গ্রহান্তরে

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

জীবনের ওপর ঘেন্না ধরে গেছে বরুণবাবুর৷ সকাল থেকে গভীর রাত্রি অবধি খেটেখুটে যা আয় হয় তাতেও সংসারটা ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না৷ বাড়িতে নিত্য খিটিমিটি লেগেই আছে৷ ছেলেপুলেগুলো ঠিকমতো মানুষ হচ্ছে না৷ বাড়িওয়ালা বাড়ি ছাড়ার জন্য চোখ রাঙাচ্ছে৷ চাকরির জীবন প্রায় শেষ হয়ে এল৷ আয়ুও কি আর বেশিদিন আছে৷ বরুণবাবুর খুব ইচ্ছে করে সংসারের ঝামেলা থেকে বিদায় নিয়ে কোনো নির্জন জায়গায় গিয়ে শান্তিতে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে৷ তিনি টের পাচ্ছেন সংসারের ওপর তাঁর আর কোনো টান বা মোহ নেই৷ সারাদিনের শেষে বাড়ি ফিরতেও তাঁর ইচ্ছে করে না৷

দূরের একটা টিউশনি সেরে শেষ ট্রামে বাড়ি ফিরছিলেন বরুণবাবু৷ মনটা বড়োই খারাপ৷ বুড়ো হতে চললেন, অথচ জীবনে একটা দিনও সুখে বা শান্তিতে কাটিয়েছেন বলে মনে পড়ে না৷ নিজের ওপর, সংসারের ওপর, গোটা দুনিয়ার ওপর তাঁর বিরক্তি ধরে গেছে৷

ট্রাম ফাঁকা৷ একেবারেই ফাঁকা৷ শুধু আর একটা লোক র্যাপার মুড়ি দিয়ে সামনের সিটে বসা৷ আর কেউ নেই৷

হঠাৎ লোকটা ফিরে তাকিয়ে বলল, 'কেমন আছেন বরুণবাবু?'

আর যাই হোক বরুণবাবুর স্মৃতিশক্তি খুবই ভালো৷ লোকটা রীতিমতো সুপুরুষ, বয়সও কম, চব্বিশ-পঁচিশের মধ্যেই হবে৷ কিন্তু লোকটাকে বরুণবাবু কিছুতেই চিনতে পারলেন না৷

ভদ্রতা করে বললেন, 'চলে যাচ্ছে কোনোরকমে৷ কিন্তু আপনাকে তো ঠিক-'

লোকটা ঝকঝকে দাঁত দেখিয়ে হাসল, 'চিনতে পারছেন না তো! চেনার কথাও নয়৷ আপনি জীবনে এই প্রথম আমাকে দেখছেন৷'

বরুণবাবু অবাক হয়ে বললেন, 'তাহলে-'

লোকটা বলল, 'আমিও আপনাকে চিনতাম না৷ এই ট্রামেই আমাদের প্রথম দেখা হল৷'

'তাহলে আমার নামটা জানলেন কী করে?'

লোকটা তেমনি হাসি হাসি মুখে বলে, 'সেটাও শক্ত কিছু নয়৷ চেষ্টা করলেই পারা যায়৷ আপনি যে বরুণ সরকার সেটা অহরহ তো আপনার মনের মধ্যে ভুরভুরি কাটছেই৷ সেই স্পন্দনটা ধরতে পারলেই হল৷'

বরুণবাবু অবাক হয়ে বললেন, 'অ্যাঁ! স্পন্দন ধরতে পারলেই হল! সেটাই কি খুব সহজ কাজ?'

লোকটি হেসে বলল, 'চেষ্টা করলেই সহজ৷ অভ্যাসে কী না হয় বলুন৷'

'আপনি কি থট-রিডার?'

লোকটা ভ্রূ কুঁচকে বলল, 'কথাটা মন্দ বলেননি৷ ওরকমই ধরে নিতে পারেন৷'

বরুণবাবু একটু আগ্রহের সঙ্গে বললেন, 'আচ্ছা আমি এখন কী ভাবছি তা বলতে পারেন?'

'পারি৷ আপনি আমার সম্পর্কে ভাবছেন, হুঁ-হুঁ বাবা তুমি একখানি আস্ত বুজরুক৷'

'ও বাবা! আপনি তো সাংঘাতিক লোক দেখছি!'

'বললাম তো অভ্যাসে সব হয়৷ এইমাত্র আপনি ফুলকপির পোড়ের ভাজা আর সোনা মুগডালের কথা ভাবলেন ... এইমাত্র ভাবলেন আপনার চলে-যাওয়া ছেলে ছোটকুর কথা ... এইমাত্র ভাবলেন ...'

'থাক থাক, আর বলতে হবে না৷ আপনার ঠিকানাটা একটু দিন তো৷ সময় করে আপনার সঙ্গে একদিন বসতে হবে৷ আপনি যখন এত জানেন তখন আপনার কাছ থেকে কিছু জেনে নিতে হবে৷ কোথায় থাকেন আপনি?'

লোকটা মিটিমিটি হাসল, 'আমার ঠিকানা খুঁজে বের করা খুবই কঠিন৷ আমি অনেক দূরে থাকি৷ যদি যেতে চান তো আমিই নিয়ে যাব আপনাকে৷'

'কলকাতা শহরটা আমি টিউশনি করে হাতের তেলোর মতো চিনি৷ এই তো খিদিরপুর থেকে ফিরছি৷'

'কলকাতা চিনলে তো হবে না৷ আমি যে অনেক দূরের লোক৷'

'কত দূরের?'

'আপনাদের হিসেবে অন্তত আড়াই হাজার লাইট ইয়ার৷'

'দূর মশাই, আপনি এবার গুল মারতে শুরু করেছেন৷ ঠিক আছে ঠিকানা না হয় না-ই বললেন, দেখা তো হতে পারে আমাদের৷'

লোকটি মাথা নেড়ে বলে, 'আমি এই সামনে ময়দানে নেমে যাব৷ আর দেখা হওয়ার সুবিধে নেই৷'

'ময়দানে নামবেন! সেখানে কী আছে?'

'সেই কথাই তো বলতে চাইছি৷ আপনার তো আর সংসার-টংসার ভালো লাগছে না, তাই না?'

'আজ্ঞে না৷'

'বেঁচে থাকার আনন্দটাই আর তেমন টের পাচ্ছেন না!'

'না৷ কিন্তু-'

'দাঁড়ান৷ আমি সব জানি৷ আপনাকে তাই একটা প্রস্তাব দিচ্ছি৷ বেশ চটপট জবাব দেবেন৷'

'আজ্ঞে সে আর বলতে!'

'ধরুন যদি আমি আপনার বয়স কমিয়ে দিই, যদি অমর করে দিই, শরীরটা যদি সুস্থ করে দিই, তাহলে কেমন হয়?'

'ঃউ মশাই, এ তো স্বপ্নের কথা বলছেন৷'

'স্বপ্ন নয়৷ সত্যি৷ আমরা ময়দানে পৌঁছে গেছি৷ শুভস্য শীঘ্রম৷ নেমে পড়ুন৷'

বরুণবাবু একটু দ্বিধা করলেন৷ নামিয়ে ছিনতাই করবে না তো!

লোকটা বলল, 'আপনার পকেটে ছ-টাকা পঁচাত্তর পয়সা আছে৷ হাতঘড়িটা পুরোনো, ওটা বেচলে পঁচিশ টাকাও পাওয়া যাবে না৷ জীবন তার চেয়ে অনেক মূল্যবান৷ নেমে পড়ুন৷'

বরুণবাবু নেমে পড়লেন৷ লোকটা আজগুবি কথা বলছে বটে, কিন্তু একবার এই গুলবাজকে একটু বাজিয়েই দেখা যাক না৷

ময়দানে বেশ ঘোর অন্ধকার৷ কুয়াশা চেপে পড়েছে৷ লোকটা একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পকেট থেকে রিমোট কন্ট্রোলের মতো একখানা জিনিস বের করে বোতাম টিপতেই সামনে একখান ডিমের মতো দেখতে মোটরগাড়ির মতো জিনিস দেখা গেল৷ একখানা অ্যাম্বাসাডার গাড়ির চেয়ে বেশি বড়ো নয়৷

বরুণবাবু সভয়ে বললেন, 'এটা কী?'

'আমরা বলি মনোরথ৷ আলোর গতির চেয়ে মনের গতি অনেক বেশি৷ এক লহমায় কোটি কোটি লাইট ইয়ার পেরিয়ে যেতে পারে৷ আমাদের এ গাড়িও তাই৷'

'বলেন কী মশাই! ইয়ার্কি মারছেন না তো!'

'ইয়ার্কি হলে না হয় কান মলে দেবেন৷ আসুন৷'

লোকটা কলকাঠি নেড়ে একটা দরজা খুলল৷ ভিতরে বিশেষ যন্ত্রপাতি দেখা গেল না৷ বসার জন্য বেশ আরামদায়ক গদি আছে৷ শীত বা গরম কিছুই লাগছে না৷'

'বরুণবাবু, আপনার খিদে পায়নি তো?'

'আজ্ঞে না৷'

'পেলেও একটু চেপে রাখুন৷ একেবারে পৌঁছে খাবারের ব্যবস্থা হবে৷'

বরুণবাবু দুশ্চিন্তায় একটু ঘামতে লাগলেন৷

কোনো ঝাঁকুনি লাগল না, শব্দও হল না৷ তবে শরীরটা হঠাৎ খুব হালকা লাগতে লাগল বরুণবাবুর৷ লোকটা মুখোমুখি বসে হাতের ছোট্ট যন্ত্রটা নিয়ে কী সব যেন করছে৷

বরুণবাবু বাইরের দিকে চাইলেন৷ যা দেখলেন তাতে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল৷ ঘোর অন্ধকার আকাশে বিশাল বড়ো বড়ো সব সূর্য দেখা যাচ্ছে, সাঁ সাঁ করে পেরিয়ে যাচ্ছে আশপাশ দিয়ে৷

লোকটা একটু হেসে বলল, 'আমরা এক সেকেন্ডেই পৌঁছে যেতে পারতাম৷ ইচ্ছে করেই একটু নীহারিকাটা পাক দিয়ে নিলাম৷ এসে গেছি৷'

শরীরটা আবার স্বাভাবিক লাগল বরুণবাবুর৷ লোকটা দরজা খুলে বলল, 'আমাদের গ্রহ আপনাকে স্বাগতম জানাচ্ছে বরুণবাবু৷ আসুন৷'

বরুণবাবু নামলেন৷ নেমেই টের পেলেন, পরিষ্কার বাতাসে তাঁর বুক ভরে গেল৷ অনেক তরতাজা লাগছে নিজেকে৷ চারদিকে চেয়ে দেখলেন, বাড়িঘর কিছুই দেখা যাচ্ছে না৷ রাস্তাঘাটও নয়৷ চারদিকে শুধুই নিবিড় জঙ্গল৷ আকাশে দু-দুটো চাঁদ, তার আলোয় চারদিকটা জ্যোৎস্নায় একেবারে ভেসে যাচ্ছে৷ বিশাল বড়ো বড়ো গাছ যেন মেঘ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ তাদের গায়ে মোটা মোটা লতা পাকিয়ে উঠেছে৷ সুন্দর ফুলের গন্ধে ম-ম করছে বাতাস৷

বরুণবাবু বললেন, 'এ তো দেখছি শুধুই জঙ্গল৷'

লোকটা মাথা নেড়ে বলে, 'ওপরটা আমরা জঙ্গলের আবরণই রেখে দিয়েছি৷ তাতে আবহমণ্ডল সুস্থ থাকে৷ বন্যজন্তুরও অভাব নেই৷ আমরা থাকি ভূগর্ভে৷'

'এখানে দেখছি শীত নেই৷'

'না৷ শীত গ্রীষ্ম কিছুই নেই৷ সবসময়েই বসন্তকাল৷ তবে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়৷'

'এসব গাছপালা কি পৃথিবীর মতোই?'

'না৷ তবে তুলসী, নিম এরকম কিছু গাছ এখানেও পাবেন৷ আর সব অন্যরকম৷'

'আচ্ছা, আমি তো পৃথিবী থেকে আসছি, আমার কোনো ইনফেকশানের ভয় নেই তো এখানে?'

লোকটা হাসল, 'না৷ কারণ মনোরথের মধ্যেই আপনাকে সূক্ষ্ম রশ্মি দিয়ে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে৷ আর আমাদের এই গ্রহে কোনো ক্ষতিকারক জীবাণুই নেই৷ এখানে কারও কখনো কোনো অসুখ করে না৷'

'কক্ষনো না?'

'না বরুণবাবু৷ আমরা সম্পূর্ণ রোগমুক্ত৷ আমাদের কোনো হাসপাতাল নেই৷ ওষুধ তৈরি হয় না৷'

বরুণবাবু উত্তেজিত হয়ে বলেন, 'কিন্তু হার্ট অ্যাটাক হলে?'

'তাও হয় না৷ আমার চল্লিশ হাজার তিনশো একানব্বই বছর বয়সে কখনো কোনো অসুখবিসুখ হয়নি৷'

'অ্যাঁ! কত বললেন?'

'চল্লিশ হাজার তিনশো একানব্বই বছর, আপনাদের হিসেবে৷ আমাদের এখানে অবশ্য এক বছর আপনাদের সাড়ে তিনশো বছরের সমান৷'

এই বলে লোকটা হাতের যন্ত্রটা টিপতেই পায়ের নীচে একটা আলোকিত সিঁড়ির মুখ খুলে গেল৷

নীচে সারি সারি প্রকোষ্ঠ৷ লম্বা লম্বা হলঘর৷ করিডোর৷ চলন্ত সিঁড়ি৷ চলন্ত মেঝে৷ সব ঝকঝক তকতক করছে৷ কাচের আড়ালে দেখা যাচ্ছে অনেক মানুষ নানা ধরনের অদ্ভুত যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করছে৷

'আপনার নামটি কিন্তু আমাকে বলেননি স্যার৷'

'আমার নাম ধৃতি৷ আসুন, এই ঘর৷'

ঘরটা একটা কাচের বর্তুলাকাত চেম্বার৷ তাঁকে একখানা যন্ত্রের সামনে টুলের মতো জিনিসে বসিয়ে ধৃতি বলল, 'আপনার বয়সটা কমিয়ে দিচ্ছি৷ কত বছর বয়সে ফিরে যেতে চান?'

বরুণবাবু ভয়ে ভয়ে বললেন, 'পঁচিশ৷'

'ঠিক আছে৷' বলে ধৃতি একটা বোতাম টিপে তাড়াতাড়ি বাইরে গিয়ে চেম্বারের দরজাটা সেঁটে দিল৷

কোনো শব্দ নেই, কম্পন নেই৷ অথচ বরুণবাবু টের পাচ্ছেন তাঁর শরীরের ভিতরে কী যেন একটা হয়ে যাচ্ছে৷ তিনি বদলে যাচ্ছেন৷ মাত্র কয়েক সেকেন্ড পর তিনি বুঝতে পারলেন, প্রক্রিয়াটা থেমে গেছে৷ সামনে একটা ঘষা কাচের পর্দায় বাংলা অক্ষরে এই ক-টা কথা ফুটে উঠল, 'অভিনন্দন৷ আপনি এখন পঁচিশ বছরের যুবক!'

বরুণবাবু যন্ত্রকেই জিজ্ঞেস করলেন, 'আচ্ছা, আবার যখন বুড়ো হব তখন ফের বয়স কমানো যাবে কি?'

পর্দায় ফুটে উঠল, 'আর কখনোই পঁচিশের বেশি বয়স হবে না আপনার৷ যেমন আছেন তেমনই চিরকাল থাকবেন৷'

'চিরকাল বলতে?'

'চিরকাল বলতে চিরকাল৷ ইটারনিটি৷'

'উরেব্বাস৷ তাহলে কতদিন বাঁচব?'

'চিরকাল৷'

'হার্ট অ্যাটাক, ব্লাড প্রেশার, স্ট্রোক এসব হবে না?'

'কস্মিনকালেও নয়৷'

'খুব রিচ খাবার খেলেও নয়?'

'খাবার কেন খাবেন?'

'খাব না?'

'না৷ আপনার আর কখনো খিদেই হবে না৷'

'বলেন কী?'

'খিদে হবে না, ঘুম পাবে না, ক্লান্তি আসবে না৷'

'বটে! তাই তো আমার খিদের ভাবটা আর টের পাচ্ছি না, না?'

'কখনো পাবেন না৷'

'তাহলে পুষ্টি হবে কী করে?'

'শরীরের ক্ষয় না হলে পূরণেরই বা কী প্রয়োজন?'

'আচ্ছা জলতেষ্টা পাবে তো?'

'কেন পাবে?'

'বাথরুমও তো পাবে, তখন শরীরের জল বেরিয়ে যাবে না?'

'বাথরুমও পাবে না৷'

'বড়ো বাইরে বা ছোটো বাইরে কোনোটাই নয়?'

'না৷'

'ব্যায়াম করার দরকার আছে কি?'

'করতে পারেন, কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ নেই৷'

'আচ্ছা ধরুন কেউ যদি আমাকে গুলি করে, কি ছোরা মারে বা আমি যদি আগুনে পুড়ে যাই তাহলেও মরব না?'

'না৷ আমাদের বায়োনিক ল্যাবরেটরির অটোমেটিক মেশিন আবার আপনার সব কিছু নতুন করে দেবে৷ আপনি কিছুতেই মারা যেতে পারবেন না এখানে৷'

'ব্যথা তো লাগবে৷'

'তাও লাগবে না৷ ব্যথার স্নায়ু এখানে আনন্দের তরঙ্গ তোলে, ব্যথার নয়৷'

'ওরে বাবা! এ তো সাংঘাতিক কাণ্ড দেখছি!'

'কিছুই সাংঘাতিক নয়৷ খুব সোজা ব্যাপার৷'

'আমি কিন্তু ঘুমকাতুরে মানুষ৷'

'শুয়ে থাকতে পারেন, কিন্তু ঘুমোনো অসম্ভব৷'

'আর একটা কথা৷ পৃথিবীতে আমার বউ আর ছেলেপুলে, আত্মীয় আর বন্ধুবান্ধবেরা আছে, তাদের কথা তো আমার মনে পড়বে!'

'পড়বে৷ স্মৃতিঘর বলে একটা চেম্বার আছে৷ সেখানে গিয়ে আপনি ইচ্ছে করলে যেকোনো স্মৃতিকে মুছে ফেলতে পারবেন৷ আবার যেকোনো স্মৃতিকে জাগিয়েও তুলতে পারবেন৷ আপনার যা ইচ্ছা৷'

'মন যদি খারাপ হয়?'

'এখানে মন খারাপ হয় না৷ পাশেই আনন্দঘর আছে৷ সেখানে গিয়ে আনন্দের মাত্রাটা একটু বাড়িয়ে নেবেন, তাহলেই হবে৷'

'সবসময়ে আনন্দে থাকতে পারব?'

'অবশ্যই৷'

এ সময়ে দরজা খুলে ধৃতি ঘরে ঢুকল৷ বলল, 'বাঃ, এই তো যুবক হয়ে গেছেন৷'

'আচ্ছা, আমি যদি আর একটু সুপুরুষ হতে চাই?'

'কোনো বাধা নেই৷ আসুন৷'

এরপর ধৃতি তাঁকে বিভিন্ন ঘরে নিয়ে গিয়ে সুপুরুষ করে দিল৷ আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দিল৷ পৃথিবীর স্মৃতি খানিকটা আবছা করে দিল৷

সব হয়ে যাওয়ার পর বরুণবাবু বললেন, 'এবার কী হবে ধৃতি?'

'এখানে তো কিছুই হয় না৷'

'একটা কাজ-টাজ কিছু দেবে না?'

'কাজ অনেক আছে৷ সেগুলো সবই যন্ত্র-মানুষেরা করে৷ ইচ্ছে করলে আপনিও করতে পারেন৷'

'কিন্তু আমি যে ইঞ্জিনিয়ারিং জানি না৷'

'চিন্তা নেই৷' বলে আর একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং মস্তিষ্ক চালু করা হল বরুণবাবুর৷ তিনি দিব্যি কলকব্জার ব্যাপার বুঝতে শুরু করলেন৷

'যদি ডাক্তার হতে চাই?'

'তাও পারেন৷'

'কবি?'

'তাও৷'

'নাঃ, এ যে দেখছি সব পেয়েছির দেশ৷ এখানকার মানুষেরা তাহলে বেশ আরামেই আছে বলো! তোফা আছে!'

'মানুষ! এখানে মানুষই নেই৷'

'ওই যে কতজনকে দেখছি৷ কাজ-টাজ করছে৷'

'কেউ মানুষ নয়৷ সব যন্ত্রের তৈরি৷'

বরুণবাবু আঁতকে উঠে বললেন, 'বলো কী হে৷ মানুষ কি তাহলে তুমি একা! অ্যাঁ!'

ধৃতি একটু হেসে বলল, 'তাও নই৷'

'মানে?'

'আমিও মানুষ নই বরুণবাবু৷ যন্ত্র মাত্র৷ এই গ্রহে বহু লক্ষ বছর কোনো মানুষ নেই৷ একসময়ে ছিল৷ তারা আমাদের হাতে এই গ্রহ ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য গ্রহে, নীহারিকার ওপাশে অন্য নীহারিকায় চলে গেছে৷ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য আমাদের একজন মানুষ বড়ো দরকার ছিল৷ তাই আপনাকে আনা৷'

'অ্যাঁ!'

'ভয় পেলেন নাকি?'

'হ্যাঁ, আমার যে ভয় হচ্ছে৷'

'ওই একটা জিনিসকেই আমরা জানতে চাই৷ ভয়৷ মানুষের ভয়কে আমরা জয় করতে পারিনি৷ কেন পারিনি তা জানার জন্যই আপনাকে আনা৷'

বরুণবাবু হঠাৎ বিকট গলায় বললেন, 'তাহলে কি এই গ্রহে আমি একা একটা মানুষ!'

'আজ্ঞে হ্যাঁ৷'

'ওরে বাবা রে! আমি কিছুতেই এখানে থাকব না ... কিছুতেই না ... ও ভাই ধৃতি, শীগগির আমাকে আমার নোংরা পৃথিবীতেই দিয়ে এসো৷ রোগ-ভোগ বয়স মৃত্যু ওসব নিয়েই আমি থাকতে চাই ... ও ভাই ধৃতি, তোমার পায়ে পড়ি ...'

'এসপ্ল্যানেড আ গয়া বাবু৷ উঠিয়ে৷'

পটাং করে চোখ মেললেন বরুণবাবু৷ ট্রাম এসপ্ল্যানেডে এসে গেছে৷ চোখ কচলে তিনি চারদিকে চাইলেন৷ যা দেখছেন তা অতি সত্য৷ এ কলকাতাই বটে৷ তিনি পৃথিবীতেই আছেন৷

মস্ত একটা স্বস্তির শ্বাস ছাড়লেন তিনি৷ নেমে পড়লেন৷ মনটায় বড়ো আনন্দ হচ্ছে৷

শ্যামবাজারমুখো একখানা বাসে উঠে দেখলেন, বেশ লোকজন আছে৷ প্রথম যার সঙ্গে দেখা হল তাকেই আনন্দের চোটে বললেন, 'খুব বাঁচা বেঁচে গেছি মশাই৷'

লোকটা কিছু বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়ে রইল৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%