হারানো কাকাতুয়া

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ওই গবা পাগল বেরিয়েছে৷ গায়ে একটা সবুজ রঙের আলপাকার কোর্ট আর ঢোলা কালো রঙের পাতলুন৷ বড়ো বড়ো কটাশে চুল রোগাটে মাঝারি চেহারা৷ এক গাল দাড়ি, বিশাল মোচ৷ পায়ে খয়েরি রঙের ক্যাম্বিসের জুতো৷ হেঁকে বলছিল, 'কেয়াসমাস! কেয়াসমাস! বর্বর ছেলেরা দৌড়িয়া ফেরে৷ সরলরেখা কাকে বলে? দু-টি বিন্দুর মধ্যে ন্যূনতম দূরত্বই হচ্ছে সরলরেখা৷ এন এ সি এল ইজ সোডিয়াম ক্লোরাইড অ্যান্ড ইট ইজ কমন সলট৷ ভাস্কো ডা গামা ভারতবর্ষে আসে চোদ্দোশো আটানব্বই সালে . . . হেঁ হেঁ জানি বাবা, সব জানি৷'

সকাল বেলা হরিহরবাবু আর গদাধরবাবু বাজার করে ফিরছিলেন৷ গবা পাগলাকে দেখে হরিহরবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, 'ঃএ, আবার দেখি গবাটা উদয় হয়েছে! ছেলেপেলেগুলোর মাথা খাবে আবার!'

গদাধরবাবু একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, 'আপনার কথাটা মানতে পারছি না হরিহরবাবু৷ গবা পাগলা যে একজন ছদ্মবেশী বৈজ্ঞানিক এ কথা সবাই জানে৷'

হরিহরবাবু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, 'হ্যাঁ, বৈজ্ঞানিকরা তো আজকাল গাছে ফলে কিনা! পেরেছে গবা পাগলা আপনার দেওয়াল ঘড়িটা সারাতে?'

গদাধরবাবু একটু গরম হয়ে বললেন, 'পেরেছে বই কী! আলবাত পেরেছে৷'

হরিহরবাবু হো-হো করে হেসে বলেন, 'তাই বুঝি আপনার দেওয়াল ঘড়ির কাঁটা উলটোদিকে ঘোরে?'

'সেইটেই তো বিস্ময়! আর কার ঘড়ির কাঁটা উলটোদিকে ঘোরে বলুন তো! বৈজ্ঞানিক ছাড়া পারে কেউ ঘড়ির কাঁটা বিপরীতগামী করতে?'

এইভাবে হরিহরবাবু আর গদাধরবাবুর মধ্যে একটা তর্কবিতর্ক পাকিয়ে উঠছিল৷

আগের দিন দুধের মধ্যে একটা কুঁচো চিংড়ি পেয়েছিলেন হালদারবাড়ির বুড়ি৷ তাই গয়লাকে বকছিলেন৷ গবা পাগলার সাড়া পেয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে একগাল হেসে বললেন, 'বাব্বাঃ! কতদিন পরে গবাসাধু আবার এ পোড়া শহরে ফিরেছে! এবার আমার কাঁকালের ব্যথাটার একটা হিল্লে হবে৷'

গুণধরবাবু তাঁর বাগানে নেতিয়ে পড়া একটা লাউডগাকে মাচানে তুলছিলেন৷ চশমার ফাঁক দিয়ে গবা পাগলাকে দেখে গিন্নিকে ডাক দিয়ে বললেন, 'গবা চোরটা আবার এসেছে৷ জিনিসপত্র সব সামলে রেখো৷ সেবার ও হাওয়া হওয়ার পর থেকেই আমাদের দু-দুটো কাঁসার বাটি গায়েব হল৷'

দুই ভাই আন্দামান আর নিকোবর জানলার ধারে বসে অ্যানুয়্যাল পরীক্ষার পড়া তৈরি করছিল৷ আন্দামান অঙ্কে কাঁচা, নিকোবর কাঁচা ইংরেজিতে৷

আন্দামান গবা পাগলাকে জানলা দিয়ে দেখেই চাপা গলায় বলল, 'আগের বারের মতো এবারেও গবাদা ঠিক পরীক্ষার সময় বাইরে থেকে চেঁচিয়ে অঙ্ক বলে দেবে৷ বাঁচা গেল বাবা, অঙ্ক নিয়ে যা ভাবনা ছিল!'

নিকোবরও চাপা গলায় বলল, 'আমার কুড়ি নম্বরের ট্রানস্লেশনের ব্যবস্থাও হয়ে গেল৷'

বোধনের সকালের পড়া হয়ে গেছে৷ এবার নেয়ে-খেয়ে স্কুলে যাবে৷ হাতে খানিকটা সময় আছে দেখে সে তার মহাকাশযানে কিছু যন্ত্রপাতি লাগাচ্ছিল৷ তার মহাকাশযানটা দেখলে যে-কেউ অবশ্য নাক সিঁটকাবে৷ কারণ সেটা আসলে একটা ফুলঝাঁটা৷ ঝাঁটার হাতলের সঙ্গে গোটা চারেক হাউই দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা৷ ঝাঁটার সঙ্গে একটা কৌটোও বাঁধা আছে৷ তার ইচ্ছে ওই কৌটোয় কয়েকটা পিঁপড়ে ছেড়ে দেবে৷ আজ সে মহাকাশযানের সঙ্গে মেজোকাকার সাধের পকেট-ট্রানজিস্টার রেডিয়োটা চুপিচুপি লাগিয়ে দিচ্ছিল৷ এমন সময় রাস্তায় গবা পাগলার হাঁকডাক শোনা গেল, 'দেখবি যদি ভূতের নাচ, ধর বাগিয়ে ঝাঁটাগাছ, ডিং মেরে ওঠ গাধার পিঠে৷ নন্দখুড়োর ঘর পেরিয়ে, ঈশানকোণে যা হারিয়ে, লাগবে হাওয়া মিঠে৷ দেখতে পাবি তিনঠেঙে গাছ, তাহার ডালে ঝুলতেছে মাছ, নীচে গহিন ছায়া৷ সেই ছায়ারই কায়া ধরে ভূত-ভূতুড়ে অদ্ভুতুড়ে নাচতেছে সব মায়া . . .'

বোধন দৌড়ে রাস্তার ধারে গিয়ে চেঁচিয়ে বলে, 'ও গবাদা! মঙ্গলগ্রহ থেকে জ্যান্ত পাথর এনে দেবে বলেছিলে যে! সেইসব পাথর নাকি আপনা থেকেই গড়িয়ে গড়িয়ে চলে, ছোটো থেকে বড়ো হয়, রেগে গেলে একটা গিয়ে আর একটাকে ঢুঁ মারে!'

হেঃ হেঃ করে হেসে গবা পাগলা বলে, 'চার দু-গুণে আট এ তো সবাই জানে৷ কিন্তু বলো তো বাছাধন, হ্যারিকেনকে পেনসিল দিয়ে গুণ করলে কত হয়?'

থানার দারোগা কুন্দকুসুমের নামটা যত নরম, মানুষটা ততই শক্ত৷ ছ-ফুট লম্বা দশাসই চেহারা৷ গলার স্বরে স্পষ্ট বাঘের ডাক৷ রোজ আড়াইশো করে বুকডন আর বৈঠক মারেন৷ রাগলে ভিসুভিয়াস৷ বাস্তবিকই নাকি রাগন্ত অবস্থায় তাঁর মাথার চারপাশে একটা লালচে মতো আভা অনেকে দেখেছে৷ কুন্দকুসুমের ভয়ে এই অঞ্চলের গুন্ডা বদমাস চোর বাটপাড় সব রোগা হয়ে যাচ্ছে, ভালো করে খেতে পারে না, ঘুমোতে পায় না, ঘুমোলেও দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে যায়৷ সকাল বেলায় কুন্দকুসুম সবে থানায় এসে কোমরের বেল্ট খুলে রেখে গায়ে একটু হাওয়া লাগাচ্ছেন, এমন সময় রাস্তায় গবার চ্যাঁচানি শোনা গেল, 'সবাই জানে চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে৷ কিন্তু বুদ্ধি পালালে কী বাড়ে? অ্যাঁ?'

কুন্দকুসুম সিধে হয়ে বসে বললেন, 'স্পাইটা আবার এসেছে! ওরে, নজর রাখিস৷ নজর রাখিস!'

কিন্তু গবা কোথাকার স্পাই, কার স্পাই তা কুন্দকুসুম ঠিক জানেন না৷ এর আগেও তিনি গবাকে ধরে এনে বিস্তর জেরা করেছেন, খোঁজখবর নিয়েছেন, কোনো তথ্য আবিষ্কার করতে পারেননি৷ তাতে তাঁর সন্দেহটা আরও ঘোরতর হয়েছে৷

'এই যে গবাঠাকুর'-বলে একপাল গেঁয়ো মেয়ে-পুরুষ রাস্তার মাঝখানেই ঢিব ঢিব করে গবা পাগলাকে প্রণাম করল৷ তারা সব হাটবারে আনাজপাতি, ধামাকুলো, গোরু ছাগল মুর্গি ডিম, ধান চাল, দড়িদড়া নিয়ে বেচতে যাচ্ছে শহরে৷ তাদের ধারণা, গবাঠাকুর আকাশে উড়তে পারে, অদৃশ্য হতে পারে, জলের উপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারে, যেকোনো রোগ হাতের ছোঁয়ায় সারিয়ে দিতে পারে৷

গবা তাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, 'হবে হবে, সব হবে, একবার যদি ছুঁচে সুতোটা পরাতে পারি৷ দেখিসখন, সব অকাল চলে যাবে, খেতে খেতে ধান আর ধরবে না, পুকুরে নদীতে মাছের গাদি লেগে যাবে৷ দাঁড়া একবার, ছুঁচে সুতোটা পরাই...'

বাঘা ওস্তাদগাইয়ে রাঘব ঘোষ সকালের দিকটায় গলা সাধছিলেন৷ রোজই সাধেন৷ ভারি দাপুটে গলা৷ সাতটা সুর একেবারে রামধনুর মতো তাঁর গলায় লেগে থাকে৷

ঘণ্টা তিনেক গলার কসরত করায় এই শীতকালেও বেশ ঘেমে গেছেন রাঘব ঘোষ৷ একটু জিরিয়ে জর্দাপান মুখে দিয়ে তানপুরাটা সবে তাবায় জড়িয়ে ধরে পিড়িং করেছেন মাত্র অমনি মূর্তিমান গবা ঘরে ঢুকে বলল, 'আরে সা লাগাও! সা লাগাও! একবার যদি ঠিকমতো সা-টা লাগাতে পার, তাহলেই হয়ে গেল, সুরে জগৎ ভেসে যাবে৷ সা লাগালে রে আসবে মা রে বাবা রে বলে তেড়ে৷ রে এলে কি আর গা দূরে থাকবে গা? এসে যাবে গা দোলাতে দোলাতে৷ গা যদি এল তবে মা-এর জন্য আর ভাবনা কী গো? মা তো মায়ের মতো কোল পেতেই আছে৷ আর মা-এর পা ধরেই সেধে আসবে পা! পা-এর পিছু পিছু ধেয়ে আসবে ধা৷ ধা ধাঁ করেই আসবে হে৷ আর কী বাকি থাকে? 'নি'? নির্ঝঞ্ঝাটে আসবে, নির্ঝঞ্ঝাটে আসবে৷ নিত্যি নিত্যি আসবে নৃত্য করতে করতে আসবে৷ এইভাবেই পৌঁছে যাবে তার গ্রামে৷ ধরো ফের চড়ায় গিয়ে সা-এর চুলের মুঠি৷ বুঝলে? সা লাগাও হে, ঠিকমতো সা লাগাও৷'

রাঘব ঘোষ বুঝলেন না৷ তবে মাথা নেড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷ গবা এল, জীবনে আর শান্তি রইল না৷

তবে গবা আসায় শহরে যে একটা শোরগোল পড়েছে, তাতে সন্দেহ নেই৷

উদ্ধববাবু ভারি রাশভারী লোক৷ তাঁর সারা জীবনটাই রুটিনে বাঁধা৷ তেমনই রুটিনে বাঁধা তাঁর তিন ছেলে আর তিন মেয়ের চলাফেরা, লেখাপড়া, খেলাধুলো৷ তাঁর গিন্নিও রুটিন মেনে চলেন৷ চাকরবাকর ঝি তো বটেই, তাঁর বাড়ির গোরু ছাগল কুকুর বেড়াল পর্যন্ত কেউই রুটিনের বাইরে পা দেয় না৷ উদ্ভববাবু বলেন, ডিসিপ্লিন ইজ দি এসেনস অব সাকসেস৷

মুশকিল হল মাসখানেক আগে তিনি একটা ভালো জাতের কাকাতুয়া কিনেছেন৷ তাঁর ইচ্ছে ছিল, কাকাতুয়াটাকে শিখিয়ে পড়িয়ে এমন তৈরি করবেন যাতে সেটা তাঁর গবেট ছোটো ছেলে রামুটাকে উঠতে বসতে ডিসিপ্লিনের কথা মনে করিয়ে দেয়৷ উদ্ধববাবুর ছোটো ছেলেটাই হয়েছে সবচেয়ে সৃষ্টিছাড়া৷ শাসনে থাকে, দুষ্টুমিও বেশি করতে পারে না বটে, কিন্তু সে এই বাড়ির আবহাওয়া ঠিক মেনেও চলে না৷ আকাশে রামধনু উঠলে রামু হয়তো বাইরে গিয়ে দু-হাত তুলে খানিক নেচে আসে৷ ঘুড়ি কাটা গেলে দৌড়ে যায় ধরতে৷ অঙ্কের খাতায় একদিন লিখে রেখেছিল, 'কে যায় রে ভোঁ-গাড়িতে উড়িয়ে ধুলো? যা না ব্যাটা . . .' দেখে শিউরে উঠেছিলেন উদ্ধববাবু৷ ওইটুকু ছেলে কবিতা লিখবে কী? কিন্তু কতই-বা আর একটা ছেলের পিছনে লেগে থাকবেন তিনি? তাঁর তো কাজকর্ম আছে! মস্ত উকিল, দারুণ নামডাক, ব্যস্ত মানুষ৷ তাই ঠিক করেছিলেন, কাকাতুয়াটাকে রামুর পিছনে লাগিয়ে দেবেন৷ সে বলল, 'রামু পড়তে বসো৷ রামু এবার স্নান করতে যাও৷ রামু, আজ আধ ঘণ্টা বেশি খেলেছ৷ রামু রামধনু দেখতে যেয়ো না৷ রামু, কাটাঘুড়ি ধরতে নেই . . . ইত্যাদি৷'

কিন্তু মুশকিল হল, কাকাতুয়াটা প্রথম দিনই নিজে থেকে বলে উঠল, 'আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে৷ বিশু বাতিটা নিভিয়ে দাও৷ ঃও, কী মশা! কী মশা!'

ধৈর্য ধরে উদ্ধববাবু পরদিন তাকে আবার রামু-শাসন শেখাতে বসলেন৷ কাকাতুয়াটা গম্ভীরভাবে শুনল৷ তারপর বলল, 'বিশু, আমার খাবারে খুব ঝাল দিয়ো৷' উদ্ধববাবু কটমট করে পাখির দিকে চেয়ে বললেন, 'ইয়ার্কি হচ্ছে?' কাকাতুয়াটা এ-কথায় খক খক করে হেসে বলল, 'আমার ভীষণ হাসি পাচ্ছে৷ খক খক৷'

উদ্ধববাবু পরদিন আবার পাখিকে পড়াতে বসালেন৷ পাখি তাঁকে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অনেকক্ষণ লক্ষ করে বলল, 'বালিশের তলায় কী খুঁজছ বিশু? আলমারির চাবি?'

উদ্ধববাবু বললেন, 'আহা, বলো, রামু এখন ঘুম থেকে ওঠো৷'

পাখি বলল, 'বিশু, আমার ঘুম পাচ্ছে৷ ঘুম পাচ্ছে৷ আলমারিতে টাকা নেই৷ অন্য জায়গায় আছে৷'

উদ্ধববাবু বললেন, 'হোপলেস৷'

কাকাতুয়াকে শেখাতে গিয়ে উদ্ধববাবু ঘেমে ওঠেন৷ রেগে গিয়ে চ্যাঁচাতে থাকেন, 'ইয়ার্কি হচ্ছে? অ্যাঁ! ইয়ার্কি?'

কাকাতুয়াটা একথাটা খুব টক করে শিখে নেয়৷ ঘাড় কাত করে উদ্ধববাবুর দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় বলে, 'ইয়ার্কি হচ্ছে? অ্যাঁ! ইয়ার্কি?'

'নাঃ, তোকে নিয়ে আর পারা গেল না৷ টাকাটাই জলে গেল দেখছি৷' উদ্ধববাবু হতাশভাবে এই কথা বলে উঠে পড়লেন৷ নেয়ে-খেয়ে আদালতে যেতে হবে৷

কাকাতুয়াটা পিছন থেকে বলল, 'টাকাটাই জলে গেল দেখছি৷'

আড়াল থেকে কাকাতুয়া ভারসাস উদ্ধববাবুর লড়াইটা ছেলে-মেয়েরা রোজই লক্ষ করে৷

সেদিন কোর্টে উদ্ধববাবু যখন মামলার কাজে ব্যস্ত, সে-সময় একজন পেয়াদা এসে তাঁকে একটা হাতচিঠি দিয়ে বলল, 'বাইরে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে৷ জবাব নিয়ে যাবে৷'

উদ্ধববাবু ভ্রূকুটি করে বললেন, 'এখন সময় নেই৷ পরে আসতে বলো৷'

পরে ভেবে দেখলেন, মোকদ্দমার ব্যাপারে কোনো মক্কেল কোনো পয়েন্ট দিয়ে থাকতে পারে৷ তাই পেয়াদাকে বারণ করে চিঠিটা খুলে পড়তে লাগলেন :

মাননীয় মহাশয়,

কিছুকাল পূর্বে আমার পোষা কাকাতুয়াটি বাড়ির লোকের অসতর্কতার সুযোগে উড়িয়া যায়৷ পাখিটি আমার অত্যন্ত আদরের৷ বহু জায়গায় অনুসন্ধান করিয়া এতকাল তাহার কোনো খবর পাই নাই৷ সম্প্রতি জানিতে পারিলাম, ওই কাকাতুয়াটিকে আপনি কোনো পাখিওলার কাছ হইতে কিনিয়াছেন৷ এখন আপনার নিকট সনির্বন্ধ অনুরোধ, দয়া করিয়া কাকাতুয়াটি আমার হাতে প্রত্যর্পণ করুন৷ আপনি টাকা খরচ করিয়া কিনিয়াছেন, তাই আপনার অর্থক্ষতি হউক ইহা আমার অভিপ্রেত নহে৷ পত্রবাহকের সঙ্গে টাকা আছে৷ ন্যায্য দাম লইয়া আপনি পাখিটি তাহার হস্তে দিলেই হইবে৷ পত্রবাহকটি জন্ম হইতেই মূক ও বধির৷ তাহার সহিত বাক্যালাপ করা নিষ্প্রয়োজন৷ কিছু জানিবার থাকিলে আপনি তাহার হাতে পত্রও দিতে পারেন৷ আমার প্রীতি ও নমস্কার জানিবেন৷ ইতি ভবদীয় শ্রীশচীলাল শর্মা৷

চিঠি পড়ার পরও উদ্ধববাবু ভ্রূ কুঁচকেই ছিলেন৷ তিনি উকিল মানুষ, সুতরাং একটু সন্দেহবাতিক আছে৷ কোনো ঘটনাকেই সরলভাবে বিশ্বাস করেন না, যুক্তি দিয়ে সম্ভাব্যতা দিয়ে বিচার করে দেখেন৷ তিনি একটি চিরকুটে লিখলেন :

মাননীয় শচীলালবাবু,

আপনার পত্র পাইয়া প্রীত হইলাম৷ আমার ক্রীত কাকাতুয়াটি সাতিশয় অবাধ্য ও জেদি৷ আজ পর্যন্ত তাহাকে মনোমতো বুলি শিখাইতে পারি নাই৷ পাখিটি যদি আপনার হয় তবে ফেরত দিতেও বিন্দুমাত্র বিলম্ব করিব না, তবে দুনিয়ায় লক্ষ লক্ষ কাকাতুয়া আছে৷ এই অঞ্চলেই কয়েকশো লোকের পোষা কাকাতুয়া আছে বলিয়া জানি৷ এখন আমার ক্রীত কাকাতুয়াটিই যে আপনার নিরুদ্দিষ্ট কাকাতুয়া, তাহার প্রমাণ কী? যদি অকাট্য প্রমাণ দেন তাহা হইলেই বুঝিব যে, আপনার নিরুদ্দিষ্ট এবং আমার ক্রীত কাকাতুয়াটি এক ও অভিন্ন৷ পাখিটি কিনিতে আমার দুই শত টাকা খরচ পড়িয়াছে৷ মাসখানেক তাহার খোরাকিবাবদ খরচ হইয়াছে প্রায় পঞ্চাশ টাকা৷ কাকাতুয়াটি বেশ ভালোমন্দ খাইতে পছন্দ করে৷ প্রীতি ও নমস্কার জানিবেন৷ ইতি ভবদীয়-উদ্ধবচন্দ্র ভট্টাচার্য৷

পেয়াদার হাত দিয়ে চিরকুটটা পাঠিয়ে উদ্ধববাবু আবার মোকদ্দমার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন৷ ঘটনাটা আর মনেই রইল না৷

উদ্ধববাবুর বাড়ির সব কাজের কাজি হল নয়নকাজল৷ ছেলেবেলা থেকেই এ বাড়িতে আছে৷ ঘরের সব কাজ জানে৷ এমনকী, মোকদ্দমার ব্যাপারে উদ্ধববাবুকেও নাকি কখনো-সখনো পরামর্শ দেয়৷ বয়স বেশি নয়, চল্লিশের নীচেই৷ তবে তার চালচলন বুড়ো মানুষের মতো ভারিক্কি হওয়ার জন্য সে চোখে একটা চশমা পরে৷

দুপুরে কাকাতুয়াটাকে ঝাঁঝরি দিয়ে ভালো করে স্নান করাল নয়ন৷ বাইরের বারান্দায় শীতের রোদে দাঁড়টা ঝুলিয়ে দিল৷ তারপর চোখে চশমা এঁটে খবরের কাগজ খুলে পড়তে বসল৷ ঠিক এমন সময় বিশাল এক সাধু এসে হাজির৷ পরনে বাঘছাল, হাতে ত্রিশূল, ডমরু, কপালে ত্রিপুণ্ড্রক, মাথায় জটা, বিশাল ভুঁড়ি, পেল্লায় দাড়ি গোঁফ, হুহুংকার দিল-'হর হর ব্যোম ব্যোম . . .৷ হর হর ব্যোম ব্যোম . . . হর হর ব্যোম ব্যোম . ..'

সেই হুংকারে আঁতকে উঠল নয়ন৷ এ শহরটা ছোটো বলে সাধু ভিখিরি সবই সকলের চেনা৷ কিন্তু এই বিকট সাধুকে আগে কখনো দেখা যায়নি৷

চশমার ভিতর দিয়ে (যদিও চশমার কাচে কোনো পাওয়ার নেই) খুব গম্ভীর ভাবে সাধুকে লক্ষ করে নয়ন বলল, 'কোত্থেকে আসা হচ্ছে?'

সাধু কাঁধের ঝোলাটা নামিয়ে বারান্দার সিঁড়িতে জমিয়ে বসে বলে, 'সোজা হিমালয় থেকে৷ দেড় হাজার মাইল হাঁটাপথ৷ ওফ, একটু জল খাওয়াও তো বাপু মায়াবদ্ধ জীব৷'

'মায়াবদ্ধ জীব' বলে এ পর্যন্ত কেউ সম্বোধন করেনি নয়নকে৷ সে খানিকটা থতমত খেয়ে বলে, 'শুধু জল?'

সাধু হা-হা করে আকাশ ফাটিয়ে হেসে ওঠে হঠাৎ৷ বলে, 'আরে জলই তো হাতের গুণে অমৃত হয়ে যাবে৷ আনো দেখি ঘটিভর৷'

সেই হাসি শুনে নয়নের খুব ভক্তি হল৷ তাড়াতাড়ি এক ঘটি জল নিয়ে এল সে৷

সাধু দু-হাতে ঘটি ধরে উঁচু থেকে গড়গড় করে জল ঢালল গলায়৷ ঘাবুত ঘাবুত করে খানিক গিলে ঘটিটা ফেরত দিয়ে বলল, 'নে, পেসাদ খা!'

নয়ন ঘটিটা মাথায় ঠেকিয়ে সেটা আলগা রেখে গলায় জল ঢেলেই চমকে ওঠে৷ জল কোথায়? এ যে খাঁটি কমলালেবুর রস!

ঘটি রেখে নয়ন উপুড় হয়ে সাধুকে প্রণাম করে বলল, 'আমাকে দয়া করতে হবে, বাবা৷'

সাধু তার মাথায় প্রকাণ্ড হাতের একটা থাবড়া মেরে বলে, 'হবে হবে৷ এই যে সিকি ঘটি অমৃত খেলি, এর ঠেলাটাই আগে সামলা৷'

নয়নকাজল অবাক হয়ে বলল, 'এই কি অমৃত, বাবা?'

'তাহলে কী?' সাধু কটমট করে তাকিয়ে বলে৷

আমতা-আমতা করে নয়ন বলে, 'না, অমৃতই হবে৷ খাওয়ার পর থেকে গায়ে একটু জোরও পাচ্ছি যেন৷ তবে কিনা খেতে একেবারে কমলালেবুর রসের মতো৷'

'দূর বেটা খণ্ডিত সত্তা, তোরা হলি সংসার-পুকুরের মাছ৷ অমৃতের স্বাদ কি একেবারে পাবি? তবু তো তোর কমলালেবুর রস বলে মনে হয়েছে, অনেকের আবার ডাবের জল বা এমনি জল বলে মনে হয়েছে৷ তারা ঘোর পাপী, ঘোর পাপী, ব্যোম ব্যোম হর হর . . .'

নয়ন আর একবার সাধুকে প্রণাম করে৷

সাধু কাকাতুয়ার দাঁড়টার দিকে তাকিয়ে ফোঁত করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, 'নিজেরা হাজারো মায়ায় আটকে ছটফট করছিস তার ওপর ওই অবোলা জীবটার পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিস৷ ঘোর নরকে যাবি যে!'

'আমি নই বাবা! ও হল কর্তাবাবুর পাখি৷ আমি সামান্য চাকর৷'

'যে বেটা নিজেকে চাকর ভাবে, সে তো আগাপাশতলা চাকরই৷ নিজেকে চাকর ভাবিস কেন? তুই তো মুক্ত আত্মা৷ এ-বাড়ি এ-সংসার এ-দুনিয়ার সব কিছুর মালিক৷ যা বেটা ছেড়ে দে পাখিটাকে৷ যা যা ওঠ, দেরি করিসনি৷'

নয়ন ভয়ে ভয়ে উঠে পড়ে বলে, 'কিন্তু বাবা, কর্তাবাবু রাগী লোক৷ ফিরে এসে পাখি না দেখলে এমন কুরুক্ষেত্র করবে!'

চোখ পাকিয়ে সাধু হুহুংকার দিয়ে ওঠে, 'হর হর ব্যোম ব্যোম . . . কে তোর কেশাগ্র স্পর্শ করবে রে বেটা? এইমাত্র অমৃত খেলি যে! যা বেটা, ছেড়ে দে, একটা মুক্ত আকাশের জীবকে আর কষ্ট দিসনে৷ ছেড়ে দে, উড়ে যাক৷'

নয়নকাজল সাধুর হুংকারে মনস্থির করতে না পেরে দোনোমোনো হয়ে উঠে পড়ল৷ দাঁড়ের কাছে গিয়ে শিকলটা খুলতে সবে হাত বাড়িয়েছে এমন সময় আর একটা লোক বারান্দায় উঠে বিকট গলায় বলে উঠল, 'কাকাতুয়ার মাথায় ঝুঁটি, খ্যাঁকশিয়ালি পালায় ছুটি . . .৷'

নয়নকাজল এই দু-নম্বর চ্যাঁচানিতে ঘাবড়ে গেল৷ শিকল আর খোলা হল না৷ তাকিয়ে দেখল, মূর্তিমান গবা পাগলা৷

গবা খুব সরু চোখ করে আপাদমস্তক সাধুকে দেখে নিচ্ছিল৷ ভালো করে

দেখে-টেখে বলল, 'সব ঠিক আছে৷ তবে বাবু, তোমার একটা ভুল হয়েছে৷ গায়ে ছাই মাখোনি৷'

সাধু একটু হতভম্ব৷ কথা সরছে না৷ তবু একবার রণহুংকার দিল, 'হর হর ব্যোম ব্যোম . . .'

গবা সেই হুংকারে একটুও না ঘাবড়ে বলে, 'পায়ে বাটা কোম্পানির চটি জোড়াও মানায়নি একদম৷ একজোড়া কাঠের খড়ম জোগাড় করতে পারনি হে?'

সাধু এবার একটু ক্ষীণকন্ঠে বলে, 'হর হর . . .'

গবা সাধুর বাঁ হাতটা তুলে কবজিটা দেখে নিয়ে বলে, 'এ যে ঘড়ি পরার স্পষ্ট দাগ গো! রোজ ঘড়ি পরো বুঝি হাতে? সাধুরা আজকাল ঘড়িও পরছে তাহলে? তা সেটা রেখে এলে কোথায়?'

সাধু ত্রিশূলটা শক্ত করে চেপে ধরে ধমক দেয়, 'ব্যোম ব্যোম . . .'

গবা ফিক করে হেসে বলে, 'বোমা কেন? পিস্তল নেই? বোমার চেয়ে পিস্তল ভালো৷ বোমা অনেক সময় ঝোলার মধ্যে ফেটে-টেটে যেতে পারে৷'

সাধু এক ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, 'ঘোর পাপী, ঘোর পাপী৷ অন্ধকারে ডুবে আছিস৷'

পাখিটা অনেকক্ষণ ধরে সাধুকে ঘাড় কাত করে করে দেখছিল আর দাঁড়ে এধার-ওধার করছিল৷ এখন একটা ডিগবাজি খেয়ে বলল, 'বিশু, বিশু, আমার কেন ঘুম পাচ্ছে! ঘুম পাচ্ছে! আলমারিতে টাকা নেই৷ টাকা আছে . . .'

সাধু হঠাৎ একটা লাফ মেরে বারান্দায় উঠে দাঁড়টাকে একটা ঝাঁকুনি মেরে বলে, 'বল বেটা কোথায় আছে! বল৷ নইলে গলা টিপে খুন করে ফেলব৷'

পাখিটা হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে বুলি ভুলে ডানা ঝাপটে ভয়ের চিৎকার করতে লাগল৷

সাধুর কাণ্ড দেখে নয়নকাজলের বাক্যি সরে না, হাত-পা নড়ে না, শরীরে সাড় নেই৷ বড়ো বড়ো চোখে চেয়ে আছে৷ মুখখানা হাঁ৷ পাখিটা বুলি ভুলে গাঁ গাঁ করে প্রাণভয়ে চ্যাঁচাচ্ছে আর দাঁড়ে বনবন করে ডিগবাজি খাচ্ছে৷ বিটকেল গলায় সাধু বলছে, 'বল বেটা বল কোথায় টাকা! বল!'

অবস্থা যখন এইরকম গুরুচরণ, তখন হঠাৎ-জলের চৌবাচ্চায় নেমে বৈজ্ঞানিক আর্কিমিডিস আপেক্ষিক গুরুত্ব আবিষ্কার করার পর যেমন 'ইউরেকা ইউরেকা' বলে আওয়াজ ছেড়েছিলেন-তেমনি গবা পাগলা লাফিয়ে উঠে দু-হাত তুলে নাচতে নাচতে চেঁচাতে লাগল, 'চিনেছি! চিনেছি! সাধুকে চিনেছি!'

যেই-না চ্যাঁচানো সেই-না সাধু চোখের পলকে লাফ দিয়ে বারান্দা থেকে নেমে হাওয়ার বেগে দৌড়ে পালিয়ে গেল৷

নয়নকাজল ধাতস্থ হয়ে গবাকে জিজ্ঞেস করে, 'বিটকেল সাধুটাকে চেন তাহলে! কে বলো তো?'

গবা বসে বসে ঘাম মুখের ধুলো-ময়লা মুছছিল৷ বিজ্ঞের মতো হেসে বলল, 'বলব কেন? ডাবল লেনস লাগিয়ে নতুন ধরনের একটা টর্চবাতি বানাব বলে তোমার কাছে যে গতকাল বাবুর মায়ের পুরোনো চশমাজোড়া চাইলাম, দিয়েছিল?'

নয়ন একটু তেড়িয়া হয়ে বলে, 'আর চোর বলে যদি আমার বদনাম রটত? তখন তুমি কোথায় থাকতে?'

'চোর!' বলে হোঃ-হোঃ করে হাসে গবা, 'চোর বুঝি এখন নও? কুন্দ দারোগাকে যদি তোমার আসল নামটা জানাই তাহলে তুমি এরকম সুখে আর থাকবে না হে!'

একথা শুনে নয়ন কেমন একধারা হয়ে গেল৷ মুখখানা ছাইবর্ণ, চোখে জুলজুলে চাউনি৷

গবা অবশ্য আর ঘাঁটাল না৷ বলল, 'নাও, মেলা বেলা হয়েছে, পাচক ঠাকুরকে আমার খাবারটা বাড়তে বলো গে৷'

নয়নকাজল মিনমিনে গলায় বলল, 'যাচ্ছি৷ কিন্তু কথাটা হল-'

গবা হাত তুলে বলে, 'বলতে হবে না৷ কথাটা আপাতত চাপা থাকবে৷ এখন নিশ্চিন্ত মনে যাও৷ আর শোনো, পাখিটাকে ভিতরের দরদালানে ঝুলিয়ে রেখো, যখন-তখন বের কোরো না, এটার ওপর কিছু লোকের চোখ আছে৷'

নয়নকাজল দাঁড়টা নিয়ে ভিতরবাড়িতে চলে গেল৷

এ-বাড়িতে গবা পাগলার আস্তানা বহুদিনের৷ মাঝেমধ্যে সে দু-চার ছ-মাসের জন্য হাওয়া হয়ে যায় বটে, কিন্তু ফিরে এসে বাইরের পাকা চণ্ডীমণ্ডপের পাশে রসুইখানার ঘরটায় বরাবরের মতো থানা গাড়ে৷ তাকে কেউ কিছু বলে না৷ শোনা যায় উদ্ধববাবু গবাকে একটা বিচ্ছিরি মামলা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন৷ বহুকাল আগেকার কথা৷ সত্যি-মিথ্যে কেউ বলতে পারে না৷

গবা পিছনের পুকুর থেকে স্নান করে এসে এক পেট খেয়ে ঘুম লাগাল৷

বিকেল হতে-না হতেই রামু এসে ঠেলে তুলল, 'ও গবাদা! বাবাকে বলে বিষ্টুপুরের সার্কাসে নিয়ে যাবে বলেছিলে যে! আজই চলো৷'

গবা হাই তুলে বলে, 'দূর! ও একটা সার্কাস নাকি? মরকুটে বাঘ, রোগা হাতি, পালোয়ানের নেই বুকের ছাতি৷ কাল সকালে গিয়ে দেখি, সার্কাসের ম্যানেজার গুনছুঁচে পাটের ফেঁসো ভরে ছেঁড়া তাঁবু সেলাই করছে৷ তার চেয়ে হাবিবগঞ্জের সার্কাস অনেক ভালো৷'

'কী আছে তাতে?'

'ঃও, সে মেলা জিনিস৷ বাঘ হাতি সিন্ধুঘোটকের কথা ছেড়েই দিলাম৷ একটা বেঁটে লোক আছে, সে ভারি হাসায়৷ বেঁটেটার বন্ধু হচ্ছে একটা তালগাছের মতো লম্বা লোক৷ তা বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার সময় বেঁটেটা একটা মই লাগিয়ে বন্ধুর কাঁধ বরাবর উঠে যায়৷ মজা না?'

'খুব মজা৷ কিন্তু কবে নিয়ে যাবে?'

'ব্যস্ত হয়ো না, বাবুমশাইকে বলে আগে অনুমতি নিই৷ তারপর একদিন যাবখন৷ পয়সাটয়সাও লাগবে না৷ হাবিবগঞ্জের সার্কাসের সেই বেঁটে লোকটা আমার খুব বন্ধু৷ দু-জনে একসময়ে একই দলে ছিলাম কিনা৷'

রামু চোখ কপালে তুলে বলে, 'তুমি সার্কাসের দলে ছিলে গবাদা? বলোনি তো!'

গবা মৃদু মৃদু হেসে বলে, 'সার্কাসে ছিলাম, বেদের দলে ছিলাম৷ সে অনেক ঘটনা৷'

'সার্কাসে কী কী খেলা দেখাতে?'

'সবরকম৷ ট্রাপিজ, দড়ির ওপর হাঁটা, একচাকার সাইকেলে উঠে রকম রকম কসরত, ক্লাউন সেজে রগড়ও করতে হয়েছে৷'

'আমাকে খেলা শিখিয়ে দেবে?'

'তা আর শক্ত কী? তবে কঠিন ডিসিপ্লিন চাই, মনোযোগ চাই, অধ্যবসায় চাই৷'

'আমি পারব৷'

উদ্ধববাবু আজ একটু তাড়াতাড়িই কাছারি থেকে ফিরে এসেছেন৷ এসেই হাঁক মারলেন, 'নয়ন, ওরে নয়ন!'

নয়নকাজল ছুটে এসে বলে, 'আজ্ঞে বাবুমশাই৷'

'পাখিটা কোথায়?'

'দরদালানে ঝোলানো আছে৷'

'হুঁ' বলে উদ্ধববাবু পকেট থেকে শচীলাল শর্মার চিঠিটা বের করে আর একবার পড়লেন৷ তারপর ভ্রূ কুঁচকে বললেন, 'পাখিটাকে খুব সাবধানে রাখা দরকার৷ আজ থেকে ওটাকে এ-ঘরে রাখবি৷ আমি না থাকলে দরজায় সবসময় তালা দেওয়া থাকবে বুঝেছিস?'

'আজ্ঞে৷' নয়নকাজল খুব বিনীতভাবে বলল, তবে এসময় উদ্ধববাবু লক্ষ করলে দেখতে পেতেন যে, নয়নকাজলের চোখ দুটো চকচক করছে৷ জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট দুটো চেটে নয়ন বলল, 'আজ এক বিটকেল সাধু এসে পাখিটার ওপর খুব হামলা করে গেছে৷ নিয়েই যেত, আমি গিয়ে সময়মতো আটকালাম বলে৷'

'সাধু!' বলে উদ্ধববাবু হাঁ করে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলেন, 'সাধুর সঙ্গে পাখির কী সম্পর্ক?'

মাথা চুলকে নয়ন বলে, 'আজ্ঞে সে তো জানি না৷'

উদ্ধববাবু রেগে গিয়ে বলেন, 'এ-বাড়িটা কি হাট নাকি? যে কেউ এসে ঢুকে পড়বে, হামলা করবে, তোরা সব করিস কী? সাধু পাখিটা নিয়ে যাচ্ছিল নাকি?'

'তাই মতলব ছিল৷ বিশাল চেহারা দেখলেই ভয় হয়৷'

'ধরতে পারলি না?'

'ও বাবা, ধরবে কে? হাতে যা একখানা ধারালো শূল ছিল!'

উদ্ধববাবু একটু চিন্তিত মুখে বললেন, 'ঠিক আছে, এখন থেকে সাবধানে থাকবি৷'

বাইরের কাছারি ঘরে মক্কেলরা জড়ো হতে শুরু হয়েছে৷ কাজেই পাখি নিয়ে ভাববার সময় উদ্ধববাবুর নেই৷ তিনি তৈরি হয়ে কাছারিঘরে গিয়ে বসলেন এবং মামলামকদ্দমার মধ্যে ডুবে গেলেন৷

সন্ধের সময় যখন সবাই পড়তে বসে তখনই রামুর ভীষণ ঘুম পায়৷ এত ঘুম যে কোথায় থাকে? কেবল হাইয়ের পর হাই উঠতে থাকে, চোখের দুটো পাতায় যেন আঠা মাখানো চুম্বক লাগিয়ে দেয় কেউ৷ শ্রীধর মাস্টারমশাই পড়াতে এসে ভীষণ রাগারাগি করেন রোজ৷ মারধরও প্রায় রোজই খেতে হয় রামুকে৷ কিন্তু পড়তে তার একদমই ভালো লাগে না৷

আজও তিন ভাই পড়তে বসেছে৷ রামু ঘন ঘন দেওয়াল ঘড়িটার দিকে চাইছে৷ ঠিক ছ-টায় শ্রীধরবাবু আসবেন৷ ততক্ষণ যতটা পারে ঢুলে নেওয়ার জন্য সে মুখে অ্যাটলাসটা চাপা দিয়ে চোখ বুজে রইল৷

কিন্তু কে জানে কেন আজ রামুর ঘুম আসছিল না৷ বারবারই তার চোখে একটা সার্কাসের দৃশ্য ভেসে উঠছে৷ সে দেখছে, একটা ছেলে এক ট্রাপিজ থেকে আর একটায় ঝাঁপ দিয়ে চলে যাচ্ছে, দড়ির ওপর হাঁটছে, একচাকার সাইকেল চড়ে কসরত দেখাচ্ছে৷ ছেলেটা অবশ্য সে নিজেই৷ আজ তার মনে হল, সার্কাসের খেলোয়াড় হতে না পারলে জীবনের কোনো মানেই নেই৷

এদিকে ছ-টা বেজে গেল৷ ক্রমে সাড়ে ছ-টাও বাজে৷ কিন্তু শ্রীধরবাবু এলেন না৷ এরকম অঘটন কখনোই ঘটে না৷ শ্রীধরবাবুর মতো নিয়মনিষ্ঠ লোক কমই আছে৷ কামাই তো নেইই, এক মিনিট দেরিও করতে নারাজ৷ আজ তবে হল কী?

সন্ধে সাতটা নাগাদ কাছারিঘরে উদ্ধববাবুর কাছে একটা লোক এসে বলল, 'শ্রীধরবাবু সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে পা মচকেছেন৷ ক-দিন আসতে পারবেন না৷'

মামলামকদ্দমায় ডুবে-থাকা উদ্ধববাবু অবাক হয়ে বললেন, 'কে শ্রীধরবাবু? কীসের মামলা?'

'মামলা নয়৷ শ্রীধরবাবু আপনার ছেলেদের পড়ান৷'

'অ, তা কী করে পড়লেন?'

'সাইকেলে টিউশানি করতে আসছিলেন এমন সময় একটা মোটর সাইকেল এসে তাঁকে ধাক্কা মেরে পালিয়ে যায়৷ খুব চোট হয়েছে৷ ডান পায়ের হাড় সরে গেছে৷'

'তাই তো! খুব দুঃখের কথা৷'

পরদিন সকালেই অবশ্য শ্রীধরবাবু চিঠি দিয়ে একটি লোককে পাঠালেন৷ চিঠিতে লেখা, 'আমার বদলে এই ভদ্রলোক ছেলেদের ক-দিন পড়াবেন৷ ইনি তিনটি বিষয়ে এম.এ. পাশ৷'

উদ্ধববাবু আপত্তির কারণ ছিল না৷ শ্রীধরবাবু যাকে পাঠিয়েছেন তার যোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্নই ওঠে না৷ লোকটির চেহারাও বেশ ভালোমানুষের মতো৷ নাম যুধিষ্ঠির রায়৷ আগে এঁকে কখনো দেখেননি উদ্ধববাবু৷ জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনি কি এই অঞ্চলের লোক?'

'এই অঞ্চলেরই৷ তবে পড়াশোনা করতে অনেকদিন বাইরে ছিলাম৷'

'ঠিক আছে৷ আজ থেকেই শুরু করুন৷'

রাত্রিবেলা চুপিসারে নয়নকাজল একটা লুচি খাওয়াল কাকাতুয়াটাকে৷ তারপর বেশ মিষ্টি করে পাখিটার গায়ে হাত বুলিয়ে মিষ্টি গলায় বলল, 'হ্যাঁ, কী যেন বলছিলি! সেই টাকাটার কথা, না? কোথায় যেন আছে সেই টাকাটা? বল বাবা৷'

পাখিটা ঘাড় বেঁকিয়ে নয়নকাজলকে ভালো করে দেখে নিয়ে বলল, 'টাকা নয়, মোহর৷ মোহরগুলো . . . মোহরগুলো . . .৷'

নয়নকাজল সাপের মতো চোখ করে চেয়ে ছিল পাখিটার দিকে৷ সাপের মতো গলাতেই বলল, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ মোহর৷ তা সে মোহরগুলো কোথায় রে বাপ?'

'মোহর আছে . . . মোহর আছে . . . মাটির তলায় . . . কিন্তু বিশু, তুমি অমন করে তাকিয়ো না . . . আমি ভয় পাই . . . ভয় পাই৷'

চাপা গলায় নয়নকাজল বলে, 'ভয় নেই রে! মাটির তলায় তো বুঝলুম, কিন্তু জায়গাটি কোথায়?'

পাখিটা দাঁড়ে দোল খেতে লাগল৷ তারপর হঠাৎ হাঃ-হাঃ হাসির শব্দ তুলে বলল, 'জানি, কিন্তু বলব না৷'

'বলবি না? বলবি না?' বলতে বলতে নয়নকাজল দুটো হাত সাঁড়াশির মতো করে পাখিটার দিকে এক-পা এগিয়ে গেল৷

পেছনে কখন নিঃশব্দে রামু এসে দাঁড়িয়েছে৷ দৃশ্যটা দেখে সে অবাক! কিন্তু বিপদ বুঝে সে হঠাৎ বলে উঠল, 'নয়নদা৷ কী হচ্ছে?'

নয়নকাজল চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে একগাল হেসে বলল, 'পাখিটাকে বড়োবাবুর ঘরে রেখে আসার হুকুম হয়েছে কিনা৷ তাই দাঁড়টা নিয়ে যাচ্ছিলাম৷'

কথাটা রামুর বিশ্বাস হল না৷ কিন্তু আর কিছু বললও না সে৷ তবে পাখিটা যে মোহরের কথা বলছিল, তা সে স্পষ্ট শুনেছে৷

রামু যে খুবই দুষ্টু ছেলে তা সে নিজেও জানে৷ একবার স্কুলের অঙ্কস্যার হেরম্ববাবু রেগে গিয়ে তাকে বলেছিলেন, 'তুই এত পাজি কেন বল তো?'

'আজ্ঞে স্যার, আমার শরীরের মধ্যে সবসময় কে যেন কাতুকুতু দেয়৷ যখন খুব কাতুকুতুর মতো লাগে, তখন আমার কিছু একটা না করলে চলে না৷'

'বটে!' বলে হেরম্ববাবু খুব রেগে গেলেন৷ রামু ইয়ার্কি করছে ভেবে শপাং শপাং কয়েক ঘা বেতও বসালেন তার গায়ে৷ তারপর বললেন, 'এবার কাতুকুতু টের পাচ্ছিস?'

কিন্তু ইয়ার্কি রামু করেনি৷ বাস্তবিকই তার শরীরের মধ্যে সবসময় একটা কাতুকুতুর ভাব৷ কখনো বাড়ে, কখনো কমে৷ যখন বাড়ে তখন বেহদ্দ কোনো দুষ্টুমি না করলেই নয়৷ খাঁ-খাঁ দুপুরে সে তখন এলোপাথাড়ি ঢিল ছোড়ে, গাছের মগডালে ওঠে, ক্লাসে অন্য ছেলেদের বই খাতা গোপনে ছিঁড়ে রাখে, ক্লাসঘরে ছাগল ঢুকিয়ে দেয়, বাড়িতে রান্নাঘরে গিয়ে রান্না তরকারির মধ্যে নুন ছিটিয়ে দিয়ে আসে৷ প্রতিবেশীরা তার উৎপাতে অস্থির৷ রামুর মেজোদাদুর সত্তর বছর বয়সেও সটান চেহারা, দারুণ স্বাস্থ্য, সবকটা দাঁত অটুট, মাথায় কালো কুচকুচে চুল৷ সেবার মেজোদাদু রামুদের বাড়ি বেড়াতে এসে বললেন, 'আমার মাথা থেকে পাকা চুল বের করতে পারবি? পার পাকাচুল চার আনা করে পয়সা দেব৷'

দুপুরে খাওয়ার পর মেজোদাদু যখন শুয়েছেন তখন রামু চুল বাছতে গেল এবং ঘণ্টাখানেকের মধ্যে প্রায় শ-খানেক পাকা চুল বের করে ফেলল৷ দেখে মেজোদাদু তো মূর্ছা যান আর কি! বাড়ি মাথায় করে চ্যাঁচাতে থাকেন, 'ভৌতিক কাণ্ড! ভৌতিক কাণ্ড! আমি কি রাতারাতি বুড়ো হয়ে গেলুম! ওরে উদ্ধব, শিগগির ডাক্তার ডাক৷ আমার বুকটা কেমন করছে, মাথা ঘুরছে, হাত-পা কাঁপছে!'

ঠিক সেই সময়ে প্রতিবেশী জামাল সাহেব তাঁর সাদা ধবধবে বিলিতি কুকুরটাকে চেন দিয়ে বেঁধে এনে বাড়িতে ঢুকলেন৷ দুঃখ করে বললেন, 'রেমোর কাণ্ড দেখুন৷ একটু আগে আমার বাসায় গিয়েছিল, হাতে একটা কাঁচি৷ কুকুরটাকে খুব আদর করছিল৷ তখন কি ছাই টের পেয়েছি! এখন দেখি পিঠের লম্বা চুলগুলো কেটে একেবারে টাক ফেলে দিয়ে এসেছে৷'

বাস্তবিকই তাই৷ সুন্দর, বড়ো বড়ো লোমওয়ালা কুকুরটার পিঠ প্রায় ফাঁকা৷ উদ্ধববাবু হান্টার বের করলেন, মেজোদাদু তখন গিয়ে তাঁকে আটকে দিয়ে বললেন, 'যাই হোক বাবা, মাপ করে দাও৷ ছেলেমানুষ৷'

মেজোদাদু যে বাস্তবিকই বুড়ো হননি সেটা জেনেই তিনি তখন খুশি৷ তবে তার পরেও দিন-দুই তাঁর চুল থেকে কুকুরের সাদা লোম ঝরে পড়ত৷

শরীরের এই কাতুকুতুটা নিয়ে রামু মাঝেমাঝে ভাবে৷ কে যে তাকে কাতুকুতু দেয়! বেটাকে ধরতে না পারলে কিছুতেই আর ভালো ছেলে হওয়া যাবে না৷

অবশ্য ভালো ছেলে হওয়ার তেমন কোনো ইচ্ছেও তার হয় না৷ তার ইচ্ছে করে সার্কাসের রিং-মাস্টার বা ম্যাজিশিয়ান বা প্রেতসিদ্ধ তান্ত্রিক বা নামকরা ফুটবল খেলোয়াড় বা রেলের গার্ড বা মহাকাশচারী বা বহুরূপী বা বিশ্বভ্রমণকারী বা ট্রাক ড্রাইভার বা পাইলট বা ডুবুরি হবে৷ শুধু লেখাপড়া করে আর নিয়মমতো চলে এর কোনোটাই হওয়া যাবে না৷ সুতরাং সে ঠিক করেছে, একদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবে৷ কুমোরপাড়ার গান্টুরও পালানোর ইচ্ছে৷ দু-জনে প্রায়ই শলাপরামর্শ করে৷ গান্টুর ইচ্ছে পালিয়ে প্রথমেই উত্তরমেরুতে যাবে৷ রামুর ইচ্ছে, আফ্রিকা৷ দু-জনে এখনও একমত হতে পারেনি৷ হলেই গলা জড়াজড়ি করে একদিন বেরিয়ে পড়বে৷

তবে রামু দুষ্টু হলেও সে গাছপালা আর পশুপাখি খুব ভালোবাসে৷ এমনকী, নিজেদের বাগানের সব কটা গাছের সঙ্গেই তার আলাদা আলাদা রকমের সম্পর্ক আছে৷ বুড়ো তেঁতুল গাছটার সঙ্গে তার সম্পর্ক দিদিমা আর নাতির৷ তেঁতুল গাছটাকে সে তিন্তিড়ি দিদিমা বলে ডাকেও৷ গাছটা যে তাতে সাড়া দেয়, তাও সে টের পায়৷

কলমের আম গাছটা ভালো ছেলে ধরনের৷ প্রতি বছর ঝাঁকা ঝাঁকা আম ফলে তাতে৷ কাজের লোক, কিছু গম্ভীরও৷ তাকে রামু গোপালদা বলে ডাকে৷ রামুর ক্লাসের ফার্স্টবয়ের নামও গোপাল, আর গাছটাও গোলাপখাস আমের৷ তবে ফার্স্টবয়ের সঙ্গে রামুর ভাব নেই, গাছটার সঙ্গে আছে৷ একটু বর্ণ বিপর্যয় করে নিয়ে গোলাপখাসকে গোপালদা বানিয়ে নিতে রামুর অসুবিধে হয়নি৷

এ ছাড়া কাক, শালিখ, চড়াই, বেড়াল, কুকুর, ইঁদুর-এমনকী কাঠবেড়ালিদের সঙ্গেও রামুর কোনো শত্রুতা নেই৷ তারা রামুকে পছন্দই করে৷ বাড়ির পোষা পায়রাগুলো রামুর মাথায়, কাঁধে নির্ভয়ে এসে বসে৷ কাঠবেড়ালি তার থেকেই চীনেবাদাম খেয়ে যায়৷ গোটা চারেক চেনা শালিখ রোজ সকালে পড়ার ঘরে ঢুকে কিচিরমিচির করে তাদের পড়া ভন্ডুল করে রামুকে সাহায্য করার চেষ্টা করে৷

নয়ন পাখির দাঁড়টা বাবার ঘরে দিতে চলে যাওয়ার পর রামুর মনে হল, এই কাকাতুয়াটাকে হাত করা দরকার৷ বাবা এটাকে কিনেছে রামুকে ঢিট করার জন্যই৷ পাখিটাকে হাত না করলে বেটা তাকে বিস্তর জ্বালাবে৷

উদ্ধববাবু মক্কেলদের বিদায় করে খাওয়াদাওয়া সেরে যখন ঘরে এলেন তখন অনেক রাত৷ পাখির দাঁড়টা সিলিং ফ্যান থেকে ঝোলানো একটা দড়িতে বাঁধা৷ কাকাতুয়া ঘাড় গুঁজে ঘুমোচ্ছে৷ উদ্ধববাবু নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়লেন৷

কিন্তু মাঝরাতে একটা দুঃস্বপ্ন দেখে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল৷ না, দুঃস্বপ্নটা ঠিক দেখেননি তিনি৷ বরং বলা যায় একটা দুঃস্বপ্ন তিনি শুনলেন৷ কে যেন বলছে, 'ওরে বাবা! কী ভয়ংকর! কী সাংঘাতিক রক্ত! রক্ত!'

এইসব বিদঘুটে কথা শুনে ঘুম ভেঙে গেল৷ উদ্ধববাবু উঠে বসলেন৷ তাঁর শ্বাসকষ্ট হতে লাগল৷ তবু চেঁচিয়ে বললেন, 'কী হয়েছে রে? ডাকাত পড়ল নাকি?'

না, ডাকাত পড়েনি৷ হতচ্ছাড়া সেই পাখিটা৷ চালের এধারে-ওধারে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে৷ পায়ের সরু শিকলের শব্দ হচ্ছে৷ কিন্তু আশ্চর্য এই, ঘোর শীতকালেও সিলিং ফ্যানটা বাঁই বাঁই করে ঘুরছে৷ সেই সঙ্গে পাখির দাঁড়টাও৷

কে পাখা খুলল? কেন খুলল? পাখিটাই বা ওরকম চ্যাঁচাল কেন? এসব প্রশ্নের জবাব পাওয়া গেল না৷

উদ্ধববাবু উঠে পাখাটা বন্ধ করলেন৷ পাখিটা খুব কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকে একবার দেখল৷ তারপর মৃদু স্বরে বলল, 'সাবধান!'

উদ্ধববাবু আর বাকি রাতটা ঘুমোতে পারলেন না৷ ঠিক করলেন, পাখিটাকে শচীলাল শর্মার কাছে বেচেই দেবেন৷ না হয় তো অন্য কাউকে৷ বড্ড ঝামেলা৷

দুপুর বেলা বহু দূর থেকে একটা লোক পশ্চিমের চষা খেতের মস্ত মাঠটা পেরিয়ে শহরের উপকন্ঠে শালবনটার ভিতরে ঢুকল৷ ঝরা পাতার বনটায় আলোছায়ার চিকরিমিকরি৷ গোঁ-গোঁ করে উত্তরে শীতের হাওয়া বয়ে যাচ্ছে৷ ভোকাট্টা ঘুড়ির মতো শুকনো পাতা খসে পড়ছে৷ লোকটা কাঁধ থেকে তার খাকি রঙের ব্যাগটা নামিয়ে গাছতলায় রাখল৷

তার ব্যাগটা দেখেই বোঝা যায়, লোকটা পর্যটক৷ তার গালে বেশ ঘন দাড়ি আর গোঁফ৷ খুব লম্বা নয়, কিন্তু শক্ত মজবুত চেহারা, পরনে মালকোচা-মারা ধুতি, গায়ে একটা ফতুয়া আর মোটা সুতির চাদর৷ কাঁধে একটা ভাঁজ করা কুটকুটে কম্বলও আছে৷ পায়ে খুব পুরু সোলের নাগরা জুতো৷ হাতে বেতের একটা লাঠি৷ বয়স বাইশ-তেইশ বা বড়োজোর পঁচিশ পর্যন্ত হতে পারে৷ চোখ দু-খানায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি৷ রোদে-জলে ঘুরে ঘুরে গায়ের রং তামাটে হয়ে গেছে বটে, তবে একসময় সে খুব ফর্সা ছিল তা বোঝা যায়৷

লোকটা খানিকক্ষণ জিরিয়ে নিল৷ তারপর ব্যাগ থেকে চিঁড়ে আর গুড় বের করে কয়েকটা শালপাতা বিছিয়ে তার ওপর ঢালল৷ সামনেই মটরখেত৷ উঠে গিয়ে খেত থেকে তাজা মটরশুঁটি তুলে আনল এক কোঁচড়৷ জলও জুটে গেল কাছেই এক চাষিবাড়ির কুয়ো থেকে৷ কোথায় কী জোটে তা লোকটা ভালোই জানে৷

খাওয়ার পর গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে লোকটা অঘোরে ঘুমোতে লাগল৷ জঙ্গলে সাপখোপ, পাগলা শেয়াল থাকতে পারে৷ শীতকালে এই অঞ্চলে চিতাবাঘও হানা দেয়৷ লোকটা সবই জানে, কিন্তু ভ্রূক্ষেপ নেই৷

শীতের বেলা তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে পশ্চিমের মাঠে সূর্য টুক করে মেঘলা মতো একটা কুয়াশার স্তরের মধ্যে ডুবে গেল৷ শালবনের মধ্যে ঘনিয়ে উঠল অন্ধকার৷ আর হাড়-কাঁপানো হিম একটা হাওয়া হু-হু করে বইতে লাগল৷

লোকটা চোখ মেলে তাকায়৷ সে দিনের বেলায় বড়ো একটা লোকালয়ে ঢুকতে চায় না৷ চারদিকটা বেশ আঁধারমতো হয়ে এসেছে দেখে লোকটা তার ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে নিয়ে উঠে পড়ল৷

বন পার হয়ে লোকটা কিন্তু শহরে ঢুকল না৷ শহরের বাইরে মস্ত সার্কাসের তাঁবু পড়েছে৷ ডিম ডিম করে বাজনা বাজছে৷ বাঘ সিংহের হুংকার শোনা যাচ্ছে৷ ভিড়ে ভিড়াক্কার৷ চারিদিকে আলো ঝলমল দোকানপাট, বেলুনওয়ালা, ভেঁপুওয়ালা, বাঁশিওয়ালা মিলে এক মেলা বসে গেছে৷

লোকটা মোটা চাদরে নাক পর্যন্ত ঢেকে আর মাথায় একটা কপাল-ঢাকা বাঁদুরে টুপি চাপিয়ে একটু সন্তর্পণে তাঁবুর পিছন দিকে এগোতে লাগল৷

এ-পাশটা অন্ধকার৷ বাঘ-সিংহের খাঁচা, রসুইখানা, খেলোয়াড়দের তাঁবু আর মেলা দড়িদড়া, বাঁশ-কাঠ, প্যাকিং বাক্সের গাদা৷ লোকটার কোনো অসুবিধে হল না, অন্ধকারে সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে গেল৷

খেলোয়াড়দের ঢুকবার দরজায় কড়া পাহারা, খুব কম করেও পাঁচ-সাতজন মুশকো লোক দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে৷ খেলা শুরু হতে আর দেরি নেই৷ দরজার কাছে একটা আলোর চৌখুপি৷ মুখঢাকা লোকটা এগিয়ে যেতেই পাহারাদাররা পথ আটকাল, 'এই এধারে যাওয়া বারণ৷ হঠো, হঠো৷'

লোকটা তাঁর বাঁদুরে টুপিটা খুলে চাদর-ঢাকা মুখটা একটু ফাঁক করে আলোয় তুলে ধরে বলে, 'আমি রে আমি৷ গোবিন্দ ওস্তাদ৷'

লোকগুলো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হাঁ করে আছে৷ লোকটা বলে কী? গোবিন্দ ওস্তাদ! তার তো আজ বাদে কাল ফাঁসি হওয়ার কথা৷

গোবিন্দ আবার টপ করে টুপিটা কপালে টেনে, চাদরে মুখ ঢেকে ফেলল৷

একজন তোতলাতে তোতলাতে বলল, 'গোবিন্দদা৷ তোমার না ফাঁসি হওয়ার কথা ছিল! ভূত হয়ে আসনি তো?'

আর একজন রাম-নাম করতে করতে কাঁপা গলায় বলে, 'সব ভুলে গেলে নাকি গোবিন্দদা?'

একজন একটু সাহসী৷ সে বলল, 'ব্যাপারটা কী? পালিয়ে-টালিয়ে এসেছ নাকি? ভূত-টুত বলে তো মনে হচ্ছে না৷'

গোবিন্দ জবাব দিচ্ছিল না৷ খোলা দরজা দিয়ে তাঁবুর ভিতরে গোল জায়গাটা দেখছিল এক মনে৷ এই সার্কাসে সে বহু খেলা দেখিয়েছে৷ আপনা থেকেই তার একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল৷

জোয়ান জোয়ান লোকগুলো তার দিকে তাকিয়ে আছে, কী করবে বুঝতে পারছে না৷ জেলে যাওয়ার আগে গোবিন্দ যখন সার্কাসে খেলা দেখাত তখনও সবাই তাকে ভয় খেত৷ মাথায় গোবিন্দ লম্বা নয় বটে, তবে তার গায়ে প্রচণ্ড জোরের কথা সবাই জানে৷ তার ওপর গোবিন্দর হাত-পা চলত বিদ্যুৎ গতিতে৷ তেমনই ছিল তার প্রচণ্ড রাগ৷ অমন খুনে রাগও দেখা যায় না বড়ো একটা৷ গোবিন্দকে তাই কেউ কখনো চটাতে সাহস করত না৷ আজও তাকে দেখে লোকগুলো ভয়ে ভাবনায় সিঁটিয়ে আছে৷

গোবিন্দ মৃদুস্বরে একটা লোককে ডেকে আড়ালে নিয়ে বলল, 'সামন্তমশাইয়ের তাঁবুটা কোন দিকে রে?'

'দেখা করবে গোবিন্দদা?'

'করেই যাই৷'

'চলো তাহলে৷' লোকটা খুশি হয়ে বলে, 'সামন্তমশাই তোমার কথা খুব বলে৷ বলে, গোবিন্দটা খুন করল বটে, কিন্তু ওরকম খেলোয়াড় হয় না৷'

গোবিন্দ এ-কথার জবাব দিল না৷ বারো-তেরো বছর বয়সে সে সামন্তমশাইয়ের সার্কাসে চলে এসেছিল৷ এই সার্কাসের সঙ্গে ঘুরে ঘুরেই ছোটো থেকে বড়ো হয়েছে৷ সে আর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷

সামন্তমশায়ের তাঁবুটা একটু পিছনের দিকে, আলাদা জায়গায়৷ তাঁবুর এমনিতে কোনো চাকচিক্য নেই, তবে ভিতরটা বেশ বৈঠকি ঢঙে সাজানো৷ সেজবাতি জ্বলছে৷ নীচু একটা তক্তপোষে পুরু গদির বিছানা৷ তার ওপর বেশ কয়েকটা পুরুষ্টু তাকিয়া৷ বুড়ো সামন্তমশাই বসে ভালো গন্ধওয়ালা তামাক খাচ্ছে গড়গড়ায়৷ সামন্তর চেহারা রোগার দিকেই, তবে রুগণ নয়৷ মাথার চুল কাঁচাপাকায় মেশানো৷ মস্ত পাকানো গোঁফ৷ চোখের দিকে চাইলে বুক গুড়গুড় করে৷ ভয়ডর বলতে কিছু নেই সেই চোখে৷ তবে লোকে তাকে ভয় খায়, আবার ভালোও বাসে৷ চিরকুমার সামন্তমশাই সারা জীবন তিলে তিলে এই সার্কাসখানা তৈরি করেছে৷ সার্কাসটাই তার ধ্যানজ্ঞান৷ এটা থেকে তার বেশ মোটা লাভও হয়৷ কিন্তু সেই টাকা কে খাবে তার ঠিক নেই৷ সামন্ত তাই ইদানীং একটু চিন্তিত৷

দু-জনে ঘরে ঢুকতেই সামন্ত মুখ থেকে তামাকের নলটা সরিয়ে অল্প আলোয় ঠাহর করে দেখতে দেখতে বলে, 'কে রে? কী চায়?'

গোবিন্দ এগিয়ে গিয়ে ভুঁয়ে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়াল৷ মুখের ঢাকা সরিয়ে বলে, 'আমি গোবিন্দ, সামন্তমশাই৷'

সামন্ত যেন ছ্যাঁকা খেয়ে সোজা হয়ে বসে৷ বলে, 'কে বললি?'

'গোবিন্দ৷ মনে পড়ছে না?'

'গোবিন্দ৷' বলে সামন্ত হতবুদ্ধি হয়ে চেয়ে থাকে৷ তারপর বলে, 'তোর না ফাঁসি হয়ে গেছে?'

'হলে আর আসতাম কী করে?'

'আয় তো, এগিয়ে আয়, আলোতে ভালো করে দেখি৷'

গোবিন্দ হাসিমুখে এগিয়ে গেল৷ দাড়িগোঁফওয়ালা মুখে সেজবাতির আলো পড়ল৷

*           *            *

রামু ট্রাপিজের খেলা দেখে তাজ্জব৷ কী সাহস৷ অন্য সব সার্কাসের মতো এরা নীচে কোনো জালও খাটায়নি৷ পড়ে গেলে মাথা ফেটে ঘিলু বেরিয়ে যাবে৷ হাত-পা ভেঙে 'দ' হয়ে যাওয়ার কথা

'ঃউ, কী খেলা গবাদা৷ আমি ট্রাপিজ শিখব৷'

গবা হেসে বলে, 'আরও আছে৷ দেখই না৷'

ট্রাপিজ শেষ হতে-না-হতেই সাহেবি পোশাক পরা সার্কাসের ম্যানেজার এসে ঘোষণা করল, 'আজ আপনাদের আমরা একটা নতুন খেলা দেখাব৷ লখিন্দর আর কালনাগিনীর খেলা৷ জীবন ও মৃত্যুর খেলা৷ এই খেলায় একদিকে থাকবে আমাদের নতুন এক ওস্তাদ মাস্টার লখিন্দর অন্যদিকে থাকবে একটি বিষাক্ত রাজগোখরো৷ সাপটার বিষদাঁত আমরা কামাইনি৷ যে-কেউ পরীক্ষা করে দেখতে পারেন৷ সদ্য জঙ্গল থেকে ধরা বুনো সাপ৷ এ খেলা সবার শেষে৷'

রামু রোমাঞ্চিত হল৷ আজ নতুন খেলা৷ বাঃ, কপালটা ভালো৷

এরপর সাইকেল, দড়ি, বাঘ, সিংহ, চোখ বেঁধে ছোরা নিক্ষেপ-একের পর এক হয়ে যেতে লাগল৷ রামুর আর পলক পড়ে না৷ বাঘ-সিংহের খেলা দেখে গায়ে রোঁয়া দাঁড়িয়ে গেল তার৷ লম্বা আর বেঁটে জোকার দুটোও খুব হাসাল৷

সবার শেষে নতুন খেলা৷

সব আলো জ্বেলে গোল এরেনাটাকে একেবারে ফাঁকা করে দেওয়া হল৷ বাজনা বাজতে লাগল অত্যন্ত মৃদু শব্দে৷ একটা সুরেলা বাঁশির স্বর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল৷

কয়েকজন লোক একটা মস্ত খাচা টেনে আনল মাঝখানে৷ স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল, খাঁচার মধ্যে একটা বিশাল ভয়ংকর সাপ বিড়ে পাকিয়ে আছে৷

খাঁচার মাথায় একটা লোক বসে আছে৷

ম্যানেজার একটা পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল, 'এবার আসছেন মাস্টার লখিন্দর৷ কিন্তু আগেই আপনাদের জানিয়ে রাখি, মাস্টার লখিন্দরের মুখ আপনারা দেখতে পাবেন না৷ কয়েক বছর আগে এক দুর্ঘটনায় ওর মুখটি পুড়ে বীভৎস হয়ে যায়৷ তার ফলে উনি সব সময়েই মুখোশ পরে প্রকাশ্যে আসেন৷'

ঘোষণা শেষ হল৷ বাজনা মৃদু তরঙ্গে বাজতে লাগল৷ খাঁচার ওপরের লোকটা ছাড়া বাকি সবাই সরে গেল এরেনা থেকে৷

আগাগোড়া কালো পোশাক এবং কালো মুখোশ পরা মাস্টার লখিন্দর এসে ঢুকল৷ ভারি চটপটে তার হাঁটার ভঙ্গি৷ চওড়া কাঁধ, সরু কোমর, আঁট পোশাকের ভিতর দিয়ে শরীরের শক্ত বাঁধুনি দেখা যাচ্ছে৷

খাঁচার ওপরের লোকটা দরজাটা ওপর দিয়ে টেনে তুলতে না তুলতে বিশাল সাপটা বিদ্যুৎগতিতে বেরিয়ে এল বাইরে৷ লখিন্দর তখনও দর্শকদের অভিবাদন শেষ করেনি৷ ঠিক এই অপ্রস্তুত মুহূর্তে বিশাল গোখরো লখিন্দরের পিঠ সমান উঁচু ফণা তুলে সাঁই করে চাবুকের মতো ছোবল দিল৷

সেই দৃশ্য দেখে আর সকলের মতো চোখ বুজে ফেলল রামু৷ একটা মৃদু 'গেল গেল, এই রে, সব শেষ' গোছের আওয়াজও বেজে গেল চারদিকে৷

সবাই চোখ বুজলেও কুন্দকুসুম চোখ বোঝেননি৷ বরং তাঁর চোখের পলক পড়ছিল না৷ তাঁবুর চারদিকে যে 'হায় হায়' ধ্বনি ভেসে গেল, তিনি তাতেও যোগ দিলেন না৷

বিশাল রাজগোখরো যখন ছোবল দিল, তখন তার দিকে মাস্টার লখিন্দর পেছন ফিরে আছে৷ আর যে চাবুকের মতো গতিতে ছোবলটা এল, তা থেকে নিজেকে বাঁচানো খুব শক্ত কাজ৷

কিন্তু তবু দেখা গেল, সাপটা যেখানে ছোবলটা চালাল সেখানে লখিন্দর নেই৷ লখিন্দর লাট্টুর মতো একটা পাক খেয়ে কী করে যে সরে গেল এরেনার অন্য ধারে, সেটাই চোখ চেয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলেন কুন্দকুসুম৷

ছোবল ফসকে যাওয়ায় সাপটাও বুঝি হতভম্ব৷ আবার বিশাল ফণা তুলে কুটিল চোখে সাপটা দেখে লখিন্দরকে৷ কিন্তু ওস্তাদ লখিন্দর তখনও সাপটার দিকে পিছন ফিরে দর্শকদের হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছে৷ যেন সে জানেই না যে তার পিছনে কালান্তক যমের মতো গোখরো৷

আবার এরেনার ওপর বিদ্যুৎ খেলিয়ে সাপটা এগিয়ে গেল এবং শপাং করে ছোবল বসাল! এবার বাঁ পায়ের ডিমে৷

সেই দৃশ্য দেখে দর্শকরা পাগলের মতো চ্যাঁচাতে থাকে, 'মরে গেল মরে গেল!'

লখিন্দর এবার সরেওনি ভালো করে৷ শুধু বাঁ-পা-টা একটু ছড়িয়ে দিয়েছিল৷ এক চুলের জন্য ছোবলটা পায়ে না লেগে মাটি ছুঁয়ে উঠে গেল আবার৷

'বন্ধ করো! এ সর্বনেশে খেলা বন্ধ করো!' বলে মহিলারা চ্যাঁচাতে লাগলেন৷ চ্যাঁচানোই স্বাভাবিক৷ লখিন্দর যে সাপটার দিকে তাকাচ্ছেই না৷

সাপটা যখন তৃতীয় বার ছোবল তুলেছে, তখন লখিন্দর উবু হয়ে তার ডান পায়ের জুতোর ঢিলে হয়ে যাওয়া ফিতে বাঁধছে মুখ নীচু করে৷ সুতরাং তার মাথাটা এবার একেবারে সাপের দোল-দোলন্ত ফণার সামনে৷

'আর রক্ষে নেই গবাদা!' বলে রামু হাঁটু খিমচে ধরে৷

এবার কুন্দকুসুমেরও চোখ বন্ধ করে ফেলতে ইচ্ছে হল৷ চোখের সামনে একটা নির্ঘাত মৃত্যু কার দেখতে ভালো লাগে!

সাপটা ফোঁস করে একটা ক্রুদ্ধ আওয়াজ ছেড়ে সটান লখিন্দরের মাথা লক্ষ্য করে হাতুড়ির মতো নেমে এল৷

কিন্তু আশ্চর্য এই, বসা অবস্থাতেই লখিন্দর একটা ব্যাঙের মতো লাফিয়ে সরে গেল পিছনে৷ একবারও সাপটার দিকে না তাকিয়ে বসে বসে সে জুতোর ফিতেটা শক্ত করে বেঁধে নিল ভারি নিশ্চিন্তভাবে৷

পুলিশের একজন ইনফরমার বৈরাগীর ছদ্মবেশে কুন্দকুসুমের পিছনের বেঞ্চে বসে ছিল৷ কুন্দকুসুম একবার তার দিকে ফিরে ভ্রূ কুঁচকে মাথাটা একটু ওপরে তুললেন৷ অর্থাৎ লোকটা কে?

ইনফরমার চারদিকে চেয়ে দেখে নিল, কেউ তাকে লক্ষ করছে কি না৷ কিন্তু এরেনায় যে খেলা চলছে, তার দিকে রুদ্ধশ্বাস চেয়ে মানুষ কেউ কারও দিকে তাকাতে ভুলেই গেছে৷ ইনফরমার মুখটা এগিয়ে এনে মৃদু স্বরে বলল, 'জানি না৷ তবে এ ধরনের খেলা একসময় দেখাত গোবিন্দ ওস্তাদ৷ কিন্তু কাশিমের চরের সেই মার্ডার কেসে গতকাল তার ফাঁসি হয়ে গেছে৷'

'হয়ে গেছে?'

'হয়ে গেছে৷ গোবিন্দর ভাই জেলখানায় গিয়ে মড়া নিয়ে শ্মশানে দাহ পর্যন্ত করেছে বলে খবর পেয়েছি৷'

'মুখোশের আড়ালে লোকটা তাহলে কে একটু খবর নিয়ো৷'

'যে আজ্ঞে৷'

ওদিকে এরেনায় মুখোশাবৃত লখিন্দর বারবার অবহেলায়, আনমনে ছোবল এড়িয়ে এড়িয়ে সাপটাকে হয়রান করে তুলল৷ অবশেষে সেই রাজগোখরো যখন ক্লান্তিতে ছোবল মারা মুলতুবি রেখে একেবারে বিড়ে পাকিয়ে বিশ্রাম নিতে বসল তখন শেষ হল খেলা৷ জীবন ও মৃত্যুর এই বিপজ্জনক খেলা দেখে দর্শকরা এত জোর হাততালি দিল যা অন্য কোনো খেলায় দেয়নি৷

লখিন্দর একবার হাত তুলে সবাইকে অভিবাদন জানিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল এরেনা থেকে৷

*           *            *

রাত গভীর৷ সার্কাসের চত্বরে যে যার তাঁবুতে ঘুমোচ্ছে৷ জেগে আছে শুধু কয়েকজন চৌকিদার৷ আর জেগে আছে বুড়ো সামন্তর তাঁবুতে সামন্ত আর গোবিন্দ ওস্তাদ৷

সামন্ত মৃদু স্বরে বলে, 'এবার ঘটনাটা খুলে বল৷'

গোবিন্দ একটু হাসল৷ বলল, 'কাল আমার ফাঁসি হয়ে গেছে৷ এমনকী দাহকাজ পর্যন্ত সারা৷'

সামন্ত তামাকের নলটা মুখ থেকে সরিয়ে বলে, 'আর একটু খোলসা করে বল৷ তোকে ফাঁসি দেয়নি তো দিল কাকে?'

গোবিন্দ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, 'তা আমি জানি না৷ ফাঁসি হবে বলে জানিয়ে দিয়েছিল আমাকে৷ আমিও তার জন্য তৈরি ছিলাম৷ কিন্তু মাসখানেক আগে একদিন সকালে আমাকে যখন জেলখানার চত্বরে পায়চারি করাচ্ছিল, তখন দেখি কয়েকজন রাজমিস্ত্রি ভারা বেঁধে জেলখানার উঁচু ঘেরা দেওয়ালে মেরামতির কাজ করছে৷'

'তুই তখন কী করলি?'

'আজ্ঞে মাথায় তখন মতলবটা খেলে গেল৷ ভাবলাম, এই সুযোগ পরে আর পাব না৷ আমাকে দু-জন বিশাল চেহারার সেপাই পাহারা দিচ্ছিল৷ আমি তাদের ঠাট্টা করে বললাম ওই যে রাজমিস্ত্রি ভারা বেঁধেছে ওটায় উঠে যদি কোনো কয়েদি পালায় তবে কী করবে? ওরা বলল, অত সহজ নয়৷ তুই পারবি? আমি হেসে বললাম, চেষ্টা করতে পারি৷ ওরাও হাসল, বলল, কর না দেখি৷'

'বলল?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ৷ আমিও ইয়ার্কির ভাব দেখিয়ে হেঁটে গিয়ে ভারার পয়লা বাঁশটায় উঠে পড়লাম৷ তারা দেখি তখনও মোচে তা দিচ্ছে আর ফিড়িক ফিড়িক করে হাসছে৷ আমি আর এক ধাপ উঠলাম৷ কেউ কিছু বলল না৷ রাজমিস্ত্রিরাও একমনে কাজ করে যাচ্ছে, আমার দিকে তাকাচ্ছে না৷ এক ধাপ দু-ধাপ করে আমি একদম দেওয়ালের মাথায় পৌঁছে দেখি, তখনও সেপাই দুটো হাসছে আর মোচে তা দিচ্ছে৷'

'বলিস কী?'

'যা হয়েছিল তা বলছি৷ দেওয়ালের মাথায় উঠে আমার মনে হল, কোনো কারণে জেলখানার কর্তৃপক্ষ আমাকে পালানোর সুযোগ ইচ্ছে করেই দিচ্ছে৷ নইলে ততক্ষণে পাগলা ঘণ্টি বেজে ওঠার কথা৷ বাজল না দেখে আমি দেওয়ালের ওপর থেকে ঠাকুরের নাম করে বাইরের দিকে ঝাঁপ মারলাম৷ ট্রাপিজের খেলা দেখাতে গিয়ে অনেক উঁচু থেকে লাফ মারার অভ্যাস থাকায় হাড়গোড় ভাঙেনি৷ পড়েই কয়েকটা ডিগবাজি খেয়ে সামলে নিলাম৷ তারপর দৌড়৷'

'তাহলে ফাঁসিটা হল কার?'

'তার আর খোঁজ নিইনি৷ পালিয়ে সোজা গাঁয়ের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম৷ একটা ব্যাগে জামাকাপড় আর কিছু টাকা নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লাম তক্ষুনি৷ বাড়ির লোককে বলে এলাম, যেন কাউকে কিছু না বলে৷ নিজের বাড়ি ছাড়া দুনিয়ায় আমার আর একটা মাত্র আশ্রয় আছে৷ তা হল এই সার্কাস৷ সার্কাসের জন্য জেলখানাতেও প্রাণটা কাঁদত৷ তাই ঘুরতে ঘুরতে এসে হাজির হয়ে পড়েছি৷'

'বেশ করেছিস৷ ভালো করেছিস৷ তবে কিনা . . .' সামন্তকে একটু চিন্তিত দেখায়৷

'আমি এসে কি আপনাকে বিপদে ফেললাম সামন্তমশাই?'

সামন্ত গম্ভীর হয়ে বলে, 'তুই আমার ছেলের মতো৷ ছেলে যদি বিপদে পড়ে আসে, তাহলে কি নিজের বিপদের চিন্তা থাকে রে গাধা! আমি ভাবছি তুই আজ খেলা দেখিয়ে ভুল করলি কি না৷ কুন্দ-দারোগা আজ খেলা দেখতে এসেছিল৷ লোকটা খুবই বুদ্ধিমান৷ সে যদি গন্ধ পায় তবে তোর পক্ষে এ-জায়গা আর নিরাপদ নয়৷'

'খেলা না দেখিয়ে যে হাঁফিয়ে পড়েছিলাম সামন্তমশাই৷ জেলখানায় তো ধরেই নিয়েছিলাম এই জীবনে আর সার্কাসের খেলা দেখানো হবে না৷ ঠাকুরের কাছে রোজ বলতাম, পরের জন্মে যেন আবার সার্কাসের খেলোয়াড় হতে পারি৷'

সামন্ত মাথা নেড়ে বলে, 'এই সার্কাসকে তুই যে বুক দিয়ে ভালোবাসিস তা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে? আমারও ইচ্ছে ছিল, মরার সময় এই সার্কাসের সব ভার তোকেই দিয়ে যাব৷ কিন্তু কাশিমের চরের সেই খুনটাই সব গোলমাল করে দিল৷'

এবার গোবিন্দ গম্ভীর হয়ে বলল, 'হরিহর পাড়ুই লোক খুব ভালো ছিল না৷ কিন্তু তাকে যে আমি খুনি করিনি, তা কি আপনি বিশ্বাস করেন?'

'করি৷ আমি জানি তুই রাগী বটে, কিন্তু কখনো পিঁপড়েটাকেও মারতে চাস না৷ খুন তোর দ্বারা হওয়ার নয়৷'

*           *            *

রাত নিশুত হলেই যে সবাই লক্ষ্মী ছেলের মতো ঘুমিয়ে পড়ে তা নয়৷

উদ্ধববাবুর চণ্ডীমণ্ডপের পাশে একটা ছোট্ট খুপরিতে খাটিয়ায় বিছানো খড়ের বিছানায় কুটকুটে এক কম্বল মুড়ি দিয়ে আরামসে ঘুমোচ্ছিল গবা পাগলা৷ কিন্তু ঘুম তার খুব সজাগ৷ হঠাৎ চটকা ভেঙে সে উঠে বসল৷

দুর্দান্ত হাড়-কাঁপানো শীত পড়েছে আজকে৷ বাইরেটা কুয়াশা আর অন্ধকারে মাখা৷ খুপরিটার দরজা একটা কাঠের খিল দিয়ে আটকানো ছিল৷ সেটা খুলে দরজাটা অনেকখানি ফাঁক হয়ে আছে, এটা অন্ধকারেও দেখতে পেল গবা৷ দেখে মৃদু একটু হাসল৷ তারপর বেশ হেঁকে বলে উঠল, 'কাকাতুয়ার মাথায় ঝুঁটি খেঁকশিয়ালি পালায় ছুটি৷ পালা পালা পালা রে বাপ, নইলে হয়ে যাবি যে সাফ৷ পাগলা গবা ধরবে এসে টুঁটি!'

হয়তো আরও বলত গবা, কিন্তু তার আগেই দরজা নিঃশব্দে আর একটু ফাঁক হল৷ একটা ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়াল চৌকাঠে৷

'গবা,' একটা ভারী গলার গম্ভীর আওয়াজ হল৷

'ও!' গবা জবাব দেয়৷

'তুমি আসলে কে তা আমি জানি৷'

গবা চোখ পিটপিট করতে থাকে৷

লোকটা আবার বলে, 'যদি বেঁচে থাকতে চাও তবে আমি যা বলছি ঠিক তাই করবে৷ পাগলামির ভান কোরো না৷ আমি জানি, তুমি কস্মিনকালেও পাগল নও৷'

গবা নিরীহ গলায় জিজ্ঞেস করে, 'আপনি কে?'

উদ্ধববাবু ওঠেন একেবারে কাকভোরে৷ তখনও আকাশে চাঁদ তারা থাকে৷ উঠে মুখ-হাত ধুয়ে ঠাকুর পুজো সেরে বেড়াতে বেরোন৷ আর বেরিয়েই বেশ গলা ছেড়ে গান ধরেন৷

আসল কথা হল, ছেলেবেলা থেকেই উদ্ধববাবুর খুব গাইয়ে হওয়ার শখ৷ শখটা খুব তীব্র, কিন্তু তাঁর গলায় সুর নেই৷ সুরটা এমন জিনিস যে, জন্ম থেকে যার আছে তার আছে৷ যার নেই, সে গলা সেধে মুখে রক্ত তুলে ফেললেও হবে না৷

উদ্ধববাবুর গলা নেই৷ তবু সেই ছেলেবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে গলা সেধেছেন, গানের মাস্টারমশাই রেখেছেন, বড়ো বড়ো ওস্তাদের জলসায় গেছেন৷ তাঁর ধারণা ছিল সাধনায় সব হয়৷ কিন্তু গানের সাধনা করতে গিয়ে লেখাপড়ায় জলাঞ্জলি হচ্ছে দেখে বাবা খুব রাগারাগি করতেন৷ তারপর গান গাইতে বসলে পাড়াপ্রতিবেশীরা কাঁসর-ঘণ্টা বাজাত, শাঁখে ফুঁ দিত৷ একবার নতুন এক বউদি তাঁকে বলেছিলেন, 'উদ্ধব ঠাকুরপো, চার আনা পয়সা দেব, আজ আর গান গেয়ো না৷'

এইসব দুঃখজনক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর উদ্ধবাবু আর প্রকাশ্যে গান গায় না৷ তবে তাঁর এখনও ধারণা, চেষ্টা করলে এবং লোকে বাগড়া না দিলে তাঁর গলা একদিন খুলে যেত ঠিকই৷

যেত কেন, গেছেই৷ প্রকাশ্যে গান না গাইলেও রোজ সকালে বেড়াতে বেরিয়ে শহরের নির্জন প্রান্তে এসে উদ্ধববাবু নিয়মিত গলা সাধেন৷ দীর্ঘদিনের এই গোপন সাধনার ফলে তিনি ইদানীং লক্ষ করছেন, তাঁর গলায় সাতটা সুর চমৎকার খেলা করছে৷ হাঁ করলেই যেন গলা থেকে সাতটা পাখি বেরিয়ে চারদিকে উড়ে বেড়ায়৷

উদ্ধববাবুর খুব ইচ্ছে, এবার একদিন লোকজন ডেকে সকলের সামনে গান গেয়ে তাক লাগিয়ে দেন৷ কিন্তু মুশকিল হল, ওস্তাদ রাঘব ঘোষকে নিয়ে৷ উদ্ধববাবু রাঘবকে দু-চোখে দেখতে পারেন না৷ সারা তল্লাটের লোক রাঘবকে বড়ো ওস্তাদ বলে কেন যে অত খাতির করে, তাও তাঁর বোধের অগম্য৷

সে যাই হোক, একদিন তিনি পুবের মাঠে এক শিশিরভোরে খুব আবেগ দিয়ে ভৈরবী ধরেছিলেন৷ চোখ বুজে গাইছেন৷ হঠাৎ একটা ফোঁপানির শব্দে গান থামিয়ে চোখ মেলে দেখেন, সামনেই রাঘব৷ ধুতির খুঁটে চোখ মুছে রাঘব বললেন, 'এমন অনৈসর্গিক গান কখনো শুনিনি উকিলবাবু৷ তবে বলি এ গান সকলকে শোনানোর নয়৷ বিশেষ করে আপনার মক্কেলরা যদি শোনে, তবে তাদের ধারণা হবে, ইনি যখন এত ভালো গায়ক, তখন নিশ্চয়ই ভালো উকিল নন৷ কারণ প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে একজন মানুষ সাধারণত একটা বিষয়েই পারফেকশন লাভ করতে পারে৷'

সেই থেকে উদ্ধববাবুর রাগ৷ ইচ্ছে করেই তিনি রোজ সকালে একবার রাঘব ঘোষের বাড়ির কাছাকাছি এসে খানিকক্ষণ গান ধরেন৷ অভদ্র লোকটা বুঝুক গান কাকে বলে৷ আজও উদ্ধববাবু পুবের মাঠে এসে রাঘবের বাড়ির দিকে মুখ করে চমৎকার তান লাগালেন ভৈরবীতে৷ গাইতে গাইতে তাঁর নিজের পিঠ নিজেরই চাপড়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠতে ইচ্ছে করছিল, শাব্বাশ৷

আশ্চর্য, এই চোখ বুজে গাইতে গাইতেই হঠাৎ টের পেলেন, কে যেন সত্যিই তাঁর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে উঠল, 'শাব্বাশ৷'

উদ্ধববাবু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেন গবা পাগলা!

গবাও বেকুবের মতো চেয়ে চেয়ে খানিকক্ষণ তাঁকে দেখে বলে উঠল, 'উদ্ধবকর্তার যে আবার গান-বাজনাও আসে, তা তো জানতাম না৷'

উদ্ধববাবু একটু রাগের গলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'এখানে কী করছিস?'

গবা মাথা চুলকে বলল, 'আজ্ঞে কিছু করছিলাম না৷ কাল রাতে একটি লোক আমাকে এখানে খুন করে রেখে গেল৷ সেই থেকে মরে পড়েছিলাম৷ হঠাৎ এই সকাল বেলায় আপনার গানে প্রাণ ফিরে এল৷ ঃও, কী গান৷ মড়া পর্যন্ত উঠে বসে৷'

'কী যা-তা বলছিস৷ কে তোকে মেরে রেখে গেল?'

'আজ্ঞে, তাকে তো চিনি না৷ কালো পোশাক পরা, মুখ ঢাকা৷ রাতে গিয়ে আমার ঘরে হাজির৷ বলল, তোমাকে একটা কাজ করতে হবে, অনেক টাকা দেব৷ রাজি না হলে প্রাণ যাবে৷'

'বলিস কী?'

'আজ্ঞে, যা ঘটেছিল, বলছি৷ লোকটা বেশি ধানাইপানাই না করে বলল, উদ্ধববাবু যে কাকাতুয়াটা কিনেছেন সেটা আসলে আমার৷ কিন্তু প্রমাণ করার উপায় নেই৷ আমি পাখিটাকে কিনতে চাই, কিন্তু উদ্ধববাবু বেচতে তেমন গা করছেন না৷ আইন দেখাচ্ছেন৷ আমার বড়ো আদরের কাকাতুয়া৷ তা তুমি যদি পাখিটা উদ্ধার করে দিতে পার, তবে দু-শো টাকা পাবে৷ নইলে . . .'

'নইলে মেরে ফেলবে?'

'ওর নইলে কথাটায় আমার খটকা লাগল৷ পাখিটা ফেরত চায় কেন? অত গরজ কীসের? তা আমি সেই কথাটা জিজ্ঞেস করতেই লোকটা অ্যাই বড়ো একটা ভোজালি বের করে আর এক হাতে আমার টুঁটি ধরে টানতে টানতে মাঠের মধ্যে নিয়ে এল৷'

'অ্যাটেমপট অব মার্ডার৷' উদ্ধববাবু ওকালতি-মাথা কাজ করছে৷ বিড়বিড় করে বললেন, 'অ্যাটেমপট অব থেপট, থ্রেটেনিং অ্যান্ড অ্যাসল্ট৷ তা লোকটা হঠাৎ ভোজালি বের করলই-বা কেন? তুই তাকে কী বলেছিলি?'

'আজ্ঞে আমি তাঁকে বলেছিলাম, যুধিষ্ঠিরবাবু, আপনার পাখিটার জন্য এত গরজ কীসের?'

'যুধিষ্ঠিরবাবু! সে আবার কে?'

'আপনি চেনেন তাঁকে! বাচ্চাদের বাড়িতে পড়ান যে নতুন মাস্টারমশাই, তিনি-'

'বলিস কী! লোকটা কি সত্যিই যুধিষ্ঠির?'

'আজ্ঞে না৷ সত্যিকারের যুধিষ্ঠির ছিলেন ধর্মপুত্তুর৷ ইনি তিনি নন৷'

'আরে দূর গাধা! আমি বলছি আমাদের যুধিষ্ঠির কি না৷'

'তাই বা বলি কী করে? তবে যুধিষ্ঠিরবাবু খুব পান আর জর্দা খান৷ আমিও রাত্রিবেলায় যমদূতটার মুখ থেকে সেই জর্দার গন্ধ পেয়েছিলাম৷ তাই-'

'তারপর?'

'তারপর মাঠের মধ্যে এনে লোকটা ছোরা রেখে দু-হাতে আমার গলা টিপে শ্বাস বন্ধ করে মেরে ফেলল৷'

'ফেলল? তবে বেঁচে রইলি কী করে?'

'কে বলল বেঁচে ছিলাম? সেই কখন থেকে মরে পড়ে আছি৷ সকাল বেলা আপনার গান শুনে মরা দেহও জেগে উঠল৷ তাই ভাবলাম, এমন যার গান, তাকে একটা শাবাশ জানিয়ে আসি৷ তা এসে দেখি আপনি স্বয়ং৷'

উদ্ধববাবু গানের কথায় একটু গম্ভীর হলেন৷ বললেন, 'গানের কথাটা অত বলার দরকার নেই৷'

গবা অবাক হয়ে বলে, 'বলেন কী? এমন উপকারী গান আমি জন্মে শুনিনি! আপনার গান শুনতে তেমন ভালো নয় বটে৷ মাথা ঘোরে, গা বমি বমি করে, ভিতরটা কেমন চমকে চমকে ওঠে৷ কিন্তু মরা শরীরে প্রাণও ফিরে আসে৷ পারবে রাঘব ঘোষ এমন গান গাইতে? রাঘবের তা-না-না কেবল লোক ভোলানোর জন্য৷ এখনও সা লাগাতে পারল না ঠিকমতো৷'

এ কথায় উদ্ধব খুশি হলেন৷ বললেন, 'হুঁ৷'

গবা বলল, 'এ গান অবহেলার বস্তু নয়৷ কবরখানার কাছে বসে গাইলে কবর ফুঁড়ে অনেক মড়া জ্যান্ত হয়ে উঠে আসবে৷ শ্মশানের কাছে বসে গাইলে অনেক মড়া চিতা থেকে লাফ দিয়ে নেমে দৌড়াদৌড়ি শুরু করবে৷'

'ঃআ! বাজে বকিস না তো! আমি ভাবছি কাকাতুয়াটার কথা৷ ওটাকে নিয়ে চারদিকে একটা ষড়যন্ত্র চলছে৷ খোঁজ নিয়ে বের কর যে কাকাতুয়াটা আসলে কার! পাখিটা মাঝে মাঝে টাকার কথা বলে৷ মনে হয় কোনো গুপ্ত টাকার খোঁজ জানে, কিন্তু স্পষ্ট করে বলে না৷'

'আমারও তাই মনে হয়৷ দেখবখন খোঁজ নিয়ে৷'

শেষরাতে যখন গোটা সার্কাসের চত্বরটা ঘুমে অচেতন, তখন হঠাৎ নিঃশব্দে একটা ছায়ামূর্তি বাঘের খাঁচার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল৷ তার চেহারা বিশাল দশাসই৷ কিন্তু হাঁটাচলা বেড়ালের মতো ক্ষিপ্র এবং নিঃশব্দ৷

ছায়ামূর্তি সবচেয়ে কাছের ছোট্ট একটা তাঁবুর দরজার পর্দা তুলে ঢুকে যায়৷ তার হাতে খোলা রিভলবার এবং টর্চ৷ টর্চটা জ্বেলে সে ঘুমন্ত লোক দুটোকে দেখে৷ এরা নয়৷

আবার ক্ষিপ্র ও নিঃশব্দ গতিতে বেরিয়ে আসে ছায়ামূর্তি, আর একটা তাঁবুতে ঢোকে৷ এখানে চার জন লোক ঘুমিয়ে আছে৷ টর্চ জ্বেলে ছায়ামূর্তি তাদের ভালো করে দেখে নেয়৷ না, এরাও নয়৷

ছায়ামূর্তি একের পর এক তাঁবুতে হানা দেয়৷ কিন্তু যে লোকটাকে দেখবে বলে আশা করছে তাকে কোথাও দেখতে পায় না৷

শেষ তাঁবুটা একটু দূরে৷ খুব ছোট্ট৷ চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া৷ এমনকী ফটকটায় তালা লাগানো৷

ছায়ামূর্তি একটু দাঁড়ায়৷ তারপর চারদিকে চেয়ে দেখে নিয়ে টপ করে কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে যায়৷

রিভলবারটা বাগিয়ে ধরে লোকটা খুব সতর্কতার সঙ্গে চারদিক দেখে নেয়৷ তারপর খুব সাবধানে পর্দাটা ফাঁক করে টর্চ জ্বালে৷ অস্ফুটস্বরে বলে, 'আশ্চর্য! খুবই আশ্চর্য!'

আশ্চর্য হওয়ারই কথা৷ তাঁবুটার মধ্যে কিছুই নেই৷ এমনকী, অন্যান্য তাঁবুর মতো একটা খাটিয়াও না, মানুষ তো দূরের কথা৷

ছায়ামূর্তি টর্চটা জ্বেলে চারদিকে ঘুরে ঘুরে খুব ভালো করে দেখে৷ না, এই তাঁবুটা এখানে কেউ ব্যবহার করেনি৷ কিন্তু এই ফাঁকা তাঁবুটার জন্য এত সতর্কতা কেন তা সে বুঝতে পারে না৷ হঠাৎ ছায়ামূর্তি চমকে উঠে স্থির হয়ে দাঁড়াল৷ বাইরে একটা ঢিল পড়ার শব্দ হল না? বেশ বড়ো একটা ঢিল৷

ছায়ামূর্তি খুব সতর্কতার সঙ্গে দরজার কাছে আসে এবং বাইরে উঁকি মারে৷ চারদিকে আজ বেশ কুয়াশা আছে৷ ভীষণ ঠান্ডা৷ শেষরাতের একটু জ্যোৎস্নায় চারদিক খুব আবছা দেখা যায়৷

ছায়ামূর্তি বেরিয়ে আসার জন্য বাইরে পা দিতেই ঘটনাটা ঘটল৷

পিছন থেকে হঠাৎ কে যেন বজ্রকঠোর হাতে পেঁচিয়ে ধরল তার গলা৷ তারপর হাঁটু দিয়ে কোমর ঠেসে ধরল৷ ছায়ামূর্তি নিজে প্রচণ্ড শক্তিশালী লোক৷ গায়ের জোরে তার জুড়ি নেই৷ সুতরাং সে এক ঝটকায় হাতের বাঁধনটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল৷ কিন্তু পারল না৷ যে তাকে ধরেছে সে শুধু তার চেয়ে বেশি শক্তিশালীই নয়, অনেক বেশি ক্ষিপ্রও৷ এক হাতে ছায়ামূর্তির গলাটা ধরে রেখেই অন্য হাতে রিভলবার-ধরা হাতের ওপর একটা কারাটে চড় বসাল৷

রিভলবারটা ছিটকে গেল হাত থেকে৷ ছায়ামূর্তি যন্ত্রণায় ওফ বলে আবার লোকটাকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করতে লাগল৷

কিন্তু জোঁকের চেয়েও ছিনে লোকটার হাত আরও বজ্রবাঁধনে চেপে ধরল তাকে৷ ছায়ামূর্তি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে৷

সামন্তমশাইয়ের তাঁবুতে কুন্দকুসুম চোখ মেলে চাইলেন৷ তার জ্ঞান ফিরেছে৷ জ্ঞানবয়সে এর আগে আর কখনো কোনো অবস্থাতেই তিনি জ্ঞান হারাননি৷ অজ্ঞান হওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে এই প্রথম৷ কারও সঙ্গে গায়ের জোরে হেরে যাওয়াও এই প্রথম৷

প্রবল শীতের মধ্যে একটা লোক তাঁর মুখে অনবরত জলের ঝাপটা দিচ্ছিল৷ কুন্দকুসুম জলদগম্ভীর স্বরে তাকে বললেন, 'আর না৷'

তারপর উঠে বসলেন৷ লোকটা বিনীতভাবে একটা গামছা এগিয়ে দিল৷ তিনি মুখ মুছতে মুছতে দেখলেন, সামনেই একটা ফোল্ডিং চেয়ারে সামন্তমশাই উদ্বিগ্ন মুখে বসে আছে৷ চোখে চোখ পড়তেই বলে, 'এখন একটু ভালো বোধ করছেন তো?'

কুন্দকুসুম নিজের গলায় হাত বোলালেন৷ ব্যথা৷ কোমরেও যেন কুমির কামড়ে ধরে আছে৷ কবজিটাও বেশ কাবু৷ ঝিনঝিন করছে৷ কিন্তু সেই বলবান লোকটার রাক্ষুসে আলিঙ্গনে তার এতক্ষণে মরে লাশ হয়ে যাওয়ারই কথা৷ বেঁচে যে আছেন সেই ঢের৷ জলদগম্ভীর গলাতে বললেন, 'বেশ ভালো বোধ করছি৷ এ-যাত্রায় মরছি না৷ মরলে আপনার পোষা হারকিউলিসটির ফাঁসি হত৷'

সামন্তমশাই শশব্যস্তে বলে, 'আগে একটু গরম দুধ খান৷ গায়ে বল হোক, তারপর সব কথা৷'

তার ইশারায় মুহূর্তের মধ্যে একটা আধসেরি গ্লাস ভরতি ঈষদুষ্ণ দুধ এসে গেল৷

কুন্দকুসুম দুধটায় চুমুক দিয়ে বলেন, 'বাঃ, বেশ দুধ৷ তা এ নিশ্চয়ই গোরুমোষের দুধ নয়৷'

'কেন বলুন তো!'

'আপনার হারকিউলিসটির গায়ে যা জোর, তাতে মনে হয় সে হাতির দুধ খায়৷ কিংবা বাঘের৷ আপনার সার্কাসে বাঘ আর হাতির তো অভাব নেই৷'

সামন্ত বিনীতভাবে হাসে৷ তবে তার চাউনিতে উদবেগটা স্পষ্টই বোঝা যায়৷

কুন্দকুসুমের এই দুধটুকুর দরকার ছিল৷ চোঁ করে দুধটুকু খেয়ে গ্লাস নামিয়ে রেখে বললেন, 'বিনা নোটিশে কাল রাতে আপনার তাঁবুতে হানা দেওয়া আমার উচিত হয়নি এটা মানছি৷ আমার সার্চ ওয়ারেন্টও ছিল না৷'

সামন্তমশাই গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, 'আজ্ঞে একটা নোটিশ দিয়ে এলে এই বিপদে পড়তেন না৷ অন্ধকারে আপনাকে চিনতে না পেরে চোর-ছ্যাঁচড় ভেবে আমাদের ওয়েটলিফটার ছেলেটা ওই কাণ্ড করে ফেলেছে৷'

কুন্দকুসুম একটা শ্বাস ফেলে বললেন, 'ওর দোষ নেই৷ আমার আচরণটা চোরের মতোই হয়েছিল৷ আপনার পাহারাদাররা আমাকে ধরতে পারেনি, কিন্তু এই ছোকরা-কী নাম ছোকরার?'

'আজ্ঞে ভবতোষ৷ খুব ভালো ছেলে৷ ধার্মিক৷ মাঝরাতে উঠে নামধ্যান করে৷ কাল রাতেও তাই করছিল৷'

'হ্যাঁ ভবতোষ৷ তা এই ভবতোষ তো দিব্যি কারাটেও জানে৷ যা একখানা ঝেড়েছিল আমার কবজিতে৷ ভালো কথা, পিস্তলটা আছে তো?'

সামন্ত মাথা নেড়ে বলে, 'আছে৷ চিন্তা করবেন না৷'

কুন্দকুসুম বলেন, 'আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন, আমার এই আচরণের অর্থ কী! বলতে বাধা নেই, সেদিন সেই সাপের খেলা দেখে আমি খুব অবাক হয়েছি৷ কোনো মানুষের অত অ্যাজিলিটি থাকতে পারে তা জানতাম না৷ কিন্তু মনে হয়েছিল মাস্টার লখিন্দরের আসল নাম মাস্টার লখিন্দর নয়৷ মুখোশের আড়ালে লোকটি কে সেটা জানাই ছিল আমার উদ্দেশ্য৷'

সামন্তের চোখে উদবেগটা বাড়ল৷ বলল, 'আজ্ঞে সে আর বেশি কথা কী? হুকুম করলেই তাকে সামনে এনে হাজির করতাম৷ খামোখা এত কষ্ট করতে গেলেন৷'

কুন্দকুসুমের আচরণটা যে অদ্ভুত ঠেকছে লোকের চোখে, তা তিনি জানেন৷ কিন্তু তার জন্য লজ্জা পেলেন না৷ লজ্জা পাবার অভ্যাস তাঁর নেই৷

তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন, 'পুলিশের কাজ একটু অন্যরকম হয়৷ সবসময় সোজা পথে চললে আমাদের চলে না৷ ঠিক আছে, লখিন্দরকে একবার ডাকুন৷'

আবার সামন্তর ইঙ্গিতে একজন বেরিয়ে যায়৷ মিনিটখানেকের মধ্যেই বেশ ছমছমে চেহারার এক ছোকরা তাঁবুতে ঢুকে কুন্দকুসুমকে নমস্কার করে দাঁড়ায়৷

কুন্দকুসুম চোখ দিয়ে লোকটাকে মেপে নিচ্ছিলেন৷ আড়েদিঘে লোকটা অবিকল লখিন্দরের মাপসই বটে সন্দেহ নেই৷ কিন্তু কুন্দকুসুমের চোখকে ফাঁকি দেওয়া মুশকিল৷ বাঁ-হাতের কড়ে আঙুলটা আসল লখিন্দরের একটু বেশি মাত্রায় ছোটো ছিল৷ তিনি একটু বিস্ময়ের গলায় বললেন, 'এই কি সেই?'

'আজ্ঞে৷ দলছুট হয়ে গিয়েছিল৷ ওর ঠাকুমার খুব অসুখ৷ তাঁকে দেখতে দেশের বাড়িতে যাওয়ায় এখানে প্রথমে খেলা দেখাতে পারেনি৷ অদ্য ফিরেছে৷'

'হুঁ৷' বলে কুন্দকুসুম ছেলেটার দিকে চেয়ে বলেন, 'তোমার নাম কী?'

'লখিন্দর৷ লখিন্দর কর্মকার৷'

'আচ্ছা, তুমি এখন যেতে পার৷'

কুন্দকুসুম যে সন্তুষ্ট হননি, তা টের পেল সামন্ত৷ মুখে উদবেগটা বাড়ল৷ বলল, 'লুচি ভাজা হচ্ছে৷ একটু বসে যান দারোগাবাবু৷'

'নাঃ, কাজ আছে৷' বলে কুন্দকুসুম উঠলেন৷

বাড়িতে ফিরে সেদিন কুন্দকুসুম তাঁর দুই ছেলে আন্দামান আর নিকোবরকে খুব পেটালেন, পড়ার টেবিলে বসে কাটাকুটি খেলছিল বলে৷ আসলে সেটা কারণ নয়৷ খুব রেগে গেলে কুন্দকুসুমের রাগ পড়ে একমাত্র কাউকে ধরে বেধড়ক পেটালে৷

বাসায় এসে তিনি আড়কাঠিকে ডেকে পাঠালেন৷ সুড়ুঙ্গে চেহারার ধূর্ত লোকটা এসে দাঁড়ালে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোর খবর ঠিক তো?'

'আজ্ঞে একদম পাকা৷'

'সামন্ত কিন্তু অন্য এক ছোকরাকে দেখাল৷'

'সামন্ত খুনিটাকে আড়াল করছে৷'

'আচ্ছা যা৷ চোখ-কান খোলা রাখিস৷'

*           *            *

যুধিষ্ঠির রায় সকাল বেলায় যথারীতি পড়াতে এসেছেন৷ নিপাট ভালোমানুষ৷ সাদা ধুতি আর সাদা শার্ট পরনে৷ অল্পবয়সি৷ চোখেমুখে লেখাপড়া এবং বুদ্ধির ছাপ আছে৷ তবে দোষের মধ্যে জর্দা দেওয়া পান খান৷

উদ্ধববাবু তক্কে তক্কে ছিলেন৷ কাছারিঘরে মক্কেলদের ভিড় ছিল খুবই৷ তবু এক ফাঁকে এসে ছেলেদের পড়ার ঘরে হানা দিলেন৷ উদ্ধববাবু কোনোরকম নেশা পছন্দ করেন না৷ তিনি নিজে সুপুরিটা পর্যন্ত খান না৷ বাচ্চাদের পড়ার ঘর জর্দার গন্ধে ম-ম করছে৷ তিনি একটু নাক কোঁচকালেন৷ গন্ধটা খারাপ নয়৷ বরং বেশ ভালো দামি আতরের গন্ধই৷ কিন্তু বাচ্চাদের শিক্ষকরা যদি নেশা-টেশা করেন, তাহলে শিশু-মস্তিষ্কে তার প্রভাব পড়তে পারে৷

উদ্ধববাবু গলা খাঁকারি দিলেন৷ যুধিষ্ঠির খুব নিবিষ্ট মনে রামুকে অঙ্ক করাচ্ছিলেন৷ শব্দ শুনে শশব্যস্তে উঠে দাঁড়ালেন৷ বললেন, 'কিছু বলবেন?'

উদ্ধববাবু ছেলেবেলা থেকেই শিক্ষকদের সম্মান করতে শিখেছেন৷ তাঁর মতে দেশের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মানুষ ছিলেন শিক্ষকরা৷ রাষ্ট্রের উচিত প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির চেয়ে শিক্ষকদের বেশি সম্মান দেওয়া৷ নইলে শিক্ষকের ওপর ছাত্রদের শ্রদ্ধা আসে না৷ আর শ্রদ্ধা ছাড়া জ্ঞান আসবে কী করে?

উদ্ধববাবু খুব বিনীতভাবে হাতজোড় করে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, 'আজ্ঞে কথা সামান্যই৷ আপনার ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই৷ বসুন৷'

যুধিষ্ঠির বসলেন৷ কিন্তু উদ্ধববাবু কথাটা কীভাবে শুরু করবেন তা বুঝতে পারছিলেন না৷ তিনি উকিল মানুষ৷ পাজি-বদমাশ-খুনে দেখে দেখে চোখ পেকে গেছে৷ সেই অভিজ্ঞ চোখে যুধিষ্ঠিরের মধ্যে কোনো খুনির লক্ষণ দেখলেন না৷

উদ্ধববাবু আমতা-আমতা করে বললেন, 'ইয়ে, আপনার পান খাওয়ার অভ্যাস আছে দেখছি৷'

'আজ্ঞে৷ পান খেলে আমার কনসেনট্রেশনটা ভালো হয়৷'

'তা ভালোই৷ ইয়ে, বলছিলাম কী, আপনি কি রাত্রি বেলায় পান-জর্দা খান?'

যুধিষ্ঠির একটু অবাক হয়ে বলেন, 'আজ্ঞে না! সারাদিনে এই সকাল বেলাই একটা৷ ব্যস৷'

উদ্ধব মাথা চুলকে বললেন, 'গবাটা যে কী সব আবোল-তাবোল বকে তার ঠিক নেই৷'

'গবা কে?'

'ওই একটা পাগল আছে৷ এ-বাড়িতেই থাকে৷'

যুধিষ্ঠির মাথা নেড়ে বলেন, 'গবা পাগলা? ঃও হোঃ, তার কথা সব শুনেছি৷ লোকে বলে লোকটা নাকি ছদ্মবেশী বৈজ্ঞানিক৷ তার সঙ্গে একবার দেখা করার খুব ইচ্ছে আছে৷'

উদ্ধববাবু দুম করে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমাদের বাড়িতে একটা কাকাতুয়া আছে তা কি আপনি জানেন?'

যুধিষ্ঠির আরও একটু অবাক হয়ে বললেন, 'জানি বই কী৷ রামুর মুখে শুনেছিলাম আপনাদের কাকাতুয়াটা নাকি গুপ্তধনের কথা বলে৷'

উদ্ধববাবু একটু রাগত চোখে রামুর দিকে তাকিয়ে নিলেন৷ তারপর যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করছেন, 'কাল রাতে আপনার ভালো ঘুম হয়েছিল তো?'

উদ্ধববাবুর ছেলে-মেয়েরাও পড়া ভুলে বাবার দিকে চেয়েছিল৷ এবার তারা নিজেদের মধ্যে তাকাতাকি করতে লাগল৷ যুধিষ্ঠিরও খুব অস্বস্তি বোধ করছেন৷ পান, কাকাতুয়া, ঘুম এসব অসংলগ্ন কথাবার্তা শুনে তারা সবাই অবাক৷

উদ্ধববাবু বুঝতে পারছেন, আদালতে দাঁড়িয়ে যত ভালো সওয়ালই করুন না কেন আজ ছেলে-মেয়েদের সামনে তাদের মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে সওয়াল-জবাব করতে গিয়ে তিনি নিতান্ত আহাম্মক বা পাগল বলে প্রমাণ হচ্ছেন৷

যুধিষ্ঠির অবাক হলেও কথায় তা প্রকাশ করলেন না৷ বিনীত ভাবেই বললেন, 'আজ্ঞে আমার বরাবরই ভালো ঘুম হয়৷ কাল রাতেও মড়ার মতো ঘুমিয়েছি৷'

'বেশ বেশ৷' বলে উদ্ধববাবু তাড়াতাড়ি সরে পড়লেন৷ গবাটাকে হাতের কাছে পেলে মাথায় কষে একটা গাঁট্টা লাগাতেন৷

কিন্তু গবা হাতের কাছে ছিল না৷

সকাল বেলায় সার্কাসের খেলোয়াড়রা ট্রেনারের নির্দেশে কসরত করছিল৷ আসল যে-সব খেলা তারা দেখায়, তার চেয়েও এই কসরত বেশি কঠিন৷

কসরতের সময় ট্রাপিজের জন্য নীচে জাল টাঙানো হয়েছে৷ জালের ওপর অনেক উঁচুতে, শূন্যে ট্রাপিজ-শিল্পীরা দোল খাচ্ছে৷ জালের নীচে চলছে সাইকেল, বিম ব্যালান্স ইত্যাদি৷ এক ধারে শক্ত করে দুটো খুঁটিতে বাঁধা তারের ওপর চলছে শীর্ষাসন৷ এক চাকার সাইকেলে একজনকে কাঁধে নিয়ে আর একজন এপার-ওপার হচ্ছে৷ আগু-পিছু করে৷ জোকাররা নানারকম ডিগবাজির ভেলকি লাগাচ্ছে এরেনার অন্য ধারে৷ দামি সিটের একটা চেয়ারে বিমর্ষ মুখে বসে দেখছে সামন্ত৷ পুলিশ পিছনে লেগেছে, এখানকার ডেরাডান্ডা শিগগিরই তুলতে হবে৷ কিন্তু তুললেই যে রেহাই মিলবে এমন নয়৷ কাশিমের চরে হরিহর পাড়ুই খুন হওয়ার পর কিছুদিন পুলিশের জ্বালায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছিল৷ গোবিন্দকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ঝামেলা মিটেছিল বটে, কিন্তু গোবিন্দের শোকে সামন্তর আহার-নিদ্রা ঘুচে গিয়েছিল৷ গোবিন্দ ফিরেছে, সেই সঙ্গে ঝামেলাও৷ মেরে ফেললেও অবশ্য সার্কাসের কেউ পুলিশের কাছে স্বীকার করবে না যে, গোবিন্দ এখানে লুকিয়ে আছে৷ কিন্তু তাতে আর কতটুকু কী ভালো হবে? ভেবে ভেবে সামন্তর মাথা গরম, মন উচাটন৷

একটা উটকো লোক হঠাৎ তাঁবুতে ঢুকে পড়ায় একটা শোরগোল পড়ে গেল৷ সামন্ত চোখ তুলে দেখে, একটা পাগল৷ গায়ে আলপাকার কোট, গালে দাড়ি, ময়লা পাতলুন৷ লম্বা লম্বা চুলে জট পড়েছে৷ বেঁটে জোকার বক্রেশ্বর রে-রে করে তেড়ে গেল তার দিকে৷ লোকটা বক্রেশ্বরকে লক্ষই করল না৷ চারদিকে চেয়ে তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, 'ছোঃ, এইসব খেলা দেখিয়ে লোক ঠকাও নাকি তোমরা?'

বক্রেশ্বর যখন খেলা দেখায় তখন তার হাতে একটা চুষিকাঠি থাকে৷ সেইটেই সে লাঠির মতো ব্যবহার করে৷ এখনও সেইটে বাগিয়ে ধরে বলল, 'দেব নাকি কয়েক ঘা?'

লোকটা বক্রেশ্বরকে ভালো করে দেখার জন্য কোটের পকেট থেকে একটা দূরবিন বের করে চোখে লাগায়৷ ভালো করে দেখে নিয়ে বলে, 'তোমার চেয়ে ঢের বেঁটে লোক দেখেছি৷ অত কায়দা দেখিয়ো না৷'

বক্রেশ্বর বুক ফুলিয়ে বলে, 'আমি ভারতবর্ষের সবচেয়ে বেঁটে মানুষ৷ নইলে আমাকে ঠাহর করতে তোমার দূরবিন লাগল কেন হে?'

লোকটা হেসে বলে, 'অ্যায়সা বেঁটে মানুষও আছে, যাকে দেখতে মাইক্রোস্কোপ লাগে৷ যাও, যাও মেলা বোকো না৷'

বক্রেশ্বর চুষিকাঠিটা তুলে মারতে গেল৷ কিন্তু হঠাৎ কী ভেবে থমকে গিয়ে খানিকক্ষণ লোকটার দিকে চেয়ে থেকে বলে, 'আরে! চেনা চেনা লাগছে যে৷'

'আমাকে সবাই চেনে৷ আমি হচ্ছি গবা পাগলা৷'

'সাজা পাগল? না হওয়া পাগল?'

'আসল পাগল হে, আসল পাগল?'

'বেশি বোকো না, তোমার চেয়ে ঢের বেশি পাগল লোক আমি দেখেছি৷'

'দেখেছ? সত্যি?'

'সেইসব পাগলকে দেখলেই বোঝা যায়, এই হচ্ছে খাঁটি পাগল৷ তাকে বলতে হয় না, আমি অমুক পাগলা৷'

গবা মুখ বিকৃত করে বলল, 'এমন পাগলামি দেখাতে পারি যা দেখলে তোমার পিণ্ডি চটকে যাবে৷ কিন্তু এখন কাজে আসা, পাগলামির সময় নেই৷ সামন্তমশাইকে দুটো কাজের কথা জিজ্ঞেস করে যাব৷ তিনি কোথায়?'

বক্রেশ্বর চোখ পিটপিট করে লোকটাকে দেখে হঠাৎ ফিক করে হেসে বলল, 'বলি ও ভাই পাগলা গবা! আর কতকাল পাগলা রবা? গোল ছেড়ে কও আসল কথা৷ পা নেই তার পায়ে ব্যথা৷'

লোকটা মুখ বেঁকিয়ে বলে, 'ভূতের যদি সর্দি সারে, রাবণ যদি রামকে মারে, ঈশ্বর যদি বক্র তবে, গবা পাগল কেন হবে?'

বক্রেশ্বর আর গবার এই তকরারে কেউ মনোযোগ দিচ্ছিল না৷ যে যার কাজে ব্যস্ত৷ বক্রেশ্বর চোখ পিটপিট করে আবার ফিক করে হেসে বলল, 'চাঁদ বদনখানা দাড়িগোঁফে বড়োই ঢাকা, তবু চেনা চেনা ঠেকছে হে৷ গলার স্বরটা লুকোতে পারনি৷ তা চেনা যখন দিতে চাও না, আমারই বা কী এমন দায় ঠেকেছে চিনবার৷ ওই হোথা সামন্তমশাই বসে আছেন৷ চলে যাও সিধে৷'

হাত তুলে বক্রেশ্বর সামন্তকে দেখিয়ে দেয়৷

গবা গিয়ে সামন্তর পাশের চেয়ারে বেশ জুত করে বসে বলে, 'এবার ঠান্ডাটাও পড়েছে মশাই৷'

সামন্ত লোকটাকে বিরক্তির চোখে দেখে বলে, 'কী চাই?'

গবা একটু অপমান বোধ করে বলে, 'ভালো লোকেদের একটা দোষ কী জানেন? তারা পাগল-ছাগলকে পাত্তা দিতে চায় না৷ তারা ভাবে, পাগলগুলো সত্যিই পাগল৷ তা পাগলগুলো কি আর পাগল নয়? তারা তো পাগলই৷ কিন্তু ভালো লোকগুলো এমন পাগল না মশাই, কী বলব আপনাকে . . . হিঃ হিঃ . . . পাগলগুলো যদি ভালো লোক হত তাহলে দেখতে পেত, আসলে ভালো লোকগুলোই এমন পাগল যে পাগলকেই কেবল পাগল ভাবে৷'

সামন্ত গম্ভীর হয়ে বলল, 'বুঝলাম, কিন্তু কথাটা কী?'

'কথা কি একটা? কথা অনেক৷'

'সংক্ষেপে বলে ফেলো৷'

'বলছিলাম কী, এসব কি খেলা নাকি? বিষ্টুপুরের ওরিয়েন্ট সার্কাস কী দেখাচ্ছে জানেন?'

'কী দেখাচ্ছে?'

'ট্রাপিজ-ফাপিজ নেই স্রেফ শূন্যে কিছু লোক উড়ে বেড়াচ্ছে৷ আপনি তারের খেলা দেখাচ্ছেন, তাঁরা দেখাচ্ছে বেতারের খেলা৷ এ-খুঁটো থেকে ও-খুঁটো কেবল একটা বাতাসের দড়ি টাঙানো, তারই ওপর দিয়ে লোকে সাইকেল চালাচ্ছে, হেঁটমুণ্ড হয়ে কসরত করছে৷ তা ছাড়া, আপনি বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, আপনাদের বামনবীর মাত্র আড়াই ফুট লম্বা, আর ওরা কী দিয়েছে জানেন? ওরা বিজ্ঞাপন দিয়েছে, আমাদের বামনবীর মাত্র তিন ফুট বেঁটে৷'

'তাই নাকি?'

'আলবাত তাই৷ লম্বাই যদি হবে, তবে আর বেঁটে বলবেন কী করে? বলতে হলে এরকমই বলতে হয়, আমাদের বামনবীর তিন ফুট বেঁটে বা চার ফুট বেঁটে বা পাঁচ ফুট বেঁটে বা ছয় ফুট বেঁটে বা-'

'থাক থাক৷ আর বলতে হবে না৷'

'বুঝেছেন তো?'

'বুঝেছি৷'

'কী বুঝলেন?'

'বুঝলাম তুমি খাঁটি পাগল৷'

গবা মাথা নেড়ে বলে, ভালো মানুষদের তো ওই একটাই দোষ৷ তারা পাগলকে ভাবে পাগল৷ পাগলরা যে সত্যিই পাগল তা কি পাগলরা জানে না? আর তারা যে পাগল সেইটে বোঝানোর জন্য কোনো পাগল কি পাগল ছাড়া অন্য কোনো পাগলের কাছে যায়? বলুন!'

সামন্ত জ্বালাতন হয়ে বলে, 'তাও বুঝলাম৷ কিন্তু বাপু হে, আজ আমার মনটা ভালো নেই৷'

'মন ভালো করার ওষুধ আমি জানি৷'

'বটে! কী ওষুধ?'

'একদম পাগল হয়ে যান৷ ভালো মানুষরা যদি পাগল না হয়, তাহলে পাগলরা যে পাগল তা বুঝবে কী করে? আর একবার যদি পাগল হয়ে পাগলামির মজা টের পায়, তবে কি আর মন খারাপ থাকে?'

'ঃও!' বলে সামন্ত নিজের মাথা চেপে ধরল৷

গবা বলল, 'এই কথাটাই বলতে আসা মশাই৷ তবে যাওয়ার আগে, দু-চারটে আজেবাজে কথাও বলে যাই৷ কথাটা হল, গোবিন্দ মাস্টার খড়ের গাদায় পৌঁছেছে৷ রাত্রে স্পাই আসবে৷ রামু নামে একটা ছেলে আসতে পারে খেয়াল রাখবেন৷'

বলে গবা উঠে পড়ল৷

সামন্ত মুখ তুলে হাঁ করে চেয়ে থাকে৷

গবা এরেনাটা পার হওয়ার সময় তাচ্ছিল্যের মুখভঙ্গি করে খেলোয়াড়দের কসরত দেখে বক্রেশ্বরের দিকে চেয়ে বলে, 'আড়াই ফুট লম্বা! হুঁ! লম্বাই যদি হলে তবে বেঁটে বলে অত বড়াই কেন?'

বক্রেশ্বর চোখ পিটপিট করে বলে, 'তুমিও যেমন পাগল, আমিও তেমনি লম্বা৷'

গবা আর কথা বাড়ায় না৷ বেরিয়ে সোজা হাঁটতে থাকে৷

রবিবার বলে আজ একটু বেলায় বাজার করে হরিহরবাবু আর গদাধরবাবু ফিরছিলেন৷ গবার সঙ্গে রাস্তায় দেখা৷

গদাধরবাবু গদগদ হয়ে বললেন, 'এই যে বৈজ্ঞানিক গবা, তোমার সারানো ঘড়িটা অদ্ভুত চলছে হে৷ একেবারে ঘণ্টায় মিনিটে সেকেন্ডে৷'

হরিহরবাবু সঙ্গেসঙ্গে বললেন, 'তবে উলটো দিকে৷'

গদাধরবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, 'দেখুন হরিহরবাবু-'

হরিহরবাবুও সঙ্গেসঙ্গে বললেন, 'কী বলবেন তা জানি গদাধরবাবু৷ তবে বলে লাভ নেই, গবা বিজ্ঞানের ব-ও জানে না৷ ও গবা, বল তো, কাইনেটিক এনার্জি কাকে বলে!'

গবা একটা প্রকাণ্ড হাই তুলে বলে, 'আপনিই তো বলে দিলেন৷'

'তার মানে?'

'কাইনেটিক এনার্জিকেই কাইনেটিক এনার্জি বলে৷ খুব সোজা কথা৷'

হরিহরবাবু একগাল হেসে বলেন, 'দেখলেন তো গদাধরবাবু, গবা কাইনেটিক এনার্জি কাকে বলে জানে না৷'

গদাধরবাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন, 'কে বলল জানে না? এই তো বলল শুনলেন না? কাইনেটিক এনার্জিকেই কাইনেটিক এনার্জি বলে?'

দু-জনের মধ্যে আবার একটা ঝগড়া পাকিয়ে উঠল৷

কিন্তু গবার সময় নেই৷ সে দ্রুত পায়ে চলেছে শহরের আর এক প্রান্তে৷ একটা খড়ের গাদায়৷

পাখিদের মুশকিল হল তারা পুরোনো কথা বেশিদিন মনে রাখতে পারে না৷ মস্তিষ্কের ততখানি ক্ষমতা তাদের নেই, স্মৃতিশক্তিও নেই৷ কিছুদিনের মধ্যেই তারা পুরোনো বুলি ভুলে নতুন বুলি শিখতে শুরু করে৷

আজ সকালে রামুর ঘুম ভেঙেছে পাখিটার ডাকে৷ কাকভোরে পাখিটা হঠাৎ বিকট স্বরে ডাকতে শুরু করে, 'রামু ওঠো, রামু ওঠো, রামু ওঠো৷ মুখ ধুয়ে নাও৷ পড়তে বসো৷'

রামু তো অবাক৷ সে ধরে নিয়েছিল, পাখিটা নতুন বুলি কিছুতেই শিখবে না৷ তাই নিশ্চিন্ত ছিল৷ একটা পাখি তার ওপর খবরদারি করবে এটা কি সহ্য হয়? কিন্তু আজ সকালে এই অদ্ভুত কাণ্ডে সে হতবাক৷ পাখিটা যে শুধু ডাকছে তা নয়, বেশ রাগের গলায় ধমকাচ্ছে৷ যেমনটা তার বাবা উদ্ধববাবু করে থাকেন, হুবহু সেই স্বর৷ ডাকছেও পাশে বাবার ঘর থেকেই৷ পাখির দাঁড়টা আজকাল উদ্ধববাবুর ঘরেই ঝোলানো থাকে৷

শীতের ভোরে এখনও চারিদিক বেশ অন্ধকার৷ তার ওপর হাড় কাঁপানো ঠান্ডা৷ এই শীতে লেপের ওম থেকে বেরোবার সময় মনে হয় কেউ বুঝি গা থেকে চামড়াটা টেনে ছিঁড়ে নিচ্ছে৷

রামু হয়তো পাখির ডাককে উপেক্ষা করে আরও কিছুক্ষণ শুয়ে থাকত৷ কিন্তু পাখিটার বিকট চ্যাঁচামেচিতে উদ্ধববাবুরও ঘুম ভেঙেছে৷ তিনিও উঠে গম্ভীর গলায় হাঁক দিলেন, 'এই রেমো! ওঠ!'

রামু মনে মনে রাগ চেপে রেখে ওঠে এবং শীতে হি-হি করে কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে ঘুঁটের ছাই দিয়ে দাঁত মেজে পাথুরে ঠান্ডা জলে মুখ ধুয়ে নেয়৷ তারপর ঠাকুরঘরে গিয়ে প্রণাম করার নিয়ম৷

একটা খদ্দরের চাদর মুড়ি দিয়ে সে যখন পড়ার ঘরে এল তখন উদ্ধববাবু প্রাঃতভ্রমণে বেরিয়ে গেছেন৷ রামু বাবার ঘরে ঢুকে কটমট করে পাখিটার দিকে তাকিয়ে বলে, 'তুই ভেবেছিসটা কী শুনি!'

পাখিটা দাঁড়ের একদিকে সরে গিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে বলে, 'বিশু! আমাকে মেরো না বিশু! আমি বুড়ো মানুষ৷ মরার সময় সব মোহর তোমাকে দিয়ে যাব৷'

রামু রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বলে, 'আমার মোহরের দরকার নেই৷ তুই চ্যাঁচানি বন্ধ করবি কি না বল৷'

পাখিটা হঠাৎ ডানা ঝাপটে, পায়ের শিকলের শব্দ করে ঠিক উদ্ধববাবুর মতো একটু কাশে৷ তারপর গম্ভীর গলায় বলে, 'পড়তে বসো৷ পড়তে বসো৷ সময় নষ্ট কোরো না৷'

পাখিটা পুরোনো বুলি সব ভুলে যায়নি এখনও৷ নতুন বুলি শিখেছে৷ তবে আর কয়েকদিনের মধ্যেই পাখিটা নতুন বুলিই বলতে থাকবে ক্রমাগত৷ রামুর তখন ভারি বিপদ হবে৷ সুতরাং পাখিটাকে না ভাগানো পর্যন্ত রামুর শান্তি নেই৷

কাকাতুয়া যে সব নিরীহ প্রাণী নয় তা রামু বুঝল শিকলটা খুলতে গিয়ে৷ যেই না দাঁড়ে হাত দিয়েছে, অমনি পাখিটা খচ করে ঠুকরে দিল হাতে৷ ডান হাতের বুড়ো আঙুলের পিছন দিকটা কেটে গেল একটু৷

কাটাকুটিকে অবশ্য রামু ভয় পায় না৷ প্রতিদিনই তার হাত কাটছে, মাথা ফাটছে, পা মচকাচ্ছে৷ ওসব গা-সওয়া৷ সে বাইরে গিয়ে একটু দুব্বোঘাস তুলে হাতে ডলে নিয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেয়৷

যারা লেখাপড়ায় ভালো হয় না তারা হয়তো-বা খেলাধুলো, গানবাজনা, ছবি আঁকা বা অন্য কোনোদিকে ভালো হয়৷ রামুর ভাই-বোনরা লেখাপড়ায় সবাই ভালো৷ বোনরা ভালো গায়, বড়দা দারুণ তবলা বাজায়, ছোড়দা দুর্দান্ত স্পোর্টসম্যান৷ রামু কোনোটাতেই ভালো নয়৷ ক্লাসে টেনেটুনে পাশ করে যায়৷ বার্ষিক স্পোর্টসে বড়োজোর হাইজাম্প বা দৌড়ে একটা বা দুটো থার্ড প্রাইজ পায়৷ গান জানে না, ছবি আঁকতে পারে না৷ কিন্তু শরীরের সেই অদ্ভুত কাতুকুতুটার জ্বালায় সে সাংঘাতিক সাংঘাতিক সব দুষ্টুমি করে বেড়ায়৷ দুষ্টু ছেলেরা সাধারণত মায়ের আদর একটু বেশিই পায়৷ কিন্তু রামুর কপালটা সেদিক দিয়েও খারাপ৷ ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তার আদরই বাড়িতে সবচেয়ে কম৷ আসল কথা হচ্ছে তার দিকে কারও তেমন নজর নেই৷ রামু বলে একটা ছেলে এ বাড়িতে থাকে মাত্র৷ যেমন নয়নকাজল থাকে, যেমন মাঝে মাঝে গবা পাগলা থাকে৷ রামুর সন্দেহ হয়, সে নিরুদ্দেশ হলে এ-বাড়ির লোকে ঘটনাটা লক্ষ করবে কি না৷

বাইরের সিঁড়িতে বসে রামু আজ সকালে এইসব ভাবছিল৷ তার জীবনে শান্তি নেই৷

রোদ উঠল৷ দাদা-দিদিরা পড়ার ঘরে পড়তে বসল৷ আর যুধিষ্ঠির মাস্টারমশাইও দেখা দিলেন৷

যুধিষ্ঠিরবাবুকে রামুর বড়ো ভালো লাগে৷ ভারি অমায়িক মানুষ৷ কথায় কথায় মারধর নেই, ধমক-ধামক নেই৷ মিষ্টি হেসে নরম সুরে বোঝান, না পারলে রাগ করেন না৷ আজও রামুকে জিজ্ঞেস করলেন, 'মুখখানা ভার দেখছি যে৷ বকুনি খেয়েছ নাকি?'

'আজ কিছু ভালো লাগছে না মাস্টারমশাই৷'

'সকাল বেলায় কিছু ভালো না লাগলে সারা দিনটাই খারাপ যায়৷ সকালটাই তো মানুষের সবচেয়ে সুন্দর সময়৷'

যুধিষ্ঠিরবাবুর পরনে ধপধপে ধুতি৷ গরম কাপড়ের নস্যি রঙের পাঞ্জাবির ওপর শাল৷ তাঁর চেহারাখানাও বেশ লম্বা-চওড়া৷ বয়স বেশি নয়৷ চোখের দৃষ্টি পরিষ্কার আর তীক্ষ্ণ৷ অগাধ জ্ঞান৷ রামু শুনেছে যুধিষ্ঠিরবাবু খুব বড়োলোকের ছেলে৷ বাবার সঙ্গে রাগারাগি থেকে বেরিয়ে এসেছেন৷ নইলে তাঁর যা অবস্থা তাতে রোজগার না করলেও চলে৷

রামু গম্ভীর হয়ে বলে, 'আজ যদি না পড়ি তাহলে কি আপনি রাগ করবেন?'

'না না৷ রোজ কি পড়তে ভালো লাগে?'

'কিন্তু বাবা তো বকবে৷'

'না, তাও বকবেন না৷ চলো, তোমার দাদা আর দিদিদের পড়া দিয়ে তোমার সঙ্গে বসে আমি কাটাকুটি খেলব৷'

'সত্যি খেলবেন?'

'কেন খেলব না? চলো৷'

বাস্তবিকই যুধিষ্ঠির মাস্টারমশাই আর সকলকে শক্ত শক্ত টাস্ক করতে দিয়ে একটা রাফ খাতা খুলে রামুর সঙ্গে কাটাকুটি খেলতে লাগলেন৷ কিন্তু কাটাকুটিও উনি এত ভালো খেলেন যে, রামু বারবার হেরে যেতে লাগল৷

যুধিষ্ঠিরবাবু হঠাৎ জিজ্ঞেস করেন, 'তোমার হাত কাটল কী করে?'

'আমাদের পাখিটা কামড়ে দিয়েছে৷'

'সেই কাকাতুয়াটা?'

'হ্যাঁ৷'

'তুমি কী করেছিলে?'

'ছেড়ে দিচ্ছিলাম৷'

'পাখিটাকে?'

'হাঁ৷ আমাকে বড্ড জ্বালাতন করে৷'

যুধিষ্ঠিরবাবু একটু চমকে উঠে বলেন, 'ছেড়ে দিয়েছ?'

'না, শিকলটা খুলতে পারিনি৷'

এরপর আর কোনো কথা হল না বটে কিন্তু যুধিষ্ঠিরবাবু বারবার কাটাকুটি খেলায় হেরে যেতে লাগলেন৷ মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে কাটাকুটি খেলার ঘটনা এবং পাখিটাকে ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টার কথা রামুর দাদা আর দিদিরা বাড়িতে বলে দিল৷ উদ্ধববাবু কাছারিতে যাওয়ার আগে রামুকে নিজের ঘরে ডাকিয়ে আনলেন৷

গম্ভীর হয়ে বললেন, 'পাখিটা তোর সঙ্গে কোনো শত্রুতা করেছে?'

রামু ভয়ে কাঠ৷ গলা দিয়ে স্বর বেরোল না৷

উদ্ধববাবু তাঁর বেতের ছড়িটা দিয়ে শপাং করে এক ঘা মেরে বললেন, 'দুনিয়ার সবাইকে শত্রু মনে করতে কে তোমাকে শেখাল?'

রামু যন্ত্রণায় ছটফট করে বাঁ-হাতের কবজি চেপে ধরল৷ বেতটা লেগেছিল সেইখানেই৷

'বলো!' আবার শপাং৷ এবার লাগল কোমরে৷

রামু বেঁকে গিয়ে বলল, 'পাখিটা আমাকে ধমকাচ্ছিল৷'

'বটে! পাখির ধমকে তোমার এমন অপমান হয়েছে যে, শিকলি কেটে তাকে উড়িয়ে দিতে হবে?'

আবার শপাং৷ এবার পিঠের চামড়াই বুঝি কেটে গেল রামুর৷ সে একটা চিৎকার করতে গিয়েও দাঁত চেপে রইল৷ বাবার সামনে কান্না বারণ৷ তবে সে চাপা কান্নায় থরথর করে কাঁপছিল৷ রাগেও৷

উদ্ধববাবু গম্ভীর হয়ে বলেন, 'পাখিটা আমার প্রতিনিধি হয়ে তোমাকে শাসন করবে৷ কথাটা মনে রেখো৷ যদি কখনো ফের এরকম কিছু করো তবে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেব৷ আর শুনলাম পড়ার মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে কাটাকুটি খেলছিলে আজ! সত্যি?'

'মাস্টারমশাই নিজেই তো খেললেন৷'

'সেক্ষেত্রে আমার বলার কিছু নেই৷ কিন্তু মাস্টারমশাইরা কোন ধরনের ছাত্রের সঙ্গে কাটাকুটি খেলেন তা জানো? যাদের কিছু হবে না বলে ওঁরা নিশ্চিন্ত হয়ে যান৷ তোমারও কিছু হবে না৷ এখন যাও৷'

চোখ মুছতে মুছতে রামু বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে এল৷

উদ্ধববাবুর কড়া হুকুম আছে কোনো ছেলেকে তিনি যেদিন শাসন করবেন সেদিন সেই ছেলের খাওয়াও বারণ৷ তাতে নাকি ফল ভালো হয়৷ সুতরাং রামুকে আজ খালি পেটে ইস্কুল যেতে হল৷

ক্লাসে লাস্ট বেঞ্চে বসে গান্টু কাঁচা কুল খাচ্ছিল নুন দিয়ে৷ স্যার এখনও আসেননি৷

রামু গিয়ে পাশে বসতেই গান্টু চাপা গলায় বলে, 'খুব ধোলাই খেয়েছিস তো!'

রামু আবার চোখের জল মোছে৷

'দূর আমি তো কত মার খেয়েছি৷ কাকা এখনও মারে৷ তবে এখন আর লাগে না৷'

রামু অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে৷ তারপর বলে, 'শোন গান্টু, আমি ঠিক করেছি সার্কাসের দলে নাম লেখাব৷'

'সার্কাস!'

'আমার লেখাপড়া হবে না৷ কিছু হবে না৷'

'সার্কাসে গেলে নেবে কেন? ঝাঁট দেওয়ার কাজ করবি?'

'না৷ খেলা দেখাব৷'

'পারবি?'

'শিখব৷'

১০

অনেক ভেবেচিন্তে গান্টু বলল 'আমি সার্কাসে যাব না৷ আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে জাহাজে চাকরি নিয়ে দুনিয়া ঘুরে বেড়াব৷'

রামু বলে, 'জাহাজে চাকরি পাওয়া অত সোজা নয়৷ তোকে নেবে কেন? তুই সাঁতার জানিস?'

'শিখে নেব৷ তোকে সার্কাসে নিলে আমাকেও জাহাজে নেবে৷'

'তাহলে পালাবি?'

'পালাব৷ কিন্তু গাড়িভাড়ার কী হবে? রাস্তায় খাব কী?'

'সে হয়ে যাবে৷ আমি তো সার্কাসের দলের সঙ্গে যাচ্ছি আমাকে ওরাই খেতে-টেতে দেবে৷'

'আমি যদি তোর সঙ্গে থাকি তো আমাকেও নেবে?'

'সেটা এখুনি বলতে পারছি না৷ কথা বলতে হবে৷'

ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে গান্টুর সঙ্গে নানারকম পরামর্শ করে রামু বাসায় ফিরল৷ সারাদিন খাওয়া নেই৷ টিফিনে গান্টু একটু চীনেবাদামের ভাগ দিয়েছিল মাত্র৷ তাতে খিদেটা আরও চাগিয়ে উঠেছে৷ পেটের আগুনটা রাগের হলকা হয়ে মাথায় উঠে আসছে৷ বই-টই রেখে রামু নিঃসাড়ে গিয়ে বাগানে ঢুকল৷ বাগানের এক কোণে একটা কুলগাছ আছে৷ তাতে মস্ত মস্ত টোপাকুল খেয়ে খিদেটা চাপা দেবে৷

কিন্তু গিয়ে দেখে, কুন্দ দারোগার দুই ছেলে আন্দামান আর নিকোবর চুরি করে বাগানের দেওয়াল টপকে ঢুকে গাছে উঠে কুল সব সাফ করছে৷ একজনের হাতে আবার একটা বাঁশের চ্যাঙাড়ি৷ সেটা টোপাকুলে টপটপে ভরতি৷

রামু হাঁক মারল, 'অ্যাই! আমাদের গাছে উঠে কুল পাড়ছিস যে বড়ো!'

কুন্দকুসুমের শাসন বড্ড কড়া৷ কুল চুরির কথা জানাজানি হলে আস্ত রাখবেন না৷ ভয়ের ব্যাপার আরও আছে৷ রামুর ঢিল ছোড়ার হাত দারুণ পাকা৷ এখন নীচ থেকে সে যদি ঢিল ছুড়তে শুরু করে তবে গাছের ওপর দুই ভাইয়ের বড়োই বিপদ৷ রামুর ঢিল বড়ো একটা ফসকায় না৷ তাই দুই ভাই ওপর থেকে কাকুতিমিনতি করতে লাগল, 'বলিস না, ভাই বলিস না৷ অন্যায় হয়ে গেছে৷ তোকে অর্ধেক দিচ্ছি৷ পায়ে পড়ছি, ঢিল মারিস না৷'

খিদে-পেটে রামুর গাছে উঠতে ইচ্ছে করছিল না৷ তা ছাড়া এ-বাড়ির ওপর এখন এমন রাগ যে, এই বাড়ির কোনো ক্ষতি হলে তার কিছু যায় আসে না৷ সে গম্ভীর হয়ে বলল, 'ঠিক আছে, নেমে আয়৷'

আন্দামান আর নিকোবর পকেটে করে কাগজের পুরিয়ায় অনেকটা ঝাল নুন এনেছে৷ তাই দিয়ে গাছতলায় তিন জনে কুলের ভোজে বসে গেল৷

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে তিন জন কুল খেয়ে গেল৷ পাকা, আধপাকা, ডাঁসা কুল আর দুর্দান্ত ঝাল নুন খেতে খেতে চকাস-টকাস শব্দ আর ঝালের শোঁসানি শোনা যাচ্ছিল কেবল৷ তারপর নিকোবর বলল, 'তুই নাকি সার্কাসের দলে ভিড়ছিস?'

রামু কথাটা আর কাউকে বলেনি, গান্টু ছাড়া৷ তাই চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কে বলেছে?'

'গান্টু৷ স্কুল থেকে ফেরার পথে বলল, রামু সার্কাসের দলে চলে যাচ্ছে৷'

আন্দামান মুখ থেকে একটা কুলের বিচি ফুড়ুক করে ফেলে বলল, 'ওই সার্কাসে একটা সাংঘাতিক খুনি লোক আছে৷ দিনে-দুপুরে মানুষ খুন করে৷'

রামু বলে, 'কে বল তো!'

'যে লোকটা আজকাল সাপের খেলা দেখায়৷ মাস্টার লখিন্দর৷'

'লোকটা খুনি কী করে জানলি?'

'বাবা গতকাল ফন্তুবাবুকে বলছিল, আমি আড়াল থেকে শুনেছি৷'

'ফন্তুবাবুটা কে?'

'পুলিশের ইনফর্মার৷'

'কী বলছিল?'

'বলছিল লখিন্দরের নাম নাকি আসলে লখিন্দর নয়৷ এ হচ্ছে মাস্টার গোবিন্দ৷ কাশিমের চরে হরিহর পাড়ুই বলে একটা লোককে খুন করে জেলে যায়৷ তার ফাঁসির হুকুমও হয়েছিল৷ কিন্তু লোকটা জেল থেকে পালিয়ে এসেছে৷'

'তবে তোর বাবা তাকে ধরছে না কেন?'

'ধরা যাচ্ছে না৷ লোকটা মুখোশ পরে থাকে তো৷ আসল চেহারাটা কেউ দেখেনি৷ সার্কাসওয়ালারা অন্য একটা লোককে দেখিয়ে বলছে, এই হচ্ছে মাস্টার লখিন্দর৷'

'তাহলে তোর বাবা এখন কী করবে?'

'কিছু করবে না৷ শুধু ওয়াচ করা হবে৷ মাস্টার গোবিন্দর সব খোঁজখবর চেয়ে পাঠানো হয়েছে৷ পুলিশ ফোর্সও আসছে৷ শহরটা ঘিরে ফেলা হবে৷ এখন ইনফর্মার আর সেপাইরা চারদিকে নজর রাখছে৷ গতকাল থেকে সার্কাসে সাপের খেলা বন্ধ হয়ে গেছে৷ বিরাট নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে-মাস্টার লখিন্দর পেটের পীড়ায় আক্রান্ত৷ সাপের খেলা বন্ধ রইল৷ সব প্ল্যান করা৷'

আর কয়েকটা কুল খেয়ে রামু উঠে পড়ল৷ আন্দামান আর নিকোবর তাকে অর্ধেক কুলের ভাগ দিতে চাইলে রামু ঠোঁট উলটে বলল, 'তোরা নিগে যা৷'

সন্ধে বেলা গবা পাগলার ঘরে গিয়ে তাকে ধরল রামু, 'গবাদা! শুনেছ হবিবগঞ্জের সার্কাসের সেই সাপ-খেলোয়াড় লখিন্দর নাকি আসলে খুনি?'

অন্যমনস্ক গবা বলল, 'হ্যাঁ, খুব গুণী৷'

'গুণী নয় গো, সে নাকি খুনি৷'

গবা অবাক হয়ে বলে, 'তোমাকে কে বলল?'

'আন্দামান আর নিকোবর৷ কুন্দ দারোগার যমজ ছেলেরা৷'

'বটে!' বলে গবা আঙুল দিয়ে তার দাড়ি আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলে, 'খুন একটা হয়েছিল বটে৷ সেই কাশিমের চরে৷ গেলবারের আগের বারে শীতকালে৷ জায়গাটা এখান থেকে খুব দূরেও নয়৷ বিশ-পঁচিশ ক্রোশ হবে৷ খুব জ্যোৎস্না ছিল সেই রাতে৷

'তুমি সেখানে ছিলে?'

'খানিকটা ছিলাম বই কী৷ কাশিমের চরেই যে সেই রাতে তেনাদের নামবার কথা৷'

'কাদের?'

'আলফা সেনটরি হল সৌরলোকের সবচেয়ে কাছাকাছি নক্ষত্র৷ দূরত্ব হবে চার আলোবছর৷ সেখানকার একটা উন্নত গ্রহের সঙ্গে আমার অনেকদিনের যোগাযোগ৷ বহুকাল খবর-বার্তা দিইনি বলে চিন্তা করছিল তারা৷ আমাকে একদিন একটা ভাবসংকেত পাঠাল৷ যন্ত্রপাতি দিয়ে নয়, স্রেফ জোরালো মানসিক প্রক্রিয়ায়৷ জানান দিল, দিন-দুইয়ের মধ্যেই তারা এক পূর্ণিমার রাতে কাশিমের চরে নামবে৷ আমি যেন সেখানে হাজির থাকি৷'

'গুল মারছ গবাদা!'

'গবা তো কেবল গুলই মারে৷ আর বলব না, যাও৷'

'আচ্ছা আচ্ছা, গুল নয়৷ বলো৷'

'শেষ পর্যন্ত অবশ্য সময়মতো তারা আসতে পারেনি৷ পরে শুনলাম ওদের মহাকাশযানের একটা মাস্তুল নাকি খারাপ হয়ে গিয়েছিল৷'

'মাস্তুল তো নৌকোয় থাকে৷'

'আরে বাবা এ কি আর সাধারণ মাস্তুল! এই মাস্তুল হল আসলে একটা সুপারসেনসিটিভ স্ক্যানার৷'

'যাকগে, তারপর কী হল?'

'সে এক কাণ্ড৷ আমি তো কাশিমের চরে জ্যোৎস্নায় একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে অপেক্ষা করতে করতে ঘুমে ঢুলে পড়েছি৷ কখন তেনারা আসবেন৷ কাশিমের চর জায়গাটা বড়ো ভালো নয়৷ একধারে ঘন জঙ্গল, মাঝখানে নদী৷ শীতকাল বলে জল প্রায় নেই-ই বলতে গেলে৷ দু-ধার দিয়ে তিরতির করে নালার মতো দুটো স্রোত বয়ে যাচ্ছে৷ মাঝখানে মস্ত চর৷ তা সেই চরেও আবার কাশফুলের ঘন ঝোপ সব৷ মাঝখানে অবশ্য অনেকটা জায়গা ফাঁকা৷ সন্ধের পরই সোনার থালার মতো চাঁদ উঠল৷ জ্যোৎস্নায় একেবারে মাখামাখি৷ আর যা শীত পড়েছিল সেবার তা আর বলার নয়৷'

'ঃউ, প্রকৃতি-বর্ণনা রেখে আসল গল্পটা বলবে তো!'

'তোমার বাপু বড্ড ধৈর্য কম৷ গল্পের আসল প্রাণই তো ওই প্রকৃতি আর পরিবেশের ওপর৷ ওটা না হলে গল্পটা বড়ো ন্যাড়া ন্যাড়া হয়ে যায় যে৷ সত্যি বলে মনে হয় না৷'

'তারপর কী হল?'

'সে এক কাণ্ড৷ আমি তো সেই শীতে একেবারে জড়োসড়ো হয়ে ঠান্ডা মেরে বসে আছি৷ চারদিকে বেশ কুয়াশা৷ কুয়াশার মধ্যে জ্যোৎস্নার একটা আলাদা রূপ আছে৷ গোটা জায়গাটাকে মনে হচ্ছিল পরির রাজ্য৷ দেখতে দেখতে রাত বেড়ে উঠল৷ ঘুমে ঢুলে পড়ছি৷ এমন সময় মনে হল একটা লোক যেন দূর থেকে দৌড়ে আসছে৷ বালির ওপর তো পায়ের শব্দ হয় না৷ কিন্তু আমি সেই মহাকাশের লোকগুলোর ভাবসংকেত পাওয়ার জন্য মনটাকে এমন চনমনে রেখেছিলাম যে, ছুঁচ পড়লেও শব্দ শুনতে পাব৷'

'তবে এই যে বললে ঘুমে ঢুলে পড়ছিলে!'

'তা বটে৷ তবে কিনা সে-ঘুমও ভাবের ঘুম৷ চোখ বোজা থাকে বটে, কিন্তু কান, গায়ের চামড়া, নাক, চারদিকের খবর পায়৷'

'লোকটা দৌড়ে কোথায় গেল?'

'গেল না৷ লোকটা আসছিল৷ আমি চোখ চেয়ে কুয়াশায় কাউকে দেখতে পেলাম না৷ তবে কয়েক সেকেন্ড পরেই আরও চার-পাঁচজনের দৌড়ে আসার আওয়াজ পেলাম৷ তারপর বুঝলাম প্রথম লোকটা পালাচ্ছে, পরের লোকেরা তাকে তাড়া করছে৷ প্রথম পায়ের শব্দটা ঝোপের আড়ালে-আবডালে বেড়ালের মতো চুপিচুপি ঘুরে বেড়াচ্ছে গা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করছে৷ অন্য লোকগুলো তাকে খুঁজছে৷'

'তুমি কী করলে?'

'আমি একটা হাই তুললাম তখন৷'

'মাত্রই হাই তুললে?'

'না, দুটো তুড়িও দিয়েছিলাম মনে আছে৷'

'ধুস, তারপর কী হল!'

'ঃও, সে এক কাণ্ড৷'

১১

বিরক্ত হয়ে রামু বলে, 'ঃআ, বলোই না!'

'ভাবলে আজও গায়ের রোঁয়া দাঁড়িয়ে যায়৷ দেখো না, আমার গা দেখো!' বলে গবা হাতে দাঁড়ানো রোঁয়া দেখাল রামুকে৷ তারপর বলল, 'কুয়াশা আর জ্যোৎস্নার মধ্যে ঝোপেঝাড়ে সেই লুকোচুরি খেলা চলছে, আর আমি বসে আছি৷ ব্যাপারটা কী তা বুঝতে পারছি না৷ একবার হঠাৎ একটা শেয়াল এক ঝোপ থেকে বেরিয়ে আমার ঘাড়ের ওপর দিয়ে লাফ মেরে সাঁ করে ছুটে পালাল৷'

'তারপর?'

তারপর সেই ঝোপের আড়াল থেকে ধুতি পরা একটা লোক র্যাপারে মুখ ঢেকে কুঁজো হয়ে বেরিয়ে এসে অবিকল শেয়ালের মতোই দৌড়ে পালাচ্ছিল৷ তার চেহারাটা বিশাল৷ ছ-ফুটের ওপরে লম্বা, ইয়া কাঁধ, ইয়া বুকের ছাতি৷ সেই ঝুমকো আলোয় মুখঢাকা লোকটাকেও কিন্তু আমি চোখের পলকে চিনে ফেললাম৷'

'লোকটা কে?'

'সেই লোকটাই পাড়ুই৷ ওরকম লোক আমি জন্মে দুটো দেখিনি৷ হরিহর পাড়ুই না-পারে এমন কোনো খারাপ কাজ নেই৷ লোকের ছেলে-মেয়ে চুরি করে আড়কাঠিদের কাছে বেচে দিত, নয়তো মা-বাপের কাছ থেকে টাকা আদায় করত৷ ডাকাতি করত৷ চুরি করত৷ আর খুন করা ছিল তার জলভাত৷ ওই তল্লাটে তার দাপটে সবাই কাঁপত৷'

'লোকটা কী করল?'

'লোকটা তখন পালাচ্ছিল৷ খুব অদ্ভুত দৃশ্য৷ হরিহর পাড়ুইকে পালাতে দেখাটাও ভাগ্যের ব্যাপার৷ কারণ সাধারণত তাকে দেখেই অন্যেরা পালায়৷ তাই তাকে পালাতে দেখে ভারি অবাক লাগল৷ কাশিমের চরে এমনিতে ঘরবাড়ি নেই, তবে বহুকাল আগেকার একটা ভাঙা বাড়ি আছে৷ সাপখোপ শেয়াল তক্ষক বাদুড় আর প্যাঁচার আড্ডা৷ চোর-ডাকাতেও বড়ো একটা কেউ সেই বাড়িতে ঢোকে না৷ আমি যেখানে বসেছিলাম, সেখান থেকে একটু ডাইনে কোনাকুনি একটা ঝাউবন৷ তার আড়াল থেকে সেই ভাঙা বাড়িটার একটা গম্বুজ দেখা যাচ্ছিল৷ নিকষ্যি অন্ধকার৷ হরিহর পাড়ুই কোলকুঁজো হয়ে সেই ঝাউবনের মধ্যে ঢুকে বাড়িটার দিকে যাচ্ছে বলে মনে হল৷ এমন সময়ে দেখি, গম্বুজে একটা আলো দেখা যাচ্ছে৷ কে যেন উঁচু থেকে একটা টর্চবাতি জ্বালছে আর নেভাচ্ছে৷ আমার মনে হল, ব্যাপারটা একটু দেখা দরকার৷'

'তোমার ভয় করল না?'

'না, ভয়ের কী? দুনিয়াটাই তো নানা খারাপ জিনিসে ভরা৷ ভয় পেতে শুরু করলে তার আর শেষ নেই৷'

'তুমি কী করলে?'

'উঠে হরিহরের পিছু পিছু এগোতে লাগলাম৷ সেটাও দুঃসাহসের কাজ৷ হরিহর যদি টের পায় তাহলে চোখের পলকে আমার ঘাড় থেকে মাথা নামিয়ে দেবে কসাই-ছুরি দিয়ে৷ তার কাছে সব সময় অস্ত্রশস্ত্র থাকে৷ স্বভাবটাও কেমন পাগলা খুনির৷ তাই খুব ঠাহর করে দেখে-শুনে সাবধানে এগোতে হচ্ছিল৷ কিন্তু ঝাউবনের মধ্যে আলো আঁধারিতে আর তাকে দেখতে পেলাম না৷ গম্বুজের আলোটাও আর জ্বলছে না তখন৷'

রামু চোখ বড়ো বড়ো করে বলে, 'তখন কী করলে?'

'কিছু করার নেই৷ চারদিকে ঠাহর করছি৷ লোকটা তো আর নেই হয়ে যেতে পারে না৷ ঝাউবনে প্রথম দিকটায় বেশ পরিষ্কার৷ ঝোপজঙ্গল তেমন নেই৷ কিন্তু ভিতর দিকটায় মেলা আগাছা হয়েছে৷ লুকিয়ে থাকার পক্ষে তোফা জায়গা৷ আমি একটা কাঁটাঝোপের কাছাকাছি ঘাপটি মেরে বসে চারদিকে দেখছি, এমন সময়-'

'এমন সময়? ঃউ, বলো না!'

'বলছি দাঁড়াও৷ হাঁ করতেই গলায় একটা মশা চলে গেল যে!' খক খক করে কেশে গলা সাফ করে গবা বলে, 'বেশ নিঝুম৷ আলোর চিকড়িমিকড়ি৷ শীত৷ কোথাও কিছু নেই, হঠাৎ একটা লম্বা হাত কোত্থেকে বেরিয়ে এসে ঘপাত করে আমার ঘাড়টা ধরল৷'

'বলো কী?'

'ওরে বাবা, সে-কথা ভাবতে আজও গায়ে কাঁটা দেয়৷ এই দেখো ফের গায়ের রোঁয়া দাঁড়িয়ে যাচ্ছে৷'

'তারপর কী হল?'

'আমি তো কেমন হতবুদ্ধি হয়ে গেছি৷ আর হাতটাও পেল্লায়৷ এই মোটা মোটা আঙুল, কুলোর মতো মস্ত পাঞ্জা৷ সেই হাতে একটু বেকায়দা বেশি চাপ পড়লে আমাদের মতো সাধারণ ঘাড় মট করে ভেঙে যাবে৷ কিন্তু আশ্চর্যের কথা, হাতটা আমার ঘাড় ধরল কিন্তু তেমন আঁট করে ধরল না৷ বরং মনে হচ্ছিল, মস্ত হাতটা আমার কাঁধে বিশ্রাম নিচ্ছে৷ কিন্তু আমি সেই ভারেই তখন কুঁই কুঁই করছি৷ টের পেলাম হাতটা সামনের কাঁটাঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে আমার ঘাড় ধরেছে৷ হাতটা মানুষের না অন্য কিছুর তা তখনও বুঝতে পারছি না৷'

'মানুষ নয়?'

'তখন তা বুঝবার মতো মনের অবস্থা নয়৷ তবে হঠাৎ ঝোপের ভিতর থেকে একটা খসখসে শ্বাস টানার শব্দ পেলাম৷ আমি তখন ভয়ে একেবারে পাথর৷ হঠাৎ সেই পেল্লায় হাত আমার ঘাড়ে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে, আস্তে আস্তে ঝোপটার মধ্যে টেনে নিতে লাগল৷ সাংঘাতিক কাঁটাঝোঁপে আমার গাল নাক কান ছড়ে যাচ্ছে, চোখেও কাঁটা ঢুকে যেতে পারে৷ আমি দু-হাত দিয়ে চোখটা আড়াল করলাম৷ তারপর ডালপালা সমেত মুখ থুবড়ে পড়লাম মাটিতে৷ দেখি কী, কাঁটাঝোপের মধ্যে একটা লোক শুয়ে আছে৷ চারদিক রক্তে ভেজা৷'

'ঃও বাবা!'

'বাবা বলে বাবা! আমি তো তখন বাবা ছেড়ে ঠাকুরদাকে ডাকতে লেগেছি৷'

'হল কী বলো না!'

'তেমন কিছু নয়৷ লোকটার তখন প্রায় হয়ে গেছে৷ বুকে মস্ত ক্ষত৷ তা থেকে বগবগ করে রক্ত পড়ছে৷ লোকটার গলায় ঘড়ঘড়ানি উঠে গেছে৷ লোকটা কোনোক্রমে বলল, পাখি জানে৷ পাখি সব জানে৷ এইটুকু বলেই লোকটা ঢলে পড়ল৷'

'লোকটা কে?'

'আর কে? সেই হরিহর পাড়ুই৷ তখনও মরেনি, কিন্তু মরছে৷ কিন্তু আমার অবস্থা তখন সাংঘাতিক৷ মরার সময় কী করে জানি না পাড়ুইয়ের হাতটা আমার ঘাড়কে শক্ত করে ধরল৷ কিছুতেই ছাড়াতে পারি না৷ ওদিকে কাছাকাছি অনেকগুলো পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি৷ কারা যেন এগিয়ে আসছে৷ চারদিকে টর্চের বাতি ঝলসাচ্ছে ফটাফট৷ যারাই হোক, তারা লোক ভালো নয়৷ আমার পালানো দরকার৷ কিন্তু হরিহরের হাতখানা আমাকে অষ্টপাশে বেঁধে ফেলেছে৷ কার সাধ্য ছাড়ায়! তার ওপর আঙুলগুলো ক্রমে বেঁকে গলায় গজালের মতো ঢুকে যাচ্ছে৷ মরন্ত মানুষের গায়ে যে অত শক্তি হয় কে জানত বলো৷'

'তারপর কী হল? তাড়াতাড়ি বলো৷'

'ওদিকে সেই বদমাশগুলোও তেড়ে আসছে৷ চারদিকে টর্চের আলো ঝলসাচ্ছে৷ একটা লোক চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, সাতনা, ঠিকমতো বল্লম চালিয়েছিলি তো! অন্য একজন রাশভারী গলায় বলল, আমার বল্লম এদিক-ওদিক হয় না৷ ঝাউবনে ঢুকবার মুখেই লোকটাকে গেঁথেছি৷ তবে দানোটার গায়ে খুব জোর৷ বল্লমটা ধাঁ করে টেনে খুলেই দৌড়ে পালাল৷ কিন্তু মনে হয় না বেশি দূর যেতে পারবে৷ চারদিকে রক্তের ছড়া দেখছ না!'

'তখন তুমি কী করলে?'

'আমি? আমি তখন কিছু করাকরির বাইরে৷ হরিহরের কব্জায় আমার পুঁটিমাছের পরান ধড়ফড় করছে৷ আস্তে আস্তে চেতন ভাবটা চলে যাচ্ছে৷ শ্বাস প্রায় বন্ধ৷ ঠিক এই সময়ে লোকগুলো 'ওই যে' বলে চেঁচিয়ে উঠল৷ পরমুহূর্তেই সবাই এসে ঘিরে ধরল আমাদের৷'

'তুমি বেঁচে গেলে বুঝি!'

'আরে দূর! অত সহজ নাকি? লোকগুলো টর্চ জ্বেলে দৃশ্যটা দেখেই চেঁচিয়ে বলে উঠল, এখনও বেঁচে আছে! সর্বনাশ৷ শেষ করে দে৷ শেষ করে দে৷ বলতে বলতে একটা লোক মস্ত দা বের করে প্রথম কোপটায় হরিহরের গলা নামিয়ে দিল৷'

'বলো কী? আর তুমি?'

'আর যারা ছিল তারা বলল, এ লোকটা কে রে? আর একজন বলল, যেই হোক, সাক্ষী রেখে লাভ নেই৷ লোকটা বেঁচে আছে৷ গলাটা নামিয়ে দে৷ সঙ্গেসঙ্গে আর একটা লোক ঘচাত করে আমার গলাটাও নামিয়ে দিল৷'

'যাঃ, কী যে বলো৷'

'যা বলছি শুনে যাও৷ একেবারে প্রত্যক্ষ ঘটনা, দুনিয়ায় আর কোনো মানুষের এমন অভিজ্ঞতা নেই৷ স্পষ্ট নিজের কাটামুণ্ডু প্রত্যক্ষ করলাম৷ বুঝলে! গলা দিয়ে ফোয়ারার মতো রক্ত পড়ছে৷ ধড়টা একটু ছটফট করছে৷ কিন্তু মুখখানা দিব্যি হাসি হাসি৷'

'গুল মারছ গবাদা৷'

'সত্যি না৷ তারপর হল কী শোনো৷ সে এক কাণ্ড৷'

'বলো৷'

'ওরা তো আমাদের কবন্ধ করে রেখে পালিয়ে গেল৷ আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একটা গাছে ঠেস দিয়ে বসলাম৷ বারবার গলায় হাত বোলাচ্ছি৷ কিন্তু সেটা তো আমার গলা নয়৷ শরীরটা তখন বাতাসের মতো হালকা পাতলা জিনিস হয়ে গেছে৷ দেখি ঝোপের ওপাশ থেকে হরিহর পাড়ুইও উঠে পড়ে চারদিকে কটমট করে চাইছে৷ তার চাউনি দেখে ভয় খেয়ে পালাতে গিয়ে মনে হল, এখন আর ওকে ভয় কী? আমিও একটু ওর দিকে এগিয়ে গেলাম৷ হরিহর আমাকে পছন্দ করছিল না৷ কাছে যেতেই একটা হুংকার দিল, খবরদার! আমি খিক করে হেসে বললাম, তোমার আর সেই দিন নেই হে হরিহর৷ মাথা গরম কোরো না বাবা৷ তার চেয়ে চলো চাঁদের আলোয় চরে বেড়াতে বেড়াতে দুটো সুখ-দুঃখের কথা কই৷ হরিহর প্রথমটায় একটু গোঁ ধরে বসে ছিল৷ তারপর যখন সত্যিই বুঝল যে, সে মরে গেছে, তখন আমার সঙ্গে মিশতে আপত্তি করল না তেমন৷'

'মরে গিয়ে তুমি ফের বেঁচে উঠলে কী করে?'

'সে তো আর এক গল্প৷ আলফা সেনটরির গ্রহ থেকে যাদের আসবার কথা ছিল, তারা ভোররাত্রে এসে আমার দশা দেখে চটপট মাথাটা জুড়ে দিয়ে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলল যে৷'

'যত সব গুল৷ কিন্তু পাখি কী জানে তা তো বললে না?'

'হ্যাঁ৷ সেইটেই তো আসল গল্প৷ আর একদিন হবেখন৷'

১২

রামু সঙ্গেসঙ্গে গবার হাত ধরে বলল, 'না, না, বলো৷ বলতেই হবে৷'

গবা মাথা চুলকে বলে, 'আসলে কী জান, বেশ কিছুদিন আগেকার কথা কিনা, ঠিক স্মরণ হচ্ছে না৷ তার ওপর আমার মাথাটা কাটা গিয়েছিল তো, তাতেও বুদ্ধি একটু ঘুলিয়ে গেছে৷ জ্যোৎস্নায় কাশিমের চরে হরিহরের প্রেতাত্মার সঙ্গে আমার যে-সব কথা হয়েছিল তার মধ্যে পাখির কথাটা আসেনি৷ মনে আছে আমরা সেই গলা কাটনেওলা লোকগুলোর আক্কেল নিয়ে কথা বলছিলাম৷ হরিহর একবার ভুল করে একটা মশা মারতে গিয়েছিল তাও মনে আছে৷ হাওয়ার হাত দিয়ে কি আর মশা মারা যায়? দু-জনে খুব হেসেছিলাম৷ কী হয় জান, মরলে পর আর পুরোনো শত্রুতা, রাগ, হিংসা এসব থাকে না৷ বেঁচে থেকে মানুষ যে-কাণ্ডমাণ্ড করে সেগুলোকে ভারি ছেলেমানুষি মনে হয় তখন৷ বাঁচা অবস্থায় তো আমি হরিহরকে কতই না সমঝে চলছিলাম, মরার পর আবার সেই হরিহরের সঙ্গে চাঁদের আলোয় গলা ধরাধরি করে বালির ওপর কত ঘুরলাম৷'

'পাখির কথাটা তুললে না?'

'ওই যে বললাম, বাঁচা অবস্থার কৌতূহলগুলো পর্যন্ত মরার সঙ্গেসঙ্গে মরে যায়৷'

'পাখিটা তবে কী জানত?'

'সেটা ভেবে দেখতে হবে!'

'আর হরিহরকে সেদিন খুনই-বা করল কারা? তাদের তুমি চেন?'

'কস্মিনকালে না৷'

'মাস্টার গোবিন্দকে তাহলে পুলিশ ধরল কেন?'

'এমনি এমনি ধরেনি৷ গোবিন্দরও দোষ আছে৷'

'কী দোষ?'

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গবা বলে, 'সে আবার আর এক গল্প৷'

'তাহলে গল্পটা বলে ফেল৷'

'সেটা একদিন গোবিন্দর কাছেই শুনে নিয়ো৷ আজ মেলা বকবক করে ফেলেছি৷'

'গোবিন্দর কাছে কবে আমাকে নিয়ে যাবে?'

'আমি এখন তার কাছেই যাচ্ছি৷ ইচ্ছে করলে তুমিও যেতে পার৷ তবে খবরদার, ঘুণাক্ষরেও কাউকে বোলো না যেন৷ জানাজানি হলেই পুলিশ গোবিন্দকে ধরে নিয়ে গারদে পুরবে৷'

শহর ছাড়িয়ে মাইলটাক মেঠোপথে হাঁটলে একটা বেশ সমৃদ্ধ গাঁ৷ সন্ধের একটু আগে সেই গাঁয়ের এক সম্পন্ন গেরস্তবাড়িতে রামুকে নিয়ে হানা দিল গবা৷

গবাকে দেখে বাড়ির সবাই তটস্থ৷ 'আসুন, আসুন, বসতে আজ্ঞা হোক৷'

নিকোনো উঠোনে জলচৌকি পেতে দেওয়া হল৷ ঘটির জলে হাতমুখ ধুয়ে এসে রামু আর গবা পাশাপাশি দুটো জলচৌকিতে বসতে-না-বসতেই দুটো ছোটো ধামায় টাটকা ভাজা মুড়ি, বাতাসা, নারকেল আর দুধ খেতে দেওয়া হল তাদের৷ সারা দিনে রামুর এই প্রথম সত্যিকারের কিছু খাওয়া৷ সে যখন হালুমহুলুম করে খাচ্ছে তখন গবা খুব মুরুব্বির চালে গেরস্তকে জিজ্ঞেস করল, 'গোরু রাখার জন্য যে বোবা কালা লোকটাকে দিয়েছিলাম সে কেমন কাজ-টাজ করছে?'

'আজ্ঞে কাজ ভালোই করে৷ খায়ও কম৷ কিন্তু লোকটা ভারি রাগী৷'

'খুব চোটপাট করে বুঝি?'

গেরস্ত একটু অবাক হয়ে বলে, 'বোবা লোক চোটপাট করবে কেমন করে? তা নয়, তবে চোখ দু-খান দিয়ে মাঝে মাঝে এমনভাবে তাকায় যে, পেটের মধ্যে গুড়গুড়নি উঠে যায়৷'

'তা লোকটা কোথায়?'

'একটু আগে গোরু নিয়ে ফিরল৷ এখন গোয়ালে সাঁজাল দিচ্ছে৷ ডাকাচ্ছি৷'

গেরস্তর ছেলে গিয়ে রাখালটাকে ডেকে আনল৷ পরনে আধময়লা হেঁটো ধুতি, গায়ে একটা মোটা কাপড়ের পিরান, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি৷ চোখ দুটির দৃষ্টি এত তীক্ষ্ণ যে, তাকালে বুকের মধ্যে একটু ধুকুরপুকুর হয় বটে৷

গবা জিজ্ঞেস করল, 'কেমন আছিস রে!'

লোকটা 'ব ব ওয়াঁ' গোছের কিছু দুর্বোধ শব্দ করল৷

গবা মাথা নেড়ে বলে, 'বেশ বেশ বেশ৷ তুই তো আবার কানেও শুনিস না৷ তবু বলি, এরা ভালো লোক৷ এদের কাছে ভালো হয়ে থাকবি৷ চল, একটু এগিয়ে দিবি আমাদের৷ আঁধার হয়ে এসেছে, লন্ঠনটা নিয়ে সঙ্গে আয়৷'

শুনে গেরস্তর ছেলেপুলেরা হইহই করে উঠল৷ 'এখুনি যাবে কি গবাজ্যাঠা! আমরা যে তোমার সেই মেছোভূতের গল্পটার শেষটুকু শুনব বলে কতদিন ধরে হা-পিত্যেশ করছি৷ সেই যে গো আন্নাপুরের বড়ো ঝিলে সেবার মাছ ধরতে গিয়ে জলে একটা বড়ো কড়াই ভাসতে দেখেছিলে৷ তারপর সেই ভাসন্ত কড়াইটা যেই কাছে এসেছে অমনি সেটাকে ধরতে গিয়ে হাতে গরম ছ্যাঁকা খেলে! তারপর দেখলে, কড়াইটা জলে ভাসছে বটে কিন্তু তাতে গরম তেল ফুটছে৷ তারপর কী হল?'

গবা উঠে পড়ে বলল, 'সে আর একদিন হবে৷ বাবুর বাড়ির ছেলেকে নিয়ে এসেছি, তাড়াতাড়ি না ফিরলে রক্ষে থাকবে না৷'

রাখালটা লন্ঠন আর লাঠি হাতে তাদের সঙ্গে এগিয়ে দিতে এল৷ মেঠোপথে পা দিয়েই বোবা রাখাল কথা কয়ে উঠল, 'গবাদা, ওদিকে কী হচ্ছে?'

'ধুন্ধুমার৷ পুলিশ চারদিকে তোমায় খুঁজছে৷'

১৩

একটা শক্ত মামলায় মক্কেলকে জিতিয়ে দিয়েছেন উদ্ধববাবু৷ বড়োলোক মক্কেল সকালেই বিরাট ভেট নিয়ে হাজির৷ ফলের ঝুড়ি, মিষ্টির চ্যাঙাড়ি, দইয়ের হাঁড়ি, বারকোশে মস্ত রুইমাছ, ধামাভরতি শীতের সবজি৷ এলাহি কাণ্ড৷

মামলায় জিতে উদ্ধববাবুর মনটা আজ ভালো৷ অন্য একটা মামলার সওয়ালের ফাঁকে গুনগুন করে ভৈরবী ভেঁজে নিচ্ছিলেন৷ আদালতে গান গাওয়া নিষিদ্ধ৷ হাকিমসাহেব গুনগুনানি শুনে বারবার এধার-ওধার তাকান, কিন্তু কোত্থেকে গানটা আসছে তা বুঝতে পারেন না৷ বার দুই-তিন হাতুড়ি ঠুকে 'অর্ডার অর্ডার' হাঁক দিলেন৷ প্রতিবারই উদ্ধববাবু রুমালে মুখ ঢেকে জিব কাটলেন৷ কিন্তু গান জিনিসটা ভারি অবাধ্য৷ ভিতরে গানের ফোয়ারা খুলে গেলে তাকে ঠেকায় কার সাধ্য৷

অবশেষে বিপক্ষের উকিল উঠে হাকিমকে বললেন, 'আমাদের লার্নেড ফ্রেন্ড উদ্ধববাবুর স্বভাব অনেকটা কোকিলের মতো৷ বসন্ত সমাসন্ন দেখে ওঁর কন্ঠ কুহু কুহু রবে চঞ্চল হয়ে উঠেছে৷ তারপর কোকিল যেমন কাকের বাসায় ডিম পাড়ে, উনিও তেমনি ওঁর গানের ডিম এই আদালতে পেড়ে রেখে যাচ্ছেন৷'

এই অদ্ভুত সওয়ালে হাকিম ভ্রূ কোঁচকালেন, লজ্জিত উদ্ধববাবু ঘাড় চুলকোচ্ছেন৷ আর একবার হাতুড়ি মেরে আদালতকে চুপ করিয়ে উদ্ধববাবুকে বলেন, 'আপনার হিয়ারিংয়ের জন্য আর একটা ডেট নিন৷ আজ বাড়ি চলে যান৷'

হাঁফ ছেড়ে উদ্ধববাবু বেরিয়ে এলেন৷ বাস্তবিক এতক্ষণ তাঁর হাঁফ ধরে আসছিল, আইঢাই করছিল৷ পাকা ফোঁড়ার মতো ভিতরে টনটন করছে গান৷ একটু টুসকি দিলেই বোমার মতো ফেটে পড়বে৷ সেই টুসকিটা এতক্ষণ দিতে পারছিলেন না৷

এজলাসের চৌহদ্দি পার হয়ে রাস্তায় পড়েই গানের ফোঁড়াটায় টুসকি দিলেন উদ্ধববাবু৷ আর বাস্তবিক সেটা বোমার মতোই ফাটল৷ হাঁ করে প্রথম তানটা লাগাতেই এত জোর শব্দ হল যে, উদ্ধববাবু নিজেই হকচকিয়ে গেলেন৷

শুধু তাই নয়৷ সেই শব্দে রাস্তার লোকজনও পালাতে লাগল৷ কাক কা-কা করে উড়ে উড়ে ঘুরতে লাগল৷ উদ্ধববাবু তাজ্জব হয়ে দেখলেন, তাঁর গানের ফোঁড়াটা বোমার মতো ফেটে চারদিকে ধোঁয়া ছড়াচ্ছে৷

ভ্যাবাচ্যাকা ভাবটা কেটে যেতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল৷ তারপর উদ্ধববাবু হঠাৎ বুঝতে পারলেন শব্দটা তাঁর গলা থেকে বেরোয়নি৷ অমন বোমার মতো আওয়াজ খুব বড়ো ওস্তাদের গলা থেকে বেরোবার কথা নয়৷ যুক্তি অনুসরণ করলে সন্দেহ থাকে না, বোমার মতো আওয়াজটা একটা বোমারই কাজ৷ আর সেটা ফেটেছে উদ্ধববাবুর মাত্র হাত দশেকের মধ্যে৷

রাস্তার আর পাঁচজনের মতো উদ্ধববাবুও দৌড়োতে লাগলেন৷ অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনার সময় নেই৷ গলায় গানটাও আর ঠেলাঠেলি করছে না৷

বাড়িতে এসে নিজের ঘরে শুয়ে চোখ বুজে অনেকক্ষণ হাঁফ ছাড়লেন উদ্ধববাবু৷ ব্যাপারটা কী হল তা বুঝতে পারছিলেন না৷ বোমাটা এত কাছাকাছি ফেটেছে যে, সেই শব্দে তাঁর মাথাটা এখনও ভোম্বল হয়ে আছে৷ এমনকী শুয়ে শুয়ে কয়েকবার ভৈরবীতে তান লাগানোর চেষ্টাও করলেন উদ্ধববাবু৷ কিন্তু গলার স্বর ফুটল না৷

ভিতরের বারান্দা থেকে কাকাতুয়াটা বলে উঠল, 'দাঁড়া, তোকে মজা দেখাচ্ছি৷ দাঁড়া, তোকে মজা দেখাচ্ছি৷'

উদ্ধববাবু কাকাতুয়ার কথা শুনে উঠে বসলেন৷ মক্কেল যে অঢেল ভেট দিয়ে গেছে, তা ফেলে-ছড়িয়ে খেয়েও শেষ হওয়ার কথা নয়৷ তাই উঠে ভিতরবাড়ি থেকে একটা রসগোল্লার হাঁড়ি এনে কাকাতুয়াটাকে খাওয়াতে লেগে গেলেন৷

কাকাতুয়াটা বেশ চেখেচুখেই খাচ্ছিল৷ কয়দিনে পাখিটা উদ্ধববাবুকে খুব চিনেছে৷ খেতে খেতে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে উদ্ধববাবুকে দেখছিল৷ হঠাৎ একটু চাপা গলায় বলল, 'কাউকে বোলো না৷ কাশিমের চরে অনেক মোহর আছে৷'

উদ্ধববাবু হাঁ করে চেয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, 'বলিস কী রে?'

'বিশু জানে না৷ বিশু জানে না৷'

'বিশুটা কে বলবি তো৷'

পাখি তখন অন্য কথা বলতে লাগল, 'রামু, তুমি ভীষণ দুষ্টু৷ পড়তে যাও৷ নইলে গোল্লা পাবে৷' তারপর আবার স্বর পালটে বলে, 'দাঁড়া, তোকে মজা দেখাচ্ছি৷'

চারদিক চেয়ে উদ্ধববাবু পাখির দাঁড়টা বারান্দা থেকে নিজের ঘরে এনে রাখলেন৷

উদ্ধববাবু বিস্তর মামলামোকদ্দমা করেছেন৷ তিনি জানেন, যার কাছে কোনো গোপন খবর থাকে, তার জীবন সর্বদাই বিপদসংকুল৷ এই পাখিটা নিশ্চিত লুকোনো সম্পদের খবর জানে৷ এ পর্যন্ত পাখিটার ওপর হামলাও কিছু কম হয়নি৷ কিন্তু এতকাল কাকাতুয়াটা কাশিমের চরের কথা বলেনি! কেউ যদি কথাটা শুনতে পায়, তবে যেমন করেই হোক হন্যে হয়ে পাখিটাকে হাত করার চেষ্টা করবে৷ তার জন্য খুন পর্যন্ত করতে পিছপা হবে না৷

উদ্ধববাবু আরও কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে বিছানায় গা ঢালতেই পিঠের নীচে কী একটা খচমচ করে উঠল৷ উঠে দেখলেন একটা খাম, তাতে ওঁর নাম লেখা৷

খাম খুলতেই একটা চিঠি৷

মহাশয়, কাকাতুয়াটা ফেরত পাইবার জন্য যে প্রস্তাব দিয়াছিলাম তাহা আপনি কার্যত অগ্রাহ্য করিয়াছেন৷ বুঝিতেছি সহজ পথে আপনি পাখিটিকে ফেরত দিবেন না৷ তাহাতে অবশ্য আমাদের কিছুই না, বিপদ আপনারই৷ আজ আদালতের বাহিরে যাহা ঘটিল, তাহা একটি নমুনা মাত্র৷ বোমাটিতে কেবল আওয়াজের মশলা ছিল, ক্ষতিকারক কোনোকিছু ছিল না৷ আপনাকে আমাদের সম্পর্কে সচেতন করিয়া দিতেই এই কাজ করিতে বাধ্য হইলাম৷ ইহার পর যদি কখনো আমাদের বোমা প্রয়োগ করিতে হয়, তবে এবার তাহার মধ্যে মারাত্মক বস্তু সকলই থাকিবে৷ মনুষ্যজীবন অতীব মহার্ঘ বিবেচনা করিয়া ভালোয় ভালোয় পাখিটিকে আমাদের হাতে তুলিয়া দিবেন৷ বেশি কিছু করিতে হইবে না৷ আপনাদের বাহিরের বারান্দায় আজ রাতে পাখির দাঁড়টা (পাখি সমেত) ঝুলাইয়া রাখিবেন৷ কোনো পাহারা রাখিবেন না৷ আমরা যথাসময়ে তাহা হস্তগত করিব৷ ক্ষতিপূরণ বাবদ যথেষ্ট অর্থও আপনি পাইবেন৷ ইতি৷

এর আগের চিঠিতে 'আমি আমি' করে লেখা ছিল৷ এই চিঠিতে বহুবচনে 'আমরা'৷

উদ্ধববাবু চার দিকে চেয়ে দেখলেন শোয়ার ঘরের তিন দিকেই বড়ো বড়ো জানলা৷ দক্ষিণ দিকে বাগান, পূর্ব দিকেও বাগান, উত্তরদিকে কলতলা৷ পত্রবাহক কোন দিক দিয়ে এসে টুক করে এই অল্প সময়ের মধ্যে জানলা গলিয়ে চিঠিটা বিছানায় ফেলে গেছে, তা অনুমান করা শক্ত৷ তবে এরা যে বেশ সংগঠিত দল তাতে সন্দেহ নেই৷

উদ্ধববাবু গম্ভীর মুখে বললেন, 'হুঁ৷'

পাখিটাও তার হুঁ শিখে গেছে৷ সেও বলল, 'হুঁ৷'

উদ্ধববাবু কাকাতুয়ার দিকে চেয়ে দেখলেন পাখিটাও তাঁর দিকেই চেয়ে আছে৷ বড়ো মায়া পড়ে গেছে উদ্ধববাবুর৷ উঠে গিয়ে কাকাতুয়ার পালকে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, 'কেন যে বাবা গোপন কথাগুলো শিখতে গেলি৷ এখন তোরও বিপদ, আমারও বিপদ৷'

পাখিটা হঠাৎ আর্তস্বরে বলে উঠল, 'বিশু, আমাকে মেরো না! মেরো না!'

উদ্ধববাবু চমকে চারদিকে চেয়ে দেখলেন, না, কেউ কোথাও নেই৷ পাখিটা পুরোনো মুখস্থ বুলিটা বলছে৷

আলমারি খুলে উদ্ধববাবু তাঁর বাবার আমলের দোনলা বন্দুকটা বের করলেন৷ বহুকাল কেউ বন্দুকটা চালায়নি৷ উদ্ধববাবু বন্দুকটা পরিষ্কার করতে বসে গেলেন৷

ভয়ের চেয়ে ভালোবাসা অনেক বড়ো৷ উদ্ধববাবু ভয়ের কাছে হার মানতে রাজি নন৷

১৪

এমনিতে দেখতে গেলে মাস্টার গোবিন্দ বেশ সুখেই আছে৷ সারাটা দিন গোরু চরায়, গেরস্ত বাড়ির অজস্র কাজ মুখ বুজে করে, পেট ভরে খায় আর সন্ধের পর খড়ের গাদায় ঢুকে ঘুমোয়৷ বোবা কালা হয়ে থাকতে একটু কষ্ট হয় বটে, কিন্তু সেটা সইয়ে নিচ্ছে৷ মাঝে মাঝে বেমক্কা মুখ ফুটে এক-আধটা শব্দ বেরিয়ে আসে ঠিকই, কিন্তু ততটা ক্ষতি কিছু হয়নি৷

সেদিন গেরস্তর ছেলের বউ এক গামলা ফুটন্ত ভাতের ফ্যান উঠোনের কোনে রেখে খার কাচতে গেছে, এমন সময় গেরস্তর ছোট্ট নাতি হামা টানতে টানতে গিয়ে সেই গামলার কানা ধরে উঠতে গিয়েছে৷ গোবিন্দ গোরুগুলোকে মাঠ থেকে নিয়ে আসতে যাচ্ছিল দুপুর বেলা৷ এই দৃশ্য দেখে বেখেয়ালে 'ইশ, গেল, ছেলেটা গেল' বলে চেঁচিয়ে দৌড়ে এসে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেয়৷ ভাগ্যিস কেউ শোনেনি৷

আর একদিন গেরস্তর মেজো ছেলে সকালে তাকে ঘুম থেকে তুলে দিতে এসেছিল৷ তখন একেবারে কাকভোর৷ আগের রাত্রে যাত্রা শুনেছে বলে ঘুমটা ভোরে খুব গাঢ় হয়েছিল গোবিন্দর৷ ছেলেটার ডাকাডাকিতে উঠে বসে বলে ফেলেছিল, 'দুত্তোর, এমন ষাঁড়ের মতো কেন চ্যাঁচায় লোকে!' ছেলেটা অবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে বলল, 'এ কী! তুমি যে বড়ো কথা বলতে পার৷' গোবিন্দ ফ্যাসাদে পড়ে অনেকক্ষণ বু-বু করল বটে, কিন্তু ছেলেটার যেন প্রত্যয় হল না৷ পাছে লোক জানাজানি হয়ে যায়, সেই ভয়ে তখন ছেলেটাকে কিছু কিছু কথা খুলে বলল গোবিন্দ৷ রাজি করাল যাতে কাউকে না বলে৷

বেশ কাটছিল৷ কিন্তু একদিন সকাল বেলা গোবিন্দ দেখল, একটা রোগা শুঁটকো মতো লোক গেরস্তর সঙ্গে উঠোনে বসে কথা বলছে৷ লোকটার চাউনি-টাউনিগুলো ভালো নয়৷ কথা বলতে বলতে চারদিকে নজর রাখছে৷ বোঝা যায় কিছু বা কাউকে খুঁজছে৷

লোকটা চলে যাওয়ার পর গোবিন্দ গেরস্তর মেজো ছেলেকে আড়ালে ডেকে জিজ্ঞেস করল, 'যে লোকটা এসেছিল, সে কে বলো তো!'

'ও হল ফন্তুবাবু৷'

'সে আবার কে?'

'দালালি-ফালালি করে৷ জমি বেচাকেনার কারবার আছে৷'

'আর কিছু?'

'আর কিছু তো জানি না৷'

'মানুষটা কেমন?'

'তা কে জানে! তবে বাবার কাছে মাঝে মাঝে আসে৷'

'আজ কেন এসেছিল একটু খোঁজ নেবে? যাও, তোমার বাবাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে এসো৷'

ছেলেটা একটু বাদে ঘুরে এসে বলল, 'কে একটা লোক জেলখানা থেকে পালিয়ে এদিকে এসেছে তার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল৷'

গোবিন্দ জেল পালানোর কথাটা ছেলেটাকে বলেনি৷ শুধু বদমাশ লোক তার পিছনে লেগেছে বলে সে লুকিয়ে আছে৷ গোবিন্দ জিজ্ঞেস করল, 'তোমার বাবা আমার কথা কিছু বলেননি তো!'

কিছু লোকের স্বভাব হল, বুদ্ধি থাকলেও তা খাটাবে না৷ ছেলেটা বলল, 'দাঁড়াও গিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করে আসি৷'

গোবিন্দ তাকে থামিয়ে বলল, 'এখন ফের জিজ্ঞেস করলে তোমার বাবার সন্দেহ হবে৷ থাকগে৷'

রামু মাঝে মাঝে ছুটির দিনে গোরু চরানোর মাঠে খেলা শিখতে আসে৷ গোবিন্দ লক্ষ করেছে, ছেলেটা যেদিকে মন দেয় সেদিকটায় বেশ ধাঁ করে উন্নতি করে ফেলতে পারে৷ খালি মাঠে যন্ত্রপাতি ছাড়া রামুকে আর কী-ই-বা শেখাতে পারে গোবিন্দ? তবু যে কয়েকটা মামুলি একসারসাইজ শিখিয়েছিল, তা চটপট শিখে নিল রামু৷ খেলা শেখার ফাঁকে ফাঁকে দু-একটা খবরও দিত৷ সামন্ত বলে দিয়েছে, পুলিশ সার্কাসের ওপর নজর রাখছে তো বটেই, কিন্তু ভাবগতিক দেখে মনে হল পুলিশ ছাড়া অন্য-কিছু লোকও সার্কাসের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে৷ আর একদিন এসে রামু জানিয়ে গেল, খুব শিগগিরই সার্কাস এখান থেকে উঠে যাবে৷ গোবিন্দ যেন সার্কাসের দলের সঙ্গে না যায়৷ এবার সার্কাস যাবে অযোধ্যার দিকে৷ পারলে গোবিন্দ যেন সেখানে গিয়ে দলে ভিড়ে যায়৷

সার্কাসের জন্য প্রাণটা বড়ো কাঁদে গোবিন্দর৷ চারদিক থেকে আলো এসে পড়ে, শূন্যে মাটিতে তার বা দড়ির ওপর হরেকরকম খেলা চলে, সঙ্গে অদ্ভুত ব্যান্ডের আওয়াজ-সে যেন এক স্বপ্নের জগৎ৷ তা ছাড়া সার্কাস হল এক বৃহৎ পরিবার৷ সকলের জন্য সকলে৷ সেই সার্কাসে আর ফিরে যাওয়া হবে কি না কে জানে!

গোরু চরাতে চরাতে এইসব ভাবে গোবিন্দ৷

একদিন গোরু নিয়ে বিকেল বেলা ফিরছে, হঠাৎ দেখে গেরস্তর বাড়ির সামনে খুব লম্বা আর জোয়ান একটা লোক দাঁড়িয়ে গাঁয়ের আর একটা লোকের সঙ্গে কী কথা বলছে৷ গোবিন্দ পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়ে শুনতে পেল গাঁয়ের লোকটা বলছে, 'না, এ-গাঁয়ে খুনি গুণ্ডা বদমাশ আসবে কোত্থেকে? সে সব শহরে থাকে৷'

লম্বা লোকটা বলল, 'হয়তো পালিয়ে আছে৷'

'পালানোর জায়গা কোথায়?'

'আচ্ছা, গবা বলে কাউকে চেনো?'

'খুব চিনি৷ গবা পাগলা হলেন স্বয়ং শিব৷'

'তিনি কি এ-গাঁয়ে আসেন?'

'প্রায়ই আসেন৷ এই তো সেদিন আমার কেলে গোরুটার কলেরার মতো হল৷ গবা পাগলটাকে ডেকে আনতে তিনি এসে এমন এক ভস্ম খাইয়ে দিলেন যে, পরদিন থেকে গোবর একেবারে ইটের মতো এঁটে গেল৷'

এই পর্যন্ত শুনে গোবিন্দ বাড়িতে ঢুকে পড়ল৷

কিন্তু মুশকিল হল, এ-লোকটা পুলিশের লোক নয়৷ লম্বা এবং বিশাল চেহারার এই দানবকে গোবিন্দ চেনে৷ রয়্যাল সার্কাসে লোকটা পাঁচ মন ভার তুলে রোজ সকলকে তাক লাগিয়ে দিত৷ তারপর সে হঠাৎ একদিন সার্কাস ছেড়ে উধাও হয়৷ গোবিন্দ কানাঘুসো শুনেছে, এই লোকটা অর্থাৎ সাতনা একটা বাজে সঙ্গে পড়ে খুনখারাপি করে বেড়ায়৷ কেন সাতনা খারাপ লোকদের দলে ভিড়ল তাও খানিকটা জানে গোবিন্দ৷ সাতনার সাত বছর বয়সের একটা মা-মরা মেয়ে ছিল৷ কে বা কারা সেই মেয়েটাকে চুরি করে সার্কাস থেকে নিয়ে যায়, তারপর দশ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে৷ সাতনার অত টাকা ছিল না৷ আদরের মেয়েকে প্রাণে বাঁচানোর জন্য সে রয়্যাল সার্কাসের মালিকের হাতে পায়ে ধরে টাকাটা ধার হিসেবে চায়৷ কিন্তু সার্কাসের মালিক টাকাটা দেয়নি৷ কিছুদিন পর মেয়েটাকে নাকি কাশীতে ভিক্ষে করতে দেখা গিয়েছিল৷ তখন তার জিভ কাটা, একটা চোখ কানা৷ সাতনা কাশীতে যায়, কিন্তু মেয়েকে পায়নি৷ সেই থেকে পাগলের মতো হয়ে যায়৷ কাশিমের চরের কাছে সুলতানপুরে মেয়েটি চুরি যায়৷ সাতনা নিজের সঙ্গে মেয়েটাকে নিয়ে সার্কাসের দলে ঘুরে বেড়াত৷ মেয়েকে খেলা শেখাত৷ সেই মেয়ে নিখোঁজ হওয়ায় সে আবার সুলতানপুরে ফিরে আসে৷ তারপর কী হয়েছে তা আর গোবিন্দ স্পষ্ট জানে না৷

এখন সাতনা তার খোঁজ করছে জেনে সে খুব অবাক হল৷ সাতনার সঙ্গে তার কোনো শত্রুতা নেই৷ অবশ্য বন্ধুত্বও নেই৷ সাতনার সঙ্গে খুব সামান্য একটু চেনাজানা মাত্র ছিল তার৷

রাতে খড়ের গাদায় শুয়ে অনেক ভেবেও সে কিছুতেই ব্যাপারটা বুঝতে পারছিল না৷ তবে সাতনার সঙ্গে হরিহর পাড়ুইয়ের খুব বন্ধুত্ব ছিল একসময়৷ হরিহর ছিল সুলতানপুরের সুলতান৷ তার কথায় গোটা গঞ্জ উঠত বসত৷ কিন্তু সেটা করত ভয়ে৷ ওই রকম ভয়ংকর লোক দুটো দেখা যায় না৷

গোবিন্দ ঘুমিয়ে পড়েছিল, মাঝ রাতে আচমকা ধোঁয়ার গন্ধে উঠে বসল৷ চোখ কচলে চেয়ে কিছু বুঝবার আগেই হঠাৎ অবাক হয়ে দেখল পুরো খড়ের গাদাটার চারপাশ দিয়ে বেড়াজালের মতো আগুনের শিখা উঠে আসছে৷ ভালো করে ব্যাপারটা বুঝবার আগেই আগুনের শিখা দাপিয়ে উঠল আকাশে৷ চারদিকে রক্তাভ লেলিহান ভয়ংকর আগুন৷ গেরস্তবাড়ি থেকে বিকট চ্যাঁচামেচি আসছিল৷ লোকজন দৌড়ে আসছে৷

গোবিন্দ কী করবে বুঝতে পারছিল না৷ চারদিক দিয়ে আগুন যেভাবে ঘিরে ধরেছে তাতে পালানোর কোনো স্বাভাবিক পথ নেই৷ কিন্তু আর কয়েক সেকেন্ড থাকলেও আগুনে বেগুন-পোড়া হতে হবে৷

গোবিন্দ উঠল৷ পায়ের নীচে নরম খড়৷ তার জন্য শরীরের ভারসাম্য রাখাই দায়৷ লাফ দেওয়ার জন্য পায়ের নীচে শক্ত মাটি দরকার৷

গোবিন্দ কিছু না ভেবেই মাথার ওপর থেকে টেনে এক পাঁজা খড় সরিয়ে ফেলল৷ মাঝখানে শক্ত খুঁটিটা দেখতে পেয়ে কাঠবেড়ালির মতো সেটা বেয়ে উঠে এল একদম ওপরে৷ খুঁটিটার মাথায় দাঁড়ানোর জায়গা নেই৷ কোনোক্রমে পায়ের পাতা রাখা যায় মাত্র৷ কিন্তু সার্কাসের খেলোয়াড়ের কাছে তাই যথেষ্ট৷

গোবিন্দ প্রায় ত্রিশ ফুট উঁচু খুঁটির মাথায় দাঁড়িয়ে ইষ্টদেবকে স্মরণ করে জীবনের সবচেয়ে বড়ো লাফটা মারল৷

১৫

লাফের চোটে গোবিন্দ তিরিশ ফুট খুঁটির ওপরে আরও চার ফুট উঁচুতে উঠে গেল৷ ধনুকের মতো বাঁকা পথে আগুনের বেড়াজাল টপকে গিয়ে পড়ল আরও অন্তত ষোলো-সতেরো ফুট দূরে৷ অন্য কেউ হলে এই বিশাল লাফের পর মাটিতে আছড়ে পড়ে হাড়গোড় ভেঙে দ হয়ে থাকত৷ কিন্তু গোবিন্দ পড়ল বেড়ালের মতো প্রায় নিঃশব্দে, এবং বিনা দুর্ঘটনায়৷

পড়ে সে আগুনের দিকে চেয়ে দেখছিল৷ এত বড়ো আগুন সে বহুকাল দেখেনি৷ গেরস্তর খড়ের গাদাগুলো সবই বিশাল৷ আগুনটাও তেমনি বিকট হয়ে আকাশ ছুঁয়ে চলেছে৷ তার চেয়েও বড়ো কথা, একটু দূরে দূরে আরও দুটো খড়ের গাদা আছে৷ আগুনটা যেরকম ফুলকি ছড়াচ্ছে, আর শিখা যেমন উত্তুরে বাতাসে দক্ষিণমুখো বেঁকে যাচ্ছে, তাতে আর দুটো গাদা আর গেরস্তর বাড়িতেও আগুন ধরল বলে৷

গেরস্ত তার বাড়ির মেয়ে-পুরুষ মিলে পরিত্রাহি চ্যাঁচাচ্ছে 'গেল, গেল সব গেল! জল দে, জল দে শিগগির৷'

কিন্তু এই শীতে টানের সময় খালবিল শুকিয়ে দড়ি৷ কুয়োর জল পাতালে৷ এই বিশাল আগুন নেভানো সহজ কর্ম নয়৷ মুনিষরা লাঠি দিয়ে খড়ের গাদায় পেটাপেটি করছিল বটে, কিন্তু আগুনের তাতে ঝলসে সবাই হটে এল৷

অত আগুনের আলোয় চোখ ঝলসে গেছে বলে গোবিন্দর হনুমান লাফটা কেউ লক্ষ করেনি৷ গেরস্ত বুক চাপড়ে চিৎকার করে বলছিল, 'বোবা-কালা অবোধ লোকটা সেদ্ধ হয়ে গেল রে৷ আহা বেচারি চ্যাঁচানোরও সময় পায়নি৷'

গোবিন্দ পড়েছিল বেগুন-খেতের মধ্যে৷ সামনে ডালপালার বেশ উঁচু বেড়া৷ সুতরাং তাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না৷ এই সময়ে হঠাৎ গোবিন্দর মাথায় একটা বুদ্ধি এল৷ খড়ের গাদায় আগুন লেগে সে মরেছে, একথাটা প্রচার হয়ে গেলে কেমন হয়? যারা তাকে মারতে চেয়েছিল তারা অন্তত কিছুদিন নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে৷

গাঁ-সুদ্ধ লোক আগুন দেখতে ধেয়ে আসছে৷ গোবিন্দর উচিত ছিল এই অবস্থায় গেরস্তকে কিছু সাহায্য করা৷ কিন্তু সে দেখল, এই আগুনকে কবজায় আনা তার অসাধ্য৷ গেরস্তর কপাল ভালো থাকলে বাঁচবে৷

এই ভেবে গোবিন্দ হামাগুড়ি দিয়ে বেগুন-খেতের পিছনে বাঁশের বেড়া ডিঙিয়ে বাঁশবনে পড়ল৷ জিনিসপত্র কিছু পড়ে রইল বটে গেরস্তর বাড়িতে, কিন্তু সে তেমন কিছু নয়৷

ঘুরপথে হেঁটে সে শহরের রাস্তায় উঠে পড়ল৷ খুবই অন্ধকার আর ঠান্ডা রাত৷ চারদিকে হিম কুয়াশা৷ গোবিন্দ তার গায়ের কাঁথাটা পর্যন্ত আনেনি৷ শীতে একেবারে জমে যাচ্ছে৷ এই ঠান্ডা থেকে বাঁচবার একমাত্র উপায় খুব জোরে জোরে হাঁটা৷ গোবিন্দ হাঁটতে লাগল৷

এতকাল ফাঁসির দড়ির ভয় ছিল৷ পুলিশের ভয় ছিল৷ এবার তার সঙ্গে এ আর এক অচেনা বিপদ এসে জুটল৷ সাতনা৷ কিন্তু আগুন যে সাতনাই দিয়েছে, তার কোনো মানে নেই৷

তবে কে? গোবিন্দকে মেরে তার কী লাভ?

ভাবতে ভাবতে কূলকিনারা পায় না গোবিন্দ৷ সে বুদ্ধিমান বটে কিন্তু আজকের আচমকা সব ঘটনায় বুদ্ধি গুলিয়ে যাচ্ছে৷ ঠান্ডা মাথায় সবটা বিশ্লেষণ করতে পারছে না৷

গাঁয়ের সীমানা ডিঙিয়ে যখন খোলা মাঠে পা দেবে গোবিন্দ, তখন হঠাৎ পিছনে শুনল কে যেন দৌড়ে আসছে৷ তবে এক জোড়া পায়ের আওয়াজ৷

গোবিন্দ একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে গেল৷ লোকটা শত্রু হলেও যদি একা হয় তবে গোবিন্দর ভয় নেই৷ যে-কোনো একজন লোকের সঙ্গে সে অনায়াসে পাল্লা টানতে পারবে৷

কে যেন ঘুটঘুট্টি অন্ধকারে ডাকল, 'রাখালদা! ও রাখালদা!'

গেরস্তর মেজো ছেলে৷ গোবিন্দ চাপা স্বরে বলল, 'এখানে!'

কাছে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে সে জিজ্ঞেস করল, 'পালাচ্ছ কেন?'

'না পালিয়ে উপায় নেই৷ তোমাদের বাড়িতে কি আগুনটা ছড়িয়েছে৷'

'না৷ গাঁয়ের লোকেরা বড়ো বড়ো বাঁশ দিয়ে গাদার আগুন প্রায় ঠান্ডা করে এনেছে৷ খড়ের আগুন বেশিক্ষণ তো থাকে না৷ আমি তোমাকেই খুঁজছিলাম যে৷ মনে হচ্ছিল, তুমি অত সহজে মরবার পাত্র নও৷ ঠিক বেঁচে যাবে৷ তোমাকে লাফ দিয়ে বেগুন-খেতে পড়তেও দেখেছি৷'

'আর কেউ দেখেনি তো?'

'আমাদের বাড়ির কেউই দেখেনি৷ তবে তুমি পালানোর পর লম্বা আর জোয়ান একটা লোক বেগুন-খেতে গিয়ে টর্চ জ্বেলে কী যেন দেখছিল৷ সে এই গাঁয়ের লোক নয়৷'

গোবিন্দ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ সাতনা৷

ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, 'লোকটা কে রাখালদা?'

'একটা দুঃখী লোক৷ দুঃখ অনেক সময় মানুষের ভালো করে৷ কখনো কখনো খারাপও করে৷ এ-লোকটার খারাপ করেছে৷'

'তার মানে?'

'গল্পটা বলার তো সময় নেই৷ লোকটা কী করল বলো৷'

'কিছু করল না৷ খানিকক্ষণ চারদিক দেখে খুব গম্ভীর মুখে একদিকে চলে গেল৷'

'সঙ্গে কাউকে দেখলে?'

'কাউকে না৷'

'তাহলে ওই লোকটাও জানে যে, আমি মরিনি!'

'তা জানতে পারে৷ কিন্তু আগুনটা দিল কে বলো তো৷ বাবার ধারণা তুমি বিড়ি খেতে গিয়ে নিজের বিপদ নিজে ডেকে এনেছ৷ সত্যি নাকি?'

ম্লান হেসে গোবিন্দ বলে, 'খেলোয়াড়দের বিড়ি সিগারেট খাওয়া বারণ জানো না?'

ছেলেটা অবাক হয়ে বলে, 'তুমি খেলোয়াড় নাকি? কীসের৷'

'সার্কাসের৷ কিন্তু সে-গল্পও আর একদিন শুনো৷'

'বাঃ রে, এসব কথা আমাকে বলনি কেন?'

'তুমি ছেলেমানুষ৷ তোমাকে বিপদে ফেলতে চাইনি৷'

'কীসের বিপদ?'

'এখন বলার সময় নেই৷'

গেরস্তর মেজো ছেলে অভিমানভরে বলল, 'কিছুই তো আমাকে বলছ না৷ কিন্তু আমি যে তোমাকে খুব ভালোবাসতাম৷'

গোবিন্দ একটু ভাবল৷ তারপর বলল, 'বেশ কিছুদিন আগে কাশিমের চরে একটা লোক খুন হয়েছিল৷ তার নাম হরিহর পাড়ুই৷ জানো?'

'জানি৷ সার্কাসের খেলোয়াড় মাস্টার গোবিন্দর তো সেই জন্যই ফাঁসি হয়৷'

'হয়নি৷ কারণ আমিই সেই গোবিন্দ মাস্টার৷'

'তুমি?' বলে ভূত দেখার মতো আঁতকে ওঠে ছেলেটা৷

গোবিন্দ তার কাঁধে হাত রেখে বলে, 'খুনটা যে আমি করিনি সেটা অনেকেই বিশ্বাস করে না৷ তবে হরিহরের সঙ্গে সেই রাতে কাশিমের চরে আমি গিয়েছিলাম বটে৷'

'তবে কে খুনটা করল?'

'তা জানি না৷ কিন্তু জানতেই হবে৷ যেমন করেই হোক খুনিকে ধরতে না পারলে পুলিশ শেষ পর্যন্ত আমাকে ধরবেই৷'

'তাহলে তুমি পালাও৷'

'তাই পালাচ্ছি৷'

১৬

উদ্ধববাবু ঠিক করলেন আজকের রাতটা জেগে পাহারা দেবেন৷ বাড়ির লোকেরা খুব একটা রাত জাগাতে আগ্রহী নয়৷ চাকরবাকরেরা দায়ে পড়ে জাগবে বটে, কিন্তু তাদের বিশ্বাস নেই! উদ্ধববাবু একাই জাগবেন বলে ঠিক ছিল৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর দু-জন সঙ্গী জুটে গেল৷ একজন তাঁর ছোটো ছেলে রামু৷ বাচ্চাদের রাত জাগা উদ্ধববাবু পছন্দ করেন না বটে, কিন্তু রামুটা বেশ ডাকাবুকো আছে, গুলতির হাতটাও বেশ পাকা৷ লেখাপড়ায় বুদ্ধি না খুললেও অন্যান্য ব্যাপারে যে রামুর বুদ্ধি খুব চটজলদি খেলে তা উদ্ধববাবু জানেন৷ কাজেই রামু যখন বাবার সঙ্গে পাহারা দেওয়ার প্রস্তাব করল তখন তিনি খুব একটা আপত্তি করলেন না৷ কটমট করে ছেলের দিকে তাকিয়ে হুংকার দিয়ে বললেন, 'ফুলহাতা সোয়েটার পরে, মাথায় কানে বেশ করে কমফর্টার জড়িয়ে নেবে৷ পায়ে জুতো মোজা থাকে যেন৷' দ্বিতীয় সঙ্গী জুটল নব্বই বছরের জাফর মিয়া৷ বয়স নব্বই হলেও জাফর মিয়ার শরীরটি মেদহীন, দীর্ঘ এবং খুবই কর্মক্ষম৷ তিনি সামান্য দুধ আর ফল ছাড়া অন্য কোনো খাবার খান না৷ দিনে পাঁচ বার নমাজ পড়েন৷ তাঁর মাথাটি ঠান্ডা, মেজাজটি ঠান্ডা, মুখে সর্বদা হাসি৷ তবে জাফর মিয়া কানে কম শোনেন৷ উদ্ধববাবুকে সেই ছোটো অবস্থা থেকে দেখে আসছেন৷ সেই উদ্ধববাবুর বাড়ি ডাকাত পড়বে শুনে তিনি নিজেই যেচে একটা লাঠি হাতে চলে এলেন৷ গলা কান মাথা ঢাকা বাঁদুরে টুপি, মোটা কম্বল আর নাগরা জুতোয় তাঁকে বেশ জম্পেশ দেখাচ্ছিল৷

উদ্ধববাবু নিজেও সঙ্গে একটা অস্ত্র রাখলেন৷ বহুকাল আগে তাঁর এক রাজপুত মক্কেল মামলায় জিতে একটা তরোয়াল উপহার দিয়েছিল৷ বংশের স্মৃতিচিহ্ন৷ তরোয়ালটা বেশ লম্বা আর ভারী৷ রাজপুত বলেছিল, 'এই তরোয়াল যদি খাপ থেকে কখনো বের করেন তবে রক্ত না খাইয়ে খাপে ভরবেন না৷ আজ পর্যন্ত এই তরোয়াল রক্ত না খেয়ে খাপে ঢোকেনি কখনো৷ এমনি রক্ত না জোটে তো কুকুর-বেড়াল পোকামাকড় যা হোক একটা মেরে নিয়মটা রাখবেন৷'

উদ্ধববাবু রক্ত খাওয়ানোর কথা শুনে তরোয়ালটা কখনো খাপ থেকে বের করেননি৷ আজ করলেন৷ দেখে অবাক হলেন, দশ বছর খাপের মধ্যে একটানা বন্ধ থেকেও তরোয়ালটার গায়ে একটু মরচে পড়েনি৷ এখনও ঝকঝক করছে৷ আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার, অস্ত্রটা হাতে নিলেই শরীরের রক্ত কেমন একটু চনমন করে ওঠে! ঘোড়ার পিঠে চেপে এক্ষুনি যুদ্ধযাত্রায় বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে৷

কিন্তু উদ্ধববাবুর ঘোড়া নেই৷ ধারেকাছে কোথাও কোনো যুদ্ধও হচ্ছে না৷ তাই তিনি শূন্যে কয়েকবার তরোয়ালটাকে ঘুরপাক খাইয়ে নিলেন৷ মনে দুর্জয় সাহস এল৷

রাত এগারোটার পর তিন জন বাইরের বারান্দায় শতরঞ্চি পেতে বসলেন৷ ফ্লাস্কে চা, টিফিন ক্যারিয়ারে লুচি আর আলুর দম৷ তিনটে নতুন ব্যাটারি ভরা টর্চ৷

জাফর মিয়া বললেন, 'পুলিশে একটা খবর দিয়ে রাখলে পারতে হে উদ্ধব৷ বদমাশগুলো যদি দল বেঁধে আসে তাহলে আমরা তিন জন কী করব?'

উদ্ধববাবু বলেন, 'সেটা একবার ভেবেছিলাম৷ তবে একটা পাখির জন্য পুলিশ পাহারা বসালে লোকে আমাকে পাগল ভাববে৷ তাই অতটা আর করিনি! এমনিতেই আজ আদালতে আমার সম্পর্কে একটু সন্দেহ প্রকাশ করেছেন হাকিম৷'

ভালোমানুষ জাফর মিয়া কী বুঝলেন কে জানে৷ শুধু বললেন, 'তা ভালো৷ তা ভালো৷'

রাত বারোটার মধ্যেই জাফর মিয়া ঢুলতে লাগলেন৷ রামু প্রথম দিকটায় তেজে পাহারা দিচ্ছিল৷ কিন্তু বাচ্চা ছেলে, হঠাৎ কোন সময়ে শতরঞ্চিতে কোণ ঘেঁষে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল৷ উদ্ধববাবু একা৷

তবে একা হলেও ভয়ের লেশমাত্র তিনি টের পাচ্ছেন না৷ হাতের তরোয়ালটা ঝকঝক করছে৷ শরীরের রক্ত এতই গরম হয়ে উঠেছে যে এই শীতেও তাঁর ঘাম হতে লাগল৷ তিনি প্রথমে আলোয়ানটা খুললেন, তারপর সোয়েটার ছেড়ে ফেললেন৷ তাতেও গরম বোধ করায় গায়ের জামাটা খুলে সেটা ঘুরিয়ে হাওয়া খেতে লাগলেন৷ গায়ের গেঞ্জিটাও ভিজে গেছে ঘামে৷ সেটাও খুলবেন কি না ভাবছেন, এমন সময় থানার ঘড়িতে একটা বাজবার ঢং শব্দ হল৷ উদ্ধববাবু তরোয়াল হাতে পায়চারি করতে করতে দরবারি কানাড়া রাগের একটি মুড তৈরি করতে লাগলেন৷ ভারি গভীর এবং গম্ভীর রাগ৷ তাঁর গলায় রাগটা খোলেও ভালো৷ গাইতে গাইতে বেশ আত্মহারা হয়ে গেলেন তিনি! পাখির কথা মনে রইল না, পাহারার কথা মনে রইল না৷ সুরের ওঠা-পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতের তরোয়ালটাও উঠছিল নামছিল৷ পা পড়ছিল তালে তালে৷ চোখ বোজা৷ উদ্ধববাবু স্পষ্টই টের পাচ্ছিলেন, আজ তাঁর গলায় অন্য কেউ ভর করেছে৷ এ যেন তাঁর সেই পুরোনো গলাই নয়৷ সুরের এক মায়ারাজ্য থেকে রাগরাগিণীর বাতাস ভেসে আসছে৷ চারদিকে এক সুরের সম্মোহন ছড়িয়ে যাচ্ছে৷

অনেকক্ষণ বাদে যখন চোখ মেললেন তখনও তিনি ঠিক বাস্তব জগতে নেই৷ নিজের সুরের রেশ তাঁকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে৷ বেশ অনেকটা সময় গেল ধাতস্থ হতে৷ তখন অবাক হয়ে দেখেন, রামু উঠে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে৷ জাফর মিয়া ঘন ঘন চোখের জল মুছছেন৷ বারান্দায়, সামনের বাগানে, ডাইনে বাঁয়ে বিস্তর পাড়া-প্রতিবেশী জড়ো হয়েছে৷ প্রত্যেকেই হাঁ করে দেখছে তাঁকে৷

উদ্ধববাবু একটু লজ্জা পেলেন৷ গান তিনি ভালোই গেয়ে থাকেন বটে, কিন্তু এত রাতে লোক জড়ো হওয়ার মতো ততটা কি? যাই হোক, তিনি হাতজোড় করে শ্রোতাদের নমস্কার জানালেন৷

ঠিক এই সময়ে বেরসিক গবা পাগলা বলে উঠল, 'আপনি তো গানের ঠেলায় পাড়া জাগালেন৷ ওদিকে যে হয়ে গেছে৷'

উদ্ধববাবু মিটিমিটি হেসে মিষ্টি করে জিজ্ঞেস করেন, 'কী হল রে আবার?'

'আবার কী? যেনাদের আসবার কথা ছিল তেনারা এসে কাজ হাসিল করে হাওয়া৷'

উদ্ধববাবুর মাথাটা আজ বড়ো ভালো৷ এই শীতের রাতে গান গেয়ে তিনি সকলের ঘুম ভাঙিয়েছেন৷ তাঁর সুরের চুম্বকে সকলে ছুটে এসেছে৷ এই সাফল্যের পর তাঁর এলেবেলে কথা ভালো লাগছে না৷ তবু গলাটা মিষ্টি রেখেই বললেন, 'আরও লোক এসেছিল বুঝি? তা বসতে দিলি না কেন?'

'তারা বসবার জন্য এলে তো বসতে বলব! তারা কাজ গুছোতে এসেছিল, কাজ গুছিয়ে সরে পড়েছে৷'

'তাই নাকি?' উদ্ধববাবু তবু গা করেন না৷

গবা পাগলা বলল, 'আমিও গোয়ালঘরের চালে বসে পাহারা দিচ্ছিলাম৷ হঠাৎ দেখি আপনি তরোয়াল ঘুরিয়ে গান ধরেছেন৷ তরোয়ালের ডগাটা একবার রামুর পেটের ধার ঘেঁষে গেল, আবার জাফরচাচার নাকের ডগা ছুঁয়ে এল৷ মারাত্মক কাণ্ড৷ ভাবছি নেমে এসে আপনাকে জাপটে ধরি৷ ঠিক এই সময় তেনারা এলেন৷ পাঁচ-সাতজন তাগড়া জোয়ান৷ আপনি চোখ বুজে গানে মত্ত৷ তারা আপনার চোখের সুমুখ দিয়ে, বগলতলা দিয়ে দরজা খুলে ফেলল যন্ত্র দিয়ে তারপর চোখের পলকে পাখির দাঁড়টা নিয়ে আপনার সুমুখ দিয়েই বেরিয়ে গেল৷ গান যে কী সব্বোনেশে তা আজ বুঝলাম৷'

উদ্ধববাবু এখনও সংগীতের সুরলোক থেকে নেমে আসতে পারেননি৷ চোখে এখনও ঘোর৷ মিষ্টি করে বললেন, 'পাখি নিয়ে গেছে? যাক৷ পাখি যাক, সুর তো ধরা দিয়েছে৷ তুই বরং রাঘব ঘোষকে গিয়ে ডেকে নিয়ে আয়৷'

লোকজনের ভিড় ঠেলে হঠাৎ দারোগা কুন্দকুসুম বারান্দায় উঠে এলেন৷ মুখ গম্ভীর৷ বললেন, 'উদ্ধববাবু, আপনার মতো বিশিষ্ট লোককে হ্যারাস করতে চাই না৷ কিন্তু আপনার পাড়াপ্রতিবেশীদের কয়েকজন গিয়ে আমার কাছে অভিযোগ করেছেন যে আপনি গভীর রাতে বিকট চিৎকার করে তাঁদের বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটিয়েছেন৷ ইন ফ্যাক্ট, আমিও থানা থেকে একটা চ্যাঁচানি শুনতে পেয়েছি৷ প্রতিবেশীরা আপনাকে থামানোর জন্য এসে জড়ো হয়েছিল৷ কিন্তু আপনি একটি বিপজ্জনক অস্ত্র ঘোরাচ্ছেন দেখে তাঁরা কেউ কাছে আসতে ভরসা পাননি৷ তাঁদের ধারণা, আপনি পাগল হয়ে গেছেন৷ আপনার বিরুদ্ধে বিপজ্জনক অস্ত্র রাখা ও ব্যবহার এবং লোকের বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটানোর দু-দফা অভিযোগ৷ আমি আপনাকে গ্রেফতারও করতে পারি৷ কিন্তু অতটা না করে আজ কেবল একটা ওয়ার্নিং দিয়ে যাচ্ছি৷ ভবিষ্যতে আর এরকম করবেন না৷'

কুন্দকুসুম চলে যাওয়ার পর উদ্ধববাবু সুরলোক থেকে দড়াম করে বাস্তব জগতে নেমে এলেন৷ কিছুক্ষণ হাঁ করে চেয়ে থেকে তিনি হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন, 'পাখিটা তবে নিয়ে গেছে?'

গবা বলল, 'তবে আর বলছি কী?'

উদ্ধববাবু খিঁচিয়ে উঠলেন, 'তোর চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে গেল, তুই কিছু করলি না?'

গবাও সমান তেজে বলে, 'সে তো আপনারও চোখের সামনেই নিয়ে গেছে৷ আমাকে দোষ দিচ্ছেন শুধু শুধু৷ আমি একা অতজনের সঙ্গে পারব কেন?'

'চ্যাঁচাতে তো পারতিস!'

গবা হেসে বলে, 'আজ্ঞে, আপনার গানের চোটে আর সব শব্দ তো লোপাট হয়ে গিয়েছিল, আমার চ্যাঁচানি শুনবে কে? তবু চেঁচিয়ে ছিলাম৷ কিন্তু আপনার গলার দাপটে আমার চ্যাঁচানি ঢাকা পড়ে গেল৷'

জাফর মিয়া হঠাৎ একগাল হেসে বললেন, 'উদ্ধব আমি বেশ শুনতে পাচ্ছি৷ বুঝলে! হঠাৎ কানের ভিতরকার ঝিঁঝিঁ ভাবটা কেটে গেছে৷'

উদ্ধববাবু কটমট করে তাকিয়ে বললেন, 'তাই নাকি?'

'ঃও, তোমার গান যে কী উপকারী তা আর বলার নয়৷ প্রথমটায় একটু আঁতকে উঠেছিলাম বটে৷ কিন্তু তার পর থেকেই কান ভেসে যাচ্ছে হাজাররকম শব্দে৷'

'হুঁ' বলে উদ্ধববাবু তরোয়াল-হাতে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা দিলেন৷ রক্ত না-খাইয়ে তরোয়াল খাপে ভরা বারণ৷ উদ্ধববাবু তরোয়ালটার দিকে চেয়ে বললেন, 'খাওয়াচ্ছি রক্ত৷ নে খা৷' বলে তরোয়ালটা দিয়ে নিজের কন্ঠনালি চেপে ধরলেন৷

১৭

ভোর রাত্রে সামন্তমশাইয়ের তাঁবুতে একটা লোক ঢুকল৷ চাপা গলায় ডাকল, 'সামন্তমশাই!'

সামন্তর ঘুম পাতলা৷ এক ডাকেই জেগে লম্ফটা উসকে দিয়ে বলে, 'কে?'

'আমি গোবিন্দ৷ শুনলাম সার্কাস এখান থেকে চলে যাচ্ছে৷'

সামন্ত একটা শ্বাস ফেলে বলে, 'রাত ভোর হলেই গোছগাছ শুরু হবে৷ বেলাবেলিই রওনা হওয়ার কথা৷'

'আমি কি পড়ে থাকব এখানে? আমাকেও সঙ্গে নিন৷'

সামন্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, 'তোকে না নেওয়া কি আমার ইচ্ছে? কিন্তু পুলিশ কড়া নজর রাখছে৷ যেখানে যাব সেখানেও রাখবে৷ লুকিয়ে থাকতে তো পারবি না৷'

'তাহলে?'

'তাহলে যে কী তা আমার মাথায় খেলছে না৷ রোজই তোর কথা ভাবি৷ কিন্তু কোনো ফন্দিফিকির খুঁজে পাচ্ছি না৷'

'সার্কাস ছাড়া যে আমি বাঁচব না৷' বলে গোবিন্দ সামন্তর বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে৷ তার চোখে জল৷

সামন্ত তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, 'কী যে গেরোয় পড়েছিস বাবা৷ ভগবান তোকে কেন এমন বিপদে ফেলল তাও বুঝি না৷ ভালো লোকেরাই দেখছি এই দুনিয়ায় সবচেয়ে হতভাগ্য৷'

গোবিন্দ মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে একটু কাঁদল৷ তারপর মুখ তুলে বলল, 'আপনি আমার বাবার মতো৷ আপনাকে তাই বলতে বাধা নেই৷ আমি ভালো লোক নই সামন্তমশাই৷'

সামন্ত চোখ বড়ো বড়ো করে বলে, 'তোকে আমি এইটুকু বয়েস থেকে জানি৷ বলতে কী আমার কাছেই প্রতিপালিত হয়েছিস৷ কোনোদিন চুরি-টুরি করিসনি, মিথ্যে কথা বলিসনি, লোকে বিপদে পড়লে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাহায্য করেছিস, তবু তুই ভালো লোক নোস, এ আবার কেমন কথা?'

গোবিন্দ চোখের জল মুছে বলে, 'সে-সব আপনিই শিখিয়েছেন৷ ভালো লোকের কাছে থাকলে লোকে সৎ শিক্ষাই পায়৷ কিন্তু কয়লা ধুলে কি ময়লা যায়? আমার ভিতরে যে গরল ছিল৷'

'সে আবার কী কথা?'

গোবিন্দ ধীর গম্ভীর গলায় বলে, 'হরিহরকে আমি খুন করিনি বটে, কিন্তু আমার মনে পাপ ছিল৷ গুপ্তধনটা খুঁজে পেলে আমার ইচ্ছে ছিল, হরিহরকে খুন করে সবটুকু আমি হাতিয়ে নেব৷ তারপর সেই টাকায় নিজের একটা সার্কাসের দল খুলব৷'

'বটে৷' সামন্ত একটু বিষণ্ণমুখে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল৷ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'আমি তো তোকে অনেকবার বলেছি, আমি মরলে এই সার্কাস তোরই হবে৷ আমি জানি, তোর মাথায় ব্যাবসা করে টাকা রোজগারের মতলব নেই৷ সার্কাস একটা আনন্দের জিনিস৷ লোকের কাছ থেকে পয়সা আমরা নিই বটে, কিন্তু সেটাই কথা নয়৷ বড়ো কথা হল, ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সাহস আর আনন্দ জাগিয়ে তোলা আর নিজেদেরও তা থেকে আনন্দ পাওয়া৷ লোভ থাকলে ভালো খেলোয়াড় হওয়া যায় না, ভালো মানুষও হওয়া যায় না৷ তোর হঠাৎ লোভ এল কোথা থেকে?'

'লোভটা বাইরে থেকে আসে না, সামন্তমশাই৷ লোভ মানুষের ভিতরেই থাকে৷' গোবিন্দের চোখে আবার জল৷ চোখ মুছে সে বলল, 'হরিহরকে খুন করার কথা ভেবেছিলাম দুটো কারণে৷ একে তো হরিহরের মতো বদমাশ দুটো নেই৷ আর একটা কারণ হল, আমি ওকে খুন না করলে ও-ই আমাকে খুন করত৷'

সামন্ত চোখ ছোটো করে খুব একদৃষ্টে গোবিন্দর দিকে চেয়ে ছিল৷ বলল, 'তোর সঙ্গে হরিহরের চেনা-পরিচয় হল কী করে?'

'হরিহরকে সবাই চিনত৷ আমরা যখন কাশিমের চরের কাছে খেলা দেখাচ্ছিলাম তখন একদিন হরিহর আমার কাছে লুকিয়ে আসে৷ আমাকে বলল, সে এক জায়গায় গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছে৷ আমি যদি সেই গুপ্তধন উদ্ধারে তাকে সাহায্য করি তাহলে সে আমাকে অর্ধেক বখরা দেবে৷ গুপ্তধনের কথা শুনেই প্রথম আমার ভিতরে লোভ জেগে উঠল৷'

'সন্ধান পেয়েছিলি?'

'না৷ গুপ্তধনটা ছিল এক বুড়ির৷ সে সম্পর্কে হরিহরের পিসি হয়৷ সেই বুড়ির তিন কুলে কেউ নেই৷ এমনকী সেই গুপ্তধনও নাকি বুড়ি চোখে দেখেনি৷ তবে সন্ধানটা সে-ই জানত৷ বুড়ি একটা কাকাতুয়া পুষত, আর সেটাকে নিজের ছেলের মতো ভালোবাসত৷ গোপনে নাকি বুড়ি কাকাতুয়াটাকে সেই গুপ্তধনের সন্ধান শিখিয়ে দিয়েছিল৷ কিন্তু আর কাউকে বলত না৷ হরিহর বুড়ির গুপ্তধনের সন্ধান জানার জন্য বিশু নামে নিজের এক সাকরেদকে পিসির বাড়িতে চাকরের কাজ দিয়ে রেখেছিল৷ কিন্তু বিশু কোনো সন্ধান বের করতে পারেনি৷ তবে একদিন বিশু কাকাতুয়াটাকে চুরি করে পালিয়ে যায়৷ খবর পেয়ে হরিহর বিশুর পিছু ধাওয়া করে এক মাঠের মধ্যে তাকে খুন করে৷ কিন্তু বিশু খুন হওয়ার আগে পাখিটার পায়ের শিকলি খুলে উড়িয়ে দেয়৷ ওদিকে হরিহরের পিসি কাকাতুয়ার শোকে মারা যায়৷ তবে মরার আগে সে যখন ভুল বকছিল তখন হরিহর সেইসব কথা থেকে গুপ্তধনের জায়গাটা আঁচ করেছিল৷ কিন্তু তা উদ্ধার করা বড়ো সহজ কাজ ছিল না৷ তাই আমার কাছে এসেছিল হরিহর৷'

'তারপর কী হল?'

'সে অনেক ঘটনা৷ কাশিমের চরে একটা মস্ত পুরোনো বাড়ি আছে৷ সেই বাড়ির অনেকগুলো গম্বুজ আছে৷ কোনো গম্বুজেই উঠবার কোনো সিঁড়ি নেই৷ আর এমন সমান করে তৈরি যে কোনো খাঁজ-টাঁজও নেই যা বেয়ে ওঠা যায়৷ হরিহর বলেছিল তার মধ্যে একটা গম্বুজের মাথায় নাকি একটা ঢাকনা আছে৷ ঢাকনার নীচে গভীর এক কুয়োর মুখ৷ গম্বুজের মাথা থেকে সেই কুয়ো নেমে একেবারে মাটির তলায় চলে গেছে৷ আর মাটির তলায় কোনো কুঠুরিতে আছে সেই গুপ্তধন৷ সেই কুঠুরিতে পৌঁছোনো খুব শক্ত কাজ৷ সার্কাসের খেলোয়াড় ছাড়া সে-কাজ করার সাধ্য খুব কম লোকের আছে৷'

'তুই হরিহরের কথায় রাজি হলি?'

'প্রথমে হইনি৷ পরে লোভ হল৷ ভীষণ লোভ৷ মনে হল, রাতারাতি বড়োলোক হওয়ার এমন সুযোগ আর পাব না৷'

'তা বলে খুনের কথা ভাববি?'

'লোভ একটা নেশার মতো সামন্তমশাই, যখন ঘাড়ে চাপে তখন মানুষ আর মানুষ থাকে না৷'

'তারপর কী হল?'

'কথা ছিল, আমি সন্ধে বেলা সেই পোড়ো বাড়িতে হাজির থাকব৷ হরিহর আসবে৷ কিন্তু সে সময়মতো এল না৷ আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম৷ সেই বাড়িতে বহু গম্বুজ৷ কোনটা যে গুপ্তধনের সুড়ঙ্গ তা তো জানি না৷ হরিহর এসে চিনিয়ে দেবে৷ কিন্তু সে আর হল না৷ কাশিমের চরে অন্য একদল বদমাশের হাতে হরিহর খুন হয়ে গেল সেই রাতে৷ আমার চোখের সামনেই ঘটনা৷ দোষের মধ্যে আমি গিয়ে হরিহরের লাশটাকে নাড়াচাড়া করেছিলাম, বেঁচে আছে কি না দেখতে৷ যদি তার কাছ থেকে কোনো কথা আদায় করা যায়৷ ঠিক সেই সময়ে কিছু লোক এসে পড়ল সেখানে৷ ধরা পড়ে গেলাম৷'

'তুই বলেছিলি, জেলখানা থেকে তোকে পালানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে৷ সেটা কেন দেওয়া হল তা জানিস৷'

গোবিন্দ একটু হেসে বলল, 'একটু একটু বুঝতে পারি৷ জেলখানায় পুরোনো এক ডাকাতির দাগি আসামি আছে৷ এখন সে ওয়ার্ডেন৷ কথায় কথায় তাকে একদিন গুপ্তধনের গল্পটা বলেছিলাম৷ মনে হয় লোকটা সেই থেকে লোভের খপ্পরে পড়ে গেছে৷ আমার ফাঁসি হলে তো সে গুপ্তধনের আর সন্ধান পাওয়া যাবে না৷ তাকে আমি জায়গাটার নাম বলতেও রাজি হইনি৷ কাজেই সেপাইদের সঙ্গে বন্দোবস্ত করে সে আমাকে পালানোর পথ করে দিয়েছিল৷ সে তো জানে পালিয়ে গিয়ে আমি সেই গুপ্তধনের সন্ধান করবই৷ গুপ্তধন উদ্ধার করবার সঙ্গেসঙ্গে আমাকে পাকড়াও করা হবে৷ শুনেছি সেই দাগি আসামির দলটা এখনও বেশ দাপটে ডাকাতি করে বেড়ায়, আর সে জেলে থেকেও তাদের সর্দার৷

১৮

গলায় তরোয়ালের ধারালো দিকটা চেপে ধরে উদ্ধববাবু চোখ বুজে দুর্গানাম স্মরণ করে বিড়বিড় করে বললেন, 'দুর্গে দুর্গতিনাশিনী মাগো! সন্তানকে কোলে তুলে নাও মা৷ দেখো, যেন বেশি ব্যথা-ট্যথা না পাই, রক্তপাত যেন বেশি না হয়৷ মরার পর যেন ভূত-টুত হয়ে থাকতে না হয়৷ সব দেখো মা!' বলতে বলতে তরোয়ালটায় একটু চাপ দিয়েছেন৷

আত্মহত্যার বিভিন্ন পন্থা নিয়ে চিন্তা করতে করতেই উদ্ধববাবু শোয়ার ঘরে ঢুকেছিলেন৷ তরোয়ালটা হাতেই ছিল৷ রক্ত না খাইয়ে সেটাকে খাপে ভরা বারণ৷ সুতরাং তিনি চটপট স্থির করে ফেললেন, এক কাজে দুই কাজ সেরে ফেলাই ভালো৷

কে যেন খুব কাছ থেকে বলে উঠল, 'বাবামশাই, লুচি খাব৷'

উদ্ধববাবু চোখ খুললেন৷ অবাক হয়ে দেখলেন, উত্তর দিকের জানলার গরাদ দিয়ে কাকাতুয়াটা সেঁধিয়ে ঘরে ঢুকছে৷ টালুক-টুলুক করে দেখছে তাঁকে৷ চোখে চোখ পড়তেই বলল, 'সব ভালো যার শেষ ভালো৷'

উদ্ধববাবু তরোয়াল রেখে দিয়ে কাকাতুয়াটাকে বুকে তুলে নিয়ে আনন্দে প্রায় কেঁদে ফেললেন৷ ধরা গলায় বললেন, 'তোর জন্যেই এ-যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলাম বাপ, কত লুচি খেতে চাস? তোকে ফাঁসির খাওয়া খাওয়াব৷' বলে ভিতর বাড়ির দিকে মুখ করে হাঁক দিলেন, 'ওরে নয়নকাজল, শিগগির লুচির জন্য ময়দা মাখ৷'

কিন্তু নয়নকাজল তখন ময়দা মাখার মতো অবস্থায় তো আর নেই৷ বাড়ি থেকে মাইলখানেক দূরে একটা জঙ্গলের মধ্যে সে মাটির ওপর চিত হয়ে শুয়ে আছে৷ তার বুকের ওপর দানবের মতো একখানা পা রেখে দাঁড়িয়ে সাতনা৷ গলায় বল্লমটা চেপে ধরে সাতনা বলছে, 'প্রাণে বাঁচতে চাস তো সত্যি কথা বল৷'

ভয়ে নয়নকাজল বাক্যিহারা হয়ে গেছে৷ দোষটা অবশ্য তারই৷ পরশুদিনই একটা লোক তার মামাতো ভাই সেজে এসে তাকে দু-শো টাকা দিয়ে বলে গেছে, 'আমরা ঠিক সময়মতো আসব৷ উদ্ধব বাধা দেবে দিক৷ তুই পাছ-দুয়ার দিয়ে পাখিটা বের করে দিবি৷' নয়নকাজল সে প্রস্তাবে রাজি হয়নি৷ পাখি গুপ্তধনের সন্ধান জানে৷ এমন পাখি হাতছাড়া করার জন্য মাত্র দু-শো টাকায় রফা করে কোন আহাম্মক! সে স্পষ্টাস্পষ্টি বলে দিল, 'ওসব হবে না৷ আমাকে ভাগ দিতে হবে৷ পাখি নিয়ে আমি তোমাদের সঙ্গেই বেরিয়ে পড়ব৷'

সেই কথাই ঠিক ছিল৷ ডাকাতরা বাড়ি ঢুকতেই নয়নকাজলও পাখিটাকে দাঁড় থেকে খুলে র্যাপারে চাপা দিয়ে পাছ-দুয়ার খুলে বেরোয়৷ তারপর সবাই মিলে হাঁটা দিয়েছে জঙ্গলের দিকে৷ কিন্তু কাকাতুয়া খুব ছোটোখাটো পাখি তো নয়! বেশ বড়োসড়ো, আর ওজনও অনেকটা৷ জঙ্গলের কাছ-বরাবর এ-বগল থেকে ও-বগলে নেওয়ার সময় পাখিটা হঠাৎ ঝাপটা মেরে উড়ে গেল৷

নয়নকাজল সাতনার দিকে চেয়ে চিঁচিঁ করে বলল, 'মাকালীর দিব্যি বলছি, হাতটায় ঝিঁঝি ধরেছিল বলে, ইচ্ছে করে ছাড়িনি৷'

দলের ষণ্ডামতো আর একটা লোক সাতনাকে ডেকে বলল, 'এক্ষুনি মারিস না৷ ওটাকে দিয়ে কাজ হবে৷'

সেই লোকটা এসে সাতনাকে সরিয়ে নয়নকাজলকে টেনে দাঁড় করাল৷ তারপর দু-গালে ফটাস ফটাস করে দু-খানা চড় মেরে বলল, 'আবার যা৷ এবার শুধু পাখি নয়, উকিলের ছোটো ছেলেটাকেও চুরি করবি৷ উকিলটা মহা ত্যাঁদড় আছে৷ থানা-পুলিশ করতে পারে৷ ছেলেটা আমাদের হাতে থাকলে তা আর করতে সাহস পাবে না৷' চড় খেয়ে নয়নকাজলের ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত ঝিনঝিন করছিল৷ সে কোনোমতে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল৷ সাতনা তার গলায় বল্লমটা আবার ধরে বলল, 'শোন বাপু, গুপ্তধনের ভাগ চাস সে অনেক বড়ো কথা৷ কিন্তু এখন প্রাণ বাঁচানোর জন্যই ঠিক ঠিক কাজ করিস৷ একটু গুবলেট হলে যমদোরে গিয়েও আমাদের হাত থেকে বাঁচার উপায় নেই৷ মনে থাকবে?'

নয়নকাজল মাথা নাড়ল৷ একটু দম নিয়ে সে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে হাঁটা দিল৷

বাড়ি পৌঁছোতে ফর্সা হয়ে গেল চারদিক৷ উদ্ধববাবুর হুংকারে পাড়া কাঁপছে৷ 'কোথায় গেল সেই পাজি ছুঁচোটা? সেই তখন থেকে কাকাতুয়া লুচি লুচি করে হেদিয়ে মরছে!'

নয়নকাজল হাঁফাতে হাঁফাতে উদ্ধববাবুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল৷ 'আজ্ঞে বাবামশাই, ধরতে ধরতেও ধরতে পারলাম না৷ একটুর জন্য . . .'

উদ্ধববাবু নয়নকাজলের উড়োখুড়ো চেহারা দেখে আঁতকে উঠে বললেন, 'কাকে ধরতে পারলি না?'

'দলে পাঁচ জন ছিল৷ হাতে ইয়া বড়ো দা, বন্দুক, কুড়ুল, বল্লম৷ তা ভাবলাম, যার নুন খাই তার জন্য না হয় প্রাণটা দেব৷ পাখিটা চুরি করে যেই না তারা পালাচ্ছে, আমিও লাঠি নিয়ে পিছু ধরলাম৷ মাইলটাক পর্যন্ত দৌড়ে ধরেও ফেলেছিলাম প্রায়৷ কিন্তু ভয় খেয়ে তারা এমন ছুটতে লাগল যে, একটুর জন্য . . .'

উদ্ধববাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, 'হুম! ঠিক আছে, এখন গিয়ে দু-সের ময়দা মাখ ভালো করে৷ ডাকাতদের ব্যবস্থা আমি করছি৷'

নয়নকাজল উদ্ধববাবুর কাঁধে-বসা পাখিটার দিকে কটমট করে একবার চেয়ে ময়দা মাখতে গেল৷

১৯

গতকাল রাতে কাকাতুয়াকে চুরি করতে ডাকাত এসেছিল কিন্তু চুরি করতে পারেনি৷ সকালে কাকাতুয়াকে লুচি খাইয়ে উদ্ধববাবু থানায় গেলেন৷ এতকাল এ-ব্যাপারে পুলিশকে জড়াননি তিনি৷ কিন্তু রাত্তিরে যা হয়ে গেল তাতে তিনি ভাবনায় পড়েছেন৷ ডাকাতদলকে ঠেকানো তো একার কাজ নয়৷

উদ্ধববাবু উকিল হিসেবে খুবই ডাকসাইটে৷ সবাই তাঁকে খাতিরও করে৷ কুন্দকুসুমও করতেন৷ কিন্তু রাত্রির ঘটনার পর আজ যেন উদ্ধববাবুকে তিনি বিশেষ পাত্তা দিতে চাইছিলেন না৷ ঘটনাটা শুনে বরং হোঃ-হোঃ করে খানিক হেসে বললেন, 'একটা পাখির জন্য সাতটা ডাকাত কাল আপনার বাড়ি চড়াও হয়েছিল, এ-কথা নিতান্ত আহাম্মক ছাড়া কে বিশ্বাস করবে বলুন!'

উদ্ধববাবুও জানেন, পাখির জন্য ডাকাতি হয় এ-কথা কেউ বিশ্বাস করবে না৷ কিন্তু তাঁর পাখিটা যে গুপ্তধনের সন্ধান জানে এ-কথাটাও তিনি ফাঁস করতে চান না৷ গলাখাঁকারি দিয়ে তিনি বললেন, 'পাখিটা আসলে খুব দামি৷ রেয়ার টাইপের জিনিস৷'

কুন্দকুসুম ভ্রূ কুঁচকে উদ্ধববাবুকে একটু দেখে নিয়ে ফিচেল হাসি হেসে বললেন, 'একটা খুব রেয়ার পাখির দামও নিশ্চয়ই এত বেশি হতে পারে না যার জন্য বাড়িতে ডাকাত পড়বে৷ আপনি কি আমাকে ছেলেমানুষ পেলেন উদ্ধববাবু?'

কথাটা যুক্তিযুক্তই৷ কিন্তু কুন্দকুসুম তো আর গোপন কথাটা জানেন না৷ উদ্ধববাবু তাই মাথা চুলকে বললেন, 'সে যাই হোক, আমার বড়ো ভয় করছে৷ আজ রাত থেকে আমার বাড়িতে দু-জন আর্মড গার্ড যদি রাখেন তবে বড়ো ভালো হয়৷'

কুন্দকুসুম মাথা নেড়ে বললেন, 'অসম্ভব৷ আমার হাতে যে ফোর্স আছে তা নিতান্তই সামান্য৷ তার ওপর এই থানার সব জায়গায় রিসেন্টলি ক্রাইম ভীষণ বেড়ে গেছে৷ ইন ফ্যাক্ট একজন ফেরারি খুনি আসামির জন্য আমাকে সদর থেকে এক্সট্রা ফোর্স আনতে হচ্ছে! আপনি যত বড়ো উকিলই হোন উদ্ধববাবু, এই অবস্থায় আপনার পোষা পাখিকে পাহারা দেওয়ার জন্য লোক দিতে পারব না৷ মাপ করবেন!'

উদ্ধববাবু মরিয়া হয়ে বললেন, 'ডাকাত যে পড়েছিল তার কিন্তু সাক্ষী আছে৷ তারা দরকার হলে আদালতে বলবে যে, আপনি আমার বিপদ জেনেও প্রোটেকশন দেননি৷'

'বটে!' বলে কুন্দকুসুম সোজা হয়ে কটমট করে উদ্ধববাবুর দিকে চেয়ে বললেন, 'আপনি আমার বিরুদ্ধে আদালতেও যাবেন বলে ভাবছেন! কারা সাক্ষী আছে বলুন তো! আমি তাদের স্টেটমেন্ট নেব৷'

'গবা আছে, আমার ছোটো ছেলে রামু আছে, জাফরচাচা আছেন৷'

কুন্দকুসুম বাজখাঁই গলায় আবার হাঃ-হাঃ করে হাসলেন৷ তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললেন, 'রামু বা জাফরচাচা সাক্ষ্য দেবে না৷ ওরা কিছু দেখেনি৷ বরং সাক্ষ্য দিলে ওরা উলটো কথাই বলবে৷ ওরা বলবে যে, আপনি বিপজ্জনক এক অস্ত্র দিয়ে বহু লোকের জীবন বিপন্ন করে তুলেছিলেন, বিকট চিৎকার করে লোকের বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটিয়েছেন৷'

'ওরা দেখেনি!' চিন্তিত উদ্ধববাবু গম্ভীর মুখে বললেন, 'কিন্তু গবা তো দেখেছে৷'

'গবাকে সাক্ষী দাঁড় করালে দেশসুদ্ধু লোকের কাছে আপনি হাস্যাস্পদ হবেন৷ কারণ সবাই জানে গবা বদ্ধ উন্মাদ৷ পাগলের সাক্ষ্য টেঁকে না, উকিল হয়ে এটা আপনার জানা উচিত ছিল৷'

উদ্ধববাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠলেন৷

কুন্দকুসুম পিছন থেকে তিক্তমধুর গলায় বললেন, 'সকালে আপনি রটিয়েছিলেন যে, আপনার পাখিটা চুরি গেছে বা ডাকাতি হয়েছে৷ কিন্তু আমি খবর রাখি যে, পাখিটা এখনও আপনার কাছেই আছে৷'

উদ্ধববাবু কী একটা বলতে গেলেন, কিন্তু শেষ অবধি বললেন না৷ বলে লাভও নেই৷ এই মাথামোটা লোকটা তাঁকে বিশ্বাস করবে না৷ আর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি থানা থেকে বেরিয়ে এলেন৷

পাখিটার জন্য আজ রাতে ডাকাতরা আর একবার হানা দিতে পারে৷ সুতরাং সন্ধের আগেই উদ্ধববাবু তৈরি হতে লাগলেন৷ তবে অসুবিধে দেখা দিল লোকজন জোটানোর বেলায়৷ জাফরচাচাকে বলতে গিয়েছিলেন উদ্ধববাবু, 'চাচা আজও আমার সঙ্গে রাতটা গল্পগুজব করে কাটাবেন নাকি?'

জাফর মিয়া আঁতকে উঠে বললেন, 'কানে শোনার ক্ষমতা ফিরে পেয়েছি ভাই, সেটা আবার হারাতে চাই না৷ তা ছাড়া আজ বাতের ব্যথাটাও চাগাড় দিয়েছে৷'

উদ্ধববাবু রামুকে ডাকাডাকি করলেন, কিন্তু তার সাড়া পাওয়া গেল না৷ এমনকী নয়নকাজলকে পর্যন্ত ডেকে গলা ভেঙে ফেললেন৷ 'কোথায় যে সব থাকে!' বিরক্ত হয়ে এই কথা বলে সন্ধে-রাত্রিতেই উদ্ধববাবু বন্দুক কাঁধে নিয়ে বাড়ির চারদিকটা টহল দিলেন৷ টর্চ জ্বেলে বাড়ির সবচেয়ে দুর্বল অংশ কোনটা এবং কোথা দিয়ে ডাকাতরা বাড়িতে ঢুকতে পারে তা ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলেন৷ বাড়িটা তাঁর খুবই মজবুত এবং নিরাপদ৷ কিন্তু তা বলে কি আর রন্ধ্র থাকতে পারে না! লখিন্দরের বাসরঘরেও তো রন্ধ্র ছিল৷

ওদিকে তাঁর স্ত্রী এবং অন্যান্য ছেলে-মেয়েরাও বাড়ির চারদিকে সার্চ করতে লেগে গেছে৷

উদ্ধববাবু খিড়কির দরজাটা পেরেক দিয়ে একেবারে সেঁটে দিলেন, তারপর কয়েকটা পাথরের চাঁই এনে ঠেকা দিলেন তাতে৷ বাড়ির চারদিকে উঁচু পাঁচিলের ওপর উঠে কাঁটাতার বিছিয়ে দিলেন৷ আর সামনের বারান্দায় সরষের তেল ঢাললেন৷ অনেকগুলো কলার খোসা ছড়িয়ে রাখলেন৷ ডাকাতরা হুড়মুড় করে এলে যাতে আছাড় খায়৷ কেলেহাঁড়ি দিয়ে একটা কাকাতুয়াও বানালেন৷ সেটাকে সামনের দরজার পাশে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখলেন৷

সবই হল, কিন্তু নয়নকাজলের পাত্তা নেই৷ সে নাকি বিকেলের দিকে দোকানের সওদা করতে গেছে৷ এখনও ফেরেনি৷ রামু গেছে খেলার মাঠে৷ তারও কোনো পাত্তা নেই৷ উদ্ধববাবু বেশ উদ্বিগ্ন এবং উত্তেজিত৷ কী করবেন ভেবে না পেয়ে তিনি স্টোর রুমে তালা দিয়ে রাখা পাখিটাকে দেখতে গেলেন৷

তালা খুলে তাঁর চোখ কপালে উঠল৷ দাঁড় ফাঁকা৷ পাখির পালকটিরও পাত্তা নেই৷

পাখি-রামু-নয়নকাজল! দুয়ে দুয়ে চার করতে উদ্ধববাবুর দেরি হল না৷ অবশ্য পাখির দাঁড়ে একটা চিরকুটও লটকানো ছিল৷ তাতে লেখা-'পাখিটা বিধিসম্মত মালিকের হস্তগত হইয়াছে৷ ব্যাপারটি লইয়া শোরগোল করিলে আপনার কনিষ্ঠ পুত্রের প্রাণ সংশয় হইবে৷ জনৈক শুভাকাঙ্খী৷'

কিন্তু তবু শোরগোল হল৷ পাড়াপ্রতিবেশীরা খবর পেয়ে ছুটে এল৷ কিন্তু তাতেও দেখা দিল প্রবল গণ্ডগোল৷ বারান্দায় আর উঠোনে ধপাধপ লোকজন আছাড় খাচ্ছে আর 'বাবা রে, মা রে, গেছি রে' বলে চ্যাঁচাচ্ছে৷ খুন্তিবুড়ি চোখে কম দেখেন৷ তিনি সামনের দরজায় কাকাতুয়াটাকে দেখে ভূত ভেবে সেই যে ভিরমি খেলেন আর চোখ খোলার নামটি নেই৷ সামনের বারান্দায় ভিড় হওয়ায় জনাকয় লোক পাঁচিলে উঠেছিল৷ কাঁটাতারে জামা-কাপড় আটকে তাদের বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা৷ রামুর মা আর ঠাকুমা ডুকরে কাঁদতে লেগেছেন, রামুর ভাই-বোনেরা কাঁদছে৷ এই গোলমালে মাথা ঠান্ডা রাখা দায়৷ বারবার সবাইকে চুপ করতে বললেন উদ্ধববাবু৷ কে শোনে কার কথা! অবশেষে এই গোলমালে অসহ্য হয়ে উদ্ধববাবু বন্দুকটা আকাশে তাক করে দুম দুম করে দুটো ফায়ার করলেন৷ তাতে ফল হল উলটো৷ যারা কাঁদছিল তারা আরও জোরে কাঁদতে লাগল৷ পাড়াপড়শির বাচ্চারা ভয় খেয়ে চ্যাঁচাতে লাগল৷ বন্দুকের শব্দে যারা চমকে উঠে পালাবার তাল করেছিল তারা ফের কলার খোসা আর তেল-হড়হড়ে মেঝেয় আছড়ে পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল৷ তবে উপকার হল এক জনের৷ ভিরমি কেটে উঠে পড়লেন খুন্তিবুড়ি৷

কিছুক্ষণ বাদে লোকজন বিদেয় হল, কুন্দকুসুম তদন্তে এলেন৷ চারদিক ঘুরেটুরে দেখে বললেন, 'আপনার বন্দুকের লাইসেন্স আছে তো?'

'আছে৷' উদ্ধববাবু বুক চিতিয়ে বললেন৷

কুন্দকুসুম বুক ফুলিয়ে বললেন, 'থাকলেই কী! যখন-তখন ফায়ার করার আইন কিন্তু নেই৷ যাকগে, আপনার মন আজ অস্থির, বন্দুকের ব্যাপারে তাই কিছু বলছি না৷ আর রামুকে কিডন্যাপ, পাখিটা চুরি এবং নয়নকাজলের উধাও হওয়া-এগুলো আমার নোট করা রইল৷'

কুন্দকুসুম চলে যাওয়ার পর বেশ একটু রাতের দিকে গবা পাগলা এসে ঢুকল৷ তার মুখ থমথমে৷

উদ্ধববাবু বাহ্যজ্ঞান শূন্য হয়ে ভাবছেন৷ হাতে এখনও বন্দুক৷ ডাকাতরা শোরগোল করতে নিষেধ করেছিল, কিন্তু শোরগোল কিছু বেশিই হয়ে গেছে৷ এখন রামুর কী হয় সেইটে নিয়েই তাঁর চিন্তা৷

গবা ডাকল, 'বাবু৷'

'কী বলছিস?'

'একজন কাজের লোক রাখবেন? খুব ভালো লোক৷'

এই দুঃসময়ে পাগলটা চাকর রাখার প্রস্তাব নিয়ে এসেছে দেখে উদ্ধব অবাক হন৷ বলেন, 'কী বলছিস?'

গবা তখন উদ্ধবের কানে কানে চুপিচুপি ক-টা কথা বলল৷

২০

রামু নিরুদ্দেশ, কাকাতুয়া বেহাত, নয়নকাজল হাওয়া৷ বাড়িতে প্রচণ্ড ডামাডোল৷ এরই মধ্যে সকলের চোখের আড়ালে একটা নতুন কাজের লোক বহাল হয়ে গেল৷

উদ্ধববাবুর প্রেশার বেড়ে গেছে, তিনি শয্যা নিয়েছেন৷ ডাক্তার এসে দেখে নড়াচড়া বারণ করে গেছেন৷ কিন্তু উদ্ধববাবু কেবল এপাশ-ওপাশ করেন৷ তাঁর ছোটো ছেলেটা দুষ্টু ছিল বটে, তিনি শাসনও করতেন তাকে, কিন্তু এখন তার জন্য বুক ফেটে যাচ্ছে কষ্টে৷ ছেলেটাকে কি ওরা জ্যান্ত রাখবে?

রাত বেশ গভীর হয়েছে৷ ঘরে মৃদু আলো জ্বলছে৷ উদ্ধববাবু ঘুমোনোর বৃথা চেষ্টা ত্যাগ করে উঠে বসে অন্যমনস্কভাবে চেয়ে রইলেন৷ ঠিক সেই সময়ে ভিতরবাড়ির দিককার দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল৷ উদ্ধববাবু হাঁ করে চেয়ে রইলেন৷

ঘরে ঢুকল নতুন কাজের লোকটা৷

'কী চাও?' উদ্ধববাবু জিজ্ঞেস করলেন৷ 'আজ্ঞে আমি একটা কথা বলতে এসেছিলাম৷'

'এত রাতে কথা কীসের?'

'আজ্ঞে টের পাচ্ছি রামুর চিন্তায় আপনার ঘুম হচ্ছে না৷ শরীরও ভালো যাচ্ছে না আপনার৷ তাই বলতে এসেছিলাম গুপ্তধনের হদিস যতক্ষণ না পাচ্ছে ততক্ষণ ওরা রামুর ক্ষতি করবে না৷ তাতে ওদের লাভ নেই৷'

'কিন্তু হদিস পেতে আর বাকি কী? কাকাতুয়া তো ওদের হাতে৷'

'তা বটে৷ কিন্তু মজা হল, কাকাতুয়াকে ঠিক প্রশ্নটি না করা গেলে সে কিছুতেই হদিস বলবে না৷ এই কাকাতুয়াটাকে নিয়ে আমি বহুকাল ধরে চিন্তা করছি৷ হরিহর পাড়ুই পারেনি, বিশু পারেনি, আপনারাও পারেননি৷ অনেক ভেবে দেখেছি, পাখিটাকে ঠিক প্রশ্নটি যতক্ষণ করা না হচ্ছে, ততক্ষণ তার মুখ থেকে আসল কথাটি বেরোবে না৷'

'প্রশ্নটা তুমি জানো?'

'আন্দাজ করতে পারি৷ কিন্তু যারা পাখিটা চুরি করেছে তাদের মাথা অত সাফ নয়৷ পাখির কাছ থেকে তারা কথা বের করতে পারবে না৷ আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমোন৷ যা করার আমি আর গবাদা মিলে করব৷'

'গবা বলছিল, তুমি নাকি সার্কাসের খেলোয়াড়৷'

'আজ্ঞে হ্যাঁ৷ কিন্তু কথাটা পাঁচকান করবেন না৷'

উদ্ধববাবু চোখ বুজে বলেন, 'সব বড়ো গোলমাল ঠেকছে হে৷ এক সার্কাসের খেলোয়াড় বাড়ির চাকর হয়ে ঢুকল৷ বাড়ির পুরোনো চাকর ডাকাতের দলে গিয়ে ভিড়ল৷ ছেলেটা গুম হয়ে গেল৷ সব বড়ো গোলমাল ঠেকছে৷'

নতুন লোকটা মাথা চুলকে বলল, 'আজ্ঞে তা আর বলতে৷ তবে কিনা আমি লোক খারাপ নই৷'

'তা কে জানে বাপু৷ আমার আর কাউকে বিশ্বাস হয় না৷ তবু তুমি যখন বলছ তখন একটু নির্ভর করেই দেখি৷'

'আমি বলি কী বাবু, আপনি বরং শুয়ে শুয়ে দরবারি কানাড়ার সুরটা গুনগুন করতে থাকুন৷ ঘুমের সবচেয়ে বড়ো ওষুধ হল গান৷'

উদ্ধববাবু কটমট করে লোকটার দিকে চাইলেন৷ ভালো করে দেখে তার মনে হল লোকটা ঠাট্টা করছে না৷ তখন খুশি হয়ে বললেন, 'আমার গানের কথা তোমায় কে বলল?'

'কেউ বলেনি৷ ভালো গাইয়ের গলা কথাবার্তায়ও ফুটে ওঠে৷ কালে খাঁ সাহেব যখন চাকরকে বকতেন বা রান্নার নিন্দে করতেন, তখনও সমঝদার লোক 'কেয়াবাত, কেয়াবাত' করে উঠত৷ তা ছাড়া বড়ো গাইয়ের বাড়ির গোরু-কুকুর কি পোষা পাখির গলায় পর্যন্ত সুর এসে যায়৷ আপনার নেড়ি কুকুরটার গলায় আজ সন্ধে বেলাতেই আমি একটা সাপটা শুনেছি৷'

'বলো কী?' উদ্ধববাবু খুবই অবাক ও উত্তেজিত হল৷

লোকটা বিনয়ে হেসে হাত কচলে বলল, 'সুর এমনই জিনিস যে, চেপে রাখা যায় না৷ যার গলায় সুর আছে, সে শত চেষ্টা করেও কোনোদিন বেসুর বের করতে পারবে না গলা থেকে৷ আপনার যেমন, একটু আগে শুয়ে শুয়ে 'ঃআ ঃউ' করছিলেন, আমি দরজার বাইরে থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম৷ শুনলাম তার মধ্যেও সুর আছে৷'

উদ্ধববাবু এত দুঃখেও হাসলেন৷ মাথা নেড়ে বললেন, 'সমঝদারই নেই হে দেশে, সমঝদার থাকলে কি আজ আমাকে ওকালতি করে খেতে হত? তা তুমি আমার বাড়িতেই থেকে যাও৷ সার্কাসের সমান মাইনে দেব৷ কাজকর্ম কিছুই করতে হবে না৷ শুধু আমার একটু সেবা-টেবা করবে আর কি৷'

'সে হবেখন বাবু৷ এখন আমি বিদেয় হই৷ অনেক কাজ বাকি৷'

উদ্ধববাবু শুয়ে পড়লেন৷ সিলিং-এর দিকে চেয়ে খুব সাবধানে গলা ঝেড়ে নিয়ে আবার উঠে বসলেন৷ বাঁ-হাতে কান চেপে ধরে নিখুঁত দরবারির সুর ধরলেন! তারপর আর বাইরের শোক-দুঃখ তাঁকে স্পর্শ করল না৷

নতুন চাকরটা নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে এল৷ তারপর মৃদু একটা শিস দিল সে৷ অন্ধকারে আর একটা মূর্তি এগিয়ে এল কাছে৷ তার দু-হাতে ধরা দুটো সাইকেল৷ দু-জনে সাইকেলে চেপে এত জোরে ছুটতে লাগল যে, মোটরগাড়িও পাল্লা দিতে পারবে না৷

প্রায় ত্রিশ মাইল রাস্তা একনাগাড়ে সাইকেল চালিয়ে দু-জনে যখন কাশিমের চরের কাছাকাছি পৌঁছোল তখন এই দুর্দান্ত শীতের রাতেও তারা ঘেমে নেয়ে গেছে৷ কিন্তু বিশ্রামের সময় নেই৷ সামনেই একটা জঙ্গল৷ মরা নদীর খাত৷ তারপর আবার জঙ্গল৷

ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্যে সাইকেল লুকিয়ে রেখে দু-জনে এবার পায়ে হেঁটে চলতে লাগল৷ দু-জনের মধ্যেই চমৎকার বোঝাপড়া৷ কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছে না, কিছু জিজ্ঞেস করছে না৷ যেন আগে থেকে প্ল্যান করা আছে এই অভিযান৷

দ্বিতীয় জঙ্গলটায় খানিকদূর ঢুকে দু-জনে থামল৷ জিরোতে নয়৷ অন্ধকার কুয়াশামাখা এই রাতে চারদিকে কিছুই দেখা যায় না৷ দু-জনে তাই পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রাতের শব্দগুলিকে চিনবার চেষ্টা করল৷ কোন শব্দটা প্রাকৃতিক, কোনটা নয়৷ সন্দেহজনক কিছুই অবশ্য শুনতে পেল না তারা৷ তবে এরপর সাবধানে এগোতে লাগল৷

সামনেই একটা দুর্গের মতো মস্ত বাড়ির কালো ভূতুড়ে আকারটা জেগে উঠছিল কুয়াশার মধ্যেও৷ একটা জায়গায় সামনের জন থামল৷ তারপর আস্তে ডাকল, 'গবাদা৷'

'হুঁ৷'

'এই হল সেই জায়গা, যেখানে হরিহর খুন হয়৷ মনে আছে?'

'খুব মনে আছে৷'

'আর সামনে ওই সেই বাড়ি৷'

'জানি৷'

দু-জনে চুপ করে চেয়ে রইল খানিকক্ষণ৷

এবার গবা ডাকল, 'গোবিন্দ৷'

'বলো৷'

'হরিহরকে খুন হতে আমি দেখেছি৷ তবে খুনিকে দেখিনি৷ আর দেখিনি বলেই সাক্ষ্যও দিইনি৷ কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভুল করেছি৷ সাক্ষ্য দিলে তুই নির্দোষ মানুষ হয়তো খালাস পেতিস৷'

গোবিন্দ মাথা নেড়ে বলল, 'না, গবাদা৷ খালাস হলেও ওরা আমাকে ছাড়ত না৷ জেলখানাতেও ওদের লোক আছে৷ বিরাট দল৷ ফাঁসিতে না ঝুললেও খুন হতাম৷'

দু-জনে বাতাসের মতো ফিসফিস করে কথা বলছিল৷ এত আস্তে যে, চার হাত দূর থেকেও শোনা যায় না৷

গবা আর গোবিন্দ আর একটু এগিয়ে গেল৷ তারপর গোবিন্দ বলল, 'গবাদা, এইবার৷'

গবা গলাটা সাফ করে নিল একটু৷ তারপর হঠাৎ বেশ চেঁচিয়ে গান ধরল, 'আজ মনটা করে উড়নখুড়ন গা করে আইঢাই৷ কাশিমের চরে দেখি জনমানব নাই৷ আছেন শুধু বিজ্ঞপক্ষী আর যতেক ভক্তজন৷ ইঙ্গিতে কথা কয় পাখি, তা বুঝেছেন ক-জন৷ আয় রে যত নন্দীভৃঙ্গী, তোদের ডাকে হরিহর৷ পাখির পেটে কথা করে খচরমচর৷ আছেন গুরু আছেন জ্ঞান কিন্তু শিষ্য নাই৷ বিজ্ঞপক্ষী গোমড়া মুখে বসে থাকেন তাই৷'

গান শেষ হলে দু-জনে উৎকর্ণ হয়ে বসে থাকে৷ অনেকক্ষণ কেটে যায়৷

গোবিন্দ বলে, 'ওরা বোধ হয় এদিকে আসেনি গবাদা৷'

গবা হঠাৎ ঠোঁটে আঙুল তোলে৷

কাছেপিঠে জঙ্গলের মধ্যে সড়সড় শব্দ হয় একটু৷ নিঃশব্দ পদসঞ্চারে কে বা কারা আসছে৷

২১

দু-জনে নিঃসাড়ে বসে আছে৷ অপেক্ষা করছে৷ টের পাচ্ছে, আড়াল থেকে কেউ নজর করছে তাদের দিকে৷ কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরও একদম সামনে কেউই এগিয়ে এল না৷

'গবাদা৷' গোবিন্দ ফিসফিস করে বলল৷

'বলে ফেল৷'

'ওরা আমাদের মাপজোখ করছে৷ কাছে আসছে না৷'

'তাই তো দেখছি৷ কিন্তু এই কুয়াশা আর অন্ধকারে মাপজোখটা কীভাবে?'

'সেও তো কথা৷ আর আমরাই বা উজবুকের মতো লুকিয়ে আছি কেন? ওরা যে খুঁজে পাবে না আমাদের,' বলে গোবিন্দ উঠতে যাচ্ছিল৷

গবা হাতটা টেনে ধরে বলল, 'দূর পাগল৷ অতটা বেপরোয়া হোসনে৷ বিপদ ঘটতে কতক্ষণ?'

'তুমি গানটা তাহলে আর একবার ধরো! ওরা জবাব দেয় কি না৷'

গবা গলা খাঁকারি দিয়ে গান ধরল, 'দানাপানি খায় রে পক্ষী, উড়াল দিতে চায়৷ তার শিকল করে ঠিনিন বেন্ধে রাখা দায়৷ এইবার উড়লে পক্ষী আর না পাবে তারে৷ ধনরত্নের হদিস রবে চির অন্ধকারে৷ তাই শুন শুন বুদ্ধিমন্ত যতেক ভক্তজন৷ পাখিরে কওয়াতে কথা এসেছেন দু-জন৷ অতি শিষ্ট ভদ্র নখদন্ত নাই৷ দুধুভাতু খাই মোরা ধর্মেরে ডরাই৷'

'গবাদা৷' এবার বেশ একটু হেঁকেই ডাকল গোবিন্দ৷

'বলে ফেল৷'

'কই, কারও তো টিকি দেখছি না৷'

'এখনও বোধ হয় মাপজোখ করছে৷'

'দাঁড়াও৷ ওদিকে এক বাঁশঝাড়ের কাছে একটা ছায়া মতো দেখছি,' বলে উঠে দাঁড়াল৷

সঙ্গেসঙ্গে বাতাসে একটা মৃদু শিসের মতো শব্দ হল৷ অন্ধকারেও ঝিকিয়ে উঠল একটা বিদ্যুৎগতির বল্লম৷

'বাপ রে!' বলে গোবিন্দ বসে পড়ল৷

বল্লমটা খচ করে বসে গেল পিছনের একটা গাছে৷

'জোর বেঁচে গেছিস৷' গবা গোবিন্দকে কাঁটাঝোপ থেকে টেনে তুলতে তুলতে বলে৷

'অন্ধকারেও নিশানা দেখেছ? এই টিপ যার-তার হাতের নয়৷'

'বকবক করিসনি৷ এখন চল, উঠে লম্বা দিই৷'

গোবিন্দও কথাটায় সায় দিলে বলল, 'তাই চলো৷ কিন্তু ওরা আমাদের বিশ্বাস করল না কেন বলো তো!'

'সেটাই বুদ্ধির কাজ৷'

দু-জনে জঙ্গলের মধ্যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হামাগুড়ি দিয়ে ফিরে আসতে থাকে৷

জঙ্গলের বাইরে এসে গবা একটু হাঁফ ছেড়ে বলে, 'আর যাহোক, তাহোক, আমাদের গান ওদের কানে তো পৌঁছেছে৷ যদি কাজ হয় তো ওতেই হবে৷'

'আমরা কারা তা জানবে কী করে?'

'খোঁজ নেবে৷ জানা কিছু শক্ত না৷ একটু বুদ্ধি চাই৷ সেটা ওদের ভালোই আছে৷'

বাড়ির দিকে ফিরতে ফিরতে গোবিন্দ জিজ্ঞেস করে, 'কিন্তু সাতনার দল আমাকে খড়ের গাদায় পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল কেন বল তো!'

'সে আর বলা শক্ত কী? তোকে মারলে হরিহরের সত্যিকারের খুনি বেঁচে যাবে৷ তুই যে নির্দোষ তা আর প্রমাণ হবে না৷'

'আমাকে হাতে পেলে কি ওরা মেরে ফেলবে গবাদা?'

'চেষ্টা তো করবেই৷'

গোবিন্দ আর কিছু বলল না৷

গবা বলল, 'রামুটার কথা ভাবছি৷ কীভাবে রেখেছে ওকে কে জানে! উদ্ধববাবুকে শাসিয়ে গেছে, পাখিচুরির কথা পাঁচকান হলে রামুকে জ্যান্ত রাখবে না৷ তা সে-কথা তো দুনিয়াসুদ্ধু লোক জেনে গেছে৷'

এ-কথায় গোবিন্দ থমকে দাঁড়িয়ে গবার হাত চেপে ধরে বলল, 'গবাদা, ফিরে যাই চলো৷ আমরা দু-জন হলেও দশ জনের মহড়া নিতে পারি৷ চলো গিয়ে ওদের ডেরা হুটোপাটা করে দিয়ে রামুকে নিয়ে আসি৷'

গবা মাথা নেড়ে একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, 'উদ্ধববাবু রামুকে খুব শাসন করে বটে, কিন্তু আমি জানি, ওই দুষ্টু ছেলেটাই ওঁর সবচেয়ে প্রিয়পুত্র৷ যদি কোনো খারাপ খবর পান তাহলে আর বাঁচবেন না৷'

'তাহলে?'

'তাহলেও মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করা চাই৷ সব কাজেই যে বুক চিতিয়ে বোকা সাহস দেখাতে হবে তার কোনে মানে নেই৷ ছুঁচ হয়ে ঢুকবি, বোমা হয়ে বেরোবি৷'

'ঢুকতে দিচ্ছে কোথায়! যা একখানা বল্লম ঝেড়েছিল আজ৷'

'রোস না দু-দিন৷ পাখির মুখ থেকে তো আর আসল কথাটি বেরোচ্ছে না!'

*           *            *

কাশিমের চর নিজঝুম৷ হাড়-কাঁপানো শীতে কুয়াশার কম্বল জড়িয়ে গোটা জায়গাটাই ঘুমিয়ে আছে যেন৷ মাঝে মাঝে শেয়ালের ডাক আর প্যাঁচার ভূতুড়ে শব্দ ওঠে ঝোপেঝাড়ে৷ রাতপাখি ডেকে ওঠে হঠাৎ হঠাৎ৷ বাঁশবনে ঝিঁঝির ঝিনঝিন৷ কিন্তু এইসব শব্দ যেন কাশিমের চরের নির্জনতাকেই আরও গাঢ় করে তোলে৷

দোতলার একটা ছোট্ট কুঠুরির মধ্যে মেঝের ওপর চটের বিছানায় রামু শুয়ে আছে৷ গায়ে একটা কুটকুটে কম্বল, এরকম শুয়ে তার অভ্যাস নেই৷ মেঝে থেকে চট ভেদ করে পাথুরে ঠান্ডা আসছে৷ কুটকুটে কম্বল দিয়ে ঢুকছে বাইরের শীত৷ বারবার তাই ঘুম ভেঙে যাচ্ছে রামুর৷ দুষ্টুমি করতে গিয়ে বহুবার বহুরকম বিপদে পড়েছে৷ দুষ্টু ছেলেরা পড়েই৷ কিন্তু এরকম বিপদে সে কোনো কালে পড়েনি৷

ডাকাতদের এই দলটা বেশ বড়োসড়ো৷ চেহারাগুলো একদম ভদ্রলোকের মতো নয়৷ হাতে সবসময়ে লাঠি, বল্লম, টাঙ্গি, বন্দুক-টন্দুকও আছে৷ কারও কোনো মায়াদয়া নেই৷ খেলার মাঠ থেকে ফেরার সময় সন্ধ্যা বেলা হঠাৎ একটা লোক এসে খবর দিল, 'তোমার বাবাকে কারা যেন পূর্বস্থলির মাঠে মারধোর করে ফেলে রেখে গেছে৷ শিগগির এসো৷'

খবরটা পেয়েই রামু লোকটার পিছু পিছু ছুটল৷ ক-দিন আগেই উদ্ধববাবুকে আদালত থেকে ফেরার পথে কারা বোমা মেরেছিল৷ এই সেদিনও বাড়িতে ডাকাত পড়েছে৷সুতরাং লোকটার কথায় রামুর অবিশ্বাস হয়নি৷ উদ্ধববাবুকে ওরা মারতেও পারে৷

পূর্বস্থলির মাঠ শহরের বাইরে৷ ভারি নির্জন জায়গা৷ সাঁঝের আবছায়া ঘন হয়ে উঠেছে৷ রামু সেখানে পৌঁছে এদিক-ওদিক তাকানোরও সময় পেল না৷ শিমূল গাছের পেছন থেকে জনাচারেক লোক বেরিয়ে এসে একটা গামছায় তার মুখ বেঁধে ফেলল৷ তারপর একটা গোরুর গাড়িতে তুলে ফেলল চটপট৷ অনেক রাতে তারা এসে পৌঁছোয় এই জায়গায়৷ রামু পরে তাদের কথাবার্তা থেকে জানতে পেরেছে এই জায়গারই নাম কাশিমের চর৷

প্রথম রাত্রিটা সারাক্ষণ বাড়ির কথা ভেবে কেঁদেছে রামু৷ এরা রুটি আর একটা আলুর ঝোল খেতে দিয়েছিল৷ তা ছোঁয়ওনি সে৷ কিন্তু সকাল থেকে রামুর চোখের জল শুকিয়ে গেল৷ একটা দৈত্যের মতো লম্বাচওড়া লোক এসে তাকে প্রথমেই বলল, 'শোনো রামু, তোমার এই দশা৷ উদ্ধব উকিল বোকাও বটে, জেদিও বটে৷ কিন্তু সে জানে না, আমার সঙ্গে বিবাদ করলে তাকে নির্বংশ হতে হবে৷ সে-কাজ শুরু হবে তোমাকে দিয়েই৷ একটু যদি বেচাল দেখি তবে রামদা দিয়ে দু-খানা করে কেটে ফেলব৷ এখন যা জিজ্ঞেস করছি তার ঠিকঠাক জবাব দাও৷ প্রথমে বলো, গবা পাগলা আসলে কে!'

রামু ভয়ে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল৷ অতি কষ্টে বলল, 'গবাদা তো পাগল৷'

'ওর পাগলামিটা চালাকি ছাড়া কিছুই নয়৷ সেটা আমরা জানি৷ কিন্তু ওর আসল পরিচয়টা আমাদের দরকার৷'

'গবাদা কারও কোনো ক্ষতি করে না তো৷'

'ক্ষতি যাতে করতে না পারে তার জন্য সাবধান হওয়া ভালো৷'

'গবাদার আর কোনো পরিচয় আমি জানি না৷'

লোকটা অবশ্য রামুকে এ নিয়ে আর খোঁচাখুঁচি করেনি৷ কিন্তু কয়েক ঘণ্টা বাদে আবার লোকটা এল৷ কিন্তু তার সঙ্গে নয়নকাজলকে দেখে রামু হাঁ৷ সে চেঁচিয়ে উঠল, 'নয়নদা৷' কিন্তু সঙ্গের লোকটা রামুকে একটি ধমক মেরে বলল, 'চোপ'! রামু ভয়ে চুপ করে গেল! নয়নকাজলও রামুর দিকে ভালো করে চাইতে পারছিল না৷ অন্য দিকে চেয়ে রইল৷ তার হাতে রামুদের কাকাতুয়ার দাঁড়টা৷

দৈত্য লোকটা বলল, 'এই পাখিটা কিছু গোপন খবর জানে৷ কিন্তু কিছুতেই বলছে না৷ তোমাদের পোষা পাখি, তোমরা নিশ্চয়ই এর গোপন কথা জানো!'

রামু মাথা নেড়ে বলল, 'জানি না৷ পাখিটা গুপ্তধনের কথা বলে বটে, কিন্তু কোথায় তা আছে তা কখনো বলেনি৷'

লোকটা বলল, 'ঠিক আছে৷ কিন্তু তোমার কাজ হল পাখিটার পেট থেকে কথা বের করা৷ চব্বিশ ঘণ্টা সময় দিচ্ছি৷ যদি তার মধ্যে পারো ভালো, যদি না পারো তবে পাঁচ ঘা করে বেত খাবে রোজ৷ এই নয়নকাজলও থাকবে পাশের ঘরে৷ সে নজর রাখবে তুমি কী করছ না-করছ৷'

রামু আর নিজেকে সামলাতে না পেরে জোরে চেঁচিয়ে উঠল, 'নয়নদা! তুমিও এদের দলে?'

নয়নকাজল তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল৷

২২

ঘুম বারবার ভাঙছে রামুর৷ বড়ো শীত৷ বিছানাটাও বড্ড শক্ত, কম্বল কুটকুট করছে৷ জেগে উঠলে সে জঙ্গলের গভীর নিস্তব্ধতা টের পায় আর গা ছমছম করে ওঠে তার৷ যে-বাড়িটায় তাকে আটকে রাখা হয়েছে, সেটা বিশাল৷ তবে প্রায় সবটাই ভেঙে পড়ে গেছে৷ এখানে-সেখানে এক-আধটা ঘর দাঁড়িয়ে আছে কোনোক্রমে৷ বাদবাকিটা ইট আর চুন-সুরকির স্তূপ৷ ডাকাতরা যথাসম্ভব বাড়িটাকে নিজেদের থাকার মতো করে নিয়েছে৷ তবে রামু জানে এটা ওদের স্থায়ী আড্ডা নয়৷ একসঙ্গে বেশি লোক এখানে থাকে না৷ প্রায় সব সময়েই আনাগোনা করে৷ ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ৷ সে-দরজাও পেল্লায় ভারী কাঠের৷ ঘরখানাও খুবই বড়োসড়ো৷ মেঝেয় আর দেওয়ালে পঙ্কের কাজ করা৷ তবে সবই অস্পষ্ট হয়ে এসেছে৷ মেঝেয় ফাটল, দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে৷ দিনের বেলা ঘরটা খুব ভালো করে দেখে নিয়েছে রামু৷ পালানোর কোনো পথ নেই৷ আর পালিয়ে যাবেই বা কোথায়? চারদিকে জঙ্গল৷ ডাকাতরা চারদিকে নজর রাখছে৷ ঘুম ভেঙে অন্ধকারে চুপচাপ তাকিয়ে ছিল রামু৷ শীতে একটু থরথরানি উঠছে শরীরে৷ কম্বলটা ভালো করে মুড়ি দিয়েও শীত যাচ্ছে না৷

হঠাৎ দরজায় একটু শব্দ হল৷ খুব মৃদু টোকা দেওয়ার মতো শব্দ৷ রামু কান খাড়া করল৷ না, ভুল নয়৷ আবার গোটা দুই টোকা পড়ল৷

স্বাভাবিক বুদ্ধিতেই রামু বুঝল, এই টোকা ডাকাতদের নয়৷ অন্য কারও কোনো কাণ্ড৷ বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল৷ কম্বল মুড়ি দিয়ে দরজার কাছটায় এসে হাঁটু গেড়ে বসে রইল সে চুপচাপ৷ খানিকক্ষণ বাদে একটু জোরে টোকা দেওয়ার শব্দ৷ কে যেন চাপা গলায় ডাকল, 'রামু!'

গলাটা চিনল রামু৷ বিশ্বাসঘাতক নয়নদা৷ কিন্তু বিশ্বাসঘাতক হলেও এই শত্রুপুরীতে নয়নকাজলই তার একমাত্র চেনা লোক৷ এমনিতে একসময়ে নয়নদা রামুকে ভালোও বাসত খুব৷ পেয়ারার ডাল দিয়ে গুলতি বানিয়ে দিয়েছে, চাবি-পটকা বানাতে শিখিয়েছে, তার টাইফয়েডের সময় ওই নয়নকাজলই লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে সন্দেশ এনে খাইয়েছে৷

রামু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দরজার কাছে মুখ নিয়ে বলল, 'কে, নয়নদা?'

'হ্যাঁ৷ পাহারাদারটা একটু তফাতে গেছে৷ বোধ হয় ঘুমিয়েও পড়েছে৷ সেই ফাঁকে এলাম৷'

'কী চাও?'

'শোনো, এই দরজার বাঁ-দিকের পাল্লায় একটা ফোকর আছে৷ এমনিতে বোঝা যায় না৷ হাতড়ে হাতড়ে খুঁজলে একটা ছোট্ট আলপিনের ডগার মতো জিনিস পাবে৷ সেটা টানলেই গোলমতো একটা ঢাকনা খোলা যায়৷'

'তা দিয়ে বেরোতে পারব?'

'না৷ বেরোনোর কথা এখন ভেবো না৷ এরা অত কাঁচা ছেলে নয়৷'

'তাহলে ফোকর দিয়ে কী হবে?'

'তোমার জন্য এক গেলাস দুধ এনেছি৷'

'তুমি তো জানোই দুধ খেতে আমার ভালো লাগে না৷'

'সে জানি৷ কিন্তু এদের দেওয়া খাবার যে তোমার মুখে রুচছে না, তাও তো দেখছি৷ এরকম আধপেটা খেয়ে থাকলে দুর্বল হয়ে পড়বে যে৷ আর এ ট্যালটেলে দুধ নয়৷ একদম ক্ষীর করা দুধ, সরে ভরতি৷'

রামু দরজা হাতড়ে ফোকরটা খুলতে পারল৷ নয়নদার দেওয়া দুধটা হাত বাড়িয়ে নিলও৷ মুখে দিয়ে দেখল সত্যিই চমৎকার ক্ষীরের গন্ধ৷ পুরু সর৷

'কী, ভালো?'

'ভালো কিন্তু তুমি তো এদের দলে৷ তবে আমার জন্য ভাবছ কেন?'

নয়নকাজল একটু চুপ করে রইল৷ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'কপালের ফের রে ভাই! লোভে পড়ে এদের দলে ভিড়েছিলাম৷ কিন্তু এখন দেখছি প্রাণসংশয়৷'

'তার মানে?'

'মানে এরা আমাকে এক বিন্দু বিশ্বাস করে না৷ তোমার মতো আমাকে ঘরে আটকে রাখেনি বটে, কিন্তু এদের চোখে ধুলো দিয়ে পালানোরও উপায় নেই৷ সব গাঁয়ে-গঞ্জে এদের লোক আছে৷ যেখানে যাব, সেখানেই গিয়ে খুন করে আসবে৷'

রামু বলল, 'এরা কি মাফিয়াদের মতো?'

'কে জানে বাপু কাদের মতো৷ তবে বিরাট দল৷ শুনেছি জেলখানাতেও নাকি এদের চর আছে৷ এদের কোনো লোককে পুলিশ ধরলে সে তিন দিনের মধ্যে জেল ভেঙে পালিয়ে আসে৷'

'কিন্তু তোমাকে খুন করবে কেন?'

'সেইই তো হয়েছে মুশকিল৷ একবার এদের দলে ভিড়লে তার আর ছাড়ান-কাটান নেই৷ তাকে আর এরা কিছুতেই ফিরে যেতে দেয় না৷ সে ছিল একরকম৷ কিন্তু ওদিকে আমাকে ডাকাত বলেও স্বীকার করছে না৷ কোনো বখরা দেবে না, মাইনে দেবে না, চাকরের মতো খাটাচ্ছে৷'

'তা তুমি এখন কী করতে চাও?'

নয়নকাজল করুণ স্বরে বলল, 'এ আমারই পাপের প্রায়শ্চিত্ত রে ভাই৷ তাই ভাবছি আমার যা গতি হওয়ার হবে৷ খামোখা তুমি কষ্ট পাবে কেন? ঠিক করেছি, তোমাকে সুযোগ পেলেই পালানোর পথ করে দেব৷'

'পারবে?'

'চেষ্টা তো করব৷ মুশকিল হয়েছে পাখিটাকে নিয়ে৷'

'কী মুশকিল?'

'পাখিটা আসল কথা বলতে চাইছে না৷ সাতনা তোমাকে বলেছে, পাখিটার পেট থেকে কথা বের করতে না পারলে মেরে ফেলবে৷ আমি জানি, তুমি তা পারবে না৷ আর সাতনা সত্যিই তোমাকে খুন করবে৷'

'ওই বিশাল চেহারার লোকটার নাম কি সাতনা?'

'হ্যাঁ৷ ওর দয়ামায়া বলতে কিছু নেই৷'

'ও কি দলের সর্দার?'

'আরে না৷ দলের সর্দার কে, তা আজ পর্যন্ত বুঝতে পারলাম না৷ মস্ত দল, চারদিকে অনেক ডালপালা ছড়ানো৷'

'আমার বাবাকে একটা খবর দিতে পার না নয়নদা?'

'খবর দেওয়ার দরকার নেই৷ খবর পেলে তোমার বাবা তোমাকে উদ্ধার করার জন্য চেষ্টা করবেন৷ তাতে তোমার বিপদ বাড়বে৷'

'অন্তত গবাদাকে যদি একটা খবর দিতে পার৷'

'গবা পাগল! সে খবর পেয়ে গেছে৷ একটু আগে জঙ্গলে একটা লোক গান গাইছিল শুনলে না?'

'না তো!'

'আমি শুনেছি৷ গবারই গলা৷ তুমি ওসব নিয়ে ভেবো না৷ শুধু মনে রেখো, আমি আছি৷ মরলে মরব, কিন্তু ধড়ে যতক্ষণ প্রাণ আছে ততক্ষণ তোমার ক্ষতি হতে দেব না৷ গেলাসটা দাও, এবার যাই৷'

গেলাস নিয়ে নয়নকাজল নিঃশব্দে চলে গেল৷

দুধটা খাওয়ার পর শীত একটু কম লাগতে লাগল রামুর৷ কুটকুটে কম্বল মুড়ি দিয়ে ভরা পেটে সে ঘুমিয়ে পড়ল৷

সকাল বেলায় দরজা খুলে প্রথম যে ঘরে ঢুকল সে সাতনা৷

খুরধার চোখে রামুর দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে সে বলল, 'কাল রাতে গবা পাগলা এখানে হানা দিয়েছিল৷ কে তাকে এ-জায়গার হদিস দিল জান?'

'আমি কী করে জানব? রামু অবাক হয়ে বলে?'

'তোমাদের চাকর নয়নকাজলকে কাঁটাওলা বেত দিয়ে মার দেওয়া হচ্ছে এখন৷ আমাদের মনে হচ্ছে, হদিসটা সে-ই দিয়ে এসেছে৷'

রামু একটু কেঁপে উঠল ভয়ে৷ বলল, 'নয়নদা? নয়নদা কী করে খবর দেবে? সেও তো তোমাদের দলে!'

'আমাদের দলে কি না তা এখনও আমরা জানি না৷ তোমার বাবার উকিলে বুদ্ধি তো কম নয়৷ হয়তো ওকে চর করে আমাদের দলে ভিড়িয়েছে৷ যাকগে, সে-সব ভেবে লাভ হবে না৷ এখন একটা কথা বলো তো!'

'কী কথা?'

'গোবিন্দ কোথায়?'

'কে গোবিন্দ?'

'গোবিন্দকে তুমি ভালোই চেনো৷ সার্কাসের গোবিন্দমাস্টার৷'

'সে কোথায়, তা আমি কী করে জানব?'

'আমাদের সন্দেহ, গোবিন্দ তোমাদের বাড়িতে লুকিয়ে আছে৷ তাকে অন্য কোথাও আমরা খুঁজে পাচ্ছি না৷'

রামু কাঁপা স্বরে জিজ্ঞেস করে, 'তাকে তোমরা খুঁজছ কেন?'

'তাঁর মুণ্ডুটা ধড় থেকে আলাদা করা দরকার৷ তাই খুঁজছি৷'

'তুমি এরকম নিষ্ঠুর লোক কেন?'

সাতনা কটমট করে রামুর দিকে চেয়ে রইল৷ কিন্তু তারপর হঠাৎ যেন কেমন ছাইরঙা হয়ে গেল তার মুখ৷ যেমন হঠাৎ এসেছিল, তেমনি হঠাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল৷

দরজাটা আঁট করে বন্ধ করে দিল পাহারাদার৷

২৩

যুধিষ্ঠিরবাবুর কামাই নেই, রোজ যেমন আসেন, তেমনই আজও পড়াতে এসেছেন৷

কিন্তু যাদের পড়াচ্ছেন তাদের পড়ায় মন নেই৷ রামুর দুই দাদা আর তিন দিদির মুখ ভার, চোখ ছলছল, গোঁজ হয়ে তারা বসে থাকে৷

যুধিষ্ঠিরবাবু আজ বইপত্র খুললেন না, টাস্কও দেখলেন না৷ রামুর সবচেয়ে বড়ো দাদা সোমনাথকে জিজ্ঞেস করলেন, 'রামুর কোনো খবর এখনও পাওয়া যায়নি, না?'

সোমনাথ মাথা নেড়ে বলল, 'না, আমাদের মা জল পর্যন্ত মুখে তুলছে না, বাবার চেহারা অর্ধেক হয়ে গেছে৷'

যুধিষ্ঠিরবাবু গম্ভীরমুখে মাথা নেড়ে বললেন, 'হুঁ, তা তোমার বাবার সঙ্গে একটু দেখা করা যাবে?'

'হ্যাঁ৷ বাবা তো ঘরেই শুয়ে আছেন৷'

'আমাকে একটু তাঁর কাছে নিয়ে চলো তো!'

উদ্ধববাবু আর একটা বিনিদ্র রাত কাটিয়ে সকালে উঠেছেন৷ যন্ত্রের মতো পুজো-আচ্চা সেরে এসে ঘরে শুয়ে পড়েছেন৷ বুকটা বড়ো কাঁপে আজকাল৷ মাথায় কত যে চিন্তা!

যুধিষ্ঠিরবাবুকে নিয়ে সোমনাথ ঘরে ঢোকার পর তিনি আস্তে আস্তে উঠে বসলেন৷ একটা চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে বললেন, 'বসুন যুধিষ্ঠিরবাবু৷'

যুধিষ্ঠির বসে বললেন, 'রামুর খবরটা আমি বাইরের লোকের মুখে শুনেছি৷'

উদ্ধববাবু কাতর স্বরে বললেন, 'হ্যাঁ, বড্ড পাঁচকান হয়ে গেছে৷ এখন ভয় খবরটা জানাজানি হয়ে যাওয়ায় ওরা আমার ছেলেটাকে মেরে-টেরে না ফেলে৷'

যুধিষ্ঠির গম্ভীর হয়ে বললেন, 'আপনি পুলিশকে কি সব কথা জানিয়েছেন?'

উদ্ধববাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'হ্যাঁ কুন্দকুসুম সবই জানে, বিচক্ষণ লোক৷ কিন্তু সেও তো কিছু করতে পারল না৷'

যুধিষ্ঠির একটু হেসে বললেন, 'আশ্চর্যের ব্যাপার কী জানেন উদ্ধববাবু, সবাই সবকিছু জানে৷ কিন্তু কাজের বেলা কেউই কিছু করতে পারছে না৷'

উদ্ধববাবু বুক কাঁপিয়ে আর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'করা হয়তো যেত কিন্তু রামুকে আটকে রেখে ওরা আমাদের একেবারে জব্দ করে দিয়েছে৷ কাল রাতে এসে কুন্দকুসুম বলে গেল কিছু করা সম্ভব নয়৷ তাহলেই ছেলেটার বিপদ৷ এই অবস্থায় আমারও মাথায় কিছু খেলছে না৷'

যুধিষ্ঠির ভ্রূকুটি কুটিল মুখে বসে রইলেন চুপচাপ৷ হঠাৎ কুঁজোয় জল নিয়ে বাড়ির চাকরটা ঘরে ঢুকল৷ যুধিষ্ঠির আনমনে তার দিকে তাকালেন৷ তারপর হঠাৎ অন্যমনস্কতা ঝেড়ে ফেলে ভালো করে তীক্ষ্ণ নজরে দেখলেন লোকটাকে৷ খুব লম্বা নয়, মজবুত গড়ন, গালে কিছু দাড়ি৷ তবু তাঁর স্মৃতি চমকে উঠল৷ যুধিষ্ঠির সোজা হয়ে বসলেন৷ উদ্ধববাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এ বুঝি আপনাদের নতুন কাজের লোক?'

'হ্যাঁ৷ এই তো তিন দিন হল কাজে লেগেছে৷'

যুধিষ্ঠির আর কিছু বললেন না৷ তবে চাকরটা চলে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ দরজার দিকে চেয়ে রইলেন, 'হুঁ৷'

উদ্ধববাবু যুধিষ্ঠিরের মুখের দিকে চেয়ে ছিলেন৷ লোকটা কেমন তা বুঝতে পারছিলেন না৷ তবে গোপনে শ্রীধরবাবুর কাছে খোঁজ নিয়েছিলেন৷ শ্রীধরবাবুর ভাঙা পা এখনও সারেনি৷ তিনি অবশ্য ভরসা দিয়ে বলেছিলেন, যুধিষ্ঠির সম্পর্কে চিন্তা করবেন না৷ অতি উত্তম ছেলে৷ আমি বহুকাল ধরে চিনি৷

উদ্ধববাবু অবশ্য নিশ্চিন্ত হতে পারেন না৷ আজকাল তাঁর সকলকেই সন্দেহ হয়৷ তিনি যুধিষ্ঠিরের মুখের ভাবসাব দেখে সন্দিহান হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'ওকে চেনেন নাকি?'

যুধিষ্ঠির মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বললেন, 'না বোধ হয়৷ চেনা চেনা লাগছিল বটে, তবে কত মানুষের সঙ্গে কত মানুষের চেহারার মিল থাকে৷'

এই বলে যুধিষ্ঠির উঠলেন৷ বললেন, 'রামুর ব্যাপারে আমার যদি কিছু করার থাকে তবে আমাকে বলবেন৷ শত হলেও সে আমার ছাত্র৷ বলতে কী আমি অমন উজ্জ্বল বুদ্ধিমান ছেলে কমই দেখেছি৷'

'বলেন কী?' উদ্ধববাবু অবাক হয়ে বলেন, 'রামু উজ্জ্বল বুদ্ধিমান?'

'ঠিক তাই৷ দুষ্টুমির স্টেজটা কেটে গেলেই সেটা বোঝা যাবে৷'

উদ্ধববাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন৷

যুধিষ্ঠির সন্তর্পণে বেরিয়ে এলেন৷ উঠোনের দিকটায় চাকরটা ভেজা কাপড়জামা মেলছে রোদ্দুরে৷

যুধিষ্ঠির চাপা স্বরে ডাকলেন, 'ওহে, ও গোবিন্দমাস্টার৷'

গোবিন্দ চমকে চিতাবাঘের মতো ঘুরে দাঁড়াল৷ চোখ ধকধক করে জ্বলছে৷

যুধিষ্ঠির একটু হাসলেন৷ তারপর কাছে গিয়ে বললেন, 'ভয় পেয়ো না৷ একটু বাইরে নিরিবিলিতে চলো৷ তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে৷'

গোবিন্দর চোখের আগুনটা নিভে গেল৷ বলল, 'আজ্ঞে৷'

যুধিষ্ঠির গোবিন্দকে নিয়ে বাইরে এলেন৷ নিরিবিলি বকুলগাছটার তলায় দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে বললেন, 'আমাকে চিনতে পার?'

গোবিন্দ মুখখানা ভালো করে দেখল৷ তারপর চাপা স্বরে বলল, 'চিনি৷ হরিহর পাড়ুইয়ের ছেলে না তুমি?'

যুধিষ্ঠির মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন, 'ধরেছ ঠিক৷ আমার বাবা বড়ো ভালো লোক ছিল না৷ পদবিটা আজকাল আর ব্যবহার করি না? এখন আমি যুধিষ্ঠির রায়৷'

গোবিন্দ কঠিন স্বরে বলল, 'কী চাও? বাপের খুনিকে পুলিশে ধরিয়ে দেবে?'

যুধিষ্ঠির গম্ভীর হয়ে বললেন, 'না৷ আমার বাবা যেসব পাপ করেছিলেন তাতে তাঁর খুন হওয়া কিছু বিচিত্র ছিল না৷ তাঁর খুনির ব্যবস্থা সরকার করবে৷ আমার তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই৷ কিন্তু আমি জানতে চাই তুমি কোন দলে৷ কেনই-বা এ-বাড়িতে চাকর সেজে আছ?'

গোবিন্দ খুব তীব্র দৃষ্টিতে যুধিষ্ঠিরকে দেখছিল৷ হরিহরের ছেলে লেখাপড়া শিখেছে বলে জানে৷ হরিহরও বলত তার ছেলে নাকি তার মতো নয়৷ গোবিন্দ একটা শ্বাস ফেলে বলল, 'তোমার হয়তো বিশ্বাস হবে না, হরিহরকে আমি খুন করিনি৷'

'হতে পারে৷ এখন আসল কথা বলো৷ তুমি এখানে কী করছ? চাকর সেজে থাকলেই তো চলবে না৷ যদি বুঝি তোমার মতলব খারাপ তাহলে উদ্ধববাবুকে তোমার আসল পরিচয়টা আমাকেই দিতে হবে৷'

গোবিন্দ একটু হেসে বলল, 'উনি জানেন৷ আমি রামুর দলে৷ সাতনার দলের নই৷'

যুধিষ্ঠির একটু অবাক হয়ে বললেন, 'সাতনা? সে আবার এর মধ্যে আছে নাকি?'

'আছে৷ দলের সর্দার না হলেও সে বেশ পাণ্ডা গোছের লোক৷ আমার ধারণা হরিহরকে সে-ই খুন করেছিল৷'

যুধিষ্ঠির একটু আনমনা হয়ে যান৷ অনেকক্ষণ দূরে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে বলে, 'সাতনা! সাতনাকে আমিও চিনতাম৷ সে লোক খারাপ ছিল না৷'

যুধিষ্ঠির ব্যথিত মুখে মাথা নেড়ে বলেন, 'তার মেয়েটা চুরি যাওয়ার পর থেকেই সে মানুষ থেকে জানোয়ার হয়ে গেল৷ তা শোনো গোবিন্দমাস্টার, যদি সাতনার দলই রামুকে চুরি করে থাকে তাহলে একটা উপায় হয়তো করা যাবে৷'

'তার মানে?'

যুধিষ্ঠির ব্যথিত মুখে বললেন, 'সাতনার মেয়েটাকে চুরি করেছিলেন আমার বাবাই৷ বাবার কী মতলব ছিল জানি না৷ হয়তো সাতনার কাছ থেকে কিছু আদায় করা৷ কিন্তু চুরি করলেও মেয়েটাকে বাবা মেরে ফেলেননি৷ আমার এক নিঃসন্তান মাসির কাছে রেখে এসেছিলেন৷ যতদূর জানি মেয়েটা এখনও সেখানেই আছে৷ যত্নে আছে৷ সাতনাকে বহুবার খবরটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি৷ পারিনি৷'

'বলো কী!' গোবিন্দর চোখ কপালে উঠল৷

'ঠিকই বলছি৷ তুমি যদি খবরটা সাতনার কাছে পৌঁছে দিতে পার তাহলে হয়তো কাজ হবে৷ বলবে রামুকে ফেরত দিলে সে তার মেয়েকে ফেরত পাবে৷'

উত্তেজিত গোবিন্দ কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'তোমার মাসির ঠিকানাটা?'

যুধিষ্ঠির মৃদু হেসে বললেন, 'ওটা এখন গোপন থাক৷ তবে নিশ্চিন্ত থাকো, মেয়েটা আছে৷ আগে খবরটা সাতনার কাছে পৌঁছে দাও৷ তারপর যা করার আমিই করব৷'

'তোমার কথা কি সাতনাকে বলব?'

'না বলাই ভালো৷' যুধিষ্ঠির মাথা নেড়ে বলেন, 'কারণ যে-গুপ্তধনের জন্য তোমরা সবাই হন্যে হয়ে গেছ তার আসল উত্তরাধিকারী আমিই৷ কিন্তু আমি ওসব দাবি করব না৷ আমি চাই গুপ্তধনের উদ্ধার হলে তা সরকারের তহবিলে জমা হোক৷ সাতনা জানে যে আমিই ওই গুপ্তধনের ওয়ারিশ৷ কাজেই আমি বেঁচে আছি জানলে সে আমাকে খুন করতে চাইবে৷'

গোবিন্দ বলে, 'তাহলে কী বলব? সাতনা কি আমাদের কথা বিশ্বাস করবে?'

'করবে৷ মেয়েটার একটা ছবি আছে আমার কাছে৷ সেটা ওকে দিয়ো৷ তাহলে বিশ্বাস করবে৷'

২৪

পরের রাতেও নয়নকাজল এল৷ রামু ভেবেছিল, বেত খেয়ে নয়নকাজলের বুঝি হয়ে গেছে৷ সে দরজায় শব্দ করল৷

রামু উঠে গিয়ে দরজায় মুখ লাগিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কে?'

'আমি নয়নদা৷'

'ঃউ, নয়নদা! তুমি ভালো আছ?'

'ভালো কি আর থাকি? সারা গায়ে কালসিটে, কাঁকালে ব্যাথা, চলতে গেলে মাথা ঘোরে৷'

'তোমাকে খুব মেরেছে নয়নদা?'

'খুব৷ মেরেই ফেলত৷ কিন্তু পাখিটার মুখ থেকে এখনও কথা বেরোয়নি বলে প্রাণটা আমার রেয়াত করেছে৷'

'তুমি পালিয়ে যাচ্ছ না কেন নয়নদা? গিয়ে পুলিশে খবর দাও৷'

নয়ন একটু দুঃখের হাসি হেসে বলল, 'পালালে যদি বাঁচতুম রে ভাই, তবে কি আর চেষ্টা করতুম না! আর পুলিশের কথা কী বলব! আমার মতো গরিব-দুঃখী মানুষের কথায় তারা গা করবে না৷'

'তাহলে উপায়?'

'উপায় কিছু দেখছি না৷ নিতান্ত চুনোপুঁটি ভেবে যদি ছেড়ে-টেড়ে দেয়৷ ভগবান ভরসা৷ তোমার জন্য আজ আর দুধটুকু আনতে পারিনি৷'

'দুধ লাগবে না৷ শোনো নয়নদা, এদের সর্দার যখন আবার আমার কাছে আসবে, তখন আমি তাকে বলে দেব যেন আর কখনো তোমার গায়ে হাত না দেয়৷ দিলে আমি পাখির মুখ দিয়ে কথা বলানোর চেষ্টা করব না৷'

নয়ন একটু অবাক হয়ে বলে, 'সর্দার! সর্দারকে তুমি কোথায় দেখলে?'

'কেন ওই দানবের মতো লোকটা৷ সাতনা না কী যেন নাম!'

নয়ন একটা শ্বাস ফেলে বলল, 'সাতনা সর্দার-টর্দার নয়৷ তবে মোড়ল গোছের একজন বটে৷ আসল সর্দার যে কে, তা এরা নিজেরাও ভালো জানে না৷ যেই হোক তাঁর অনেক ক্ষমতা৷ তাকে সবাই যমের মতো ডরায়৷'

'তুমি সর্দারকে দেখনি?'

'আমি কেন, এরাও অনেকে দেখেনি৷ ওসব নিয়ে ভেবো না৷ সাতনাকে আমার কথা বললে হিতে বিপরীত হবে৷ এখন ছেড়ে রেখেছে, তুমি কিছু বললে হাতে-পায়ে শিকল পরিয়ে রাখবে৷'

'তাহলে বলব না কিন্তু এই যে তুমি আমার কাছে এসেছ, যদি ধরা পড়ে যাও?'

'সে ভয় খুব একটা নেই৷ তোমার ওপর এরা তেমন কড়া নজর রাখছে না৷ তুমি ছোটো ছেলে, দরজা ভেঙে পালাতে তো পারবে না, আর পালালেই বা যাবে কোথায়? চারদিকে জঙ্গল৷'

'এখন ওরা ক-জন আছে?'

'বেশি নয়৷ তবে সব সময়েই লোক আনাগোনা করে৷ বিরাট কাণ্ড৷ কোদাল গাঁইতি দিয়ে চারদিকে খুব খোঁড়াখুঁড়িও হচ্ছে গুপ্তধনের জন্য৷'

'কিছু পেয়েছে?'

'না, পাওয়া বড়ো সহজ নয়৷'

'পাখিটা কোথায়?'

'সে খুব ভালো জায়গায় আছে৷ আমাদের নাগালের বাইরে৷'

রামু উত্তেজিত গলায় বলল, 'শোনো নয়নদা, আমাদের যেমন করে হোক, পালাতেই হবে৷ এখানে থাকলে তুমি বা আমি কেউই হয়তো বেঁচে থাকব না৷'

'পালাবে? ও বাবা!'

'ভয় পাচ্ছ কেন? মরার চেয়ে তো পালানো ভালো৷'

'তা ভালো কিন্তু . . .'

'কিন্তু-টিন্তু নয়৷ ভালো করে দেখো, এ-ঘর থেকে বেরোনোর কোনো উপায় আছে কি না৷'

'দেখেছি৷ নেই৷'

'ছাদে উঠতে পার?'

'তা পারি৷'

'আর একটা দড়ি লাগবে৷'

'তাও জোগাড় হবে৷ কিন্তু অত সাহস ভালো নয়৷ শুনেই আমার হাত-পা কাঁপছে৷'

'শোনো নয়নদা, না পালালেও এরা রেহাই দেবে না৷ আমাকে যদি নাও মারে, তোমাকে মারবে৷ কারণ তুমি বড়ো মানুষ, ওদের অনেক গোপন খবর জেনে গেছ৷ কাজেই তোমার না পালিয়ে উপায় নেই৷ যদি দু-জনে পালাতে পারি, তবে আমি বাবাকে গিয়ে সব বলব৷ বাবা পুলিশের কাছে গেলে পুলিশ কিছু না করে পারবে না৷ তা ছাড়া গোবিন্দদা আর গবাদা আছে৷ ওরা ঠিক একটা বুদ্ধি বের করবে৷'

নয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, 'কিন্তু পালানোর উপায়টা কী ভেবেছ?'

'খুব সোজা৷ দক্ষিণ দিকে ছাদের কাছে একটা বড়ো ঘুলঘুলি আছে৷ অবশ্য অনেক উঁচুতে৷ ঘুলঘুলিতে পাতলা তারের জাল দেওয়া৷ জালটা পুরোনো হয়ে মরচে পড়ে পচে গেছে৷ তুমি ছাদে উঠে কার্নিশে ভর দিয়ে ওই ঘুলগুলির ভিতর দিয়ে দড়ি নামিয়ে দেবে৷ আমি দড়ি ধরে উঠে যাব৷'

'পারবে? পড়ে যাবে না তো?'

'না না৷ আমি গোবিন্দমাস্টারের কাছে অনেক তালিম নিয়েছি৷ কিন্তু তুমি খুব সাবধান৷'

'আজ রাতেই পালাবে নাকি?'

'আজ এক্ষুনি৷ কাল আবার কী হয় কে জানে৷'

'আমার বড়ো ভয় করছে রামু৷ পুরোনো কার্নিশ ভেঙে যদি পড়ে যাই?'

'কার্নিশ যদি পুরোনো হয় তাহলে ছাদের রেলিং বা শক্ত কিছুতে দড়িটা বেঁধে নিজের কোমরে জড়িয়ে নিয়ো৷ পড়বে না কিন্তু সাবধান৷ শব্দ-টব্দ কোরো না৷'

'আচ্ছা৷ কিন্তু পারবে তো রামু?'

'আমি পারব৷ তোমাকেও পারতে হবে৷'

'দেখি তাহলে৷' মিনমিন করে এ-কথা বলে চলে গেল নয়ন৷

রামু শীত তাড়ানোর জন্য কয়েকটা ডন-বৈঠক করল৷ স্কিপিং-এর ভঙ্গিতে নেচে মাংসপেশির আড় ভেঙে নিল৷ গা গরম করে না নিলে হঠাৎ কঠিন পরিশ্রম করতে গিয়ে পেশিতে টান ধরে যায়৷ গোবিন্দদা তাকে অনেক কটা কসরত শিখিয়েছে৷ সবই ফ্লোর একসারসাইজ৷ তার কয়েকটা করে নিল রামু৷

তারপর কম্বল মুড়ি দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল৷ অন্ধকার ঘরে ঘুলঘুলিটা খুব আবছা দেখা যায়৷ অনেকটা উঁচুতে৷ খুব বড়ো ঘুলঘুলি নয় বটে, তবে রামু গলে যেতে পারে৷ কিন্তু কথা হল, নয়নকাজল পারবে কি না কার্নিশে নামতে৷ একে ভীতু মানুষ, তার ওপর নয়ন তো আর খেলাধুলো করে না৷

ওদিকে নয়ন পড়েছে মুশকিলে৷ একতলার একটা ঘরে মেলা দড়িদড়া শাবল খন্তা মজুত থাকে৷ দরজায় তালাও নেই৷ সে নিঃশব্দে গিয়ে একটা দড়ি বের করে এনেছে বটে, কিন্তু বাকি কাজ করতে ভয়ে তার হাত-পা অসাড় হয়ে যাচ্ছে৷

দালানের মধ্যে তেমন পাহারা নেই৷ পাহারা আছে বাড়ির চারধারে৷ কোনো দরজা বা ফটক দিয়ে বেরোনোর উপায় নেই৷ আর নীচের তলার ঘরে দোর দিয়ে অনেক লোক ঘুমোচ্ছে৷ দোতলাতে গোটা দুই-তিন ঘরে লোক আছে৷ সাড়াশব্দ হলে তারা জেগে যেতে পারে৷

নয়ন পা টিপে টিপে ছাদে উঠল৷ আজও কুয়াশা আছে, শীতও সাংঘাতিক৷ তবে মাঝরাতে একটু চাঁদের উদয় হয়ে থাকবে৷ অন্ধকারটা তেমন জমাট নয়৷ একটু ফিকে ভাব৷ মস্ত ছাদখানা অনেকটা দেখা যাচ্ছে৷ বিস্তর আজেবাজে জিনিস পড়ে আছে ছাদে৷ পুরোনো পিপে, পাথরের মূর্তি, ইট, ভাঙা দরজা জানলার কাঠ৷

নয়ন ঠাহর করে রামুর ঘরটা কোথায় তা আন্দাজ করল৷ রেলিং দিয়ে ঝুঁকতে নীচের দিকে মাথাটা বোঁ করে ঘুরে গেল তার৷ এই এত উঁচু থেকে যদি পড়ে যায় তো মাথাটি আস্ত থাকবে না৷ অনেকক্ষণ চোখ বুজে একটু ধাতস্থ হওয়ার চেষ্টা করল সে৷

তারপর চোখ খুলতেই বুকের মধ্যে একটা চড়াই পাখি উড়াল দিল যেন৷

সামনে লোক দাঁড়িয়ে৷

দাঁতে দাঁতে কত্তাল বাজছিল নয়নের৷ সে 'বাবা গো' বলে ফের চোখ বুজে ফেলল৷

লোকটা জিজ্ঞেস করল, 'কে তুই?'

'আজ্ঞে আমি দলের লোক৷'

'এখানে কী করছিস!'

'আজ্ঞে পাহারা দিচ্ছিলাম৷'

লোকটা অবাক হয়ে বলল, 'ছাদে তো আমার ডিউটি৷ তুই এলি কোত্থেকে? হাতে দড়িই বা কেন?'

নয়ন একটু সাহস করে বলল, 'যদি কাউকে ধরে ফেলি তো বাঁধতে হবে না?'

'ঃও, তাই বল!' বলে হঠাৎ লোকটা হাসতে হাসতেই ঠাস করে একটা চড় কষাল নয়নের গালে৷ সেই চড়ে চোখে ফুলঝুরি দেখতে লাগল নয়ন৷ বাপ রে, কী চড়!

২৫

যখন একটু ধাতস্থ হল নয়নকাজল, তখন আবার আত্মারামের খাঁচা ছাড়ার উপক্রম৷ লোকটা তার কন্ঠার কাছে বল্লমের চোখা ডগাটা ধরে আছে৷ যা ধার, তাতে একটু চাপ দিলেই গলা এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যাবে৷ নয়নের বুক ঢিবঢিব করছে, মা কালীর নামটাও স্মরণে আসছে না৷

লোকটা জিজ্ঞেস করল, 'তোর নাম কী?'

নয়নকাজল জিব দিয়ে ঠোঁট চেটে বলল, 'ইয়ে মানে-'

সর্বনাশ! নয়নকাজল দেখে নিজের নামটাও তার মনে নেই মোটেই৷ মাথাটা এত ঘেবড়ে গেছে যে, কোনো কথা স্পষ্ট মনে পড়ছে না৷ বাবার নামও নয়, নিজের নামও নয়, কারও নামই নয়৷ তবে উপায়?

'কী রে?' বলে লোকটা বল্লমটা একটু নাড়ে৷

নয়নকাজল চেঁচিয়ে বলে, 'আমার নাম লোক৷'

'লোক?' বলে লোকটা অবাক হয়ে পড়ে থাকা নয়নকাজলের দিকে চেয়ে বলে, 'লোক আবার কারও নাম হয় নাকি?'

'কে জানে বাপু৷ নিজের নামটা আমার মনে পড়ছে না তেমন৷ মেলা খোঁচাখুঁচি কোরো না, লেগে যাবে৷'

'এখানে কী করিস?'

'ডাকাতি৷ আর কী করার আছে?'

'তুই কেমনধারা ডাকাত? আমার মতো রোগাপটকা লোকের একটা চড় সহ্য করতে পারিস না! কোন আহাম্মক তোকে দলে ভিড়িয়েছে?'

এ-কথায় নয়নের খুব অপমান বোধ হল৷ লোকটা তেমন রোগাপটকা মোটেই নয়৷ দিব্যি ঘাড়ে-গর্দানে চেহারা৷ হাতের চড়টাও বেশ খোলতাই হয়৷ নয়ন বলল, 'চড়-টড় খাওয়া আমার অভ্যেস নেই৷'

লোকটা হাসল! বলল, 'তা দড়ি নিয়ে কোথায় যাচ্ছিলি? গলায় দড়ি দিতে?'

দড়ির কথায় নয়নের গোটা ব্যাপারটা মনে পড়ে গেল৷ তাই তো৷ রামু যে হাঁ করে বসে আছে তার জন্য৷ আর তো দেরি করা যায় না৷

নিজের অবস্থাটা আড়চোখে একটু দেখে নিল নয়ন৷ খুবই খারাপ অবস্থা৷ ছাদের ধুলোবালির মধ্যে চিত হয়ে পড়ে আছে সে৷ তার বুকের দু-দিকে দু-খানা পা রেখে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা! হাতের বল্লম তার গলায় ঠেকানো৷ নড়ার সাধ্য নেই৷

নয়ন বলল, 'তা গলায় দড়ি দিলেই বা কী? তোমার বল্লমের চেয়ে সেটা কতটা খারাপ হবে?'

'মতলবটা কী ফেঁদেছিলি সেটা খোলসা করে বল তো বাপ৷ নইলে গেলি৷'

নয়ন লক্ষ করছিল, লোকটা তাকে মানুষ বলেই তেমন গ্রাহ্য করছে না৷ ভাবছে নয়নের পিঁপড়ের প্রাণ, তাই ততটা সাবধানও হচ্ছে না৷ নয়ন নিজের ডান পাটা একটু তুলল৷ না, লোকটা লক্ষ করছে না৷ পা তোলার ঘটনাটা ঘটছে লোকটার পিছন দিকে৷ সুতরাং নয়ন লোকটাকে পিছন থেকে একটা রাম লাথি কষাতে পারে৷ ভয় হল, সেই ধাক্কায় লোকটার বল্লম না আবার তার গলায় বিঁধে যায়৷ তাই লাথি মারার সঙ্গে সঙ্গে হাতের ঝটকায় বল্লমটা সরিয়ে নিতে হবে৷ তারপর মা কালী ভরসা৷ নয়ন লোকটাকে অন্যমনস্ক করার জন্য হঠাৎ একটু কঁকিয়ে উঠে বলল, 'আমার পেটে বড়ো ব্যথা৷ বল্লমটা সরাও৷'

লোকটা আবার তার নাটুকে হাসি হেসে কী যেন বলতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু বলা আর হল না৷ নয়নের আচমকা লাথিটা লোকটাকে দু-হাত ছিটকে দিল৷ হুড়মুড় করে লোকটা যেই পড়েছে অমনি নয়ন বল্লমটা বাগিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে৷ খুন-টুন সে জীবনে করেনি৷ তাই বল্লমটা লাঠির মতো বাগিয়ে ইচ্ছেমতো ঘা কতক দিল লোকটাকে৷ লোকটা নেতিয়ে পড়ে রইল চুপচাপ৷

নয়নকাজল দড়ি নিয়ে ছাদের একটা মজবুত রেলিংয়ে বেঁধে খানিকটা নিজের কোমরে জড়াল৷ এখন আর তার আলসে দিয়ে নামতে ভয় করছে না৷ তার চেয়ে বড়ো ভয় ওই লোকটার যদি চট করে জ্ঞান ফিরে আসে৷

দড়ি ধরে একটু ঝুঁকতেই রামুর ঘরের ঘুলঘুলিটা হাতের নাগালে পেয়ে গেল সে৷ দড়িটা নামিয়ে দিয়ে ডাকল, 'রামু!'

'এই যে!'

'উঠে পড়ো তাড়াতাড়ি৷ বাইরে বিপদ৷'

রামু গোবিন্দর কাছে কায়দা-কসরত কম শেখেনি ক-দিনে৷ দড়ি ধরে টপ করে ঝুল খেয়ে উঠে এল ঘুলঘুলিতে৷ তারপর দড়িটা টেনে নিয়ে বাইরের দিকে ঝুলিয়ে নেমে আসতে খুব বেশি সময় লাগল না৷

সে যে পালাতে পারে, এটা নিশ্চয়ই কারও মাথায় আসেনি৷ এলে আরও ভালো পাহারা রাখত৷ কিন্তু পাহারা নেই৷ তা বলে পালানোও সহজ নয়৷ চারদিকে ঘন গাছপালা৷ নিবিড় জঙ্গল৷ তারা রাস্তা চেনে না৷

'নয়নদা, কোনদিকে যাবে?'

'তাই তো ভাবছি৷ চলো এগোই যেদিকে হোক৷ এখানে বেশিক্ষণ থাকা নিরাপদ নয়৷'

'চলো৷' বলে রামু এগোতে থাকে৷

কিন্তু এগোনো খুবই শক্ত৷ শীতকাল বলে সাপের ভয় নেই তেমন৷ কিন্তু লতাপাতায় পা আটকে যায়৷ হঠাৎ হঠাৎ পাখি ডেকে ওঠে৷

দুর্গের মতো বিশাল বাড়িটার চৌহদ্দি বড়ো কমও নয়৷ খানিকদূর এগোনোর পর সামনে আর একটা ভাঙা দালান৷ সেই দালানের একটা ঘর থেকে টেমির আলো আসছে বন্ধ জানলার ফাঁক দিয়ে৷

নয়ন রামুর হাত চেপে ধরে বলল, 'সর্বনাশ! শিগগির অন্য পথে চলো৷'

রামু হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, 'যাব, একটু উঁকি দিয়ে যাই৷'

'পাগল হয়েছ?'

হঠাৎ কাছে পিঠে একটা ঘোড়া পা দাপিয়ে চিহিঁহিঁ করে ডেকে উঠল৷ দু-জনেই সেই শব্দে চমকে ওঠে৷

'রামু, লক্ষণ ভালো নয়৷'

'তুমি চুপ করো তো নয়নদা৷ অত ঘাবড়ে যাও কেন?'

রামু নিঃসাড়ে গিয়ে জানলার ধার ঘেঁষে দাঁড়ায়৷ উঁকি মেরে ভিতরে তাকিয়ে তার রক্ত জল হয়ে যাওয়ার উপক্রম৷ একটা চৌকির ওপর কম্বলের আসনে বিশাল চেহারার এক কাপালিক বসা৷ তার মস্ত জটাজূট, বিশাল কালো দাড়ি-গোঁফ, কপালে সিঁদুরের ধ্যাবড়া টিপ৷ গায়ে লাল পোশাক৷ তার সামনে বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে সাতনা৷

নয়ন ডাকল, 'রামু! পালাও!'

রামু আর দাঁড়াল না, নয়ন আর সে প্রাণপণে দৌড়োতে লাগল৷

কতবার যে পড়ল দু-জন, কতবার ফের উঠল, তার হিসেব নেই৷ গাছের সঙ্গে শতেক বার ধাক্কা খেল৷ পা-হাত ছড়ে গেল, কপাল ফুলে উঠল৷ তবু তারা দৌড়োতে থাকে৷

খানিকটা দূর দৌড়োবার পরই তারা বুঝতে পারে, পিছনে কারও হাঁকডাক নেই বটে, কিন্তু কেউ তাদের পিছু নিয়েছে ঠিকই৷ তারা যেদিকে যাচ্ছে, পায়ের একটা শব্দও সেদিকেই তাদের পিছু নিচ্ছে৷

'নয়নদা, পিছনে কেউ আসছে৷'

'আমারও তাই মনে হচ্ছে৷'

২৬

রামু বলল, 'বড্ড হাঁফিয়ে গেছি৷'

নয়ন বলল, 'আমিও৷ এসো, বসে একটু জিরিয়ে নিই৷'

'জিরোবে! কিন্তু কে যে আসছে পিছনে৷'

ফিসফিস করে নয়ন বলে, 'আসছে আমাদের পায়ের শব্দ শুনে শুনে৷ নইলে এই জঙ্গলে আমাদের পিছু নেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়৷ যদি বসে থাকি, তবে আমাদের পায়ের শব্দও হবে না, আর লোকটাও খুঁজে পাবে না আমাদের৷'

বলতে বলতে নয়ন বসে দম নিতে থাকে৷ রামুও৷ পিছনে পায়ের শব্দটাও আর হচ্ছে না৷

রামু জিজ্ঞেস করে, 'আমরা কতদূর এসেছি নয়নদা?'

'তা কী করে বলব? এ-জায়গা আমার চেনা নয়৷ জঙ্গলটাও ভারি জটিল৷ শুনেছি পুবধারে একটা দুর্ভেদ্য বাঁশবন আছে৷ সেই বন এত ঘন যে, শেয়ালও গলতে পারে না৷'

'আমরা কি সেদিকেই যাচ্ছি?'

'তাও জানি না৷ আমরা খুব বেশি দূর আসতে পারিনি৷ ছুটবার সময় ডাকাতদের রাতপাহারার একটা হাঁকডাক শুনতে পেলাম যেন৷'

রামু উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'তাহলে চলো, আর একটু দূরে যাই৷'

নয়ন তার হাতখানা ধরে বসিয়ে দিয়ে কাহিল গলায় বলল, 'খামোখা হয়রান হয়ে লাভ কী? গোলকধাঁধায় পড়ে আবার হয়তো গিয়ে ডাকাতদের আড্ডায় হাজির হতে হবে৷ তার চেয়ে বসে থাকো৷ ভোর হলে আলোয় আলোয় চলে যাব৷'

রামু জিজ্ঞেস করে, 'কাপালিকটাকে দেখলে?'

'ভালো করে দেখিনি৷ যা ভয় পেয়েছিলাম৷'

রামু একটা শ্বাস ফেলে বলল, 'বিশাল চেহারা৷ হাবভাব দেখে মনে হল সাতনাও ওকে খাতির করে৷'

'তা হলে ও হল সাতনার ওপরের সর্দার৷ এ-দলে কে কোন পোস্টে আছে, তা বলা মুশকিল৷'

'তান্ত্রিক কাপালিকরা কি ডাকাত হয়?'

'হতে পারে৷ তা ছাড়া আসল কাপালিক কি না তাই দেখো, ভেকও থাকতে পারে৷'

যেখানে তারা বসে আছে, সে-জায়গাটায় গাছপালা তেমন ঘন নয়৷ শীতে গাছপালার পাতা ঝরে এমনিতেও একটু হালকা হয়েছে জঙ্গল৷ অন্ধকারে গাছপালা চেনা যায় না, তবে এখানকার গাছগুলো সবই বড়ো বড়ো৷ ঝোপঝাড় তেমন নেই৷ লম্বা ঘাসের জঙ্গল আছে অবশ্য৷ তারা তেমনি বুকসমান ঘাসের মধ্যেই বসে আছে৷ হাত বাড়ালে একটা শিশুগাছের গুঁড়ি ছোঁয়া যায়৷

হঠাৎ রামু বলল, 'একটা শব্দ পেলে নয়নদা?'

নয়ন একটু শক্ত হয়ে গেল৷ তারপর ফিসফিস করে বলল, 'হ্যাঁ একটু একটু পাচ্ছি৷ শুকনো পাতার ওপর দিয়ে কেউ আসছে৷'

রামু বলল, 'আসছে নয়, এসে গেছে৷ ওঠো, নয়নদা, ছোটো৷'

প্রাণের দায়ে নয়ন উঠল৷ কিন্তু ছুটতে গিয়েই ঘটল বিপদটা৷ কোত্থেকে একটা খেঁটে লাঠি ছিটকে এসে তার দুই পায়ের মধ্যে একটা ডিগবাজি খেল৷ তাইতে নয়ন পড়ল উপুড় হয়ে৷ আর একটা খেঁটে লাঠির পাল্লায় পড়ে রামুও চিতপটাং৷

শিশুগাছের পিছন থেকে লোকটা ধীরে-সুস্থে বেরিয়ে এল৷ হাতে বল্লম৷ অন্য হাতে নড়া ধরে প্রথমে রামুকে দাঁড় করাল৷ ছোট্ট একটা চড় তার গালে কষিয়ে গমগমে গলায় বলল, 'পালাতে চাইবে আর? ওই খেঁটে লাঠির ক্ষমতা জান? এককালে ঠ্যাঙাড়ে ঠগিরা ওই দিয়ে দূর থেকে লোককে ঘায়েল করত৷ ফের যদি পালাও তো পাবড়া দিয়ে ঠ্যাং ভেঙে দেব৷'

রামুর অবশ্য পালানোর মতো অবস্থা নয়৷ চড়টা খেয়ে তার মাথা ঘুরছে৷ সে উবু হয়ে বসে পড়ল৷

নয়নকাজল আর ট্যাঁ-ফো করল না৷ শোয়া অবস্থাতেই লোকটার পায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, 'আজ্ঞে আর পালাব না৷'

লোকটা দু-জনকে পাশাপাশি বসিয়ে নিজেও মুখোমুখি বসল৷ অন্ধকারে আবছা যা দেখা যায় তাতে বোঝা যাচ্ছে লোকটার বয়স বেশি নয়৷ হালকা-পলকা চেহারা বটে, কিন্তু গায়ে বেশ জোর রাখে৷ পরনে মালকোঁচা ধুতি, গায়ে একটা বালাপোশের খাটো কোট, পায়ে নাগরা৷

লোকটা জিজ্ঞেস করল, 'কোথায় পালাচ্ছিলে তোমরা?'

নয়ন মাথা চুলকে বলল, 'ঠিক পালাচ্ছিলাম না৷'

'তাহলে কি এত রাতে জঙ্গলে বেড়াতে বেরিয়েছিলে?'

নয়ন একগাল হেসে বলল, 'আজ্ঞে অনেকটা তাই, দিনকাল ভালো নয়৷ চারদিকে চোর-ছ্যাঁচড়ের উৎপাত৷ তাই চারদিকটায় একটু নজর রাখছিলাম আর কি৷'

'এই জঙ্গলে চোর-ছ্যাঁচড় কী করতে আসবে?' লোকটা একটু অবাক গলায় জিজ্ঞেস করে৷

নয়ন বিগলিত হয়ে বলে, 'বলা তো যায় না আজ্ঞে৷ আমাদের আড্ডায় তো মেলাই দামি জিনিস আছে৷'

লোকটা এবার একটু আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করে, 'তোমাদের একটা আড্ডা আছে নাকি এখানে? তা সে আড্ডাটা কোথায়?'

নয়ন ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে ঘন ঘন মাথা চুলকোতে থাকে৷ রামু বলে, 'কেন, আপনি কি সাতনা ডাকাতের আড্ডা চেনেন না?'

লোকটা এবার উৎসাহে একহাত এগিয়ে আসে৷ চাপা গলায় বলে, 'আরে আমিও যে সেই আড্ডাটাই খুঁজতে বেরিয়েছি৷ জায়গাটা কোথায় বলো তো?'

রামু মাথা নেড়ে বলে, 'তা আমরাও জানি না৷ আমরা সেখান থেকে পালিয়ে এসেছি৷ জঙ্গলের রাস্তা চিনি না৷ ফিরে যাওয়ার পথ বলতে পারব না৷'

লোকটা বলে, 'তোমরা পালিয়ে এসেছ কেন? তোমাদের কি ওরা ধরে রেখেছিল?'

'হ্যাঁ৷'

'তোমার নাম কি রামু, উদ্ধববাবুর ছেলে তুমি?'

'হ্যাঁ৷' রামু ভয়ে ভয়ে বলে৷

লোকটা একটু হাসে৷ বলে, 'আচ্ছা কাণ্ড যা হোক৷ আমি তো ভেবেছিলাম তোমরা ওদের দলেরই লোক৷'

'আপনি কে?'

'আমাকে চিনবে না৷ আমি ডাকাতদের দলে নাম লেখাতে যাচ্ছি৷'

নয়ন ফস করে বলে ওঠে, 'সে তো আমিও গিয়েছিলুম৷ কিন্তু ওরা নতুন লোককে সহজে দলে নেয় না৷'

লোকটা খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে, 'নেবে৷ এলেমদার লোক দেখলে ঠিকই নেবে৷ তোমরা যদি কেবল পথটা বাতলে দিতে পারতে তাহলে আমার অনেক হয়রানি কমে যেত৷'

নয়ন একটু গুম হয়ে থেকে বলল, 'আপনি কেমন লোক কে জানে৷ খুব ভালো লোক যে নন তা বোঝাই যাচ্ছে৷ লোক আমিও ভালো নই৷ তাই আপনাকে বলতে বাধা নেই, আমার মনে হচ্ছে এই পশ্চিম দিকে নাক বরাবর এগোলে সেই আড্ডায় পৌঁছে যেতে পারবেন৷ তবে সাবধানে, আচমকা বল্লম এসে বুকে বিঁধতে পারে৷ মাথায় লাঠি পড়তে পারে কিংবা ঘাড়ে রামদায়ের কোপ৷ ওরা বাইরের লোক পছন্দ করে না৷'

লোকটা হেসে বলল, 'কিন্তু তুমি তো ওদের দলের লোক৷'

'না, আমি দল ছেড়ে পালাচ্ছি৷'

'তাই কি হয়?' বলে লোকটা সাদা দাঁতে হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়াল৷ তারপর বলল, 'তোমরা পালালে এত পরিশ্রমই বৃথা যাবে৷ আমি তোমাদের ধরে আবার সাতনার আস্তানায় নিয়ে যাব৷ চলো৷'

নয়ন ভয়ে আঁতকে উঠে বলে, 'বলেন কী? এই তো গত পরশু সাতনার এক কসাই আমাকে বিষ-বিছুটি দিয়ে ছেড়েছে৷ আবার সেখানে যাব?'

রামুও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে, 'আপনি ডাকাত হতে যাচ্ছেন তো যান না, আমাদের টানছেন কেন?'

লোকটা মাথা নেড়ে বলে, 'তোমাদের ধরে নিয়ে গেলে সাতনা চট করে আমার ওপর খুশি হয়ে যাবে৷ তা ছাড়া দলের ঘাঁতঘোঁতও কিছু তোমাদের কাছে জানার আছে আমার৷ আর দেরি করে লাভ নেই৷ ওঠো, উঠে পড়ো৷'

নয়ন লোকটার পায়ে ধরার চেষ্টা করল৷ রামুও কাঁদো-কাঁদো হয়ে অনেক কথা বলল৷ কিন্তু লোকটার নরম হওয়ার নাম নেই৷ খেঁটে লাঠিদুটো বগলে নিয়ে বল্লম বাগিয়ে সে একটা পেল্লায় ধমক দিয়ে বলল, 'নাকি কান্না বন্ধ করো৷ তোমাদের এত সহজে ছাড়ছি না৷'

অগত্যা বল্লমের মৃদু খোঁচা খেতে খেতে দু-জনে ম্লানমুখে লোকটার আগে আগে পশ্চিমদিকে হাঁটতে লাগল৷

বেশি দূর হাঁটতে হল না৷ আধ-মাইলটাক হাঁটতেই অন্ধকারে বিশাল বাড়িটা দেখা গেল৷ আর দেখা গেল মশাল হাতে বিশ-ত্রিশজন লোক ছোটাছুটি হাঁকাহাকি করছে৷

লোকটা বলল, 'ওই বোধ হয় সেই আড্ডা?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ৷ যমদুয়ার৷' নয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে৷

আচমকা পিছন থেকে লোকটা একটা অমানুষিক 'রে-রে-রে-রে' হাঁক ছাড়ল৷ সে এমন শব্দ যে মাটি কেঁপে ওঠে, গাছপালা নড়তে থাকে, দুর্বল লোকের হৃৎপিণ্ড থেমে যায়৷ কোনো কথা নয়, শুধু 'রে-রে-রে-রে' শব্দ বজ্রনির্ঘোষের মতো বেজে ওঠে৷

সেই শব্দে মশালগুলো স্থির হয়ে দাঁড়াল৷ তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল৷

২৭

মশালের আলোয় সবার আগে সাত ফুট লম্বা সাতনাকে দেখা গেল এগিয়ে আসতে৷ হাতে টাঙ্গি৷

ভয় খেয়ে নয়নকাজল রামুর হাত চেপে ধরে বলল, 'আর রক্ষে নেই৷ দেশে আমার বিধবা মাকে একটা খবর পাঠিয়ে দিয়ো ছোটোদাদাবাবু৷'

রামু অত ঘাবড়ায়নি৷ সে তো জানে কাকাতুয়াটাকে দিয়ে এখনও আসল কথা বলাতে পারেনি এরা৷

দলটা কাছে এগিয়ে আসতেই দুটো মুশকো চেহারার লোক এসে খপাখপ রামু আর নয়নকাজলকে ধরে পিছমোড়া করে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল৷

সাতনা গমগমে গলায় লোকটাকে জিজ্ঞেস করল, 'তুই কে রে?'

লোকটা বেশ বুক চিতিয়েই জবাব দিল, 'আমার নাম কিংকর৷ তুমি কেডা?'

'আমি সাতনা সর্দার৷'

'ঃও, তুমিই!' বলে লোকটা একটু হাসল৷ তারপর বলল, 'তোমার দলেই নাম লেখাতে এসেছি৷ আমি বর্ধমানের শংকর মাঝির শাকরেদ৷ নাম শুনেছ?'

'শংকর মাঝি৷' সাতনার গলায় রীতিমতো ভক্তিশ্রদ্ধা ফুটে উঠল৷ ধরা গলায় বলল, 'এ দলে আসবে নাকি?'

'ইচ্ছে তো তাই৷' বলে লোকটা জামার বুকপকেট থেকে বের করে সাতনার হাতে দিয়ে বলল, 'এই হল শংকর মাঝির পাঞ্জা৷ বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ, পুরুলিয়া যেখানে খুশি যে-কোনো দলে এই পাঞ্জা দেখালেই লুফে নেবে আমাকে৷ তবু তোমার দলেই এলাম কেন জান? শুনেছি তোমরা একটা বড়ো দাঁও মারার ফন্দি এঁটেছ৷ সত্যি নাকি?'

সাতনার মুখটা একটু ব্যাজার হল৷ বলল, 'সত্যি৷ তবে হিস্যা নিয়ে বেশি ঝাঁকাঝাঁকি কোরো না৷ আমাদের হিস্যাদার অনেক৷'

সাতনা সর্দার তাদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে শাকরেদদের বলল, 'এ দুটোকে নিয়ে যা৷' তারপর লোকটার দিকে ফিরে বলল, 'এদের তুমি পেলে কোথায়? ধরেই বা আনলে কেন?'

লোকটা বলল, 'ওদের মুখেই শুনলুম যে, ওরা তোমার আস্তানা থেকে পালিয়েছে৷ তাই ভাবলুম যার দলে নাম লেখাতে যাচ্ছি তার একটু উপকার করি গে৷'

সাতনা মৃদু হেসে বলে, 'দল আমার নয়৷ আজ বড়ো সর্দার এখানেই আছে৷ চলো তোমাকে তার কাছে নিয়ে যাই৷'

'চলো৷'

শাকরেদরাও ওদিকে রামু আর নয়নকাজলকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলল৷ এ-বাড়ির মাটির নীচে গোটাকয় চোরকুঠুরি আছে৷ তারই দুটোয় দু-জনকে ভরে বাইরে থেকে ঝপাঝপ তালা মেরে দিল৷

ভিতরে জমাট অন্ধকার৷ সোঁদা সোঁদা গন্ধ৷ হাতে আর মুখে মাকড়সার জাল জড়িয়ে যাচ্ছে বার বার৷ রামু বারকয়েক হাঁচি দিল নাক সুড়সুড়ির চোটে৷ ঘরে কিছু নেই৷ না বিছানা, চৌকি, না অন্য কোনো আসবাব৷ পায়ের নীচে শুধু ঠান্ডা মেঝে৷ তারই ওপর উবু হয়ে বসল সে৷ হাঁটু দুটো দু-হাতে জড়িয়ে ধরে গুটিসুটি মেরে শীত তাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে ঢুলতে লাগল৷

চোরকুঠুরি থেকে কখন ভোর হল তা টেরও পায়নি রামু৷ একটা লোক এসে দরজা খুলে যখন নড়া ধরে তাকে ছেঁচড়ে বের করে আনল, তখন সে দেখল বাইরে বেশ বেলা হয়ে গেছে৷

উঠোনের রোদে একটা দড়ির চারপাইতে বসে কাঁসার মস্ত গেলাসে খেজুর-রস খাচ্ছিল সাতনা৷ তার সামনে নিয়ে রামুকে খাড়া করা হল৷

সাতনা একবার ভ্রূ কুঁচকে তার দিকে চেয়ে গেলাসটা গলায় উপুড় করে বাড়িয়ে দিল বাঁ-ধারে৷ গামছায় মুখ বাঁধা একটা হাঁড়ি নিয়ে মাটিতে বসে আছে একটা লোক৷ সে গেলাসটা তাড়াতাড়ি আবার ভরে এগিয়ে দেয়৷

সাতনা রামুর দিকে লালচে চোখে চেয়ে বলে, 'খুব খারাপ কাজ করেছিলে কাল রাতে৷ তোমার কি জানের পরোয়া নেই? কিংকরের হাতে পড়েছিলে বলে বেঁচে গেছ৷ নইলে জঙ্গল থেকে বেরোতেও পারতে না, বেঘোরে আমার দলবলের হাতে শিকার হয়ে যেতে৷'

রামু কিছু বলল না৷ দাঁড়িয়ে রইল চুপ করে৷

আরও কয়েক ঢোক খেজুর-রস খেয়ে সাতনা একটা মস্ত ঢেকুর তুলে বলল, 'তোমাকে এবারের মতো মাপ করে দিলাম৷ বাচ্চা ছেলেদের ওপর আমার কোনো রাগ নেই৷ কিন্তু খবর পেয়েছি, তোমার বাবা পুলিশে খবর দিয়েছে৷ তোমার খোঁজে লোকজনও লাগিয়েছে৷ কাজটা তোমার বাবা খুব ভালো করেনি৷ এখন যদি তোমাকে জ্যান্ত রাখি, তবে আমাদের মেলা ঝামেলা৷ তাই ঠিক হয়েছে তোমার মাথাটা কেটে নিয়ে তোমার বাবার কাছে পাঠানো হবে৷'

বলে সাতনা আর এক চুমুক খেজুর-রস খেল৷ আর রামুর শীত করতে লাগল৷

সাতনা ধুতির খুঁটে মুখ মুছে বলল, 'বুঝেছ?'

রামু একটু কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে, 'আর নয়নদার কী হবে?'

'নয়ন?' বলে সাতনা অবাক হয়ে রামুর দিকে চেয়ে বলে, 'নয়নের খবরে তোমার কী দরকার হে ছোকরা?'

'নয়নদার কিছু হলে তার বিধবা মা খুব কাঁদবে৷'

'সে তো তোমার মা-ও কাঁদবে৷'

'আমাকে কেউ ভালোবাসে না৷ বাবা না, মা না৷' বলতে বলতে আজ রামুর চোখে জল এসে গেল৷ গলাটা এল ধরে৷

সাতনা গেলাসে চুমুক দিতে গিয়েও কেমন থমকে গেল একটু৷ বারকয় গলা খাঁকারি দিল৷ হঠাৎ তার মনটা বোধ হয় নরম হয়ে পড়েছিল৷ সেটা ঝেড়ে ফেলতে একটা বিকট হাঁকাড় দিল, 'নিয়ে যা৷ নিয়ে যা একে৷'

লোকগুলো তাকে জঙ্গলের দিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল৷ পশ্চিম ধারে একটা ঢিবি, তার ওপাশে পচা ডোবায় মস্ত হোগলা বন৷ ভারি নির্জন জায়গা৷ ঢিবি পেরিয়ে ডোবার ধারটায় রামুকে নিয়ে এল তারা৷ জায়গাটা ভীষণ নির্জন৷ একদিকে ঢিবি আর অন্যধারে হোগলার বন থাকায় জায়গাটা লোকচক্ষুর আড়ালও বটে৷ যে দু-জন লোক রামুকে ধরে এনেছে তারা দু-জনেই ভীষণ তাগড়া জোয়ান৷ কালো চেহারা৷ মুখে রসকষ নেই৷ একজনের হাতে ঝকঝকে একটা ভোজালি৷ একজন রামুকে ধরে হাত দুটো মুচড়ে পিঠের দিকে ঘুরিয়ে চুল ধরে মাথাটা ঝুঁকিয়ে দিল সামনের দিকে৷ বিড়বিড় করে বলল, 'এই বয়সে মরণ না ডাকলে কেউ বাঘের ঘরে ঢোকে!'

রামু কোনো ব্যথা টের পাচ্ছিল না৷ পেট জ্বলে যাচ্ছে খিদেয়৷ গলা তেষ্টায় কাঠ৷ বুকটা দুঃখে বড়ো ভার হয়ে আছে৷ মরতে সে ভয় পাচ্ছিল না৷ শুধু দুঃখ হচ্ছিল কেউ তাকে ভালোবাসে না বলে৷

যে লোকটার হাতে ভোজালি সে একটা মসৃণ পাথরের মতো জিনিসে ভোজালিটা বারকয় ঘষে নিয়ে আঙুলে ধার দেখে নিল৷ তারপর বলল, 'নে, হয়েছে৷ ভালো করে ধরিস৷ শেষ সময়টায় বড়ো ঝটকা দেয় কেউ কেউ৷'

২৮

জলার ধারে যখন এই ঘটনা ঘটছে, তখন একটু দূরে ঈশান কোণে একটা ভাঙা মন্দিরের উঁচু চাতালে দাঁড়িয়ে দু-জন লোক দৃশ্যটা দেখছিল৷ আসলে দৃশ্যটা খুব মন দিয়ে দেখছিল একজন৷ সে কিংকর৷ আর দ্বিতীয় লোকটি অর্থাৎ সাতনা লক্ষ করছিল কিংকরকে৷

রামুর ঘাড়ের ওপর উদ্যত ভোজালিতে রোদ ঝিকিয়ে উঠতেই কিংকর আর সহ্য করতে পারল না৷ হাতের বল্লমটা চোখের পলকে তুলে শাঁ করে ছুড়ে দিল৷ এত দূর থেকে বল্লম যত জোরেই ছোড়া হোক, তা পৌঁছোনোর কথা নয়৷ তা ছাড়া নিশানা ঠিক রাখার তো প্রশ্নই ওঠে না৷ কিন্তু কিংকরের জাদু-হাত যেন বল্লমটাকে মন্ত্রপূত করে ছুড়ল৷ সেটা রোদে ঝিলিক হেনে হাউইয়ের মতো তেড়ে গিয়ে খুনেটার বাঁ-কাঁধে বিঁধে গেল৷ ভোজালি ফেলে 'বাপ রে' বলে চেঁচিয়ে লোকটা মাটিতে পড়ে ছটফট করতে থাকে৷

সাতনা এতটুকু চঞ্চল হল না৷ শুধু প্রকাণ্ড একখানা হাত বাড়িয়ে কিংকরের পিঠটা চাপড়ে দিয়ে বলল, 'শাবাশ! বহোত খুব৷'

কিংকর এই বাহবায় গলল না৷ চিতাবাঘের মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে ধমক দিয়ে বলল, 'তোমরা ডাকাত না ছুঁচো? কাপুরুষের দল! বাচ্চাদের যারা খুন করে, তারা কখনো মরদ নয়৷'

সাতনা একটু হাসল৷ তারপর মোলায়েম গলায় বলল, 'রামুকে খুন করা হত না হে৷ তোমাকে একটু পরীক্ষা করার জন্য ওটুকু অভিনয় করতে হল৷'

কিংকর ফুঁসে উঠে বলল, 'কীসের পরীক্ষা? তোমাদের মতো চুনোপুঁটির কাছে পরীক্ষা দিতে হবে আমাকে তেমন ঠাউরেছ নাকি?'

সাতনা ঠান্ডা গলায় বলে, 'আহা চটো কেন ভায়া! তুমি তিন দলের লোক না শত্রুপক্ষের চর তা একটু বাজিয়ে দেখতে হবে না?'

কিংকর চোখ রাঙা করে তেজের গলায় বলল, 'দেখো সাতনা, যতদূর জানি তুমি এ-দলের সামান্য মোড়ল মাত্র৷ সর্দার তান্ত্রিকবাবা কাল তোমাকে তেমন পাত্তা দিচ্ছিল না৷ বেশি ফোপরদালালি করবে তো সোজা সর্দারকে জানিয়ে দেব৷ আর একটা কথা, তোমার চেহারাটা বড়োসড়ো বটে, ভেবো না বেড়ালের মতো তোমার ন-টা প্রাণ আছে৷ এ দু-খানা শুধু-হাতে তোমার ওই মোষে গর্দান ভেজা গামছার মতো নিংড়ে মুচড়ে দিতে পারি৷ কাজেই বুঝে-সমঝে চলো৷ আমি তোমার পালের মেড়াদের মতো নই৷'

সাতনার সঙ্গে এই ভাষায় এবং তেজের ভঙ্গিতে কেউ কথা কওয়ার সাহস পায় না৷ কিন্তু এই অগ্রাহ্যের ভাব সাতনা মুখ বুজে সয়ে গেল৷ শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, 'আমি একটা ছেলেকে চিনতাম৷ তখন তার অল্প বয়স৷ ইস্কুলে পড়ে৷ প্রতি বছর ইস্কুলের স্পোর্টসে ছেলেটা জ্যাভেলিন থ্রোয়ে সেরা প্রাইজ পেত৷ বর্শা ছুড়ত এমন জোরে যে দেখে তাক লেগে যেত৷ বেঁচে থাকলে এখন সে তোমার বয়সিই হয়েছে৷'

এ-কথা শুনে কিংকর একটু অস্বস্তি বোধ করতে লাগল৷ তবু তেজের সঙ্গে বলল, 'ওসব এলেবেলে কথা শুনতে চাই না৷ এবার থেকে কিংকরকে একটু সমঝে চলো৷'

দু-জন লোক বল্লম-খাওয়া লোকটাকে ধরাধরি করে চাতালে এনে ফেলল৷ মুখে জল দেওয়া হচ্ছে, রক্তে ভাসাভাসি কাণ্ড৷ চোট গুরুতর৷ তবে কাঁধে লেগেছে বলে প্রাণের ভয় নেই৷ সাতনার স্যাঙাতরা কটমট করে কিংকরের দিকে তাকাচ্ছে, একটু ইঙ্গিত পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে গলা নামিয়ে দেবে৷

কিন্তু সাতনা তাদের দিকে তাকাল না৷ কিংকরকে বলল, 'চলো, ভিতর বাড়িতে যাই৷ ভয় নেই, রামুকে কেউ এখনই খুন করবে না৷'

কিংকর বলল, 'না করাই বুদ্ধিমানের কাজ৷ ওই বাচ্চা ছেলেটার গায়ে কেউ হাত তুলেছে বলে যদি টের পাই তবে সেই হাত আমি কেটে ফেলে দেব মনে রেখো৷'

'বাপ রে!' বলে সাতনা হাসল, 'তুমি যে আমাকে ভয় খাইয়ে দিচ্ছ৷'

এ-কথায় কিংকরও হেসে ফেলল৷ তারপর ভিতরবাড়িতে গিয়ে উঠোনের রোদে দু-জনে দুটো দড়ির চারপাইতে বসে খেজুর-রস খেতে লাগল৷ কিংকর জিজ্ঞেস করল, 'হঠাৎ আমাকে পরীক্ষা করার জন্য ওই ছেলেটাকে সাতসকালে খুনেদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলে কেন?'

সাতনা প্রথমটায় কথা বলল না৷ একমনে খেজুর-রস খেয়ে যেতে লাগল৷ অনেকক্ষণ বাদে বলল, 'দেখছিলাম ওই ছেলেটার প্রতি দরদ আছে কি না৷'

কিংকর অবাক হয়ে বলল, 'থাকবে না কেন? ডাকাতি করি বলে তো আর অমানুষ নই৷'

সাতনা একথায় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'তোমাকে যে সেই ছেলেটার কথা বলছিলাম, যে ইস্কুলে জ্যাভেলিন থ্রোতে প্রতিবার ফার্স্ট হত, তার কথা আর একটু শুনবে নাকি?'

কিংকর একটু থতমত খেয়ে বলে, 'তার মানে? তোমার কি মাথার গণ্ডগোল আছে নাকি বাপু? হঠাৎ পুরোনো গপ্পো ফেঁদে বসতে চাইছ কেন?'

'সাধে কি আর চাইছি? গপ্পোটা তোমার জানা দরকার৷ এমনও তো হতে পারে যে, সেই ছেলেটাই তুমি৷'

কিংকর হাতের রসসুদ্ধ ভাঁড়টা হঠাৎ ছুড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াল৷ তার চোখ ধকধক করছে, লম্বা শরীরের পেশিগুলো জামার তলায় ঠেলাঠেলি করছে! থমথমে গলায় সে বলে, 'সাতনা, বুঝতে পারছি খামোখা আমাকে ঝামেলায় জড়িয়ে, সকলের মনে সন্দেহ জাগিয়ে তুমি আমাকে দল থেকে হঠাতে চাইছ৷ কারণ আমি থাকলে এই দলে তোমার জায়গা আমার নীচেই হবে৷ তাই বলছি, ওসব হীন চক্রান্ত না করে এসো, দু-জনে মরদের মতো ফয়সালা করে নিই কে কত বড়ো ওস্তাদ৷ হাতিয়ার ধরতে হয় তো ধরো, নইলে খালি হাতে চাও তো তাই হোক৷ চলে এসো৷'

এই চ্যালেঞ্জের জবাবে কিন্তু সাতনা নড়ল না৷ কেমন একরকম ক্যাবলা চোখে কিছুক্ষণ কিংকরের দিকে চেয়ে মাথা নেড়ে বলল, 'বসো কিংকর৷ না, তোমার সঙ্গে আমি কাজিয়া করতে চাই না৷ বসো কথা আছে৷'

রাগে ফুলতে ফুলতে কিংকর আবার চারপাইতে বসল৷

সাতনা বলল, 'তুমি খুব সাংঘাতিক লোক, মেনে নিচ্ছি৷ কিন্তু মনে রেখো, তোমারও একটা বই দুটো প্রাণ নেই৷'

'তা জানি৷ ওসব ভয় আমাকে দেখিয়ো না৷ কিংকরের একটাই জান বটে, কিন্তু সেটা মরদের জান৷ তোমার জান নয়৷ আমাকে প্রাণের ভয় দেখিয়ো না৷'

এতেও উত্তেজিত হল না সাতনা৷ শান্ত গলায় বলল, 'তোমাকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই জানি৷ সে-চেষ্টা করছি না৷ শুধু জানতে চাইছি তুমি এ-দলে ঢুকলে কেন? তোমার মতলবখানা কী?'

'সে যাই হোক, সর্দার বুঝবে৷ তুমি তোমার মতো থাকো৷'

সাতনা মাথা নেড়ে বলে, 'তা থাকতে পারছি কই? তুমি কথায় কথায় আমাকে শাসাচ্ছ, লড়তে চাইছ৷ তার মানে ছুতোনাতায় আমার সঙ্গে তোমার লাগবেই৷ তাই মনে হয় তুমি আমাকে ভালো চোখে দেখতে পারছ না৷'

কিংকর গম্ভীর গলায় বলে, 'ভদ্রলোকের মতো ব্যবহার করলে ভালো চোখে দেখতে বাধা কী?'

সাতনা বলে, 'বাধা আছে৷ তোমার বাধা আছে৷ আমার সব কিছু মনে থাকে৷ মানুষের মুখ আমি সহজে ভুলি না৷'

কিংকরের মুখটা আবার হিংস্র হয়ে ওঠে৷

সাতনা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, 'কিছু বলতে হবে না৷ আমি মরদ কি না সে-পরিচয় যথাসময়ে পাবে৷ এখন খ্যামা দাও৷ শুধু মনে রেখো সাতনার দশজোড়া চোখ সব জায়গায় তোমাকে নজরে রাখবে৷ দশজোড়া হাত তৈরি থাকবে৷ এক চুল বেয়াদবি দেখলে, চোখের একটা ইশারা করব, সঙ্গেসঙ্গে তোমার মুণ্ডু খসে পড়বে৷'

কিংকর ঝাঁকুনি মেরে উঠতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু বাস্তবিকই পিছন থেকে আচমকা দশখানা বল্লমের তীক্ষ্ণ ডগা পিঠ আর কোমর স্পর্শ করল৷ কিংকর উঠল না৷ কিন্তু একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, 'খুব মরদ৷'

সাতনা খুব বড়ো একটা শ্বাস টেনে বলল, 'তোমার সাহস আছে বটে৷'

২৯

কোনো কথা না বলে দু-খানা তীক্ষ্ণ চোখে অনেকক্ষণ কিংকরকে দেখল সাতনা৷ তারপর বলল, 'তোমার বড্ড ঝাঁজ হে৷ ঝাঁজালো লোক আমি পছন্দ করি বটে, তবে বেশি ঝাঁজ ভালো নয়৷'

কিংকর কথা বলল না৷ কটমট করে তাকিয়ে রইল৷ সাতনা একটা হাঁক দিলে এক স্যাঙাত দৌড়ে আসে৷ সাতনা তাকে বলে, 'যা, রামুকে ধরে নিয়ে আয়৷'

কিংকরের পিছনে দশখানা বল্লম উঁচিয়ে আছে৷ সে অবশ্য গ্রাহ্য করল না৷ একমনে খেজুর-রস খায় আর মাঝে মাঝে সাতনার দিকে আগুনপারা চোখ করে চায়৷

একটু বাদেই নড়া ধরে রামুকে নিয়ে এল সাতনার স্যাঙাত৷ অল্প সময়ের মধ্যেই রামুর মুখ শুকিয়ে গেছে৷ চোখে আতঙ্ক৷ তাকে দেখে কিংকর সাতনার ওপর রাগে দাঁতে দাঁত পিষল৷

সাতনা কিংকরকেই লক্ষ করছিল৷ একটু হেসে বলল, 'রাগ কোরো না হে৷ মায়াদয়া করলে আমাদের চলে না৷ ওহে রামু, এই লোকটাকে চেনো?'

রামু দিশাহারার মতো চারদিকে চেয়ে দেখল৷ তারপর কিংকরের দিকে তাকিয়ে বলল, 'চিনি৷ এই লোকটাই কাল রাতে আমাদের ধরে এনেছে৷'

সাতনা মাথা নেড়ে বলে, 'সে তো জানি৷ সে-কথা নয়৷ লোকটাকে আগে থেকে চেনো কি না ভালো করে দেখে বলো তো৷'

রামু ভালো করেই দেখল৷ আবছা আবছা একটা চেনা মানুষের আদল আসে বটে, কিন্তু সঠিক চিনতে পারল না৷ মাথা নেড়ে সে বলল, 'চিনি না৷'

'খুব ভালো করে দেখলে চিনতে পারতে কিন্তু৷ অবিশ্যি তোমার দোষ নেই৷ এই লোকটা হরবোলা৷ একসময়ে সার্কাসে হরেকরকম পাখি আর জানোয়ারের ডাক নকল করত৷ যেকোনো মানুষের গলা একবার শুনে হুবহু সেই গলায় কইতে পারে৷ সুতরাং গলা শুনে একে চিনবে না৷ আর চেহারা? যে-চেহারাটা এখন দেখছ সেইটেও এর আসল চেহারা নয়, তবে অনেকটা কাছাকাছি৷ দরকার শুধু থিয়েটারের সং সাজার কয়েকটা জিনিস৷ তাহলেই হাঃ হাঃ হাঃ ঃহ . . .'

সাতনা হাসতে হাসতে বেদম হয়ে পড়ল৷

কিংকর স্থির চোখেই সাতনার দিকে চেয়ে ছিল৷ কথা বলল না৷

সাতনা হাসি থামিয়ে কিংকরের দিকে চেয়ে বলল, 'তোমার অনেক গুণ৷ এত গুণ খামোখা নষ্ট করলে হে৷'

কিংকর একটু হেসে বলে, 'তোমারও অনেক গুণ৷ সেইসব গুণ তুমিও অকাজে নষ্ট করলে সাতনা৷ তবে বলি তোমার ক্ষতি করতে আমার আসা নয়৷ আমি তোমাকে দুটি কথা বলব৷ বেশ মন দিয়ে শোনো৷'

সাতনা হাসি থামিয়ে বেশ গম্ভীর মুখ করে কিংকরের দিকে চাইল৷ তারপর বলল, 'শুধু গুল মেরে এই জাল কেটে বেরোতে পারবে না৷ কাজেই বলার আগে ভেবেচিন্তে নাও, যা বলবে তা সত্যি কি না৷'

'আমি যা বলব তা সত্যি৷ তবে এত লোকের সামনে বলা যাবে না৷ কথাটা বড়ো গোপন৷'

সাতনা পাহাড় প্রমাণ শরীরটা টান করে উঠে দাঁড়াল৷ বলল, 'ঠিক আছে৷ চোরকুঠুরিতে চলো৷ তবে তোমার হাতদুটো পিছমোড়া করে বাঁধা থাকবে৷'

'ঠিক আছে৷ তাই-ই সই৷'

'সার্কাসে তুমি হাতকড়া খোলার খেলা দেখাতে! আমার সব মনে আছে৷ কিন্তু এখন চালাকি করে হাতের দড়ি খুলতে যেয়ো না আমার কাছে রিভলবার আছে৷ মনে রেখো৷'

দুটো লোক এসে কিংকরের হাত পিছমোড়া দিয়ে শক্ত করে বাঁধল৷ তারপর সাতনা আর কিংকর গিয়ে ঢুকল চোরকুঠুরিতে৷

কিংকরকে দেওয়ালের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড় করিয়ে মুখোমুখি বসল সাতনা৷ হাতে সত্যিই ছ-ঘরা রিভলবার৷ বসে বলল, 'যা বলার চটপট বলে ফেলো৷'

'আমি কাকাতুয়াটাকে দিয়ে কথা বলাতে পারি৷'

'পার? বটে?' সাতনা একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে৷

কিংকর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, 'পারি৷ অনেক ভেবেচিন্তে কায়দাটা বের করেছি৷ কিন্তু পাখিটা কথা বললে তোমরা সেই গুপ্তধন বের করবে৷ অথচ ওই গুপ্তধন তোমাদের পাওনা নয়৷ আইন বলে, যত গুপ্তধন পাওয়া যাবে তার সবই গভর্মেন্টের৷ কিন্তু তোমরা গভর্মেন্টকে এক পয়সাও দেবে না৷'

সাতনা জলদগম্ভীর স্বরে বলে, 'শুধু এই কথা?'

'না৷ আরও আছে৷ গোবিন্দ ওস্তাদকে চেনো৷ বেচারা মিথ্যে খুনের মামলায় ফেঁসে গেছে৷ অথচ তা উচিত নয়৷ আসল খুনির উচিত নিজের দোষ স্বীকার করে নির্দোষ লোকটাকে খালাস করে দেওয়া৷'

সাতনার মুখ ফেটে পড়ছিল দুর্দান্ত রাগে৷ খুব কষ্টে নিজেকে সংযত রেখে বলল, 'আর কিছু?'

'হ্যাঁ৷ আর একটা কথা৷ তোমার যে-মেয়েটা হারিয়ে গিয়েছিল, আমি তার সন্ধান জানি৷ সে যে তোমারই মেয়ে তার প্রমাণও দিতে পারি৷'

আস্তে আস্তে, খুব আস্তে আস্তে সাতনার মুখে একটা পরিবর্তন ঘটতে লাগল৷ কর্কশ, নিষ্ঠুর ভয়ংকর মুখখানা যেন কোমল হতে লাগল৷ চোখ দুটো ভরে উঠল জলে৷ একটা দমকা শ্বাসের সঙ্গে অস্ফুট গলায় সে বলল, 'মিথ্যে কথা!' একটু থেমে আবার বলল, 'মিথ্যে কথা! তুই আমাকে ভোলাতে এসেছিস!'

'না সাতনা, তোমাকে ভোলানোর ক্ষমতা আমার নেই৷ এই দেখো-' বলে পিছন থেকে ডান হাত বের করে কিংকর তার বালাপোশের কোটের ভিতর দিকে হাত ভরে একখানা ফোটো বের করে আনল৷

সাতনা হাঁ করে চেয়ে দৃশ্যটা দেখে বলল, 'হাত খুলে ফেলেছ! তোমাকে বলেছিলাম না চালাকি করার চেষ্টা করলে-'

কিংকর অমায়িক একটু হেসে বলে, 'আমার হাত কিছুতেই বাঁধা থাকতে পারে

না, বুঝলে! আপনা থেকে খুলে বেরিয়ে আসে৷ যাকগে, আবার নাহয় বাঁধতে বলে

দাও৷'

সাতনা জানে, সে-চেষ্টা বৃথা৷ হাত বাড়িয়ে সে ফোটোটা নেয়৷ অবিশ্বাসের সঙ্গে চেয়ে থাকে ফটোটার দিকে৷ চোরকুঠুরিতে শুধু একটা ছোট্ট ঘুলঘুলি দিয়ে আসা আলোতেও ফটোর মেয়েটির মুখ দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায় সাতনা৷ তার মেয়ে চুরি যায় পাঁচ-ছ বছর বয়সে৷ এই মেয়েটির বয়স তেরো-চোদ্দো বছর৷ কী হুবহু মিল৷ তার মেয়েটা বেঁচে থাকলেও এই বয়সিই হওয়ার কথা৷ সে জিজ্ঞেস করল, 'এটা কতদিন আগেকার ফটো?'

'গত বছরের৷ তোমার মেয়ের বয়স এখন চোদ্দো বা পনেরো৷'

'আর কোনো প্রমাণ আছে?'

'আছে৷ তবে তা দিয়ে আর তোমার দরকার কী? আমার কথা বিশ্বাস করতে পার৷ এ তোমারই মেয়ে এবং সে বহাল তবিয়তে বেঁচেও আছে৷'

সাতনা ভালো করে কথা বলতে পারছিল না, বারবার ঢোঁক গিলছে৷ চোখে জল আসছে৷ অত বড়ো সা-জোয়ান লোকটার হাত দুটো কাঁপছে থরথর করে৷ সে জিজ্ঞেস করল, 'আমার মেয়ে কোথায়?'

'সেইটে এখন বলতে পারছি না৷'

'বলো!' বলে সাতনা প্রকাণ্ড দুটো হাত বাড়িয়ে চেপে ধরল কিংকরকে৷ একটা রামঝাঁকুনি দিয়ে বলল, 'শিগগির বলো৷ নইলে মেরে ফেলব৷'

কিংকর নিজের শরীরটাকে একটু মোচড় দিয়ে সরে গেল৷ তারপর বিদ্যুৎগতিতে হাতটা তুলে সাতনার ঘাড়ে হাতের চেটোর ধার দিয়ে একটা কোপ মারল৷

'আঁক' করে একটা শব্দ হল শুধু৷ তারপর হাতির মতো বিশাল শরীর নিয়ে সাতনা ঢলে পড়ল মেঝের ওপর৷

কিংকর ঘরের কোণে একটা জলের কুঁজো অনেকক্ষণ আগেই লক্ষ করেছে৷ এখন সেইটে তুলে এনে সাতনার চোখেমুখে জলের ছিটে দিতে লাগল৷

একটু বাদেই চোখ মেলে উঠে বসল সাতনা৷

কিন্তু এ এক অন্য সাতনা৷

৩০

ধীর গম্ভীর স্বরে সাতনা বলল, 'যে-হাত আমার গায়ে তুলেছ, সে-হাত তোমার শরীর থেকে কেটে ফেলা হবে৷'

কিন্তু সাতনা মুখে যা-ই বলুক, আর তার সেই ভয়ংকরতাও নেই৷ মুখটা কেমন ভোঁতা দেখাচ্ছে৷ চোখে একটা দিশেহারা ভাব৷ কিংকর একটু হেসে বলল, 'ভয় দেখাচ্ছ নাকি? তোমার আমার জীবন যেরকম, যাতে কাউকে কারও ভয় দেখিয়ে লাভ নেই৷ খামোকা চোখ রাঙিয়ে নিজের কাছে নিজেই হাস্যাস্পদ হচ্ছ৷ ভয় খাওয়ার হলে এতক্ষণে খেতাম৷'

সাতনাও সেটা ভালোরকম টের পাচ্ছে৷ কিংকর কিছুতেই ভয় পাচ্ছে না৷ তাই সাতনা খানিকটা চুপসে গিয়ে বলল, 'আমার মেয়ের ছবি যদি খাঁটি হয়ে থাকে, যদি জালজোচ্চুরি না করে থাক তবে এ-যাত্রায় তুমি প্রাণে বেঁচে যাবে৷ এখন বলো, আমার মেয়ে কোথায়৷'

কিংকরের মুখ থেকে এখনও হাসি মুছে যায়নি৷ সে মাথা নেড়ে বলল, 'ধীরে বন্ধু, ধীরে৷ অত তাড়া কীসের? তোমার শরীরে যে একটু নামমাত্র মায়াদয়া এখনও অবশিষ্ট আছে, তা ওই মেয়েটির জন্য, তা জানি৷ কিন্তু আমারও শর্ত আছে৷'

সাতনা থমথমে মুখে বলল, 'সেটা না-বোঝার মতো বোকা আমি নই৷ শর্তটা কী তা বলে ফেলো৷'

'এক, দলের যে মাথা, তার নাম আমাকে বলতে হবে৷'

'তার নাম জেনে কী হবে? ধরিয়ে দেবে?'

'সেটা পরে ঠিক করব৷ আগে নামটা তো জানি৷'

'আর কোনো শর্ত আছে?'

'আছে৷ তোমাকে দল ছাড়তে হবে৷'

সাতনা একটু ম্লান হেসে মাথা নাড়ল৷ 'তোমার শর্তগুলো শুনতে ভালো কিন্তু কাজের নয়৷ প্রথম কথা, দলের বড়ো সর্দারের নাম আমারও জানা নেই৷ দু-নম্বর কথা হল, দল ছাড়া অসম্ভব৷ এ-দলে ঢোকা যায়, বেরোনো যায় না৷'

কিংকর হাসিমুখে বলল, 'আমার তিন নম্বর শর্ত হল, কোনো নির্দোষকে সাজা দেওয়া উচিত নয়৷ তাই বেচারা গোবিন্দ মাস্টারকে খালাস করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে৷'

সাতনা মাথা নীচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, 'যদি এর কোনো শর্তই না মানি?'

কিংকর এবার হাসল না৷ মৃদু স্বরে বলল, 'তোমার যে-মেয়ে যাওয়ার পর তুমি মানুষ থেকে পশু হয়েছ, সেই মেয়ের খোঁজ জীবনেও পাবে না৷'

সাতনা স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ কিংকরের দিকে চেয়ে থেকে হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ তারপর কেমন ভ্যাবলার মতো বসে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগল৷ অনেকক্ষণ বাদে বলল, 'রাত দুটোর সময় আবার এই চোরকুঠুরিতে এসো৷ কথা হবে৷'

'কিন্তু বাইরে যে-সব যমদূত মোতায়েন আছে তারা আবার পিছু নেবে না তো?'

'বারণ করে দিচ্ছি৷ এখন তুমি স্বাধীন৷'

দু-জনে বেরিয়ে এল৷

সাতনার মাথা নীচু৷ ভাবছে৷ মাঝে মাঝে হারানো মেয়েটার কথা ভেবে চোখে জল আসছে তার৷ হাতের পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছছে মাঝে মাঝে, সাতনার চোখে জল! ব্যাপারটা তার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না৷

এই কিংকর নামে লোকটা কে, তা ভেবে সারাদিন রামুর মাথা গরম৷ গতকাল রাতে জঙ্গলের অন্ধকারে প্রথম দেখা! লোকটা তাদের ধরিয়ে দিল৷ কিন্তু আজ সকালে আবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে তাকে বাঁচাল৷ সাতনা যখন তাকে ডাকিয়ে নিয়ে লোকটাকে চিনতে পারে কি না জিজ্ঞেস করল, তখন তার স্পষ্টই মনে হল, সে কিংকরকে চেনে৷ কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারল না, কোথায় দেখেছে বা কবে৷

আজ সকালেই ডাকাতরা তার গলা কাটতে গিয়েছিল বটে, কিন্তু আজই আবার কী মন্ত্রে যেন তারা ভারি সদয় হয়েছে তার ওপর! সকাল থেকে কিছু খেতে দেয়নি৷ কিন্তু বেলা দশটা নাগাদ একজন নরম-সরম চেহারার ডাকাত এসে জামবাটি-ভরা সর-ঘন দুধ কলা আর নতুন গুড় দিয়ে মাখা চিড়ের ফলার খাওয়াল৷ তারপর ঘরের দরজা খুলে দিয়ে বলল, 'যাও খোকা, ঘুরে-টুরে বেড়াও গিয়ে৷ তোমাকে আর ঘরে আটকে রাখার হুকুম নেই৷'

রামু বেরিয়ে এল৷ চারদিকে আলো আর গাছপালা৷ মুক্ত বাতাস৷ বুক ভরে শ্বাস টানল সে৷ ডাকাতরা কেন সদয় হয়েছে তা বুঝতে পারল না৷

ছেড়ে দিলেও রামুর পিছু পিছু ছায়ার মতো একজন পাহারাদার রেখেছে এরা৷ ভাঙা প্রকাণ্ড বাড়িটার সব জায়গায় যাওয়া বারণ৷ লোকটা মাঝে মাঝে পিছন থেকে সাবধান করে দিচ্ছে, 'ওদিকে যেয়ো না খোকা৷ না না, ওই কুঠুরিতে উঁকি মেরো না৷'

ঘুরতে ঘুরতে নয়নদার সঙ্গেও দেখা হয়ে গেল রামুর৷ নয়নকাজল দিব্যি হাসিমুখে পিছন দিককার একটা বাগানে রোদে বসে গায়ে সর্ষের তেল মালিশ করতে করতে একজন রোগাপটকা পশ্চিমা ডাকাতের সঙ্গে ভাঙা হিন্দিতে কথা বলছিল৷ 'ছাপরা জিলা হাম খুব চিনতা৷ ওদিকে খুব ভালো দুধ মিলতা৷'

রামু চেঁচিয়ে ডাকল, 'নয়নদা৷'

নয়ন একগাল হেসে বলল, 'তোমাকেও ছেড়ে দিয়েছে? যাক বাবা! আমি তোমার কথাই ভাবছিলাম৷'

রামু কাছে গিয়ে বসে একটু নীচু স্বরে জিজ্ঞেস করে, 'আচ্ছা, কিংকর লোকটা কে বলো তো!'

নয়ন নিশ্চিন্ত গলায় বলে, 'সাংঘাতিক ডাকাত৷ এ সাতনার চেয়েও ভয়ংকর৷'

'তা তো বটে, কিন্তু তোমার চেনা চেনা লাগছে না?'

নয়নকাজল একটু ভেবে বলল, 'তুমি কথাটা বললে বলেই বলছি, আমারও মনে ওরকম একটা ভাব হয়েছিল৷ লোকটাকে যেন কোথায় দেখেছি৷ তারপর ভাবলাম, দেখলেও সে-কথা মনে না-রাখাই ভালো৷ লোকটা এক নম্বরের বিশ্বাসঘাতক৷ আমাদের কাল রাতে ধরিয়ে দিল৷ আর একটু হলেই পালাতে পারতাম৷'

রামু বিষণ্ণ মুখে বলে, 'পালিয়ে লাভটা কী হত? বাড়ি গিয়েও তো রক্ষা পেতাম না৷ তুমিও না, আমিও না৷'

নয়ন চিন্তিত মুখে বলে, 'তা বটে৷'

'লোকটা হয়তো আমাদের ভালোর জন্যই ধরিয়ে দিয়েছে৷ হয়তো এর পিছনে কোনো কারণ আছে৷ লোকটা জানত, পালিয়েও আমরা বেশিদূর যেতে পারব না৷ গেলেও বাঁচব না এদের হাত থেকে৷'

নয়ন খুব মিনমিন করে বলল, 'আমি অত ভেবে দেখিনি৷ কিন্তু এখন তুমি বলার পর দেখো ভয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে৷'

'কিন্তু আমার মনে হচ্ছে নয়নদা, কিংকর লোকটা আমাদের শত্রু নয়৷'

'না হলেই ভালো৷ ওরকম লোক যার শত্রু হবে, তার অনেক বিপদ৷'

দুপুরে স্নান করে রামু আর নয়ন একটা ছোটোখাটো ভোজ খেল আজ৷ নতুন একটা ঘরে খড়ের ওপর পাতা নরম বিছানায় দু-জনে শুয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়ে নিল অনেকক্ষণ৷ কাল রাতে অনিদ্রা গেছে৷ যখন উঠল, তখন বেলা ফুরিয়ে এসেছে৷ রামু দেখল তার বালিশের পাশে একটা ছোট্ট চিরকুট এক টুকরো পাথর চাপা দেওয়া৷ তাতে লেখা, 'আজ রাতে সজাগ থেকো৷'

আশা আর ভরসায় রামুর বুক ভরে উঠল৷ সে নয়নকাজলকে ঠেলে তুলে দিল৷ তারপর চিরকুটটা দেখিয়ে বলল, 'আমার মনে হয় এটাও সেই কিংকরের কাজ৷'

ঠিক রাত দুটোয় সাতনা চোরকুঠুরিতে হাজির হল৷ সারাদিন কেঁদে কেঁদে তার চোখ লাল৷ মুখের চামড়া ঝুলে পড়েছে কিছুটা৷ বেশ নড়বড়ে আর বুড়ো দেখাচ্ছে দানবের মতো লোকটাকে৷

চোরকুঠুরিতে কোনো আলো নেই৷ জমাট অন্ধকার৷ কিন্তু সাতনা মৃদু একটু শ্বাসের শব্দ শুনে বুঝল, কিংকরও হাজির৷

গলা খাঁকারি দিয়ে সাতনা ডাকে, 'কিংকর৷'

'বলো৷'

'এখানে নয়৷ বড়ো সর্দারের হাজারটা চোখ হাজারটা কান৷ চলো, জঙ্গলের দিকে যাই৷'

'তাহলে চলো৷'

দু-জনে নিশব্দে বেরিয়ে পড়ে৷ তারপর আগে সাতনা এবং তার পিছনে কিংকর ছায়ার মতো জঙ্গলে গিয়ে ঢোকে৷

নিস্তব্ধ জঙ্গলাকীর্ণ একটা জায়গায় এসে দু-জনে দাঁড়ায়৷

সাতনা বলে, 'আমি রাজি৷'

'ভালো করে ভেবে বলো৷'

'ভেবেই বলছি৷ দুনিয়ায় ওই মেয়েটা ছাড়া আমার কেউ নেই৷ মেয়েটা চুরি যাওয়ার পর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমার মাথায় খুন চেপেছিল৷ সার্কাস ছেড়ে ডাকাতের দলে নাম লিখিয়েছিলাম৷ আজ সারাদিন ভেবে দেখলাম, মরতে একদিন হবেই৷ তার আগে যদি সুযোগ পাই, মেয়েটার একটা হিল্লে করে দিয়ে যাই৷ একবার তাকে চোখের দেখাও তো দেখতে পাব৷'

'তা পাবে৷'

'যখন ছোট্টটি ছিল, তখন সারাদিন আমার বুকের সঙ্গে লেগে থাকত মেয়েটা৷ মা-মরা মেয়ে৷ তাকে বুকে করে সার্কাসের সঙ্গে দেশ-বিদেশ ঘুরতাম৷ মেয়েটাই ছিল আমার জীবন, আমার শ্বাসের বাতাস আমার নয়নের মণি৷'

'জানি সাতনা৷'

'সকলেই জানত৷ জানত, সাতনার মেয়েই সাতনার সর্বস্ব৷'

'এবার বড়ো সর্দারের নামটা বলো সাতনা৷' সাতনা একটু চমকে উঠল৷

৩১

সাতনার মতো ডাকাবুকো লোককে আঁতকে উঠতে দেখে একটু হাসল কিংকর৷ মোলায়েম গলায় জিজ্ঞেস করল, 'ভয় পাচ্ছ?'

সাতনা চারদিকে ভালো করে চেয়ে দেখল৷ তারপর ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, 'পাচ্ছি৷ আমার আয়ু আর বেশিদিন নয়৷ আজ অবধি সর্দারের চোখকে কেউ ফাঁকি দিতে পারেনি৷ আমিও পারব না৷ তবু জেনেশুনে যে হাঁড়িকাঠে গলা দিচ্ছি, তার কারণ আমার কাছে আর নিজের প্রাণের দাম নেই৷ শুধু একটাই সাধ৷ মরার আগে যেন মেয়েটার মুখ একবার দেখে যেতে পারি৷'

কিংকর এ-কথার জবাব দিল না চট করে৷ কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল, 'তোমার কি ধারণা, সর্দার তোমার ওপর নজর রাখছে?'

সাতনা মাথা নেড়ে বলল, 'জানি না৷ কিন্তু মনে মনে যেই ঠিক করেছি যে, সর্দারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করব, তখনই মনে ভয়টা এল৷ কোন মানুষের মনে কী আছে তা সর্দার মুখ দেখলেই টের পায়৷'

কিংকর মৃদুস্বরে বলল, 'মানুষের মুখে যে তার মনের কথা লেখা থাকে৷ সর্দার তো আর অন্তর্যামী ভগবান নয়, সে শুধু তোমাদের চেয়ে আর এক ডিগ্রি বেশি চালাক৷ এ-লাইনে আমার গুরু হল শংকর মাঝি৷ সে তোমাদের মতো নোংরা ডাকাত নয়৷ টাকা-পয়সা সোনাদানায় লোভ নেই৷ সারাদিন জপ-তপ নাম-ধ্যান নিয়ে থাকে৷ লোকের ওপর কখনো খামোখা হামলা করে না৷ শুধু অন্যায় দেখলে রুখে দাঁড়ায়৷ লোভ-লালসা নেই বলে তার মনটাও পরিষ্কার৷ চোখটাও পরিষ্কার৷ তোমাদের সর্দারের চেয়ে লোকের মন বোঝবার ক্ষমতাও তার বেশি৷ শংকর মাঝি একবার আমাকে বলেছিল, পাপী তাপী খুনে গুন্ডা বা বদমাশদের ফাঁসিকাঠে ঝোলালে বা জেলে ভরে রাখলেই কি আর তাদের ঠিক ঠিক সাজা হয় রে? লোকটার মনে অনুতাপ জাগাতে পারলে বরং সেইটেই ঠিক শাস্তি৷ একটা ডাকাতকে যদি ভালো করে তুলতে পারিস তবে দেখবি তার মতো মানুষই হয় না৷'

সাতনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, 'তুমি শংকর মাঝির দলে কতদিন ছিলে?'

'বছর-দুই৷ তার কাছে অনেক কিছু শিখেছি৷'

সাতনা একটা গভীর শ্বাস ফেলে বলে, 'অনেক কিছু শিখেছ বটে, কিন্তু আগুন নিয়ে এই খেলাটা না খেললেও পারতে৷ আমার মেয়ের খবর এনে আমাকে দুর্বল করে ফেলেছ, কিন্তু তা বলে তো আর বড়ো সর্দারের মন গলবে না৷ তার হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর মন্ত্রটা কে তোমাকে এখন শেখাবে?'

কিংকর নির্ভীক গলায় বলে, 'বড়ো সর্দার ভগবান নয়, আগেই বলেছি৷ যত ক্ষমতাই থাক, তারও কিছু দুর্বলতা আছে, ভয় আছে৷ একবার তার মুখোশটা খুলতে দাও, তখন দেখবে৷'

মাথা নেড়ে সাতনা বলে, 'মুখোশ বা মুখ কোনটা তা আমিও জানি না৷ শুধু জানি, সর্দার মস্ত তান্ত্রিক৷ মারণ উচাটন বশীকরণ সব জানে৷ মানুষের মনের কথা টের পায়৷ আর জানি, পুলিশ বা গবর্মেন্টের সাধ্য নেই যে তাকে ধরে৷ তুমি তার ডেরায় ঢুকে মস্ত ভুল করেছ৷ তুমি পুলিশের লোক না গবর্মেন্টের চর তা জানি না৷ শুধু জানি, যাই হয়ে থাকো, সর্দারের হাত থেকে রেহাই পাবে না৷'

কিংকর হাত নেড়ে প্রসঙ্গটা উড়িয়ে দিয়ে বলল, 'আমার একটা শর্ত ছিল, নির্দোষ গোবিন্দ মাস্টারকে খুনের দায় থেকে রেহাই দিতে হবে৷ সেটা ভেবে দেখেছ?'

সাতনা বিষাক্ত গলায় বলল, 'আমাকে তার জন্য কী করতে হবে৷'

'দায়টা তোমাকে নিজের ঘাড়ে নিতে হবে৷'

'নিতে আপত্তি নেই৷ কিন্তু যে মামলা বহুকাল আগে চুকেবুকে গেছে, আসামির ফাঁসির হুকুম পর্যন্ত হয়ে গেছে তা আবার কেঁচে গণ্ডুষ করতে আদালত চাইবে কি? তা ছাড়া আমি স্বীকার করলেই তো হবে না, আদালত চাইবে প্রমাণ৷ তার ওপর আসামি জেলহাজত থেকে পালিয়েছে, সেটাও তো মস্ত অপরাধ৷ পুলিশ তাকে এত সহজে ছাড়বে না৷'

'সে আমরা বুঝব৷ তুমি তোমার কাজটুকু করলেই হবে৷'

'করব৷ এখন আমাকে আমার মেয়ের কাছে নিয়ে চলো৷'

ট্যাঁক থেকে একটা মস্ত পকেটঘড়ি বের করল কিংকর৷ ঝুঁঝকো অন্ধকারে অনেকক্ষণ তীক্ষ্ণ নজরে চেয়ে থেকে সময়টা ঠাহর করল৷ তারপর বলল, 'আর আধঘণ্টা৷ তারপর কিছু কাজ সেরে বেরিয়ে পড়ব দু-জনে৷'

সাতনা সন্ত্রস্ত হয়ে বলে, 'সময় দেখলে কেন? কীসের আধঘণ্টা?'

কিংকর মৃদুস্বরে বলল, 'তোমার যেমন দলবল আছে আমারও তেমনি একটা ছোট্ট দল আছে৷ তাদের আজ রাত্তিরে এখানে পৌঁছোনোর কথা৷'

সাতনা অস্ফুট একটা শব্দ করে দু-হাতে মুখ ঢাকল৷ মিনিট খানেক বাদে মুখ তুলে বলল, 'তার মানে কী? তুমি কি লড়াই করতে চাও?'

কিংকর মাথা নেড়ে বলল, 'না৷ লড়াই হবে না৷ তোমার যে কয়জন স্যাঙাত আছে তাদের ঠেকিয়ে রাখবে তুমি৷ আমরা বিনা লড়াইয়ে যুদ্ধ জিতে তোমাদের বেঁধে নিয়ে যাব৷ আর তাহলে বড়ো সর্দারের মনে তোমার সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ আসবে না৷'

'বড়ো সর্দারকে কি ছেড়ে দেবে তাহলে?'

কিংকর অন্ধকারেও একটু হাসল৷ 'না৷ বড়ো সর্দারের জন্য আমি তো রয়েছি৷'

সাতনা বলল, 'কিন্তু বড়ো সর্দার তো নেই এখানে৷'

'কে বলল নেই?' কিংকর আবার একটু হাসে৷ মৃদুস্বরে বলে, 'আমি যে বড়ো সর্দারের গায়ের গন্ধ পাচ্ছি৷'

আর ঠিক এই সময়ে একটা মস্ত কন্টিকারির ঝোপের ওপাশ থেকে একটা ভারী পায়ের শব্দ আস্তে আস্তে দূরে সরে যেতে লাগল৷

সাতনা পাথর হয়ে বসে থাকে৷ কিছুক্ষণ শ্বাস ফেলতে পর্যন্ত ভুলে যায়৷

কিংকর মৃদু হেসে বলে, 'কী হে, বিশ্বাস হল?'

সাতনার মুখে বিস্ময়ে কথা এল না৷ শুধু মাথা নাড়ল৷

কিংকর স্বাভাবিক গলাতেই বলে, 'তোমার মতো সর্দারও আমাকে বিশ্বাস করেনি৷ সারাক্ষণই আবডাল থেকে নজর রেখেছিল৷'

'তবু ভয় পাচ্ছ না?'

'না৷ কিন্তু আমার আর সময় নেই৷ তুমি ওঠো, স্যাঙাতদের গিয়ে বলো, গাড্ডায় একটা ছোটোখাটো হামলা হবে৷ তারা যেন বাধা না দেয়৷ বাধা দিলে রক্তের গাং হয়ে যাবে৷'

সাতনা উঠল৷ অসহায়ভাবে বলল, 'আর বড়ো সর্দার?'

'তার কথা আমার খেয়াল আছে৷ তুমি ভেবো না৷ যাও৷'

সাতনা দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে ভাঙা কেল্লার দিকে এগোতে লাগল৷

তার ছায়ামূর্তির দিকে ক্ষণকাল চেয়ে রইল কিংকর৷ তারপর ট্যাঁকঘড়িটা আর একবার দেখে নিয়ে খুব টানা নীচু পর্দায় একটা শিস দিল৷ এমনই সে শব্দ যে, জঙ্গলের অন্যান্য শব্দের মধ্যে ঠিক ঠাহর হয় না৷

শিসটা শেষ হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে একটা ঘুঘুর ডাক ভেসে এল কাছ থেকে৷ নিশ্চিন্তির শ্বাস ফেলল কিংকর৷ তার দল এসে গেছে৷

কিংকর উঠে চকিত পায়ে কেল্লার দক্ষিণ কোণের দিকে চলে এল৷ ভাঙা ইঁদারার পাশে দু-টি ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে৷

কিংকর সাবধানি গলায় ডাকল, 'রামু৷'

'আজ্ঞে৷'

'এসো৷' বলে কিংকর হাত বাড়িয়ে রামুর একটা হাত ধরে৷ রামুর পিছনে নয়নকাজল দাঁড়িয়ে ছিল৷ তার হাতে কাকাতুয়ার দাঁড়৷ কাঁপা কাঁপা গলায় সে জিজ্ঞেস করল, 'আবার আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? সেদিনকার মতো নতুন কোনো বিপদে পড়ব না তো?'

কিংকর একটু হেসে বলে, 'না৷ বিপদের মধ্যেই তো আছি৷ বিপদকে ভয় করলে কি চলে?'

ধীরে ধীরে তিন জন গভীর জঙ্গলের দিকে এগোতে থাকে৷ অন্যদিক দিয়ে দশ-বারোটা ছায়ামূর্তি দ্রুত পায়ে নিঃশব্দে কেল্লায় গিয়ে ঢোকে৷

একটা বাঁশঝাড় গোল হয়ে একটা চত্বরকে ঘিরে রেখেছে৷ বাইরে থেকে ভিতরকার ফাঁকা জায়গাটা বোঝা যায় না৷ কিংকর সেইখানে এনে রামু আর নয়নকাজলকে দাঁড় করাল৷ বলল, 'আমার একটা কাজ বাকি আছে৷ সেইটুকু সেরেই আসছি৷'

নয়নকাজল উদ্বেগের গলায় বলে, 'যদি কোনো বিপদ হয় এর মধ্যে?'

'তাহলে, ভগবান দু-খানা পা তো দিয়েছেন, দৌড় মেরো৷'

কিংকর আর দাঁড়ায় না৷ অতি দ্রুত পায়ে সে দৌড়োতে থাকে কেল্লার দিকে৷ যেতে যেতেই দেখে, দশ-বারোজন লোক পাঁচ-সাতজন লোককে পিছমোড়া করে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে৷ কিন্তু সেদিকে আর ভ্রূক্ষেপ করে না কিংকর৷

কেল্লায় ঢুকে সে জোর কদমে ছুটে একদম বায়ুকোণে চলে আসে৷ পুরোনো ভাঙা খিলান গম্বুজের ভিতর একটা মিনার৷ তাতে ঢোকার কোনো রাস্তা নেই৷ কিন্তু কিংকর দিনের বেলায় লক্ষ করেছে এই মিনারের গায়ের কারুকাজ একটু অন্যরকম৷ খাঁজগুলো কিছু বেশি গভীর৷

চারদিকটা একবার দেখে নিয়ে কিংকর বানরের মতো সেই খাঁজগুলোয় হাত আর পা রেখে উঠে যেতে থাকে ওপরে৷

কিন্তু বেশিদূর উঠতে হয় না তাকে৷ ওপর থেকে একটা ঝাঁঝালো টর্চের আলো এসে পড়ে তার ওপর৷ আর সেই সঙ্গে একটা গুলির শব্দ৷

৩২

গুলিটা একেবারে চুল ঘেঁষে বেরিয়ে গেছে৷ প্রাণের ভয়ে অনেকটা উঁচু থেকেই কিংকর লাফ নিয়ে নীচে পড়ল৷ একটা ভেঙে পড়া থামের আড়ালে গা ঢাকা দিতে যাবে, তার আগেই পরপর আরও দুটো গুলি৷ তবে মিনারের মাথা থেকে এত দূরের পাল্লায় রিভলবারের গুলি ততটা বিপজ্জনক নয়৷ রাইফেল হলে এতক্ষণে কিংকর ছ্যাঁদা হয়ে যেত৷

থামের আড়াল থেকে মিনারের মাথাটা লক্ষ করল কিংকর৷ অন্ধকারে ভালো দেখা যায় না৷ শুধু বোঝা যায়, একটা মস্ত মানুষের ছায়ামূর্তি একটু ঝুঁকে নীচের দিকে নজর রাখছে৷ টর্চটা মাঝে মাঝে ঝুঁকিয়ে সে চারদিকে আলো ফেলছে৷

হঠাৎ কিংকরের কাঁধে একটা ভারী হাত আলতো করে রাখল কেউ৷ একটু চমকে উঠেছিল কিংকর৷ পিছন থেকে একটা ভারী গলা তার কানে কানে বলল, 'সর্দারকে অত সহজে বাগে আনতে পারবে না৷'

'সাতনা! তুমি এখনও যাওনি!'

'আমি গেলে সর্দারকে লড়াই দেবে কে? একা তোমার কর্ম নয়৷'

'মিনারের ওপর লোকটাই কি সর্দার?'

'হ্যাঁ৷ সর্দারের আজ এখানে থাকার কথা নয়৷ কিন্তু কিছু একটা আঁচ পেয়ে সর্দার আবার ফিরে এসেছে৷ এখানে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই৷ আমার সঙ্গে এসো৷'

'কোথায়?'

'কাকাতুয়ার কাছে৷ একমাত্র কাকাতুয়াটাই জানে ওই মিনারে ঢোকার গুপ্ত পথ৷ আমরা অনেকদিন ধরে তাকে দিয়ে বলানোর চেষ্টা করছি কিন্তু পাখিটা বলেনি৷ এখন শেষ চেষ্টা করে দেখো, যদি তাকে দিয়ে কথা বলাতে পার৷'

'কিন্তু সর্দার যদি পালায়?'

'গুপ্তধন না নিয়ে সর্দার পালাবে না৷ ও এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে৷ কিন্তু গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া খুবই কঠিন৷ মই লাগিয়ে আমরা প্রত্যেকটা মিনারের মাথায় চড়েছি৷ আশ্চর্য এই যে, তিনটে মিনারের মাথায় গুপ্ত সুড়ঙ্গের মুখও মিলেছে৷ সেই পথ ধরে আমরা পাতালেও নেমেছি৷ কিন্তু বৃথা৷ গোলকধাঁধার মতো কিছু গলিঘুঁজি ছাড়া আর কিছু পাইনি৷ এই মিনারের সুড়ঙ্গটাও তাই৷ তবু সর্দার শেষ চেষ্টা করতে ওখানে উঠেছে৷ সহজে পালাবে না৷'

কিংকর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ লোভই মানুষের সবচেয়ে বড়ো শত্রু৷ সে বলল, 'কাকাতুয়াটা রামু আর নয়নকাজলের কাছে আছে৷ চলো৷'

বাঁশবনে ঘেরা নিরাপদ জায়গাটায় পৌঁছে তারা দেখল, দু-জন জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে৷ দাঁড়ে বসে ঝিমোচ্ছে কাকাতুয়া৷ টর্চের আলো চোখে পড়তেই ডানা ঝাপটে বলে উঠল, 'মেরো না, মেরো না আমাকে বিশু৷'

সবাই পাখিটার কাছে গুপ্তধনের সন্ধান জানতে চেয়েছে৷ পাখিটা বলেনি৷ কিংকর এবার পাখিটার সামনে বসে খুব আদরের গলায় বলল, 'না না, বিশু তোমাকে মারবে না৷'

পাখিটা ডানা ঝাপটে বলে, 'আলমারিতে টাকা নেই৷ টাকা আছে-৷'

কিংকর চাপা গলায় বলে, 'বোলো না, বোলো না, টাকার কথা বোলো না৷'

পাখিটা আবার ডানা ঝাপটায়৷ তারপর তীক্ষ্ণস্বরে বলে, 'তিন নম্বর মিনার৷ পাথর সরাও, পাথর সরাও৷'

'পাথর নেই৷'

'তলার দিকে৷ পাথরে চিহ্ন আছে৷'

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলতে পারল না৷ তারপর কিংকর উঠে দাঁড়াল৷

সাতনা বলল, 'তিন নম্বর মিনারের মাথাতেই এখন সর্দার থানা গেড়েছে৷'

কিংকর মৃদু হেসে বলে, 'মিনারে চড়তে হবে না৷ পাখি কী বলল শুনলে তো৷ মিনারের গোড়ায় আর একটা পথ আছে৷ চলো! যদি পার একটা শাবল নিয়ে এসো চট করে৷'

দু-জনে যখন আবার মিনারটার কাছে এল, তখন ওপরটা অন্ধকার৷ কোনো ছায়ামূর্তি দেখা যাচ্ছে না৷

মিনারের গোড়ার দিকে চৌকো চৌকো পাথর গাঁথা৷ তার ওপর নকশা৷ টর্চ জ্বেলে কিংকর পরীক্ষা করে দেখল, সব নকশাই একরকম৷ কোনটা নির্দিষ্ট পাথর এবং তাতে কী চিহ্ন আছে তা বোঝা মুশকিল৷ কিংকর হাঁটু গেড়ে বসে তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকে৷ বহু পুরোনো আমলের নকশাগুলো সব ক্ষয় হয়ে এসেছে৷ তবু কিংকর বুঝবার চেষ্টা করে৷

আচমকা ওপর থেকে আবার এক ঝলক টর্চের আলো এসে পড়ে৷ সঙ্গে সঙ্গে গুলির আওয়াজ৷ দু-জনের খুব কাছাকাছিই গুলি দুটো মাটিতে গেঁথে যায়৷ সাতনা অন্ধকারে কী একটা জিনিস মাথার ওপর তুলে ধরে৷ কিংকর তাকিয়ে দেখে, মস্ত একটা লোহার ঢাল৷ ছাতার মতো বড়ো৷ পুরোনো আমলের ভারী জিনিস দেখে একটু হাসে সে, সাতনার বুদ্ধি আছে৷

ওপর থেকে পর পর আরও দশ-বারোটা গুলি ছুটে আসে৷ দু-চারটে টকাটক ঢালের ওপরও এসে পড়ে৷

সাতনা চাপা গলায় বলে, 'সর্দার নেমে আসছে মনে হয়৷ তাড়াতাড়ি করো৷'

কিংকর নিশ্চিন্ত গলায় বলে, 'আমরা দু-জন, ও একা৷ ভয় কী?'

সাতনা একটু মৃদু হেসে বলে, 'সর্দারকে চেনো না তাই বলছ৷ দু-দশ জনের মহড়া নেওয়া সর্দারের কাছে জলভাত৷ আমার এই লোহার মতো পাঞ্জা একবার সর্দার একটু চেপে ধরেছিল৷ তখনই বুঝেছিলুম, এর সঙ্গে ইয়ার্কি নয়৷'

কিংকর এসব কথায় কান দেয় না৷ মন দিয়ে খুঁজতে থাকে৷ অনেক নিরিখ-পরখ করে তার মনে হয়, একটা পাথরের একটা কোনায় যেন খুব অস্পষ্ট একটা তীরের চিহ্ন আছে৷ খুবই অস্পষ্ট আন্দাজ৷ তবু এখন অন্ধকারে ঢিল ছোড়া ছাড়া উপায়ও তো নেই৷ শাবলটা পাথরের খাঁজে ঢুকিয়ে গায়ের সবটুকু জোর দিয়ে চাড় দিতে লাগল সে৷

ঠিক এই সময়ে হাত দশেক ওপর থেকে সর্দারের রিভলবার দু-ঝলক আগুন ওগরায়৷ এখন এত কাছ থেকে তার নিশানা ভুল হয় না৷ ঢাল ঘেঁষে দুটো গুলিই কিংকরের পায়ের কাছে গেঁথে যায় মাটিতে৷

কিংকর মুখ তুলে সাতনাকে বলে, 'হাঁদার মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন? পালটা গুলি চালাও৷'

সাতনা মাথা নেড়ে বলে, 'তা হয় না৷ ভালো হোক মন্দ হোক, সর্দার আমার গুরু৷ তাকে মারতে পারব না৷'

কিংকর হাত বাড়িয়ে বলে, 'তবে আমাকে অস্তরটা দাও৷'

'তাও হয় না৷ আমার অস্ত্র দিয়ে ওকে মারা চলবে না৷'

'তা বলে ওই পাষণ্ডটার হাতে মরবে নাকি?'

'আমার চেয়ে সর্দার তো বেশি পাষণ্ড নয়৷ দু-জনেই সমান পাপী, তাহলে কে কার বিচার করবে বলো!'

ঢালের আড়াল থেকে খুব সাবধানে মুখ বের করে কিংকর ওপরের দিকে চেয়ে দেখল একটু৷ প্রকাণ্ড একটা ছায়ামূর্তি প্রায় বাদুড়ের মতো ঝুলে ঝুলে নেমে আসছে৷ মিনারের অগভীর খাঁজে স্রেফ আঙুলের সাহায্যে শরীরের ভার নিয়ে নেমে আসা অত্যন্ত কঠিন কাজ৷ এ কাজ পারে সার্কাসের বাজিকররা৷ সর্দার নামছেও বেশ তাড়াতাড়ি৷ একবার থেমে একটা হাত ঘুরিয়ে নীচের দিকে তাক করল যেন৷ সাঁত করে ঢালের আড়ালে মাথা টেনে নেয় কিংকর৷ আর সঙ্গেসঙ্গে একটা গুলি এসে মাটি ছিটকে দেয় খানিকটা৷ একটা রিভলবারে এত গুলি থাকার কথা নয়৷ কিংকর অনুমান করল, সর্দারের কোমরে অন্তত গোটা চারেক রিভলবার আছে৷ একটার গুলি ফুরোলে আর একটা চালাচ্ছে৷

শাবলে আর একটা চাড় দিতেই পাথরটা নড়ে উঠল৷ শাবল টেনে নিয়ে পাথরের অন্য ধারে ঢুকিয়ে আবার চাড় দেয় কিংকর৷ পাথরটা আলগা হয়ে ঢকঢক করে নড়ে৷ শাবল ফেলে দু-হাতে মস্ত পাথরের চাঁইকে ধরে টান দেয় কিংকর৷

ধড়াম করে পাথরটা খসে পড়ে মাটিতে৷ আর সেই মুহূর্তে প্রকাণ্ড বাঘের মতো সর্দারও লাফ দিয়ে নামে নীচে৷ নেমেই রিভলবার তুলে বিকট গলায় হাঁক দেয়, 'খবরদার প্রাণে বাঁচতে চাস তো পালা৷ মাত্র দশ সেকেন্ড সময় দেব৷ পালা!'

ঢালের নিরাপদ আড়ালে থেকেও সেই স্বরে একটু কেঁপে ওঠে সাতনা৷ কিন্তু কিংকর কাঁপে না৷ পাথরটা হঠাৎ খসে আসার ফলে টাল সামলাতে না পেরে সেও পড়ে গিয়েছিল মাটিতে৷ কিন্তু খাড়া হওয়ার কোনো চেষ্টা না করে সে নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে মিনারের আড়ালে সরে গেল৷ সর্দার বোকা নয়৷ দশ দিকে তার চোখ ঘোরে৷ তবু কিংকর শেষ একটা চেষ্টা করতে চায়৷ লোভে আর উত্তেজনায় এখন হয়তো সর্দারের মাথার ঠিক নেই৷

সর্দার গম্ভীর গলায় বলে, 'সাতনা, পিস্তল ফেলে দে৷'

সাতনা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, 'সর্দার, তোমাকে গুরু বলে মানি৷ কিন্তু জান নিয়ে টানাটানি হলে আমাকেও অস্ত্র ধরতে হবে৷'

সর্দার একটা পেল্লায় মাটি কাঁপানো ধমক দিয়ে বলে, 'চোপ শয়তান৷ সর্দারের পিছন থেকে ছোবল মারতে চেয়েছিলি, তার সাজা কী জানিস?'

'জানি৷'

'সেই ছুঁচো কিংকরটা কোথায়?'

'আমার সঙ্গেই আছে৷'

'যদি নিজের ভালো চাস তো সরে যা৷ আগে ওটাকে খুন করব৷ তোর বিচার তার পরে৷'

সাতনা নরম গলায় বলল, 'শোনো সর্দার৷ তোমাকে আমি-তোমাকে আমি এমনিতে মারতে পারি না৷ সেটা অধর্ম হবে৷ তবে যদি একই জমিতে দাঁড়িয়ে ভগবানের আকাশের নীচে আমাদের মারার চেষ্টা করো, তাহলে কিন্তু গুলি তোমার দিকেও ছুটবে৷ রিভলবার আমার হাতেও তৈরি৷'

সর্দার একটু চুপ করে থেকে এক পর্দা গলা নামিয়ে বলে, 'মেয়ের কথা ভেবে তুই দুর্বল হয়ে পড়েছিলি৷ তোর মাথা গুলিয়ে গেছে৷ সেইজন্য তোকে আমি এবারের মতো মাপ করে দিচ্ছি৷ একটা কথা মনে রাখিস, কাছেপিঠের এক-শো গাঁয়ে আমার চর আছে৷ তোর মেয়ে যদি বেঁচে থাকে, তবে তাকে আমি খুঁজে দেব৷ ভাবিস না৷'

হামাগুড়ি দিয়ে মিনারের ও-পিঠে চলে এসেছে কিংকর৷ সর্দারের পিছন দিকে মাত্র হাত-পাঁচেকের মধ্যে এসে থেমেছে সে৷ অপেক্ষা করছে৷

সর্দার সাতনার দিকে এক-পা এগিয়ে গেল৷ বলল, 'সাতনা, এখনও বলছি, ফিরে আয় আমার দিকে৷ গুপ্তধনের পথ মিলেছে৷ দু-জনে মিলে ভাগ করে নেব৷ আর উঞ্ছবৃত্তি করতে হবে না৷'

সাতনা এক-পা পিছু হটে বলে, 'দল ভেঙে দেবে?'

'দিতেই হবে৷ ডাকাতরা চিরকাল ডাকাত থাকে না৷ দুনিয়ার নিয়মে ভোল পালটাতে হয়৷'

সাতনা ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলে, 'তুমি ভোল পালটাতে পার সর্দার, কারণ তোমার আসল পরিচয় আজও কেউ জানে না৷ কিন্তু আমরা দাগি লোক, আমরা ভোল পালটাতে চাইলেও পারব না৷'

অসাবধানে সাতনা ভারী ঢালটা এক হাত থেকে অন্য হাতে নিতে গিয়েছিল৷ পলকের সেই অসতর্কতাই কাল হল তার৷ সর্দারের রিভলবার গর্জে উঠল৷ একটা নয়, দু-হাতে দুটো৷

'ঃআ!' বলে চেঁচিয়ে সাতনা উবু হয়ে বসে পড়ল মাটিতে৷ ঢালটা ছিটকে গেছে একধারে৷ আর আড়াল নেই৷

সর্দার রিভলবার তুলে ভালো করে নিশানা করছিল৷ আর তখনই তার ঘাড়ে চিতাবাঘের মতো লাফিয়ে পড়ল কিংকর৷

৩৩

কিংকর ঝাঁপিয়ে পড়ল বটে কিন্তু সর্দারকে নাগালে পেল না৷ সর্দার তো সোজা লোক নয়, সাতনার মতো দানবও তাকে খামোখা সমঝে চলে না৷ পিছন দিকে যেন-বা সত্যিই তার আরও দুটো চোখ আছে৷ কিংকরও ঝাঁপ দিয়েছে, তৎক্ষণাৎ সর্দারও তড়িৎগতিতে সরে গেছে৷ কিংকর পড়ল মাটিতে, মুখ থুবড়ে৷

সর্দার তার রিভলবার সোজা কিংকরের মাথায় তাক করে সাতনাকে বলল, 'তোর অস্ত্র ফেলে দে৷ নইলে তোর এই প্রাণের ইয়ারকে শেষ করে দেব৷'

সাতনা কিংকরের অবস্থাটা দেখল৷ বোকার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে পস্তাচ্ছে৷ কিংকর সর্দারের হাতে মারা পড়লে সাতনার শোক করার কিছু নেই৷ কিন্তু ভয় একটাই৷ কিংকর মরলে জীবনেও আর মেয়েটার খোঁজ পাওয়া যাবে না৷ সাতনার এখন ধ্যানজ্ঞান তার মেয়ে৷ একবার তাকে চোখের দেখা দেখতেই হবে৷ তারপর মরে গেলেও দুঃখ নেই৷ কিন্তু এখন যে সংকটে তারা রয়েছে তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার আশা দেখছে না সাতনা৷ সর্দারের হাতে দু-জনকেই না মরতে হয়৷

সাতনা জানে, সর্দারকে গুলি করার উপায় নেই৷ এখন আর গুরু বলে সর্দারকে খাতির না করলেও চলে৷ কারণ, সর্দার বিনা কারণে তার দিকে গুলি চালিয়েছে৷ এখন উলটে গুলি চালালে সাতনার অপরাধ হয় না৷ কিন্তু তাও সম্ভব নয়৷ একটু নড়লেই কিংকরের মাথাটা সর্দারের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাবে৷ আর অস্ত্র ফেলে দিলেও যে রেহাই পাওয়া যাবে তা নয়৷ সর্দার দু-জনকেই মারবে৷ সুতরাং এই শীতেও সাতনা ঘামতে লাগল৷

সর্দার দুম করে একটা গুলি চালিয়ে দিল৷ কিংকরের মাথার কাছটায় মাটি ছিটকে গেল খানিকটা৷ একটু হেসে সর্দার বলে, 'এখনও ভেবে দেখ সাতনা, খুব বেশি সময় পাবি না৷ পরের গুলিটা ওর খুলি ফাটিয়ে দেবে৷'

সর্দারের মস্ত টর্চের আলো অনেকটা ছড়িয়ে পড়েছে কিংকরের চারধারে৷ সেই আলোয় সাতনাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ সাতনার আর সর্দারের মাঝখানে কেবল একটা বেঁটে কামিনীঝোপ৷ সাতনা ক্ষীণ স্বরে বলল, 'দিচ্ছি৷'

কিংকরের নড়াচড়ার নাম নেই৷ এমন ভঙ্গিতে শুয়ে আছে নিশ্চিন্তে যেন-বা একটু বাদেই ওর নাকের ডাক শোনা যাবে৷ অসহায় সাতনা তার আগ্নেয়াস্ত্রটা সর্দারের পায়ের কাছে ছুড়ে ফেলে দিল৷

বেচারা! প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই রিভলবার থেকে আগুন ঝিকিয়ে ওঠে৷ সাতনা তার পাঁজর চেপে ধরে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে৷ সর্দারের রিভলবারের নল চকিতে কিংকরের দিকে ফেরে৷

চোখে পলক ফেলার মতো একটুখানি দেরি হলে হয়তো কিংকর বেঁচে থাকত না৷ কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে নিভুÍল নিশানায় একটা ইট সাঁ করে এসে সর্দারের কপালে লাগে৷ সর্দার থমকে যায়৷ বাঁ-হাতখানা কপালে চেপে ধরে৷ কিন্তু পড়েও যায় না, মূর্ছাও হয় না৷

ততক্ষণে কিংকর উঠে দাঁড়িয়েছে৷ খুব-একটা তাড়াহুড়ো করল না সে৷ শাবলটা কুড়িয়ে নিল শান্তভাবে৷ তারপর সর্দারের ডান হাতের কবজিতে আলতোভাবে মারল৷ রিভলবারটা পড়ে গেল৷ দু-পা এগিয়ে কিংকর সর্দারের মুখে একখানা ঘুসি চালাল৷

সর্দার পড়ল না৷ এমনকী নড়লও না এতটুকু৷ হাত বাড়িয়ে সে কিংকরকে প্রায় মাথার ওপর তুলে ছুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করল দূরে৷ কিন্তু কিংকর তো ঘাসজল খায় না৷ সর্দার যখন তাকে দু-হাতে টেনে ওপরে তুলছে তখনই সে তার দু-খানা পায়ে ফুটবল-খেলোয়াড়ের মতো দুটো শট কষাল সর্দারের মুখে আর পেটে৷

সেই দুটো লাথিতে যেকোনো শক্তসমর্থ লোকেরও জমি নেওয়া উচিত৷ কিন্তু সর্দারের কাছে তা বোধ হয় পিঁপড়ে কামড়ের শামিল৷ সে শুধু 'উম' করে একটা বিরক্তির শব্দ করল৷ তারপরই উলটে এক ঘুসি মারল কিংকরকে৷ ভাগ্যিস ঠিক সময়ে মুখটা সরিয়ে নিয়েছিল কিংকর৷

তারপরই শুরু হল, দু-জনের ধুন্ধুমার লড়াই৷

কে জিতত, কে হারত তা বলা মুশকিল৷ কিন্তু হঠাৎ ঘটনাস্থলে আর একজন লোকের আবির্ভাব হল৷ মজুবত গড়ন৷ মাঝারি লম্বা৷ সে এসেই একটানে কিংকরকে সরিয়ে আনল সর্দারের থাবা থেকে৷ তারপর নিজে লাফিয়ে পড়ল সর্দারের ওপর৷

এই দু-নম্বর লোকটা লড়তে জানে৷ মিনিট দুয়েক পরই দেখা গেল, সর্দার হাঁফাচ্ছে৷ লড়াইয়ের তাল পাচ্ছে না৷ যতবার ঘুসি লাথি চালায় ততবার তা বাতাস কেটে বেরিয়ে যায়৷ কুস্তির প্যাঁচে যতবার লোকটাকে কাবু করার চেষ্টা করে ততবার লোকটার প্যাঁচে পড়ে যায়৷

কিংকরের দম শেষ৷ সে হাঁফাতে হাঁফাতে কিছুক্ষণ দম নিয়ে টর্চ আর রিভলবার তুলে নেয় মাটি থেকে৷ দুটোই সর্দারের৷ রিভলবারটা তুলে ধরে সে আদেশ দেয়, 'সর্দার, লড়াই ছাড়ো৷ ধরা দাও৷'

সর্দার একবার তার দিকে তাকায়৷ তারপর আচমকা প্রতিপক্ষকে একটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নীচু হয়ে ভোজবাজির মতো জঙ্গলের আবছা অন্ধকারে মিলিয়ে যায় চোখের পলকে৷

কয়েক মুহূর্ত বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে কিংকর সর্দারের অনুসরণ করার জন্য পা বাড়ায়৷ সেই সময়ে কামিনীঝোপের ওপাশ থেকে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায় সাতনা৷ টর্চের আলোয় দেখা যায়, রক্তে তার বুকের বাঁ-দিক ভেসে যাচ্ছে৷ বুকে হাত চেপে ধরে সাতনা হাঁফাতে হাঁফাতে বলে, 'সর্দারের রণপা আছে৷ পশ্চিমধারে একটা শুঁড়ি পথ, ধরতে হলে সেদিকে যাও, সাবধানে৷' . . . বলে সাতনা আবার ঢলে পড়ে৷

কিংকর আর দু-নম্বর লোকটা তৎক্ষণাৎ পশ্চিমদিকে ছুটে যায়৷

শুঁড়ি পথটার ধারেই জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দু-জন৷ রামু আর নয়নকাজল৷ রামুর হাতে কয়েকটা আধলা ইট৷

নয়ন বলল, 'তোমার ঢিলটা সর্দারের কপালে লেগেছে৷ নইলে এতক্ষণে কিংকরের হয়ে যেত৷ কী টিপ তোমার! আর কী সাহস!'

রামু রাগের গলায় বলে, 'কিন্তু তুমি অত কাঁপছ কেন? এত ভয়টা কীসের?'

'ও বাবা! এরা সাংঘাতিক লোক৷ ঢিলটা মেরে তুমি ভালো কাজ করনি৷ সর্দার জানতে পারলে তোমাকে আস্ত রাখবে না৷'

'অত সস্তা নয়৷ তুমি চুপ করে থাকো তো৷'

'দেখলে তো নিজের চোখে তিন-তিনটে জোয়ান সর্দারকে কাবু করতে পারল না৷ তুমি বাচ্চা ছেলে কী করতে পারবে?'

'আর কিছু না করতে পারি ঢিল মারতে পারব৷ তুমি অত ভয় পেয়ো না৷'

নয়ন মাথা চুলকে বলে, 'বুঝলে দাদাবাবু, আমি খুব একটা ভিতু ছিলুম না৷ এই ডাকাত হওয়ার পর থেকেই ভয়টা বেড়েছে৷ ওরে বাপরে! ওটা কী! রাম রাম রাম রাম' বলতে বলতে নয়ন মাটিতে বসে দু-হাতে মুখ ঢাকে৷

রামু প্রথমটায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল৷ ভালো করে তাকিয়ে দেখল, শুঁড়ি পথটার মুখে ভীষণ ঢ্যাঙা এক মূর্তি হনহন করে তাদের দিকে ধেয়ে আসছে৷ কম করেও বারো ফুট লম্বা৷ আবছায়ায় ভালো দেখা যায় না৷ কিন্তু ভুল নেই৷

রামুর রণপায়ে চড়া অভ্যাস আছে৷ সুতরাং প্রথমটায় ঘাবড়ে গেলেও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ব্যাপারটা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল৷ সর্দার রণপায়ে চড়ে পালাচ্ছে৷

রামু শুঁড়ি পথটার মাঝখানে এগিয়ে গিয়ে মূর্তিটার মুখোমুখি দাঁড়াল৷ তারপর বোঁ বোঁ করে তার দুটো ঢিল ছুটে গেল নির্ভুল নিশানায়৷

রণপায়ে লোকটা একটু থমকে গেল৷ রামু ভেবেছিল, বুঝি লাগেনি৷ কিন্তু কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে মূর্তিটা হঠাৎ টলতে টলতে ধড়াস করে পড়ে গেল৷

সেই সঙ্গেই ছুটে এল কিংকর আর সেই লোকটা৷ কিংকরের হাতে টর্চ৷ কিংকর চেঁচিয়ে বলল, 'শাবাশ রামু!'

একটু বাদে সকলেই ঘিরে দাঁড়াল সংজ্ঞাহীন সর্দারকে৷ কিংকর শক্ত দড়ি এনে সর্দারের হাত-পা বেঁধে ফেলে৷ বলে, 'বড়ো সাংঘাতিক লোক৷ বাঁধা না থাকলে জ্ঞান ফিরে আসার পরই গণ্ডগোল পাকাবে৷'

রক্তাম্বর এবং দাড়িগোঁফে সর্দারকে বাঁধা অবস্থাতেও ভয়ংকর দেখাচ্ছে৷

দ্বিতীয় লোকটি আসলে গোবিন্দ৷ সে এসে রামুকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'তোমার এলেম আছে৷ আমার যা বিদ্যে সব তোমাকে শিখিয়ে দেব৷'

রামু মুখ তুলে বলে, 'তুমি একা কেন গোবিন্দদা? গবাদা আসেনি?'

মৃদু একটু হেসে গোবিন্দ বলে, 'গবাদাও এসেছে৷ একটু তফাতে আছে৷ পাগল মানুষ তো৷ এসে পড়বে কিছুক্ষণ বাদে৷'

কিংকর সর্দারকে বাঁধার পর মুখের ওপর ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে আস্তে আস্তে তার নকল দাড়িগোঁফ টেনে খুলছিল৷ খুলতে খুলতে বলল, 'এ লোকটাও চেনা লোক৷ কিন্তু কিছু করার নেই৷ ধরিয়ে দিলেও কেউ বিশ্বাস করবে না যে, এ সর্দার ছিল৷'

রামু জিজ্ঞেস করে, 'কে লোকটা কিংকরদা?'

'নিজেই দেখো৷'

রামু টর্চের আলোয় দাড়ি-গোঁফহীন সর্দারের মুখের দিকে চেয়ে হাঁ হয়ে যায়৷ এ যে আন্দামান আর নিকোবরের বাবা, দারোগা কুন্দকুসুম৷

রামু কাঁপতে কাঁপতে বলে, 'ইনিই সর্দার?'

কিংকর মাথা নাড়ে, 'ইনিই৷'

৩৪

কুন্দকুসুম যখন চোখ মেলে তাকাল, তখনও সকলের অবাক ভাবটা যায়নি, যাকে বলা যায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা৷

হাত-পা-বাঁধা কুন্দকুসুম কিন্তু একটুও ঘাবড়াল না৷ চারদিকে চেয়ে নিজের অবস্থাটা একটু বুঝে নিল কয়েক সেকেন্ডে৷ কিংকরের হাতে একটা মশাল জ্বলছে৷ তার মস্ত আলোয় সবকিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷

কুন্দকুসুম রামুর দিকে চেয়ে মৃদু একটু হাসল৷ তারপর বলল, 'তুমি উদ্ধববাবুর ছেলে রামু? আন্দামান আর নিকোবরের বন্ধু?'

রামু এত ঘাবড়ে গেছে যে, গলায় শব্দ এল না৷ শুধু মাথা নাড়ল৷

কুন্দকুসুম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'তোমার টিপ খুব ভালো৷ আজ তোমার জন্যই সর্দার প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিল আর কি! শেষ অবধি অবশ্য পালাতে পেরেছে৷ কিন্তু বেশিদিন পালিয়ে থাকতে পারবে না৷'

এ-কথা শুনে রামুর মাথা একদম গুলিয়ে গেল৷ বলে কী লোকটা? তাহলে কি কুন্দকুসুম সর্দার নয়?

কুন্দকুসুম চারদিকে আর একবার চোখ বুলিয়ে রামুকে জিজ্ঞেস করে, 'এরা সব কারা বলো তো! আর আমাকে এমনভাবে বেঁধেছেই বা কে? কার এত সাহস?'

গোবিন্দ একটু হেসে বলল, 'সেলাম দারোগাবাবু৷ কিছু মনে করবেন না, নিজেদের জান বাঁচাতে আপনাকে একটু বাঁধতে হয়েছে৷'

কুন্দকুসুম একটা হুংকার দিয়ে বলে, 'খুলে দে৷ তারপর দেখাই তোর ঘাড়ে কটা মাথা!'

'মাথা একটাই, তবে সেটা এত সস্তা নয়৷ আপনার তো অনেকগুলো মাথা আর মুখ৷ কখনো দারোগা, কখনো সর্দার৷ আপনার একটা মাথা গেলেও আর একটা থাকবে৷'

কুন্দকুসুম একটু অবাক হওয়ার ভান করে বলে, 'দারোগাদের মাঝে মাঝে ছদ্মবেশ ধরতেই হয়, তাতে আশ্চর্যের কী? আমি সর্দার এ-কথা তোকে কে বলল রে মর্কট?'

'অত চিল্লাবেন না দারোগাবাবু৷ এখন আপনি একটু অসুবিধের মধ্যেই আছেন৷ আমরা ছাপোষা লোক সব, দারোগাবাবুকেও ভয় খাই, ডাকাতের সর্দারকেও ভয় খাই৷ কিন্তু আপনার স্যাঙাত সাতনা আপনার গুলি খেয়ে ভারি রেগে গেছে৷ জানেন তো বাঘ জখম হলে বড়ো বিপজ্জনক৷ সে এখন আপনাকে গুরু বলেও মানছে না, দারোগা বলেও মানছে না৷ আপনার সঙ্গে মোকাবিলা করতে সে এল বলে৷'

কুন্দকুসুমকে একটু অস্বস্তি বোধ করতে দেখা যায়৷ গলা এক পর্দা নামিয়ে বলে, 'তোমরা বিশ্বাস করো, এই ডাকাতের দলটাকে অ্যারেস্ট করার জন্য গত তিন মাস ধরে চেষ্টা করছিলাম৷ আজই প্রথম এদের ডেরার পাকা সন্ধান পাই৷ আমার ফোর্স এই জঙ্গলটা ঘিরে আছে এখনও৷ আমি কাপালিকের ছদ্মবেশে-'

এতক্ষণ কিংকর একটাও কথা বলেনি৷ এবারে সে হঠাৎ হোঃ-হোঃ করে হেসে ওঠে৷ কুন্দকুসুম কটমট করে তার দিকে চায়৷

কিংকর হাসি থামিয়ে বলে, 'আমারও সেটা সন্দেহ হয়েছিল দারোগাবাবু, আপনি বোধ হয় সর্দার নন৷ আসল সর্দার বোধ হয় সত্যিই পালিয়েছে৷ আপনাকে আমরা ছেড়েও দিতে চাই৷ তবে তার আগে আমাদের কয়েকটা কথা আছে৷'

কুন্দকুসুম গম্ভীর হয়ে বলে, 'বলে ফেলো৷'

কিংকর মাথা নেড়ে বলে, 'আমার তেমন সাজিয়ে-গুছিয়ে কথা বলার অভ্যাস নেই৷ কথা বলবে গবাদা৷ আমি তাকে ডেকে আনছি৷ এই বলে কিংকর জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে গেল চকিত পায়ে৷

কয়েক মিনিট বাদে একটু দূরে গবার গলা পাওয়া গেল৷ সে গান গাইছে, 'বলো রে মন কালী কালী৷ আমার বুকটা করে ধুকুরপুকুর, পেটটা লাগে খালি খালি৷ অধিক কী আর কবো রে ভাই, মনেতে মোর আনন্দ নাই৷ কত নাচনকোঁদন দেখাইলাম রে, তবু দেয় না যে কেউ হাতে তালি৷'

সামনে এসেই গবা এক হাত জিব কেটে নিজের কান ধরে বলল, 'ছিঃ ছিঃ, কী পাষণ্ড রে তোরা! বড়োবাবুকে হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখেছিস! নরকে যাবি যে রে! খুলে দে! ওরে খুলে দে!'

গবা নিজেই নীচু হয়ে তাড়াতাড়ি কুন্দকুসুমের বাঁধন খুলতে লেগে যায়৷

রামু গবাকে দেখেও নড়ে না৷ তার মনের মধ্যে টিকটিক করে কী যেন একটা হতে থাকে৷ সে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে শুধু৷

গবা কুন্দকুসুমের হাতের বাঁধন খুলে ধরে ধরে তাকে তুলে বসায়৷ তারপর সামনে ঢিপ করে মাথা ঠুকে বলে, 'বড়োবাবু, অপরাধ নেবেন না৷ ছেলেমানুষ সব, না বুঝে করে ফেলেছে৷'

কুন্দকুসুম গম্ভীর গলায় বলে, 'হুঁ৷'

গবা নিরীহ গলায় বলে, 'মানুষ মাত্রেরই ভুল হয় আজ্ঞে৷'

কুন্দকুসুম বলে, 'তা বটে৷'

গবা হাতজোড় করে বলে, 'তা সেই ভুলের কথাই বলছিলুম আর কি৷ ভুল কি দারোগা-পুলিশেরও হয় না? এই আমাদের গোবিন্দ মাস্টারের কথাই ধরুন৷ খুন-টুন করার ছেলেই নয়৷ তবে ফেঁসে গেছে!'

'তাই নাকি?'

'একেবারে নির্যস সত্যি কথা৷' বলতে বলতে গবা কুন্দকুসুমের পায়ের বাঁধনটা খুলবার চেষ্টা করতে করতে বলে, 'ঃএ, এই গিঁটটা বড্ড এঁটে বসেছে দেখছি৷ ওদিকে আবার সাতনাকে দেখে এলুম একটা খাঁড়ায় ধার দিচ্ছে৷ নাঃ, বড্ড বিপদ দেখছি৷ পায়ের বাঁধনটা তাড়াতাড়ি না খুললেই নয় . . .'

কুন্দকুসুম একটা ধমক দিয়ে বলে, 'ইয়ার্কি রাখো৷ এটা ইয়ার্কির সময় নয়৷ কী চাও সেটা স্পষ্ট করে বলো৷'

গবা মাথা চুলকে বলে, 'আপনি দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, গরিবের মা-বাপও বটে৷ আপনার কাছে আবদার করে চাইব তাতে আর লজ্জা কী! বলছিলাম, গোবিন্দকে খালাসের একটা ব্যবস্থা করে দিতেই হবে আপনাকে৷'

কুন্দকুসুম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, 'দেখা যাবে৷'

'ভরসা দিচ্ছেন তো?'

কুন্দকুসুম একটু বিষাক্ত হেসে বলে, 'হাতি কাদায় পড়েছে বাপু, ভরসা না দিয়ে যে আমার উপায় নেই সে তুমি ভালোই জানো৷'

ভারি লজ্জার ভান করে গবা বলে, 'কী যে বলেন বড়োবাবু! তা দিলেনই যদি, তবে আরও একটু দিন৷'

'আবার কী?'

'আজ্ঞে ওই গুপ্তধনের ব্যাপারটা৷ ওটা সরকারের হক পাওনা৷'

কুন্দকুসুমের চোখ দুটো হঠাৎ জ্বলে ওঠে৷

চাপা গলায় গবা বলে, 'প্রাণের দাম যে ওর চেয়ে একটু বেশি বড়োবাবু৷ কিংকর বা সাতনা যেমন লোক, থানা-পুলিশ-কোর্ট-কাছারির তোয়াক্কা করবে না৷ জানে তাতে লাভ নেই৷ কোন ঝানু উকিল মামলা ঘুরিয়ে আপনাকে খালাস দিয়ে দেবে৷ তাই ওরা চায় বল্লমে এফোঁড় ওফোঁড় করে মেরে দিতে৷ আমি অনেক কষ্টে ঠেকিয়ে রেখেছি৷'

কুন্দকুসুম নিভে যায়৷ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, 'ঠিক আছে, তাই হবে৷'

গবা আবার মাথা চুলকে বলে, 'আর একটা কথা৷'

'আবার কী?'

'এতই যদি দিলেন তবে আর একটু বা বাকি থাকে কেন? বলছিলাম, এ-জায়গায় আপনার অনেক দিন চাকুরি হয়ে গেল৷ আমরা পাঁচজনে দেখছি, এখানকার জল-হাওয়া আপনার তেমন সহ্য হচ্ছে না৷ শুকিয়ে একেবারে অর্ধেক হয়ে গেছেন৷ তাই বলছিলুম আজ্ঞে, একটা বেশ ভালো স্বাস্থ্যকর জায়গায় বদলি নিয়ে চলে যান না বড়োবাবু৷'

কুন্দকুসুম থমথমে মুখ করে বলে, 'বুঝেছি৷'

'আজ্ঞে আপনি বুঝবেন না তো কে বুঝবে! এমন পাকা মাথা দেশে কটা আছে?'

কুন্দকুসুম বিরক্তির গলায় বলে, 'এবার পায়ের গিঁটটা খুলতে পার কি না৷'

গবা জিব কেটে বলে, 'ওই দেখো, কথায় কথায় ভুলেই যাচ্ছিলাম, ইয়ে বড়োবাবু, আর একটা কথা৷'

'আরও কথা?'

'মানে সাতনার কাছে কয়েকটা চিঠি আছে৷ সর্দারের নিজের হাতের লেখা৷ কোথায় কোন বাড়িতে ডাকাতি করতে হবে, কাকে খুন করতে হবে, এই সব বৃত্তান্ত, সর্দারের হাতের লেখা সেই সব চিঠি সাতনা আবার পুলিশের কাছে পাঠাতে চায়৷ আমি বলি, তার কি কোনো দরকার আছে বড়োবাবু?'

কুন্দকুসুম বিবর্ণ মুখে বলে, 'না৷ তার দরকার নেই৷'

গবা সঙ্গেসঙ্গে বলে, 'হ্যাঁ, আমিও তাই বলি৷ দরকার কী? কেঁচো খুঁড়তে আবার সাপ বেরিয়ে পড়বে৷ তার চেয়ে চিঠি কটা বরং থাক৷ পরে কাজে লাগবে৷'

কুন্দকুসুম ইঙ্গিত বোঝে৷ একটু চাপা স্বরে বলে, 'তোমরা খুব ঘড়েল৷'

'ছিঃ ছিঃ, কী যে বলেন! আপনি থাকতে আমরা! হেঃ হেঃ . . .'

গবা পায়ের বাঁধনটা খুলে দিলে কুন্দকুসুম উঠে দাঁড়ায়৷ কিন্তু অত বড়ো মানুষটা যেন নুয়ে পড়েছে, বয়সটাও যেন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বেড়ে গেছে৷

কুন্দকুসুম ধীরে ধীরে গিয়ে রণপা দুটো কুড়িয়ে নিল৷ কারও দিকে একবারও না তাকিয়ে রণপায়ে চড়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে জঙ্গলের অন্ধকার আর রহস্যময়তায় মিলিয়ে গেল৷

৩৫

ঘটনার মাসখানেক পর এক গাঁয়ের রাস্তায় তিন জন হাঁটছিল৷ গবা পাগলা, সাতনা আর রামু৷

একটা পুকুরধার পেরিয়ে কয়েকটা তালগাছের জড়াজড়ি৷ তারপর একটা বাঁক দেখা যাচ্ছিল৷ গবা বলল, 'ওই বাঁকটা ঘুরলেই যুধিষ্ঠিরের সেই পিসি না মাসির বাড়ি৷ এসে গেছি হে৷'

সাতনার বুকে এখনও ব্যান্ডেজ৷ আঘাত মারাত্মক না হলেও সর্দারের দুটো গুলিই তার পাঁজরে ক্ষত করে দিয়ে গেছে৷ হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল৷ তার ওপর মেয়েকে দেখতে পাবে আনন্দে তার হাঁফ ধরে যাচ্ছিল৷ হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে বলল, 'কথাটা মনে রেখো গবা, মেয়ের কাছে বাপ বলে আমার পরিচয় দিয়ো না৷'

'জানি৷ বলব দূর সম্পর্কের আত্মীয়৷'

সাতনা একটু ভাবল৷ তারপর বলল, 'তারও দরকার নেই৷ মেয়ে খুব সম্ভব আমাকে চিনতে পারবে৷ আবছা হলেও আমার কথা তার মনে আছে৷ এ-চেহারা তো ভোলার নয়৷ তার চেয়ে এক কাজ করি এসো৷ ওই বাঁকের মুখে ঝুপসি আম গাছটার ছায়ায় বসে থাকি৷ একবার না একবার সে পুকুরে কিংবা বাগানে বেরোবেই৷ তখন একটু চোখের দেখা দেখে নেব৷'

এ-কথার ওপর গবা কোনো কথা বলতে পারল না৷ রামুর চোখ দুটো ছলছল করতে লাগল৷ সে ফিরে আসার পর তার বাবা যে আনন্দে কাঁপতে কাঁপতে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল সে-কথাটা এখন মনে পড়ল তার৷ বাবাকে আগে তার খুব রাগী আর নির্দয় বলে মনে হত৷ এখন জানে, বাবা তাকে কত ভালোবাসে৷ সাতনার জন্য তাই তার বড়ো কষ্ট হচ্ছিল৷

গাছতলায় বসে সাতনা অপলক চোখে কিছুক্ষণ সামনের বাগানঘেরা একতলা পাকা বাড়িটার দিকে চেয়ে রইল৷ কাউকেই দেখা যাচ্ছিল না৷ সাতনা গবার দিকে চেয়ে বলল, 'তুমি যে আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দিলে না, আমি যে কোনো শাস্তি পেলুম না, এটা কি ঠিক হল?'

গবা মৃদু হেসে বলল, 'শাস্তি কাকে বলো তুমি? কত চোর-ছ্যাঁচোড় খুনে-জালিয়াতকে তো পুলিশ গারদে ভরে৷ জেল খেটে কি আর তাদের শুদ্ধি হয়৷ বাপু হে, আমি বুঝি অনুতাপের আগুন না জ্বললে মানুষের পাপ পোড়ে না৷ অনুতাপ কাকে বলে জানো? কোনো কাজ করে বিচার দ্বারা তার ভালোমন্দ অনুভব করে যে তাপের দরুণ মন্দে বিরতি আসে তাই হল অনুতাপ৷ সেই অনুশোচনায় নিজের মেয়েটার সামনে গিয়ে পর্যন্ত তুমি দাঁড়াতে পারছ না৷ এর চেয়ে বেশি সাজা তোমাকে আর কে দেবে?'

সাতনা ধুতির খুঁটে চোখের জল মুছল৷

ঠিক এ-সময়ে একট দিঘল চেহারার মেয়ে বেরিয়ে এল৷ সদ্য স্নান করে এসেছে বুঝি৷ এক রাশ চুল এলো হয়ে আছে পিঠের দিকে৷ ভারি সুন্দর মুখখানি৷ একটা ভেজা কাপড় শুকোতে দিচ্ছিল বাইরের তারে৷

গবা একটু ঠেলা দিয়ে সাতনাকে বলল, 'দেখো হে, দেখো৷ দানবের মেয়ে কেমন পদ্মফুলটির মতো দেখতে হয়েছে৷'

সাতনা জবাব দিল না৷ সম্মোহিতের মতো চেয়ে রইল মেয়ের দিকে৷ চোখের পলক পড়ে না, শ্বাসও বুঝি বন্ধ হয়ে গেছে৷

ধীরে ধীরে রোদে একটু পায়চারি করল মেয়েটি৷ তারপর ভিতর থেকে কেউ বুঝি ডাকল৷ মেয়েটি সাড়া দিল, 'যাই৷'

তারপর চলে গেল৷

গবা উঠে পড়ল৷ বলল, 'মেয়ের সামনে যদি না-ই যেতে পার তবে আর মায়া বাড়িয়ো না৷ দশটা গাঁয়ের লোক তোমাকে চেনে৷ ধরা পড়লে বিপদ আছে৷ ওঠো, ওঠো৷'

সাতনার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল অঝোরে৷ উঠে আস্তে আস্তে ফেরার পথ ধরে সে বলল, 'যত খারাপ কাজ করেছি তার দশগুণ ভালো কাজ যদি বাকি জীবনটায় করি, তাহলে মেয়ের সামনে একদিন দাঁড়ানোর সাহস হবে না গবা?'

'হবে৷ খুব হবে৷ ইচ্ছেটাই আসল, অনুতাপটাই আসল৷'

সাতনা হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে বলে, 'তাহলে এখান থেকে আমায় বিদায় দাও ভাই৷ পৃথিবী জায়গাটা বিশাল, কাজেরও অন্ত নেই৷ দেরি করে কী হবে৷ এক্ষুনি শুরু করে দিই গিয়ে৷'

গবা মাথা নাড়ল, 'এসো তবে৷'

সাতনা একটু ভেবে বলল, 'আর একটা কথা৷ মেয়েটার বিয়ের বয়স হয়েছে৷ আমার খুব ইচ্ছে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে ওর বিয়ে হোক৷ তুমি ব্যবস্থা করবে?'

গবা একটু হেসে বলল, 'করব৷ ভেবো না৷'

'তাহলে যাই৷'

চোখের পলকে লম্বা লম্বা পা ফেলে সাতনা বাঁ-পাশের মাঠটা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল৷

রামু গবার সঙ্গে বাড়ি ফিরে এল ভারী মনে৷

পুলিশ নতুন করে রিপোর্ট দেওয়ায় গোবিন্দ মাস্টারের মামলা আবার আদালতে উঠেছে৷ গোবিন্দর পক্ষে সওয়ালে নেমেছেন মস্ত মস্ত ডাকসাইটে সব উকিল৷ সামন্তমশাই তাদের মোটা টাকা দিচ্ছেন৷ গোবিন্দ গিয়ে শহরে ধরা দেওয়ার পর ফের জামিনে খালাস পেয়ে সার্কাসে তার খেলা দেখাচ্ছে৷ মামলার যা গতিক তাতে সে খালাস পাবেই৷

কুন্দকুসুম বদলি হয়নি৷ হঠাৎ চাকরি ছেড়ে সপরিবারে দেশের বাড়িতে চলে গেছে৷ সেখানে নাকি চাষবাস নিয়ে থাকবে৷ নতুন যে দারোগা এসেছে, তার নাম চন্দ্রাতপ খাঁড়া৷ ভারি ভালো লোক৷ প্রায়ই উদ্ধববাবুর বাড়িতে এসে রামুকে আদর করেন আর কাকাতুয়াকে ছোলা খাওয়ান৷

উদ্ধববাবুর হঠাৎ জ্ঞানচক্ষু খুলেছে৷ তিনি বুঝতে পেরেছেন, রাঘব ঘোষ তাঁর চেয়ে ভালো গাইয়ে৷ তাই আজকাল সন্ধের পর রাঘবের বৈঠকখানায় গিয়ে বসেন প্রায়ই৷ চোখ বুজে গান শোনেন আর তারিফ করেন, 'ওয়াঃ ওয়াঃ, কেয়াবাত৷'

রাঘব ব্যথিত স্বরে বলে, 'কেয়াবাতটাও ঠিক জায়গামতো বলতে পারছেন না উদ্ধববাবু! বেজায়গায় তারিফ করলে সুর কেটে যায়৷'

উদ্ধববাবু ভারি লজ্জা পান৷

নয়নকাজলের সঙ্গে এখন আর কাকাতুয়ার আড়াআড়ি নেই৷ সরকারি লোকেরা গুপ্তধনের প্রায় দু-কলসি মোহর উদ্ধার করে নিয়ে গেছে৷ কাকাতুয়াকে তাই এখন হরিনাম শেখানো হচ্ছে৷ তবে পাখিটার স্মৃতিশক্তি বড়োই প্রবল৷ ভোর হতে-না-হতেই সে ডাকতে থাকে, 'রামু ওঠো৷ মুখ ধোও৷ পড়তে বসো৷'

রামুর মনে বহুদিন ধরেই একটা খটকা লেগে আছে৷ সে একদিন গবাকে ধরে পড়ল, 'সেই কিংকর লোকটা সেই রাত্রে যে হাওয়া হয়ে গেল তারপর আর তার দেখা পেলাম না কেন বলো তো! কোথায় গেল সে?'

গবা এক গাল হেসে বলে, 'সেই কথাটা কিন্তু খুব গুহ্য কথা৷ কেউ না জানতে পারে!'

'কেউ জানবে না৷'

'তবে বলি৷ সেই যে তোমাকে আলফা সেনটরের কথা বলেছিলুম, মনে আছে?'

'আছে৷ আলফা সেনটর হল সৌরলোকের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র৷ পৃথিবী থেকে চার আলোকবর্ষ দূরে৷'

'বাঃ, ঠিক বলেছ৷ সেখান থেকে একদল লোক এসে আমার সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা করে যায়, জানো তো!'

'জানি৷ কিন্তু সে তো গুল৷'

'তাহলে বলব না৷'

'আচ্ছা গুল নয়৷ বলো৷'

'আলফা সেনটরের একটা গ্রহের নাম হচ্ছে নয়নতারা৷ কিংকর হল আসলে সেই গ্রহের লোক৷ ডাকাতদের সঙ্গে যখন আমরা কিছুতেই এঁটে উঠতে পারছিলুম না, তখন আমি টেলিপ্যাথিতে নয়নতারায় খবর পাঠাই৷ খবর পেয়ে কিংকর একদিন একটা মহাকাশযানে চেপে চলে এল৷ তারপর সব ঠিকঠাক করে দিয়ে সামলে-সুমলে দিয়ে ঘটনার সেই রাত্রে আবার নয়নতারায় ফিরে গেছে৷'

'আর তুমি কে গবাদা?'

'আমি? ও বাবা, ও আবার কেমনধারা কথা! আমি হচ্ছি আমি, গবগবাগব পাগলা খুড়ো, উলিঝুলি ফোকলাটেকো নাংলাবুড়ো৷ ঝুলদাড়ি আর ঝোলা গোঁফে গুমসো ছিরি, নালে-ঝোলে চোখের জলে জড়াজড়ি৷'

'তুমি কিন্তু মোটেই বুড়ো নও৷ বুড়োদের চামড়া এত টান থাকে না৷'

'থাকে থাকে৷ এ কি তোমাদের এই নোংরা জায়গার আধমরা বুড়ো নাকি! এসব মেড ইন অ্যানাদার ওয়ার্ল্ড৷'

'তার মানে?'

'কথাটা কিন্তু খুব গুহ্য৷ গোপন রেখো৷'

'রাখব৷ কিন্তু ফের গুল দিলে৷'

'আহা, আগে শোনোই না৷ কাউকে বলো না৷ আমিও আসলে ওই নয়নতারার লোক৷ সেখানে জল-হাওয়ার এমন গুণ যে, দেড়শো দুশো বছর বয়সে মানুষের যৌবন আসে৷'

'ফের গুল?'

'গুল নয় গো৷ শুনলে প্রত্যয় যাবে না, সেখানে পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের লোকেরা হামা দেয়৷ ত্রিশ-চল্লিশে গিয়ে হাঁটতে শেখে৷ আধো-আধো বোল ফোটে তখন৷ সত্তর বছর বয়সে আমাদের হাতেখড়ি৷ পঁচাত্তর বছর বয়সে ইস্কুলের পাঠ শুরু৷ সেখানে গেলে দেখবে আশি-নব্বুই বছরের লোকেরা ঢিল মেরে আম পাড়ছে, ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, ক্রিকেট খেলছে৷'

'সেখানে কি কিংকরদার গাঁয়েই তোমার বাড়ি?'

'হ্যাঁ তা বলতে পার একরকম৷ পাশাপাশি গাঁ৷ ওর গাঁয়ের নাম বাঘমারি, আমার গাঁ হল কুমিরগড়৷ দু-গাঁয়ের মধ্যে দূরত্ব মাত্র শ-পাঁচেক মাইল, একই থানা আমাদের৷'

'বলো কী! পাঁচশো মাইল দূরের গাঁ কি পাশের গাঁ হল নাকি?'

গবা খুব হাসে৷ বলে, 'তোমাদের এখানকার মতো নয়৷ আমাদের গ্রহটাও যে বিশাল৷ আমাদের একটা জেলা তোমাদের গোটা ভারতবর্ষের সমান৷ চলো একবার তোমাদের নিয়ে যাব৷ জামবাটি ভরতি সরদুধ আর সবরিকলা আর নতুন গুড় দিয়ে মেখে চিঁড়ের এমন ফলার খাওয়াব না! আর সেই জামবাটির সাইজ কী! ঠিক তোমার ওই পড়ার ঘরখানার মতো . . .'

'গুল! গুল!'

'আহা, শোনোই না . . .'

পরদিনই গবা আবার নিরুদ্দেশ হয়ে গেল৷ নয়নতারাতেই ফিরে গেল কি না কে জানে!

অধ্যায় ২৫ / ২৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%