তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার বন্ধু সৌমেন প্রায়ই বলে ওদের বাড়িতে কিছুদিন কাটিয়ে আসার জন্য, কিন্তু সেবার যেন একটু বেশি জোর দিয়েই বলেছিল। শীত সে অর্থে না পড়লেও হিমেল ছোঁয়া লেগেছে বাতাসে। হাতে ছুটি ছিল কয়েক সপ্তাহের। সৌমেন বাড়ি যাচ্ছিল, আমি ওর সঙ্গ নিলাম। বর্ধমান শহরের কিছু দ্রষ্টব্য জায়গায় ঘোরার ইচ্ছেও ছিল, কিন্তু আসল উদ্দেশ্য সৌমেনের দাদুর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালাটা দেখা। ওর দাদু সৌরীন্দ্রমোহন চৌধুরীর কীর্তিকলাপের কথা সৌমেনের মুখে এতবার শুনেছি যে, এ সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না।
স্টেশনে নেমে রিকশায় সাত-আট মিনিটের রাস্তা। সাবেকি গঠনশৈলীর বিশাল তিনতলা বাড়িটা প্রায় বিঘে দুয়েক জমির উপর অবস্থিত। বাড়ির লোকজন দারুণ মিশুকে আর সবচেয়ে বড়ো কথা, দিনটা রোববার হওয়ার ওর বাবা বাড়ি ছিলেন। ওঁর কাছে সৌরীন্দ্রমোহনের সংগ্রহশালা আর লাইব্রেরির চাবি পেতে আমার সময় লাগে না। সৌমেনের বাবার সঙ্গে দারুণ একটা র্যাপো তৈরি করে নিলাম তাড়াতাড়ি। উনি তো নৃতত্ত্ব বিষয়ে আমার আগ্রহ আর বেসিক পড়াশুনোয় বেশ ইমপ্রেসড। ওঁকে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম সৌরীন্দ্রমোহন সম্পর্কে।
উনি প্রাথমিক ভাবে যা-যা বললেন, তা আগে সৌমেনের কাছে শোনা। তবু একই কথা দু-জনের কাছে শুনলে সত্যিটা যাচাই করা হয়ে যায়। যা শুনলাম, তার মোদ্দা কথা হল, সৌরীন্দ্রমোহন চৌধুরী মারা গিয়েছেন দশ বছরের উপর হল। নামি অ্যানথ্রোপলজিস্ট ছিলেন। নৃতত্ত্বের ওপর একাধিক গবেষণাধর্মী বই লিখেছেন। আমেরিকান সাহেব স্টিভ হপকিন্সের সঙ্গে জুটি বেঁধে সম্পাদনা করেছেন উত্তর আমেরিকার মিথ আর প্রাচীন উপজাতিদের জীবনযাত্রা নিয়ে। কলকাতা থেকে নৃতত্ত্বের পাঠ শেষ করে উনি স্কলারশিপ নিয়ে গবেষণা করতে যান ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে গিয়ে মজে যান উত্তর আমেরিকার নোভাহো অ্যাপাচে ইত্যাদি আদিবাসীদের নিয়ে। ওখানকার অধ্যাপক রবার্ট ডসনের নেতৃত্বে একটা গবেষক দলের সদস্য হয়ে উনি চলে যান অ্যারিজোনার দিকে।
দুপুরে খেয়েদেয়ে ওর বাবার সঙ্গে জমিয়ে গল্প করতে-করতে বললাম, 'সকলে বলে আমি আর সৌমেন নাকি অভিন্নহৃদয় বন্ধু, ওর বাড়িতে আসার ইচ্ছে তো থাকবেই। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, আরও আসা ডক্টর এস এম চৌধুরীর স্পেশ্যাল কিছু কালেকশন নিজের চোখে দেখার জন্য। শুনেছি ওঁর মুখোশের কালেকশন নাকি সাঙ্ঘাতিক একটা ব্যাপার।'
ভদ্রলোক কেমন যেন চাপ খেয়ে গেলেন, 'কে বলেছে এসব? মুখোশের কালেকশন একসময় ছিল। এখন আর নেই। উনি বেঁচে থাকতেই বেশিরভাগ বই আর জিনিসপত্র কলকাতার বেশ কয়েকটা গ্রন্থাগার আর সংগ্রহশালায় দিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুখোশগুলো দান করা হয়েছে কানাডার একটা মিউজিয়ামে।'
'কিন্তু আমি যে শুনেছি, আরও কিছু বিরল মুখোশ আছে আপনাদের সংগ্রহে। যার জন্য ছ-মাস আগেও আমেরিকার একটা মিউজিয়ামের কয়েকজন প্রতিনিধি আপনাদের বাড়ি এসে একটা লাম্পসাম টাকা অফার করে গেছে। কিন্তু আপনারা রাজি হননি। প্রয়াত সৌরীন্দ্রমোহনের নাকি আদেশ ছিল, ওঁর মৃত্যুর পর ওসব জিনিস বেচা বা নিলাম করা যাবে না।'
'সে কি! আমাদের বাড়ির কথা অথচ আমরাই জানি না। আশ্চর্য কথা! কে বলেছে, তোমায় কে বলেছে এসব কথা?'
'সৌমেনের মুখেই শুনেছিলাম, ও অবশ্য আমাকে কথাটা কাউকে বলতে বারণ করেছিল।'
ভদ্রলোক কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সৌমেনের দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে বলল, 'ও তোমায় ওসব বানিয়ে বলেছে। কি রে সুমু, এরকম কিছু বলেছিলি বন্ধুকে? বন্ধুর সামনে হিরো হতে তিলকে তাল করেছিস?'
সৌমেন লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'কই, আমার তো কিছু মনে পড়ছে না। এমন কিছু বলেছিলাম তোকে? কবে বললাম?' সৌমেন যেন আকাশ থেকে পড়ল।
ওর সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই দুম করে ওর বাবার সামনে কথাটা বলা ঠিক হয়নি। হাজার হোক, ফ্যামিলি সিক্রেটের একটা আলাদা মর্যাদা থাকে। আসলে ও সেদিন খুব আবেগতাড়িত হয়ে কথাগুলো কিছুটা যেন মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল। বলার পরে শপথ করিয়েছিল, আমি যেন ঘুণাক্ষরেও কাউকে কিছু না বলি। ও আসলে আমাকে এত কাছের মনে করে যে, আমাকে মনের যে-কোনও কথা বলতে দ্বিধা করে না। আমিও ওকে পর ভাবতে পারি না কিছুতেই, কিন্তু ওর বাবা তো আমার বন্ধু নন যে, কথাটা ওরকম সরাসরি বলে ফেলা যাবে।
আমি আমতা-আমতা করে বললাম, 'তা হলে যদি অনুগ্রহ করে লাইব্রেরি ঘরটা খুলে দেন, ওঁর লেখাপত্র একটু উলটেপালটে দেখতাম আর কী! আপনাদের বাড়ি আসার পর থেকে ওঁর ছবিও দেখতে পেলাম না। শুনেছি ওই লাইব্রেরি ঘরে ওঁর প্রচুর ছবি আছে।'
সৌমেনের বাবা সোফা থেকে উঠে বললেন, 'সে দেখতে পার। কিন্তু সিংহভাগ বই-ই তো নেই, যা আছে তার মধ্যে ওঁর মেজর ওয়ার্কগুলো পড়ে ফ্যালো। ওঁর সম্পর্কে জানো, উত্তর আমেরিকার উপজাতিদের সমাজ, চিন্তাভাবনার জগৎ নিয়ে একটা পরিষ্কার ধারণা তৈরি করো। আমাদের এখানে তো থাকার অসুবিধে নেই, বন্ধুর সঙ্গে থাকো। যদ্দিন খুশি থাকো আর পড়ো। মুখোশ দেখার হলে সে তো ছবিতেও দেখা যায়। কিন্তু তার আগে ওই সময়টাকে বুঝতে হবে। মুখোশগুলোর পিছনের ভাবনাটা বুঝতে হবে। নোভাহো, অ্যাপাচে, হোপি, নুনিভিকদের জীবন বিশ্বাসগুলো বুঝতে হবে, অশিক্ষিত কৌতূহল আমার মোটেও পছন্দের নয়।'
'সে তো একশোবার। আমি তো আর বেশিদিনের জন্য আসিনি, কিন্তু দু-দিন, তিনদিন যা-ই থাকি, কথা দিচ্ছি যত দূর সম্ভব পড়ব। সৌরীন্দ্রমোহন সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা নিয়ে বাড়ি যাব। আপনি শুধু কাইন্ডলি আমাকে গাইড করবেন। যেখানে আটকে যাবে, আপনি শুধু জটটা খুলে দেবেন। কঠিন পড়াশোনায় অসুবিধে নেই, কিন্তু এই ফিল্ডটা তো আমার কাছে নতুন।'
'সে ঠিক আছে, আমার দিক থেকে যত দূর সম্ভব সাহায্য পাবে। কিন্তু ব্যাপারটা তো দু-তিনদিনের কাজ না, বিষয়টা অন্তত পাঁচ পার্সেন্টও আয়ত্ত করতে হলে দিন দশেক আমাদের বাড়িতে থাকতে হবে। আমি তোমাদের বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিচ্ছি। বলে দিচ্ছি, তুমি ছুটির ক-দিন আমাদের বাড়িতে থাকছ। এই ক-দিন দিনরাত এক করে খাটতে পারলে তবে তোমার ওই সব কৌতূহলের অধিকার তৈরি হবে। যদি দেখি, ঠিকঠাক এগোচ্ছ, তোমার নিষ্ঠা আর পরিশ্রম আমার ভালো লাগে, তা হলে...।'
'তা হলে?' —আমার গলায় উচ্ছ্বাস।
সৌমিত্রবাবু হাসলেন, 'আর শোনো, তোমার বন্ধুটিকে সঙ্গে নিও। নিজের দাদু সম্পর্কে তো আমাদের মুখে শোনা কিছু গল্প ছাড়া কিছুই জানল না। নিজের সাবজেক্টের বাইরে কিছু পড়তে গেলেই ওর গায়ে জ্বর আসে। আমার বাড়ির কেউ একটা তো থাকুক, সৌরীন্দ্রমোহন সম্পর্কে অন্তত দু-চার কথা বলতে পারবে। তবে আমি যে জিনিসটা বুঝি, সেটা হল ফাঁকিবাজি দিয়ে কোনও মহৎ কাজ করা যায় না।'
আমি তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলাম, সৌমেনও যথেষ্ট উৎসুক। ওর বাবা চাবি আনতে গেলে সৌমেন আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল, 'তুই তো আচ্ছা!'
আমি ওর ঘাড়ে হাত দিয়ে বললাম, 'সরাসরি আসল কথায় পৌঁছে হ্যাঁ কি না জানতে চেয়েছি। তুই তো জানিস, আমি ডেসপারেট ছেলে। তবে উনি রাশভারী লোক হলেও মনে হয় না আমাদের নিরাশ করবেন। তুইও তো নিজেও মুখোশগুলো দেখিসনি। কী রে ইচ্ছে করছে না মুখোশগুলো দেখতে?'
'সে তো করছেই, ছোটো থেকেই করে এসেছে, কিন্তু বাবা এমনিতে খুব স্ট্রিক্ট লোক। লাইব্রেরি ঘরের দেওয়ালে একটা লুকনো দরজা আছে। ওই দরজায় জম্পেশ একটা লক আছে, সেটা খুলতে জানেন একমাত্র আমার বাবা। আমার বিশ্বাস, ওই ঘরেই আছে ওই সব মুখোশ, আরও নানান সব রেলিক, উপজাতিদের সাজসরঞ্জাম, ছোটো অস্ত্রশস্ত্র হ্যাড্ডাব্যাড্ডা আরও বহু দুর্মূল্য জিনিসপত্র,' বাবাকে আসতে দেখে ও ফিসফিসিয়ে ওঠে।
বাড়িটার পুরো তিনতলা জুড়ে ছড়ানো ওই লাইব্রেরি কাম সংগ্রহশালা। অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক সিকিউরিটি সিস্টেম দিয়ে সুরক্ষিত। সৌমেনের বাবা আমাদের নিয়ে ঢুকলেন বিশাল একটা হল ঘরে, যার একদিকে সাজানো বইয়ের সারিবদ্ধ র্যাক, অন্য দিকের দেওয়ালে টাঙানো অসংখ্য ছবি আর ওয়াল স্ট্যান্ডে রাখা প্রচুর প্রত্নসামগ্রী। ঘরে ঢুকে নিজের চারধারে পাক খেয়ে হাঁ হয়ে দেখতে লাগলাম সব কিছু। এ তো একটা ছোটখাটো মিউজিয়াম, যদিও বইয়ের র্যাকের বেশিরভাগটাই ফাঁকা।
ধীরে-ধীরে এগিয়ে গেলাম ছবিগুলোর দিকে। সৌমেনের বাবা হাতে একটা পয়েন্টার নিয়ে একেবারে বাঁ-দিক থেকে দেখাতে শুরু করলেন সৌরীন্দ্রমোহনের বিভিন্ন বয়সের ছবি। ক্রমশ ডানদিকে রয়েছে বিভিন্ন উত্তর আমেরিকান প্রজাতির ছবি, তাদের নাচ ও নানান আচার-অনুষ্ঠানের ছবি, কম করে শ-খানেক ধরনের মুখোশ। মুখোশ পরা নোভাহোদের দেখিয়ে উনি বোঝালেন, 'এদের মুখোশ মূলত তিন ধরনের। শামান বা ওঝাদের মুখোশ, মেডিসিন ম্যান বা ওষুধওয়ালাদের মুখোশ আর সাধারণ মানুষের মুখোশ।'
এই সব মুখোশের গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন করায় উনি বললেন, 'মুখোশ সেই বন্যজীবনে পশু আর মানুষের জীবনের নিবিড় যোগাযোগের প্রমাণ। তা ছাড়া এসব মুখোশের পিছনে আলাদা-আলাদা গল্প আছে। ওদের মিথ্যের নানা চরিত্র আর কল্পকাহিনি, ওষুধওয়ালারা শারীরিক ও মানসিক সব রোগ সারাতে এই সব মুখোশ পরে অশরীরী শুভ ও অশুভ আত্মাদের সঙ্গে যোগাযোগ করত। আর শামানদের মুখোশ সবচেয়ে জটিল ব্যাপার। ওরা ওদের অদ্ভুত মুখোশগুলো ব্যবহার করত প্রেতলোকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে। শামানরা বিশেষ ও অতিপ্রাকৃত জ্ঞানের অধিকারী। যে কেউ শামান হতে পারে না। শামান হতে গেলে তাকে প্রথমে দেবতার ডাক পেতে হবে, তারপর চরম সাধনা আর দুরূহ ব্রতযাপনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে সে দেবতা আর প্রেতদের জগতে ঢোকার অলৌকিক শক্তি পায়।'
'আপনি ওঝা বা তান্ত্রিকদের অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করেন?'
'আমি বিশ্বাস করি বা না-ই করি, তাতে কিছু এসে যায় না। কিন্তু কিছু ঘটনার ভিত্তিতে সৌরীন্দ্রমোহন বিশ্বাস করতেন। বিশ্বাস করতেন মুখোশগুলোর অলৌকিক ক্ষমতায়। এই মুখোশগুলো ভালো করে স্টাডি করলে বিচিত্র সব সংকেত পাবে, রহস্যময় গুহ্য সব ইঙ্গিত। যেমন ধরো, এই মুখোশটার বৈশিষ্ট্যগুলো সব ডানদিক চাপা। এটা ছেলেদের মুখোশ, তাই দু-ভাগে বিভক্ত। বাঁ-দিকটা লাল আর ডানদিকটা নীল। মুখোশটার হাত-পা, শিং, গোঁফদাড়ি সব আছে। আর তার পাশেরটা দেখছ, শুধু মুখাকৃতি। সম্ভবত সিন্ধুঘোটকের চামড়া দিয়ে তৈরি, ইঞ্চিখানেক ছেড়ে সেটা একটা গোলাকার কাঠির রিং দিয়ে ঘেরা, রিংটায় পাখির লেজের লম্বা-লম্বা পালক লাগানো। আর এই মাস্কটা পরে আছে একটা মেয়ে, গলায় হামাতসা হার আর গায়ে চিলকাট কম্বল, কিন্তু মুখোশটা কোনো এক মৃত শামানের। তার পাশের এক জাতীয় মুখোশগুলোয় মুখভঙ্গির পরিবর্তনের সঙ্গে-সঙ্গে আবেগের বদল আসছে। ভালো করে দ্যাখো, অনেক কিছু পাবে।'
আমি আঙুল দিয়ে দেখলাম আর একটা মুখোশের দিকে। উনি বললেন, 'এটা ইয়েবিচাই মুখোশ। উনি হলেন ইয়েই নামক এক কথা-বলা দেবতার দাদু। রাতের সমবেত নাচের উৎসবে মন্ত্র আওড়াতে-আওড়াতে নাচিয়েরা এইসব মুখোশ পরে নোভাহোদের বাকি আট উপদেবতার সঙ্গে ইয়েবিচাইকে ডাকত। মুখোশগুলোর সামনে সম্মোহিতের মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম, উনি আমাদের ডেকে নিয়ে এলেন একটা ন-দশ ফুট লম্বা কাঠের পোলের কাছে। পোলটার সারা গায়ে অদ্ভুত সব মুখ আঁকা। মাথার কাছে দু-টো ডানা। তার পাশে সাজানো অসংখ্য হেড ড্রেস। কাক, কুমির, ভল্লুক ইত্যাদি, আরও নানা সব জন্তুর মুখের আকৃতির এই হালকা কাঠের জিনিসগুলো নোভাহোরা মাথায় পরত।'
চেনা পৃথিবীর পাশে এ এক অন্য ভুবন, একটা অতিপ্রাকৃত গন্ধে ভরা পরিবেশ। ওঁর পিছন-পিছন এগিয়ে গেলাম বইগুলোর দিকে। এই ক-দিন নিরলস পরিশ্রম করে এই জগৎটার মধ্যে ঢুকতে হবে। সৌমেনের বাবা চলে গেলে আমরা দু-জন পছন্দমতো বই নামিয়ে পড়তে শুরু করে দিলাম। বিকেল গড়িয়ে গিয়েছে, কাজের মেয়েটা টেবিলে খাবার দিয়ে হাঁক দিয়ে গিয়েছে একাধিকবার। সন্ধেবেলা সৌমেনের মা এসে তাগাদা দিয়ে না গেলে আমাদের খেয়ালেই আসত না খাওয়ার কথা। কোনো রকমে খাবার মুখে পুরে আবার বসে গেলাম বই মুখে দিয়ে।
রাতে খাওয়ার পর সৌমেনের বাবাকে বললাম রাতটা লাইব্রেরিতেই কাটাব। উনি আপত্তি করলেন না। রাত দু-টো নাগাদ লাইব্রেরিতে ঢুকে আমাদের দু-জনকে একমনে পড়তে দেখে উনি তো খুবই খুশি। হাসিমুখে বললেন, 'আর না, অনেক রাত হয়েছে, এবার শুতে যাও। কাল সকালে ওঠে আবার শুরু করো।'
সৌমেন আপত্তি করে বলল, 'না বাবা, আজ যতক্ষণ পারি পড়ব। বিষয়টা এমনই যে, নেশা ধরে যাচ্ছে।'
আমি বললাম, 'রাত জাগা ছাড়া উপায় নেই কাকাবাবু। প্রচুর পড়তে হবে, অথচ হাতে সময় খুব কম।'
উনি বললেন, 'শুনেছি তোমার পড়ুয়া হিসেবে সুনাম আছে, কিন্তু সৌমেনকে ফিজিক্সের বাইরে অন্য কোনো বিষয়ে এতটা মন দিতে দেখে ভালো লাগছে।'
পরের দিন সকালে ওঠে আমরা আবার লেগে পড়লাম। অফিস যাওয়ার আগে সৌমেনের বাবা সৌমিত্রবাবু আমাদের উৎসাহ দিয়ে গেলেন, আর বলে গেলেন, 'আমি আন্তরিকভাবে চাই, নতুন প্রজন্মের বাঙালি যুবকরা এস এম চৌধুরী সম্পর্কে জানুক। ওঁর উত্তরাধিকার থেকে যাক তোমাদের মধ্যে।' সন্ধেবেলা ফিরে উনি নিজে একটা ট্রে-তে তিন কাপ চা আর প্রচুর বিস্কুট নিয়ে হাজির হলেন আমাদের মধ্যে।
আমি প্রশ্ন করলাম, 'আচ্ছা, দেশে ফিরে কি সৌরীন্দ্রমোহন ভারতীয় তন্ত্রসাধক ওঝাদের সঙ্গে মিশতে চেয়েছিলেন? উনি দেখছি শেষের দিকে উত্তর আমেরিকার উপজাতিদের সঙ্গে আমাদের দেশীয় অকাল্ট চর্চার একটা সম্পর্ক-সুতো আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন।'
'হ্যাঁ, উনি চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু উনি হতাশ হয়েছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, যাদের পেলাম তাদের বেশিরভাগই ফেক, জালজোচ্চুরি দিয়ে রুজিরোজগার করে আর কী! তবে উনি আলাস্কার নুনিভাক দ্বীপে একজন শামানকে পেয়েছিলেন, যার মধ্যে তিনি অলৌকিক ক্ষমতা দেখেছিলেন। বেরিং সাগরের অপদেবতাদের সঙ্গে কথা বলতেন, প্রেতলোকের সঙ্গে ছিল সাবলীল যোগাযোগ। উনি কিন্তু আসলে ছিলেন একজন নোভাহো। পরে নুনিভিকদের এলাকা মেকোরিউকে চলে আসেন। যাই হোক, উনি আমার বাবাকে একটা মুখোশ দিয়েছিলেন। মেরুহরিণের চামড়া দিয়ে তৈরি, কিন্তু তাতে ভুসো কালি মাখিয়ে কালো করা। রক্ত ফিনকি দেওয়া এড়াতে হরিণটাকে শস্যদানা নাকে-মুখে ঠুসে শ্বাসরোধ করে মারা হত। উনি বলেছিলেন, এটা এমনিতে বিপজ্জনক। ওটাকে যেন খুব সাবধানে রাখা হয়। কায়দাকানুন না জেনে ব্যবহার করলে ফল ভালো হবে না।'
''সেটা কি দান করা হয়ে গিয়েছে না আপনাদের বাড়িতেই আছে?''— আমি জিজ্ঞেস করলাম।
ভদ্রলোক কেমন একটা অপ্রস্তুতে পড়ে গিয়ে বললেন, ''সেটা বাবা কাদের দিয়ে গিয়েছেন কিনা জানি না। উনি তো সব কথা আমায় বলে যাননি।''
বলার সময় ওঁর মুখে একটা অস্বস্তি ছিল, যেন কিছু একটা লুকোতে চাইছেন।
আমি বললাম, ''মুখোশটা কি আপনি দেখেছিলেন?''
''না, না, শুনেছিলাম। কত মুখোশই তো আছে, তার মধ্যে কোনটা কী করে বলব? আমি তো ওই বিষয়ে এক্সপার্ট নই।''
''আছে মানে? আপনাদের বাড়িতে তা হলে অনেক মুখোশের নমুনাই আছে। কোথায় আছে? এই ঘরে নিশ্চয়ই কোনও মুখোশ নেই। তা হলে অন্য আর-একটা ঘর আছে?''
সৌমিত্রবাবু সৌমেনের দিকে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আমাকে বললেন, ''এটা কিন্তু অনধিকার চর্চা হচ্ছে। আমি বলেছিলাম না ঠিক মতো পড়াশোনা করে কৌতূহলী হওয়ার অধিকার অর্জন করতে পারলে তবে কথা হবে। তার আগে এসব প্রশ্নের কোনও মানে নেই। তার আগে তোমার কোনও কথাই আমার কানে ঢুকবে না।''
আমি বললাম, ''তা হলে বলছেন, মুখোশ দেখতে পাব। তার জন্য অবশ্য আমরা যা কিছু করতে রাজি।''
উনি আর শব্দ খরচ না করে চলে গেলেন।
আমাদের উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে উঠল। যত সময় যাচ্ছে, পড়ার গতি বাড়ছে। একটা বইয়ের জিজ্ঞাসা আর একটা বইকে টেনে আনছে। মোটা-মোটা বিদেশি বইগুলোর একের তিন অংশের উপর চোখ বোলানো হয়ে গিয়েছে। আমি ছোটো থেকে বইপোকা। কিন্তু জটিল, অপরিচিত এই বিষয়টা আমাকে এইভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলবে, ভাবতেও পারিনি। পড়তে-পড়তে একটু-একটু সরে যাচ্ছি অন্য গোলার্ধে। মনের মধ্যে তৈরি হচ্ছে এক নতুন উত্তর আমেরিকা।
দিন চলে যাচ্ছে। এক সপ্তাহ শেষ হতে বাকি আর দেড় দিন, অথচ এখনও অনেক পড়া বাকি। সৌমিত্রবাবু সেদিন এসে জিজ্ঞেস করলেন, পড়াশোনার হালহকিকত।
আমি বললাম, ''নদী যত চওড়া ভেবেছিলাম, এখন মাঝখানে এসে মনে হচ্ছে আরও অনেকটা সাঁতার কাটতে হবে।''
উনি বললেন, ''তা হলে থাকো না আর ক-টা দিন। আমরা তো তোমার থাকাটা এনজয় করছি। সৌরীন্দ্রমোহন বেঁচে থাকলে খুশি হতেন। শেষ জীবনে উনি আক্ষেপ করে বলতেন— অ্যাকাডেমিক গবেষণার বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রোপলজি বিষয়টাকে একেবারেই জনপ্রিয় করা গেল না। অথচ বিষযটা এত ইন্টারেস্টিং!''
'শুধু ইন্টারেস্টিং না, রীতিমতো বিপজ্জনক। যতদিন যাচ্ছে, বিষয়টা আমায় চুম্বকের মতো টানছে। দিব্যি ফিজিক্স নিয়ে পড়ছিলাম। কেন যে হঠাৎ? যাক গে, এখনও মনে হচ্ছে দিন চারেক লাগবে। যদি থেকে যাই আপত্তি নেই তো?'
'আপত্তির প্রশ্ন উঠছে কেন? বরং আমরা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ সৌরীন্দ্রমোহনকে নিয়ে এতটা ইন্টারেস্ট দেখানোর জন্য। আর এখন কলেজ খুললেও তো সেভাবে ক্লাস হবে না বোধ হয়।'
'না, সে চিন্তা করছি না। তা হলে আর ক-টা দিন রয়েই গেলাম। বাড়িতে ফোন করে জানাতে হবে। ওঁরা আবার কী ভাবছেন, কে জানে? ওঁরা তো জানেন না, এখানে আমি কী নিয়ে মজে আছি।'
আমি আবার পড়ায় মন দিলাম। সৌরীন্দ্রমোহনের বইয়ের পুরো সংগ্রহের সিকি ভাগও নেই এখানে। তাই দশ দিনের মাথায় প্রায় সব বইয়ে একবার করে অন্তত চোখ বোলানো হয়ে গেল।
সৌমিত্রবাবু বললেন, 'এবার আমি একটা ইন্টারভিউ নেব। আমি পরখ করে দেখে নিতে চাই, তোমার বোঝাপড়া কতটা সাউন্ড।'
বিষয়টার গভীরে জ্ঞান না থাকলেও ওঁর ইন্টারভিউতে বেশ সন্তাোষজনক ভাবে উতরে গেলাম। উনি আমার পিঠে হাত রাখলেন।
এবার আমি কাতর গলায় বললাম, 'কাকু, কাল সকালে চলে যাচ্ছি। এবার তা হলে একবার মুখোশগুলো দেখতে পাব? আমি হয়তো আপনার বাড়ির কেউ নই, কিন্তু সৌমেনের বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে আমাকে আপনি বিশ্বাস করতে পারেন। আমি আপনাদের পারিবারিক গোপনীয়তা কোনওদিন অমর্যাদা করব না। আমি জাস্ট নিজের চোখে জিনিসগুলোকে দেখতে চাই। আমার একটা খুব বাজে সমস্যা হল কৌতূহল না মেটা পর্যন্ত আমি তিষ্ঠোতে পারি না, মন আনচান করে। অস্থির হয়ে উঠি। ঠিক এই মুহূর্তে আমার কৌতূহল তুঙ্গে উঠেছে।'
সৌমিত্রবাবু শান্ত গলায় বললেন, 'সে তো আমি তোমাকে বলেইছি, তোমার পড়াশোনায় সন্তুষ্ট হলে পুরস্কার দেব। তুমিই হবে আমাদের বাড়ির বাইরে আর সৌরীন্দ্রমোহনের খুব বিশ্বস্ত গবেষকদের বাইরে প্রথম ব্যক্তি, যে ওই ঘরটার ভিতর ঢুকবে। তোমার সঙ্গে সৌমেনও আজ প্রথম ওই ঘরে ঢুকবে। কিন্তু আমার আস্থার সম্মান রেখো। আর বেরনোর সময় তোমাদের আগাপাশতলা সার্চ করব। কিছু মনে করবে না কিন্তু।'
সৌমিত্রবাবু একটা আলমারি সরিয়ে দেওয়ালের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটা সুইচে হাত দিতেই দেওয়ালের গা দিয়ে একটা ডালা খুলে গেল। চোখের সামনে একটা লোহার দরজা। উনি তাতে লাগানো তালা বিশেষ কায়দায় খোলার পর আমাদের নিয়ে এলেন ওঁদের সেই গোপন ঘরটায়। আমার তো চক্ষু চড়কগাছ! যেন মনে হচ্ছে, সত্যিই কোনও নর্থ আমেরিকান মিউজিয়ামে চলে এসেছি। দেওয়ালে টাঙানো অসংখ্য প্রত্নসামগ্রী। মুখোশগুলোকে নিয়ে আমার উৎসাহ বেশি। তাই ওদিকে চলে গেলাম। ছবিতে দেখা জিনিসগুলোকে নিজের চোখের সামনে আশরীর রোমাঞ্চ ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু কোথায় সেই শামানের দেওয়া হরিণের চামড়ার মুখোশটা? সেরকম কোনও মুখোশ তো টাঙানো নেই।
সৌমেনের বাবা হাত দশেক দূরে একটা চেয়ারে বসে আছেন খবরের কাগজ খুলে। আমি সৌমেনকে বললাম, 'আমাদের কিন্তু সেই শামানের মুখোশটা খুঁজে বের করতে হবে।'
ও বলল, 'থাকলে এখানেই কোথাও থাকবে। ওই দেখ ওই বাক্সগুলো। চল, ওগুলো দেখা যাক।'
বাক্সগুলোর ঢাকনা খুলতে কিছু টুকিটাকি জিনিস বেরিয়ে এল। যেমন ডাইন, মানে নোভাহোদের ব্যবহার্য কিছু বাসনপত্র, ওষুধওয়ালাদের হামান দিস্তে, সিলমাছের মমি করা পাকস্থলী, শ্বেতভল্লুকের দাঁতের পাটি, সিন্ধুঘোটকের গোঁফ, দাঁত, না-জানা কত জন্তুর হাড়, যেগুলো সম্ভবত ওদের পারলৌকিক কাজে লাগত। বাক্সগুলোর পিছনেই কিছু ড্রয়ার। ডান হাতেরটা টানতেই একটা কিম্ভূত মুখোশ বেরিয়ে এল। পাশেরটা টান দিতেই বেরিয়ে এল আরও একটা। এইভাবে বেরিয়ে এল আরও কিছু বেশ পুরনো কিছুটা বিবর্ণ মুখোশ। কেমন একটা ঘোর তৈরি হচ্ছিল অজান্তেই।
সৌমিত্রবাবুর নীচ থেকে ডাক এসেছে। অফিস থেকে ফোন এসেছে বলে উনি তড়িঘড়ি নীচে গেলেন। আমাদের দু-জনের সামনে তখন ওই ঘরে অবাধ স্বাধীনতা। হঠাৎ একটা ছেলেমানুষি পেয়ে বসল আমাদের দু-জনকে।
আমি বললাম, 'মনে কর আমরা দু-জন নোভাহো। ধর, ওদের দেশে পৌঁছে গিয়েছি।'
ড্রয়ার থেকে একটা মুখোশ তুলে নিয়ে ওকে বললাম, 'এটা তুই পর, আর এটা আমি।'
আমারটা মাথায় পরে বর্শা উঁচিয়ে ওর দিকে ধেয়ে গেলাম আদিম কায়দায়। সৌমেনও ধেয়ে এল।
দিব্যি মজা করছিলাম! কিন্তু এটা কী হল? আমার মাথা ঘোরা শুরু হয়ে গিয়েছে। মুখোশের চোখের জায়গায় দু'টো ফুটো আছে। তবু কিছু দেখতে পাচ্ছি না। চারদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে এল। তার মধ্যে বিন্দু-বিন্দু আলোর ফুলকি বড়-বড় বৃত্তে ফেটে পড়ছে। হারিয়ে গিয়েছে একটু আগের চারদিক। অদ্ভুত সব দৃশ্য দেখছি। অকল্পনীয় সব মুখ নাচছে। ভয়াবহ আকৃতির কিছু শরীর বড়-বড় চুল এলিয়ে সারা দেহে ঝাঁকি মেরে-মেরে কী অদ্ভুত সব নাচ নাচছে। নাকে বিশ্রী একটা গন্ধ পাচ্ছি। পশুরক্ত আর চামড়া ছাড়ানো লোমের গন্ধ মনে হচ্ছে।
আমার মুখ দিয়ে আশ্চর্য সব শব্দ বেরিয়ে আসছে। চিৎকার করছি। বিকট সুর করে কীসব মন্ত্র উচ্চারণ করছি। আমার চারপাশে আরও কিছু না হলে একশো পা দাবড়ানোর শব্দ আসছে কানে। সম্মিলিত চিৎকারে যেন কানের পর্দা ফেটে যাবে। আমার গা বমি-বমি করতে শুরু করল। আকাশে মিশমিশে কালো মেঘ করেছে। গুমগুম শব্দ হচ্ছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ ভেঙে পড়বে মাথায়। মেঘ ডাকছে কড়কড় শব্দে, বিদ্যুৎ ঝলকে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। ভয়ে বুকের রক্ত শুকিয়ে আসতে লাগল।
আচমকা আমার সর্বাঙ্গে একটা প্রবল ঝাঁকুনি লাগল। কিছু একটা উল্কাপাতের মতো ভয়ানক বেগে নেমে এসে প্রবেশ করল আমার ভিতরে। ভিতরে ঢুকে যেন খাঁচায় আটকা পড়া বেজির মতো ছুটে বেড়াচ্ছে। সে যে কী যন্ত্রণা, কী অস্বস্তি বলে বোঝাতে পারব না। যেন প্রাণ বেরিয়ে যাবে। সেই কষ্ট অসহনীয়! যেন আমার সারা দেহ ছিঁড়েফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে সেই প্রাণীটা। চোখের নিমেষে আমাকে আছাড় মেরে ছুড়ে ফেলে দিল মেঝেতে। আমি বেঁকে যাচ্ছি যন্ত্রণায়। আর বাঁচব না। কিছুতেই বাঁচা সম্ভব নয়। খামোকা মাথা ঠুকতে শুরু করলাম মাটিতে। কারা সব আমায় বাইরে থেকে জাপটে ধরেছে। আমি ত্রাহি ত্রাহি চেঁচাচ্ছি। দমবন্ধ হয়ে আসছে।
আমি কোনও রকমে উঠে প্রবল বেগে দৌড়তে শুরু করলাম। দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ছুটতে গিয়ে ধাক্কা খেলাম দেওয়ালে। তীক্ষ্ন কিছুতে আঘাত লেগে পাঁজরের কাছে বড়ো একটা ক্ষত তৈরি হল মনে হচ্ছে। ছিটকে পড়লাম। আবার ছুটতে চেষ্টা করলাম অন্ধের মতো। দু-বার ভুল করার পর খোলা দরজা খুঁজে পেয়ে প্রাণপণে বেরিয়ে এসে এলোমেলো ঘুরতে লাগলাম লাইব্রেরি ঘরে। বইয়ের তাকগুলোয় বারচারেক ধাক্কা খেয়েছি। ঘরে সাজিয়ে রাখা বিভিন্ন জিনিসপত্র লন্ডভন্ড হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। তার ওপর দিয়ে কেউ যেন আমায় ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
হঠাৎ মনে হল, বাতাসে পা নেই। ধনুকের ছিলার মতো শেষ পর্যন্ত টেনে রেখে কেউ যেন ছেড়ে দিল। ফোর ফর্টি ভোল্টের কারেন্ট শক খাওয়ার মতো শরীরটা তীব্র কম্পাঙ্কে কেঁপে ওঠে শূন্যে ভেসে রইল কিছুক্ষণ। মুখটা হাঁ হয়ে রয়েছে। ভিতর থেকে কিছু একটা ওখান দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত মনে হল। বেরিয়ে যাওয়ার হলে এক্ষুনি যাক। দরকার হলে ছিঁড়েখুঁড়ে বেরিয়ে যাক এই দেহ।
কষ্টটা চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছল। আর প্রচণ্ড একটা ঠেলা দিয়ে কণ্ঠনালীর পিছল হয়ে গলে গলা দিয়ে বেরিয়ে গেল বিশাল চেহারার অর্ধশরীরী কিছু একটা। যাই বেরোক, বোঝার অবস্থায় ছিলাম না। চারদিকে আকাশ ফাটানো চিৎকার করে উঠল সকলে। পশুদের আর্তনাদ শুনতে পেলাম। আগুনের হলকা জেগে উঠল চারদিকে। আমি দমকে-দমকে বমি করতে লাগলাম। এত বমি কোথায় ছিল কে জানে? মেঝেয় চিত হয়ে শুয়ে উগরে দিতে লাগলাম ভিতরে যা ছিল।
আমার সব দিকে আলো নিভে আসতে লাগল। নর্তকদের সেই সব বীভৎস চিৎকার ঝিমিয়ে আসছে। চোখের ধাঁধা মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। সব শব্দ মিলিয়ে গেল। আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই। যখন চেতনা ফিরল, দেখলাম, নার্সিং হোমের বেডে শুয়ে আছি। পাশে উদ্বিগ্ন মুখে বসে সৌমেন আর ওর মা, তাঁর পিছনে সৌমিত্রবাবু আর বাকিরা। একটু আগে শুনলাম ডাক্তার দেখে গিয়েছেন। আমি ওঠে বসার চেষ্টা করলাম। মাথাটায় চাপ ধরে রয়েছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন কেজি দশেকের পাথর চাপিয়ে দিয়ে গিয়েছে মাথার ওপর। আমার সারা শরীরে একাধিক আঘাতের দাগ, বুকের কাছের ক্ষতটায় অসহ্য ব্যথা। একজন নার্স ওগুলো ড্রেসিং করে ব্যান্ডেজ লাগাচ্ছেন। খুব দুর্বল লাগায় আবার শুয়ে পড়লাম।
সকালে সৌমিত্রবাবু আমাকে দেখতে এলেন। সকালে ওঠে সৌমিত্রবাবুর কাছে গেলে উনি শরীরের অবস্থা জানতে চাওয়ার পর বললেন, 'আমি ভাবতে পারিনি তুমি মুখোশটা পরে বসবে। আমি বারবার বলেছিলাম মুখোশ খুব বিপজ্জনক জিনিস। ব্যবহার না জেনে মুখোশ পরার ফল মারাত্মক হতে পারে। সৌমেনও আর-একটা পরেছিল। কিন্তু ওরটা ছিল সাধারণ মুখোশ। ওর কিছু হয়নি।'
'তা হলে কি আমারটা সেই শামানের মুখোশ ছিল? সৌরীন্দ্রমোহনকে দেওয়া সেই শামানের মুখোশ?' চোখ বড়-বড় করে জিজ্ঞেস করলাম।
'তাই হবে নিশ্চয়ই। যত দূর জানি, ওটা ছিল আঁধারদেবতা দিল- ইয়েহের মুখোশ। নোভাহো জ্যোতির্বিদ্যায় আগুনের রূপে ওই অপদেবতা প্লেইয়াড নক্ষত্রপুঞ্জের সঙ্গে জড়িত। প্লেইয়াডের অবস্থান কষে দেখলে বোঝা যাবে, এই মুহূর্তে আমাদের দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের সাপেক্ষে ঠিক কোন জায়গায় আছে?'
'প্লেইয়াড বলতে বৃষ রাশির সেই তারকাপুঞ্জ, যাকে আমরা কৃত্তিকা নক্ষত্রমণ্ডল বলি?'
'ঠিক তাই। লৌকিক বিশ্বাসে ভরসা রাখতে গেলে বলতে হয়, কোনও ভাবে যে-কোনও অজ্ঞাত কারণে দিল-ইয়েহে তোমার মধ্যে ভর করেছিল। কিন্তু তাকে ভিতরে নেওয়ার ক্ষমতা বা দক্ষতা না থাকার জন্য অঘটনটা ঘটে গেল। খুব বেঁচে গিয়েছ। ভয়ানক কোনও ক্ষতি হয়ে যেতে পারত। বাবা বেঁচে থাকতে আমাদের ওসব মুখোশের দশ হাতের মধ্যে ঢুকতে দিতেন না। অত মুখোশের মধ্যে কোনটা যে বিপজ্জনক কী করে জানা যাবে?'
'আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। কোথা থেকে কী ঘটে গেল? অলৌকিকে যদি বিশ্বাস না করি, তা হলে কি ওটা হিস্টিরিয়া ছিল? এই ক-দিনের পড়াশোনা আর কল্পনা মেশানো ভয়ানক এক মানসিক বিশৃঙ্খলা? কিন্তু কাল যা হয়ে গেল, সেটা কিছুতেই শুধু মানসিক বিকার হতে পারে না। চিন্তা করলে এখনও আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। সে যে কী যন্ত্রণা, কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। ভেবেছিলাম বাঁচবই না।'
'হিস্টিরিয়া বা অতিলৌকিক, কারণ যাই হোক, ফলটা যে কী মারাত্মক হতে পারে, সেটা তো চোখের ওপর দেখলাম। আমি স্টানড। একেবারে বজ্রাহত হয়ে গিয়েছিলাম। যাই হোক, আমি ওই মুখোশ বাড়িতে রাখব না। আজই ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই মিউজিয়ামে ফোন করব। ওরা এসে ওটা নিয়ে যাক।'
'কিন্তু সৌরীন্দ্রমোহনের নিষেধাজ্ঞা...?'
'কিছু করার নেই। বাড়িতে ওই রকম একটা ঘটনা দেখার পর উনি বেঁচে থাকলেও হয়তো এই কাজটাই করতেন।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন