মোল্লারহাটের নেমন্তন্ন

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ট্রেন থেকে নেমে মাইল দুই হেঁটেছেন আশুবাবু৷ আশ্বিনের শেষ, রোদ তেমন তেজালো নয়, আর মাথায় ছাতা ছিল বলে গরমে তেমন হাপশে পড়েননি ঠিকই, কিন্তু বিষ্টুপুরের বটতলা অবধি এসে মনে হল, নাঃ, একটু না জিরোলেই নয়৷ আরও মাইল দুই পথ বাকি আছে বলে আন্দাজ৷ সেই বাকি রাস্তাটায় তেমন জনবসতি নেই বলেই যেন হরেকেষ্ট বলেছিল৷

এই হল বিষ্টুপুরের বিখ্যাত বটতলা৷ বেশ জমাটি জায়গা৷ দোকানপাট আছে৷ লোকজনের যাতায়াত আছে৷ আশুবাবু টিউবওয়েল থেকে জল খেয়ে বটতলার বাঁধানো জায়গায় বসে হাঁফ ছাড়লেন৷ দিব্যি বাতাস লাগছে ফুরফুর করে৷ শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে৷ লোকজন বিষয়কর্মে ব্যস্ত৷ দুটো লজঝড়ে বাস ধুলো উড়িয়ে কোথায় যেন চলে গেল৷

এ হল চৌপথী৷ এখান থেকে কোনো একটা রাস্তা মোল্লারহাট হয়ে মুনসিগঞ্জ পর্যন্ত গেছে৷ আগে নাকি বাস চলত৷ তবে গত বর্ষায় রাস্তা ভেঙে পোল ভেসে গিয়ে গাড়িঘোড়া বন্ধ, এখন শ্রীচরণ ভরসা৷

পাশে বসা একটা লোক ঝিমোচ্ছিল৷ আশুবাবু তাকেই বেশ মোলায়েম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'অ মশাই, বলি শুনছেন!'

'বলে ফেলুন৷'

'এখান থেকে মোল্লারহাট কোন রাস্তাটা গেছে বলুন তো৷'

লোকটা চোখ চেয়ে আশুবাবুকে বড়ো বড়ো চোখে একবার ভালো করে দেখল৷ তারপর বলল, 'কেন, মোল্লারহাটে কী দরকার?'

'আমি সেখানে যাব যে!'

লোকটা নির্বিকারভাবে বলে, 'মোল্লারহাট কেউ যায় না মশাই!'

'সে কী? সেখানে যে আমার এক আত্মীয়ের বাড়ি৷'

'অ৷ তা আত্মীয়টি কে?'

'আমার এক দূর সম্পর্কের ভাগনে৷'

'জানেন তো যম, জামাই, ভাগনা, তিন নয় আপনা৷'

আশুবাবু লোকটার ওপর ভারি চটে গিয়ে বললেন, 'বলতে না চাইলে বলবেন না৷ তা বলে ভাগনের নিন্দে করছেন কেন?'

লোকটা একটা প্রকাণ্ড হাই তুলে বলে, 'মোল্লারহাটে কারও ভাগনে থাকে বলে কখনো শুনিনি মশাই৷'

'কেন, মোল্লারহাটে ভাগনে থাকলে দোষটা কী?'

'গুণের কথাও নয় কিনা৷'

'তার মানে?'

'যার ভাগনে মোল্লারহাট থাকে তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার৷'

'কেন মশাই?'

'সত্যি কথা শুনতে চান?'

'কেন চাইব না?'

'শুনলে সহ্য করতে পারবেন তো?'

আশুবাবু ধুতির খুঁটে কপালের ঘাম মুছে দুর্বল গলায় বললেন, 'এমন কী কথা মশাই? আমার যে একটু ভয় ভয় করছে৷'

'না শুনেই ভয় করছে? আসল কথা শুনলে তো দাঁতকপাটি লেগে মূর্ছা যাবেন৷ এখন ভালো করে ভেবে বলুন আসল কথা শুনতে চান কি না৷ নইলে ধুলোপায়েই বিদেয় নিয়ে যেখান থেকে এসেছেন সেখানেই ফিরে যান৷'

আশুবাবু খুব দমে গেলেন৷ তিনি অতিশয় ভীতু মানুষ৷ খানিকক্ষণ গুম হয়ে থেকে বললেন, 'অনেক দূর থেকে এসেছি, ধকল বড়ো কম হয়নি৷ এসপার-ওসপার যাই হোক বলে ফেলুন৷'

'শুনবেন তাহলে?'

'শুনব৷'

'না, আপনাকে দেখলে নিতান্তই গোবেচারা মনে হয় বটে, কিন্তু আপনার বুকের পাটা আছে৷'

আশুবাবু একথায় ভারি খুশি হয়ে একটু হাসলেন৷ বললেন, 'এই তো গত চোত মাসে হরিহরপুরের গাজনের মেলায় আমি একজন মুরগিচোরকে হাতেনাতে ধরে ফেলেছিলাম৷'

লোকটা অবাক চোখে তাঁর দিকে চেয়ে বলল, 'ও বাবা, মুরগিচোর ধরা তো চাট্টিখানি কথা নয় মশাই; যে মুরগিচোর ধরতে পারে সে তো বাঘ-সিংহীও মারতে পারে৷ তা একাই ধরলেন নাকি?'

আশুবাবু লজ্জা পেয়ে বললেন, 'একরকম একাই বলতে পারেন৷ তবে আরও পাঁচজন একটু হাত লাগিয়েছিল আর কি৷'

'তাতে আপনার গৌরব কিছুমাত্র কমেনি৷ শাস্ত্রেই তো বলেছে, দশে মিলি করি কাজ, হারি-জিতি নাহি লাজ৷ তা আপনিই প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বুঝি মুরগিচোরটার ওপর৷'

আশুবাবু ভারি বিনয়ের সঙ্গে মাথা চুলকে বললেন, 'একরকম তাই৷ তবে ঝাঁপ দিতে একটু দেরি করে ফেলায়, ওই পাঁচজনই আগে ঝাঁপ দিয়ে ফেলে৷'

'তাতে কী? ওতেও প্রমাণ হয় যে আপনি একজন নির্ভীক মানুষ৷ অকুতোভয়৷ নাঃ, আপনাকে দেখে আমার ভারি শ্রদ্ধা হচ্ছে৷ দেশে আজকাল ডাকাবুকো লোকের বড়োই অভাব৷'

আশুবাবু বললেন, 'তা ইয়ে, মোল্লারহাটের কথা কী যেন বলছিলেন, এদিকে আবার বেলাও হয়ে যাচ্ছে কিনা৷'

'বলব মশাই বলব৷ দু-দণ্ড একটু বসুন৷ আপনার মতো প্রাঃতস্মরণীয় মানুষের সঙ্গ যতটা পারি করে নিই৷ এমন সুযোগ আর কি পাওয়া যাবে!'

একথা বলার পর লোকটার আবার একটু ঢুলুনির মতো এল৷ তারপর হাই তুলে বলল, 'হ্যাঁ, কী যেন বলছিলেন!'

'আজ্ঞে, মোল্লারহাটের রাস্তাটা৷'

'তাহলে মোল্লারহাটে আপনি যাবেনই? নাকি আরও একটু ভেবে দেখবেন৷'

আশুবাবু দোনোমোনো করে বললেন, 'সেটা কি খুবই বিপদের জায়গা মশাই?'

লোকটা ফস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'বিপদ বললে তো কিছুই বলা হল না, সে হল প্রাণঘাতী জায়গা৷ পাঁচজনকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, সেখানে গিয়ে কেউ প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছে কি না৷'

'ও বাবাঃ, তাহলে লোকে সেখানে বসবাস করে কী করে?'

'কে বলল বসবাস করে? খোঁজ নিলেই দেখতে পাবেন সেখানে যারা বসবাস করে তারা কেউ মানুষ নয়!'

'অ্যাঁ, বলেন কী?'

'তাদের অ্যাই বড়ো বড়ো নখ, অ্যাই বড়ো বড়ো দাঁত, ভাঁটার মতো চোখ৷ তারা মানুষের রক্ত শুষে খায়৷'

আশুবাবু কাহিল গলায় বললেন, 'এরকম কথা তো কই হরেকেষ্ট আমাকে বলেনি!'

'হরেকেষ্ট কে?'

'আমার ভাগনে৷'

'মোল্লারহাটের একটা গাছকেও বিশ্বাস করবেন না মশাই৷ পাঁচজনকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, সবাই জানে, মোল্লারহাটের গাছ, গোরু, ছাগল সবাই মিথ্যে কথা বলে৷'

'অ্যাঁ!' বলে খুবই ভাবিত হয়ে পড়লেন আশুবাবু৷ তার যেন কেমন একটা শীত শীত করতে লাগল৷

লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'ঠ্যাঙাড়ে, ডাকাত, খুনে, গুন্ডা, বজ্জাত, ফেরেববাজ মোল্লারহাটে গিজগিজ করছে৷ দেখবেন সেখানে গাছে গাছে নরমুণ্ড ঝুলে আছে, পথে পথে পড়ে আছে করোটি আর হাড়গোড়৷ সেখানকার কামারশালায় দিনরাত তৈরি হচ্ছে, রাম দা, ছোরাছুরি, হেঁসো, মোল্লারহাটের মুদির দোকানে চাল-ডালের সঙ্গে বন্দুক, পিস্তল বিক্রি হয়৷ সেখানকার লোক বাইরের মানুষ দেখলেই পিছন থেকে মাথায় মুগুর বসিয়ে দেয়৷'

আশুবাবুর গলা বসে গিয়েছিল৷ বারবার গলা খাঁকারি দিয়ে তবে স্বর বেরোল৷ খুবই ক্ষীণ স্বর৷ বললেন, 'অথচ সেখানে আজ আমার এক ভাগনির বিয়ে৷ হরেকেষ্ট নেমন্তন্ন করে গেছে৷ এখন করি কী বলুন তো৷ যাওয়ার জন্য বহু ঝোলাঝুলি করে গেছে যে?'

লোকটা উদাস গলায় বলল, 'তা যাবেন যান৷ কিন্তু বিয়েবাড়ি পৌঁছোতে পারবেন কি না দেখুন!'

শীত শীত ভাবটা উবে গিয়ে আশুবাবুর এখন ঘাম হতে লেগেছে৷ কপালটা ধুতির খুঁটে মুছে নিয়ে বললেন, 'আপনি দেখছি মোল্লারহাটের সব খবরই রাখেন৷'

'তা আর রাখব না! ওই মোল্লারহাটেই তো আমার বউ আর ছেলে-মেয়ে কয়েদ হয়ে আছে কিনা৷'

'কয়েদ? কে কয়েদ করে রেখেছে তাদের?'

'ছয় ফুট লম্বা, দৈত্যের মতো চেহারার একটা লোক৷ তার আশি ইঞ্চি বুকের ছাতি, মুগুরের মতো হাত, কথা কইলে মনে হয় বাজ ডাকছে৷'

'এ তো ভারি অন্যায় কথা! তা থানা-পুলিশ করলেন না কেন?'

ফের দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লোকটা বলল, 'তার উপায় নেই যে!'

'কেন উপায় নেই কেন?'

'লোকটা যে আমার শ্বশুর৷'

'শ্বশুর! বলেন কী? মোল্লারহাটে আপনার শ্বশুরবাড়ি নাকি?'

'তবে আর বলছি কী? বারো বছর ধরে ঘরজামাই আছি মশাই, কোনোদিন জামাই আদর পেয়েছি বলে কেউ বলতে পারবে না৷ উপরন্তু শ্বশুরমশাইয়ের ফাইফরমাশ খাটা, খেতের কাজকর্ম দেখা, মুনিষ খাটানো, হিসেবপত্তর রাখা, মামলা-মোকদ্দমার তদবির করা, কী করতে হয় না বলুন তো! তাও কি শ্বশুরের মন ওঠে? দোষের মধ্যে একদিন একটু পয়সায় টান পড়েছিল বলে শাশুড়ির রুপোর পানের ডিবেটা বিষ্টুপুরের চরণ দাসের দোকানে বেচে দিয়েছিলাম বলে শ্বশুরমশাই জুতোপেটা করে তাড়ালেন৷ গতকাল থেকে এই বটতলায় বসে আছি মশাই, দানাপানিটুকু পর্যন্ত জোটেনি৷ কেউ খোঁজটুকু অবধি করেনি এখন অবধি৷'

আশুবাবু একটা নিশ্চিন্তির শ্বাস ছেড়ে বললেন, 'অ তাই বলুন৷ সেই জন্যই এতক্ষণ মোল্লারহাটের নিন্দেমন্দ করছিলেন?'

লোকটা একটা আড়মোড়া ভেঙে বলল, 'তা ইয়ে হয়েছে৷'

'কী হয়েছে?'

'ফস করে একটা কথা মনে পড়ে গেল৷'

'আবার কী কথা?'

'মনে পড়ে গেল যে, হরেকেষ্ট হল আমার শালা৷ আর আজ আমার শালি আন্নাকালীর বিয়ে৷'

'অ্যাঁ৷ তাহলে আপনি হরেকেষ্টর ভগ্নীপতি হন! কী আশ্চর্য!'

লোকটা বিরস মুখে বলল, 'হরেকেষ্টর ভগ্নীপতি হওয়া এমন কিছু গৌরবের ব্যাপার নয় যে, অবাক হতে হবে৷ তা বলছিলাম কী, মোল্লারহাটের রাস্তা আপনাকে এক শর্তে দেখিয়ে দিতে পারি৷'

'শর্তটা কী?'

'আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে৷ গিয়ে আমার শ্বশুরমশাইকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঠান্ডা করে যদি . . .'

আশুবাবু উঠে পড়লেন৷ বললেন, 'বুঝেছি, বুঝেছি! এ আর শক্ত কাজ কী? চলুন মশাই, চলুন৷ হরেকেষ্টর বাবা সুধাংশুবাবু আমার ভগ্নীপতি৷ অতি সজ্জন মানুষ৷ আমার সঙ্গে তাঁর খুবই সদ্ভাব ছিল একসময়৷ অনেকদিন যোগাযোগ নেই, এই যা৷ কিন্তু তাঁর কোনো ঘরজামাই আছে বলে তো শুনিনি৷'

'সব কি আর আপনাকে জানিয়েছে?'

'তা আপনি ঘরজামাই হয়ে আছেন কেন? নিজে কিছু করেন না?'

বিরস মুখে লোকটা বলে, 'করি না কে বলল?'

'কী করেন?'

'সাতপুরার নাম শুনেছেন? আমি সেখানকার দারোগা৷'

'অ্যাঁ! তবে যে বললেন ঘরজামাই৷'

'তাও একরকম বলতে পারেন৷ ঘন ঘন যাতায়াত তো করতে হয়৷ শ্বশুরবাড়িতে বেশি যাতায়াত করা মানে একরকম ঘরজামাইয়ের মতোই ব্যাপার৷'

'আর পানের বাটা চুরি! সেটা কে করল?'

লোকটা ফের একটা হাই তুলে হাঁটতে হাঁটতে বলল, 'সেই সকাল থেকে বিষ্টুপুরের বটতলায় আপনার জন্যে বসে আছি মশাই৷ শ্বশুরমশাই বললেন, বাবা, তোমার হল দারোগার চোখ, আশুকে দেখলেই তুমি চিনতে পারবে৷ তাকে পথ চিনিয়ে নিয়ে এসো তো৷ তাই বসে থেকে থেকে ঝিমুনি এসে গেল৷ তখনই গল্পটা ফেঁদে ফেললাম আর কি! ভালো হয়নি গল্পটা?'

'খুব ভালো, খুব ভালো৷'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%