রাপ্য হওয়াটা তো আর ওর বানানো নয় — এটাই তো আশ্চর্য।’
সেদিন সর্দারের সঙ্গে শেষপর্যন্ত কয়েকজন জেলে জোগাড় করে দেবার চুক্তি বিনা গোলমালে হয়ে গেল। সমুদ্রের অদ্ভুত আলোর কথাও সে সঙ্গে আমরা ভুলে গেলাম।
কিন্তু কয়েকদিন বাদেই যখন জেলে-নৌকোর বহর হারিয়ে গেছে সংবাদ এল এবং জল ঝড় না থাকা সত্ত্বেও দুদিন ধরে তাদের কোনো পাত্তা পাওয়া গেল না তখন বাজপেয়ী মশাই হঠাৎ অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।
সকালে আমি যেতেই বললেন, ‘কালকের খবর শুনেছ তো?’
বললুম ‘জেলে-নৌকোর কথা তো? শুনেছি।’
তিনি তাড়াতাড়ি বললেন—‘না হে না, শুধু ওই নয়। যে ক-জন লোক কাল ওদের খোঁজ করতে দুখানা নৌকো নিয়ে বেরোয় তাদেরও পাত্তা নেই!’
আশ্চর্য হয়ে বললাম ‘না এ কথা তো শুনিনি! এ কী ব্যাপার!’
তিনি বললেন—‘আমিও তো তাই ভাবছি।’ তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন—‘দেখো আমার আগেকার প্ল্যান আমি বদলালাম। আমি আজই লঞ্চ নিয়ে বেরুব। এ ব্যাপারে একটু তদন্ত তাড়াতাড়ি করা দরকার। তুমি আসতে পারবে তো?’
না আসবার কোনো কারণ ছিল না। আমি সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম।
দুপুরবেলা কক্সবাজারের জেটি থেকে আমাদের লঞ্চ ছাড়ল। লঞ্চের সারেং খালাসি ও কয়েকজন ছেলে ছাড়া আরোহী মাত্র আমরা দুজন।
লঞ্চটি যেমন মজবুত তেমনি বেগবান। দেখতে দেখতে কক্সবাজার ছাড়িয়ে আমরা অকূল সমুদ্রে এসে পড়লাম! কক্সবাজারের পুবে মহিষখালি দ্বীপ। তারই কাছে কাছে সাধারণত এই সব জেলেরা নৌকো নিয়ে মাছ ধরতে যায়। সেই দিকেই আমাদের লঞ্চ চলছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা বাদে সেখানে পৌঁছে আমরা হারানো জেলেদের কোনো চিহ্নই দেখতে পেলাম না।
এবার কী ভেবে জানি না, বাজপেয়ী মশাই লঞ্চের মুখ আরও দক্ষিণে ফিরিয়ে চালাতে বললেন। জিজ্ঞেস করতে জানালেন, ‘কয়েক দিন এদিকে মাছ না পেয়ে নতুন জলের সন্ধানে জেলেদের দক্ষিণদিকে এগিয়ে যাওয়া কিছু আশ্চর্য নয়।’
তাঁর অনুমান যে সত্য কিছুক্ষণ বাদেই তার ভয়ংকর প্রমাণ আমরা পেলাম। ঘণ্টাখানেক ধরে আমরা এগিয়েছি ; হঠাৎ একজন জেলে চিৎকার করে বললে—‘ওই দেখুন বাবু!’
ততক্ষণে আমাদের সকলের দৃষ্টি সেদিকে গেছে। দেখলাম উলটো হয়ে জেলেদের একটি নৌকো ভাসছে। আমাদের লঞ্চ তার কাছে গিয়ে থামল। খালাসি জেলেরা সবাই রেলিঙের ধারে ভিড় করে দেখতে এল। কিন্তু এই অদ্ভুত ব্যাপারের কোনো কারণ আমরা খুঁজে পেলাম না। জেলেদের নৌকোগুলি দস্তুরমতো মজবুত এবং ঝড়ের ভেতরেও সহজে তা জলে ডোবে না ; তা ছাড়া ছেলেবেলা থেকে সমুদ্রে থাকার দরুন নৌকো চালানোতে তাদের জুড়ি পাওয়া ভার। সুতরাং তাদের নৌকো অকারণে এমন উলটে যাওয়া আশ্চর্য নয় কি? নৌকোর আশপাশে আমরা কিছুই দেখতে পেলাম না।
খানিক বাদে আবার লঞ্চ ছাড়া হল। এবারে আমরা যতই এগিয়ে যেতে লাগলাম, ততই এক এক করে হারানো বহরের নৌকোগুলির দেখা পাওয়া যেতে লাগল। সবগুলিই কোনো অজানা কারণে একইভাবে উলটে গেছে এবং কোথাও জেলেদের একটি চিহ্নও নেই।
সত্যই এবার আমার ভয় করছিল। আগের দিন হারানো জেলেদের খোঁজ করতে যারা এসেছিল কী পরিণাম হয়েছে স্মরণ করে বুকের ভেতরটা কেমন শিউরে উঠছিল। খালাসি ও জেলেদের সবার মুখেই দেখলাম ভয়ের ছায়া ; শুধু বাজপেয়ী মশাই সমস্ত ভয়ের ওপরে থেকে অত্যন্ততন্ময় ভাবে কী চিন্তা করতে করতে ডেকের ওপর পায়চারি করে বেড়াচ্ছিলেন।
ভাবছিলাম বাজপেয়ীমশাইকে লঞ্চ ফেরাবার আদেশ দিতে অনুরোধ করব কি না, এমন সময় সমুদ্রের দিকে চেয়ে রমানাথবাবু অত্যন্ত ব্যস্তভাবে বললেন, ‘সুধীর, শিগগির আমার দূরবিনটা দাও।’ দূরবিনটা তাঁর হাতে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে তিনি যা দেখেছেন তাও চোখে পড়ল।
আশ্চর্য ব্যাপার! কিছু দূরে সমুদ্রের কালো জলে মনে হল কে যেন মোটা একটা সবুজ পেনসিল দিয়ে প্রকান্ড একটা লাইন টেনে দিয়েছে। দুঃখের বিষয় রমানাথবাবু দূরবিন হাতে ধরতে না ধরতেই সে লাইন মিলিয়ে গেল। তিনি হতাশ হয়ে দূরবিন নামিয়ে বল্লেন—‘দেখেছ তো?’
বললাম—‘হ্যাঁ! ওই দেখুন, ডানদিকে আবার সেই রকম দেখা যাচ্ছে।’
এবার আমাদের লঞ্চের ডানদিকে অতিঅল্প দূরেই লাইনের মতো নয়, খানিকটা ধাবড়ার মতো ওই সবুজ রং দেখা গেল। ঠিক যেন খুব খানিকটা সবুজ কালি কে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে। দেখতে দেখতে আমাদের চারধারেই এবার এইরকম সবুজ রং দেখা দিতে লাগল।
রমানাথবাবু লঞ্চ থামাতে বললেন। দূরবিন চোখে নিয়ে সেই সবুজ ছোপ দেখতে দেখতে তাঁর মুখ কেন জানি না, অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে গেল। কিন্তু তাঁর তন্ময়তা দেখে কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস করলাম না।
লঞ্চ কয়েক মিনিট মাত্র থেমেছে, এমন সময় হঠাৎ সেটা অত্যন্ত দুলে উঠল এবং বেশ টের পেলাম, হঠাৎ লঞ্চ একদিকে হেলছে। সেই মুহূর্তেই সেই ভয়ংকর জীবটিকে দেখলাম।
লঞ্চ হেলে পড়ায় সামনের দিকে ঝুঁকে সমুদ্রের পানে চেয়েছিলাম। মনে হল ঠিক আমাদের ডেকের কাছে সমুদ্রের জলের কিছু নীচেই সেইরকম খানিকটা সবুজ রং দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ সেই সবুজ রং আরও স্পষ্ট হয়ে এল এবং তারপর যা দেখলাম তাতে নিজের চোখকেই প্রথমত বিশ্বাস করা শক্ত হয়ে পড়ল। দেখলাম ছোটোখাটো পিপের মতো এক একটি সবুজ জীব ; সমুদ্রের যত প্রাণী মানুষের চোখে এ পর্যন্ত পড়েছে তার কোনোটির সঙ্গেই তার মিল নেই। পেছনের দিকে খানিকটা লম্বা পিপের মতো হলেও সামনে তার অনেকটা অক্টোপাসের মতো গুটিআষ্টেক নুলো বেরিয়েছে। সবচেয়ে ভীষণ, সে জীবটির প্রকান্ড মুখ, আর সাপের মতো নিষ্ঠুর চোখ। দেখতে দেখতে সেটা ডুবে গেল কিন্তু তারপরেই দেখলাম আমাদের লঞ্চের চারধারে ক্ষুধিত নেকড়ের পালের মতো অসংখ্য এই জাতীয় জীব ঘিরে এসেছে। আমাদের চারধারের জল সবুজ হয়ে গেছে তাদের ভিড়ে।
লঞ্চের সবাই এখন বিস্ময়বিমূঢ়ভাবে সেই দিকে চেয়েছিল। সারেং একটা বালতিতে খানিকটা নোংরা ইঞ্জিনের তেল বাইরে ফেলতে এসে বলল,—‘লঞ্চ ভয়ানক হেলছে কেন বুঝতে পারছি না বাবু!’
লঞ্চ যে হেলছে এটা আমরা সবাই বুঝতে পারছিলুম কিন্তু তাতে বিশেষ ভয়ের কিছু আছে এতক্ষণ আমাদের মনে হয়নি। সারেঙের কথায় আমরা চমকে উঠলাম। লঞ্চ হেলার সঙ্গে এই জীবগুলির কোনো সম্বন্ধ নেই তো! আর সকলের কথা জানি না, আমার মনে ওই রকমই একটা সন্দেহ কিন্তু হচ্ছিল।
রমানাথবাবুর ধ্যান তখনও ভাঙেনি। ডেকের নীচেই যেখানে সারেঙের ফেলা ময়লা তেলটা ভাসছিল সেইদিকে চেয়ে তিনি তখনও একমনে কী ভাবছিলেন। লঞ্চ তখন এতটা হেলে পড়েছে যে আমরা ভয়ে ভয়ে অপর দিকে গিয়ে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছি। জেলেদের মুখ দেখলাম শুকিয়ে গিয়েছে একেবারে। সর্দার আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। জাতে সে মগ — শুকনো মুখে ‘ফয়ার’ নাম করে সে বলল, ‘আজ আর নিস্তার নেই বাবু, জেলের বহরের যে দশা হয়েছে আমাদেরও তাই হবে। সমুদ্রের দানো উঠেছে আমি তো আগেই বলেছিলাম।’
তার কথার উত্তর দিলাম না! সামনের দিকে তখন দেখছিলাম কালো সমুদ্রকে সবুজ করে দিয়ে বহুদূর থেকে এই সামুদ্রিক নেকড়ের পাল আসছে। তাদের আসা সম্বন্ধে একটা আশ্চর্য ব্যাপার এই যে ঠিক শিক্ষিত সৈন্যের মতো সার বেঁধে ছাড়া তারা চলে না। মাছের ঝাঁক অনেক সময়ে এক সঙ্গে চলে, কিন্তু তাদের ভেতর এমন শৃঙ্খলা নেই। এদের প্রত্যেক সারে একটির বেশি দুটি প্রাণী পাশাপাশি নেই। কেউ কাউকে এগিয়েও যায় না। দূর থেকে দেখলে মনে হয় ঠিক যেন প্রকান্ড একটা সাপ সমুদ্রের ভেতর দিয়ে আসছে ; তবে এঁকেবেঁকে নয়, একেবারে তিরের মতো সোজা।
এর মধ্যে লঞ্চ ক্রমশ এতটা হেলেছে যে আর একটু বাদেই সমুদ্রের জলে ডেকের ওপর উঠবে। সারেং ভীত হয়ে রমানাথবাবুর আদেশ না নিয়েই লঞ্চ চালাবার চেষ্টা করল, কিন্তু নীচের স্ক্রু তখন ভালো করে আর জল পায় না, লঞ্চ কাত হয়ে এগোতে গিয়ে আরও বেশি জল ডেকে উঠে পড়বার সম্ভাবনা হল।
আমি ভয়ে একরকম বিহ্বল হয়ে রমানাথবাবুর কাছে গিয়ে চিৎকার করে বললাম— ‘লঞ্চ যে ডোবে তা দেখতে পাচ্ছেন?’
ভয়ে আমার বুদ্ধি বিবেচনা লোপ পেয়েছিল। এমনকী এই বিপদের ভেতর আনবার জন্যে রমানাথবাবুর ওপর রাগই হচ্ছিল। তিনি কিন্তু অবিচলিতভাবে আমার দিকে ফিরে জলের একদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন—‘দেখতে পেয়েছ!’
সারেঙের ফেলা তেলটা ভাসছে, এইটুকু ছাড়া আর কিছুই কিন্তু আমি দেখতে পেলাম ন। বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘আপনি পাগল হয়ে গেছেন। লঞ্চ ডুবছে তা খেয়াল আছে?’
রমানাথবাবু এবার বিদ্যুৎ-স্পৃষ্টের মতো চমকে উঠে ডাকলেন ‘সারেং!’
সারেং কাছেই ছিল। শুকনো মুখে বললে—‘আর আশা নেই বাবু।’
সে কথায় কান না দিয়ে রমানাথবাবু পাগলের মতো জিজ্ঞেস করলেন—‘কত পেট্রোল আছে স্টোর-রুমে।’
সারেং আমারি মতো অবাক হলেও উত্তর দিল—‘তা অনেক আছে বাবু, দুদিনের আসা যাওয়ার মতো তেল কেনা হয়েছিল।’
‘শিগগির সব বার করে নিয়ে এসে লঞ্চের চার ধারে ঢাল। শুধু ফিরে যাবার মতো তেল থাকলেই চলবে।’
রমানাথবাবুর কথা বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে তাঁর দিকে চাইতেই তিনি আবার জলের দিকে আমাকে তাকাতে বললেন,—‘এখনও বুঝতে পারোনি? আমাদের চারধারে সব জল সবুজ হয়ে গেছে, কিন্তু ওখানটায় কিছু দেখতে পাচ্ছ?’ সত্যিই সমস্ত জায়গা সেই প্রাণীর ভিড়ে সবুজ হয়ে গেলেও সেই তেলটুকু যতখানি স্থান জুড়ে ভাসছিল তার ত্রিসীমানায় সবুজ রঙের আভাস ছিল না।
লঞ্চ তখন একেবারে হেলে পড়ে এক দিকের ডেক জলের প্রায় সমান সমান হয়ে পড়েছে। তাড়াতাড়ি আমি রমানাথবাবুকে টেনে না নিলে একটি জানোয়ার নুলো বাড়িয়ে আর একটু হলে তাঁকে ধরে ফেলেছিল আর কী! খালাসিরা রমানাথবাবুর আদেশের তাৎপর্য না বুঝলেও ইতিমধ্যে চারধারে পেট্রোল ঢালতে শুরু করেছে। কিন্তু তাতে যে কিছু হবে আমার আশা ছিল না। সেই মুহূর্তেই আমাদের চোখের ওপর যে ব্যাপার ঘটল তাতে আশা হারানো অস্বাভাবিকও নয়। একজন জেলে তেল ঢালবার জন্যে রেলিঙের একটু বেশি রকম কাছে এগিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ তার চিৎকার শুনে দেখি দু-তিনটে জানোয়ার তাদের চাবুকের মতো নুলো দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। আমরা তার সাহায্যে যেতে না যেতেই তারা তাকে চক্ষের নিমেষে টেনে একেবারে জলের তলায় নিয়ে গেল। লোকটা একবারের বেশি চিৎকার করবার অবসরও পেল না। কিছুক্ষণ বাদে আমাদের সকলেরই ওই দশা হবে জেনে গভীর হতাশায় আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হলাম।
কিন্তু সেদিন প্রাণ নিয়ে অক্ষত শরীরে কক্সবাজারে ফিরেছিলাম। না ফিরলে এই গল্প তোমাদের শোনাতে পারতাম না। সেদিন বেঁচে ছিলাম, শুধু রমানাথবাবুরই বুদ্ধিতে সে কথা আজ কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করছি। চারধারে পেট্রোল ঢালার সঙ্গে সঙ্গে জাদুমন্ত্রের মতো কী করে যে সেই ভীষণ সামুদ্রিক নেকড়ের পাল সরে গেল তখন তা বুঝতে পারিনি। স্টিমার একটু সোজা হতেই সারেং সেদিন প্রাণপণে ইঞ্জিন চালিয়ে প্রাণ বাঁচায়।
রমানাথবাবু নিজে পরিত্রাণ পেয়ে ফিরে এসেই অবশ্য নিশ্চিন্ত হননি। তাঁরই চেষ্টায় ও পরামর্শে অনেক গড়িমসির পর শেষ পর্যন্ত কক্সবাজারের পুলিশ রাজি হয়ে জলে তেল ছড়াবার কয়েকটি স্টিমার পাঠাবার ব্যবস্থা করে। ঝড়ের সময় যেমন করে কোনো কোনো জাহাজ চারধারে তেল ছড়ায় তেমনি করে ওই ভয়ংকর প্রাণীর বিবরণ-ক্ষেত্র জুড়ে কয়েক দিন ধরে তেল ছড়ানো চলে। তার ফলে আশ্চর্যভাবে কয়েক দিনের ভেতর তারা অন্তর্হিত হয়েছে। কক্সবাজারে এখনও সামুদ্রিক মাছ দুষ্প্রাপ্য, কিন্তু আশা করা যায় আর কয়েক বছরের ভেতর আবার আগেকার দিন ফিরে আসবে।
কয়েক দিন বাদে রমানাথবাবুকে এই অদ্ভুত সামুদ্রিক প্রাণীর রহস্য পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলবার জন্যে অনুরোধ করলাম। তিনি বললেন। ‘ব্যাপারটা খুবই আশ্চর্য বটে, কিন্তু সমুদ্র নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন তাঁরা অনেক দিন আগেই এমন ঘটা যে সম্ভব তা অনুমান করে রেখেছেন। সামুদ্রিক যে সব জীবজন্তুর, মানুষ এ পর্যন্ত সন্ধান পেয়েছে সেগুলি সমুদ্রের অপেক্ষাকৃত ওপরের স্তরের। কিন্তু সমুদ্রের গভীর তলায় যে কী আছে মানুষ তার কিছুই জানে না। সমুদ্রের তলা তো বড়ো কম কথা নয়! হিমালয়ের সবচেয়ে উঁচু শৃঙ্গটিকে উলটো করে যদি জলে ডুবিয়ে দেওয়া যায় তাহলেও তল পাওয়া যায় না — এমন গভীর সমুদ্রও আছে। সেখানে মানুষের কোনো জালই পৌঁছোয় না। আর যদি বা পৌঁছোত তা হলেই বা হত কী? সমুদ্রের এ পর্যন্ত মানুষ কতটুকু আর খুঁজে দেখেছে। বৈজ্ঞানিকেরা তাই অনেকদিন আগেই অনুমান করেছেন সমুদ্রের গভীর স্তরে আমাদের অজানা অনেক অদ্ভুত জীব থাকা সম্ভব। এ ব্যাপারে বৈজ্ঞানিকদের অনুমান যে সত্যি তাই প্রমাণ হয়ে গেল। যে সামুদ্রিক জীব আমরা দেখেছি, সমুদ্রের কোন গভীর স্তরে এদের বাস। এরা এতদিন ওপরে ওঠেনি বলেই মানুষ এদের পরিচয় পায়নি। এদের সম্বন্ধে সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে — এদের বুদ্ধি আর শৃঙ্খলা।
‘সমুদ্রের তলায় কোনো প্রাণী যে এতখানি বুদ্ধি, এ রকম দলবদ্ধ হওয়ার ক্ষমতা দেখাতে পারে এ কথা কেউ ভাবেনি। জেলেদের নৌকো ওলটানোর ব্যাপার থেকেই এদের অসামান্য বুদ্ধির আমি প্রমাণ পাই। সার বেঁধে আক্রমণ করার শৃঙ্খলা তো তুমিও দেখেছ।’
বললাম—‘আমাদের লঞ্চও তো উলটোতে বসেছিল, কিন্তু কী করে তা এখনও বুঝতে পারিনি।’
‘এমন কিছু শক্ত কাজ তো নয়, শুধু একটা সামুদ্রিক প্রাণীর মাথায় এসেছে এইটেই আশ্চর্য। নৌকো ও আমাদের লঞ্চের তলায় মেরুদন্ডে নুলো জড়িয়ে এদের গোটাকতক প্রাণী একদিকে টানবার চেষ্টা করলেই তো কাত হয়ে পড়বে। কাত হবার পর সামনে থেকে নুলো জড়িয়ে নীচে টানা যায়! একটু কাত হলেই জল উঠে উলটোতে কতক্ষণ? অবশ্য এতে ভীষণ শক্তিরও দরকার।’
জিজ্ঞেস করলাম—‘কিন্তু এরা হঠাৎ নীচের স্তর ছেড়ে ওপরেই বা উঠল কেন?’
রমানাথবাবু বললেন ‘প্রথমে আমিও তা ভেবে ঠিক করতে পারিনি। তারপরেই মনে পড়ে গেল যে কিছুদিন আগে কাছাকাছি সমুদ্রের তলায় এক জায়গায় ভীষণ ভূমিকম্প হয়ে গেছে। সেই আলোড়নেই, নিশ্চয়ই, এরা স্থানচ্যুত হয়ে ছিটকে এদিকে এসে পড়েছে। এসে প্রথমত এদিকের সমুদ্রের মাছ অর্ধেক খেয়ে সাবাড় করেছে। বাকি অর্ধেক এদের ভয়ে এ তল্লাট ছেড়ে পালিয়েছে। মাছের যখন অভাব তখন খিদের জ্বালায় এদের নজর গেছে মানুষের ওপর এবং তারজন্যে বুদ্ধি যা খাটিয়েছে তা অপূর্ব। দৈব পথ না দেখালে এতদিনে আমরাও তাদের পেটে হজম হয়ে যেতাম। সারেং যদি সেই সময় জলে ময়লা তেল না ফেলত, আর আমার যদি সেই দিকে চোখ না পড়ত তাহলে আমরা তো মারা যেতামই আরও কী সর্বনাশ মানুষের যে ওই জীব থেকে হত কে জানে? সামান্য পেট্রোলের তেল কেন যে ওদের অসহ্য তা এখনও ভালো করে বুঝি না এবং দৈব সহায় না হলে শুধু বিজ্ঞানের সাহায্যে এ ওষুধের সন্ধান কখনও পেতাম কি না সন্দেহ।’
আমি বললাম—‘এ সব তো বুঝলাম কিন্তু জেলেদের সর্দার রাত্রে সমুদ্রে যে আলোর কথা বলেছিল সেটা নিশ্চয়ই মিথ্যে!’
রমানাথবাবু হেসে বললেন—‘সেটা সম্পূর্ণ সত্যি। রাত্রে যে আলো জেলেরা দেখেছিল সে এই প্রাণীগুলিরই গায়ের আলো এবং এরা যে সমুদ্রের গভীর স্তরের জীব এই আলোই তার আর একটা প্রমাণ। সমুদ্রের গভীর তলায় একেবারে অমাবস্যার রাতের মতো অন্ধকার। সূর্যের আলো জলের রাশি ভেদ করে অত দূর পৌঁছোতে পারে না। সেখানে যে সব প্রাণী থাকে, প্রকৃতির আশীর্বাদে তাদের আলো তারা নিজেদের দেহ থেকেই বার করবার ক্ষমতা পেয়েছে।’
খানিক চুপ করে থেকে রমানাথবাবু আবার বললেন—‘আমরা এই দেখেই আশ্চর্য হচ্ছি, কিন্তু এই অসীম অতল সমুদ্রের ভেতর আরও কত রহস্যময় প্রাণী আছে কে জানে! পৃথিবীর চার ভাগের এক ভাগ স্থলে যদি মানুষের মতো বুদ্ধিমান জীবের উদ্ভব সম্ভব হয়, তাহলে এই বিশাল জলের জগতে নতুন ধরনের বুদ্ধিমান কোনো জীবের সৃষ্টি সম্ভব হবে না কে বলতে পারে!’

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন