মিসেস উইলিয়মসন

তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়

এই কোণের ফ্ল্যাটের একজন তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়— সুইমিং পুলের ওপারের ফ্ল্যাটটার দিকে আঙুল দেখিয়ে আমার স্ত্রী বলল।

পদ্মিনী মাঝে মাঝেই আমাকে নানা দ্ব্যর্থক কথাবার্তা বা ধাঁধায় ফেলে মজা দেখে। সেক্ষেত্রে আমি অবশ্য ওকে ব্যাপারটা খোলসা করতে বলি না, ওই ধীরে ধীরে ব্যাখ্যায় নেমে আসে। আমি কখনই জিজ্ঞেস করি না লোকটা পুরুষ না মহিলা, কমবয়সি না বয়স্ক বা কেনই বা সে আমার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে পড়ল।

প্রতিবেশীদের মুখে শুনেছি উনি নাকি ভারতবর্ষ সম্পর্কে অনেক কিছু পড়েছেন। পদ্মিনী বলল— এক বিধবা মহিলা। তখন সে নামটা বলেনি, যদিও তাতে কিছু এসে যায় না। নিশ্চয়ই কোনো খ্যাপাটে আমেরিকান হবে যে অতীন্দ্রিয় ধ্যান, যোগা, কর্মযোগ, পুনর্জন্ম নিয়ে আমার মাথা খাবে। আমেরিকায় ভারতীয় দর্শনের অতিথি অধ্যাপক সে এক অদ্ভুত জীব। যে কেউ তাকে রহস্যময় প্রাচ্য সম্পর্কিত কৌতূহল মেটানোর মাধ্যম করে নেয়।

ভাবলাম পদ্মিনীর কাছে জানতে চাইব— ভদ্রমহিলার সঙ্গে ওর কোথায় দেখা হল। কিন্তু সে সুযোগ না দিয়ে সে নিজেই বলে চলল— আজ সকালে মিসেস পেপ্পারের বাড়ি গিয়েছিলাম ইস্ত্রি করাতে। ওই বলল মিসেস উইলিয়মসনের কথা। খুবই নিঃসঙ্গ একটা মানুষ। আমাদের ওর সঙ্গে দেখা করা উচিত।

আজ সকালে পদ্মিনী তাহলে ল্যানড্রমাট ক্লাবে বেশ খানিকক্ষণ গল্পগুজব করেছে। জায়গাটাকে আমি ওই নামে ডাকি, কারণ ওখানে জামাকাপড় ইস্ত্রি করাতে গিয়ে প্রাত্যহিক গৃহকর্মে বিরক্ত গৃহবধূরা জমিয়ে আড্ডা দেয়। ওদের পড়ার জন্য মালিক গাদাগুচ্ছের মহিলাদের ম্যাগাজিন, সত্যি প্রেমের গল্প, গৃহসজ্জার টুকিটাকি জাতীয় পত্রিকা টেবিলের ওপর ঢেলে রেখেছে।

ওই কোণের ফ্ল্যাটটাকে আমি বেশ ভালোই চিহ্নিত করতে পেরেছি। পুব দরজা দিয়ে ঢুকে প্রায়ই ওটার সামনে দিয়ে হেঁটে আমি আমাদের কমপ্লেক্সে ঢুকি। ভেবে আশ্চর্য লাগে ওই ফ্ল্যাটের জানালাগুলো সবসময় কালো পর্দা দিয়ে ঢাকা থাকে— এমনকী শীতের উজ্জ্বল বিকেলগুলোতেও। মূল দরজাতো বন্ধই, সামনের লনটাতেও কাউকে কখনো হাঁটতে দেখিনি। সুইমিংপুলের ঠিক পাশে হলেও শিশুরা ওটার ধারে কাছেও ঘেঁষে না।

পরদিন ওই পুব দরজা দিয়েই ফিরছিলাম। মালি ঘাস ছাঁটছে পুলের কাছে। সদ্য কাটা ঘাস জমিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্বাস নেবার জন্য মালির সাথে একটু গল্প জুড়ে দিলাম।

—'কেমন আছেন মিস্টার গ্রীন?'

—'ভালো, আপনি কেমন আছেন প্রফেসর?' উষ্ণভাবে সে বলল— 'এইমাত্র গোলাপগুলোর ব্যবস্থা করে এলাম। আপনি জানেন সেটা মেয়েদের চুল সাজানোর মতোই সূক্ষ্ম কাজ।' আমি জানি সে বেশ এক লম্বা গল্প শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আসলে ওর সঙ্গে তেমন তো কেউ কথা বলে না— কর্মরত অবস্থায় ওর দিকে তাকানোরও প্রয়োজন বোধ করে না কেউ। সে অভ্যাসমতো তার কাজ করে যায়— গাছে জল দেয়, আগাছা ছাঁটে, কীটনাশক ছড়ায়।

—'জানেন প্রফেসর আজ সকালে আমি লিলিদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ গল্প করেছি— ওরা খুবই প্রতিক্রিয়াশীল। ওদের পাঁপড়িগুলোকে দেখেছেন— ঠিক যেন মানুষের জিভের মতো। ক'জনের আর ফুলেদের সঙ্গে কথা বলার ফুরসত আছে।'

—'প্রায় কারোরই নেই। আচ্ছা মিস্টার গ্রীন ওই দিকে'— আমি মিসেস উইলিয়মসনের বাড়ির দিকে নির্দেশ করে বললাম— 'লনে একটাও ফুল নেই, শুধুই আগাছা।'

'ও ওই মহিলা' একটু বিরক্ত মুখে মিস্টার গ্রীন বলে—' উনি এক অদ্ভুত জিনিস। আমাকে দেখলেই বলে এদিকে কোনো শব্দ হবে না— যাও যাও। শান্তি চাই— কবরখানার শান্তি-নিঃশব্দ। এমনকী ঘাস ছাঁটার শব্দও ওর অসহ্য।' ঘাস কাটা থামিয়ে গ্রীন বলতে থাকে— 'ওর স্বামীকেও আমি চিনতাম। একই রকম মনমরা ছিল। দু'জন দুজনার সাথে আদৌ কথাবার্তা বলত কিনা কে জানে! দুটোই মরার মুখোশ।'

খুবই তীক্ষ্ন ও অনুভূতিশীল পর্যবেক্ষণ। আমার চিরকালীন বিশ্বাস খুব সাধারণ মানুষেরও শিল্পীদের মতোই কল্পনা ও অন্তর্দৃষ্টি থাকে।

'বিশ্বাস করো পরের জন্মে তোমার মতো বাগানের মালি হতে চাই। তুমি তো জানো আমরা হিন্দুরা পরজন্মে বিশ্বাসী।'

'হ্যাঁ শুনেছি, আপনি নিশ্চয়ই বিনয় করছেন। নাহলে একজন প্রফেসর বাগানের মালি হতে চায় কখনো?' হেঁটে চলে যাবার সময় ভাবছিলাম মিসেস উইলিয়মসন সম্পর্কে বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য জোগাড় করা গেল। সামনের শুক্রবার তো আবার ওঁর সঙ্গে দেখা করার কথা। মিসেস পেপ্পারই অ্যাপয়েন্টমেন্টটা ঠিক করেছে।

শুক্রবার বিকেলটা এল। আমি আর পদ্মিনী ওর বাড়ির দরজার সামনে এলাম। ডোর বেল বাজালাম। ভেতরটা গা ছমছমে নিস্পন্দ। পদ্মিনী দরজায় খটখট করল। একটা কর্কশ শব্দ কানে এল। কিছু একটা মেঝের ওপর দিয়ে ছেঁচড়ে এগিয়ে আসছে। হুইল চেয়ারে বসে মিসেস উইলিয়মসন দরজা খুলে দিলেন।

'ভেতরে আসুন মিস্টার ও মিসেস কৃষ্ণন'। একটুকরো কষ্টার্জিত হাসি দিয়ে উনি আমাদের আপ্যায়ন করলেন।

'ধন্যবাদ।' আমরা বসার ঘরের দিকে এগোলাম ওর পিছন পিছন। উনি হাতছানি দিয়ে ওর সামনের সোফায় আমাদের দু'জনকে বসালেন। আমার চোখ আটকে গেল একটা কাঠের স্ট্যান্ডের ওপর বসানো একটা লোকের পূর্ণদৈর্ঘ্য-মানুষ মাপের ফটোগ্রাফটার ওপর।

—'ওটা আমার স্বামী ক্রিস।' দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে উনি বললেন। 'ঠিক মনে হচ্ছে ও রক্তমাংসের শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে— দশ বছর আগে আমি ওকে হারিয়েছিলাম। কিন্তু এখনও আমি ওর অস্তিত্ব আমার চারপাশে অনুভব করি সবসময়— ঘুমে, জাগা অবস্থায়।'

আমার যা মনে হল ক্রিস এক লিকলিকে কৌণিক শরীর আর খুদে খুদে চোখবিশিষ্ট লোক ছিলেন। একমাত্র চোখে লাগার মতো ওর কপালটা— স্পষ্ট, চওড়া।

—'উনি একজন ইনসিওরেন্স এজেন্ট ছিলেন, যিনি বিশ্বাস করতেন জীবন বীমা পলিসিই মৃত্যুর বিরুদ্ধে মানুষের একমাত্র সুরক্ষা কবচ'।

আমি যান্ত্রিকভাবে মাথা নাড়লাম ঠিকই কিন্তু নিজের জীবনে কখনও একটাও বীমা পলিসি করার প্রয়োজন বোধ করিনি। আমার চোখ এবার গিয়ে পড়ল মিসেস উইলিয়মসনের ওপর। যদিও ওঁর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকিনি, পাছে উনি ভেবে বসেন ওঁর দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছি।

তার বয়স আশি মতো হবে। মুখের চামড়ায় জ্যামিতিক কুঞ্চনরেখাগুলো গেঁথে বসেছে। চোখদুটোয় কেমন জল-জল ভাব। পুরু ঠোঁট। হাতগুলো পাটকাঠির মতো সোজা ওঠে গিয়ে মৃত পাখির সুতীক্ষ্ন নখরের মতো বিস্তৃত হয়ে শেষ হয়েছে।

—'আমি অনেকদিন থেকেই আপনার সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় আছি। আমি আপনার একটা বই পড়েছি— এই যে এখানে...।' ওঁর আঙুলের নির্দেশ অনুসারে চোখ গিয়ে পড়ল টেবিলে রাখা আমার লেখা একটা বইয়ের ওপর। 'হিন্দু কনসেপ্ট অব লাইফ'।

—'ধন্যবাদ।' আমাকে অপ্রস্তুত লাগল। পদ্মিনীকেও খুব একটা সন্তুষ্ট মনে হল না।

মহিলার ওপর থেকে সরে আমার চোখদুটো ঘুরতে শুরু করল ঘরের অন্যত্রে। দেওয়ালে এক বিশালাকৃতি ঝিনুকের খোল ঝুলছে, তার নীচে প্রবাল ও রঙিন পুঁথির মালা। তার পাশে এক নব্য বিবাহিত দম্পতির ছবি টাঙানো।

'ওটা ক্রিস আর আমি; ছবিটা বিয়ের পর চার্চ থেকে বেরিয়ে তোলা।'

'সুদর্শন দম্পতি।' ওঁকে খুশি করতে বললাম। যদিও ছবিটার মধ্যে সৌন্দর্যের ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাইনি। বরং ওঁদের দুজনকে পুলিশ অফিসার মনে হচ্ছিল।

—'আমি ক্রিসকে কখনও ভুলতে পারিনি।' উনি খুব করুণ সুরে বললেন— 'আমার আত্মা যদি ওর সাথে কথা বলতে পারত! ওকে ছুঁতে পারত, ওর কথা শুনতে পেত!'

—'আত্মা তো হাওয়ার মতো আকারহীন, অস্থূল।' ওঁকে শুধরে দিয়ে আমি বললাম— 'আত্মা আমাদের অস্তিত্বের সার নির্যাস, শরীরটা তো শুধু বাইরের আবরণ।' কেন যে মন্দিরের পুরোহিতদের মতো জ্ঞান দিতে শুরু করলাম কে জানে!

—'হ্যাঁ, প্রফেসর, আমি জানি।' উনি বলতে থাকেন— 'তবু আমি কল্পনা করি... বহুবার ভেবেছি কোনো এক মরণোন্মুখ মানুষের আত্মার মাধ্যমে আমি ক্রিসের সাথে যোগাযোগ করব। ঠিক মৃত্যুর আগের মুহূর্তে সেই ব্যক্তির সাথে কথা বলে তার মাধ্যমে আমি আমার বার্তা পৌঁছে দেব— ক্রিসকে জানাবো আমি ভালো আছি, আমাদের নাতনির একটা ছোট্ট মেয়ে হয়েছে, যে নগদ টাকা সে রেখে গিয়েছিল সেটা সুদে-আসলে বেড়ে দশগুণ হয়েছে, এখন আর আমার আর্থিক সমস্যা নেই। আমার স্থির বিশ্বাস, যেসব আত্মা পরলোকে আছে তারা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগে সক্ষম। এইসব চিন্তাভাবনার জন্য সবাই আমাকে ভুল বোঝে, পাগল মনে করে। আপনিই বলুন, আমি কি কিছু ভুল ভাবি?'

আমি নিশ্চুপ থাকাটাই শ্রেয় মনে করলাম। তিনি নিশ্চয়ই মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছেন। পদ্মিনী আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল— 'চলে যাওয়া যাক।'

—'লোকজন আমার এসব কথা শুনলে বিরক্ত হয়। আসলে এটা তো আর চোখ বা কিডনি দান করার মতো ব্যাপার নয়— একজন মরণাপন্ন মানুষের পক্ষে এর চেয়ে মহৎ দান আর কী হতে পারে?'

—'একজন হিন্দু হিসাবে আমার এতে আপত্তি আছে।' পদ্মিনী ওঠার জন্য উশখুশ করছে দেখে একটু চাঁচাছোলা ও স্পষ্ট ভাষায় ওকে বলতে শুরু করলাম— 'আমার বইটা আপনার আরও ভালো করে পড়া উচিত ছিল। হিন্দুদের বিশ্বাস একটি আত্মা তার দেহের মৃত্যুর পর তেরোদিন বাতাসে ভেসে থাকে, তারপর আবার অন্য শরীরে প্রবেশ করে পুনর্জন্ম নেয়। কর্মফল অনুযায়ী সে পরজন্মে মানুষ, পশু-পাখি, পতঙ্গ যা কিছুই হতে পারে। অর্থাৎ, বুঝতেই পারছেন হিন্দু দর্শন মতে এখন আপনার স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগের চিন্তাটা উদ্ভট কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। এতদিনে ক্রিস অন্য মা-বাবার ঘরে জন্মে দশবছরের ছেলে হয়ে গেছে।'

—'এই জায়গায় তোমাদের ধর্মের সাথে আমি একমত নই।' আমার ব্যাখ্যা শুনে উনি রীতিমতো আহত হলেন— 'আমার মনে হয় মৃত্যুর ওপারের ঘটনা সম্পর্কে কোনও ধর্মমতেই গোঁড়ামি থাকা উচিত নয়। কে জানে... 'হঠাৎই বাইরে একটা অল্পবয়সি ছেলের আর্ত চিৎকার শোনা গেল। হাঁকডাক কানে এল— ছেলেটাকে বাঁচাও, ডুবছে, ডুবে যাচ্ছে।' আটকাঠবন্ধ মিসেস উইলিয়মসনে ফ্ল্যাটের মধ্যেও চিৎকারগুলো অনুরণিত হতে লাগল।

আশেপাশের ফ্ল্যাটগুলো থেকে দরজা খোলার দুম-দাম শব্দ। ত্রস্ত পায়ের শব্দ, অস্পষ্ট উত্তেজনা। পদ্মিনী বাইরে দৌড়ে গেল। আমি ওর পিছু নিলাম।

চারদিকে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। কিছু বিক্ষিপ্ত গলার স্বর এদিক-ওদিক থেকে ফিনকি দিয়ে উঠছে। 'পুলের বেড়া টপকে কীভাবে পড়ল?' 'বারো বছরের ছেলেটা আকাশছোঁয়া স্প্রিংবোর্ডটা থেকে জলে ডাইভ মারতে গিয়েছিল।' 'তখন মিস্টার ও মিসেস পেপ্পার কোথায় ছিল?'

ডেভিসের শরীরটা পুলের জল থেকে তোলা হল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছলে। অ্যাম্বুলেন্সটা তড়িৎগতিতে যেতেই আমরা দু'জন আবার মিসেস উইলিয়মসনের বাড়ির দিকে মুখ ফেরালাম। উনি হুইল চেয়ার ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। মাথা ওপরের দিকে বেঁকিয়ে একদৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন।

ওঁর জলীয় চোখের দিকে তাকাতেই শিউরে উঠলাম। শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত দৌড়ে নেমে গেল। আঙুলগুলো দিয়ে উনি হুইলচেয়ারের হাতলের ওপরের গদিটা বাজাচ্ছেন, আর বিড়বিড় করে কী সব অস্পষ্ট শব্দ উচ্চারণ করছেন।

ওঁর মাথাটা কি পুরোপুরিই বিগড়েছে? হঠাৎই কি উনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন?—' আপনি ঠিক আছেন তো মিসেস উইলিয়মসন?' আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

—'আমি ঠিকই আছি, কিন্তু একটু বিব্রত...। এইমাত্র মুমূর্ষু এক আত্মার মাধ্যমে ক্রিসের সঙ্গে যোগাযোগের একটা মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল। ইস, একটু আগে যদি জানতাম— ও যখন ডুবছিল — ঠিক মরার আগের কয়েক মুহূর্তে যদি ওর সঙ্গে কথা বলতে পারতাম! ছোট ছেলেমেয়েরা বড়দের চেয়ে অনেক বেশি সাহায্যপূর্ণ হয়। ইস সুযোগটা হারালাম!'

উনি ওঁর হাতদুটো কচলাচ্ছিলেন।

কথাগুলো শুনে পদ্মিনীর মুখ রাগে লালাভ হয়ে উঠেছে— 'ভাবো— ও ডেভিসের মৃত্যুর কথা বলছে— ওর নিজের বন্ধুর ছেলে।' ভয়ার্ত কণ্ঠে সে বলল— 'চলো বাড়ি যাই।'

হঠাৎই সম্বিৎ ফিরে পেয়ে মিসেস উইলিয়মসন আমাদের বললেন— 'এই যা! আপনাদের তো চা খাওয়ানোই হল না...!'

—'না ঠিক আছে... আরেকদিন হবে... হয়তো।' পদ্মিনী রাগে ফুটছিল।

আমরা দু'জনে লন বরাবর হাঁটা শুরু করলাম। পদ্মিনী আমায় ধমকে ওঠে বলল— 'তুমি ওই ভয়ানক মহিলার সঙ্গে একনাগাড়ে কথা বলছ তো বলেই যাচ্ছো। ভবিষ্যতে তোমাকে আমি ওঁর কাছে মোটেও যেতে দেব না।'

—'বেশ মজাদার চরিত্র, তাই না?' আমি হাসলাম।

—'ঈশ্বরকে ধন্যবাদ তুমি ফিলোসফার, গল্পকার নও।'

পরের দিন শুনতে পেলাম ডেভিস বেঁচে গেছে। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। মিসেস পেপ্পার সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

'হতভাগ্য, মিসেস উইলিয়মসন।' আমি ফিস ফিস করে বললাম।

ওই মহিলার সঙ্গে দেখা করে আসার পর থেকে আমার স্ত্রী এতটাই আতঙ্কিত হয়ে ভেঙে পড়েছে যে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভারতে ফিরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

'আমি তো দুটো সেমিস্টার পরীক্ষা পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ', আমি ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। 'এখনও তো হাতে গাদা পরীক্ষার খাতা পড়ে আছে, এখনই কী করে যাই?'

—'তাহলে আমাকে বোম্বের ফ্লাইটে তুলে দাও।' রাগত কণ্ঠে সে বলল।

—'যাতে আমি নিজেকে পুরোপুরি মিসেস উইলিয়মসনের হাতে তুলে দিতে পারি।' আমি ফিক করে হেসে উঠলাম।

(মূল গল্প: শিব. কে. কুমার)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%