রূপকথার কেলেঙ্কারি

প্রেমেন্দ্র মিত্র

রূপকথার রাজ্যে কেলেঙ্কারির একশেষ।

এমন কেলেঙ্কারি সেই গুণাঢ্যের বৃহৎকথা-র দিন থেকে আর কখনও হয়নি। চারদিকে এই নিয়ে প্রথমে ফিসফিস কানাঘুষা, তার পর ঢি ঢি। রাজপুরীর দেওয়ালের গায়ে পর্যন্ত ‘পোস্টার’ পড়ে গেল; ‘রূপকথার রাজ্যে দুর্নীতি— বজ্রকুমারের সকল কীর্তিফাঁস।’ পথেঘাটে হাজারে হাজারে ‘তেপান্তর’ কাগজের সান্ধ্যসংস্করণ বিক্রি হয়ে গেল।

ব্যাপারটাকে শেষপর্যন্ত আর চেপে রাখা গেল না, এত জানজানির পর। বিশেষ করে ‘তেপান্তর’ কাগজের গরম সম্পাদকীয়গুলোর ঠেলাতেই রূপকথার রাজ্যের রাজা রাজরা থেকে সমস্ত হোমরা-চোমরা কর্তাদের উঠে বসতে হল—একটা কিছু না করলেই আর নয়।

কিন্তু কী করা যায়? রাজা থেকে পাত্র,—মিত্র, মন্ত্রী, কোটাল কারও কোনো ধারণাই নেই এ বিষয়ে। এমন ব্যাপার তো কস্মিনকালে ঘটেনি। তার মীমাংসার কোনো নজিরও কোথাও নেই। রাজসভার সবাই শুকনো মুখে সেই-কথাই ভাবেন। কোথা থেকে এমন ফ্যাসাদ যে এল! বেশ চলে যাচ্ছিল রূপকথার রাজ্য। বিপদ-আপদ গন্ডগোল ছিল না এমন নয়, রাক্ষস-খোক্কস, দৈত্য-দানব হানা দিত মাঝে মাঝে। রাজপুত্তুরদের যেতে হত। সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পেরিয়ে বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচির খোঁজে। ডাইনির মন্তরে রাজকন্যার সোনার রূপ পুড়ে খাক হত। কিন্তু তারপর আবার সব ঠিক হয়ে যেতে দেরি হত না, কারণ সেসব মুশকিলের আসান তাদের জানা। বরাবর একভাবেই তার কিনারা হয়ে আসছে।

কিন্তু এ বিপদ যে একেবারে আলাদা। ব্যাপারটা শুরুতে কিছুই বোঝা যায়নি; রূপকথার রাজ্যে যেমন দস্তুর সেইমতো আজ এ রাজ্যে ভয়ংকর রাক্ষস এসে হানা দিয়েছে। রোজ একটি করে হৃষ্টপুষ্ট মানুষের বরাদ্দ তার চাই। নইলে সমস্ত রাজ্য সে উদরসাৎ করে দেবে। রাজা রাজরারা নিরুপায় হয়ে সায় দিয়েছেন, এ রাক্ষস যে মারতে পারবে তার কপালে অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা। না পারলে রাক্ষসের একবেলার জলপানি। দেশ-বিদেশের রাজকুমারেরা এসে হার মানবার পর কোথা থেকে উদয় হয়েছেন রাজপুত্র বজ্রকুমার।

নিশুতিরাতে খাঁড়াহাতে বজ্রকুমার একা গেছেন রাক্ষসের গুহায় লড়তে। রাজ্যের লোক ঘরে খিল দিয়ে সারারাত জেগে ভয়ে কেঁপেছে। অন্ধকারে আকাশ-ফাটানো সেকী যুদ্ধের হুংকার! পৃথিবী কাঁপানো সেকী দাপাদাপি! পরের দিন ভয়ে ভয়ে সবাই ঘর থেকে বেরিয়েছে। যুদ্ধের ফলাফল সম্বন্ধে তাদের মনে কোনো সংশয় নেই। অমন অনেক রাজকুমারকে তারা লড়তে যেতে দেখেছে। কিন্তু একী তাজ্জব ব্যাপার। পাহাড়ের পথে বজ্রকুমারই একা নেমে আসছেন। খাঁড়া তাঁর তাজা রক্তে লাল। তারপর বজ্রকুমারের জয়জয়কার।

রাজ্যময় উৎসব পড়ে গেছে, রাক্ষসের লাশটা পেলে উৎসবটা বুঝি একটু ভালো করে জমত। কিন্তু সে আর কোথায় পাওয়া যাবে! শোনা যায় বজ্রকুমার তাকে বারো টুকরো করে পৃথিবীর বারো কোণে ফেলে দিয়েছেন।

রাক্ষস মেরে বজ্রকুমার কিন্তু অদ্ভুত বায়না ধরেছেন। অর্ধেক রাজত্ব তাঁর চাই কিন্তু রাজকন্যাকে বিয়ে করতে তিনি নারাজ। রাজকন্যার বদলে তাঁকে বেশ কিঞ্চিৎ কাঞ্চন-মূল্য ধরে দিতে হবে।

এমন উদ্ভুতে কথা কেউ কখনও শুনেছে? রাজ্যশুদ্ধ সবাই হতভম্ব। এটা অপমান ভেবে রেগে উঠবেন না ঠাট্টা ভেবে হেসে উড়িয়ে দেবেন রাজা তা ভেবেই পান না প্রথমত।

শেষপর্যন্ত কিন্তু বজ্রকুমারের কথাতেই রফা হয়, অর্ধেক রাজত্বের ভাগ আর রাজকন্যার কাঞ্চন-মূল্য নিয়ে বজ্রকুমার রওনা হয়ে পড়েন পাশের রাজ্যের পানে।

পাশের রাজ্যে রওনা হবার কারণ আছে। সেখানেও কিছু দিন থেকে শুরু হয়েছে এক রাক্ষসের উৎপাত।

পাশের রাজ্যে রাক্ষসের উপদ্রব বন্ধ করেও বজ্রকুমার দুদন্ড হাঁফ ছেড়ে জিরিয়ে নেবার অবসর পান না। খাঁড়া হাতে তাঁকে ছুটতে হয়েছে তার পাশের রাজ্যে। এমনি পর পর রাক্ষসের উৎপাতও শেষ হয় না—বজ্রকুমারের ছোটাছুটিরও কামাই নেই।

সব রাজ্যে বজ্রকুমারের একদর, অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যার বদলে কাঞ্চন-মূল্য। দেখতে দেখতে বজ্রকুমারের ঐশ্বর্য প্রতিপত্তির আর সীমা থাকে না। রূপকথার রাজ্যের অর্ধেক রাজত্ব তাঁরই দখলে। সোনাদানাও যা কিছু তাঁর ভাঁড়ারে। এমনি করে গোটা রূপকথার রাজ্যই হয়তো বজ্রকুমারের হাতের মুঠোয় এসে পড়ত, কিন্তু গোল বাঁধল লৌহগজের রাক্ষস মারতে গিয়ে সেখানকার রাজকন্যা পুষ্পবতীকে দেখে।

বজ্রকুমার যথারীতি রাক্ষস মেরে নগরে ফিরেছেন, মাঝপথে রাজ্যের লোক এগিয়ে এসেছে তাঁকে অভিনন্দন জানাতে, সেই সঙ্গে এসেছেন রাজকন্যা পুষ্পবতী—সোনার সাজ, রুপোর ঝালর দিয়ে সাজানো রথে, চার বক্ষের মিলন হল। বজ্রকুমারের বজ্রের মতো কঠিন প্রতিজ্ঞা গেল আলগা হয়ে। অর্ধেক রাজত্ব চাইলেন, কিন্তু রাজকন্যার বদলে কাঞ্চন-মূল্য আর চাওয়া হল না।

দেশময় আনন্দ-উৎসব পড়ে গেল, এতদিনে বজ্রকুমারের মন ফিরেছে—পুষ্পবতীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে!

ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন চলেছে, এমন সময় শুরু হল ফিসফাস কানাঘুষা রূপকথার রাজ্যে কিছুদিন বেরিয়েছে নতুন কাগজ ‘তেপান্তর’।

রাক্ষস মারা অভিযান শুরু হওয়া থেকে তেপান্তরই সবচেয়ে জোরে বজ্রকুমারের ঢাক পিটে আসছে। সেই তেপান্তরই হঠাৎ একটু উলটো সুর ধরল।

সম্পাদকীয় প্রবন্ধ বার হল। বজ্রকুমার বিয়ে করেছেন, সুখের কথা। কিন্তু দেশের কল্যাণ যাঁর ব্রত তাঁর আদর্শ আরও কঠোর হওয়া উচিত নয় কি? বজ্রকুমারের মতো রূপকথার রাজ্যের এমন অসাধারণ বীর স্বাচ্ছন্দ্যকেই বড়ো করে দেখেন তা হলে তাঁর কাছে দেশ আর কী আশা করতে পারে?...ইত্যাদি, ইত্যাদি।

বিয়ের দিন কিন্তু তা সত্ত্বেও এগিয়ে আসতে লাগল। সম্পাদকীয় প্রবন্ধ পড়ে বজ্রকুমারের মত বদলাবার কোনো আভাসই দেখা গেল না।

বিয়ের আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি। এমন সময় ‘তেপান্তর’ তার ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করল। তেপান্তর বই-এর সম্পাদকীয় কলমে বোমার মতো এক শিরোনামা ফেটে বেরোল—‘বজ্রকুমারের বুজরুকি’! তেপান্তর আগুনের মতো গনগনে ভাষায় বজ্রকুমারকে আক্রমণ করে লিখেছে— যে হয় রাজ্য থেকে ‘নয়’—রাজ্য পর্যন্ত রূপকথার দেশের অনেক রাজ্যেই বজ্রকুমার রাক্ষস মেরেছেন বলে শোনা যায়। কিন্তু একটি রাক্ষসের লাশ এ পর্যন্ত কেউ দেখেছে কি!—

এতগুলো রাক্ষসের লাশ একত্র করলে তো দশটা পাহাড় হয়ে যেত! সে লাশ গেল কোথায়? আর সে লাশ যখন পাওয়া যায় না তখন বজ্রকুমারের কীর্তি বিশ্বাস করা যায় কী করে? এর ভেতর কোথাও একটা কারসাজি বলেই সন্দেহ হয়।

একদিন গেল, দুদিন গেল, ‘তেপান্তর’-এর সম্পাদকীয় প্রবন্ধ গরম থেকে আরও গরম হয়ে উঠল ; রূপকথার রাজ্য আর ঠান্ডা হয়ে থাকতে পারে? তিনদিনের দিন লৌহগড়ের রাজপুরীর দেউড়ির বাইরে দেখা গেল রাজ্যের লোক খেপে উঠে জড় হয়েছে, আর চিৎকার করছে—‘ডাকো বজ্রকুমারকে, দেখাও রাক্ষসের লাশ’।

বিয়ের উৎসবের আর মাত্র দুদিন বাকি এমন সময় এই ফ্যাসাদ। রাজা তাই মাথায় হাত দিয়ে বসেছেন, সেই সঙ্গে পাত্র-মিত্র, কোটাল, মন্ত্রী,—সবাই। রাজসভার সবাই কাঠের পুতুলের মতো নিস্তব্ধ। কারুর মাথায় কোনো বুদ্ধি খেলে না কেউ একটা উপায় বাতলাতে পারে না।

উপায় বার করা তো সোজা নয়—এ যে এগুলেও নির্বংশ, পেছুলেও নির্বংশ। গুজব যা রটেছে তার একটা মীমাংসা না হলে লাঠালাঠি বেঁধে যায়, আবার বজ্রকুমারের মতো বীরকে কৈফিয়ত চেয়ে ঘাঁটাতেও সাহসে কুলোয় না।

রাজামশাই ভয়ে ভাবনায় ঘেমে উঠেছেন, মন্ত্রীমশাই ঘন ঘন নস্যি নিয়ে নাকের জলে চোখের জলে একাকার করে ফেলেছেন উপায় বার করতে, কোটালমশাই চোখ বুজে ভাববার ভান করে একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছেন, এমন সময় দ্বারী হেঁকে বললে—বজ্রকুমার আসছেন রাজসভায়। এমন সময় রাজসভার সবাই শশব্যস্ত হয়ে উঠল। যা জোয়ান গোঁয়ার, সব দেখেশুনে রেগে গিয়ে একটা কান্ড না করে বসে।

কিন্তু বজ্রকুমার কোনো কান্ড করলেন না, রাজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে নেহাত শান্তভাবে বললেন—‘মহারাজ আমি বিচার চাই।’

বিচার? মহারাজ সভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—‘কীসের বিচার’?

‘আজ্ঞে আমার নিজের বিচার,—শুনছি আমার রাক্ষস মারা ব্যাপারটা বুজরুকি বলে কথা উঠেছে।’

মন্ত্রীমশাই ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি কথাটা চাপা দেবার জন্যে বললেন,—আরে রামঃ—ওসব কথা আবার ধর্তব্য! আপনি রাক্ষস মারেননি তো মারলে কে?—তবে কিনা...।

সেই ‘তবে কিনার’ জন্যেই আমার বিচার চাই, সকলের মাঝে খোলা সভায় কাল আমার বিচারের ব্যবস্থা করুন!—গম্ভীরভাবে বলে বজ্রকুমার চলে গেলেন।

মস্ত বড়ো বিচারসভা বসেছে। সকাল থেকে সেখানে লোকে লোকারণ্য। বজ্রকুমার এসে পৌঁছোতেই একদল অভ্যাস মতো ‘জয় বজ্রকুমারে জয়’ বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল। কিন্তু আর একদলের ‘ধিক ধিক’ চিৎকারে সে জয়ধ্বনি চাপা পড়ে গেল। বজ্রকুমার কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে নিজের জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালেন। বিচার শুরু হল। মন্ত্রীমশাইয়ের ওপরই বিচারের ভার। নানান মিষ্টিকথায় মোলায়েম করে তিনি কোনোমতে ভয়ে ভয়ে বজ্রকুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগটা জানিয়ে দিলেন, বললেন—, ‘রাজ্যে একটা গুজব উঠেছে,—বজ্রকুমার নাকি রাক্ষস মারেননি, ফাঁকি দিয়ে রাজত্ব আদায় করেছেন। অবশ্য সবাইকার মত এক রকম নয়। তবু রাক্ষসগুলোর লাশ থেকে তিনি মামলা ‘ডিসমিস’ করে দেন।

মন্ত্রীমশাইয়ের বক্তৃতা শেষ হবার পর বজ্রকুমার গিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়ালেন। সমস্ত সভায় ‘‘টুঁ’’ শব্দটি নেই। সবাই নিশ্বাস বন্ধ করে আছে—বজ্রকুমার সবাইকে একেবারে থ করে দিয়ে বললেন— ‘মন্ত্রীমশাই, গুজব যা রটেছে মিথ্যে নয়।’

সভায় একটা গুন গুন শব্দ আরম্ভ হতেই—হাতের ইঙ্গিতে তা থামিয়ে বজ্রকুমার আবার বললেন— ‘কিন্তু আমার অপরাধের শাস্তি নেবার আগে দু-জন সাক্ষী আমি ডাকতে চাই—ব্যাপারটা পরিষ্কার করবার জন্যে। আমার প্রথম সাক্ষী...’ বলে ইশারা করতেই বিচার সভায় যে ঢুকল তাকে দেখে সভাসুদ্ধ লোকের চক্ষুস্থির। অর্ধেক লোক তো সেইখানেই তৎক্ষণাৎ ভিরমি গেল ভয়ে।

সাক্ষী আর কেউ নয়, স্বয়ং রাক্ষস। তবু তাকে দেখে অতটা ভয় না পেলেও বোধ হয় চলত। রাক্ষস হলে কী হয়, বিচারসভায় সে বেশ ভদ্রভাবেই ভব্যিযুক্ত হয়ে এসেছে দেখা গেল। নখ, চুলছাঁটা, দাড়ি-গোঁফ কামানো, গায়ে দস্তুর মতো রাক্ষসও সে নয়। চুলে তার টাকও পড়েছে, পাকও ধরেছে, দাঁত পড়েছে অনেকগুলো। কুঁজো হয়ে ছাড়া চলতে পারে না। তা ছাড়া রাক্ষস যে অমন হাবাগোবা ভালোমানুষ হয়, চোখে না দেখলে কে বিশ্বাস করত?

কাঠগোড়ায় দাঁড়িয়ে সসম্ভ্রমে মন্ত্রীমশাইকে নমস্কার করে সে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে বললে— ‘ধর্মাবতার, আমি নেহাত মুখখু সাদাসিদে রাক্ষস-কুলের সাবেকি সনদের জোরে পুরুষানুক্রমে রূপকথার রাজ্যে একটু-আধটু উপদ্রব করে আসছি, দুষ্টলোকের কুপরামর্শ শুনে আমার আজ এই দুর্দশা। আমার কসুর মাপ করুন, ধর্মাবতার।’

মন্ত্রীমশাই এবং সভাসুদ্ধ লোক তখন প্রথম ভয়ের ধাক্কাটা সামলে উঠেছে। সাহস করে বেশ একটু কড়া গলায় ধমক দিলেন,— ‘থামাও তোমার কান্না। কাঁদতে লজ্জা করে না? বুড়ো ধাড়ি হয়ে মরবার বয়স হল যে।’

রাক্ষস চাদরে চোখ মুছে বললে,—‘আজ্ঞে সেই দুঃখেই তো কাঁদি, রাক্ষসকুলে আমার মতো হতভাগা কেউ নেই। কোথায় বয়সকালে বাপ পিতামহর নাম রেখে রাজপুত্রের খাঁড়ায় মারা যাব, না, লোকের কুমতলব শুনে লোভে পড়ে বুড়ো হওয়ার জ্বালা ভোগ করছি। কেন যে আমার অমন দুর্মতি হয়েছিল...।’

মন্ত্রীমশাইয়ের ভয় ইতিমধ্যে একেবারে ঘুচে গেছে রাক্ষসের ভাব-গতিক দেখে এবার নির্ভয়েই ধমক দিয়ে বললেন,—‘আ মোলো যা, তবু কাঁদে ; আরে কে তোমায় কী কুমতলব দিলে শুনি?’

রাক্ষস ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললে— ‘তার নাম জানি না হুজুর, তবে গন্ধটা চিনি। সে গন্ধটা যেন এখানেও পাচ্ছি।’

রাক্ষস বেশ একটু চঞ্চল হয়ে চারদিকে নাক ঘুরিয়ে হঠাৎ একদিকে আঙুল তুলতেই দেখা গেল ‘তেপান্তর’-এর সম্পাদক ও মালিক হন্তদন্ত হয়ে সরে পড়েছেন। কিন্তু বজ্রকুমার একলাফে গিয়ে তাঁকে ধরে ফেলে বললেন,—‘এই আমার দু-নম্বর সাক্ষী, মন্ত্রীমশাই।’

ধরা পড়ে ‘তেপান্তর’-এর মালিকের চোহারা তখন বদলে গিয়েছে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তাঁর সেকী তেজ। প্রথমেই তিনি জানিয়ে দিলেন, তাঁকে এভাবে মিছিমিছি নাকাল করার ফল তিনি বুঝিয়ে দেবেন। তেপান্তরএ এমন লেখা লিখবেন..।

মন্ত্রীমশাই বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—‘তেপান্তরের সব লেখা আপনি লেখেন?’

‘হামি লিখব কেন!’ তেপান্তর-এর মালিক চটে উঠলেন রীতিমতো। হামি কি কেরানি আছি! হামি খালি মতলব দিয়ে লিখিয়ে লই।’

‘বেশ বেশ!—আপনার নাম?’

‘লছমন দাস ঝুনঝুনিয়া’।

ঝুনঝুনিয়া! এত রূপকথার নাম নয়।

রূপকথার দেশে কেমন করে এলেন?

ঝুনঝুনিয়া আরও গরম হয়ে উঠলেন,—‘কেন, রূপকথায় কি আমাদের মানা আছে? হামি লোক আজকাল ফিলিম বানাই, কত—পৌরাণিক সামাজিক গল্প লটপট কাটিয়ে বদল করে দিই,—রূপকথায় কেন আসব না?’

‘কিন্তু কুমতলব দিয়ে এ রাজ্যের ধারা।’

ঝুনঝুনিয়া বলল— তবে শুনুন, মন্ত্রীমশাই। তেপান্তরে লেখার জন্য হামার অনেক লোক আছে। হামি শুধু ঘরে বসে রূপকথার জাল বুনি। রাতকে দিন বানাই - দিনকে রাত। এ হামারই কাজ। সেজন্যইতো ‘তেপান্তর’ পত্রিকার বিক্রি সবচেয়ে বেশি। হামার কাছে স্বর্গ-মর্ত্য সবই এক। হামি একটাই বুঝি, শুধু ‘রূপায়া’। অর্থাৎ কিনা টু-পাইস। দুনিয়াটা মশাই চলছে রূপায়ার ওপর। আপনি দু-পয়সা কামিয়ে নিন না মন্ত্রীমশাই।’

সভায় উপস্থিত লোকজন হৈ-চৈ করে উঠলো। লোকটার সাহস কী। এখনই ওর গর্দান যাবে। মন্ত্রীমশাই সবাইকে শান্ত হতে বললেন। কিন্তু একথায় মন্ত্রীমশাই বেশ বিপাকেও পড়লেন। এরপর জোড়া গোঁফে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘‘আর ছি: ছি: এসব কথা কী বলছেন আপনি? এসব কথা কী সবার সামনে হয়?’’

অধ্যায় ১ / ১৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%