শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

নটবর সাউ সন্ধে লাগতেই দোকান বন্ধ করে হাট করতে বেরিয়ে পড়ল৷ শেষ হাটে জিনিসপত্র বেজায় সস্তায় পাওয়া যায়৷ দোকানিরা ঝপাঝপ মাল বেচে হালকা হয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে তখন৷
জকপুরের হাট বেশি দূরেও নয়৷ আকন্দপুরের খালটা যেখানে মাওবেড়ের দিকে বাঁক নিয়েছে সেখানে শিবতলার মাঠে বিরাট জায়গা জুড়ে হাট৷ হ্যাজাক, টেমি, কারবাইডের আলোয় চারিদিক ঝলমল করছে যেন৷ কেউ কেউ দোকান গুটিয়ে ফেলেছে, কেউ কেউ গোটাচ্ছে আবার কোথাও রমরম করে বিকিকিনি চলছে৷
ব্যাপারীরা বেশিরভাগই নটবরের মুখ চেনা৷ এই যেমন রায়দিঘির বিখ্যাত বেগুন নিয়ে আসে মুকুন্দ পাল, সোনার গাঁয়ের ফুলকপি নিয়ে বসে শিবু গায়েন, চণ্ডীগড়ের বড়ো বড়ো লাল মুলো বেচতে আসে হারান দাস৷ নটবরের অবশ্য আজ অন্য দরকারেও আসা৷ হাটের পশ্চিম ধারে এক বুড়োমতো মানুষকে মাঝে মাঝে টেমি জ্বালিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়৷ তার লম্বা সাদা দাড়ি, বিশাল গোঁফ, মাথায় ঝাঁকড়া সাদা চুল৷ বয়স হেসেখেলে অন্তত পঁচাশি হবে৷ মুখখানার চামড়ায় অনেক ভাঁজ, মাথায় একটা সাদা টুপিও থাকে৷ মাঝে মাঝে গায়ে লাল রঙের কাপড় জুড়ে তৈরি একটা জোব্বা মতো৷ এই সাংঘাতিক শীতে খোলা মাঠের দিকে বসে বুড়ো কিছু পুঁথি-পুস্তক বিক্রি করতে বসে থাকে৷ গাঁয়ের লোক বই-টই বেশি পড়ে না৷ তাই বুড়োর বিক্রিবাট্টাও নেই৷ তবুও বুড়ো বসে থাকে৷
সেবার হাটে এসে কৌতূহলের বশে নটবর তার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বই দেখছিল, বিচিত্র সব নাম-'মহাকাশের হাতছানি', 'পৃথিবীতে আজব মানুষের আগমন', 'সহজ উড়ন শিক্ষা', 'জাদুবলে রোগআরোগ্য', 'দ্রব্যগুণের সাহায্যে গগনে বিহার'৷
সবই বুজরুকি তাতে সন্দেহ নেই৷ কিন্তু কৌতূহল এক সাংঘাতিক ব্যাপার, ঝোঁক চাপলে মাথাটা যেন ভূতগ্রস্ত হয়ে যায়৷ নটবর কেনাকাটা সেরে বুড়োর দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল৷ টেমির আলোয় ম্লান পুরোনো বইগুলো হলদেটে দেখাচ্ছে৷ বুড়ো শীতে জবুথবু হয়ে বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে৷ বই-টই আগের দিনই দেখে পছন্দ করে রেখেছিল নটবর-'সহজ ভূত নামাইবার কৌশল'৷
'ও দাদু!'
বুড়ো চোখ চেয়ে নটবরকে দেখে বেজার মুখে বলে, 'কী চাই?'
'এই বইখানা কত দাম?'
'এক টাকা৷'
'বইতে যা লেখা তাতে কাজ হয়?'
'কে জানে বাবু, আমি তো পরখ করিনি?'
'কাজ না হলে বই ফেরত দেব কিন্তু?'
'না বাবু, ওসব ফেরত-টেরত হবে না৷ নিলে নাও, না নিলে পথ দেখো৷'
'আহা, এসব তো বুজরুকিও হতে পারে?'
'তা হতে পারে!'
নটবর একখানা টাকা ঠকাং করে ফেলে বইখানা তুলে নিল৷ গেল একখানা টাকা৷ তা আর কী করা যাবে!
বইখানা পকেটে পুরে নটবর বাড়ি রওনা হল৷
না, ভূতে নটবরের বিশ্বাস নেই৷ সে ভূত-টুত মানে না৷ এই নিয়ে বন্ধু ভজহরির সঙ্গে তার প্রায়ই তর্ক হয়৷ ভজহরি আবার ঘোরতর ভূতে বিশ্বাসী৷ প্রায়ই বলে, 'এখন মানছ না, কিন্তু একদিন ঠেলায় পড়ে মানবে৷'
ভূত না মানলেও কৌতূহলকে তো আর ঠেকানো যায় না৷
আজ বড়োই শীত পড়েছে৷ তার গ্রাম শামুকখোলা একটু দূরেই৷ ভারী থলি দু-খানা দু-হাতে ঝুলিয়ে যথাসাধ্য জোরেই হাঁটছে নটবর৷ কুয়াশায় পথঘাট আবছা, তবে একটু ক্ষয়াটে জ্যোৎস্না থাকায় তেমন অসুবিধে হচ্ছে না৷ রথতলা ছাড়িয়ে আমবাগানের পাশের রাস্তায় সবে পা দিয়েছে-এমন সময় একটা লোক পিছন থেকে তার পাশাপাশি এসে পড়ল৷
লোকটা বলে উঠল, 'শামুকখোলা যাচ্ছেন নাকি মশাই?'
'হ্যাঁ৷'
'ভালো ভালো৷ তা হাটে আজ কেমন কেনাকাটা হল?'
'এই টুকিটাকি৷'
'মুলো, বেগুন সব পেলেন?'
'তা পেলাম৷'
'বেশ বেশ৷'
'তা আপনি কোন দিকে?'
'এই একটু বিষয় কার্যে এসে পড়েছিলাম এই দিকে৷ তা আর কী কিনলেন?'
'এই ঘরগেরস্থের টুকিটাকি জিনিস৷'
লোকটা হেসে বলল, 'আছে কিন্তু৷'
'কী আছে?'
'ওই যা বলছিলাম আর কি৷ আচ্ছা মশাই আসি, এই ডানহাতি আমার রাস্তা৷'
নটবর ভালোমন্দ কিছুই বুঝতে পারল না৷ উটকো লোকটা যে কোথা থেকে উদয় হল, কোথায় অস্ত গেল কে জানে!
সামনেই বাঁ-ধারে কপালী দিঘি৷ চারধারে গাছগাছালি৷ দিঘির কোল ঘেঁষে রাস্তাটা পেরোনোর সময় হঠাৎ নটবরের মনে হল সামনের ঘাটে কে যেন চান করছে৷ এই শীতের রাতে ঠান্ডা জলে চান করে কে?
ঘাটের কাছে পৌঁছে দেখল চান করে একটা মোটাসোটা লোক উঠে এল৷ গামছা নিংড়োতে নিংড়োতে বলল, 'হাটে গিয়েছিলেন বুঝি?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ৷ তা আপনি এই শীতের রাতে চান করছিলেন যে?'
'চান না করলে শরীরটা বড়ো ম্যাজম্যাজ করে৷ সারা দিনে আমি বার পঁচিশেক চান করি কিনা!'
'বলেন কী? ঠান্ডা লেগে নিউমোনিয়া হবে যে?'
লোকটা একটু হেসে বলে, 'আরে না, নিউমোনিয়া কি আর সকলের হয়! তা হাটে কী কী পেলেন?'
'এই একটু শীতের শাকপাতা৷'
'শুধু শাকপাতা?'
'আর এই টুকিটাকি৷'
'শুধু টুকিটাকি?'
'এই সামান্য জিনিসপত্তর৷'
লোকটা গা মুছতে মুছতে বলল, 'তা বলে ভাববেন না যে নেই৷'
'কী ভাবব না?'
'এখনও আছে, অনেক আছে৷ যাই আর একবার ডুব দিয়ে আসি৷'
লোকটা ফের জলে নেমে গেল দেখে নটবর হাঁ! আচ্ছা পাগল তো!
গাঁয়ের কাছ বরাবর চলে এসেছে নটবর৷ জটেশ্বরের খালের সাঁকোটা পেরোলেই গাঁয়ের সীমানায় ঢুকে পড়বে৷
সাঁকোতে পা দিতেই নটবর দেখতে পেল সাঁকোর মাঝ বরাবর বাঁশের রেলিং-এ হাতে ভর রেখে একটা লোক ঝুঁকে জলের দিকে চেয়ে আছে৷ নটবর সাঁকোতে উঠতেই 'মচাৎ' করে শব্দ হওয়ায় লোকটা ফিরে তাকাল৷ চেনা মানুষ নয়৷
'নটবর নাকি?'
'হ্যাঁ৷'
'হাট করে ফিরলেন?'
'হ্যাঁ৷ কিন্তু আপনি এখানে দাঁড়িয়ে কী করছেন?'
'মাছ ধরছি৷'
'মাছ ধরছেন৷' বলে নটবর হাঁ হয়ে গেল৷ সাঁকোর ওপর থেকে এই রাত্তিরে মাছ ধরা যায় বলে সে জন্মে শোনেনি৷ হেসে বলল, 'কীভাবে ধরছেন? মন্তর দিয়ে নাকি?'
'না ছিপ দিয়ে৷ দেখবেন?'
লোকটার হাতে যে ছিপ রয়েছে সেটা এতক্ষণ লক্ষ করেনি নটবর৷ এবার করল৷ লোকটা ডান হাতের ছিপটা হঠাৎ 'ছপাৎ' করে ওপরে তুলতেই দেখা গেল বঁড়শিতে বেশ বড়োসড়ো একটা মাছ লাফঝাঁপ করছে৷ তাজ্জব ব্যাপার!
'দেখলেন তো নটবরবাবু?'
'দেখলাম৷ খুবই বিস্ময়ের ব্যাপার৷'
'না না, এ আর বিস্ময়ের কী? তা হাটে যা খুঁজতে গিয়েছিলেন তা পেলেন?'
'তা পেলাম, শীতের শাকসবজি আর কি৷'
'উঁহু, ওসব নয়৷ আর যা খুঁজতে গিয়েছিলেন!'
'এই টুকিটাকি সব জিনিসপত্র৷ ঘরগেরস্থালিতে তো কত কিছুই লাগে!'
'সে আমি জানি৷ কিন্তু সে সব ছাড়া আর কিছু?'
'না, আর বিশেষ কী?'
'কী যে বলেন নটবরবাবু! যাকগে, কথাটা হল-ওসব নিয়ে বেশি মাথা না ঘামানোই ভালো৷'
'কী সব নিয়ে! কীসের কথা বলছেন?'
'বলছিলাম কী, দু-তরফ নিজের নিজের মতো করে আছে৷ কাজ কী বলুন অন্য তরফের তল্লাশ নিতে যাওয়ার৷ ওতে অন্য তরফের অসুবিধে হয় কিনা৷'
দুই তরফ! নটবর হঠাৎ একটু চিন্তিত হয়ে পড়ে৷ কোন তরফের কথা বলতে চাইছে লোকটা!
'আচ্ছা আসি নটবরবাবু!' বলে লোকটা হনহন করে তার পাশ কাটিয়ে উলটো দিকে চলে গেল৷ তাকে ভেদ করেই গেল যেন! কিন্তু নটবরের গায়ে একটু ছায়াও লাগল না৷ হঠাৎ নটবরের গা শিউরে উঠল৷
'বাপরে!' বলে বাজারের থলি ফেলে নটবর প্রাণপণে ছুটতে লাগল৷ পড়ি-কি-মরি অবস্থা৷
পরদিন সে ভজহরিকে গিয়ে বইখানা দান করে বলল, 'আছে রে ভাই আছে৷'
ভজহরি একগাল হেসে বলল, 'বলেছিলাম কি না!'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন