শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

লোকের সঙ্গে ভাব ভালোবাসা করতে নরহরি খুবই ভালোবাসে৷ ভাব জমানোর নানা ফন্দিফিকিরও জানা আছে তার৷ শনিবার রাতে ডাউন বর্ধমান-কলকাতা লোকালে উঠে সে দেখল কামরাটা বড়োই ফাঁকা৷ জনমনিষ্যি নেই৷ এধার-ওধার খুঁজে সে দেখল জানলার ধারে একজন মাত্র বসে বসে ঝিমোচ্ছে৷ অগত্যা নরহরি গিয়ে তার পাশটিতেই বসল৷
একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বিনয়ের
সঙ্গে বলল, 'মুখখানা খুব চেনা চেনা ঠেকছে যে!'
লোকটা নিমীলিত চোখে তাকে একবার দেখে নিয়ে বলল, 'চেনা লোককে তো চেনা চেনা দেখবারই কথা!'
নরহরি কস্মিনকালেও এই মুশকো চেহারার ফগলা, ভুঁড়ো গোঁফওয়ালা লোকটাকে দেখেনি৷ তবু খুশি হয়ে বলল, 'তা যা বলেছেন৷ কতকাল পরে দেখা!'
কিছু বলতে হয় বলেই বলা৷ কথা না কইলে নরহরির বড়ো হাঁসফাঁস লাগে৷ তবে ভাব জমাতে হলে ভুলভাল, সত্যি-মিথ্যে যা হোক কিছু বললেই হল৷
লোকটা ঝিমোতে ঝিমোতে বলল, 'হ্যাঁ, এক বছর তিন মাস সতেরো দিন পর৷'
নরহরি এ কথায় একটু হাঁ হল৷ ও বাবা! এ যে একেবারে দিনক্ষণ অবধি বলছে!
তবু নরহরি বেশ অমায়িকভাবেই বলল, 'হ্যাঁ, তা হবে৷ তা বাড়ির সবাই ভালো তো!'
লোকটা ফের নিমীলিত চোখে একবার নরহরিকে দেখে নিয়ে বলল, 'বাড়ি? বাড়ির কথা আর বলবেন না মশাই৷ তাদের হাল কী হয়েছে তা ভগবানই জানেন৷'
'বাড়ির খবর পাচ্ছেন না বুঝি! তা গিয়ে ঘুরে আসুন না একবার৷ বাড়ি দূর তো আর নয়৷'
'দূর! না, দূর আর এমন কী! আসলে ফুরসত পাচ্ছি কোথায় বলুন৷'
'তা অবশ্যি ঠিক৷ আপনি তো কাজের লোক৷ তা সেই পুরোনো চাকরিই করছেন তো এখনও?'
'তা ছাড়া আর কী? চাকরিটা তেমন খারাপ ছিল না মশাই৷ তবে এই বুড়ো মা-বাবা, বউ-বাচ্চাদের ছেড়ে বিদেশবিভুঁইয়ে পড়ে থাকাটাই বড্ড খারাপ লাগে৷'
একটা স্টেশনে ট্রেন থামতেই একটা চা-ওলা ছোকরা উঠল৷
নরহরি বলল, 'একটু চা ইচ্ছে করবেন নাকি? ভাদ্র মাসের শেষে এবার একটু ঠান্ডাই পড়ে গেছে৷'
'তা নিন একটু চা৷'
চা খেতে খেতে নরহরি বলল, 'তা কতকাল বাড়ি যাওয়া হয়নি আপনার?'
'তা বেশ অনেকদিনই হয়ে গেল৷ দু-আড়াইশো বছর হবে৷'
'কী বললেন, দু-আড়াই বছর?'
চা খেয়ে লোকটার ঝিমুনি কেটেছে৷ হাঃ-হাঃ করে হেসে বলল, 'দু-আড়াই বছর হলে তো কথাই ছিল না মশাই৷ সে তো নস্যি৷ আমি কি তাই বললাম আপনাকে?'
'তাহলে?'
'দু-আড়াইশো বছরের কথাই বলছি৷ এতদিনে মা-বাবা আরও একটু বুড়ো হয়ে গেছে নিশ্চয়ই৷ ছোটো মেয়েটা তখন হামা দিয়ে বেড়াত, এখন নিশ্চয়ই হেঁটে চলে বেড়ায়৷ রাঙী গাইটার বিয়োনোর কথা ছিল, তা তার বাছুরটাও বোধ হয় এতদিনে বড়ো হয়ে গেছে৷ গোয়ালঘরের পিছনে কলমের গাছটা ছোটো ছিল, এখন নিশ্চয়ই ফল দিতে শুরু করেছে৷'
লোকটা পাগলই হবে৷ তবে ভয়ংকর পাগলকেই যা ভয়৷ অল্পস্বল্প পাগলকে নরহরি সামাল দিতে পারবে৷ তাই সে ভারি বিনয়ের সঙ্গে বলল, 'হ্যাঁ, অনেকদিনের পাল্লা তো, ওরকম হতেই পারে৷ তা আপনার গ্রামটি কি বাঁকড়ো না মেদিনীপুরে?'
লোকটা মাথা নেড়ে বলল, 'কোনোটাই নয়, আমার জেলা হল হরেকেষ্টপুর, থানা শিকরগাছা, গাঁয়ের নাম কালীতলা৷'
'হরেকেষ্টপুর! এরকম জেলার নাম তো শুনেছি বলে মনে পড়ছে না৷'
'খুব বড়ো জেলা মশাই৷ আড়েদীঘে এতই বড়ো যে আপনাদের এগারোটা বর্ধমান জেলা তাতে অনায়াসে ঢুকে যাবে৷'
নরহরি অবাক হয়ে বলে, 'ওরে বাবা! তা কোন লাইনে যেতে হয় বলুন তো! একবার না হয় ঘুরেই আসা যাবে৷'
'কাজটা শক্ত হবে৷ পরাণ মাঝির খেয়া ছয় মাসে একবার করে এখানে খেপ মারে৷ তা সে খেয়ায় সবসময়ে জায়গা পাওয়া যায় না৷ মোটে বারোশো লোক বসবার জায়গা আছে৷'
চোখ কপালে তুলে নরহরি বলল, 'খেয়া নৌকোয় বারোশো লোক! সেটা কি নৌকো, না জাহাজ?'
'আদর করে খেয়া বলে বটে সবাই৷ তবে সেখানা বেশ বড়োসড়ো ব্যাপারই বটে৷'
'তা মশাই, খেয়া নৌকো তো আমাদের দামোদরেও খেপ মারে৷ দিনে অগুনতিবার এপার-ওপার করছে৷ কিন্তু আপনাদের পরাণ মাঝি ছ-মাসে একবার খেপ মারে কেন?'
'পাল্লাটাও তো দেখতে হবে৷ তা ধরুন এ মুড়ো ও মুড়ো ধরলে লক্ষ কোটি মাইলের তফাত৷'
'এ যে দুনিয়াজোড়া কথা মশাই৷'
'যে আজ্ঞে৷ দুনিয়াজোড়া কথাই তো৷'
'নদীটার নাম কী বলুন তো৷'
'আমরা তো বলি আকাশগঙ্গা৷'
'আকাশগঙ্গা! না দাদা, এরকম নদীর নাম শুনিনি৷'
'না শুনলেও দেখেছেন তো বটেই৷'
'দেখেছি নাকি?'
'না দেখার কী আছে বলুন৷ চোখের সামনেই বুক চিতিয়ে পড়ে আছে৷ জল-টল নেই অবশ্য, শুধু খাত৷'
'বলেন কী, জলছাড়া নদী! তা তাতে আবার খেয়া! না দাদা, আমার মাথায় সেঁধোচ্ছে না৷'
লোকটা ভারি হাঃ-হাঃ করে হাসল৷ বলল, 'আকাশগঙ্গা কি যে সে নদী! তার দেমাকই আলাদা৷'
'নদীটা কি আমাদের বর্ধমানের লাইনেই পড়বে মশাই?'
'তা পড়বে না কেন? আকাশগঙ্গার ঘাট সর্বত্র৷ ওপর পানে তাকালেই তো আকাশগঙ্গা মশাই৷ একেবারে ভগবানের রাজ্যে৷ ও নদীর কোনো কূলকিনারা নেই৷ কোথাও শুরু হয় না, কোথাও শেষ হয় না৷'
'আপনি বোধ হয় ঠাট্টা করছেন৷'
'আমি ঠাট্টা করার কে? ঠাট্টা যদি বলেন তো সেটা ভগবানেরই ঠাট্টা৷ অত বড়ো আকাশখানা আমাদের মুখের ওপর ছুড়ে দেওয়ার কোনো মানে হয় বলুন! আমরা ছোটোখাটো মানুষ সব, আকাশখানার বহর দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ারই তো কথা৷'
নরহরি এবার খুব সন্তর্পণে বলল, 'আপনার আকাশগঙ্গা কি তাহলে আকাশের নদী মশাই?'
'তাই বটে৷'
'সেটাকেই কি আকাশকুসুম বলে?'
'তাও বলতে পারেন৷ সন্ধেরাতের দিকে পূবমুখো দাঁড়িয়ে বাঁ-হাতে কোনাকুনি যে লালচে তারাটাকে দেখতে পাবেন, ওরই কাছেপিঠে আমার গাঁ৷ ভারি ভালো গ্রাম মশাই৷ হপ্তায় তিন দিন হাট বসে৷ শিবরাত্রি, চড়ক, রথ আরও সব পালেপার্বণে বিরাট মেলা বসে৷ জাগ্রত রক্ষাকালীর থান আছে৷ লাগোয়া দ্বাদশ শিবের মন্দির৷ রথযাত্রায় দু-শো ফুট উঁচু রথ বেরোয়৷'
নরহরির বাক্য শেষ হয়ে গেল৷ এ পাগলের সঙ্গে কথা কওয়ার মানেই হয় না৷ সে পিছনে হেলান দিয়ে চোখ বুজে ফেলল৷ মাথাটা ঘুরছে৷
'মশাই কি ঘুমোলেন?'
'আজ্ঞে একটু ঝিমুনি আসছে বটে৷'
'তাহলে ঘুমোন৷ আমি পরের স্টেশন মশাগ্রামেই নেমে যাব৷'
'তা বেশ৷'
'শুধু নামবার আগে একটা কথা৷'
'কী বলুন তো৷'
'এক বছর তিন মাস সতেরো দিন আগে এই ট্রেনেই এমনি রাতের বেলা আপনি আমার ঘুম ভাঙিয়ে খেজুরে আলাপ জুড়েছিলেন, মনে আছে?'
নরহরি শশব্যস্তে বলল, 'তাই নাকি?'
'যে আজ্ঞে৷ তাই তক্কে তক্কে ছিলাম৷ আজ সুযোগ পেয়ে একটু পালটি দিয়ে গেলাম আর কি৷ ভবিষ্যতে আর বোধ হয় আপনি আমার ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করবেন না৷'
নরহরি ভারি খুশি হয়ে হাত কচলে বলল, 'আজ্ঞে না৷ কস্মিনকালেও না৷'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন