শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

'বাঃ, আপনার কুকুরটি কিন্তু ভারি সুন্দর বলাইবাবু৷'
'কুকুর, কোথায় কুকুর!'
'ওই তো, আপনার পিছনে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে৷'
'অ! না মশাই, ওটা আমার কুকুর নয়৷'
'নয়! ইস দেখুন তো, আপনার কুকুর মনে করে গতকালও যে ওকে আমি লেড়ো বিস্কুট কিনে খাইয়েছি! বিস্কুটের আজকাল যা দাম হয়েছে, কহতব্য নয়৷ পয়সাটা কি তবে জলে গেল?'
'কিন্তু মশাই, আমার কুকুর মনে করে ওকে লেড়ো বিস্কুট খাওয়াতে গেলেন কেন? আমার কুকুরকে লেড়ো বিস্কুট খাওয়ানোয় আপনার লাভ কী?'
'আছে, ও আপনি বুঝবেন না৷ সামান্য একটা লেড়ো বিস্কুটই তো! তবে ও কিন্তু গতকালও আপনার পিছু পিছু বাজার অবধি গিয়েছিল৷ পরশুদিনও৷ এমনকী তার আগের দিনও৷'
'অবাক কাণ্ড! কুকুরটা রোজ আমার পিছু নেয়, আমি তো তা জানতাম না৷'
'আমার যতদূর মনে হয়, কুকুরটা লোক চেনে৷ আপনি যে একজন মহান লোক তা কুকুরটা বুঝতে পেরেছে৷'
'আমি মহান লোক! তা মশাই, মহান কথাটার মানে কী দাঁড়াচ্ছে তা বুঝিয়ে বলতে পারেন? জীবনে কখনো কেউ আমাকে মহান বলেনি৷ শুনে বড়ো অবাক লাগছে৷'
'কী যে বলেন বলাইবাবু৷ মহান কথাটার জন্মই তো হল আপনার জন্য৷ ও কথাটা আর কারও গায়ে তেমন ফিট করে না, কিন্তু আপনার গায়ে একদম মাপে মাপে বসে যায়৷'
'বটে!'
'তা নয়! সবাই জানে আপনার মানুষের জন্য প্রাণ কাঁদে, আপনি দু-হাতে গরিব-দুঃখীকে বিলিয়ে দেন, আপনি মানুষের বিপদ দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়েন, নিতান্ত সামান্য মানুষকেও সম্মান দিয়ে কথা বলেন, জীবজন্তুর প্রতি আপনার প্রেম তো সর্বজনবিদিত৷'
'চিন্তায় ফেলে দিলেন মশাই৷ আমি মানুষকে নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাই না৷ বাড়িতে ভিক্ষুক এলে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, কারণ অধিকাংশ ভিক্ষুকই প্রফেশনাল নিষ্কর্মা৷ মানুষ নিজের দোষে বিপদে পড়ে বলে আমি কারও বিপদআপদে বোকার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ি না আর অধিকাংশ মানুষই সম্মান পাওয়ার যোগ্য নয় বলে তাদের আমি পোকামাকড়ের বেশি মনে করি না৷ আরও একটা কথা, কুকুর বেড়াল ইত্যাদি নানা রোগজীবাণু বহন করে বলে আমি তাদের সযত্নে এড়িয়ে চলি৷'
'আহা বলাইবাবু, এসবও তো বিবেচকের মতোই কাজ৷ আর তাতে আপনার মহান হতে আটকাচ্ছে কীসে?'
'তাতেও আটকাচ্ছে না! তাজ্জব করলেন মশাই!'
'আজ্ঞে, দু-চারটে গুণ বাদ গেলেও ক্ষতি নেই৷ গান্ধীজি কি ফুটবল খেলতে পারতেন?'
'বোধ হয় না৷ কিন্তু হঠাৎ একথা কেন?'
'আচ্ছা, বিদ্যাসাগরমশাই কি গান জানতেন?'
'জানি না তো!'
'রবিঠাকুর কি ক্যালকুলাস জানতেন?'
'না জানাই সম্ভব৷'
'তা বলে কি তাঁরা মহান নন?'
'তা বটে৷ তাহলে আপনি আমাকে মহান বানিয়েই ছাড়বেন৷'
'আজ্ঞে না! আমি বলতে চাইছিলাম যে, আপনি মহান হয়েই জন্মেছেন৷ তা আপনি যতই নিজেকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করুন৷ আর এটাও আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে যে, নিজেকে তুচ্ছ জ্ঞান করা মহানদেরই লক্ষণ৷'
'আমি মশাই, নিজেকে মোটেই তুচ্ছ জ্ঞান করি না৷ আমি বিলক্ষণ জানি যে, আমি একটি বড়ো কোম্পানির ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, সেজন্য আমার যথেষ্ট অহংকারও আছে৷'
'বলাইবাবু, ওই অহংকারও আপনাকে মানায়৷'
'আচ্ছা মশাই, আপনি তো গায়ে পড়ে অনেক কথা বলছেন৷ কিন্তু আপনাকে তো আমি চিনি না! আপনি কে বলুন তো!'
'কী যে বলেন, আমাকে চিনতে যাবেন কোন দুঃখে? উঁচু সার্কেলের লোকদের কাছে দেওয়ার মতো পরিচয় তো নয়৷'
'সে তো আপনার হাড়হাভাতে চেহারা আর পোশাক দেখেই বোঝা যাচ্ছে৷ তবু নামধাম জেনে রাখা ভালো৷'
'নাম হল ধর্মদাস ঘোষ৷'
'কী করা হয়-টয়?'
'ওই সামান্য একটু ডাক্তারি করে থাকি৷ হোমিয়োপ্যাথি৷'
'তা মন্দ কী? হোমিয়োপ্যাথদের তো আজকাল বেশ পসার শুনেছি৷'
'তা আজ্ঞে কিছু কিছু মানুষ ভাগ্য নিয়ে জন্মায়৷ তারা যাতে হাত দেয় তাতেই সোনা ফলে৷ তবে কিনা হোমিয়োপ্যাথিতে আমি তেমন সুবিধে করে উঠতে পারিনি৷ তাই ওর সঙ্গে একটু জ্যোতিষচর্চাও করে থাকি৷'
'ওরে বাবা, আপনি জ্যোতিষীও?'
'ওই যে বললাম, কপাল ভালো থাকলে সবকিছুতেই হাতযশ হয়৷ কিন্তু আমার জ্যোতিষবিদ্যারও তেমন কদর হয়নি৷'
'এবার বলুন তো ধর্মদাসবাবু, আজ গায়ে পড়ে এই খেজুর করার উদ্দেশ্যটা কী?'
'আজ্ঞে, গত কয়েকদিন ধরেই আপনাকে আমি ফলো করছি৷'
'ফলো করছেন! আশ্চর্য ব্যাপার! ফলো করছেন কেন?'
'আজ্ঞে পদাঙ্ক অনুসরণও বলতে পারেন৷ ভাবলাম কৃতবিদ্য লোক আপনি, বিশাল ডিগ্রি, বিশাল চাকরি, বিশাল নামডাক, তা আপনার হাওয়া-বাতাস গায়ে লাগলেও উপকার আছে৷ তাই রোজই, আপনি যখন আর পাঁচজনের মতো বাজার করতে বেরোন তখন আমি আপনার পিছু নিই৷'
'কারও পিছু নেওয়া যে অভদ্রতা সেটা নিশ্চয়ই জানেন!'
'যে আজ্ঞে৷'
'এরজন্য আপনাকে আমি পুলিশে দিতে পারি তা জানেন?'
'পারেন বই কী৷ মানগণ্য লোক আপনি, পুলিশকে ডাকলে তারা ধেয়ে আসবে৷ উটকো লোক আমি, কী উদ্দেশ্যে ফলো করছি এটাও তো ভাববার কথা৷'
'যাকগে, আমি পুলিশ ডাকছি না৷ আপনিও আর ফলো করবেন না৷'
'আজ্ঞে৷ তবে কিনা ওই কুকুরটাও কিন্তু রোজই আপনাকে ফলো করে৷'
'কুকুরটা কেন ফলো করে তা আমি জানি না, তবে তার উদ্দেশ্য ততটা সন্দেহজনক নাও হতে পারে৷'
'যে আজ্ঞে৷ আপনি বিবেচক মানুষ৷'
'আপনার কি আর কিছু বলার আছে?'
'তেমন কিছু নয়৷ না বললেও চলে৷ আপনার হাতে হয়তো এত সময়ও নেই৷ ব্যস্ত মানুষ আপনি, বাজার করে এসে চাট্টি খেয়েই হয়তো অফিসে রওনা হবেন৷ আজ অবশ্য শনিবার, আপনার ছুটি৷ তা হলেও হয়তো বিকেলের ফ্লাইটে সিঙ্গাপুর বা লন্ডন যাওয়ার আছে, কিংবা নিদেন দিল্লি-টিল্লি৷'
'সিঙ্গাপুর৷ খবর-টবর রাখেন দেখছি৷'
'কী যে বলেন! হোমরাচোমরা মানুষরা যা করেন তাই খবর৷ এমনকী হেমন্ত আগরওয়ালের সঙ্গে পার্টিতে একটু আবডাল হয়ে কথা বললেও খবর, কিংবা দুবাইয়ের নটবরলালের সঙ্গে চোখাচোখি হলেও খবর৷'
'অ্যাঁ! কী কী বললেন?'
'আজ্ঞে, ও কিছু নয়৷ বড্ড বেশি কথা বলে ফেলি বলে আমার গিন্নিও আমাকে প্রায়ই বকাঝকা করেন৷ আমাদের কথার দামই বা কী বলুন৷'
'দাঁড়ান, দাঁড়ান, বেশি কথা বলেন বটে, কিন্তু হেমন্ত আগরওয়াল বা নটবরলালের নাম তো আপনার জানার কথা নয়!'
'বলেন কী বলাইবাবু! এ নামে কি সত্যিকারের কেউ আছে নাকি? আমি তো জিভের ডগায় যা এল বলে ফেললাম৷'
'না মশাই না! ব্যাপারটা এখন আমার কাছে অতটা সোজা মনে হচ্ছে না! ধর্মদাসবাবু একটু ঝেড়ে কাশুন তো৷'
'এই দেখো ফ্যাসাদ৷ কী বলতে কী বলে ফেলেছি, আপনি হয়তো আমার ওপর অসন্তুষ্ট হলেন৷ বড়ো মানুষরা রেগে গেলে যে আমাদের মতো চুনোপুঁটিদের ঘোর বিপদ!'
'ধর্মদাসবাবু, ব্যাপারটা একটু সিরিয়াস কিন্তু৷'
'না না বলাইবাবু, আমি আসলে আপনার ভালোর জন্যই বলতে এসেছিলাম যে, আপনি একজন গণ্যমান্য লোক, আপনার কোনো অসোয়াস্তির কারণ ঘটুক এটা আমি চাই না৷'
'অসোয়াস্তিটা কীসের?'
'এই যে ওই কুকুরটা আর আমি আপনাকে রোজ ফলো করি, কিন্তু আপনি তা টের পান না এটা যেমন অসোয়াস্তি তেমনি এই আমাদের মতো আরও জনা দুই আপনার পিছু নেয় রোজ৷ একজন ওই যে পানের দোকানে দাঁড়িয়ে পান খাচ্ছে, মোটা মতো, ধুতি আর শার্ট পরা৷ আর একজন ওই যে, দেওয়ালে পোস্টার পড়ছে, লম্বা রোগামতো!'
'আশ্চর্য! ওরা আমাকে রোজ ফলো করে, ঠিক জানেন?'
'আজ্ঞে৷ তবে হয়তো ওরা চাকরির উমেদার, কিংবা টেন্ডার দিতে চায়, কিংবা হয়তো কোনো ধান্দা আছে৷ কিংবা এও হতে পারে ওদের কোনো উদ্দেশ্যই নেই৷'
'না মশাই, ভাবিয়ে তুললেন৷'
'আপনাদের তো এমনিতেই ভাবনাচিন্তার অবধি নেই৷ সর্বদাই নানারকম সমস্যার মোকাবিলা করছেন৷ বড়ো কোম্পানি হলে যা হয় আর কি৷ তাই আমি ভাবলাম, বলাইবাবুর মতো একজন মহান মানুষকে সবদিক দিয়ে রক্ষা করাই আমাদের কর্তব্য৷ বিশেষ করে এখন হয়তো আপনি ত্রিশ-বত্রিশ কোটি টাকার একটা ডিল নিয়ে ভারি ভাবনায় আছেন, হয়তো বড়ো বড়ো নানা ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন, হয়তো দু-তিনটে শত্রু কোম্পানি আপনাকে নানাভাবে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে৷ সবসময়ে যাকে এতসব সমস্যা নিয়ে ভাবতে হয় তার কি এসব ছোটোখাটো ব্যাপারে নজর থাকে!'
'দাঁড়ান মশাই, দাঁড়ান৷ ত্রিশ-বত্রিশ কোটি টাকার ডিলের কথা আপনি জানলেন কী করে, এবং আর যা যা বললেন সেগুলোও তো খুব একটা আন্দাজে ঢিল ছোড়া নয়৷ ধর্মদাসবাবু, আপনি আসলে কে বলুন তো?'
'আজ্ঞে আমি একজন হোমিয়োপ্যাথ এবং জ্যোতিষী, বলিনি আপনাকে?'
'বলেছেন, কিন্তু সেটা বিশ্বাসযোগ্য নয়৷'
'আমাকে বিশ্বাস করা উচিতও নয়৷ আমি প্রয়োজনে এবং অপ্রয়োজনেও মিথ্যে কথা বলে থাকি৷ তবে কিনা মিথ্যে কথার ফাঁকে ফাঁকে দু-চারটে সত্যি কথাও ঢুকে যায়৷ চালে কাঁকড়ের মতোই আর কি! যেগুলো বেছে বের করা মুশকিল৷'
'আপনি কী চান স্পষ্ট করে বলবেন?'
'ওরে বাপ রে! আপনার কাছে চাইবার মতো মুখ বা যোগ্যতা কোনোটাই কি আমার আছে? জানি, আপনি এক মহান মানুষ৷ চাইলেই দিয়ে ফেলবেন৷ কিন্তু দেখুন, চাওয়ার জন্যও বুকের পাটা লাগে৷ আমাদের মতো নগণ্য মানুষের তো ওটারই অভাব কিনা৷'
'নগণ্য কিনা জানি না, তবে আপনি অতি বিপজ্জনক লোক৷'
'কী যে বলেন বলাইবাবু! বিপজ্জনক হতে গেলেও কিছু এলেম চাই৷ আমাকে তো বাড়ির বেড়ালটাও গ্রাহ্য করে না৷ সংসারে আমার কোনো সম্মান নেই৷ ছেলেপুলেদের শাসন করার মতো ব্যক্তিত্ব নেই৷ আর সেইজন্যই দেখুন না, ছেলেটাকে কত করে বললাম, ওরে, চাকরি-বাকরির যা বাজার, একটা লাইন ধর৷ তা সে বাপের কথা গ্রাহ্যই করল না৷'
'ছেলে বেকার বুঝি!'
'বেকার বলে বেকার! বসে বসে বাপের অন্ন ধ্বংস করছে৷'
'কী পাশ করেছে বলুন তো?'
'সে আর বলবেন না৷ টেনেমেনে ইংরেজিতে এম.এ. করেছে৷ আর একটু কম্পিউটার নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে আর কি!'
'ঠিক আছে, কাল সকাল দশটায় সে যেন আমার অফিসে গিয়ে দেখা করে৷'
'না, না, সেটা কি উচিত কাজ হবে? আপনি ব্যস্ত মানুষ৷'
'আপনি কি জানেন যে, আপনি অতি ঘোড়েল লোক!'
'কেউ কেউ বলে বটে কথাটা৷ ভাবি বড়ো বড়ো ঘোড়েলদের তুলনায় আমি তো নস্যি৷ চারদিকে চেয়ে দেখুন না, ঘোড়েলদের কী রমরমা, ঘোড়েলরাই দেশ চালাচ্ছে, তারাই ব্যাবসাবাণিজ্য সামলাচ্ছে, তারাই পাঁচজনের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে৷ উঁচু জাতের ঘোড়েল হলেও নাহয় কথা ছিল৷'
'বুঝেছি, আর আত্মগ্লানিতে ভুগবেন না ধর্মদাসবাবু৷ আপনার ছেলের চাকরিটা হয়ে যাবে৷'
'আপনি মহান মানুষ বলাইবাবু৷'
'যে আজ্ঞে ধর্মদাসবাবু৷'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন