তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়
ভিড়ভাট্টা মোটেও ভালো লাগে না অমিতাভবাবুর। না হলে বিকেলে জগিং করার জন্য ব্রিটিশ জমানায় তৈরি সরকারি কলেজের সামনের এই মাঠটার চেয়ে ভালো জায়গা আর কী-ই বা হতে পারত?
তাঁর বরং পছন্দ মেইন বিল্ডিং-এর ঠিক পেছনের নির্জন এলাকাটা। সাত-আটটা ঝুরিওয়ালা বট ছাড়াও বেশ কিছু পেল্লাই বিলিতি গাছের ঘন আওতা ওখানকার আকাশটাকে চাঁদোয়ার মতো ঢেকে রাখে পুরোপুরি। গরমকালের দুপুরবেলায় জায়গাটা তাই চিরকালই বড্ড লোভনীয় ছাত্রছাত্রীদের কাছে। বিকেল নামার পর থেকেই ছায়া ঘন হতে থাকে আর ছ'টা নাগাদ তো দেখে মনে হয় রীতিমতো অন্ধকার।
রানিং-শু্য আর শরীরচর্চার উপযোগী পোশাক পরে তিনি এই এলাকাটাতেই চক্কর দেন একা একাই। তীব্র গরমের দিনেও জায়গাটা বেশ ঠান্ডা, ঝিরঝিরে একটা হাওয়াও বয় চারপাশ থেকে। আঠেরোশো ছেচল্লিশ সালে তৈরি হওয়া এই রাজ্য তথা সারা ভারতের অন্যতম পুরোনো এই সরকারি কলেজের বিল্ডিংটি অতিকায় গথিক স্থাপত্যের। পেছন দিকের বিশাল বিশাল থামগুলোর পাশ দিয়ে দৌড়ে যাওয়ার সময় একদা ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র অমিতাভবাবুর মাঝে মাঝেই মনে হয় তিনি যেন কোনও মধ্যযুগীয় প্রাসাদের দুনিয়ায় চলে এসেছেন। ভিক্টোরিয়ান গথিক উপন্যাসের পটভূমির মতো গা ছমছমে দুনিয়ায়। তবু তার ভালো লাগে।
অফিস থেকে ফিরে, বাড়ির টুকটাক কাজটাজ সামলে এখানে আসতে মাঝে মাঝে সন্ধে হয়ে যায়। জায়গাটা ওই সময় একেবারে শুনশান তবু তার ভয় লাগে না কারণ এই জায়গাটা তার অনেকদিন আগে থেকেই চেনা। এই চত্বরের খানিকটা ওপরে প্রোটেস্টান্ট মিশনারি সোসাইটি পরিচালিত সেন্ট জনস হাইস্কুলে যেহেতু তার বিদ্যালয় জীবনের বেশিরভাগটাই কেটেছিল তাই অনেক আগে থেকেই এই পুরো তল্লাটটা তার হাতের তালুর মতো চেনা। স্কুল জীবনে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে এসে কতদিন যে এখানে কত খেলাধুলো করেছেন, বহু দুপুর সন্ধে এমনকী রাতেও আড্ডা দিয়েছেন চুটিয়ে— সে সব স্মৃতি এখনও জ্বলজ্বলে রয়েছে মনে।
প্রকাণ্ড এই কলেজ বিল্ডিংটা দিনের বেলায় গমগম করে কিন্তু রাত হলেই এই এলাকার লোকজনের মুখে মুখে ফেরা নানান গল্পগুজবের রেশ ধরে হয়ে ওঠে অদ্ভুত ভূতুড়ে। ছোটবেলাতেই কিছু কথা কানে আসত মাঝে মাঝেই— কলেজের পেছন দিকের লম্বা করিডর দিয়ে নাকি—গলা থেকে পা পর্যন্ত লম্বা সাদা পাদ্রির পোশাক পরা কে যেন একজন পায়চারি করেন। তাঁর মুখ বোঝা যায় না কিন্তু জনশ্রুতি বলে উনি নাকি এই কলেজের এক প্রাক্তন স্কটিশ প্রিন্সিপাল। নাম প্যাটারসন সাহেব। কলেজের সামনের বাগানে শ্বেত পাথরের স্মৃতি ফলক অনুযায়ী তিনি মারা যান উনিশশো চুয়াল্লিশ সাল নাগাদ। স্কুল লাইফে রাত করে কিছু ডানপিটে বন্ধুর সঙ্গে মিলে বেশ কয়েকবার সেই সাহেব ভূত দেখার চেষ্টা চালিয়ে ছিলেন, অমিতাভবাবু কিন্তু কিছুই দেখতে পাননি। ভূত বা অশরীরীরা নাকি অবিশ্বাসীদের চোখে ধরা দেন না কিছুতেই।
এখন এই চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে সেই রোমাঞ্চ আর নেই কিন্তু জায়াগাটার মায়াবী আকর্ষণ কাটাতে পারেননি। যথারীতি সেদিনও তিনি রোজকার মতো পাক মারছিলেন ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে মোটামুটি একটা বৃত্তাকার রানিং ট্র্যাক কল্পনা করে নিয়ে। কম করে তিরিশ পাক না মারলে ঠিক ঘাম ঝরবে না, ঠিকঠাক ক্যালরি বার্ন করতে না পারলে দৌড়ে আর লাভ কি? শারীরিক ফিটনেসটাকে জীবনের অন্যতম বড় সম্পদ মানেন তিনি, তার ওপর বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এসে পড়া মেয়েদের সঙ্গে লড়তে এই জগিং সেশনটার কোনও জুড়ি নেই। পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে একটানা দৌড়ানোর সময় অন্যদিকে খেয়াল করেন না। কানে পুরে নেন হেডফোন, পকেটে ফোনের সাউন্ড প্লেয়ার থেকে ওঠে আসে পছন্দসই সব গান। ভরা আষাঢ় মাস। বিকেল থেকে আকাশটা ছাই রং মেখে সাজছিল। মাথার ওপরটা গাছের ডালপালা দিয়ে ঢাকা তাই খেয়াল করেননি আকাশটা ইতিমধ্যে থমথম করছে, ঘন কালো ইস্পাত রং ধারণ করেছে। ঘনিয়ে উঠেছে বজ্রগর্ভ মেঘ, গুম গুম শব্দ করে ফুঁসতে লেগেছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ঝটাপটি লাগল পল্লবে পল্লবে, উড়তে লাগল ধুলো, শুকনো পাতা। ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করেছে টের পেয়ে ছোটার গতি কমান অমিতাভবাবু। কান থেকে হেড ফোন সরিয়ে দাঁড়ান একটা গাছের গায়ে হাত দিয়ে, সোঁদা গন্ধযুক্ত ভেজা হাওয়া এসে লাগে মুখে শরীরে।
আর মিনিট কয়েকের মধ্যেই বৃষ্টি নামবে আঁচ করে সরু পিচ রাস্তাটার পাশের ঝাঁকড়া গাছটার দিকে এগোন দ্রুত। ওর গোড়াতেই রাখা একটা প্লাস্টিকের কিট ব্যাগে ফোল্ডিং ছাতা আছে, আছে জলের বোতল, তোয়ালে। গাছটার নীচে পৌঁছতে যতটা দেরি, আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। ছাতা খুলতে যাওয়া বৃথা, যে বেগে হাওয়া বইছে তাতে নিমেষে উলটে গেল সেটার মাথাটা। হাওয়ার যে দাপট তাতে এগোনোর চেষ্টা মুর্খামি। গাছের গায়ে পিঠ দিয়ে, চোখমুখ বুঁজে গুটিসুটি মেরে দাঁড়ালেন অমিতাভবাবু। শুরু থেকে যে হারে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল তাকে মুষলধারা ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়।
কলেজের পেছনের বড় ভেপার ল্যাম্পটা দপদপ করতে করতে নিভে গেলে ঘুটঘুটে নিকষ কালো অন্ধকারের চাদরে ঢেকে গেল চারদিক। প্রচণ্ড শব্দে কড়কড়িয়ে একটা বাজ পড়ল ধারে কাছেই কোথাও। বাড়িতে ফোন করে স্ত্রী কন্যার খবর নিয়ে, জানিয়ে দিলেন উনি নিরাপদেই আছেন কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির পরিমাণ যেভাবে বাড়তে লাগল তাতে বুঝে উঠতে পারা যাচ্ছে না ঠিক কটা নাগাদ বাড়ি ফেরা যাবে। এতো মহাফ্যাসাদে পড়া গেল। এতোটা দুর্যোগের তেমন কোনও পূর্বাভাস ছিল না বেরনোর সময়!
প্রকাণ্ড যে গাছটার নীচে ঠাঁই নিয়েছেন তাতে মাথা ভেজার কথা না তবু বৃষ্টির ছাঁট এতই তীব্র যে গেঞ্জি ট্রাউজার ভিজে একসা। মোবাইলটা কিট ব্যাগের মধ্যে পুরে আপশোশ করতে থাকেন কেন বাইক আর রেনকোটটা নিয়ে এলেন না। এই ঘোর বর্ষাকালে ঝড় বৃষ্টির আশঙ্কা তো থেকেই যায় আকস্মিকভাবে। আবার কেঁপে উঠল আকাশ, দেখা গেল বিদ্যুতের দাঁত, ক্ষণিকের জন্য আলোকিত হয়ে উঠল আশপাশটা, আবার সব মিশকালো। কিন্তু ওইটুকু আলোর ঝলকানিতে উনি অদূরে কাকে যেন একটা দেখলেন মনে হল? মাথায় বড় একটা সাবেকি আমলের ছাতা, হাঁটুর খানিকটা নীচ অবধি বর্ষাতিটা ছড়ানো। ঈষৎ কোল কুঁজো একজন পুরুষ, সরু পিচের রাস্তাটা ধরে এগিয়ে আসছেন এইদিকেই।
নড়েচড়ে ওঠেন অমিতাভবাবু, পিচ রাস্তাটা যেহেতু গিয়েছে তার সামনে দিয়েই তাই লোকটাকে নিশ্চিতভাবেই তার সামনে দিয়ে যেতে হবে। ওয়াটার প্রুফ ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে দেখেন মাত্র সাড়ে সাতটা বাজে। এমন কোনও রাত না কিন্তু এভাবে আর কাঁহাতক দাঁড়িয়ে থাকা যায়। ভাবতে ভাবতে উলটে যাওয়া ছাতাটা খোলার চেষ্টা করছিলেন, আচমকা দেখেন লোকটা এসে দাঁড়িয়েছেন সামনে। বিদ্যুতের রুপোলি ঝলকানিতে আবছা বোঝা গেল অবয়বটা। হ্যাঁ বেশ কুঁজোই বটে, বেশ বৃদ্ধই মনে হচ্ছে, লম্বা চওড়া চেহারা, বর্ষাতির তলা দিয়ে গড়াচ্ছে জল, ছাতার হ্যান্ডেল ধরা হাতটা কাঁপছে। ভরাট জলদগম্ভীর গলায় লোকটা জিজ্ঞেস করলেন— 'আটকে গেছেন মনে হচ্ছে?'
—'হ্যাঁ, বৃষ্টিটা থামার জন্য অপেক্ষা করছি।'
—'মনে হয় না ঘণ্টা খানেকের মধ্যে কমবে। কী হল ছাতাটা খুলছে না?'
—'না, বেকায়দা হাওয়ায় উলটে গেছে।'
—'বাড়ি কোথায় আপনার, কাছেই না অনেকটা দূরে?'
—'বেশ খানিকটা দূরেই, গভর্নমেন্ট হাউসিং-এ।'
—'আমার বাড়ি সামনেই, কলেজ হোস্টেলের ঠিক পেছনেই। আপনি আমার বাড়িতে একটু বসে, বৃষ্টিটা থামার পর রওনা দিতে পারেন।'
—'না না কোনও সমস্যা নেই। এখানে এমনিতে সেফ-ই তো আছি।'
—'যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছে, যে রকম ঝোড়ো হাওয়া— বলা যায় না বাজ-টাজ পড়তে পারে, গাছের ডাল-ফাল ভেঙেও তো পড়তে পারে। আই থিঙ্ক ইটজ নট সেফ অ্যান্ড ওয়াইজ টু স্ট্যান্ড হেয়ার ফর লং।' লোকটা সামান্য কাশল। আবার একবার বিদ্যুতের ঝলকের আলোয় অমিতাভবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল— 'অ্যান্ড বাই দ্য ওয়ে আপনার মুখটা আমার খুব চেনা লাগছে, গলার স্বরটাও খুব চেনা!'
—'আমারও, আপনার গলাটা, বিশেষ করে যে অ্যাকসেন্টে ইংরেজিটা বললেন।'
—'আমি লুই প্রভাত সরকার আর আপনি ইফ অ্যায়াম নট মিসটেকেন অমিতাভ?'
—'হ্যাঁ আবসলিউটলি আমি অমিতাভ। ওহ মাই গুডনেস— আপনি লুই স্যার? লং রেনকোটের জন্য একেবারে বুঝতে পারিনি। কেমন আছেন স্যার, এই ঝড় বাদলায় বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন কেন? এইভাবে এতদিন পরে আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি!'
—'আছি একরকম, হাও এভার চলো আমার বাড়ি খানিকক্ষণ বসবে চলো। তুমি তো একেবারে ভিজে গেছ দেখছি, চলো আর এক মিনিটও দাঁড়িয়ে থেকো না। এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে জ্বর জ্বালা একটা বাঁধিয়ে বসবে দেখছি, এসো আমার ছাতার মধ্যে চলে এসো।'
কথা না-বাড়িয়ে ছাতাটার তলায় মাথাটা ঢুকিয়ে আনেন অমিতাভ গুপ্ত। লোকটা পা চালাতে থাকে দ্রুত, ওঁর সঙ্গে পা মেলাতে রীতিমতো হিমসিম খেতে হয় তাকে। লুই প্রভাতবাবুর বাড়িটা ছিল বয়েজ হোস্টেলের ঠিক পেছনেই, একসময় স্থানীয় ডন বসকো স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। ওঁর কাছে হায়ার সেকেন্ডারির সময় থেকে শুরু করে অনার্সের সেকেন্ড ইয়ার পর্যন্ত প্রাইভেটে ইংরেজি পড়েছিলেন অমিতাভবাবু। অসাধারণ পড়াতেন, অগাধ পাণ্ডিত্য কিন্তু সিলেবাসের পড়াশুনোয় একেবারেই মন দিতেন না। ওর প্যাশন ছিল থিয়েটার— শেক্সপিয়ারিয়ান থিয়েটার। নিজেই শেক্সপিয়ারের মাস্টারপিসগুলো অনুবাদ করতেন বাংলায়। নিজেই ডিরেকশন দিতেন, অভিনয় করতেন। গাঁটের কড়ি খরচা করে খুলেছিলেন 'ফিনিক্স' বলে একটা অ্যামেচার নাট্যদল।
একটু ভালো ছাত্র পেলেই উনি প্রাণপণ চেষ্টায় তাকে নিজের থিয়েটারে ঢোকানোর চেষ্টায় মেতে উঠতেন। পরীক্ষার উপযোগী কায়দায় টেক্সট পড়ানো, নোট লিখে দেওয়া, সাজেশন দেওয়া— এসব একেবারেই ধাতে ছিল না তাঁর। সেই নিয়ে ওনার একটা বদনাম তৈরিও হয়ে গিয়েছিল, ওঁর ব্যাচে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমছিল কিন্তু অমিতাভবাবুর মতো তিন চারজন টিকে ছিল তবুও। ওঁর নাটকগুলোর মঞ্চায়নের কাজে ওরা যাকে বলে জান লড়িয়ে দিয়েছিল সাধ্যমতো। লুইবাবুর অ্যাজমা ছিল পুরোদমে। ওদের সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার মাঝামাঝি সময় নাগাদ স্যার ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়েন, চিকিৎসার জন্য ওর দুই মেয়ে ওকে নিয়ে যায় কলকাতায়। তারপর থেকে এই আজকের আগে কখনও দেখা হয়নি আর।
—'অনার্স কমপ্লিট করেছিলে তো, এম.এ?'
—'হ্যাঁ, স্যার, অনার্সটা পাশ করেছিলাম, কিন্তু এম.এ-টা শেষ করতে পারিনি। বাড়ির আর্থিক অবস্থা বিশেষ ভালো ছিল না তো জানতেন। তাই এম.এ ফার্স্ট ইয়ারে পড়াকালীন মিসেলেনিয়াস সার্ভিসের পরীক্ষায় বসে কনজিউমার ওয়েলফেয়ার অফিসার হিসেবে জয়েন করি বহরমপুরের দিকে। তারপর প্রোমোশন পেয়ে এখন গেজেটেড র্যাঙ্ক পেয়েছি, ডেপুটি অ্যাসিটেন্ট ডিরেক্টর হয়ে জয়েন করেছি এই ডিস্ট্রিক্ট অফিসে।'
—'সে ভালো করেছ, কিন্তু এম.এ.-টা করলে না কেন। শেক্সপিয়ারের অন্তত কুড়িটা নাটক খুঁটিয়ে না-পড়লে আমি মনে করি এ জীবনটাই বৃথা। কী ভালো ইংরেজি লিখতে তুমি, লিটারেচার পড়ার ফুললি অ্যাবল অ্যান্ড ওয়ার্দি স্টুডেন্ট ছিলে। ইস কী ভালো টিচার হতে পারতে। তোমার মতো শিক্ষক পেলে স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা কতটা উপকৃত হতে পারত। আমার এখনও মনে আছে আমার অনুবাদের কিং লিয়ারে তুমি কী সুন্দর কেন্টের রোলটা প্লে করেছিলে, উইংসের পাশ থেকে কী ভালো প্রম্পট করতে, টিকিট বেচার জন্য কী অকথ্য পরিশ্রম করতে বাড়ির নজর এড়িয়ে। তোমার মতো ছাত্রদের একসময় পড়িয়েছি এ আমার অসীম সৌভাগ্য।'
—'লজ্জা দেবেন না স্যার, আপনার মতো একজন মানুষকে টিচার হিসেবে পেয়েছিলাম, সৌভাগ্যটা একেবারেই আমাদের।'
—'ওই জন্যেই তো তুমি আমায় ভুলে গেছ কিন্তু আমি তোমায় ভুলতে পারিনি।' অভিমানী শ্লেষের সুরে বলে উঠল লোকটা।
কথা বলতে-বলতে ওরা দুজন একটা পোড়ো দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। প্ল্যাস্টার চটে ইট বার হয়ে আসা লতা আগাছায় ভরা একটা অন্ধকার বাড়ি। বাড়িটা অমিতাভবাবুর চেনা, কিন্তু এ কী দশা। লোকটা সিঁড়ি দিয়ে খানিকটা ওঠে বলল— 'কী হল, দাঁড়িয়ে পড়লে কেন, ওঠে এসো। এ বাড়ি তো তোমার অচেনা না?'
—'হ্যাঁ স্যার, কিন্তু বাড়িটার এ কী অবস্থা?' সিঁড়ির প্রথম ধাপে ওঠতে গিয়ে মাকড়সার জাল জড়িয়ে গেল মুখে। হাত দিয়ে কোনওরকমে সেটা ছাড়িয়ে আরও দুধাপ ওঠে থমকে দাঁড়ালেন, পাঁশুটে একটা গন্ধ আসছে নাকে— 'ধাপগুলো ঠিক বুঝতে পারছি না, অনেকদিন পরে এলাম তো। স্যার আলোটা জ্বালুন না।'
—'আলো নেই। অনেকদিন বিল মেটানো হয়নি, পাওয়ার হাউস থেকে ইলেকট্রিক-লাইন কেটে দিয়ে গেছে। একা থাকি, অসুবিধে হয় না। আন্দাজ মতো পা ফেলে ওঠে এসো না, সোজা ওঠে বারান্দায় চলে এসো।' কোনওরকমে হাতড়াতে হাতড়াতে ওপরে ওঠে আসেন অমিতাভ বাবু। হোঁচট খেয়ে প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছিলেন চৌকাঠটা ডিঙোতে গিয়ে।— 'স্যার আপনি কোথায়?'
—'এই তো চৌকিটার ওপর বসে আছি, তুমি আমার ওই লোহার চেয়ারটায় বসো।'
চেয়ারটার পুরু ধুলো আর শুকনো পাতার ওপর বসে পড়েন অমিতাভ। লুই স্যার উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে ওঠেন— 'তোমাকেও পেয়ে গেলাম, যেমন করে পেয়েছি তোমাদের বন্ধুদের বেশিরভাগ জনকে — সেলিম, জনসন, প্রবুদ্ধ, মিহির, কৃষ্ণজিৎ। অতনুকে অনেক খুঁজেছি পাইনি। ও কোথায় আছে জানো?'
—'শুনেছি তো ব্যাঙ্গালোরে।'
—'তাহলে ওকে আর পাওয়া যাবে না। দরকার নেই, তোমাকে দিয়েই হবে। ভাবছি দলটাকে আবার নতুন করে তৈরি করব। এখন তো সেই আর আগের দিন নেই। কত ফেসিলিটিজ বেড়েছে, দারুণ সাউন্ড, লাইট, টেকনোলজি, প্রপস। হলটাও তো এক্সেলেন্ট হয়েছে দেখি আজকাল। ফিনিক্স আবার উড়বে, আবার নতুন করে টাউন কাঁপাবে। ভাবছি এবার কিং লিয়ারটা নামাব, তোমাদের তো পার্টগুলো মোটামুটি তৈরিই ছিল, একটু ঝালিয়ে নিলেই হবে, মানে দৌড়াবে।
আগের মতো তোমার হাতে সময় নেই জানি, তবু দিতে হবে, সপ্তাহে একদিন করে অন্তত দিতে হবে। আমি জানি, স্যার বললে তুমি ফেলতে পারবে না।'
—'না মানে ইয়ে মানে স্যার হ্যাঁ...।' ঢোঁক গেলেন অমিতাভবাবু।
বাইরে বৃষ্টির বেগ বেড়েছে বই কমেনি, প্রবল বেগে হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগছে বাড়িটার গায়ে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে এখন রীতিমতো শীত করছে। লুই প্রভাত সরকার বলে উঠলেন— 'কী দারুণ আবহাওয়া! আহা কিং লিয়ারের স্ট্রম সিনটা অভিনয় করার এক্কেবারে আদর্শ পরিবেশ! কি বলো? মনে আছে সেই ভয়ানক ঝড়ের রাতে উন্মাদপ্রায় রাজা লিয়ার। গনেরিল আর রেগান, তাঁর বড় ও মেজ দুই মেয়ের প্রতারণায় রাজ্যহারা, সর্বস্বান্ত, অসহায়, রাজা লিয়ার...?'
শুনে চমকে উঠলেন অমিতাভ গুপ্ত। বলে কী লোকটা! এই ভয়ানক দুর্যোগের রাতে, ঝড় বৃষ্টির দাপটে জেরবার এইরকম একটা ভূতুড়ে বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলে কিনা কী দারুণ ওয়েদার! মাথা-টাতা ঠিক আছে তো? বজ্রপাতের মতন চেঁচিয়ে উঠলেন লুই স্যার— 'স্ট্যান্ড আপ অমিতাভ। রাজা লিয়ারের সেই ঝড়ের দৃশ্য অভিনয় করার মতো এমন উপযুক্ত ওয়েদার আর পাওয়া যাবে না। মিস করতে চাই না, আমার করা অনুবাদ, তোমার কিছু কি মনে আছে? আমি লিয়ারের পার্টটা করছি, তুমি ফুল, আই মিন ভাঁড়ের পার্টটা বলো।'
—'আমার মনে নেই স্যার, সেই কবেকার কথা।'
—'তাহলে আমিই বলছি শোনো। এই বয়সে সেই ক্ষমতা আর নেই তবু কেমন হচ্ছে দেখত।'
রেনকোটটা খুলে ফেলল লোকটা। বিদ্যুতের ঝলকানিতে যেটুকু দেখা গেল— সাদা একটা ফতুয়া আর ঠেঁটো পাজামা পরা অতি শীর্ণ এক বৃদ্ধ, গালে বুক অবধি লম্বা দাড়ি আর মাথার ধপধপে ঘাড় ছাড়ানো চুলগুলো উড়ছে হাওয়ার অনুকূলে। কোটরাগত চোখদুটো যেভাবে ঠিকরে বেরোল তাতে বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল অমিতাভবাবুর, দু'হাত আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিলেন লুই স্যার, ঘড়ঘড়ে শ্লেষ্মা জড়ানো গলায় চিৎকার করে উঠলেন— 'বও বও হে প্রচণ্ড ঝড়/আকাশের গালের চামড়া ফাটিয়ে তীব্রতম বেগে বও। বিদ্যুৎ গর্জাক, কালবৃষ্টি নামুক, মহাপ্লাবন আসুক/ এমন উচ্ছ্বাসে বও যাতে গির্জার চূড়া ডুবে যায়, ডুবে যায় হাওয়া মোরগের ডানা,/আকাশে আগুন জ্বলুক— ছিটকে আসা সেই আগুনে চৌচির হয়ে যাক পাথর, কঠিন ওক গাছের কান্ড।'
লাফিয়ে-লাফিয়ে উঠছে লোকটা, গলা ফাটানো চিৎকারে কেঁপে উঠছে অমিতাভবাবুর শিরদাঁড়া— 'বৃষ্টি, হাওয়া, বজ্র, আগুন— তোমরা তো কেউ আমার মেয়ে নও/ তোমাদের কাউকে তো আমি জন্ম দিইনি, রাজ্য দিইনি, তোমাদের কারুর তো আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার কোনও দায় নেই/ তোমাদের কাউকেই তো আমি নিষ্ঠুরতার অভিযোগে অভিযুক্ত করতে পারি না।/ তোমরা চাইলেই তো আমায় এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পারো/ এই তো আমি হাজির তোমাদের সামনে/ এক হতভাগা অথর্ব দুর্বল ঘৃণ্য এক বৃদ্ধ...।' বলেই মাটিতে আছড়ে পড়লেন লুই স্যার। লম্বা দেহটাকে ধনুকের মতো বেঁকিয়ে এমনভাবে মেঝেতে পড়লেন জোর একটা শব্দ হল—'কী হল স্যার, লাগেনি তো?'
—'লাগবে কেন? ইটজ অল অ্যাক্টিং, কেমন হয়েছে?'
—'দারুণ স্যার।'
—'না না কিসসু হয়নি, তোমরা জানো না কিসসু হয়নি।' ঝাঁকি মেরে উঠল শরীরটা, তারপর এক ঝটকায় ওঠে ভাঙা দরজাটা দিয়ে ভেতরে ছুটে চলে গেল।
—'স্যার স্যার, কোথায় গেলেন স্যার?' চিৎকার করে উঠলেন অমিতাভ গুপ্ত। কিন্তু কোথায় কে, বিন্দুমাত্র সাড়াশব্দটি পাওয়া যাচ্ছে না। ভাঙা দরজাটার মুখে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি— 'স্যার স্যার, কোথায় আপনি? কোথায় চলে গেলেন?' ঘরটার ভেতরে চাপ চাপ অন্ধকার। কিট ব্যাগ থেকে মোবাইল টর্চটা বার করে তাক করলেন সারা ঘরের আনাচে কানাচে। পুরো ঘরটা ফাঁকা, কেউ কোত্থাও নেই। বাইরে যাওয়ারও কোনও রাস্তা নেই। কড়ি বরগা থেকে ঝুলছে কিছু বাদুড়, ইঁদুর ছুঁচোর বিষ্ঠার গন্ধ ঘরময়। এ কী করে সম্ভব? জলজ্যান্ত একটা লোক কি হাওয়া হয়ে গেল নাকি?
পাশের ঘরটা বাইরে থেকে তালা বন্ধ। দোতলায় আর এমন কোনও জায়গা নেই যেখানে কোনও মানুষ ঢুকে যেতে পারে। তাহলে কোথায় গেল?— 'স্যার স্যার'। অমিতাভবাবু আর্তনাদের মতো চিৎকার করলেন আবার কিন্তু এ কী ভয়ানক নৈঃশব্দ! জলে ভেজা হাওয়া উন্মাদের মতো ছুটে এসে লাগল বুকে মুখে। যেন হাওয়া নয়, আকাশের বুকে ধাক্কা খেয়ে আসা রাজা লিয়ারের হাহাকার!
বুকের রক্তে চুমুক মারল ভয়, শিরশিরিয়ে উঠল প্রতিটা স্নায়ু। গলা শুকিয়ে কাঠ, পাঁজরে হাতুড়ি পিটছে হৃৎপিণ্ড। ভেতর ঠেলে ওঠে এল হাড় হিম করা একটা ভয়ের ধাক্কা। কিট ব্যাগ-ফ্যাক সব ফেলে মোবাইলের আলোতে বাইরের পথটা ঠাহর করে নিয়ে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতে লাগলেন। কোনওরকমে ভারসাম্য রেখে সিঁড়িটা পেরিয়ে একতলায় নেমে প্রাণপণে ছুটতে লাগলেন। বৃষ্টি পড়ছে, তবে হাওয়ার বেগ অনেক কম। জীবনে কখনও এর চেয়ে জোরে ছোটেননি তিনি।
সারারাত বিছানায় ছটপট করতে থাকেন অমিতাভবাবু। ঘটনাটার কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পান না আকাশ পাতাল ভেবেও। সকালে আকাশ মেঘলা কিন্তু বৃষ্টিবাদল নেই। বাজারের থলে নিয়ে মোটর সাইকেলে চেপে পৌঁছে যান সরকারি কলেজের বয়েজ হোস্টেলের কাছাকাছি। পেছনের গলিটায় ঢুকে পড়েন সাহসে ভর করে। লুইবাবুর বাড়ির সামনেটায় গিয়ে দাঁড়ান। দিনের আলোয় স্পষ্ট একেবারেই পরিত্যক্ত একটা বাড়ি, বাসযোগ্যতার চিহ্ন মাত্র নেই কোথাও। উনি হাঁ করে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দেখে এক পথচারী ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করেন— 'কী দাদা, কাউকে খুঁজছেন?'
—'হ্যাঁ, এই বাড়িটায় আমার একজন মাস্টারমশাই থাকতেন। ওনার খবর কিছু দিতে পারেন?'
—'হ্যা, লুই সরকার বাবু তো? কিন্তু উনি তো বছর পাঁচেক হল মারা গিয়েছেন। শেষদিকে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন, এই বাড়িতে একাই থাকতেন। এই বাড়িতেই মরে পড়েছিলেন, শেষে এই পাড়ার আমরা কজন বডি উদ্ধার করে চার্চ সোসাইটির হাতে তুলে দিই।'
—'সে কী? কী বলছেন?' ফ্যাকাশে চোখে তাকিয়ে থাকেন অমিতাভবাবু।
—'আপনি অনেক বছর পরে এলেন মনে হচ্ছে এ'তল্লাটে।'
—'না মানে হ্যাঁ, ইয়ে মানে— আমার সঙ্গে শেষ যখন দেখা তখন উনি গুরুতর হয়েছিলেন। ওর দুই মেয়ে ওকে কলকাতায় চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান।'
—'সে আমিও জানি, আমিও ছোটবেলায় ওঁর কাছে পড়েছি। এও জানি চিকিৎসায় উনি সুস্থ হয়ে ওঠেছিলেন, দুই মেয়ের বাড়ি ভাগাভাগি করে থাকতেন। যতদূর শুনেছি ওদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উনি নাকি কাউকে কিছু না বলে এই বাড়িতেই পালিয়ে আসেন। তখন প্রায় মানসিক ভারসাম্যহীন, এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতেন আর ঘনিষ্ঠ মহলে বলতেন অকৃতজ্ঞ সন্তানদের বাবা হওয়ার অভিশাপের কথা। মেয়েরা ওর খোঁজে এখানে আসে, ওকে জোর করে বাড়িটা ওদের নামে লিখিয়ে দেওয়ার চাপ দিতে থাকে। উনি রাজি না হওয়ায় ওরা ওঁকে ওই রকম দুরবস্থার মধ্যে ফেলে চলে যায়।'
—'সে কী?' আঁতকে ওঠেন অমিতাভবাবু।
—'ওঁর চলে যাওয়ার পরে মেয়েরা বেশ কবার এখানে এসেছিল। বাড়িটা বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল অনেক কিন্তু পারেনি।'
—'কেন?'
—'কারণ বাড়িটা নাকি ভূতুড়ে তাই কেউ কিনতে চায়নি। এলাকার লোকে বলে রাতের দিকে এই গলিটা দিয়ে যাওয়ার সময় অনেকেই নাকি দোতলার বারান্দায় স্যারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। সত্যি মিথ্যে জানি না কিন্তু এদিকে আমরা পড়েছি মহাবিপদে। এই রকম একটা বাড়ি পাড়ার মধ্যে থাকাও তো ঠিক না, আবার স্যারের স্মৃতি বলেও একটা ব্যাপার আছে। আমাদের ওয়ার্ড কাউন্সিলার এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।'
শুকনো ঢোঁক গেলেন অমিতাভবাবু। ভদ্রলোকের দিকে ভ্যালভেলে দৃষ্টিতে তাকিয়ে সৌজন্যস্বরূপ যাচ্ছি বা আসছি কিছু না-বলেই হনহনিয়ে হাঁটা লাগান পেছনে।
—'ও দাদা, ও দাদা।' পেছন থেকে ডাকেন ভদ্রলোক। —'এই বাইকটা তো আপনার, ফেলে চলে যাচ্ছেন তো!'
—'ওহ! সব দেখে শুনে মাথাটা ঠিক কাজ করছে না।' দৌড়ে এসে বাইক স্টার্ট করেন অমিতাভ গুপ্ত। প্রচণ্ড জোরে ছোটাতে থাকেন গাড়ি। কিন্তু স্যার কি পরের সপ্তাহে আবার আসবেন? উনি যে ওই বললেন না, সপ্তাহে অন্তত একবার ওঁর সঙ্গে রিহার্সালে বসলেই হবে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন