হনুমান ও নিবারণ

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

নিবারণবাবু শান্তিপ্রিয় মানুষ৷ কারও সাতেও নেই, পাঁচেও নেই৷ উটকো উৎপাত তিনি পছন্দ করেন না৷ তবু তাঁর কপালেই হালে এক ঝামেলা এসে জুটেছে৷ বাড়ির সামনেই একখানা পেল্লায় জাম গাছ৷ সেই গাছে দু-তিন দিন আগে হঠাৎ কোথা থেকে এক বিশাল জাম্বুবান কেঁদো হনুমান এসে থানা গেড়েছে৷ এ তল্লাটে হনুমান বাঁদর ইত্যাদি কোনো কালেই ছিল না৷ হনুমানটা যে কোথা থেকে উটকো এসে জুটল তা কে জানে৷

তা হনুমান আছে থাক, নিবারণবাবুর তাতে বিশেষ আপত্তি নেই৷ হনুমান হনুমানের মতো থাক, তিনি থাকবেন তাঁর মতো৷ কিন্তু ব্যাটাচ্ছেলে হনুমান কী করে যেন টের পেয়েছে যে, এ পাড়ায় সবচেয়ে নিরীহ ভালোমানুষ হল এই নিবারণ ঘোষাল৷ হতচ্ছাড়া আর কাউকে কিছু বলে না, কারও দিকে দৃকপাত অবধি নেই৷ কিন্তু নিবারণবাবু বাড়ি থেকে বেরোলেই জাম গাছে তুমুল আলোড়ন তুলে হুপহাপ দুপদাপ করে দাপাদাপি করতে থাকে৷

প্রথম দিনের ঘটনা৷ শান্ত শরৎকালের মনোরম সকাল৷ সোনার থালার মতো সূর্য উঠেছে৷ চারদিকে একেবারে আহ্লাদি রোদ৷ একখানা কোকিলও কুহুস্বরে ডাকছিল৷ নিবারণবাবু থলি হাতে প্রশান্ত মনে বাজার করতে বেরিয়েছেন৷ দুর্গা নাম স্মরণ করে চৌকাঠের বাইরে সবে পা রেখেছেন, এমন সময়ে হঠাৎ জাম গাছটায় ওই তুমুল কাণ্ড৷ নিবারণবাবু সভয়ে আবার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন৷ তিনি ভারি ভীতু লোক৷

গিন্নি বললেন, 'কী হল ফিরে এলে কেন?'

নিবারণবাবু আমতা-আমতা করে বললেন, 'জামগাছে কী যেন একটা কাণ্ড হচ্ছে৷'

গিন্নি হেসে বললেন, 'ও তো একটা হনুমান৷ কাল আমিও দেখেছি৷ পাড়ার ছোঁড়ারা ঢিল মারছিল৷'

নিবারণবাবু একটা নিশ্চিন্দির শ্বাস ফেলে বললেন, 'তাই বলো! হনুমান!'

জাম গাছতলা দিয়েই রাস্তা আর রাস্তা দিয়ে মেলা লোক যাতায়াত করছে৷ দুধওয়ালা, কাগজওয়ালা, বাজারমুখো এবং বাজারফেরত মানুষ, ঝাড়ুদার৷ হনুমান কাউকে দেখেই উত্তেজিত নয়, কিন্তু যেই নিবারণবাবু ফের দরজার বাইরে পা দিয়েছেন অমনি লম্ফঝম্ফ শুরু হয়ে গেল৷

নিবারণবাবু তখন সাহসে ভর করে একটু দৌড় পায়েই জাম গাছটা পেরিয়ে গেলেন বটে, কিন্তু কেমন যেন একটা অস্বস্তি রয়ে গেল মনের মধ্যে৷

তবে সেদিন বাজারে গিয়ে মনটা ভারি ভালো হয়ে গেল৷ সস্তায় বেশ বড়ো বড়ো পাবদা মাছ পেয়ে গেলেন৷ মরশুমের প্রথম ফুলকপি একটু দর করতেই দাম নেমে গেল আর এক আঁটি ধনেপাতা কিনে ফেললেন মাত্র চার আনায়৷ বাজার সেরে যখন ফিরছেন তখন আর হনুমানটার কথা তাঁর খেয়াল নেই৷

যেই আনমনে জাম গাছটার কাছাকাছি এসেছেন অমনি ডালপালায় তুমুল শব্দ করে হনুমানটা নেমে এল একেবারে নীচে৷ একখানা ডাল ধরে এমন ঝুল খেতে লাগল যে তার লেজখানা নিবারণবাবুর নাকের ডগা ছোঁয় ছোঁয়৷ নিবারণবাবু জীবনে দৌড়ঝাঁপ বিশেষ করেননি, তবু হনুমানের হামলা থেকে বাঁচার জন্য সেদিন এমন দৌড় দিলেন যে তাঁর ছোটো ছেলে বিশু অবধি পরে প্রশংসা করে বলেছিল, 'বাবা, তুমি যদি সিরিয়াসলি দৌড়োতে তাহলে অলিম্পিক থেকে প্রাইজ আনতে পারতে৷ চটি-পরা পা আর বাজারের ব্যাগ নিয়ে কেউ যে অমন দৌড়োতে পারে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হত না৷'

দৌড়টা যে ভালোই হয়েছিল তা নিবারণবাবুও জানেন, তবে শেষ অবধি চটিজোড়া পায়ে ছিল না, ছিটকে পড়েছিল৷ আর বাজারের ব্যাগ হাতছাড়া হয়ে সাধের পাবদা মাছ চারটে কাকে নিয়ে গেল, ছ-খানা ডিম ভাঙল আর রাস্তার একটা গোরু দু-খানা ফুলকপি চিবিয়ে খেয়ে নিল৷

দ্বিতীয়বার ঘটনাটা ঘটল অফিসে বেরোনোর সময়৷ নিস্তব্ধ জাম গাছতলা দিয়ে বিস্তর লোক বিষয়কর্মে যাচ্ছে আসছে৷ কিন্তু টিফিনকৌটো নিয়ে ছাতা বাগিয়ে গালে পানটি পুরে দুর্গানাম স্মরণ করে যেই নিবারণবাবু বেরোলেন অমনি জাম গাছে যেন ঝড় উঠল৷ হনুমানটা এ ডালে ও ডালে ভীষণ লাফালাফি করতে করতে হুপহাপ করে বকাঝকাই করতে লাগল বোধ হয়৷

কিন্তু অফিস তো আর কামাই করা যায় না, নিবারণবাবু ছাতাখানা ফট করে খুলে তার নীচে আত্মগোপন করে প্রাণপণে দৌড় লাগালেন৷ কিন্তু স্পষ্ট টের পেলেন, জাম গাছটা পেরোনোর সময় হনুমানটা তাঁর ছাতায় একটা খাবলা মারল৷

গত তিন দিন ধরে নিবারণবাবুর জীবনে আর শান্তি নেই৷ আসতে হনুমান, যেতে হনুমান৷ হনুমানটা কেন যে শুধু তাঁর পিছনেই লাগছে তা চিন্তা করে করে তিনি হয়রান৷ খেতে পারছেন না, ঘুমোতে পারছেন না, তিন দিনেই বেশ রোগা হয়ে গেছেন৷ তাঁর দুই ছেলে কানু আর বিশু হনুমানটাকে তাড়ানোর জন্য বিস্তর ঢিল আর গুলতি ছুড়েছে, তাদের সঙ্গে পাড়ার ছেলেরাও৷ কিন্তু বিশেষ লাভ হয়নি৷ হনুমানটি গাছের মগডালে উঠে ঘন ডালপালার মধ্যে চুপচাপ বসে আছে৷ ইট-পাটকেল তার ধারেকাছে ঘেঁষতে পারেনি৷

গিন্নি বললেন, 'পূর্বজন্মে ও তোমার ভাই ছিল, তাই এত টান৷'

নিবারণবাবু খিঁচিয়ে উঠে বললেন, 'আমি হনুমানের ভাই হতে যাব কেন?'

দুশ্চিন্তা নিয়েই নিবারণবাবু রাতে শুয়েছেন৷ তবে ঘুম আসছে না৷ মাথাটা বেশ গরম৷ কাল সকালেই আবার বাজার আছে, অফিস আছে৷ জাম গাছতলা ছাড়া যাওয়ার পথ নেই৷ শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছেন৷ কিছুদিনের ছুটি নিয়ে পুরী বা ওয়াল্টেয়ার ঘুরে আসবেন কি না তাও ভাবছেন৷

হঠাৎ একটা বিকট হুপ শব্দে নিস্তব্ধ রাতটা যেন কেঁপে উঠল৷ নিবারণবাবু চমকে উঠে বসলেন আতঙ্কে৷ অন্ধকার ঘর, তবু জানলার দিকে চেয়ে তাঁর বুক হিম হয়ে গেল৷ জানালাটা অর্ধেক ভেজানো ছিল৷ এখন জানলাটা পুরো খোলা৷ আর গ্রিল ধরে সেই অতিকায় হনুমানটা দাঁড়িয়ে৷ দু-খানা চোখ ভাটার মতো জ্বলছে৷

ভয়ে এমন সিঁটিয়ে গেলেন নিবারণবাবু যে, কাউকে ডাকতে পারলেন না, গলা দিয়ে স্বরই বেরোল না তাঁর৷ কিছুক্ষণের জন্য যেন পাথর হয়ে গেলেন৷

হঠাৎ একটা বেশ ভরাট গমগমে গলা বলে উঠল, 'ভয় পাবেন না . . . ভয়ের কিছু নেই . . .'

বিস্ময়ে হতবাক নিবারণবাবু৷ কে কথা বলল তা চারদিকে চেয়ে খুঁজতে লাগলেন৷ কিন্তু ঘরের মধ্যে কারও থাকার কথা নয়৷

কন্ঠস্বরটি ফের বলে উঠল, 'রামচন্দ্র আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান৷ আমি তাঁর দূত মাত্র৷'

নিবারণবাবু নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না৷ স্বপ্ন দেখছেন কি না তা বুঝবার জন্য হাতে একখানা রামচিমটি কেটে নিজেই ঃউ করে উঠলেন৷

গলাটা বলল, 'স্বপ্ন নয়৷ যা দেখছেন, যা শুনছেন সব সত্যি৷'

নিবারণবাবু হনুমানের দিকে চেয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, 'কথাগুলো কি আপনিই বলছেন? মানুষের ভাষায়?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ, কিন্তু আমাদের হাতে সময় বিশেষ নেই৷ রামচন্দ্র অপেক্ষা করতে ভালোবাসেন না৷'

'রামচন্দ্র কে?'

'আমার প্রভু৷'

'কোথায় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হবে?'

'আপনি আমার সঙ্গে যাবেন৷'

'ও বাবাঃ৷ আমি পারব না, আমার বড়ো ভয় করছে৷'

'ভয় কীসের?'

'আমার ব্যাপারটা বড্ড গোলমেলে ঠেকছে৷'

'গোলমালের কিছু নেই৷ চলে আসুন৷ দেরি হয়ে যাচ্ছে৷'

নিবারণবাবু বুঝলেন, এসব ভূতুড়ে কাণ্ড৷ এবং বেশ জবরদস্ত ভূতের পাল্লায় তিনি পড়েছেন৷ তবে এখনও উদ্ধারের উপায় আছে৷ তিনি ঘুমন্ত গিন্নিকে প্রবল ধাক্কা দিয়ে জাগাতে জাগাতে কানু আর বিশুকে প্রাণপণে চেঁচিয়ে ডাকতে লাগলেন৷ সে এমন রামধাক্কা আর বিকট চ্যাঁচানি যে মরা মানুষেরও উঠে বসবার কথা৷ কিন্তু কোনো সাড়াশব্দই পেলেন না৷

হনুমান বলল, 'ওদের ঘুম এখন ভাঙবে না৷ বৃথা চ্যাঁচামেচি করছেন৷'

ভয়ে নিবারণবাবুর শরীর প্রথমে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এখন তার ভয়ে আবার কলকল করে ঘাম হতে লাগল৷ বুকের ভিতরটা এমন ধড়ফড় করছে যে, হার্ট ফেল হওয়ার জোগাড়৷

ক্ষীণকন্ঠে বললেন, 'আমাকে ছেড়ে দাও বাবা, এসব আমার ভালো লাগছে না৷'

নিবারণবাবু শুয়ে পড়ে জোর করে চোখ বন্ধ করে রইলেন৷

হনুমান বলল, 'নিবারণবাবু, প্রভুর হুকুম তামিল না করে আমার উপায় নেই৷ আপনি সহজে না গেলে জোর করে নিয়ে যেতে হবে৷'

এই বলে হনুমান চুপ করল৷ নিবারণবাবু চোখ মিটমিট করে দেখতে পেলেন হনুমান দু-হাতে গ্রিল টানাটানি করছে৷ শক্ত লোহার গ্রিল, ভাঙতে পারবে বলে মনে হল না নিবারণবাবুর৷

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হনুমান মাত্র একটা হ্যাঁচকা টানেই পুরো গ্রিলটা জানলার ফ্রেম থেকে উপড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলল৷

নিবারণবাবু এত ভয় পেয়েছেন যে, আরও বেশি পাওয়া তাঁর পক্ষে আর সম্ভব নয়৷ মজা হল ভয় যখন সাংঘাতিক বেশি হয় তখন মানুষের একটা মরিয়া সাহসও আসে৷ চোর তাড়ানোর জন্য খাটের মাথার কাছে একখানা মোটা বেতের লাঠি রাখা থাকে৷ আজ অবধি সেটা কোনো কাজে লাগেনি৷ আজ লাগল৷ নিবারণবাবু ভাবলেন, এমনিতেও গেছি, অমনিতেও গেছি, সুতরাং আর ভয়ের কী? যা থাকে কপালে-

ভেবে লাফিয়ে উঠে তিনি লাঠিটা নিয়ে প্রবল বিক্রমে হনুমানের মাথায় বসিয়ে দিলেন৷ কিন্তু বসালেও লাঠিটা ঠিক মতো বসল না৷ হনুমান খুব আলগা হাতে লাঠিটা কেড়ে নিল হাত থেকে, তারপর সেটাকে প্যাঁকাটির মতো ভেঙে ফেলে বলল, 'কেন ঝামেলা করছেন? প্রভু রামচন্দ্র ডাকছেন, এ আপনার মহা সৌভাগ্য৷'

নিবারণবাবু যাকে বলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন৷ হনুমানটা লম্বায় প্রায় তাঁর সমান৷ আর চওড়ায় কুস্তিগিরদের মতো৷ এত বড়ো হনুমান তিনি এর আগে আর দেখেননি৷ বিপদে পড়ে মাথাটা একটু গণ্ডগোল হয়ে গিয়েছিল বলে তিনি হনুমানের কথাগুলো শুনেও বুঝবার চেষ্টা করেননি৷ এবার তাঁর হঠাৎ মনে হল এ কি সেই রামচন্দ্রের হনুমান নাকি? হনুমান তো অমর, তার এখনও পৃথিবীতে বেঁচেবর্তে থাকবার কথা৷ আর প্রভু রামচন্দ্র তিনি তো স্বয়ং ভগবান৷ তাহলে এসব হচ্ছেটা কী? রামচন্দ্র তাঁর ভক্ত হনুমানকে পাঠিয়েছেন তাঁকে ডাকবার জন্য? কিন্তু কেন? তিনি তো তেমন উঁচুদরের ভক্ত বা ধার্মিক নন৷

হনুমান জলদগম্ভীর গলায় বলল, 'আমার লেজটা ধরুন৷'

ভয়ে ভয়ে নিবারণবাবু বিনা বাক্যব্যয়ে লেজটা ধরলেন৷ আর ধরতেই যেন চৌম্বক আকর্ষণে হাত দুটো লেজের সঙ্গে আটকে গেল৷ আর দাঁড়ানোর উপায় রইল না৷

তার পর যে কী হল তা নিবারণবাবু ঠিকঠাক বুঝতে পারলেন না৷ হনুমান তাঁকে জানলা গলিয়ে বাইরে এনে ফেলল এবং তারপর ইঞ্জিনের মতো ছুটতে শুরু করল৷ এত ছুট জীবনে কখনো ছোটেননি নিবারণবাবু৷ তবে কেন যেন তার হাঁফ ধরছিল না৷ চোখের পলকে নিজেদের তল্লাট এবং শহর ছাড়িয়ে খোলা মাঠঘাটে এসে গেলেন তাঁরা৷ হনুমান মস্ত মস্ত লাফ মেরে ঢেউয়ের মতো চলছে৷ সঙ্গে সঙ্গে নিবারণবাবুও ঢেউ হয়ে বয়ে যাচ্ছেন৷ প্রায় দশ-বারো হাত দূরে দূরে এক-একবার পা মাটিতে ঠেকছে৷

অনেকটা চলে আসার পর একটা জঙ্গলে ঢুকে গেলেন তাঁরা৷ তারপর একটা ফাঁকা চত্বর৷ জঙ্গলঘেরা জায়গাটায় একটা লোক পিছনে হাত রেখে মৃদুমন্দ পায়চারি করছে৷ লোকটা বেঁটে এবং দেখতে একটা কিম্ভূত৷ পরনে একটা পাশবালিশের ওয়াড়ের মতো পোশাক, মাথায় একটা সরু টুপি৷ লোকটার গোল মুখখানায় চোখ নাক কান কোনোটাই ঠিক জায়গায় নেই বলে মনে হল দূর থেকে৷

কাছে গিয়ে হনুমান লোকটাকে প্রণাম করে বলল, 'প্রভু এনেছি৷'

লোকটা নিবারণের দিকে ফিরে তাকাল, মুখটা ভালো করে দেখে আঁতকে উঠলেন নিবারণবাবু৷ এর চোখ দুটো দুই গালে৷ ঠোঁট দুটো নাকের ওপরে৷ আর গলা বলে কিছু নেই৷ কান দুটো গোরুর কানের মতো৷

এই কি রামচন্দ্র? এত বিচ্ছিরি দেখতে?

রামচন্দ্র লোকটা ডান গালের চোখটা দিয়ে নিবারণবাবুকে দেখে নিয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন, 'পেন্নাম করলে না?'

'যে আজ্ঞে৷' বলে নিবারণবাবু তাড়াতাড়ি মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে ভয়ে ভয়ে প্রণাম করলেন৷

রামচন্দ্র খক খক শব্দ করে হেসে বললেন, 'শোনো হে বাপু, আমি সত্যিই কিন্তু তোমাদের সেই রামায়ণের রামচন্দ্র নই৷ তার গল্পটা বেশ লাগে, তাই ভাবলুম রামচন্দ্র নামটা নিলে মন্দ হয় না৷'

'আপনি আসলে কে তাহলে?'

লোকটা মাথাটা একটু নেড়ে বলে, 'সে বাপু অনেক কথা৷ তবে সোজা কথায় আমি এ তল্লাটের লোক নই, এই দেশের নই, এমনকী এই হতচ্ছাড়া নোংরা গ্রহেরও নই৷ অনেক দূরের পাল্লা রে বাপু৷ আর আমার এই হনুমানটিও আসল হনুমান নয়৷ কলের হনুমান৷ তবে কল হলেও ও বড়ো খুঁতখুঁতে, সবাইকে পছন্দ করে না৷ দুনিয়া ঘুরে ঘুরে মাত্র একটা লোককেই ও বেছে বের করেছে৷ সে হল তুমি৷'

নিবারণবাবু ঘন ঘন চোখ কচলাচ্ছিলেন৷ প্রত্যয় হচ্ছে না৷ যা শুনছেন সব সত্যি নাকি? এসব তো কল্পবিজ্ঞানে থাকে৷

রামচন্দ্র বলল, 'তোমাদের গ্রহটা নোংরা হলেও মহাকাশে আমার কাজের পক্ষে সুবিধেজনক৷ আমার হনুমানকে তাই তোমাদের গ্রহে পাকাপাকি ভাবে রেখে যেতে চাই৷ সমস্যা হল, ওকে ঠিকমতো দেখাশুনা করার লোক চাই৷ ও তোমাকে খুঁজে বের করেছে, কাজেই ওর ভার তোমাকেই নিতে হবে৷'

নিবারণবাবু ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, 'যে আজ্ঞে, তবে কেমন যত্নআত্তি করতে হবে?'

'খুব সোজা, ওর মাথায় একটা ছোট্ট ফুটো আছে, চাঁদির একেবারে মাঝখানে৷ এই তেলের কৌটোটা নাও, মাসে একবার ওই ফুটোর মধ্যে দু-ফোঁটা তেল ঢেলে দিলেই হবে৷ আর তোমার বাড়ির জাম গাছটাতেই ও থাকবে৷ ওকে যেন কেউ বিরক্ত না করে দেখো৷ বেশি বিরক্ত করলে কিন্তু ও গা থেকে এমন রশ্মি বের করতে পারে যা তোমাদের পক্ষে বিপজ্জনক৷'

নিবারণবাবু শিউরে উঠে বললেন, 'যে আজ্ঞে৷'

'আর তুমি ইচ্ছে করলে ওকে ফাইফরমাশ করতে পার, ওর সঙ্গে হিল্লি-দিল্লি বেড়িয়ে আসতে পার৷'

নিবারণবাবু স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললেন, 'যে আজ্ঞে৷'

'তাহলে এসো গিয়ে৷ কোনোরকম গোলমাল কোরো না কিন্তু৷'

'আজ্ঞে না৷'

লোকটা অর্থাৎ রামচন্দ্র গটগট করে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে একটা শিস দিল৷ অমনি মাটির তলা থেকে একটা কিম্ভূত পটলাকৃতি মহাকাশযান বেরিয়ে এল৷ লোকটা দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই জিনিসটা সাঁ করে আকাশে উঠে মিলিয়ে গেল৷

নিবারণবাবু এখন বেশ আছেন৷ হনুমানটা জাম গাছেই থাকে৷ তবে তাকে আর ভয় পাওয়ার কারণ নেই৷ বরং মাঝরাতে হনুমানটা এসে তাঁর সঙ্গে দিব্যি আড্ডা দিয়ে যায়৷ ঘরের কাজকর্মও অনেক করে দেয়৷ গিন্নি তো পছন্দ করেনই, বিশু আর কানুরও সে বেশ বন্ধু হয়ে গেছে৷

হনুমানকে তেল দিতে নিবারণবাবুর একবারও ভুল হয় না৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%