শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

গোপালবাবু যে! শুনলুম কাল রাতে আপনার বাড়িতে চোর এসেছিল!
ঃও, সে কী কাণ্ড মশাই! চোর বলে চোর! সাংঘাতিক চোর!
চোর-ডাকাতের যুগ পড়েছে মশাই৷ চারদিকেই চুরির একেবারে মোচ্ছব পড়ে গেছে৷ কী চুরি হচ্ছে না বলুন৷ সোনাদানা, টাকাপয়সা, বাসনকোসন, জামাকাপড়, এমনকী জুতো, ঝাঁটা, বস্তা, পাপোশ যা পাচ্ছে চেঁছেপুঁছে নিয়ে যাচ্ছে৷ পরেশবাবুর বাড়িতে যেদিন চুরি হল তার পরদিন তো তাদের লজ্জা নিবারণের বস্ত্রটুকু পর্যন্ত ছিল না৷
তা যা বলেছেন৷ চোরদের আস্পদ্দা দিন দিন বাড়ছে৷
অতি সত্য কথা৷ নরেনবাবুর বাড়িতে যে চোরটা এসেছিল সে তো রীতিমতো নরেনবাবুকে দু-চার কথা শুনিয়ে যেতে ছাড়েনি৷ কিপটে, কঞ্জুস, নীচু নজর, রুচিহীন, এমনকী এমন কথাও বলে গেছে, আপনার বাড়িতে চুরি করতে এসে যে ভুল করেছি, গঙ্গাস্নান করে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে...
বটে! এ তো সাংঘাতিক অপমান৷
অপমান বলে অপমান! নরেনবাবু তো সেই থেকে ভারি মনমরা হয়ে পড়েছেন৷ দু-দিন অন্নজল গ্রহণ করেননি৷ তবে কিনা বিশ্বকঞ্জুস নরেনবাবুর সেই থেকে হাত বেশ দরাজ হয়েছে৷ এখন দেখছি বাজার থেকে বড়ো মাছ, ময়রার দোকান থেকে সন্দেশ এসব কিনছেন৷
তাই নাকি! এই জন্যেই সব জিনিসেরই খারাপ আর ভালো দুটো দিক থাকে৷
তা আপনার বাড়ি থেকে কী কী চুরি গেল?
সেসব এখনও হিসেব করা হয়নি৷
কিন্তু গোপালবাবু, আপনার কবজিতে রোলেক্স হাতঘড়িটা এখনও দেখতে পাচ্ছি যে! ব্যাপারটা কী? চোর কি ওটা দামি ঘড়ি বলে বুঝতে পারেনি?
পারেনি মানে! ঘড়িটা একটানে খুলে নিয়ে একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে কত সালের কোন মডেল, কত দাম সব গড়গড় করে বলে গেল মশাই৷
তাজ্জব কথা! তবু নেয়নি?
না৷ ঘড়িটা খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, 'এ ঘড়ির এখন অনেক দাম৷ সাবধানে রাখবেন৷'
বলেন কী? কলিযুগ কি শেষ হয়ে গেল নাকি মশাই? তারপর ধরুন, আপনার স্ত্রীর গলায় একটা পনেরো ভরির সীতাহারের কথাও যেন শুনেছি৷ সবাই বলে খুব দামি হার নাকি৷ তা সেটা নিশ্চয়ই গেছে৷
উঁহু৷ সীতাহারটা তো ছুঁলই না৷ দূর থেকেই বলে দিল চোদ্দো ভরি আট রতি মাপ আছে৷ এখনকার বাজার দর নাকি দেড় লাখ টাকার ওপরে৷
সেটাও নেয়নি! এ আবার কেমনধারা চোর? আপনার লোহার আলমারিটা খোলেনি?
খুলেছে বই কী৷ চোর বলে কথা! খুলল, দেখল৷
ওই আলমারিতেই তো বোধ হয়-
ঠিকই ধরেছেন৷ আমার সব ক্যাশ টাকা ওই আলমারিতেই থাকে৷ আজ লেবার পেমেন্টের জন্য আড়াই লাখ টাকা ব্যাঙ্ক থেকে তুলে ওই আলমারিতেই রেখেছিলাম৷ টাকাগুলো বের করে গুনে-টুনে দেখলও৷
তারপর থলিতে ভরল তো!
হ্যাঁ, থলিও তার সঙ্গে একটা ছিল বটে৷ রাকস্যাকের মতো একটা ব্যাগ৷ ভরার উপক্রমও একবার করেছিল৷ তারপর নিজের মনে 'না থাক' বলে যেমন ছিল তেমনি আবার আলমারিতে সাজিয়ে রেখে দিল৷
আড়াই লাখ টাকা! চোর আড়াই লাখ টাকা হাতে পেয়েও নিল না মশাই! ঃএ, আমারই তো হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছে৷ কিন্তু আপনার সেই দুবাই না তেহরান থেকে আনা হিরের কালেকশনটা? লোকে তো বলে পূর্ব ভারতে আপনার মতো হিরের কালেকশন কারও কাছে নেই৷
ঠিকই বলে৷ আমি বহুকাল ধরেই হিরে কালেকশন করে আসছি, ওটাই আমার নেশা৷ রেয়ার সব হিরে মশাই৷ লাখ লাখ টাকা দাম৷
তা সেসব কি ছাড়তে পারে?
ছাড়েওনি৷ আমাকে দিয়ে জোর করিয়ে সিন্ধুক খুলিয়ে সব আঁতিপাঁতি করে দেখেছে৷ দেড়শো হিরে ছাড়াও নানান সাইজের মুক্তো, নীলা, পোখরাজ, চুনি, গোমেদ মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকার পাথর৷
আহা, শুনেই আমার পিলে চমকাচ্ছে৷ তা গেল তো সেগুলো! যাবেই৷ অত দামি জিনিস কি বাড়িতে রাখতে আছে মশাই? ব্যাঙ্কের ভল্টে বা মাটির নীচে পুঁতে-টুঁতে রাখতে হয়৷
তা বটে৷ সেরকম একটা ফন্দি মনে মনে ঠিকও করে রেখেছি৷ কিন্তু সেটা কার্যকর করার আগেই কাল মধ্যরাতে চোরের আবির্ভাব৷
জানলা ভেঙে ঢুকল বুঝি?
না, অতি ঘোড়েল চোর৷ ভাঙচুর করলে তো শব্দ শুনতে পেতাম৷ আমার আবার ভারি সজাগ ঘুম৷ বাড়ির দেউড়িতে দারোয়ান আছে, দু-দুটো অ্যালসেশিয়ান কুকুর, টোটাভরতি বন্দুক আছে, বালিশের তলায় পিস্তল নিয়ে শুই৷ সুতরাং মোটামুটি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নিশ্ছিদ্রই বলা যায়৷
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনার বাড়িটা তো দুর্গ-বিশেষ৷ কুকুর দুটোও খুবই তেজি৷ দারোয়ান দুটোও বেশ তাগড়াই চেহারার বটে৷ তাহলে চোরটা ঢুকল কীভাবে বলুন তো!
সেটাই রহস্য৷ আমি চোরটাকে জিজ্ঞেসও করেছিলুম, 'বাপু হে, এ বাড়িতে ঢোকা তো সহজ নয়! তুমি ঢুকলে কী করে?'
জবাবে কী বলল?
বলল, 'দুনিয়ায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলে কিছু নেই৷ সব জায়গাতেই ঢোকা সম্ভব৷ আমি আপনার বাড়ির সামনের তেঁতুল গাছ থেকে হুক সমেত একটা নাইলন দড়ি ছুড়ে ছাদের রেলিঙে আটকে দিয়ে সেইটে বেয়ে ছাদে এসে নামি৷'
এ তো দেখছি টারজান!
তা বলতে পারেন৷ দিব্যি কসরত করা চেহারা৷ ভদ্রঘরের ছেলের মতোই মনে হয়৷
দিনকাল যা পড়েছে, ভদ্রঘরের বেকার ছেলেদেরও এইসব পথেই নামতে হচ্ছে৷ তা তারপর কী হল?
চোরেরা নিঃশব্দে চুরি করে, সেটাই রেওয়াজ৷ কিন্তু এর কায়দা আলাদা৷ খুব মোলায়েম গলায় আমার নাম ধরে ডেকে ঘুম ভাঙাল৷
নাম ধরে? ছিঃ ছিঃ, আপনি বয়স্ক মানুষ৷
না, সে আমাকে গোপালকাকা বলে ডেকেছিল৷
বাঁচোয়া৷ তারপর বলুন৷
আমি পিস্তল খুঁজতে গিয়ে দেখি, সেটা যথাস্থানে নেই৷ চোরটা বলল, 'অস্ত্রশস্ত্র আমি সরিয়ে নিয়েছি৷ আলমারি সিন্দুক সব খুলুন৷ সময় নেই৷'
ওরে বাবা! এ তো চোরের বেশে ডাকাত!
তাও বলতে পারেন৷ সব দেখল৷ টাকাপয়সা, হিরেজহরত, সোনাদানা, কিন্তু কোনোটাই তার যেন তেমন পছন্দ হচ্ছিল না৷ হিরেজহরতগুলো একটু নাড়াচাড়া করল বটে, কিন্তু যেন তেমন গা করল না৷
এ কেমন বেয়াদব চোর মশাই! এত কসরত করে ঢুকল, সব হাতের নাগালে পেল তাও তার গাল উঠল না কেন?
সেইটেই রহস্য৷ সব দেখেশুনে বলল, 'আপনার আর কোনো দামি জিনিস নেই?' আমি অবাক হয়ে বললুম, 'এর চেয়ে দামি জিনিস আর কী থাকবে?' চোরটা মুখ বেঁকিয়ে বলল, 'হ্যাঁ, এসব দামি জিনিস বটে, কিন্তু আমার দরকার লাগবে না৷'
বটে! খুব নবাবপুত্তুর দেখছি৷ তারপর?
তারপর সে বলল, 'আপনার বইপত্র কোথায় থাকে?' আমি বললুম, 'নীচের লাইব্রেরি ঘরে৷'
বইপত্র! ছোঃ! বইপত্র দিয়ে কী হবে?
সেইটে তো জানি না৷ তবে নিয়ে যেতে হল৷ দেখলাম বইপত্রে তার বেশ আগ্রহ আছে৷ বিস্তর বই বের করে করে দেখল, আবার যত্ন করে জায়গায় রেখে দিল৷ অনেকক্ষণ ধরে প্রতিটি আলমারি ঘাঁটল সে৷
বই ঘেঁটে সময় নষ্ট করা কেন বাপু?
আমিও তাকে সে-কথাই বলেছিলুম৷ সে বলল, 'ও আপনি বুঝবেন না৷'
তারপর?
বললে বিশ্বাস করবেন না, খুঁজে পেতে সে একখানা বই বের করল৷ বেশ পুরোনো বই৷ নাম নীলবসনা সুন্দরী৷ কার লেখা জানি না৷ বইপত্র পড়ার অভ্যাস আমার নেই৷ বাপ-দাদার আমল থেকেই ওগুলো পড়ে আছে৷
নীলবসনা সুন্দরী! তা সেটা কী করল?
সেটাই চুরি করল মশাই৷ বলল, 'এটা চুরি করতেই আমার আসা৷'
শুধু একটা বই?
হ্যাঁ৷ বইটা নিয়ে সে হাওয়া হয়ে গেল মশাই!
আশ্চর্য! এরকম আহাম্মক আর দেখিনি!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন