গল্পের শেষে

প্রেমেন্দ্র মিত্র

বর্ষাকাল, সুতরাং বৃষ্টি তো হবেই। কিন্তু সারাদিন সমানে জল পড়বার পর রাত্তিরেও তার এমন বিরাম হবে না জানলে আমরা বোধ হয় সেই কলকাতা ছেড়ে এই অজ পাড়াগাঁয়ে ফুটবল খেলার লোভে আসতাম না।

জায়গাটা যে এমন পান্ডববর্জিত দেশ তাইবা কে জানত! খবরের কাগজে নসিপুরে নগেন্দ্র মেমোরিয়াল শিল্ডের নাম দেখে ভবেশ একটা এন্ট্রি করে দিয়েছিল। ভবেশ আমাদের দি আনবিটন ইলেভেনের অত্যন্ত উৎসাহী কর্মঠ সেক্রেটারি। খেলাটা ফুটবল এবং এন্ট্রি-ফি আট আনার নীচে থাকলে সে চোখ বুজে একটা চিঠি ছেড়ে দেবেই — তা সে খেলা যেখানেই হোক না কেন। আনবিটন ইলেভেন তার ছ-মাসের পরমায়ুতে এ পর্যন্ত কাউকে পরাস্ত করতে পারেনি সেদিক দিয়ে আমাদের রেকর্ড আনবিটন সত্যিই। চাঁদা দেওয়া ও একবার করে মাঠে নামাই সার। কিন্তু ভবেশের উৎসাহ তাতে দমবার নয়।

গোড়ার দিকে কলকাতার একটু আধটু-নাম-করা ‘শিল্ড’ বা ‘কাপেই’ নামতে গিয়ে আমাদের একটু অসুবিধে হয়েছে একথা স্বীকার করা ভালো। দর্শকেরা আমাদের খেলায় উৎসাহিত হয়ে এমন হাততালি দিতে শুরু করেছে যে, খেলা শেষ হয়ে গেলেও তা থামেনি অনেকে হাততালি দিতে দিতে আমাদের পেছনে বাড়ি পর্যন্ত এসেছে, এ আমার নিজের চোখে দেখা। আমরা হেরে গেলেও খুব খারাপ খেলি না। কিন্তু ভালো খেলেও এতটা আমাদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ঠিক বরদাস্ত করতে পারছিলাম না। শেষের দিকে তাই কলকাতা ছাড়িয়ে মফসসলের শহর এবং মফসসলের শহর ছাড়িয়ে পাড়াগাঁয়ের দিকে আমাদের ঝোঁক একটু বেশি হয়েছে।

কিন্তু পাড়াগাঁয়েরও একটা সীমা আছে—নসিপুর তার বাইরে। নগেন্দ্র মেমোরিয়াল শিল্ডের কর্মকর্তারা আমাদের চাঁদা পেয়ে খুশি, জানিয়েছিলেন যে, স্টেশন থেকে এক পা গেলেই তাঁদের ক্লাব ও খেলার মাঠ। আমাদের কোনো কষ্টই হবে না। স্টেশনে তাঁরা লোকও রাখবেন। লোক বলতে স্টেশনমাস্টার ও এক পা বলতে ঘটোৎকচের পা সেটুকু তাঁরা উহ্য রেখেছিলেন।

অবিশ্রান্ত বৃষ্টির ভেতর তিনটে নাগাদ প্যাসেঞ্জার ট্রেনে গিয়ে যখন নসিপুর নামলাম, তখন প্রথমে তো মনে হল গাড়ি বোধ হয় সিগনাল না পেয়ে মাঠের মাঝে থামাতে আমরা ভুল করে নেমে পড়েছি। এ আবার স্টেশন নাকি!

প্ল্যাটফর্ম না থাক, মাটিতে খানিকটা লাল কাঁকরও তো বেছানো থাকে! হুড়মুড় করে আবার ট্রেনে উঠে পড়তে যাচ্ছি, এমন সময় উদয় খুব পর্যবেক্ষণ করে বললে—‘নারে স্টেশনই বটে, দেখছিস না দু-একটা কাঁকর পড়ে রয়েছে। বাকি সব জলে ধুয়ে গেছে!’

কাঁকর দেখে আশ্বস্ত হয়ে সামনে চাইলাম। বৃষ্টির ভেতর দূরে যেন একটা ভাঙা গাছও দেখা গেল। গাছ নয় সেটা স্টেশনের নাম লেখা সাইন পোস্ট। বৃষ্টিতে নীচের মাটি আলগা হয়ে একটু হেলে পড়েছে। সাইন পোস্টের পর দূরে একটা ঘর এবং তার ভিতরে একজন স্টেশনমাস্টার টিকিট কালেক্টরকেও পাওয়া গেল। তাঁর হাতে রিটার্ন টিকিটের অর্ধেক দিয়ে রাস্তা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি একটা কাটা খাল দেখিয়ে দিলেন মনে হল। ‘ওটা যে খাল মশাই, যাব কী করে নৌকো না হলে।’ স্টেশনমাস্টার বুঝিয়ে দিলেন, খাল নয় ওটাই রাস্তা, বৃষ্টিতে ওই অবস্থা হয়েছে। শুনলাম সেই রাস্তায় সাঁতরে ও কাদা ঠেলে ক্রোশ দু-এক গেলে নসিপুর গ্রাম পাওয়া যাবে, যদি না বন্যায় সেটা ভেসে গিয়ে থাকে।

দলের অধিকাংশ লোক তৎক্ষণাৎ সেইখান থেকেই বাড়ি ফিরে যাবার জন্যে ব্যাকুল দেখা গেল, কিন্তু ভবেশ ছাড়বার পাত্র নয়। নগেন্দ্র মেমোরিয়াল শিল্ডটা না নিয়ে যেন সে এখান থেকে বাড়ি ফিরবে না। কোনো মতেই সকলকে বোঝাতে না পেরে সে চরম যুক্তি প্রয়োগ করল। বাড়ি তো ফিরবে কিন্তু যাবে কি হেঁটে! সত্যিই তো! খোঁজ নিয়ে জানা গেল রাত্তির আটটার আগে কোনো ট্রেন এই মাঠে আর থামছে না। অগত্যা উপায়ান্তর না দেখে আমাদের ভবেশের কথাতেই রাজি হতে হল।

নসিপুরে কেমন করে পৌঁছোলাম ও সেখানে জলে জলময় মাঠে ওয়াটার পোলো ও রাগবির মাঝামাঝি কী ধরনের ফুটবল খেলা হল তার আর বর্ণনায় কাজ নেই। নসিপুর আগমনের এই ভূমিকাটুকু সেরে আসল কথায় এবার নামা যাক।

এগারো জন মিলে খেলতে এসেছিলাম। খেলা-ধুলোয় নয়, খেলাকাদার পর নসিপুর গ্রামের অবস্থা ও শিল্ডের কর্মকর্তাদের আতিথেয়তার নমুনা দেখে ছ-জন কিছুতেই আর থাকতে রাজি হল না। বৃষ্টির ভেতর খাল বা রাস্তা সাঁতরেই তারা স্টেশনে ফিরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে ও খেলায় কয়েকটা গোল খেয়ে আমরা একটু বেশি কাতর হয়ে পড়েছিলাম। এর ভেতর বসন্তর আবার একটু জ্বরভাবও দেখা দিয়েছে। জ্বরহওয়াটা আশ্চর্য নয়। কারণ ধাক্কাটা তার ওপর দিয়েই একটু বেশি গেছে। সেই ছিল গোলকিপার। জ্বর অবস্থায় বসন্তকে এই জলের ভেতর তো যেতে দেওয়া যায় না। বসন্তর সঙ্গে ভবেশ আমি, উদয় ও সুরেন রাতটার মতো নসিপুরেই কাটিয়ে দেব ঠিক করলাম।

ঠিক তো করলাম কিন্তু থাকব কোথায়! নগেন্দ্র মেমোরিয়াল শিল্ডের কর্তা নগেনবাবু স্বয়ং আমাদের নিয়ে একটু ঘোরাফেরা করলেন। নগেন্দ্র মেমোরিয়ালের কর্তা নগেনবাবু স্বয়ং — শুনে একটু অবাক অনেকে হবে সন্দেহ নেই। আমরাও হয়েছিলাম। কিন্তু জিজ্ঞেস করে জানলাম, নগেনবাবু নিজের নামটা বেঁচে থাকতে থাকতেই স্মরণীয় করে রেখে যেতে চান। পরে কে কী করবে বলা তো যায় না। শিল্ড তৈরির খরচ যখন তিনিই দিয়েছেন তখন মেমোরিয়ালটা দুদিন আগে থাকতে হলে কার কি বলবার আছে! যাই হোক, নগেনবাবু আমাদের নিয়ে একটু আধটু ঘোরাফেরায় করেও সুবিধেমতো একটা থাকবার জায়গা খুঁজে পেলেন না। তাঁর নিজের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন আসায় স্থানাভাব। পাড়ায় অপর বাড়িতে আতিথেয়তার আদর্শ একটু নীচু বলেই মনে হল। নসিপুরে আরও একটি পাড়া আছে কিন্তু তাদের ওখানে শুনলাম ব্রজমোহন কাপ বলে আর একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা খেলা হয়। নগেন্দ্র মেমোরিয়ালের সঙ্গে তাদের আদা এবং কাঁচকলার মতো মধুর সম্পর্ক। এখানকার খেলুড়েদের তারা স্থান কিছুতেই দেবে না।

আশ্রয় পাওয়া সম্বন্ধে প্রায় হতাশ হয়ে উঠেছি, এমন সময় উদয়ের বুদ্ধিতে একটা সুরাহা হয়ে গেল! গ্রামের একটি মাত্র চলনসই রাস্তায় বার কয়েক আসা-যাওয়া করতে গিয়ে একটি মাত্র পাকা দোতালা বাড়ি সকলেরই চোখে পড়েছে। একটু ভগ্নদশা! কিন্তু আমাদের দশা তার চেয়ে খারাপ!

উদয় হঠাৎ বলে ফেললে—‘এ বাড়িটার খোঁজ তো করেননি মশাই! ওদেরও একটা শিল্ড বা কাপ আছে নাকি?’

নগেনবাবু হন হন করে হাঁটতে হাঁটতে বললেন—‘না না মশাই,—ও বাড়ির দিকে তাকাবেন না!’

তাঁকে একরকম জোর করে থামিয়ে বললাম—‘কেন মশাই, দোষটা কীসের! একজন বিদেশি লোক জ্বরে পড়েছে শুনলেও এই বৃষ্টিবাদলার রাতে আশ্রয় দেবে না এমন চামার কেউ আছে নাকি!’

নগেনবাবু একটু রেগেই বললেন—‘আরে না মশাই! গ্রেট বেঙ্গল স্পোর্টিং বারো গোল খেয়েছিল তাদেরই ওখানে থাকতে দিইনি, আপনারা তো মোটে আট গোল।’

সামান্য চারটে গোলের তফাতের দরুন এমন আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হতে হবে এ বড়ো অন্যায় কথা। সুরেন একটু ক্ষুণ্ণস্বরে বলল,—একটু চেষ্টা করলে আর চারটে গোল কি আমরাই খেতে পারতাম না।’

‘আরে না মশাই, সে কথা নয়! চলুন চলুন!’ কিন্তু আমরা অমন বাড়ির লোভ ছেড়ে যেতে প্রস্তুত নই কিছুতেই। একবার জিজ্ঞেস করলে দোষ কী, এই আমাদের বক্তব্য।

নগেনবাবু চটে উঠে বললেন, ‘কাকে জিজ্ঞেস করবেন মশাই। ও বাড়িতে কেউ থাকে!’

‘থাকে না! তাহলে তো আরও ভালো! একটা দরজা খোলা পেলেই হবে। নেহাত তালা ভাঙতেই হয়তো দামটা না হয় দিয়েই দেব।’

নগেনবাবু আমাদের বিমূঢ় করে দিয়ে বললেন—‘তালা নেই মশাই, দরজা সব খোলা!’

‘দরজা খোলা, বাড়িতে কেউ নেই, তবু এই বৃষ্টির ভেতর আমাদের ঘুরিয়ে মারছেন!’

‘ঘুরিয়ে মারছি না আপনাদের, মারবার ইচ্ছে নেই বলেই তো ঘোরাচ্ছি।’

উদয়ের বুদ্ধিশুদ্ধি আমাদের চেয়ে একটু চট করে খোলে। সেই প্রথম ব্যাপারটা আন্দাজ করে বললে,—‘ভূতুড়ে বাড়ি নাকি মশাই?’

নগেনবাবু মুখে কিছু না বলে শুধু একটু শিউরে উঠলেন।

ভবেশ হেসে উঠে বললে,—‘এতক্ষণ বলতে হয়! ভূত পেলে কি এদেশে মানুষের আশ্রয় খুঁজি!’

নগেনবাবু গম্ভীর হয়ে উঠলেন অত্যন্ত—‘ও বাড়িতে থাকা হাসির কথা নয় মশাই!’

আমি বললাম—‘বাড়ির বাইরে থাকাও বিশেষ হাসির ব্যাপার মনে হচ্ছে না! আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না, আমরা ওখানেই চললাম। শুধু একটা হ্যারিকেন ও কটা মাদুর ও একজোড়া তাস যদি জোগাড় করে দিতে পারেন!’

নগেনবাবু তারপরেও আমাদের বাধা দেবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু আমরা নাছোড়বান্দা। অগত্যা অত্যন্ত হতাশ ও করুণভাবে আমাদের শেষবিদায় দিয়ে ভবেশকে নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরলেন। এ ভূতুড়ে বাড়িতে রাত্তির বেলা জিনিসপত্র পৌঁছে দিতে আসতেও তিনি নারাজ!

বসন্তকে চাদর-টাদর মুড়ি দিয়ে নিয়ে আমরা ভূতুড়ে বাড়ির দেউড়ির নীচে ভবেশের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ঝুপ ঝুপ করে সমানে বৃষ্টি পড়ছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে পাড়াগাঁয়ের পথে একটা আলোর রেখা দূরে থাক একটা জোনাকিরও দেখা নেই।

অনেক দিন বিনা ব্যবহারে পড়ে থাকার দরুন বাড়িটা থেকে কেমন একটা ভাপসা গন্ধ দেউড়ির তলাতেই পাচ্ছিলাম। গাঁয়ের লোক বাড়িটা দেখে যে ভয় পায় তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। বাড়িটা একেবারে গ্রামের এক ধারে। ধারে কাছে একটা বসতি নেই। দিনের বেলা বাড়ির যে চোহারা দেখে গেছি, তা একটু অদ্ভুত। দোতালার একদিকের ঘরের জন্যে দেয়াল তোলার পর ছাদ আর সম্পূর্ণ হয়নি। ছাদহীন দেওয়ালগুলো দরজা-জানলার শূন্য ফোকর নিয়ে যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে বাড়িটার চোহারা সত্যিই কেমন যেন বদলে গেছে। বৃষ্টিতে অন্ধকার বাড়িটাকে এখন অবশ্য দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু কেমন একটা চাপা অস্বস্তির আবহাওয়া টের পাচ্ছিলাম।

ভবেশ একটা চাকরের মাথায় কিছু বিছানা চাপিয়ে হাতে একটা লন্ঠন নিয়ে খানিক বাদে এসে হাজির হতে সত্যি খুশিই হলাম। চাকরটা আমাদের জিনিসপত্র দেউড়ির কাছে নামিয়ে দিয়েই যেভাবে পড়ি কি মরি করে দৌড় দিল তা একটা দেখবার জিনিস!

নিজেরাই বিছানাপত্র ও লন্ঠন নিয়ে এবার ভেতরের ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলাম। দোতালার একদিকে গুটিকয়েক ঘর ঠিক আছে। সিঁড়ির সামনের প্রথম ঘরটিই বেশ বড়ো।

ঘরে ঢুকে লন্ঠনটা তুলে ধরে ভবেশ অদ্ভুত সুর করে বলল—‘কই বাপ ভূত, অতিথি-সজ্জন এল একটু সাড়া দাও।’

আমরা সকলে তার কথার সুরে শুধু নয়, সঙ্গে সঙ্গে আর একটা ব্যাপারেও হেসে উঠলাম। ভবেশের কথা শেষ হতে না হতেই ওধারের কোন ঘর থেকে লম্বা টানা ক্যাঁ—চ করে একটা শব্দ হল! ভাঙা পুরেনো কোনো জানলার পাল্লা বাতাসে নড়ার শব্দ নিশ্চয়ই, তবু শব্দটা ঠিক জুতসই ও যথাসময়ে হয়েছে বলতে হবে।

ভবেশ হেসে বলল,—‘বেশ বেশ! এইতো ভদ্রতা, নসিপুর গ্রামে মানুষের চেয়ে ভূত ভালো!’

সঙ্গে সঙ্গে তার কথা সমর্থন করবার জন্যেই যেন পাশের ঘরে ঘড়ঘড় ঝনঝন করে একটা আওয়াজ। একটু চমকে উঠলেও সবাই আবার হেসে ফেললাম। শুধু বসন্ত জ্বরের রুগি বলেই বোধ হয় একটু অপ্রসন্ন ভাবে বলল,—‘ঠাট্টা-তামাশা আর ভালো লাগছে না বাপু! বিছানা টিছানা একটা করতে হয় তো করো।’

সুরেন ও উদয়কে বিছানা পাতবার ভার দিয়ে আমি ও ভবেশ একবার পাশের ঘরে দেখতে গেলাম ব্যাপারটা কী!

ভবেশ বলল,—‘সাড়াটাড়া দিচ্ছেন যখন, সশরীরে একবার দেখা দেন কি না দেখাই যাক না!’

পাশের ঘরটা আকারে ছোটো। দেয়াল থেকে নোনা ধরা চুন-বালি খসে পড়ে ও পুরেনো কাঠ-কাঠরার ভগ্নাংশ থাকার দরুন অত্যন্ত নোংরা।

ঘরে ঢুকেই দু-জনেই অমন চমকে উঠব ভাবিনি।

বাতিটা ছিল ভবেশের হাতে পেছনে। দরজার গোড়ায় পা দিতে না দিতেই অন্ধকারে কাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলার মতো ফ্যাঁস করে একটা আওয়াজ শুনে সত্যি শিউরে উঠলাম নিজের অনিচ্ছায়। পেছন থেকে ভবেশও সেটা শুনতে পেয়েছিল, বাতিটা নিয়ে এগিয়ে এসে বলল,—‘শুধু তোমার বাণী নয় বন্ধু, একটু দর্শনও দিয়ো! কই তিনি?’

এবার তাঁকে দেখা গেল চাক্ষুষ। দেখে ভয় পাবারই কথা। অতবড়ো এবং অমন মিশকালো বেড়াল বাংলা মুলুকে জন্মায় বলে জানা ছিল না। তিনি তার বহুদিনের দখলি ঋত্বের ওপর আমাদের চড়াও হওয়াটা অন্যায় উপদ্রব মনে করে জ্বলজ্বলে চোখে গায়ের লোম ফুলিয়ে এখন দন্তবিকাশ করছিলেন।

ভবেশ বাতিটা নামিয়ে হতাশার ভঙ্গিতে বললে,—‘এটা কি ভালো হল প্রভু? এত আশ্বাস দিয়ে শেষকালে বেড়ালরূপ ধারণ করলেন। আপনার নিজমূর্তি কই?’ বেড়ালটা আর একবার ফ্যাঁস করে উঠল উত্তরে। আমরাও হেসে ফেললাম। পেছনের ঘর থেকে বসন্তর বিরক্ত গলা শোনা গেল—‘আবার বাতিটা নিয়ে গেলি কোথায় অন্ধকারেই থাকব নাকি।’

সে ঘরে ফিরে ভবেশ হেসে বলল,—‘তোর কি ভয় করছে নাকি! না জ্বরের লক্ষণ!’

বসন্ত আরও যেন বিরক্ত হয়ে বলল,—‘ভয়টয় জানি না বাপু! আমার ভালো লাগছে না। খুঁজে খুঁজে আচ্ছা থাকবার জায়গা বার করেছ!’

আমরা সবাই মিলে তাকে অবশ্য ঠাট্টায় নাকাল করে তুললাম, কিন্তু তা সত্ত্বেও মনে হচ্ছিল, অস্বস্তি একা বসন্তরই হয়নি।

সামনে দীর্ঘ রাত। খাবার-দাবার নগেনবাবু চাকরের সঙ্গে যা পাঠিয়ে ছিলেন, তার সৎকার করে বসন্তকে একটা বিছানায় শুতে বলে আমরা আর একটায় তাস খেলতে বসলাম। কেন বলা যায় না, সমস্ত বৃষ্টিতে ভিজে ও ফুটবল খেলে ক্লান্ত হলেও ঘুমোবার জন্যে শুতে কেউ তেমন ব্যাকুল নয় দেখা গেল।

রাত্রের সঙ্গে বৃষ্টির বেগও ক্রমশ যেন বাড়তে লাগল। সেই সঙ্গে পুরোনো বাড়ির দরজা, জানালার নানারকম আওয়াজ ক্ষণেক্ষণে।

তাস খেলাটা তার মাঝে কিছুতেই যেন জমল না। এক সময়ে সবাই তাস ফেলে দিলাম। সুরেন বলল,—‘‘এবার শুয়ে পড়লে হয়!’ আমরা সবাই সায় দিলাম, কিন্তু কারুর ওঠবার নাম নেই!

হঠাৎ ভবেশ বলল—‘সাধারণ লোক কেন ভয় পায় বুঝেছ তো। কী রকম আওয়াজটা হচ্ছে শুনছ! কে বলবে যে, ও ঘরে একটা কাঠের পা ঠকঠকিয়ে কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে না?’

আওয়াজটা আমরা সবাই শুনেছিলাম। এই প্রথম নয় এর আগেও অনেকবার, কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কিছুই বলিনি।

ভবেশ আবার বলল—‘এসব থেকেই মানুষ ভূত তৈরি করে...!

ভবেশের কথা শেষ না হতেই, উদয় বলল—‘তা না হয় হল, কিন্তু অমন আওয়াজটাই বা কীসের! ও তো আর জানালা নড়ার শব্দ নয়!’

আমরা পরস্পরে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম একবার। সকলেই একুট যেন হতভম্ব। হঠাৎ সুরেন লন্ঠনটা নিয়ে উঠে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও উঠে পাশের ঘরে গিয়ে হাজির হলাম। কই কোথাও কিছু নেই তো!

ভবেশ হেসে উঠল,—‘আমাদেরও ভয় ধরল নাকি!’ তার হাসিটা খুব আন্তরিক শোনাল না!

উদয় হঠাৎ চাপা উত্তেজিত কন্ঠে বললে,—‘কিন্তু ওটা কী!’

আমাদের সকলের দৃষ্টি তখন সেদিকে পড়েছে! আমি গিয়ে সেটা হাত দিয়ে তুলে ধরলাম,—একটা কালো রঙের খানিকটা ছেঁড়া কাপড়!

হেসে বললাম—‘রজ্জুতে সর্পভ্রম হচ্ছে নাকি!’

এবার ভবেশই বললে—‘কিন্তু বেড়ালটা কোথায় গেল? ওইখানেই দেখেছিলাম না!’

তাও তো ঠিক! বেড়ালটাকে তো এইখানেই দেখা গেছল! এই কাপড়টাকে ভুল করে কি...না, তাও সম্ভব নয়, স্পষ্ট তাকে দেখেছি, রাগের ফোঁসফোঁসানি শুনেছি নিজের কানে!

তবু হেসে বললাম—‘বেড়াল কি তোমার জন্যে এতক্ষণ বসে আছে! সে কখন সরে পড়েছে!’

‘কিন্তু কোথা দিয়ে! এ ঘরের একটি মাত্র জানালা তাও বন্ধ। ওধারের দরজায় খিল দেওয়া তো দেখতেই পাচ্ছ!’

বললাম—‘আমাদের ঘর দিয়েই পালিয়েছে হয়তো!’ মুখে বললেও মনের খটকা গেল না। আমাদের ঘর দিয়ে কোনো বেড়ালের পক্ষে আমাদের অজান্তে যাওয়া সম্ভব তো নয়। একেবারে দরজার সামনেই আমরা তাসের আসর পেতে বসেছিলাম। একটা ধুমসো মিশকালো বেড়াল পেরিয়ে গেলে জানতে পারব না এমন বেহুঁশ আমরা ছিলাম কি?

ভবেশ বলল,—‘থাকগে, বেড়ালের অন্তর্ধান তত্ত্ব নিয়ে মাথা ঘামাতে আর...’ তার মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল। আমাদের সকলের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা বরফ গলানো জলের স্রোত নেমে গেল বিদ্যুৎবেগে!

ওধারের ঘরে বসন্তের সে কী আতঙ্কের চিৎকার! উত্তেজনার মুখে আমরা সবাই তাকে অন্ধকারে একলা ফেলে এসেছি!

ছুটে সবাই এ ঘরে এলাম। বসন্ত ছাইয়ের মতো মুখ করে উঠে বসেছে! তার কপাল মুখ অসম্ভব রকম ঘেমে উঠেছে!

‘হয়েছে কী! কী হল!’

বসন্ত হাঁফাবে না কথা বলবে! অনেক কষ্টে থেমে থেমে যা বলল, তার মর্ম—তার মাথার কাছে বসে কে যেন বরফের মতো ঠাণ্ডা নিশ্বাস তার মুখে ফেলছিল।

আমরা সবাই হেসে উঠলাম জোর করে! ‘জ্বরের ঘোরে তুই দুঃস্বপ্ন দেখেছিস।’

বসন্ত তীব্রভাবে প্রতিবাদ করে বলল—‘না না, আমি জেগে স্পষ্ট সে নিশ্বাস শুনেছি, মুখের ওপর টের পেয়েছি অনেকক্ষণ, তারপর চিৎকার করেছি। তোরা ওরকম করে চলে যাসনি।’

ভবেশ হাসবার চেষ্টা করে বলল ‘আচ্ছা, আচ্ছা তাই হবে। এমন ভয়কাতুরে ছেলেও দেখিনি! আমরা এখানেই শুচ্ছি এবার!’

উদয় একটু ইতস্তত করে বলল,—‘এক্ষুনি শুয়ে কী দরকার! জেগে একটু গল্প করা যাক না!’

ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়লেও কারুর সে কথায় আপত্তি দেখা গেল না, ভবেশেরও না।

‘বেশ তো!’ ভবেশ বলল,—‘কীসের গল্প হবে! বল, সুরেন একটা ভূতের গল্পই বল, এ বাড়িতে বেশ লাগবে।’

বসন্ত তাড়াতাড়ি বলল—‘না, না!’

‘যা: তুই একেবারে ভীতুর একশেষ! বল সুরেন!’

সুরেন ম্লানভাবে একটু হেসে বললে,—বলব তাহলে শোন! ‘আনটন ইলভেন’ বলে এক টিম গেছল নসিপুরে...।

আমরা সবাই একটু হাসলাম। ভবেশ বলল—‘আহা বলতেই দাও ওকে!’

সুরেন বলতে শুরু করল,—আমাদের নসিপুর আসা ও তারপরের ঘটনার সে যা বর্ণনা দিল, তাতে অন্য সময় হলে হাসত নিশ্চয়, কিন্তু ঘরে এখন সাড়াশব্দ বিশেষ নেই। গল্প শেষে ভূতুড়ে বাড়ি পর্যন্ত এসে পৌঁছোল, সেখানকার ঘটনাগুলো একে একে শেষ করে সুরেন বলে,—ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত, বাইরে বৃষ্টির অবিশ্রান্ত শব্দ, আরও নানারকম বিদঘুটে আওয়াজ! ঘরে লন্ঠনের মিটমিটে আলোয় একজন গল্প বলছে ভূতের গল্প।

কেউ সে গল্পে বিশ্বাস করে না, গল্প যে বলেছে সে হঠাৎ একটা তাস নিয়ে ওপরে ছুড়ে দিয়ে বললে, ‘অশরীরী কেউ এখানে থাকে তো এ তাস বাতাসে মিলিয়ে যাক!’

হাসতে গিয়ে আমরা স্তব্ধ হয়ে গেলাম।

উদয় বললে,—‘আরে তাসটা পড়ল কোথায়?’

সুরেন সত্যি সত্যিই গল্পের সঙ্গে একটা তাস ওপরে ছুঁড়ে দিল।

ভবেশ তাচ্ছিল্যের সুরে বলবার চেষ্টা করলে—‘পড়েছে কোথাও ওদিকে!’

‘ওদিকে কোথায়!’ উদয়ের গলার স্বর তীক্ষ্ণ!—‘ওদিকে তো খালি মেঝে। এ ঘরে তো জিনিস লুকিয়ে থাকবার মতো জায়গা নেই।’

আমি তবু উঠে বসন্তর বিছানার আশপাশ সমস্ত ভালো করে খুঁজলাম। অন্য সবাইও তন্নতন্ন করে সমস্ত ঘর খুঁজে দেখল।

আশ্চর্য! আমাদের সকলের মুখ গম্ভীর। শুধু বসন্তর নয়, আমাদের কপালেও ঘাম দেখা দিয়েছে।

ভবেশ হঠাৎ অকারণে অত্যন্ত রেগে বলল,—‘কী তোমরা যা তা করছ. পাগল হলে নাকি সবাই। নাও সুরেন গল্প বলো।’

শুকনো পাংশু মুখে আমরা যন্ত্র-চালিতের মতো আবার এসে বসলাম। সুরেনের মুখে যেন রক্ত নেই। সকলের মুখের দিকে চেয়ে সে আবার একটা তাস তুলে নিলে, তারপর বলল,—‘আগের তাসটা উড়ে গেল...’

ভবেশ শুধু বলল—‘হুঁ!’

‘আবার একটা তাস নিয়ে গল্পের কথক বলল,—‘উড়ে যাওয়াটা প্রমাণ নয়!’—সুরেনের স্বর অত্যন্ত অস্ফুট—‘এবারের তাস থেকে একটা মস্ত কালো বেড়াল বেরিয়ে’...।

বসন্তর চিৎকার বুঝি সকলের ওপরে শোনা গেল। তার বিছানায় ঠিক পায়ের কাছে...।

না, সেবার আমরা অক্ষত দেহেই তার পরদিন কলকাতায় ফিরেছিলাম। শুধু বসন্তর জ্বরটা বিকারে দাঁড়িয়েছিল কলকাতায় এসে। বেচারাকে ভুগতে হয়েছিল অনেকদিন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%