শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

জয়চাঁদ বিকেলের দিকে খবর পেল, তার মেয়ে কমলির বড়ো অসুখ, সে যেন আজই একবার গাঁয়ের বাড়িতে যায়৷
খবরটা এনেছিল দিনু মণ্ডল, তার গাঁয়েরই লোক৷
জয়চাঁদ তাড়াতাড়ি বড়ো সাহেবকে বলে ছুটি নিয়ে নিল৷ বুকটা বড়ো দুরদুর করছে৷ তার ওই একটিই মেয়ে, বড্ড আদরের৷ মাত্র পাঁচ বছর বয়স৷ অসুখ হলে তাদের গাঁয়ে বড়ো বিপদের কথা৷ সেখানে ডাক্তার-বদ্যি নেই, ওষুধপত্র পাওয়া যায় না৷ ওষুধ বলতে কিছু পাওয়া যায় মুদির দোকানে, তাই মুদিই রোগের লক্ষণ শুনে ওষুধ দেয়৷ তাতেই যা হওয়ার হয়৷ কাজেই জয়চাঁদের খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল৷
দুশ্চিন্তার আরও কারণ হল, আজ সকাল থেকেই দুর্যোগ চলছে৷ যেমন বাতাস তেমনি বৃষ্টি৷ এই দুর্যোগের দিনে সুন্দরবনের গাঁয়ে পৌঁছোনো খুবই কঠিন ব্যাপার৷
দিনু মণ্ডল বলল, 'পৌঁছোতে পারবে না বলে ধরেই নাও৷ তবে বাস ধরে যদি ধামাখালি অবধি যাওয়া যায় তাহলে খানিকটা এগিয়ে থাকা হল৷ সকাল বেলায় নদী পেরিয়ে বেলাবেলি গাঁয়ে পৌঁছোনো যাবে৷'
জয়চাঁদ মাথা নেড়ে বলল, 'নাঃ, আজই পৌঁছোনোর চেষ্টা করতে হবে৷ মেয়েটা আমার পথ চেয়ে আছে৷'
জয়চাঁদ আর দিনু মণ্ডল দুর্যোগ মাথায় করেই বেরিয়ে পড়ল৷ যাওয়ার পথে একজন ডাক্তারবাবুর চেম্বারে ঢুকে মেয়ের রোগের লক্ষণ বলে কিছু ওষুধও নিয়ে নিল জয়চাঁদ৷ এরপর ভগবান ভরসা৷
বৃষ্টির মধ্যেই বাস ধরল তারা৷ তবে এই বৃষ্টিতে গাড়ি মোটে চলতেই চায় না৷ দু-পা গিয়েই থামে৷ ইঞ্জিনে জল ঢুকে গাড়ি বন্ধ হয়ে যায় বারবার৷ যত এসব হয় ততই জয়চাঁদ ধৈর্য হারিয়ে ছটফট করতে থাকে৷
যে গাড়ি বিকেল পাঁচটায় ধামাখালি পৌঁছোনোর কথা তা পৌঁছোতে পৌঁছোতে রাত ন-টা বেজে গেল৷ ঝড়-বৃষ্টি আরও বেড়েছে৷ ঘাটের দিকে কোনো লোকজনই নেই৷ তবু ছাতা মাথায় ভিজতে ভিজতে দু-জনে ঘাটে এসে দেখল, নৌকো বা ভটভটির নাম-গন্ধ নেই৷ নদীতে বড়ো বড়ো সাংঘাতিক ঢেউ উঠছে৷ বাতাসের বেগও প্রচণ্ড৷ উন্মাদ ছাড়া এই আবহাওয়ায় কেউ নদী পেরোবার কথা কল্পনাও করবে না এখন৷
দিনু মণ্ডল বলল, 'চলো ভায়া, বাজারের কাছে আমার পিসতুতো ভাই থাকে, তার বাড়িতেই আজ রাতটা কাটাই গিয়ে৷'
জয়চাঁদ রাজি হল না৷ বলল, 'তুমি যাও দিনুদাদা, আমি একটু দেখি, যদি কিছু পাওয়া যায়৷'
'পাগল নাকি? আজ নৌকো ছাড়লে উপায় আছে? তিন হাত যেতে না যেতে নৌকো উলটে তলিয়ে যাবে৷'
জয়চাঁদ হতাশ গলায় বলল, 'ঠিক আছে৷ তুমি তোমার ভাইয়ের বাড়িতে জিরোও গিয়ে৷ আমি যদি কিছু করতে না পারি তাহলে একটু বাদে আমিও যাচ্ছি৷'
দিনু মণ্ডল ফিরে গেল৷ জয়চাঁদ দাঁড়িয়ে রইল ঘাটে৷ ছাতা হাওয়ায় উলটে গেছে অনেকক্ষণ৷ ঘাটে কোনো মাথা গোঁজার জায়গাও তেমন নেই৷ জয়চাঁদ বৃষ্টি-বাতাস উপেক্ষা করে ঘাটে বসে ভিজতে লাগল৷ মেয়ের কথা ভেবে কাঁদলও খানিক৷ কে জানে কেমন আছে মেয়েটা! ভগবানই ভরসা৷
কতক্ষণ কেটেছে তা বলতে পারবে না জয়চাঁদ৷ সময়ের হিসেব তার মাথা থেকে উড়ে গেছে৷ বসে আছে তো বসেই আছে৷ ঝড়-বৃষ্টি একসময়ে প্রচণ্ড বেড়ে উঠল৷ এমন সাংঘাতিক যে জয়চাঁদ দু-বার বাতাসের ধাক্কায় পড়ে গেল৷ জলে-কাদায় মাখামাখি হল সর্বাঙ্গ৷
সামনে ঘুটঘুট্টি অন্ধকার নদী৷ নদীতে শুধু পাঁচ-সাত হাত বড়ো বড়ো ঢেউ উঠছে৷ সত্যিই এই নদীতে দিশি নৌকো বা ভটভটি চলা অসম্ভব৷ জয়চাঁদ তবু যে বসে আছে তার কারণ, এই নদীর ওপাশে পৌঁছোলে আরও পাঁচ-সাত মাইল দূরে তার গাঁ৷ এখান থেকে সে যেন গাঁয়ের গন্ধ পাচ্ছে, মেয়েকে অনুভব করতে পারছে৷
গভীরভাবে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটু চমকে উঠল জয়চাঁদ৷ ভুল দেখল নাকি? অন্ধকারে নদীর সাদাটে বুকে ঢেউয়ের মাথায় একটা ডিঙি নৌকো নেচে উঠল না৷ চোখ রগড়ে জয়চাঁদ ভালো করে চেয়ে দেখল৷ দুটো ঢেউ তীরে আছড়ে পড়ার পর এবার সে সত্যিই দেখল, একটা ঢেউয়ের মাথায় ছোট্ট একটু ডিঙি নৌকো ভেসে উঠেই আবার তলিয়ে গেল৷ এ দুর্যোগে কেউ ডিঙি বাইবে এটা অসম্ভব! তবে এমন হতে পারে, ডিঙিটা কোনো ঘাটে বাঁধা ছিল, ঝড়ে দড়ি ছিঁড়ে বেওয়ারিশ হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে৷
হঠাৎ জয়চাঁদের মাথায় একটা পাগলামি এল৷ সে একসময় ভালোই নৌকো বাইত৷ ডিঙিটা ধরে একবার চেষ্টা করবে? পারবে না ঠিক কথা, কিন্তু এভাবে বসে থাকারও মানে হয় না৷ ডিঙি নৌকো সহজে ডোবে না৷ একবার ভেসে পড়তে পারলে কে জানে কী হয়৷
জয়চাঁদ তার ঝোলা ব্যাগটা ভালো করে কোমরে বেঁধে নিল৷ তারপর ঘাটে নেমে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ ডিঙিটা একটা গোঁত্তা খেয়ে নাগালের মধ্যেই চলে এসেছে প্রায়৷ জয়চাঁদ ঢেউয়ের ধাক্কায় পিছিয়ে এবং ফের এগিয়ে কোনো রকমে ডিঙিটার কানা ধরে ফেলল৷ এই ঝড়-জলের সঙ্গে যুদ্ধ করে ডিঙি ধরে রাখা মুশকিল৷ জয়চাঁদ ডিঙিটাকে টেনে আনল পাড়ে৷ তারপর অন্ধকার হয়ে যাওয়া চোখে যা দেখল তাতে তার চোখ চড়কগাছ৷ নৌকোর খোলের মধ্যে জলে একটা লোক পড়ে আছে৷ সম্ভবত বেঁচে নেই৷
জয়চাঁদ বড়ো দুঃখ পেল৷ লোকটা বোধ হয় পেটের দায়েই মাছ-টাছ ধরতে এই ঝড়-জলে বেরিয়েছিল৷ প্রাণটা গেল৷ জয়চাঁদ নৌকোটা ঘাটের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে লোকটাকে পাঁজা কোলে তুলে এনে ঘাটের পাথরে উপুড় করে শোয়াল৷ প্রাণ থাক বা না থাক, বাঁচানোর একটা চেষ্টা তো করা দরকার৷ সে লোকটার পিঠ বরাবর ঘন ঘন চাপ দিতে লাগল৷ যাতে পেটের জল বেরিয়ে যায়৷ সে হাতড়ে হাতড়ে বুঝতে পারল, লোকটা বেশ রোগা, জরাজীর্ণ চেহারা৷ বোধ হয় বুড়ো মানুষ৷
খানিকক্ষণ চেষ্টার পর যখন জয়চাঁদ হাল ছেড়ে দিতে যাচ্ছিল তখন লোকটার গলা দিয়ে একটা অস্ফুট আওয়াজ বেরিয়ে এল৷ ঃউ বা ঃআ গোছের৷ জয়চাঁদ দ্বিগুণ উৎসাহে লোকটাকে কিছুক্ষণ দলাইমলাই করল৷ প্রায় আধঘণ্টা পর লোকটার চেতনা ফিরে এল যেন৷
লোকটি বলল, 'কে বটে তুমি?'
'আমাকে চিনবেন না৷ গাং পেরোবার জন্য দাঁড়িয়েছিলুম, হঠাৎ আপনার ডিঙিটা চোখে পড়ল৷'
লোকটা উঠে বসল৷ ঝড়ের বেগটা একটু কমেছে৷ বৃষ্টির তোড়টাও যেন আগের মতো নয়৷ লোকটা কোমর থেকে গামছা খুলে চোখ চেপে কিছুক্ষণ বসে থেকে বলল, 'ঃও, বড্ড ফাঁড়া গেল আজ৷ প্রাণে যে বেঁচে আছি সেই ঢের৷ তা তুমি যাবে কোথা?'
জয়চাঁদ হতাশ গলায় বলল, 'যাব ক্যাওটা গাঁয়ে৷ ওপার থেকে পাঁচ-সাত মাইল পথ৷ মেয়েটার বড্ড অসুখ খবর পেয়েই যাচ্ছিলুম৷ তা সে আর হয়ে উঠল না দেখছি৷'
লোকটি বলল, 'হুঁ৷ কেমন অসুখ?'
'ভেদবমি হয়েছে শুনেছি৷ কলেরা কি না কে জানে৷ গিয়ে জ্যান্ত দেখতে পাব কি না বুঝতে পারছি না৷'
লোকটা বলল, 'মেয়েকে বড্ড ভালোবাস, না?'
'তা বাসি৷ বড্ডই বাসি৷ মেয়েটাও বড্ড বাবা-বাবা করে৷'
লোকটা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ বলল, 'চলো তাহলে৷'
জয়চাঁদ অবাক হয়ে বলল, 'কোথায়?'
'তোমাকে পৌঁছে দিই৷'
'খেপেছেন নাকি? কোনোরকমে প্রাণে বেঁচেছেন, এখন নৌকো বাইতে গেলে মারা যাবেন নির্ঘাত৷ আমার মেয়ের যা হওয়ার তা হয়েই গেছে৷ আর এই দুর্যোগে নদী পেরোনো সম্ভবও নয়৷'
রোগা লোকটা গামছাটা কোমরে বেঁধে নিয়ে বলল, 'ওহে, বাঁচা-মরা তো আছেই, সে কি আমাদের হাতে? আমাদের হাতে যা আছে তা হল, চেষ্টা৷ চলো, নৌকোয় উঠে পড়ো, তারপর ভগবান যা করেন৷'
লোকটার গলার স্বরে কী ছিল কে জানে, জয়চাঁদ উঠে পড়ল৷
বুড়ো লোকটা নৌকোর খোল থেকে একটা বইঠা তুলে নিয়ে গলুইয়ে বসল৷ অন্য প্রান্তে জয়চাঁদ৷ উত্তাল ঢেউয়ে নৌকোটা ঠেলে দিয়ে লোকটা বইঠা মারতে লাগল৷
ডিঙিটা একটা ঢেউয়ের মাথায় উঠে পরমুহূর্তেই জলের উপত্যকায় নেমে যাচ্ছিল৷ আবার উঠল, আবার নামল৷ ওঠা আর নামা৷ মাঝ দরিয়ায় প্রচণ্ড তুফানে উত্তাল ঢেউয়ে ডিঙিটা যেন ওলট-পালট খেতে লাগল৷ কিন্তু জয়চাঁদ দু-হাতে শক্ত করে নৌকোর দুটো ধার চেপে ধরে অবাক চোখে দেখল, জীর্ণ বৃদ্ধ মানুষটা যেন শাল খুঁটির মতো দাঁড়িয়ে৷ হাতের বইঠা যেন জলকে তোলপাড় করে সব বাধা ভেঙে নৌকোটাকে তির গতিতে নিয়ে চলেছে৷
একটা বিশাল দোতলা সমান ঢেউ তেড়ে আসছিল বাঁ-দিক থেকে৷ জয়চাঁদ সেই করাল ঢেউয়ের চেহারা দেখে চোখ বুজে ফেলেছিল৷
কে যেন চেঁচিয়ে বলল, 'জয়চাঁদ, ভয় পেয়ো না৷'
অবাক হয়ে জয়চাঁদ ভাবল, আমার নাম তো এর জানার কথা নয়!
ঢেউয়ের পর ঢেউ পার হয়ে এক সময়ে নৌকোটা ঘাটে এসে লাগল৷ লোকটা লাফ দিয়ে নেমে ডিঙিটাকে ঘাটের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ফেলে বলল, 'এ ঘাট চেন জয়চাঁদ?'
জয়চাঁদ অবাক হয়ে অন্ধকারে একটা মস্ত বট গাছের দিকে চেয়ে বলল, 'কী আশ্চর্য! এ তো আনন্দপুরের ঘাট৷ এ-ঘাট তো আমার গাঁয়ের লাগোয়া! এখানে এত তাড়াতাড়ি কী করে এলাম? নৌকোয় আনন্দপুর আসতে তো সাত-আট ঘণ্টা সময় লাগে৷'
'ঝড়ের দৌলতে আসা গেছে বাবু৷'
জয়চাঁদ মাথা নেড়ে বলল, 'না৷ ঝড় তো উলটোদিকে বইছে৷'
'যাহোক, পৌঁছে তো গেছ৷'
জয়চাঁদ একটু দ্বিধায় পড়ে হঠাৎ বলল, 'আপনি কে?'
'আমি! আমি তো একজন মাঝি৷ তোমার দয়ায় প্রাণ ফিরে পেয়েছি৷'
জয়চাঁদের চোখে জল এল৷ মাথা নেড়ে বলল, 'আপনাকে প্রাণ ফিরে দিতে পারি তেমন ক্ষমতা আমার নেই৷ আপনি আসলে কে?'
'বাড়ি যাও জয়চাঁদ৷ মেয়েটা তোমার পথ চেয়ে আছে৷'
জয়চাঁদ চোখের জল মুছে পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে যেতে লোকটা পা সরিয়ে নিয়ে বলল, 'করো কী জয়চাঁদ, করো কী, বাড়ি যাও জয়চাঁদ৷'
'গিয়ে?'
'মেয়ের কাছে যাও৷ সে ভালো আছে৷ অসুখ সেরে গেছে৷'
'জানি মাঝি, আপনি যাকে রক্ষা করেন তাকে মারে কে৷'
বুড়ো মাঝি একটু হাসল৷ তারপর উত্তাল ঝড়ের মধ্যে বিশাল গাঙে তার ছোটো ডিঙিটা নিয়ে কোথায় চলে গেল কে জানে!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন