ভাড়াটে

তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়

আজ সকালেও পিনাকীবাবুর মুম্বাইবাসী মেয়ের ফোন এসেছিল। সেই এক কথা যেটা ও মাসখানেকের ওপর ধরে বলে আসছে, 'এত বড়ো বাড়িতে একা থাকো, বয়স হচ্ছে অত কনফিডেন্স ঠিক না। আচমকা শরীর-টরির খারাপ করলে কে সামলাবে শুনি? আজকাল চাকরবাকরদের ওপর আর ভরসা কী, কত রকমের সব বিপদ আপদের কথা হামেশাই শুনি, পড়ি আর তোমার কথা ভেবে দুশ্চিন্তা হয়। তাছাড়া রিটায়ার্ড লাইফে মাঝে মাঝে কথা বলার মতো দু'চারজন থাকলেও তো ভালো লাগে, নীচের তলাটা তো পুরোই ফাঁকা রয়েছে একটা নির্ঝঞ্ঝাট ভাড়াটে দেখে ভাড়া দিয়ে দাও না।'

কাল রাতে টেক্সাস থেকে ওনার ছেলে এই একই কথা বলে ফোন করেছিল। ও বলছিল কাগজে বাড়ি ভাড়ার একটা বিজ্ঞাপন দিতে। অ্যাডটা চোখে পড়লে একের পর এক সব যোগাযোগ করতে শুরু করবে, তখন পছন্দমতো ছোটো একটা ফ্যামিলি দেখে, তোমার টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনের কথাগুলো জানিয়ে কোর্টের কাগজে একবছরের কন্ট্রাক্ট করিয়ে নিলেই হল, তাহলে তো আর ওঠানোর ঝামেলা থাকছে না। এইভাবে পড়ে থেকে থেকে তো নীচতলার ঘরগুলো ড্যাম ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তুমি বাবা ইমিডিয়েটলি একটা ব্যবস্থা করো, অনেকদিন তো এভাবে কাটালে এবার ফর আ চেঞ্জ একটা ভাড়াটে বসিয়ে দেখই না।

আগে বহুবার প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গিয়েছেন পিনাকীবাবু, কিন্তু এবার ওরা যেভাবে বলছে, মনে হয় না বার বার ওদের কথা অমান্য করে যাওয়াটা আর ভালো দেখায়। বারো কাঠা জমির ওপর বাংলো প্যাটার্নের এই বাড়িটা ওঁর অনেক শখ করে করা ঘিঞ্জি শহরের চিৎকার চেঁচামেচি আর লোকালয় থেকে বেশকিছুটা ভেতরের দিকে নিরিবিলি পরিবেশে তৈরি, বাড়িটার চারপাশ ঘন গাছপালা দিয়ে ঢাকা। উঁচু পাঁচিলের পরিখার ভেতরে এটা প্রাক্তন এস ডি ও সাহেব পিনাকীরঞ্জন মিত্রর মনের মতো একটি নিজস্ব দুনিয়া-এর ভেতর ভাড়াটে ঢোকা মানেই অখণ্ড স্বাধীনতায় হাত পড়া। স্ত্রী'র মৃত্যুর পর এত বড়ো বাড়িতে মাঝে মাঝে বড্ড একা লাগে ঠিকই কিন্তু ভীষণ রকম স্বাবলম্বী, কর্মঠ আর সব সময় কোনও না কোনও কাজের ভেতর ব্যস্ত রাখা মানুষটা নিজেকে কিছুতেই সেই কষ্টটুকু পাওয়ার সুযোগ দিতে চান না। একা একা একটা কড়া রুটিং বাঁধা লাইফস্টাইল তৈরি করে তিনি বেশ আছেন। কাজের লোকগুলো যে খুব খারাপ তাও না, টাকাপয়সার যে এমন বিশেষ কিছু দরকার আছে তাও না: যে ভাড়া বসাতে হবে।

তবে একরোখা আর আপন মর্জিমাফিক চলা লোক বলে নিজের ছেলেমেয়ে আত্মীয়স্বজনদের কাছে একধরনের বদনাম রয়েছে ওর। ছেলে তো মাঝে মাঝে স্পষ্টাস্পষ্টিই বলে, বাবাকে এত সব কথা বলাই বৃথা, উনি নিজে যা ভালো বুঝবেন শেষমেষ তাই করবেন। অনেক ভাবলেন পিনাকীবাবু নিজের ভাবমূর্তিটা পালটানোর এর চেয়ে বড়ো সুযোগ আর কী হতে পারে। উনি চটপট লোকাল এজেন্টকে ফোন করে তিনটে কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়ালেন, কন্ট্যাক্ট করলেন একটা এজেন্সির সঙ্গেও। বিজ্ঞাপন বেরোনোর পর থেকেই যথারীতি যোগাযোগ হতে শুরু করল নানান লোকজন। যদিও বাড়িটা একটু ভেতরদিকে আর ফাঁকা ফাঁকা জায়গায় তবু বাসস্থান প্রার্থী লোকের অভাব নেই, রোজই দু-একজন করে লোক এসে ঘরবাড়ি দেখে দেখে তাদের ভাড়া দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে যাচ্ছে কিন্তু পিনাকীবাবুর কাউকেই ঠিক পছন্দ হচ্ছে না পুরোপুরি।

উনি চাইছেন ঝাড়াঝাপটা আর ছোটো পরিবার, অবশ্যই চাকরিবাকরির জন্য বাধ্য হয়ে এখানে থাকা, যাদের শেকড় গেঁড়ে বসার কোনও ইচ্ছেই নেই। স্বামী-স্ত্রী একটা বা দুটো বাচ্চা, ওদের দিকে সেপারেট থাকবে, মেন দরজা দিয়ে না, ডানহাতের আরও একটা ছোটো দরজা দিয়ে যাতায়াত করবে। কিন্তু এতটা ভেতরে ওইরকম পরিবার পাওয়া যাচ্ছে কোথায়, যারাই আসছে একগাদা মেম্বার, হইহল্লার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তাছাড়া তার শৌখিন বাড়িতে একটু সফিস্টিকেটেড পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন লোক না হলে ঠিক মনে ধরবে না পিনাকীবাবুর। প্রাক্তন সরকারি আমলা বলে মুখ দেখে লোকজনের মতিগতি বুঝতে পারার ক্ষমতার ওপর ওর অগাধ ভরসা আছে, কিন্তু সে রকম লোক আসছে কই যাদের দেখেই ভেতরে ভেতরে একটা গ্রীন সিগন্যাল বেজে ওঠবে। অতএব ঘর ভাড়া নিতে চেয়ে লোকজনের আনাগোনা লেগেই চলেছে কিন্তু অপেশাদার বাড়িওয়ালিটির কাউকেই আর মনে ধরে না।

একটা ফ্যামিলি অবশ্য বেশ ভালোই লেগেছিল। ভদ্রলোক ব্যাঙ্ককর্মী, স্ত্রী শিক্ষিকা, বয়স কারোরই চল্লিশের কোঠাতে পৌঁছায়নি দেখে মনে হয়েছিল আইডিয়াল কাপল কিন্তু একটাই মুশকিল ওদের প্রাইভেট কার আছে। পার্কিং-এর জায়গার অভাব নেই এই বাড়িতে কিন্তু সে গাড়ি মেন গেট দিয়ে ঢোকানোয় ওর আপত্তি আছে। তাই ওদেরকেও না বলতে হয়েছে বটে কিন্তু কাউকে না পেলে অগত্যা ওদের ব্যাপারটায় একটা সেকেন্ড থট দেওয়া যেতে পারে। সেদিন সকালে জগিং থেকে ফিরে, নিজের হাতে তৈরি মরশুমি ফুলের বেডের পাশের লনে রোজকার মতো ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করছিলেন পিনাকীবাবু, আর এইসব নিয়ে চিন্তা করছিলেন এমন সময় একটি ছিপছিপে চেহারার সুবেশা সুন্দরী মেয়ে মেন দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে এল, পেছনে একজন মাঝবয়সি ভদ্রমহিলা।

পিনাকীবাবুর কাজের লোক হারান ওর ইশারা মতো ওদের নিয়ে গিয়ে বসাল বাইরের ঘরে। কিছুক্ষণ পর ড্রেস চেঞ্জ করে এসে পিনাকীবাবু ওদের সঙ্গে দেখা করলে মেয়েটা বলল ওরা বাড়ি ভাড়ার বিজ্ঞাপনটা দেখে এসেছে। মেয়েটির বাচনভঙ্গি উচ্চারণ বেশ সুন্দর, পরনের পোশাক সাজগোজ হেয়ার-কাট আধুনিক ও রুচিসম্মত, নাম আত্রেয়ী বোস। পেশায় একটি নামকরা ইন্টিরিওর ডেকরেটরস কোম্পানির ক্রিয়েটিভ ডিপার্টমেন্টের কর্মী, তাছাড়া প্রাইভেটলিও এই ফিল্ডে অ্যাডভাইজার হিসেবেও কাজ করে ভারতের বিভিন্ন শহরে। আর পাশে মাথা নিচু করে বসে থাকা ভদ্রমহিলা ওর মা, উনি ইদানীং অসুস্থ—মাস ছয়েক আগে স্বামীর কার অ্যাক্সিডেন্টে মৃত্যুর পর মানসিক আঘাত পাওয়ার পর উনি প্রায় শয্যাশায়ী থাকেনই বলা যায়। ওরা ভাড়া নিতে চাইছে মাত্র সাত-আট মাসের জন্য—দক্ষিণ কলকাতায় ওদের ফ্ল্যাটটা তৈরি হচ্ছে ওটার কাজ শেষ হওয়া মাত্র উঠে যাবে।

মেয়েটি খুব মিহি স্বরে বলল ওরা খুব উপকৃত হয় যদি ওই দুটো ঘর ভাড়া দেওয়া হয়। ও ছ'মাসের ভাড়া অগ্রিম দিয়ে দিতে প্রস্তুত, আসলে এই বাড়িটা দেখে খুব পছন্দ হয়ে গেছে ওর মা'র শরীর মনের পক্ষেও এই পরিবেশটা খুব সুটেবল। ওর দাবি, 'একটা কথা আপনাকে অ্যাসিওর করতে পারি আপনি যদি আলটিমেটলি অনুগ্রহ করে আমাদের সুযোগটা দেন, আশা করি টেনেন্ট হিসেবে আমাদের নিয়ে অন্তত আপনার কোনওরকম কমপ্লেইন থাকবে না, আমরা যে আপনার বাড়ির নীচে আছি টেরই পাবেন না। আমি সকাল সকাল অফিসে বেরিয়ে যাই, ফিরি রাত করে, সারাদিন থাকা বলতে থাকবেন আমার মা-ই আর ওর একজন সবসময়ের পরিচারিকা। ওরা ঘর থেকে প্রায় বেরোয় না বললেই চলে আর ওই পরিচারিকা মূক ও বধির-অতএব আমাদের তরফ থেকে আপনার এই বাড়ির নীরবতা ভঙ্গ হওয়ার কোনও প্রশ্নই উঠছে না।'

'না না সেসব খুব একটা বড়ো কথা না। আমি এমনিতেই...।'

'কী আর বলি আপনাকে—আমরা দুজন এই সময়টা সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে ব্লিক পিরিয়ডের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি বাবার আকস্মিক মৃত্যুটা আমাদের দুজনকে এমন একটা ঝাঁকি দিয়ে গেল আর কী বলব ওনার ইম্পর্টেন্সটা আমাদের কাছে এতটাই ছিল যে উনি না থাকায় একেবারে দিশেহারা অবস্থা। আমাদের পৈত্রিক বাড়িটা মানে যেখানে এতদিন ছিলাম সেটা একটা বিশাল জয়েন্ট ফ্যামিলি বলতে পারেন ওরা এমনিতে বনেদি পরিবার, ইংরেজ আমল থেকে ওদের অনেক নাম ডাক ছিল। যাই হোক বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের সম্পত্তি নিয়ে শরিকি সমস্যা শুরু হল, আমার জ্যাঠা-কাকারা শুধু আমাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিতই করতে চায়নি পদে পদে বিবাদ বিতণ্ডা তৈরি করে ও বাড়িতে আমাদের জীবন ওষ্ঠাগত করে তুলেছিল। আমার কাজের খুব অসুবিধা হচ্ছিল, মা'র শরীর মন দিন দিন বিষিয়ে যাচ্ছিল, একরকম মরিয়া হয়েই আমি সব ছেড়ে ছুড়ে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললাম। চাই না ওদের অনুগ্রহ, নিজে যা রোজগার করি তাতে কলকাতার বুকে একটা ফ্ল্যাট কেনার সামর্থ্য আমার আছে আর সেটা হ্যান্ডওভার হতে যে কটা মাস বাকি সেটুকু সময় যদি আপনার এই বাড়িতে আশ্রয় পেতাম...।' মেয়েটা করুণভাবে তাকাল পিনাকীবাবুর দিকে।

কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদের কথা বলার ভঙ্গিতেই এমন একটা ব্যাপার থাকে যে তারা কিছু চাইলে না করা কষ্টকর তবুও সম্পূর্ণ অচেনা অজানা একটা পরিবারকে নিজের বাড়িতে থাকতে দেওয়ার আগে সাত-পাঁচ ভাবাটাই স্বাভাবিক কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন পিনাকী- বাবু, মেয়েটার মুখের দিকে তাকালেন, নিথর চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কী যেন একটা হল ভেতরে, নেতিবাচক কিছু বলতে ইচ্ছে করল না একেবারেই। তাছাড়া এটাও ঠিক নিজের মেয়েকে তিনি একটু বেশিই ভালোবাসেন, ওর বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর মাঝে মাঝে ওর অভাবটা বড্ড বেশি করে অনুভূত হয়। এই মেয়েটার বয়সও ওরই কাছাকাছি, কেন জানা নেই সহসা পিতৃহারা এই মেয়েটার কথা চিন্তা করে এক ধরনের মায়াও হল। মাথা নিচু করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ, ইতিমধ্যে মেয়েটা আরও এক দফা অনুরোধ করে ফেলেছে। সটান ওঠে দাঁড়ালেন উনি, সরকারি অফিসারের পুরোনো কেতায় হাত নেড়ে মেয়েটার আর্জি মঞ্জুর করে ফেললেন। স্নেহার্দ গলায় বললেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জিনিসপত্র নিয়ে চলে আসতে আর সাথে সাথেই একটা খুশির আভা ছড়িয়ে পড়ল মেয়েটার মুখে।

পরদিনই একটা মাঝারি ট্রাকে জিনিসপত্র ভরতি করে জিনিসপত্র নিয়ে ওরা হাজির। প্যাকিং বাক্সে ভরা মালপত্র বয়ে এনে গুছিয়ে গাছিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই জাতীয় শিফটিং-এর কাজ করা পেশাদারি সংস্থার লোকজনকে, ওরা ওদিকে ওদের কাজে ব্যস্ত। পিনাকীবাবু মেয়েটি, ওর মা আর ওদের সেই মূক ও বধির পরিচারিকাদের রেস্ট নিতে খুলে দিলেন নীচের আর একটা রুম। জলখাবার বা স্নানের গরম জল ইত্যাদি পাঠানোর কথা বললে মেয়েটা বারণ করল, থ্যাঙ্কস কাকাবাবু, আমরা স্নান খাওয়া করেই বেরিয়েছি, প্লিজ ডোন্ট টেক এনি ট্রাবল ফর আস, আর ঘণ্টা দেড়েক পরেই ওদের গোছানো সব হয়ে যাবে, তারপর আমরা আমাদের ঘরে ঢুকে যাব।

পিনাকীবাবু যাওয়ার আগে তবু বললেন, 'কোনও সমস্যা বা প্রয়োজন পড়লে আমাদের ডেকো—হেজিটেট করো না। ল্যান্ডলর্ড হিসেবে আমার তো কিছু দায়িত্ব থাকেই।'

'আপনাকে কিচ্ছু চিন্তা করতে হবে না। আমাদের কোনও সাহায্য দরকার হবে না।' জোর দিয়ে বলল মেয়েটি, 'মেনি থ্যাঙ্কস ফর ওফারিং আস হেল্প।'

'প্লিজ মেনশন নট'। মৃদু হাসেন পিনাকীবাবু আর বাড়িওয়ালা ভাড়াটের বিধিবদ্ধ চুক্তির কোর্টের কাগজটা এগিয়ে দেন সই করার জন্য। যথাস্থানে সইসাবুত করে মেয়েটা একটা অ্যাটাচিকেস থেকে একটা ব্রাউন পেপারের খামে ছ'মাসের অ্যাডভান্সের টাকাটা দিল পিনাকীবাবুর হাতে। যাওয়ার আগে পিনাকীবাবুর আচমকা চোখ পড়ল ওদের পরিচারিকা ভদ্রমহিলার ওপর অদ্ভুত থমথমে একটা ফ্যাকাশে গম্ভীর মুখ। ওর পাশে মেয়েটির মা ভদ্রমহিলা মাথা নিচু করে বসে আছেন একভাবে। মাথার কাচাপাকা চুলগুলো ঝুলছে দুপাশে।

সত্যিই ওরা ভীষণ চুপচাপ। এ বাড়িতে তিনদিন থাকা হয়ে গেল, সারাদিন ওদের কারও টিকিটি দেখতে পাননি পিনাকীবাবু বা ওর কাজের লোকজন। এদিকের দরজাটা সবসময় বন্ধ থাকে মেয়েটি সকাল সকাল চাকরিতে বেরিয়ে যায় ফেরে কখন জানা নেই। ওদের ঢোকা বেরোনোর রাস্তাটা যেহেতু পাতাবাহারি গাছগাছালি দিয়ে ঢাকা তাই ওদের দিকটার গতিবিধি লক্ষ করা এমনিতেই একটু কষ্টকর। পিনাকীবাবু নির্জনতা পছন্দ করেন ঠিকই, কিন্তু এ বাড়িতে নতুন তিনজন মানুষ এল অথচ তাদের কোনও দেখা নেই, শব্দটব্দ কিচ্ছু নেই, এ আবার কেমন ব্যাপার! একবার মনে হল ওদের দিকে গিয়ে খোঁজ নিই, আবার কেমন যেন মনে হল নিজে যেচে গিয়ে কথা বলতে যাওয়াটা কেমন খেলো দেখায়। হাজার হোক উনি প্রাক্তন আমলা, ওর সেলফ রেসপেক্ট আর একধরনের গ্রাভিটি আছে।

আরও দু'দিন কেটে যাওয়ার পর নিজেকে আর ঠেকানো গেল না। সেদিন রবিবার, মেয়েটা নিশ্চয়ই বাড়ি আছে, তাই সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ উনি ব্যাক প্যাসেজ দিয়ে নক করলেন ওদের দরজায়।

পরিচারিকাটি দরজা খুলে দিল, মেয়েটি সোফা থেকে ওঠে এসে সৌজন্যসুলভ হাসির সঙ্গে বসতে বলল ওকে। খাট আলমারি আর সোফাসেট ছাড়া আসবাবপত্র বিশেষ চোখে পড়ছে না, ঘরটা প্রায়ান্ধকার, জানলাগুলো একটাও খোলা নেই, বেশ গুমোট লাগছে ভেতরটা, কী ব্যাপার এরা একটু আগে ঘুম থেকে ওঠেছে নাকি।

মেয়েটি বলল, 'কী খাবেন বলুন—একটু চা বলি?'

'না না, একটু আগে চা খেয়ে এলাম। তিন-চারদিন হয়ে গেল তোমরা এসেছ—একবারও কথা হলো না, তাই ভাবলাম একবার...।'

'আর বলবেন না, সারাদিন কাজের চাপ চোখে মুখে দেখতে পাই না। বাড়ি ফিরেও কাজ, তারপর আর শরীর চলে না। আর মা তো জানেন অসুস্থ, ওঁকে ভেতরের ঘরটা দিয়েছি।'

'সে ঠিক আছে।' সারা ঘরময় চোখ বোলালেন পিনাকীবাবু। দেওয়ালের হাঙ্গারে টাঙানো রয়েছে লম্বা লম্বা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের বেশ কিছু জ্যাকেট কভার, তার ভেতরে মেয়েদের নানা রঙের বেশ কিছু গাউন টাইপের। মনে হচ্ছে সব দামী পার্টি ড্রেস। ওগুলোর দিকে তাকিয়ে পিনাকীবাবু বললেন, 'তুমি কি ফ্যাশন ডিজাইনিং-এর সঙ্গেও যুক্ত আছ নাকি?'

'না না ওগুলো আমার বান্ধবীদের...।' মেয়েটা অন্যমনস্ক ঢঙে বলল।

'ওহ আচ্ছা। আর এই ঘরটা অনেকদিন বন্ধ ছিল তো, একটু ভ্যাপসা গন্ধ থাকতে পারে, জানলা দরজাগুলো একটু খুলে রেখো, আলো বাতাস আসলে ঠিক হয়ে যাবে।'

'না না, তেমন গন্ধ তো তেমন কিছু নেই। মশা মাছির উৎপাতের জন্য দরজা জানলা বন্ধ থাকে, মা বিশেষ আলো পছন্দ করেন না।' মেয়েটি টেবিল থেকে একটা বই তুলে নিয়ে পাতা ওলটাতে ওলটাতে কিছুটা ব্যস্ততা দেখাল। ঘরের অনেক সরঞ্জামই সব বেড সিট দিয়ে ঢাকা, বীভৎসদর্শন একটা পুতুল মতো রয়েছে ঘরের কোণের একটা টেবিলের ওপর — কোনও আদিবাসী কমিউনিটির টোটেম টাইপের দেখতে মনে হচ্ছে, যেটার সারা গায়ে পিন ফোটানো, 'ওটা কী?' কৌতুহলী পিনাকীরঞ্জন বলে ওঠেন।

'ওটা আমার তৈরি একটা স্কাল্পচার—অনেক কাস্টমার একটু অফবিট আফ্রিকান পিস পছন্দ করেন। এটা আফ্রিকার টোগো অঞ্চলের রেয়ার একধরনের ভুডু মডেল বলতে পারেন।'

মেয়েটা আর বেশি কথা বলার আগ্রহ দেখাল না। একমনে বই ওলটাতে লাগল।

পিনাকীবাবু বেরিয়ে আসার সময় ভাবছিলেন যাকগে যে যেমনভাবে থাকতে ভালোবাসে থাক না। ন্যায্য টাকা ভাড়া দিয়ে রয়েছে, ওদের পূর্ণ স্বাধীনতা আছে নিজের পছন্দ সুবিধা মতো নিজেদের ঘরে বসবাস করার। ওসব বিদঘুটে মডেল-ফডেল দেখে অবাক হওয়ার কী আছে? ওসব আফ্রিকান ব্ল্যাকম্যাজিক, সুপারস্টিশনের জিনিসপত্র তো আজকাল আধুনিক মানুষের ঘর সাজানোর সামগ্রী হয়ে গেছে, একুশ শতকে দাঁড়িয়ে এসব নিয়ে সন্দেহ করার কোনও মানে হয় না।

আরও দু'দিন কেটে গেছে— ওদের কারও সঙ্গেই মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয়নি। সে আর কী করা যাবে পিনাকীবাবু এমনিতে একটু খাদ্যরসিক লোক। বাড়িতে ওস্তাদ রান্নার লোক আছে কিন্তু মাঝে মাঝে নিজেই রান্নাঘরে ঢুকে লেগে যান পোলাও কাবাব কোফতা বিরিয়ানি মোগলাই আরও সব কত দেশ-বিদেশি গুরুপাক খাবার তৈরি করতে। এটা ওর হবিই বলা যায়, এ বয়সে এত রিচ খাওয়া ঠিক না কিন্তু জিভ বড়ো দায়। যাই হোক সেদিন রাতে উনি রান্নার বই দেখে রাঁধলেন একধরনের বিশেষ আফগানি পোলাও, পরিমাণে একটু বেশি করেই করলেন। টিফিন ক্যারিয়ারে করে বেশ খানিকটা পোলাও হারানের হাত দিয়ে পাঠালেন নীচে ভাড়াটেদের ঘরে, বাড়িতে অসুস্থ মানুষ নিয়ে থাকে তাই হয়তো মেয়েটার বহুদিন ভালোমন্দ রান্না খাওয়ার সুযোগ হয়নি। কিন্তু মিনিট পনেরো পর হারান ফিরে এল টিফিন কৌটো হাতে। পিনাকীবাবু উৎসুক গলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হল দিয়ে এলি? মেয়েটা ছিল, কী বলল?'

'দু-দিকের দরজাই আটকাঠ বন্ধ। মিনিট দশেকের ওপর ধরে ডাকলাম, দরজা ধাক্কালাম, কোনও সাড়া নেই। মেয়েটা না থাক একটা কেউ তো সাড়া দেবে, বাইরে দিয়েও তালা দেওয়া নেই কী ব্যাপার?'

মেয়েটার কাছ থেকে একটা মোবাইল ফোন নাম্বার নিয়ে রেখেছিলেন পিনাকীবাবু। সেই ফোনে রিং করে ওকে বিষয়টা জানাতে মেয়েটা বলল 'আমার ফিরতে একটু রাত হবে আর মা এখন হয়তো হাই ডোজের ঘুমের বড়ি খেয়ে ঘুমোচ্ছেন আর আমাদের মেড সারভেন্ট তো জানেন ডেফ অ্যান্ড ডাম্ব। যাই হোক থাঙ্কস ফর সেন্ডিং পোলাও ইটস মাই ফেভারিট কিন্তু আমি তো খেয়ে ফিরব সো স্যরি ফর দিজ ডে, কাইন্ডলি একটু ফোন করে জানিয়ে আর একদিন পাঠাবেন।'

সেদিন জন্মদিন ছিল পিনাকীবাবুর মেয়ের। ওকে সকালে ওঠে ফোনে শুভ জন্মদিন জানিয়েই শেষ না ওর প্রিয় পুডিং তৈরি করলেন নিজের হাতে। ভাড়াটে মেয়েটাকে কিছুটা পাঠাবার আগে ফোন করলেন কিন্তু ফোনটা তিন-চারবার পুরো রিং হয়ে কেটে গেল। অগত্যা উনি হারানকে আবার পাঠালেন নীচে ওদের ঘরে নক করে টিফিন-বক্সটা পৌঁছে দিতে, দিনের বেলা নিশ্চয়ই এবার সাড়া পাওয়া যাবে। কিন্তু আজও হারানের সেই এক কথা, দরজা বন্ধ, রীতিমতো দরজা ধাক্কেও কাউকে পাওয়া গেল না। হারানের মুখে বিরক্তি, 'এরকম লোক জন্মে দেখিনি-এরা কী দিনের বেলাতেও ওষুধ খেয়ে ঘুমোয়।' মেয়েটার ফোন এল রাতে, 'স্যরি আপনার ফোনটা তখন রিসিভ করতে পারিনি, বলুন কী বলছিলেন?' পিনাকীবাবু পুডিং পাঠানোর কথাটা বলতে মেয়েটা কিছুটা কর্কশ গলায় বলল, 'ওহ তাহলে এইজন্য! এইজন্য আপনার বাড়ির ওই চাকরটা সকালে আমাদের দরজা ধাক্কাচ্ছিল? মা ফোনে বলছিল ওর খুব অসুবিধা হয়েছে, রাতে ওর ভালো ঘুম হয়নি, বেলায় চোখের পাতাটা একটু ফেলেছেন আর দরজায় দুমদাম বারি ওকে কাইন্ডলি একটু বলে দেবেন তো ওভাবে দরজা না ধাক্কাতে, মা অত শব্দটব্দ সহ্য করতে পারেন না। আর এরপর কোনও খাবার জিনিস-টিনিস পাঠালে ওকে বলবেন দরজার পাশে নামিয়ে রাখতে আমরা ঠিক সুযোগ মতো কালেক্ট করে নেব।'

কথার টোনটা শুনে পিনাকীবাবু কিছুটা ক্ষুণ্ণ হলেন, ওর খামোখা কী এত দায় পড়েছে যেচে কাউকে খাবার দিতে যাওয়ার! নেহাত মেয়েটাকে দেখলে নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ে তাই এত সব। পারতপক্ষে ওদের নিয়ে বেশখানিকটা উদাসীন হয়ে পড়লেন উনি, যেমন আছে তেমন থাক সাত-আট মাস পরে তো চলেই যাবে। কিন্তু হারান সারাদিন বাড়ির চারদিকটা ঘোরাঘুরি করে গাছপালার দেখাশোনা ছাড়া রোজ বাড়ির প্রতিটা কোণে ইতিউতি চোখ বোলানো ওর বহুদিনের অভ্যেস। সেদিন সন্ধের পর পিনাকীবাবুর পড়ার ঘরে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে হারান বলল— ও কিছুক্ষণ আগে ভাড়াটেদের ঘরের দরজার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করেছে। আবছা একটা খলখল কলকল কানে এলে ও কান পাতে এদিকের দরজায় স্পষ্ট শুনতে পায় কিছু মেয়ের গলার আওয়াজ, গল্পগুজব হাসিঠাট্টার শব্দ। কী নিয়ে কথা বলছে কিছু বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু কম করেও গোটা সাত-আটজনের গলার কথাবার্তা।

'ধুর তোর কানের ভুল। মেয়েটা কী অত আগে বাড়ি ফেরে ওর মা'র তো ঘরের ভেতর অত চেল্লামেল্লি সহ্য হওয়ার কথা না অতগুলো মেয়ে বাড়িতে ঢুকলে কি তুই একেবারেই টের পেতিস না?'

'কী যে বলেন, একেবারে স্পষ্ট শুনেছি এক নাগাড়ে হাসাহাসির শব্দ। বিশ্বাস না হয় চলুন নিজের কানেই শুনবেন।'

'না না, ওসব আমার কম্ম না। তুই বরং একটু নজর রাখিস কেউ রাতের দিকে ওদের ওদিকের গেট দিয়ে বেরোচ্ছে নাকি। কে জানে ওদের পার্সোনাল কোনও গেট টুগেদার আছে কিনা, তেমন কিছু থাকলে তো বাড়িওয়ালাকে জানানো উচিত, যাক-গে পরে মেয়েটাকে সুযোগ মতো জিজ্ঞেস করে নিতে হবে তো।'

রাত তখন এগারোটা মতো হবে। পিনাকীবাবু টিভিতে নিউজ দেখছিলেন—হারান নিঃশব্দে এসে ঢুকল ওর ঘরে—মুখটা থমথম করছে, চোখগুলো বড়ো বড়ো। 'কী হল ওরকমভাবে তাকাচ্ছিস কেন এতক্ষণ কোথায় ছিলি, খাবার সময় কত ডাকাডাকি করলাম কোনও সাড়া নেই?'

হারান কেমন একটা ঘোরের ভেতর এগিয়ে এসে ধপ করে বসে পড়ল মাটিতে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে পিনাকীবাবুর দিকে। 'কী হলো—কথা বলছিস না কেন কী ব্যাপার?' অনেকবার জিজ্ঞেস করার পর প্রায় ধমকে ওঠাতে সংবিত ফিরে পেয়ে ও মুখ খুলল। ওর বক্তব্য সন্ধের পর এখান থেকে যাওয়ার পর নেহাতই কৌতূহলের বশে ও বাড়ির বাইরে গিয়ে পেছনদিকের ছোটো গেটটার চারপাশে ঘুরঘুর করছিল। ঘণ্টা খানেকের ওপর কেটে যাওয়ার পরেও কারও আসা যাওয়া চোখে না পড়ায় পাঁচিলের বাইরের কৃষ্ণচূড়া গাছের তলার চাতালে বসে বিড়ি ফুঁকছিল। ঝিমঝিম অন্ধকারে হাওয়াও আসছিল রাস্তার দিক থেকে, অল্প ঝিমুনি মতো এসে গিয়েছিল। আচমকা একটা পাতলা মতো গলার ডাকে ধড়ফড়িয়ে ওঠে দাঁড়ায় সে। সামনে দাঁড়িয়ে সে। সামনে দাঁড়িয়ে ওই আত্রেয়ী বোস বলে মেয়েটি, দেখে মনে হল বাইরে থেকে ফিরছে, পিঠে ঝোলানো বড়ো ব্যাগ, একহাতে গোটা দু-এক প্যাকেট। কটমট করে ওর দিকে তাকিয়ে ফ্যাশফেশে গলায় বলল, 'কী হলো, এখানে কী করছেন, নজরদারি করা হচ্ছে কে কখন আসে যায় দেখা হচ্ছে?'

'না না, আমি তো ইসে, এখানে এই এমনিই তো...।' সে তুতলে ওঠে।

'মিথ্যে কথা বলবেন না ভাববেন না আমরা কিছু টের পাই না। আজ আপনাকে ভদ্রভাবে বলে রাখলাম, কাল থেকে যদি দেখি এদিকে ঘুরঘুর করছেন, খুব খারাপ হয়ে যাবে, আপনি কিন্তু আমাকে চেনেন না।'

ওইরকম নরমশরম দেখতে একটা মেয়ে যে ওইরকম ভয়ানক খরখরে গলায় কথা বলতে পারে ওইরকম ফুটো করে ঢোকা চাহনিতে তাকাতে পারে হারান সেটা ভাবতেই পারছে না। কেন জানা নেই ওর সারা গা শিরশির করে ওঠেছিল শিরদাঁড়ার ভেতর কেমন একটা ঝিলিক মতো লেগে গিয়েছিল, জিভ আড়ষ্ট হয়ে আসায় ও কোনও জবাব দিতে পারেনি, ওখান থেকে হনহনিয়ে হেঁটে বেরিয়ে আসা ছাড়া যেন আর কোনও উপায় ছিল না।

সব শুনে পিনাকীবাবুর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল, মেয়েটার কাছ থেকে এই ধরনের আচরণ উনি আশা করেননি। সেদিনই সকালবেলা ওনার ঠিকে কাজের মেয়ে সবিতা ঘর ঝাঁট দিতে দিতে ওনাকে বলছিল, 'এ কীরকম ভাড়াটে বসালেন জ্যাঠামশায়, সকালে আসি সন্ধের পর বাড়ি যাই একদিনও তো ওদের কাউকে নজরে পড়বে? আশপাশের বাজার দোকানপাটে কিছু কিনতে টিনতে যাওয়া, ঘর ঝাঁটঝোঁট দেওয়া ধুলোময়লা বাইরে কোথাও ফেলা, কাপড়চোপড় মেলার তারে কোনওদিন তো একটা তোয়ালে মেলাও দেখলাম না, রান্নাবান্নার আওয়াজও কানে আসে না, কে জানে কেমন সব মানুষজন?' সবিতা হয়তো ভেবেছিল ওরা আসাতে গায়ে গায়ে বাড়তি একটা কাজ পাবে, পায়নি বলে হয়তো রাগ কিন্তু আরও যা যা বলছে সেগুলোতো উড়িয়ে দেওয়ার মতো কথা না।

হারান কিছুটা ভড়কে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু ওর মাথা থেকে সন্দেহের জাল কিছুতেই আর সরতে চাইছিল না। মেয়েটার শাসানি ওর ও বাড়ির ওপর দীর্ঘদিনের অধিকার বোধের ওপরেও আঘাত ঘটে, তাই সেদিন অন্ধকার নামার পর চুপিসাড়ে নীচ তলার করিডর পেরিয়ে ও কান পাতে এ পাশের দরজায়। নাঃ, হতেই পারে না, এ ওর কানের ভুল কিছুতেই হতে পারে না। ঘরের ভেতর নিশ্চয়ই বেশকিছু মেয়ে আছে, ওরা দিব্যি খোশমেজাজে নিজেদের ভেতর কথা বলে চলেছে। আরও মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করে হারান। হঠাৎ পিঠে একটা টোকা লাগাতে আঁতকে উঠে ও তাকায় পেছনে, ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ভাড়াটে মেয়েটাদের সেই পরিচারিকা মহিলা।

সামান্য যেটুকু আলো আসছিল বাড়ির সামনের দিক থেকে, মহিলা পাথরের মতো নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে, মুখটা ভয়াবহ, জ্বলজ্বলে চোখ দুটো ঠিকরে বেরোচ্ছে। অদ্ভুত ধরনের নীলচে আলোর রেখার মণিদুটোয় চোখ পড়তেই কেঁপে উঠল পা থেকে মাথা, কে যেন খপ করে চেপে ধরেছে হৃৎপিণ্ড। মহিলা সেই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, কিন্তু এখনই ওখান থেকে ছুটে পালিয়ে না গেলে যেন রক্ষা নেই। হারান প্রাণপণে দৌড় লাগায়। সিঁড়ি দিয়ে পড়ি কী মরি ছুটে পিনাকীবাবুর সামনে এসে থামে, ওর চোখে মুখে জমাট ভয়, ঠোঁট কাঁপছে থরথরিয়ে দরদরিয়ে ঘেমে স্নান করে দাঁড়িয়ে আছে কাঁপাকাঁপা আঙুলটা নীচের দিকে নির্দেশ করে। কী হয়েছে বার বার জিজ্ঞেস করেও কোনও উত্তর পাওয়া গেল না। রাতে খাওয়া তো দূরের কথা, নীচে গ্যারাজের ঘরের পাশে ওর নিজের ঘরে শুতে যেতে চাইল না কিছুতেই। পিনাকীবাবুর শোয়ার ঘরের মেঝেতে গুটিসুটি মেরে শুয়ে রাত কাটিয়ে দিল।

সকাল থেকে ও কেমন বেবাক হয়ে গেছে, গায়ে ধুম জ্বর। পিনাকীরঞ্জন ওকে অনেক কায়দায় নানাভাবে জেরা করার পর ও শুধু বলল, 'ওদের তুলে দেন, যে করে হোক ওদের ও বাড়ি থেকে...।'

'কারা, কাদের কথা বলছিস?'

'আপনার ভাড়াটেদের। ওরা কিন্তু...।' কী একটা বলতে গিয়েও গিলে নিল কথাটা চোখ বন্ধ করে আবার সেই আগের মতো উলটোদিকে মুখ করে শুল গুটিসুটি মেরে। এত সহজে ভয় পাওয়ার লোক হারান না পিনাকীবাবুর মাথার ভেতর সব কেমন তালগোল পেকে যাচ্ছে। প্রায় সারাদিনটা ধরে উনি নিজের ঘরের এমুড়ো থেকে ওমুড়ো পায়চারি করে কাটালেন, চতুর্দিক বিবেচনা করে আকাশ পাতাল অনেক চিন্তা করলেন। যা করার তাকে নিজেকেই করতে হবে, সমস্যাটা এমনই যে বাইরের কাউকে বলে লাভ নেই, তাছাড়া নিজের সমস্যায় অনেক মন্ত্রণা বা সাহায্য কোনওটা নেওয়ারই পক্ষপাতী উনি নন।

কিছু করার নেই, যা হওয়ার হোক। ব্যাপারটা বাস্তবিক হোক বা নিছক সন্দেহ, ওকে নিজে ওদের ঘরে ঢুকে মেয়েটার মুখোমুখি বসে সোজাসাপটা কিছু কথা বলতে হবে। আজ না কাল, ওই সব আগামী কালের চক্করেও পড়তে চান না, যা করতে হবে আজই, আজ সন্ধেবেলাতেই। তখন ঘড়িতে সাড়ে আটটা মতো বেজে গেছে, এদিকটা এমনিতেই এতই শুনশান সাড়ে আটটাতেই অনেক সময় গভীর রাত মনে হয়, উনি ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালেন। ঝিঁঝির ডাক কানে আসছে একটানা, উনি ফোন লাগালেন আত্রেয়ী বলে ওই মেয়েটার ফোনে কিন্তু যথারীতি নো রেসপন্স। আরও তিনবার কল করলেন পরপর, কোনও সাড়া নেই। ও কী ইচ্ছে করে তুলছে না নাকি ফোনটা সাইলেন্ট অবস্থায় বেজে যাচ্ছে ওর ব্যাগের ভেতরেই। রাত তখন ন'টার মতো হবে— উনি নিঃশব্দে নেমে এলেন নীচে। সন্তর্পণে ঘাসের লনের ওপর দিয়ে হেঁটে সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন ভাড়াটেদের ঘরের সদর দরজার সামনে বেশ কয়েকবার ডোর বেল বাজানোর পর সাড়া না পেয়ে জোরে জোরে নক করতে লাগলেন। কেউ দরজা খুলল না।

পিনাকীবাবু করিডর দিয়ে ওঠে এসে বাঁ-দিকের দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন। হারানের কাছ থেকে শোনা কায়দায় কান খাড়া করে মাথাটাকে নিয়ে এলেন দরজার গায়ে। নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারা যাচ্ছে না কিছুতেই, এ কী করে সম্ভব, ঘরের ভেতর থেকে বিলক্ষণ বেশ কিছু মেয়ের তীক্ষ্ন গলার শব্দ এসে পৌঁছোচ্ছে কানের পর্দায়। একটা হালকা মিউজিক মতো কানে আসছে, মেয়েগুলোর কথাবার্তার মেজাজ বেশ খুশিয়াল ধরনের। ওরা নিজেদের ভেতর কথাবার্তায় কি এতটাই মত্ত যে বেলের শব্দ বা দরজার নকিং শুনতে পাচ্ছে না। এসব হচ্ছে টা কী, তার বাড়ির চৌহদ্দির ভেতর এসব কী ধরনের আচরণ!

বিরক্ত পিনাকীবাবু দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন ওদের সদর দরজার সামনে, সর্বশক্তি দিয়ে নক করতে শুরু করলেন। কোনও সাড়া না পেয়ে গায়ের জোরে ধাক্কাতে লাগলেন সেগুন কাঠের একপাল্লা দরজাটা। তাতেও কিছু না হওয়ায় এক নাগাড়ে কিল মারতে শুরু করলেন দু'হাত দিয়েই। জেদ আর রাগ এমন জায়গায় চলে এসেছে যে আজ যা হয় হোক, হয় এসপার নয় ওসপার দেখে উনি ফিরবেন। একভাবে মিনিট পাঁচেকের ওপর আঘাত করে যাওয়ার পর আচমকা দরজাটা খুলে গেল। সেই পরিচারিকা মহিলা নির্বিকার ঢঙে দরজাটা খুলে দিয়ে সরে গেল পাশে। পিনাকীবাবু বেপরোয়াভাবে ঢুকে এলেন ঘরের ভেতর। ভেতরটা অন্ধকার কিন্তু একধরনের মৃদু ও ঠান্ডা চাঁদের আলোর মতো কী যেন একটা ছড়ানো রয়েছে সবদিকে। কিছু না হলেও আট-দশটা মেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপনমনে কথা বলায় ব্যস্ত নিজেদের ভেতর। জনা চার-পাঁচেক ওই কোণে একটা সফট মিউজিকের তালে তালে কোমর দোলাচ্ছে, যেন একটা নৈশ পার্টি চলছে ঘরে। ওদের ভেতর সেই মেয়েটাকে চোখে পড়ছে না কিন্তু উনি যে এসে ঢুকেছেন কারও সে দিকে নজর নেই, কেউ যেন ওঁকে দেখতেই পাচ্ছে না। উনি একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা আত্রেয়ী কোথায় বলতে পারবে? মেয়েটা উত্তর দিল না, যেন শুনতেই পায়নি।

দিশেহারা হয়ে চারদিকে পাক খেতে লাগলেন উনি, জীবনে এমন হেনস্তা আর কোথাও কোনওদিন হতে হয়নি। অসহায়ভাবে উনি চিৎকার করে উঠলেন, 'কেউ কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? আমি এ বাড়ির বাড়িওয়ালা, আমি তোমাদের কিছু বলতে চাইছি...।' কারও কোনও প্রতিক্রিয়া নেই, সবাই সবার মতো গল্পগুজব আর ড্যান্সিং নিয়ে মশগুল। ব্যাপারটা হচ্ছেটা কী, এত আজব কাণ্ড, মেয়েগুলোকে একেবারে স্পষ্ট ঘোরাঘুরি করতে দেখছেন অথচ ওরা যেন ওঁকে দেখতেই পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে হয় ওরা নেই, না হলে উনি নেই। সবার পরনে সুন্দর সুন্দর নাইট গাউন, গলায় কানে হাতের কবজিতে শৌখিন সব গয়নাগাটি, একটা স্নিগ্ধ গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে ভেজাভেজা হাওয়ায়।

পরিচারিকাটি কোথায় গেল! মেয়েটির মা, সেই অসুস্থ মহিলা নিশ্চয়ই ভেতরের ঘরে শুয়ে, উনি উন্মাদের মতো অস্থির হয়ে মেয়েগুলোকে পাশ কাটিয়ে মাঝখানের একটা হালকা দরজা ঠেলে ক্ষীপ্রগতিতে ঢুকে এলেন ওই মহিলার ঘরে। এই তো, মহিলা ওপাশ ফিরে শুয়ে রয়েছেন খাটে। ঘুমোচ্ছে মনে হচ্ছে কিন্তু কিছু করার নেই, অবশিষ্ট সবটুকু জোর লাগিয়ে ওই মহিলার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠলেন পিনাকীবাবু, 'কী হল এই যে মিসেস বোস, শুনতে পাচ্ছেন! আমাকে না জানিয়ে এসব কী চলছে আমার বাড়ির ভেতরে? আপনার মেয়ে কোথায়? ও আসলে বলে দেবেন আমার বাড়িতে এসব চলবে না, আমি আপনাকে ওয়ার্নিং দিয়ে গেলাম। কালকেই আপনারা...।' বলতে বলতে মহিলা পাশ ঘুরে ওর দিকে তাকাল, মুখের ওপরে এসে পড়া চুলটা সরাতেই আঁতকে উঠে ছিটকে পেছনের দিকে ছুটে গেলেন পিনাকীবাবু। এ কী দেখছেন উনি! এ কী মানুষের মুখ, অস্বাভাবিক রকমের শীর্ণ কোঁচকানো চামড়ায় ভরা একটা মুখে দুটো টেবিল টেনিস বলের মতো সাদা মণিহীন চোখ ওর দিকে তাকিয়ে আছে।

পেছন থেকে বেজে উঠল একটা চেনা গলা, চকিতে পেছন ফিরতেই উনি দেখলেন সেই মেয়েটি দাঁড়িয়ে। হিসহিসে গলায় মেয়েটা বলে উঠল, 'কী ব্যাপার, আপনি এখানে কেন? এখানে কী দরকার? আপনাকে কে এখানে আসতে বলেছে, এত কৌতুহল কীসের? কী জানতে চান আপনি, কী বলতে চান? আপনার বাড়ি তো কী হয়েছে, এখন তো আমরা ভাড়া দিয়ে থাকি। যখন তখন যেখানে সেখানে ঢুকে পড়লেই হল, মহিলাদের একটা প্রাইভেসি বলে কিছু নেই, ভেবেছেনটা কী?

মেয়েটা এক-পা এক-পা করে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। কিন্তু এ কী! এ কী করে সম্ভব! ওর চোখের মণিদুটো কোথায় গেল? বরফের মতো সাদা ঠান্ডা চোখদুটো ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে চোখের পাতা। 'তু-তু-তুমি কে-তোমরা কারা-তোমরা কি তাহলে...।' কাঠের মতো শুকনো গলা উচ্চারণ করতে পারল না আর।

মেয়েটার মুখে বাঁকা হাসি। ধীরে ধীরে ওর পেছনে এসে জমা হচ্ছে বাকি মেয়েগুলো। থমথমে প্রাণহীন ধুতরো ফুলের মতো সাদাটে ফ্যাকাশে সব মুখ, একজনের চোখেও মণি নেই। সবাই পিনাকীবাবুর দিকে তাকিয়ে অথচ কিছুর দিকেই তাকিয়ে নেই যেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%