প্রেমেন্দ্র মিত্র

১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে কম্বোজের পূর্ব উপকূলে একটি অসাধারণ রহস্যময় ব্যাপার ঘটে। কম্বোজের পুরোনো সরকারি দপ্তরে তার উল্লেখ আছে কিন্তু কোনো বিস্তৃত বিবরণ নেই।
১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে কম্বোজের পূর্ব উপকূলে ভয়ানক জলদস্যুর উৎপাত আরম্ভ হয়। কম্বোজের জল পুলিশ, নৌ-সেনা প্রাণপণ চেষ্টা করে তাদের দমন করতে পারে না। দমন করা দূরে থাক—তাদের সন্ধান পর্যন্ত পায় না।
কোথা থেকে সিন্ধু-শকুনের মতো এই জলদস্যুদের বেগবান সুলুপগুলি এসে বড়ো বড়ো বাণিজ্য-তরির ধনসম্পদ যে লুটে নিয়ে যেত, কম্বোজের যুদ্ধতরিগুলি কিছুই বুঝে উঠতে পারত না। কম্বোজের সমস্ত পাহারা এড়িয়ে রাজকর্মচারীদের চোখে ধূলি দিয়ে এই জলদস্যুর দল এমন অনায়াসে তাদের কাজ হাসিল করে যেত যে, শেষে তারা মানুষ নয়, এমনি একটা জনপ্রবাদ সমস্ত কম্বোজের অশিক্ষিত মাঝি-মাল্লার ভেতর রটে গেল।
বাণিজ্যতরির জন্য মাঝি-মাল্লা পাওয়া ক্রমে দুষ্কর হয়ে উঠল। তারা মানুষের বিরুদ্ধে লড়ে জান দিতে প্রস্তুত, কিন্তু দেবতার বিরুদ্ধে তারা কী করতে পারে এই হল তাদের বুলি।
পূর্ব উপকূলের ব্যাবসা-বাণিজ্য একরকম বন্ধ। উপরওয়ালাদের তাড়া খেয়ে পুলিশ ও নৌ-সেনা মরিয়া হয়ে জলদস্যু দমনে লেগে গেল। কিন্তু কিছুই হল না। কম্বোজের পূর্ব উপকূলে দস্যুদের প্রতাপ অক্ষুণ্ণই রইল। জলদস্যুরা যে মানুষ নয়, এই জনরব এই সব ব্যাপারে আরও বিস্তৃত হয়ে পড়ল।
পঞ্চাশ বছর বাদে কম্বোজে এখনও সে প্রবাদ লোকের মুখে শোনা যায়। তার কারণও আছে।
১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে সাইগনের কাছে একটি অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত মশলা বোঝাই প্রকান্ড স্টিমার লুট হয়ে যায়। কম্বোজ সেই প্রথম স্টিমার—যদিও সেকেলে কিন্তু সাধারণ সুলুপের চেয়ে অনেক বড়ো। এই স্টিমার লুট হওয়ার পর সেখানকার সদাগর মহলে রীতিমতো বিভীষিকা দেখা দেয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই স্টিমারই জলদস্যুদের শেষ লুট। তারপর কম্বোজের পূর্ব প্রান্ত থেকে তারা যেন জাদুমন্ত্রে অদৃশ্য হয়ে যায়। যাদের দাপটে সারাসমুদ্র একদিন থরহরি কম্পিত হত, হঠাৎ তারা কেমন করে এমন নিশ্চিহ্ন হয়ে অন্তর্ধান হতে পারে এ রহস্যের কোনো মীমাংসা আর হয় না।
এর পর জলদস্যুদের সম্বন্ধে নানা আজগুবি কিংবদন্তি রটা আশ্চর্য মোটেই নয়।
কম্বোজের সরকারি দপ্তরে এই রহস্যময় ব্যাপারের উল্লেখ আছে, কিন্তু কেমন করে তারা লোপ হয়ে গেল, এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।
যে সমস্যার কথাই কখনো শুনিনি, সুদূর বাংলাদেশের একটি শহরে বসে তার সমাধান জানতে পারব একথা কে ভেবেছিল!
যে রকম সামান্য ব্যাপারের ভেতর দিয়ে এই রহস্যের কথা জানতে পারি তা ভাবলে এখন বিস্ময় লাগে।
সুধীরদের বাড়ি সেদিন সকালে নিমন্ত্রণ ছিল। নিমন্ত্রণ এমন তাদের বাড়ি প্রায়ই হয় কিন্তু সেদিন একটি বিশেষ উপলক্ষ্যও ছিল।
সুধীরের জ্যাঠামশাই সুদূর সুমাত্রায় ডাক্তারি করতেন, বহুদিন বাদে সেখানকার কাজ ছেড়ে দিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন— সেই উপলক্ষ্যেই খাওয়ার আয়োজন।
এ কয়দিন স্কুলে ও স্কুলের বাইরে সুধীরের মুখে তার জ্যাঠা মহাশয়ের কথা ছাড়া আর কোনো কথা ছিল না। সত্তর বৎসরের বৃদ্ধের এমনকী অসাধারণত্ব থাকতে পারে যাতে চোদ্দো বছরের কিশোর-মন মুগ্ধ হয়ে যায় এতদিন বুঝতে পারিনি। কিন্তু বঙ্কিমবাবুকে দেখবামাত্র সে প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম। বৃদ্ধ সত্যই অসাধারণ। প্রথমত বাঙালির ভেতর অমন চেহারাই দুর্লভ। সত্তর বৎসর বয়স যে তাঁর হয়েছে একথা তিনি নিজে না বললে বিশ্বাস করাই কঠিন। দীর্ঘ বলিষ্ঠ দেহ, মুখে বয়সের চিহ্ন আছে বটে কিন্তু বার্ধক্যের জীর্ণতার পরিচয় নেই। গাম্ভীর্য দূরে থাক, মুখে বালকের মতো কৌতুকের হাসিটি লেগেই আছে। ছোটো ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অত্যন্ত সহজে মিশে যাবার দেখলাম তাঁর অসাধারণ ক্ষমতা আছে।
তাঁর জীবনের বিবরণ যা শুনলাম তাও অদ্ভুত। অত্যন্ত ডানপিটে দুরন্ত ছিলেন ছেলেবেলায়। সেজন্যে তাঁকে নানারকম শাস্তি ঘরে-বাইরে সহ্য করতে হয়েছে। স্কুলে থেকে একবার কী কারণে বিতাড়িত হয়ে তিনি আর লজ্জায় বাড়ি ফেরেন না। বহুদিন পর্যন্ত তাঁর খবর না পেয়ে সকলে তাঁর জীবনের আশা পর্যন্ত ত্যাগ করেছিল। অবশেষে একদিন বিলেতের ডাকে তাঁর বাবার নামে একটি চিঠি এসে হাজির। চিঠি খুলে তিনি তো অবাক! যে ছেলে এখানের স্কুলে কোনোরকমে প্রোমোশন পাবে কি না বছরের শেষে সেই দুশ্চিন্তায় তাঁকে রাতের পর রাত অনিদ্রায় কাটাতে হত, বিলেতে গিয়ে তিনি সেখানকার প্রবেশিকার বেড়া উপড়ে একেবারে মেডিকেল কলেজে গিয়ে ভরতি হয়েছেন। শুধু ভরতি হননি সেখানে পড়াশোনা দস্তুর মতো কৃতিত্ব দেখিয়ে সে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশংসা লাভ করেছেন।
তারপর সেখানকার মেডিকেল কলেজ থেকে সসম্মানে পাশ হয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু ঘরে বসে থাকা তাঁর ধাতে সইবে কেন। কিছুদিন বাদেই সুমাত্রার কাছে একটি বড়ো হাসপাতালের ভার পেয়ে তিনি আবার সাগরে পাড়ি দেন।
সেই বিদেশেই তাঁর সমস্ত জীবন কেটেছে। এই বৃদ্ধবয়সে সে কাজ থেকে অবসর গ্রহণ করে তিনি দেশে শেষ জীবন কাটাবার জন্যে ফিরেছেন।
এই বিবরণ শুনেই তখন বিস্মিত হয়েছিলাম, জানতাম না যে তাঁর জীবনে এমন ঘটনা ঘটেছে, যার কাছে এ সমস্ত ব্যাপার নিতান্ত তুচ্ছ সাধারণ।
সকলে একসঙ্গে খেতে বসেছিলাম। সুধীরের জ্যাঠামশাই নানারকম মজার গল্প করে খাওয়ার আসর জমিয়ে রেখেছিলেন। সুমাত্রার লোকেদের একরকম অদ্ভুত নিয়মের কথা বলেছেন এমন সময় হঠাৎ পাতের দিকে চেয়ে তাঁর মুখ যেন বিবর্ণ হয়ে গেল— ব্যস্তসমস্ত হয়ে বললেন—‘না না ও আমি খাই না—ও কাঁকড়া তুলে নিয়ে যাও।’
আমরা তাঁর মুখ দেখে চুপ করে ছিলাম, সুধীর তাঁর পাশে বসেছিল অত লক্ষ করেনি, বললে—‘কেন জ্যাঠাবাবু এই বুঝি আপনার দাঁতের জোর, কাঁকড়ার দাঁড়া চিবোতে পেছিয়ে যাচ্ছেন।’
বঙ্কিমবাবু একটু হাসবার চেষ্টা করে বললেন—‘দাঁতের জোর ঠিকই আছে রে। কিন্তু ও কাঁকড়া দেখলে আমার সমস্ত শরীর কেমন করতে থাকে।’ তারপর কিন্তু উঠে পড়ে বললেন, ‘আমার খাওয়া হয়ে গেছে বাপু, বুড়ো মানুষ বসে থাকতে পারলুম না—কিছু মনে কোরো না যেন।’
খাওয়া তাঁর তখনও হয়নি। আমরা সবাই সত্যই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সুধীরের বাবা ছুটে এসে বললেন—‘ওকী দাদা কিছু না খেয়েই উঠে পড়লে যে?’
‘হয়েছে হয়েছে, আমার খাওয়া হয়ে গেছ। এখন কি আর আগের মতো খেতে পারি’—বলে বঙ্কিমবাবু এত তাড়াতাড়ি চলে গেলেন যেন এ ঘরে তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসছে।
কাঁকড়া পাতে দেওয়ার পরই একী হল আমরা বুঝতে না পেরে থ হয়ে রইলাম।
দুপুর বেলা বাইরের ঘরে বসে সুধীর বললে, ‘কেন খেলেন না আপনাকে বলতেই হবে জ্যাঠাবাবু!’
দু-একবার এড়াবার চেষ্টা করে বঙ্কিমবাবু অবশেষে একটু হেসে বললেন—‘কাঁকড়া দেখলেই আমার অজ্ঞান হবার মতো হয়—তাই না উঠে পারলাম না।’
‘কেন জ্যাঠাবাবু?’—সুধীর অমনি ছাড়বার ছেলে নয়। খানিক চুপ করে থেকে কী ভেবে বঙ্কিমবাবু বললেন—‘তবে শোন কিন্তু শেষকালে আমাকে পাগল ভাবিসনি যেন। এই ভয়ে পৃথিবীর কাউকে একথা আজও জানাইনি। মানুষের স্বভাব ভারি মজার, এত বড়ো আশ্চর্য দুনিয়ায় বাস করেও অত্যন্ত সাধারণ ব্যাপার ছাড়া আর কিছুতে বিশ্বাস করতে সে নারাজ।’
বঙ্কিমবাবু গড়গড়ার নলটি একধারে সরিয়ে রেখে আবার বললেন—‘তোরা বড়ো জোর মনে করবি বুড়োর ভীমরতি ধরেছে। তা বুড়ো হলে অমন হয়। এককালে এই গল্প বললে হয়তো আমার চাকরি মান সম্ভ্রম সব যেত। মানুষের অসাধারণের ওপর এমনি অবিশ্বাস।’
এইবার গল্প শুরু হল। বঙ্কিমবাবু বলতে লাগলেন পঞ্চাশ বছর আগের কথা :—
সুমাত্রায় তখন বছর কয়েক চাকরি করেছি। এমন সময় সেখানে ভয়ানক কান্ড শুরু হল। সুমাত্রায় তখন টিকে দেবার বীজ পাওয়া দুষ্কর ছিল। শুনলাম সাইগনে একজন ফরাসি ডাক্তার নিজের পরীক্ষাগার করে টিকার বীজ তৈরি করছেন। সেই টিকার বীজ ভালো হলে তাই কিনে আনব বলে সাইগনে গেলাম। সাইগনে কয়েকদিন থেকে টিকার বীজ সংগ্রহ করে আবার সুমাত্রায় ফেরবার আয়োজন করবার সময় ভয়ানক বিপদে পড়লাম।
কম্বোজের পূর্ব উপকূলে তখন ভয়ানক জলদস্যুর উৎপাত। আসবার সময় সুমাত্রার মাঝি-মাল্লারা তেমন ভয় পায়নি। কারণ সুমাত্রায় এই জলদস্যুদের সম্বন্ধে বেশি গুজব পৌঁছোয়নি। কিন্তু সাইগনে কয়েকদিন থেকে নানা কথা শুনে তারা ইতিমধ্যে ভড়কে গিয়েছিল। তারা দেশের টানেও এই জলদস্যুদের ভেতর দিয়ে আর যেতে রাজি নয়। জলদস্যুরা সত্যি ভয়ানক নৃশংস ব্যবহার করত। শুধু লুট তরাজও নয়, অকারণে মানুষ মারতেও তাদের যেন আনন্দ।
ফেরবার জাহাজ না পেয়ে কী করব ভাবছি, এমন সময় সেই ফরাসি ডাক্তার খবর দিলেন যে, নূতন একটি ফরাসি কোম্পানি একখানি স্টিমার আনিয়েছে। কাল সে স্টিমার প্রথম যবদ্বীপ হয়ে সাইগনে আসবে। তাইতে আমি আবার সুমাত্রায় ফিরতে পারি। সত্যি কথা বলতে কী —হাতে যেন স্বর্গ পেলাম।
শুধু মাঝি-মাল্লাদেরই দোষ দেব কেন এই জলদস্যুদের সম্বন্ধে মনে যথেষ্ট আমারই ভয় ছিল। সাধারণ পাল-তোলা জাহাজে যাওয়া কত বিপজ্জনক তাও জানতাম, অকারণে প্রাণ হারাবার বিশেষ বাসনাও ছিল না। এই স্টিমারটিতে যেতে পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে গেলাম।
এদেশে এই প্রথম স্টিমার আক্রমণ করা দূরে থাক, স্টিমার দেখলে জলদস্যুরা বোধ হয় ভয়েই খুন হবে।
সঙ্গে বেশি কিছু জিনিসপত্র ছিল না। টিকার বীজই আসল জিনিস। অত্যন্ত সাবধানে তাই নিয়ে কয়েকদিন বাদে স্টিমারে উঠলাম। প্রকান্ড মজবুত স্টিমার। জলদস্যুদেরই জন্যে তার দুই প্রান্তে দুটি কামান বসান। তা ছাড়া স্টিমার রক্ষা করবার জন্যে জন পঞ্চাশ সৈন্যও নেওয়া হয়েছিল। স্টিমারে উঠে অত্যন্ত আনন্দ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আসুক জলদস্যু।
কিন্তু সকালে স্টিমার ছেড়ে সন্ধ্যায় যখন মাঝসমুদ্রে পাড়ি দিচ্ছে তখন পর্যন্ত জলদস্যুদের কোনো চিহ্ন দেখা গেল না। একটু হতাশই যেন হলাম। জলদস্যুদের মজাটা একবার টের পাইয়ে দেবার সুবিধে হল না বলে।
কিন্তু জলদস্যুরা এল।
রাত তখন বেশি নয়। চারদিকে অন্ধকার। হঠাৎ স্টিমারের প্যাডলের গম্ভীর আওয়াজ ছাড়িয়ে স্টিমারের তীক্ষ্ণ হুইসল শোনা গেল। পরমুহূর্তে স্টিমারের ইঞ্জিন থেমে গেল।
ব্যাপার কী?
যাত্রীরা সবাই সামনের ডেকে গিয়ে ভিড় করলাম। ক্যাপ্টেন শশব্যস্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সৈন্যরা কামান ও বন্দুক বাগিয়ে ঠিক হয়ে আছে। সামনে বহুদূরে গুটিকতক আলো দেখা যাচ্ছে।
শুনলাম, আলো আর কিছুর নয় জলদস্যুদের নৌবহরের।
এবার অন্তত তারা আক্রমণ করতে আসেনি। আমরাই তাদের আক্রমণ করছি।
স্টিমার থেকে একসঙ্গে কামান ও বহু বন্দুক গর্জন করে উঠল।
জলদস্যুরা আমাদের এতক্ষণ দেখতে পায়নি বলেই মনে হল। কারণ আওয়াজ হওয়া মাত্র টপ টপ করে তারা নৌকোর আলো সব নিবিয়ে ফেললে। কিন্তু আমাদের ক্যাপ্টেন ছাড়বার পাত্র নয়। বললেন, অন্ধকারেই গুলি চালাও।
তখন সার্চলাইট বলে কিছু ছিল না। থাকলে আমাদের অমন সর্বনাশ বোধ হয় হত না।
অন্ধকারেই গুলি চলতে লাগল। জলদস্যুদের সুলুপগুলিতে মাঝে মাঝে কোথাও আলো জ্বলে ওঠে। আমাদের স্টিমার তাই দেখেই তাদের ধাওয়া করে, আর গুলি চালায়।
ক্যাপ্টেন বলছেন শুনতে পেলাম—আজ আর রেহাই দেওয়া নেই ; ভীমরুলের চাক ভেঙে তবে ছাড়ব।
স্টিমার ক্রমশ তাদের সুলুপগুলির কাছ বরাবর এসে পড়েছিল। অন্ধকারেও অস্পষ্টভাবে সুলুপগুলি দেখা যাচ্ছিল।
এমন সময় হঠাৎ সবাই স্টিমারের ওপর উবুড় হয়ে পড়ে গেলাম। তার সঙ্গে ভয়ংকর এক আওয়াজ! প্রকান্ড স্টিমারটা যেমন মর্মান্তিকভাবে আহত হয়ে কেঁপে উঠল।
স্টিমার চোরা পাহাড়ে ঠেকে গেছে।
ক্যাপ্টেনও পড়ে গিয়েছিলেন! উঠে পড়ে উন্মত্তের মতো তিনি ছুটে গিয়ে তাড়াতাড়ি ইঞ্জিন থামিয়ে দিলেন কিন্তু তখন আর উপায় নেই। তলায় প্রকান্ড চিড় হয়ে জাহাজে তখন রাশি রাশি জল ঢুকছে।
জলদস্যুরা যে এই উদ্দেশ্যেই আমাদের প্রলোভন দেখিয়ে এপথে টেনে এনেছে তা কে জানত।
স্টিমার ঠেকে যাবার সঙ্গে সঙ্গে যে ভয়ংকর ব্যাপার শুরু হল তার আর বর্ণনা হয় না। জলদস্যুদের কয়েকটি মাত্র সুলুপ স্টিমারকে প্রলোভন দেখিয়ে ডুবোপাহাড়ে ঠেকাবার জন্যে সামনে ছিল। তাদের বেশির ভাগ সুলুপই ছিল পেছনে। তারা ইতিমধ্যে কোথা থেকে এসে ছেঁকে ধরল।
অন্ধকারে চারদিকে শুধু ভীত যাত্রীদের আর্তনাদ। জলদস্যুরা নৃশংসভাবে তাদের হত্যা করতে শুরু করে দিল। এই জলদস্যুদের হাতে মরার চেয়ে জলে ডুবে মরা ভালো বলে জলে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছি, এমন সময় পেছন থেকে মাথায় একটা প্রচন্ড আঘাত খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লাম।
যখন জ্ঞান হল তখন দিন। দেখি হাতপা বেঁধে আমায় একটু সুলুপের ওপর দস্যুরা ফেলে রেখেছে। বুঝলাম স্টিমার ডুবেছে এবং আমায় এরা ক্রীতদাস করে নিয়ে চলেছে। অনেক কষ্টে হাতপা বাঁধা অবস্থাতেই উঠে বসলাম। সামনে দেখলাম সমুদ্রের মাঝে প্রকান্ড পাহাড়। এই পাহাড়টিকে চিনতাম। জাহাজ-টাহাজ এই পাহাড়ের পাশ দিয়েই যাতায়াত করে, কিন্তু পাহাড়ের গায়ে আছড়ে মরবার ভয়ে কেউ বড়ো কাছে ঘেঁসে না।
এখন দেখে আশ্চর্য হলাম যে, জলদস্যুদের নৌকোগুলি এই পাহাড়ের দিকেই এগিয়ে চলেছে।
সমুদ্র থেকে পাহাড়টি খাড়া উঠেছে জানি। তার কোথাও কোনো নৌকো দূরের কথা, মানুষ দাঁড়াবার আশ্রয় নেই। তবে এই জলদস্যুরা চলেছে কোথায়। এই পাহাড় তাদের ঘাঁটি হলে তারা অনেকদিন আগেই ধরা পড়ে যেত। সমস্ত বাণিজ্যজাহাজ এই পাহাড়ের ধার দিয়েই তো যায়।
পাহাড়ের কাছে পৌঁছে কিন্তু জলদস্যুদের আড্ডার রহস্য অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেল। পাহাড়ের চারধারে কোথাও দাঁড়াবার জায়গা না থাকলেও একধারে একটি নাতিবৃহৎ গুহাপথ রয়েছে। সমুদ্রের জল তার ভেতর দিয়ে চলে গেছে। আমাদের সুলুপটি ক্রমশ এগিয়ে এসে তার ভেতর ঢোকামাত্র সব অন্ধকার হয়ে গেল।
গুহাপথটি বেশি চওড়া নয়। আমাদের সুলুপ অতিকষ্টে তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে বুঝলাম। কিন্তু কোথায়?
অন্ধকারে এমন প্রায় মিনিট দশেক কাটল এবং তারপর চারদিক পরিষ্কার হয়ে গেল। দেখি সামনে প্রকান্ড খোলা জায়গা। তার মাঝে একটি ছোটো হ্রদের মতো। সমুদ্রের জল সেই হ্রদে গিয়ে শেষ হয়েছে। সুলুপগুলি সেই হ্রদের একধারে ভিড়ল। সমুদ্রের এই পাহাড়ের মাঝখানে এমন গোপন স্থান ছিল কে জানত? এইখানে মানুষের অগোচরে জলদস্যুরা নির্ভয়ে তাদের লুটের মাল সঞ্চয় করে বসবাস করে।
আমায় ধরে সুলুপ থেকে নামিয়ে দেবার পর দেখলাম, আমার মতো আরও অনেককে তারা বন্দি করে এনেছে—তাদের দাসবৃত্তি করবার জন্য।
এর পর আমাদের যে জীবন শুরু হল, তার দুঃখ আর বলে শেষ করা যায় না। মানুষ যে এমন পিশাচ হতে পারে এই জলদস্যুদের দেখবার আগে তা কখনও কল্পনা করিনি। সারাদিন তাদের জন্যে অকারণে হাড়ভাঙা খেটে ভালো করে একটু খাবার উপায়ও আমাদের ছিল না। আমরাই তাদের আহারের বন্দোবস্ত করতাম। আমাদের চোখের সামনে তারা উন্মত্ত হয়ে সেই খাবার ফেলে ছড়িয়ে নষ্ট করত, কিন্তু আমাদের আধপেটা খাওয়াও তাদের সহ্য হত না।
সারাদিনের পর একটিবার মাত্র দাসেদের অত্যন্ত কদর্য আহার মিলত। সেই কদর্য খাবারও সুখে খাবার উপায় নেই। জলদস্যুদের তো লুট করা ছাড়া আর কাজ নেই। একজনের হয়তো ইচ্ছে হল এই ক্রীতদাসেদের নিয়ে একটু মজা করা যাক। খেতে বসেছি— হঠাৎ হাসতে হাসতে এসে লাথি মেরে সব খাবার ফেলে দিল। কুড়োতে গেলে আর এক লাথি। প্রতিবাদ করতে গেলে একটি তরোয়ালের খোঁচায় ভবলীলা সাঙ্গ।
ক্রীতদাসেদের একজোট হয়ে বিদ্রোহ করবার উপায় নেই। কারণ, প্রথমত —আমরা অস্ত্রহীন; দ্বিতীয়ত—আমাদের সকলের পায়ে বেড়ি। সেই বেড়ি নিয়েই আমাদের চলতে-ফিরতে হত।
দিনের পর দিন এইভাবেই কেটে যাচ্ছিল। যে সাহেবি পোশাকে এসেছিলাম, সেই পোশাকের আর পরিবর্তন হয়নি। সেটি ছিঁড়ে-খুঁড়ে প্রায় কুটি কুটি হয়ে গিয়েছিল। সেদিকে নজরও আর ছিল না। একদিন কিন্তু সেই পোশাক থেকে একটি জিনিস খুঁজে পেয়ে ক্ষণিকের জন্য উল্লসিত হয়ে উঠলাম।
বসন্তের টিকার বীজ নিয়ে যেতে সাইগনে এসেছিলাম বলেছি। সে সমস্ত টিকার বীজের শিশি সমুদ্রের স্টিমারের সঙ্গেই ডুবেছিল। কিন্তু তার ভেতর একটি শিশি কবে দেখবার জন্যে বার করে ভুলে ওয়েস্ট-কোটের পকেটে রেখেছিলাম মনে নেই। ওপরের কোটটি একেবারে ছিঁড়ে যাওয়ায় একদিন খুলে ফেলে দিলাম। সেদিন ওয়েস্টকোটের পকেটে হঠাৎ হাত দিয়ে সেই শিশিটি পেলাম। শিশিটি কীসের বুঝতে পেরে আমার আনন্দের সীমা রইল না। এতদিনকার অমানুষিক অত্যাচারের এইবার শোধ নেব। মরুক এই পিশাচের দল।
আমার কাছে যে টিকার বীজ ছিল, তা শোধন করা নয়। সুমাত্রায় গিয়ে তা আমি শোধন করে ব্যবহার করব বলেই নিয়ে যাচ্ছিলাম। এই অশুদ্ধ বীজের এতটুকু একজন দস্যুর রক্তে মিশিয়ে গেলে যে মহামারি শুরু হবে তা থেকে কেউ বাঁচবে না।
কিন্তু পরমুহূর্তেই বুকের ভেতর থেকে কেঁপে উঠল। এ আমি উন্মত্তের মতো কী ভাবছি। হাজার হলেও আমি ডাক্তার। মানুষকে বাঁচানোই আমার ব্রত, আমি কিনা মৃত্যুর বাহন হয়ে মানুষকে মারতে যাচ্ছি। হোক সে শত্রু, হোক সে অত্যাচারী, চরম উৎপীড়ন সয়েও একাজ যে আমি পারি না। তা ছাড়া শুধু তো জলদস্যুরা নয়, নিরীহ উৎপীড়িত ক্রীতদাসেরাও যে এই মহামারিতে মারা যাবে।
কিন্তু বিধাতার শাস্তি শেষপর্যন্ত তারা পেল, অদ্ভুত উপায়ে।
আমার কাজ ছিল, আর কয়েকজন দাসের সঙ্গে হ্রদের জলে মাছ ধরা। আমরা ছোটো একটি নৌকো নিয়ে সারাদিন হ্রদে ঘুরে ঘুরে জাল ফেলে ফেলে মাছ ধরতাম। একদিন সকালে হঠাৎ প্রথম জাল তুলে অবাক হয়ে গেলাম। সমস্ত জাল, লাল রঙে যেন চোবানো। একটু নজর করে দেখতে, মনে হল, জালময় যেন ছোটো ছোটো লাল কাঁকর উঠেছে এবং পরক্ষণেই দেখলাম সে কাঁকর নড়তে শুরু করেছে। কাঁকর নয়, সে কাঁকড়ার ছানা।
এদেশের কোনো কোনো নদীতে বৎসরের এক সময়ে অমনি কাঁকড়ার ছানা হয়। নদী ভরে যায়, আঁচল করে জল তুললে তাতে অসংখ্য ছানা কিলবিল করে।
তৎক্ষণাৎ জাল আবার জলে ফেলে দেওয়া হল। তাতে কী হবে? কাঁকড়ার ছানারা ততক্ষণে সমস্ত নৌকো ছেঁকে ধরেছে। তারা শুধু নৌকোয় উঠেই ক্ষান্ত হয় না—সুড়সুড় করে দলে দলে গায়ে ওঠে। তাদের ঝেড়ে ফেলে দেওয়াও দায়; পাঁচটাকে ঝাড়তে পঞ্চাশটা উঠে পড়ে। তাদের মাড়াতেও কষ্ট হয় কিন্তু না মাড়িয়েও উপায় কী। বুঝতে পারলাম না কোথা থেকে এই সমুদ্রে পঙ্গপাল এল! সমুদ্রের ‘পঙ্গপাল’ কথাটি তাদের পক্ষে কীরকম যে খাটে সেদিন তা বুঝতে পারলাম!
কিছুক্ষণ বাদে নৌকোয় থাকাও অসম্ভব হল। মাছ তো সেদিন সামান্যই মিলল। তাই নিয়ে পাড়ে উঠে দেখি, পাড়েরও বহুদূর পর্যন্ত সেই কাঁকড়ার ছানায় ছেয়ে গেছে।
মাছ না পাওয়ার জন্যে সেদিন যথেষ্ট উৎপীড়ন অবশ্য সহ্য করতে হয়েছিল। পরের দিন কিন্তু সকালে হ্রদের ধারে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। তীরে বহুদূর থেকে দেখা যায় সমস্ত হ্রদের জল রক্তের মতো রাঙা হয়ে গেছে। কাঁকড়াগুলো একদিনেই যেন অনেকটা বড়ো হয়ে উঠেছে।
আমরা আগের দিন কাঁকড়ার জন্যে মাছ ধরতে পারিনি বলে কৈফিয়ত দেওয়ায় একজন দস্যু আমাদের সঙ্গে আমাদের কথা সত্যি কি না যাচাই করতে এসেছিল। আমাদের একজন সেই কাঁকড়ার সমুদ্র দেখিয়ে বললে,—‘কেমন, আমরা মিথ্যে বলেছিলাম, ওই কাঁকড়ার ভেতরে মাছ পাওয়া যায়।’ তার মুখে এক ঘুঁসি মেরে দস্যু বলল—‘তাই ধরতে হবে।’
তাই ধরতেই গেলাম। কিন্তু হ্রদে পৌঁছোতে পারলে তো। তীরের ওপরেই কিলবিল করে কাঁকড়ার পাল গায়ের উপর ওঠতে থাকে। শুধু গায়ে ওঠে না। তারা বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটু একটু কামড়াতেও শিখেছে। কত তাদের গা থেকে ঝেড়ে ফেলা যায়। খানিক দূর গিয়ে বাধ্য হয়ে ফিরলাম। যে দস্যু তদারক করতে এসেছিল এবারে সে কিন্তু কিছু বলল না।
সত্যকার বিপদ তার কয়েক দিন পর থেকে শুরু হল। সকাল বেলা হঠাৎ পায়ে কীসের কামড় খেয়ে ধড়মড় করে উঠে বসলাম। আমাদের শোবার কোনো জায়গা ছিল না। মাঠের ওপর যেখানে সেখানে গোরু-ঘোড়ার মতো আমরা শুয়ে থাকতাম।
উঠে দেখি, চিতিকাঁকড়ার আকারের একটি লাল কাঁকড়া সজোরে দাঁড়া দিয়ে পায়ের একটি আঙুল কামড়ে ধরেছে। আশপাশে আরও বিস্তর কাঁকড়া ছুটে বেড়াচ্ছে। অনেক কষ্টে সে কাঁকড়ারা আকারে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে এতদূর পর্যন্ত এগিয়ে এসেছে দেখে, সত্যই অবাক হয়েছিলাম।
চারদিকেই কাঁকড়ার পাল। এমন অদ্ভুত ব্যাপারের কথা কখনও শুনিনি বা পড়িনি। প্রকৃতির নিয়মে সব নিম্নশ্রেণির প্রাণীরই প্রথমে এই রকম বংশবৃদ্ধি হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধিকাংশই মারা যায়। না গেলে পৃথিবীতে মানুষের বাস করা অসম্ভব হত।
দস্যুদের দেখলাম, একটা নতুন খেলা জুটেছে, কাঁকড়া মারা।
তারা বড়ো বড়ো লাঠি নিয়ে চারধারে কাঁকড়া মেরে বেড়াচ্ছিল। বিকেলের দিকে তাদেরও প্রাণে কিন্তু ভয় না হোক দুশ্চিন্তা দেখা দিল। এই কাঁকড়ার পাল না গেলে রাত্তিরে শোবার জায়গাও যে মিলবে না। হ্রদ থেকে পালে পালে এসে তারা যেখানে যা কিছু আছে সব অধিকার করে ফেলছিল। দস্যুদের প্রকান্ড ভাঁড়ার ঘরের চারধারে পঁচিশ জন দাস শুধু কাঁকড়া মারবার জন্যই মোতায়েন রাখতে হয়েছিল। কিন্তু তারাও হয়রান হয়ে পড়েছিল। ক্রমাগত মেরে মেরে একদল ক্লান্ত হয়ে গেলে, আর এক দল তাদের জায়গা নিচ্ছিল। কিন্তু এত চেষ্টা সত্ত্বেও কাঁকড়ার পালের ভাঁড়ারে ঢোকা বন্ধ করা গেল না।
রাত্রে কোথায় শোয়া হবে সেই হল সবচেয়ে সমস্যা। সমস্ত পাহাড়ঘেরা দ্বীপ কাঁকড়ায় ছেয়ে গেছে। সে দ্বীপে যা কিছু আহার্য ছিল, তা প্রায় শেষ করে ফেলে ক্ষুধার জ্বালায় তারা উন্মত্ত হয়ে উঠেছে বুঝতে পারলাম। আমরা যে তাদের ভক্ষ্য নয়,—একথা তাদের বোঝানো ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছিল।
সে রাত্রে আর ক্রীতদাসে প্রভুতে প্রভেদ রইল না। সবাই যে যার নিজের দেহ বাঁচিয়ে আশ্রয় খুঁজতে ব্যস্ত। অনেক কষ্টে একটুখানি পরিষ্কার জায়গা পেয়ে, শুয়ে একটুখানি না ঘুমোতে ঘুমোতেই কাঁকড়ার কামড়ে অস্থির হয়ে জেগে উঠতে হয়। সে কাঁকড়ার শক্ত দাঁড়া আবার না ভাঙলে ছাড়াবার উপায় নেই। সারারাত এমনি পাগল হয়ে ফিরে সকালবেলা যে ব্যাপার দেখলাম—তাতে সমস্ত রক্ত জল হয়ে গেল ভয়ে।
একজন দস্যু অনেক রাত্রে অত্যন্ত মদ খেয়ে মাতাল হয়ে বুঝি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। কাঁকড়ারা তার রক্তাক্ত কঙ্কালটি ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট রাখেনি।
সকাল হলেও বিপদ বাড়ল বই কমল না। আগের রাত্রে শোবার জায়গা পাওয়া দুষ্কর হয়েছিল। এদিন দাঁড়িয়ে থাকাই দুষ্কর। সমস্ত দ্বীপ রাঙা হয়ে গেছে কাঁকড়ায়। তারা পাহাড়ে পর্যন্ত ক্ষুধার জ্বালায় গিয়ে উঠছে। স্থির হয়ে কোথাও দাঁড়াবার উপায় নেই। অনবরত গা ঝেড়ে ঝেড়ে চলে না বেড়ালে তারা কামড় দেবেই —একটি নয় একসঙ্গে পঞ্চাশটি।
সেদিন যে কীভাবে গেল, ভালো করে স্মরণও হয় না। আহার নেই — নিদ্রা নেই, সারাদিন ছুটে বেড়াচ্ছি। কাঁকড়া মেরে মেরে হাত পা অবশ হয়ে গেছে, আর হাতের লাঠি নড়াতেও ইচ্ছে করে না। কোনোরকমে একটু নড়ে চড়ে বেড়াবার শক্তিটুকু আছে। সমস্ত দ্বীপে বড়ো কোনো গাছ নেই — থাকলেও এ কাঁকড়াদের হাত থেকে নিস্তার পেতাম না।
সন্ধের সময় পায়ের একটা আঙুল কাটা গেল। কাঁকড়াটাকে লাঠির বাড়ি মেরে গুঁড়িয়ে ছাড়ালাম, কিন্তু তার দাড়া ততক্ষণ জম্পেশ হয়ে পায়ে বসেছিল।
আগের রাত্রে মশাল জ্বালা হয়েছিল। এরাত্রে সমস্ত অন্ধকার। কে মশাল জ্বালাবে। কে কোথায় আছে তারই খোঁজ হয় না। কোনো উপায় না দেখে অবশেষে পাহাড়ের দিকে ছুটতে শুরু করলাম, সেখানে হয়তো কাঁকড়ার ভিড় একটু হালকা হবে ভেবে। কিন্তু সে আশা বৃথা। যতদূর যাই, সেই এক কাঁকড়ার সমুদ্র। তবু যতক্ষণ প্রাণ আছে যুঝবই মনে করে এগিয়ে চললাম। এধারে পাহাড় ঢালু হয়ে উঠেছে। তার গা-ময় সেই কাঁকড়ার লাল ছোপ। অনেক ওপরে উঠলে হয়তো নিষ্কৃতি পেতে পারি মনে করে ক্লান্ত পদ টেনে টেনে চলতে লাগলাম। পাহাড়ের গায়ে নানা জায়গায় ছোটো ছোটো গুহা। ওরই একটির মধ্যে শুয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে মরতে পারলেও যেন সুখ পাই মনে হচ্ছিল।
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ায় চমকে উঠলাম। এতক্ষণ এই কথাটি মনে পড়েনি এমনি আমি নির্বোধ! পাহাড়ের গায়ে অজস্র শুকনো ঘাস রয়েছে। একটি ছোটো গুহা বেছে, তার ভেতর থেকে কাঁকড়া তাড়িয়ে, যদি গুহামুখে এই শুকনো ঘাস জড়ো করে আগুন করতে পারি, তাহলে তো কাঁকড়া ঢুকতে পারে না। জানি সে ক্ষণিকের নিষ্কৃতি। বরাবর সে আগুন বজায় রাখবার মতো ঘাস জোগাড় করতে আমি পারব না—শেষ পর্যন্ত কাঁকড়ারা ঢুকবেই, কিন্তু তবু কিছুক্ষণের জন্যে তো নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোতে পারব — তারপর আসুক মৃত্যু।
সেই আশায় যেন নতুন বল পেয়ে উন্মত্তের মতো শুকনো ঘাস সংগ্রহ করে ছোটো একটি গুহা খুঁজে তার মুখে জড়ো করতে লাগলাম। এই ছোটোগুহার ভেতরেও কাঁকড়া ঢুকছে কিন্তু চেষ্টা করলে তাদের মেরে গুহাটি নিরাপদ করা বোধ হয় যেতে পারে। অবশ্য যদি বাইরে থেকে নতুন কাঁকড়া আর ঢুকতে না পারে।
ঘাস সংগ্রহ তখন প্রায় শেষ হয়েছে অন্তত চার পাঁচ ঘণ্টা সে ঘাসের আগুন বেশ জ্বলতে পারবে বুঝে গুহার ভেতর ঢুকে যাব, এমন সময় মাথা ঘুরে গুহার মুখেই ঘাসের ওপর মুখ গুঁজে পড়ে গেলাম। তৎক্ষণাৎ কোমরের ওপর প্রচন্ড এক কামড় অনুভব করলাম। সঙ্গে সঙ্গে মড় মড় করে কী যেন ভেঙে গেল এবং তারও একটি অংশ দেহে ফুটল বুঝতে পারলাম। এক খামচা পেটের কাছের মাংসসমেত কাঁকড়াটাকে যখন ছাড়িয়ে ছুড়ে ফেলে দিলাম, তখন মনে পড়ল ওয়েস্ট-কোটের পকেটে টিকার বীজের শিশি ছিল। সেইটেই ভেঙেছে।
সে নিয়ে মাথা ঘামাবার তখন সময় নেই। তাড়াতাড়ি গুহায় ঢুকে অনেক কষ্টে পাথর ঠুকে আগুন জ্বেলে গুহার মুখের শুকনো ঘাস ধরালাম।
ধীরে ধীরে গুহার মুখে আগুনের একটি বেড়া তৈরি হয়ে গেল। সে বেড়া ডিঙিয়ে কাঁকড়ারা ঢুকতে পারবে না।
এইবার ভেতরের কাঁকড়া মারায় মন দিলাম। হাত আর চলে না। তবু প্রাণপণে প্রায় আধঘণ্টা চেষ্টার পর গুহার ভেতরটা নিরাপদ করা গেল। তখন আর দেহে সাড় ছিল না। কাঠের মতো পড়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই।
যখন উঠলাম তখন গুহার দরজার আগুন নিভে গেলেও ভেতরে তাত ছিল। দেখলাম, বাইরে কাঁকড়া গিজ-গিজ করলেও ভেতরে তারা ঢুকতে পাচ্ছে না। গুহার ভেতর যে শুকনো ঘাস অবশিষ্ট ছিল, তাই দিয়ে আবার কষ্ট করে আগুন জ্বাললাম। আগুন আর বড়োজোর ঘণ্টা দু-এক আমায় বাঁচাতে পারে! তবু সেইটুকুই যথেষ্ট।
সমস্ত শরীরে ভয়ংকর উত্তাপ ও বেদনা বোধ করছিলাম। বেদনা হওয়া আশ্চর্য নয়—সমস্ত দেহ অসাড় হয়নি এই আশ্চর্য।
কিন্তু গায়ে আমার এসব কী? ঘাসগুলো ভালো করে জ্বলে ওঠবামাত্র নিজের গায়ের দিকে চেয়ে কেঁপে উঠলাম। আমার সর্বাঙ্গে বসন্তের গুটি বেরিয়েছে। বুঝলাম যে বীজে একদিন দস্যুদের মারবার কল্পনা করেছিলাম— তাই ভাঙা শিশি দিয়ে আমার গায়ে ঢুকে এই রোগের সৃষ্টি করেছে।
প্রথমটা ভয় হচ্ছিল, শেষে মনে হল তাতে আর কী, মরতে তো হতই। বেশিক্ষণ জ্ঞানও রইল না, জ্বরের ঘোরে খানিক বাদে বেহুঁশ হয়ে পড়লাম।
কদিন যে সে অবস্থায় আমার কেটেছিল জানি না। ও রোগের মধ্যে কী করেছি না করেছি তাও মনে নেই। সেবার যদি মরতাম, কোনো কষ্ট আমায় পেতে হত না — আমার জ্ঞান ছিল না।
একদিন সকালে হঠাৎ চোখ খুলে মাথা পরিষ্কার হয়ে গেল। দেহ অত্যন্ত দুর্বল, নড়তে কষ্ট হয়—তবু কেমন যেন ভালো মনে হচ্ছিল। চেষ্টা করে উঠে বসলাম। তারপরই মনে পড়ল সব কথা। কোথায় সে কাঁকড়ার পাল?
গুহা-মুখে চেয়ে অবাক হয়ে গেলাম। সেখানে মরা কাঁকড়ার খোলাস্তূপাকার হয়ে গেছে। গুহামুখে গিয়ে অতিকষ্টে দাঁড়িয়ে দেখলাম, চারধারে স্তূপাকার মরা কাঁকড়ার খোলা!
দুর্বল দেহেও প্রাণরক্ষার জন্যে সব করতে হল। কেমন করে সে পাহাড় থেকে গড়িয়ে নেমেছিলাম, কেমন করে আহার না পেলেও পাহাড়ের খোদলে-খোদলে জমা বৃষ্টির জল খেয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলাম, সে সব বর্ণনার দরকার নেই।
খাবার জিনিসের অভাবে ঘাসের দানা খেয়েই থাকতাম। তখন বুঝেছিলাম—মানুষ সব কিছু পারে। দিন চারেক বাদে শরীরে একটু বল পেলাম। পাহাড় ছাড়িয়ে ক্রমশ দস্যুদের বাসস্থানের দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম।
সেখানে যে ভয়াবহ দৃশ্য দেখলাম, তা জীবনে ভুলতে পারব না। চারধারে শুধু মরা কাঁকড়ার খোলা, আর তারই মাঝে মাঝে মানুষের কঙ্কাল। কাঁকড়ারা কেন মরেছে জানি না কিন্তু সমস্ত মানুষ যে নি:শেষ করে তারা মরেছে এটা নিশ্চিত। যে জলদস্যুর ভয়ে একদিন ওদিকের সাগরে মানুষের হৃদকম্প হত — তারা এমনি করে নি:শেষ হয়ে যাবে কে জানত!
এইখানেই আমার গল্প শেষ। সেই ভয়ংকর দ্বীপ থেকে কেমন করে, একটি ছোটোনৌকোয় বেরিয়ে বাইরে এসেছিলাম, কেমন করে সেই পথে একটি বাণিজ্য-তরি আমায় তুলে নিয়েছিল—সে সব কথা বলব না।
এই অদ্ভুত কাহিনি অবশ্য কাউকে বলিনি। বললে তারা আমায় পাগলা গারদে না দিলেও চাকরিতে নিশ্চয়ই রাখত না। তারা ভাবত এরকম অদ্ভুত স্বপ্ন যে দিন-দুপুরে দেখতে পারে তার নিশ্চয়ই মাথা খারাপ। তাকে একটা হাসপাতালের কর্তা করে রাখা যায় না।
তাদের বলেছিলাম যে স্টিমার ডোববার পর আমি কোনোরকমে ভাসতে ভাসতে সেই পাহাড়ের গায়ে এসে ঠেকি। সেইখানেই আমায় একটি বাণিজ্য-জাহাজ উদ্ধার করে।
গল্প শেষ হয়ে গেলে, সুধীর জিজ্ঞেস করল—‘আচ্ছা জ্যাঠাবাবু কাঁকড়াগুলো কীসে মরল?’
‘তা ঠিক জানি না ; তবে আমার একটি অনুমান আছে।’
‘কী জ্যাঠাবাবু?’
‘শুনলে তোরাও হয়তো হাসবি ; তবু বলি— সেই টিকার বীজ থেকেই বোধ হয় তাদের ভেতর মহামারি হয়। আজকালকার কোনো কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ করেছেন যে, মানুষের অধিকাংশ রোগ—পশুপক্ষী, এমনকি সমুদ্রের জীব-জন্তুদেরও হয়।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন