শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সে-আমলে আমাদের পরগনায় বিখ্যাত চোর ছিল সিধু৷ তার হাত খুব সাফ ছিল, মাথা ছিল ঠান্ডা, আর তুখোড় বুদ্ধি৷ দিনের বেলা সিধু গৃহস্থের মতো চালচলন বজায় রাখত, আমাদের বাড়িতেও বেড়াতে-টেড়াতে আসত সে৷ আর পাঁচজনের মতোই ঠাকুমা তাকেও ফল-টল খাওয়াতেন, মুড়ি মেখে দিতেন৷ কেবল সে চলে যাওয়ার পর ঠাকুমা গেলাশ-বাটি গুনে দেখতেন সব ঠিকঠাক আছে কি না৷ সিধু সব বাড়িতে যেত খবর করতে, কার বাড়িতে নতুন লোক এল, কী নতুন কাপড়চোপড় এল দোল-দুর্গোৎসবে, কোন বাড়িতে টাকাপয়সার আমদানি হচ্ছে ইত্যাদি৷ খবর বুঝে রাতবিরেতে হানা দিত সেই বাড়িতে৷ এমন সব মন্ত্র জানা ছিল তার যে, সেই মন্ত্রের জোরে বাড়ির সবাই নিঃসাড়ে ঘুমোত, সিধু হাসতে হাসতে চুরি করে নিয়ে যেত সব৷ এমনকী যাওয়ার আগে গেরস্তের ঘরে বসে দু-দণ্ড জিরিয়ে তামাক-টামাক খেয়ে যেত৷
আমরা ছেলেবেলায় যখন দেখেছি তখন সে বেশ বুড়ো৷ পরনে ফরাসডাঙার ধুতি, গিলে করা পাঞ্জাবি, পায়ে নিউকাট, মুখে পান, আর গলায় গান৷ বুড়ো বয়সেও বেশ শৌখিন ছিল সে৷ চার আঙুলে চারটে করে আংটি পরত, বাজার করতে গিয়ে দরাদরি করত না৷ চুরি করে প্রচুর পয়সা করেছিল সে৷ বাড়িতে দশ-বারোটা গোরু, সাত-আটজন ঝি-চাকর, জুড়িগাড়ি সবই ছিল তার৷ বুড়ো বয়সে ভীমরতি হয়েছিল খানিকটা৷ তখন তার চোখে ছানি আসছে; বাত ব্যাধিতেও কষ্ট পায়৷ খুব দরকার না পড়লে চুরি করতে যেত না৷ এদিকে তার ছোটো মেয়ে বিবাহযোগ্য হয়েছে৷ একটা ভালো সম্বন্ধও পেয়ে গেল৷ মেয়ের বিয়ে, তার খরচ কম নয়৷ তার বউ তখন তাকে প্রায়ই খোঁচাত, মেয়ের বিয়ে আষাঢ়ে, তোমার তো গরজই নেই দেখছি, অত বড়ো ব্যাপার, তার খরচাপাতি আসবে কোত্থেকে? রাতের দিকে একটু বেরোলে তো হয়৷ সিধু তখন তার কাঁকালের ব্যথার কথা বলত, চোখের ছানির কথা বলত, কিন্তু তার বউ সে সব শুনত না৷ শোনা যায়, বুড়ো বয়সে সিধুর কিছু ভূতের ভয়ও হয়েছিল৷ নিশুত রাতে বেরোতে সাহস পেত না৷
আমাদের পরগনায় আর একজন বিখ্যাত লোক ছিল৷ তার নাম হালিম৷ লোকে বলত হালুম মিয়া৷ তা হালিম ছিল সাংঘাতিক ডাকাত৷ যেমন তার বিরাট চেহারা, তেমনি তার সাহস৷ যে বাড়িতে ডাকাতি করবে, সে বাড়িতে সাত দিন আগে গিয়ে তার সাগরেদ চিঠি দিয়ে আসত যে, অমুক দিনে হালিম সে বাড়িতে ডাকাতি করতে আসবে৷
সে-আমলে পূর্ববঙ্গের গ্রামগঞ্জে দারোগা-পুলিশ খুব বেশি ছিল না৷ তা ছাড়া খাল-বিল-জঙ্গলের দেশ বলে অধিকাংশ জায়গাই ছিল দুর্গম৷ সে সব জায়গায় চোর-ডাকাতদের ভারি সুবিধে৷ হালিম বা হালুম মিয়াকে তাই কেউ কখনো জব্দ করতে পারেনি৷ সে ছিল দারুণ লাঠিয়াল, অসম্ভব সাহসী৷ দরকার না পড়লে খুন-টুন করত না৷ জমিদার বা ধনীরা সাধারণত হালিম মিয়া ডাকাতি করতে এলে খাতির-টাতির করত শোনা যায়, হালিম যে বাড়িতে ডাকাতি করতে যেত সে বাড়িতে আগে থেকেই বিয়ে বাড়ির মতো সাজানো হত, রোশনাই দেওয়া হত-ভালো খাবারদাবারের বন্দোবস্ত থাকত৷ হালিম উপস্থিত হলে বাড়ির মালিক হাত জোড় করে আসুন বসুন করত৷ হালিম বিনা বাধায় ডাকাতি করে চলে আসত, কিংবা ডাকাতি তাকে করতে হত না, বাড়ির লোকেরা তাকে সিন্দুকের চাবি-টাবি খুলে সব গুনেগেঁথে দিয়ে দিত৷
কিন্তু সকলের তো দিন সমান যায় না৷ আমাদের ছেলেবয়সের সেই কিংবদন্তীর ডাকাত হালিমও বুড়ো হয়েছে৷ গোরস্থানের কাছে তার বেশ বড়ো বাড়ি৷ তারও দাসী-চাকর, ধানের মরাই, জোতজমি, গোরু সবই আছে৷ আমরা হালিমকে দেখতাম কানে আতরের তুলো গুঁজে চোখে সুর্মা দিয়ে, চমৎকার চেককাটা সিল্কের লুঙ্গি আর মখমলের পাঞ্জাবি পরে জমিদারের পুকুরে ছিপে মাছ ধরছে৷ খুব গম্ভীর ছিল সে, চোখ দু-খানা সবসময়ে লাল টকটকে৷ ডাকাতি করা তখন ছেড়েই দিয়েছে, তবে শিক্ষানবিশ ডাকাতরা তার কাছে তালিম নিতে আসত৷
সিধুর কথা যা বলছিলাম৷ বউয়ের তাড়নায় অবশেষে একদিন রাতে চুরি করতে বেরোল৷ চোখের ছানির জন্যে রাস্তাঘাট ভালো করে ঠাহর হয় না, তাই সঙ্গে হ্যারিকেন নিল৷ একা যেতে ভূতের ভয়, তাই একজন চাকরকেও ডেকে নিল সঙ্গে৷ রাস্তায় সাপখোপের গায়ে পা পড়তে পারে ভেবে হাততালি দিয়ে হাঁটতে লাগল৷ আর ভূতপ্রেত তাড়ানোর জন্যে তারস্বরে 'রামনাম' করতে লাগল৷ সেই হাততালি রামনামের চোটে এত বিকট শব্দ হচ্ছিল যে রাস্তার দু-পাশের বাড়িঘরে লোকজনের ঘুম ভেঙে যেতে লাগল৷ তারা সব উঁকি মেরে দেখছে, ব্যাপারখানা কী?
অনেকেরই ধারণা হল, সিধু-চোর ধার্মিক হয়ে গেছে, তাই রাত থাকতে উঠে ঠাকুরের নাম নিতে নিতে প্রাঃতস্নান করতে যাচ্ছে নদীতে৷ এদিকে সিধুর হল বিপদ, যে বাড়িতেই ঢুকতে যায় সে-বাড়িতেই দেখে গৃহস্থ সজাগ রয়েছে৷ ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে গেল সে৷ কত ঘুমপাড়ানি মন্ত্রপাঠ করল, কিন্তু বুড়ো বয়সে মন্ত্রের জোরও কমে এসেছে, তেমন কাজ হয় না৷
ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে গোরস্থানের কাজ বরাবর এসে এক গাছতলায় বসে জিরিয়ে নিচ্ছিল সিধু৷ খুব ঠাহর করে সমুখপানে দেখে বলল, 'ওই মস্ত বাড়ি, ওটা কার রে?'
চাকর উত্তর দিল, 'ও হালুম মিয়ার বাড়ি৷'
'বটে বটে৷' বলে খুব খুশির ভাব দেখাল সিধু, 'তা হালিম দু-পয়সা করেছে বটে৷ এতকাল তো খেয়াল হয়নি৷'
এই বলে সিধু সিঁদকাঠি বার করল৷
পরদিন গঞ্জে হইচই পড়ে গেল৷ হালুম মিয়ার বাড়িতে মস্ত চুরি হয়ে গেছে৷ সকালে হালিমের বউ পা ছড়িয়ে পাড়া জানান দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, 'ওগো, আমার কী হল গো? আমার সব চেঁচেপুঁছে নিয়ে গেছে গো৷ বলি ও বুড়ো হালিম, তোর শরম নেই? যার দাপে বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খেত, তার বাড়িতে চুরি? বলি ও মুখপোড়া হালিম বুড়ো সাত সকালে গাঁজা টানতে বসেছিস! কচু গাছের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ফাঁসি যা, থুতু ফেলে তাতে ডুবে মর . . .'
দাওয়ায় বসে গাঁজা খেতে খেতে হালিম কেবল রক্তচক্ষু মেলে তাকিয়ে তার বিবিকে ধমক দিয়ে বলে, 'চুপ র চুপ র, বাঁদি৷ যে ব্যাটা চুরি করেছে তার গর্দানের জিম্মা আমার দেখিস৷'
তা শুনে বিবি আরও ডুকরে কেঁদে ওঠে৷
হালিম দুটো কাজ করল৷ সিধুর নামে তিন ক্রোশ দূরের থানায় গিয়ে একটা নালিশ ঠুকে দিয়ে এল, আর সিধুর মেয়ের বিয়ের ঠিক সাত দিন আগে একটা চিঠি পাঠাল তার কাছে, তোমার কন্যার বিবাহের রাত্রে আমি সদলবলে উপস্থিত হইতেছি৷ আমাকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য প্রস্তুত থাকিয়ো . . . ইত্যাদি৷

চিঠি পেয়ে সিধু বলল, 'ফুঃ৷'
তারপর সেও তিন ক্রোশ দূরের থানায় দারোগাবাবুকে মুরগি আর মাছ ভেট দিয়ে মেয়ের বিয়েতে নেমন্তন্ন করে এসে দাওয়ায় বসে ফিক ফিক করে হাসতে আর তামাক খেতে লাগল৷
সিধুর মেয়ের বিয়েতে আমাদেরও নেমন্তন্ন ছিল, ছোটো কাকা সমেত আমরা সব ঝেঁটিয়ে গিয়েছিলাম৷ গিয়ে দেখি, হালুম মিয়া ডাকাতি করতে আসবে শুনে যাদের নেমন্তন্ন হয়নি তারাও সব এসেছে গঞ্জ সাফ করে৷ বিয়ে বাড়ি গিসগিস করছে লোকে৷ দারোগাবাবুও এসে গেছেন৷ সিধু তাঁকে বিবাহ বাসরের মাঝখানে বরাসনে বসিয়ে দিয়েছে৷ আর বর তার পাশে একটা মোড়ায় বসে নিজের হাত-পাখার বাতাস খেতে খেতে ঘামছে৷
তখনকার নেমন্তন্নে চার-পাঁচ রকমের ডাল খাওয়ানো হত, তারপর মাছ, মাংস, দই, মিষ্টি বা পায়েস দেওয়া হত৷ আমরা সবে তিন নম্বর ডাল খেয়ে চার নম্বর ডালের জন্য তৈরি হচ্ছি এমন সময়ে উত্তরের মাঠ থেকে 'রে রে' চিৎকার উঠল আর মশাল দেখা গেল৷ পাত ছেড়ে আমরা সব ডাকাতি দেখতে দৌড়ে গেলাম৷
কী করুণ দৃশ্য! ষাট-সত্তরজন সাকরেদ নিয়ে হালিম এসে গেছে৷ সকলের হাতেই বিশাল লাঠি, বল্লম, দা, টাঙ্গি৷ কপালে সিঁদুরের টিপ৷ খালি গা, মালকোঁচা করে ধুতি পরা৷ কিন্তু সব ক-জনই বুড়োসুড়ো মানুষ৷ এতদূর জোর পায়ে এসে আর হাল্লাচিল্লা করে সকলেরই দম ফুরিয়ে গেছে৷ হালিমের হাঁপের টান উঠেছে৷ তাই সিধু তাকে ধরাধরি করে নিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসাল৷ কয়েকজন ডাকাত উবু হয়ে বসে কাশতে কাশতে বুকের শ্লেষ্মা তুলছে! একজনকে দেখলাম, হাতের ভারী কুড়ুলটা আর বইতে না পেরে একজন বরযাত্রীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজের ভেরেযাওয়া হাতটাকে ঝেড়েঝুড়ে ঠিকঠাক করে নিচ্ছে৷
সিধু অনেকক্ষণ হালিমের বুক মালিশ করে দেওয়ার পর হালিমের হাঁপের টানটা কমল৷ তখন হাতের খাঁড়াটা তুলে নিয়ে বলল, 'এবার কাজের কথা হোক৷'
সিধু হাতজোড় করে বলল, 'তোমার মানমর্যাদা ভুলে যাইনি হে৷ এই নাও সিন্দুকের চাবি, দরজা-টরজা সব খোলা আছে৷ চলে যাও ভিতরে৷'
তো তাই হল৷ হুংকার দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল হালিম, সঙ্গে সঙ্গে তার দলবলও হুংকার দিল৷ অবশ্য হুংকারের সঙ্গে সঙ্গেই খক খক করে কাশিও শুরু হয়ে গেল৷ কিন্তু বেশ দাপটের সঙ্গেই হালিম ভিতরে ঢুকে সব লুটপাট করতে লাগল৷ নিজের বাড়ির যেসব জিনিস চুরি গিয়েছিল সে সবই উদ্ধার করল হালিম৷ সিধু আগাগোড়া সঙ্গে রইল হাতজোড় করে৷ হালিম কোনো জিনিস নিতে ভুল করলে সিধু আবার সেটা দেখিয়ে দেয়, 'ওই কাঁসার বাটিটা নিলে না! বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে নাকি, ওই দেয়াল ঘড়িটা যে তোমার, চিনতে পারছ না?'
এইভাবে ডাকাতি নির্বিঘ্নে এবং সাফল্যের সঙ্গে শেষ হল৷ সারাক্ষণ দারোগাবাবু পা ছড়িয়ে বসে তামাক টানলেন৷ সবাই তাঁর হাফপ্যান্টের নীচে বিশাল মোটা পা, মোটা বেল্ট আর ক্রসবেল্টে বেঁধে রাখা প্রকাণ্ড ভুঁড়ি এবং চোমড়ানো গোঁফের খুব তারিফ করতে লাগল৷ তিনি কাউকে গ্রাহ্য করলেন না৷ বর বেচারা নিজেকে বাতাস করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বসে ঢুলছে৷ বরযাত্রী সমেত সবাই ডাকাতি দেখছে ঘুরে ঘুরে৷
ব্যাপারটা শেষ হলে হালিম আর সিধু এসে দারোগাবাবুর সামনে করজোড়ে দাঁড়াল৷ দারোগাবাবু হুংকার দিলেন, 'ঘটনাটা কী হল বুঝিয়ে বলো৷ এই বুড়ো বয়সে চুরি-ডাকাতি করতে যাস, একদিন মরবি৷'
সিধু কাঁচুমাঁচু হয়ে বলে, 'বড়োবাবু, চুরি কি আর নিজের ইচ্ছায় করতে গেলাম! বউয়ের কাছে ইজ্জত থাকে না, সেই ঠেলে-ঠুলে পাঠায়৷'
হালিম বলল, 'আমারও ওই কথা!'
দারোগাবাবু হাতের নল ফেলে খুব হাসলেন৷ তাঁর হাসিরও সবাই প্রশংসা করল৷
তারপর বারান্দায় ঠাঁই করে হালিমের দলকে খেতে বসানো হল৷ হালিমের অবস্থা ভালো, কিন্তু তার সাকরেদরা সব হাঘরে৷ ডাল আর বেগুন ভাজা দিয়েই তারা পাত লোপাট করতে লাগল৷
সেই দেখে আমাদেরও মনে পড়ল, আমাদের পাতে এবার চার নম্বর ডাল পড়বার কথা৷ আমরা সব দৌড়াদৌড়ি করে ফিরে এলাম খাওয়ার জায়গায়৷ এবং তারপরই গণ্ডগোল শুরু হয়ে গেল৷ অর্ধেক খেয়ে উঠে গেছি; ফিরে এসে হুটপাট করে বসে পড়বার কিছুক্ষণ পরেই সবাই টের পেতে লাগলাম পাতের গণ্ডগোল হয়ে গেছে৷ কে কার পাতে বসেছি তার ঠিক পাচ্ছি না৷ যেমন আমার ডান পাশে ছোটো কাকা বসে ছিল, বাঁয়ে সুবল৷ পাতে দেড়খানা বেগুন ভাজা ছিল, মুড়িঘণ্টের একটা কানকো৷ এখন দেখছি ছোটো কাকা উলটো দিকের সারিতে বসে আছে, বাঁ পাশে বিপিন পণ্ডিত, পাতে আধখানা মোটে বেগুন ভাজা, মুড়িঘণ্টের কানকোটা নেই, একটা পোটকা পড়ে আছে৷ সবাই চ্যাঁচামেচি করতে লাগল, 'এই তুই আমার পাতে বসেছিস চোর কোথাকার' ... 'ঃও মশাই, আপনি তো আমার বাঁ ধারে ছিলেন' . . . 'এ কী, আমার ভাজা কোথায় গেল . . .' ইত্যাদি৷ তবু খাওয়াটা সেদিন খুব জমেছিল৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন