তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়
শিবুরামের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল আমার ছোটকাকা পলু রক্ষিত। কাকার ভাল নাম পলাশকান্তি রক্ষিত। পাড়ার খুব ডাকসাইটে ছেলে, তাই লোকজন ওর নামটাকে যতটা সম্ভব ছোট করে নিয়েছিল। এ তল্লাটের খুব করিতকর্মা ছেলে। যেমন ফুটবল খেলে, তেমন তৎপর সমাজসেবায়। যেমন অসাধারণ সাঁতার কাটে, তেমন লেখে ধুন্ধুমার সব কবিতা। বাজি কম্পিটিশনে ফি বছর প্রাইজ পাওয়া, তুবড়ির মশলা তৈরি থেকে শুরু করে পাড়ায় জগদ্ধাত্রীপুজোর আগের রাতের নাটকে মাচাকাঁপানো অভিনয়, এইসব জাতীয় আরও কত কিছুতেই যে সে ছিল মহাওস্তাদ, তা বোধ হয় নিজেই জানত না।
যাই হোক, ওই কাকা ছোট থেকেই আমার চোখে একজন হিরো। বন্ধুরা বলতেই পারে, আমাদের টাউনের হিসেবে হিরো বলতে তোর ছোটকা, কি অমর ভারতী ক্লাবের বলে-বলে ছক্কা হাঁকানো অলরাউন্ডার বিশে দত্ত, দ্বিজেন্দ্র সেতুর মাথা থেকে ভল্ট খেয়ে খড়ে নদীতে ঝাঁপ মারা মাইকেল বিশ্বাস, খালি হাতে সশস্ত্র ব্যাঙ্ক ডাকাতি ধরা নদিয়াশ্রী ব্যায়ামবীর মইদুল আলমের মাপের হিরো! তা নাই বা হল, আমার মতে, অন্তত ওর মতো সাহসী, বুদ্ধিমান, এলেমদার লোকের জুড়ি মেলা ভার। ইচ্ছে করলে আবার এক কিলো সরপুরিয়া বেটের চ্যালেঞ্জ নিয়ে ষষ্ঠীতলার ক্যারামের ঠেকে তিন বোর্ড নিল-এ গেম দিয়ে দিতে পারে অনেক হোমড়াচোমড়া চ্যাম্পিয়ন খিলাড়িকে।
যাই হোক, সেই বয়সটা ছিল বীরপুজোরই বয়স। পাতিকথায় যাকে ল্যাংবোট বলে, ঠিক তেমনটাই ছিলাম ছোটকাকার। বাড়ির কেউ যদি চটানোর জন্য পলুর চ্যালাও বলত, রাগের বদলে বেশ একটা গর্বই হত যেন। কিন্তু পলুর চ্যালা সে কী করে এই রকম মহাভিতু আর হাঁদা গঙ্গারাম হতে পারে, সেটাই প্রশ্ন ছিল সবার। পাশাপাশি থাকলে তো লোহারও আস্তে-আস্তে চুম্বক হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু সে ধরনের কোনও লক্ষণ নেই আমার মধ্যে।
ভয়, ভয়, ভয়! দিনরাত নানা রকমের ভয়। লেখাপড়ায় গাফিলতি দেখলেই বাবার বকুনির ভয়, ইশকুলের মাস্টার আশুবাবুর গাঁট্টার ভয়, খেলার মাঠে মারকুটে ব্যাকি মিহির কবিরাজের ভয়, তেমনি একটু বেনিয়ম করে ফেললেই সর্দিকাশি বা পেট কামড়ানোর ভয়, আত্মীয়-প্রতিবেশীদের চোখে ভালোছেলের তকমা হারানোর ভয় ইত্যাদি নিত্যনতুন হাজার কিসিমের ভয় ঘিরে থাকত রাতদিন। তবে সবচেয়ে ভয়টা অবশ্যই ভূতের। ভূত ঠিক কী জিনিস জানা নেই, কিন্তু অন্ধকারে একা হলেই মনে হয়, কে যেন পিছন-পিছন হাঁটছে। রাতে একা ঘরে শোওয়ার তো প্রশ্নই উঠছে না। মাঝরাতে বেমক্কা জোরসে ছোট বাইরে পেয়ে গেলেও অন্ধকার প্যাসেজটা পেরিয়ে বাথরুমে যাওয়ার ভয়ে বাকি রাতটা চেপেচুপে কাটিয়ে দেওয়াই সুবিধের মনে হয়।
ভূতে আমার ভীষণ ভয় ব্যাপারটা সকলের জানা, তাই সুযোগ পেলেই চলে আমায় ভয় দেখানো। জ্যাঠতুতো দাদা দোদন মাঝেসাঝেই নানান কায়দায় আমার পিলে চমকে দিয়ে মজা লোটে। সুযোগ পেলে অবশ্য সে ব্যাপারে বাকিরাও কম যায় না। দুঃখের কথা, এমনকী পরিবারের সবচেয়ে ছোট, আমার সেজকাকার মেয়ে বুঁদি পর্যন্ত রাতে দরজার পিছনে লুকিয়ে থেকে আমাকে ভয় দেখায়। এই তো সেবার ভাইফোঁটার সময় বাড়িতে পিসতুতো ভাইবোনদের সঙ্গে সাঁট করে ওরা আমাকে কী একটা অজুহাতে নিয়ে গিয়েছিল অন্ধকার ছাদে। তারপর কথায়-কথায় চিলেকোঠার উপরে তুলে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল সাদা কাপড়ের ঘোমটা মুড়ে বসে থাকা এক বুড়ি ডাইনির সামনে। আমার তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া। আর একটু হলেই সিঁড়ি বেয়ে দুদ্দাড়িয়ে নেমে পালানোর সময় মুখ থুবড়ে পড়ে মরতাম। পরে জানলাম, ওই বুড়ি ডাইনিটা ছিল মুখে টুথপেস্ট মাখা আর পরনে ঠাকুরমার সাদা থান জড়ানো ওই বুঁদি। লজ্জায় কাউকে মুখ দেখাতে পারছিলাম না তারপর থেকে।
মুখ চুন করে ঘুরে বেড়াচ্ছি দেখে ছোটকাকা আমায় ডেকে নিল একান্তে। সম্পর্কে ছোটকাকা হলে কী হবে, বয়সে দোদনদার থেকে মাত্র ছ-বছরের বড়ো। এ বাড়িতে ওই একটা লোকের সঙ্গেই আমার সম্পর্কটা বন্ধুর মতো। ওকে আলাদা করে বলার তো কিছু নেই। আমার কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করল, 'আচ্ছা, ভূতে তোর এত ভয় কেন? তুই কি ভূত দেখেছিস?'
আমি আমতা-আমতা করে বললাম, 'না, মানে হ্যাঁ। মানে, ইয়ে গল্পের বইয়ে, স্বপ্নে...'
'ধুস ওসব গাঁজাখুরি। গল্পের বইয়ে কেউ সত্যি লেখে না, আর স্বপ্নও কোনওদিন সত্যি হয় না। তা হলে আর ভয়টা কীসের? আসলে তোর মনে কোত্থেকে জানি না একটা ভুল ধারণা গেঁড়ে বসে গিয়েছে ভূত মানেই ভয়ানক কিছু একটা। কিন্তু আমরা যারা অ্যাকচুয়ালি ভূতেদের চিনি, তাদের সঙ্গে মিশি, গল্পগুজব করি, তারা জানি ভূতেরা কিন্তু খুবই নিরীহ, নির্ঝঞ্ঝাট লোকজন। নির্জন-নিরালায় থাকে, পারতপক্ষে কাউকে ঘাঁটায় না। তবে হ্যাঁ, কেউ ঘাঁটাতে এলে তো ওদের একটুআধটু ফোঁস করতেই হয়।'
'মানে, কী বলতে চাইছ, ভূতেদের সঙ্গে তোমার পরিচয় আছে? ওদের সঙ্গে তুমি গপ্পোগুজব করো? এই যাহ, ইয়ার্কি মেরো না।'
'ইয়ার্কি না, সেন্ট পার্সেন্ট সত্যি কথা। আজ থেকে না, সেই তোদের বয়স থেকেই ওদের সঙ্গে আমার ভয়ানক দহরম-মহরম। বিশ্বাস না হলে চল আমার সঙ্গে। তোর সঙ্গে কথা বলিয়ে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। আমার মুখের কথায় না, নিজের চোখে দেখে, কানে শুনে যাচাই করে নিবি তেনারা আসলে কীরকম বস্তু!'
'আমি? ভূতের সঙ্গে কথা? তুমি কী পাগল হলে? আমায় জানে মারতে চাও নাকি?' থরথরিয়ে কেঁপে উঠল আমার ঠোঁট। গা ছমছম করে উঠল।
'এইটুকু বিশ্বাস না থাকলে আর কথা বাড়িয়ে লাভ কী? সত্যি কথা বলাটা আমার কাজ, তাই বললাম বিশ্বাস-অবিশ্বাস তোর ব্যাপার। যাকগে, আমি আজ ওঠি তা হলে। পরে কথা হবেখন,' কেমন একটা রাগ-রাগ ভাব দেখিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ছোটকাকা।
'আরে-আরে রাগ হল নাকি? আমি কি ছাই তাই বলতে চাইছি নাকি? বলতে চাইছি, তুমি তো আমায় চেন। ভূতের সঙ্গে কথা বলা তো দূরের কথা, ওদের সামনে দাঁড়ালেই আমি নিশ্চয়ই অজ্ঞান হয়ে যাব। অক্কাও যেতে পারি, কিচ্ছু বলা যায় না।'
'কথা দিচ্ছি কিচ্ছু হবে না। আমি পাশে থাকতে তোর গায়ের লোম পর্যন্ত ছোঁয় কার ঘাড়ে ক-টা মাথা? কী, আমার ওপর পুরো বিশ্বাস আছে তো নাকি? থাকলেই কিন্তু যাবি। গেলে দেখবি সব ভুল ভেঙে গেছে।'
'ঠিক আছে যাব। কিন্তু কবে, কোথায় যেতে হবে? অনেক দূরে কোথায়?'
'না-না। এই তো বাড়ির কাছে। শিবুরামের বাগানে। কাল বিকেল-বিকেল সময়...'
'শিবুরামের বাগানে? মানে, শিবুরামের বাড়ি?'
'হ্যাঁ, তো কী?' ছোটকাকা ভুরু নাচায়, 'স্বয়ং শিবুর সঙ্গে তোর কথা বলিয়ে দেব। দেখবি খাসা লোক। ওই রকম মাই ডিয়ার লোক তো আমি আমার জীবনে আর দেখিনি।'
শুনেই বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল। কী বলছেটা কী? শিবুরামের বাড়ি মানে সে তো ডেঞ্জারাস জায়গা! এ তল্লাটের কুখ্যাত এক জায়গা, যেটা এমনিতে একটা পরিত্যক্ত বাগান। তার কোণে ঝোপজঙ্গলের ভিতরে জেগে থাকা একটা বহু পুরনো দোতলা বাড়ির ভগ্নাবশেষ। শরিকি ঝগড়ার জেরে ওই অবস্থাতেই পড়ে আছে পঞ্চাশ বছরেরও ওপর। তার ওপর আছে ওই বাড়িতে একাধিক লোকের স্বচক্ষে দেখা ভূতুড়ে নানা কাণ্ডকারখানার নানা লোম খাড়া করে দেওয়া কাহিনি। লোকে বলে মৃত্যুর পর শিবুরাম তাঁর প্রিয় ওই বাড়ি থেকে একচুলও নড়েনি। ব্রহ্মদৈত্য হয়ে ওখানেই বাস করছে বহাল তবিয়তে।
ব্রহ্মদৈত্যের সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা, আমার মতো ভিতুর ডিমের পক্ষে বিষয়টা যে কতটা অসম্ভব, তা শুধু আমিই জানি। মাথা কাজ করছে না একেবারে, আমি কি বাড়ি থেকে পালাব? আবার ছোটকাকার কথাতেও আমার অটুট আস্থা। যা হয় হোক, কাকার মানসম্মান রাখতে অন্তত আমাকে যেতেই হবে। কাকা পাশে থাকলে নিশ্চয়ই কোনও অনিষ্ট হতে দেবে না। যাই হোক, পরদিন সন্ধেবেলা ছোটকাকা ওরফে পলু রক্ষিতের হাত ধরে নিরুচ্চারে রাম-রাম করতে-করতে রওনা দিলাম শিবুরামের বাগানের উদ্দেশে। বিকেলের আলো মরে আসছে কিন্তু অন্ধকার নামেনি তখনও। ঘন শিশুবন ভেদ করে আমরা দু'জন সোজা গিয়ে দাঁড়ালাম হানাবাড়িটার সামনে। ছোটকাকার হাত ধরে চোখ বন্ধ করে ঢুকেও গেলাম ভিতরে।
ভিতরে গিয়ে চোখ খুলতে চাইছি না, জোর করে খোলাল ছোটকা। তাকিয়েই দেখি বেশ খানিকটা দূরে উলটোদিকে মুখ করে একটা বেদি মতো জায়গার উপর বসে আছে একজন। মাথা, কাঁধ, পিঠের ওপর দিয়ে মোড়ানো রয়েছে জরাজীর্ণ একটা কম্বল। দেখেই ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল মেরুদণ্ড বরাবর, পা-দুটো মনে হচ্ছে গলে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। কাকা আশপাশে কোথাও নেই দেখে ককিয়ে উঠলাম, 'ছোটকা!'
কাকার গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম কিছুটা দূর থেকে, 'কোনও ভয় নেই, শিবুদাদুকে প্রণাম জানিয়ে ওঁর সঙ্গে কথা বল। আমি পাশে থাকলে তো হবে না। উনি যখন নাইনটি ডিগ্রি সরলরেখায় দাঁড়ান কারও সঙ্গে, তখন একমাত্র তার সঙ্গেই কথা বলেন। অন্য কারও সঙ্গে কথা বলেন না। পাশে অন্য কেউ থাকলে একটা কথাও বলবেন না। আরে বাবা তোর চিন্তা নেই। বল মুখে যা আসছে। দেরি করলে উনি যদি রেগে যান।'
থতমত খেয়ে প্রণাম সেরে বলে বসলাম, 'অক্টোবর শেষ হতে চলল, তাও ভ্যাপসা গরম গেল না, কিন্তু আপনার গায়ে কম্বল?'
খিনখিন করে হেসে নাকি-নাকি সুরে শিবুরাম উত্তর দিলেন, 'কী আর করি শ্রীমান পিনাকী, আমাদের ভূতেদের দুনিয়ায় যে সারাবছরই কনকনে শীত।'
'সে কী আপনি আমার নাম জানেন?'
'শুধু কী নাম? তোমার সম্পর্কে কোন কথাটা জানি না তাই বলো? সব জানি। তুমি কীসে-কীসে কাঁচা, ডিম খেতে ভালোবাস অথচ খেলেই সর্দি, ক্লাসের সাতচল্লিশ রোলনম্বর ষণ্ডামার্কা মানস ঘোষ তোমায় তেলাপোকা বলে খ্যাপায়। ভূতের গল্পের পোকা অথচ ভূতের ভয়ে রাতের দিকে 'নেচারস কল' পেলে চুপিচুপি মাকে বাথরুমের গেটের বাইরে দাঁড়াতে বলো, আরও বলব?'
'না-না থাক,' লজ্জা পেয়ে গেলেও বেমক্কা একধরনের সাহস পেয়ে যাই আমি। প্রসঙ্গ পালটে ফেললেও অনেকক্ষণ কথা চলে তারপর। শিবুরাম স্কুললাইফের অনেক গোপন কথা জানে দেখে অবাক না হয়ে উপায় ছিল না। টানে-টানে হড়হড়িয়ে আমার অনেক মনের কথা বলে বেশ হালকা লাগে।
ছোটকাকার সঙ্গে মাঝে-মাঝেই যেতে শুরু করলাম শিবুরামের বাড়িতে। সেই একই ভাবে ওঁর বেদির সামনে সরলরেখায় দাঁড়িয়ে কথা বলে যেতে লাগলাম আর উনি উত্তর করে যেতে লাগলেন ওঁর ঢঙে। আমার একান্তই ব্যক্তিগত কিছু-কিছু সমস্যার ব্যাপারে কী যে উপকারে লাগতে শুরু করল ওঁর উপদেশগুলো!
মান্ধাতার আমলের লোক হলে কী হবে, আমাদের এই আজকের সময়ের সমস্যাগুলো এত ভালো বোঝেন। মাঝে-মাঝে মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি পুরে দেন। স্কুলে বা খেলার মাঠে আমায় উত্যক্ত করা ছেলেপিলেকে শায়েস্তা করার জন্য ওর টিপসগুলো কাজে লাগিয়ে মানসকে তো জব্দ করেইছি, জব্দ করেছি ফেল করে আমাদের ক্লাসে আসা শক্তের ভক্ত নরমের যম শুভেন্দুকেও। আশুবাবুর ভয় কাটিয়েছি, ফুটবল মাঠে উপায় খুঁজে পেয়েছি বাকিদের ল্যাং এড়িয়ে কাটিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার।
দেখতে-দেখতে দারুণ একটা দোস্তি তৈরি হয়ে গেল শিবুদাদুর সঙ্গে। কিন্তু সমস্যা একটাই, ওঁর কাছে যেতে গেলেই সেই যেতে হয় ছোটকাকার সঙ্গে। কাকা নানা কাজের মানুষ, মাঝে মাঝেই বিকেলে ওর ফুটবল ম্যাচ থাকে। তা ছাড়া পাড়ার লোকের হয়ে বেগারখাটা তো আছেই। শিবুরামের বাগানে যেতে ইচ্ছে হলেই ওকে ডাকা তাই বেশিরভাগ দিনই সম্ভব হয়ে ওঠে না। ইতিমধ্যে আমার ভূতের ভয় অনেক কমে গিয়েছে।
'তা হলে, আমি কি একদিন একাই যাব শিবুরামের বাড়ি' ছোটকাকাকে জিজ্ঞেস করলেই কাকা বলে, 'সে কী করে সম্ভব? শিবুরামের ডাকার তো বিশেষ একটা মন্ত্র আছে, ওটা না উচ্চারণ করলে যে উনি আসবেন না।'
আমি তবুও বলি, 'ওটা কি আমায় শিখিয়ে দেওয়া যায় না?'
কাকা মাথা নেড়ে বলে, 'না রে ওটা আওড়ানোর বিশেষ পদ্ধতি না শিখলে উনি আসবেন না।'
এদিকে আমার স্কুলে নতুন একটা সমস্যা যে হঠাৎ এভাবে ঘোরালো হয়ে ওঠবে ভাবতেই পারিনি। হলি তো হলি এমন সময় যে, ছোটকাকা দু'সপ্তাহের জন্য খেলতে গিয়েছে নৈহাটিতে এক টুর্নামেন্টে। সমস্যাটা এমনই যে, এখনই বিহিত না করলে বিচ্ছিরি অপমানজনক হয়ে ওঠেছে। ব্যাপারটা গুরুতর কারণ, গত পাঁচদিন ধরে আমার ব্যাগ থেকে টিফিন চুরি হয়ে যাচ্ছে। রোজ এক ঘটনা, খালি টিফিন কৌটোটা থাকছে ব্যাগেই কিন্তু তাতে খাবার নেই। কী করে হচ্ছে, কে করছে কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না। টিফিন পিরিয়ডের আগে এক আধমিনিটের জন্য ওয়াটারবটলে জল ভরতে বা ছোট বাইরে করতে যেই না যাওয়া, সেই ফাঁকেই কম্মো সাবাড়। মনে হচ্ছে না একজনের কাজ, বেশ কয়েকজন নিশ্চয়ই জড়িত আছে এই ষড়যন্ত্রে। এই নিয়ে ক্লাসে রীতিমতো হাসাহাসি হচ্ছে। নিজেকে রোজ-রোজ এভাবে হাসির খোরাক হতে দেখে কাঁহাতক আর ভালো লাগে!
সেদিন বাড়ি থেকে দুর্দান্ত এক পদ টিফিনে পাঠিয়েছিল। যার গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে জিবে জল আসছিল প্রথম পিরিয়ডের পর থেকেই। ব্যাগ আগলে বসেওছিলাম, কিন্তু কপাল খারাপ। ভূগোল স্যার সেই আমাকেই পাঠালেন ইউরোপের ম্যাপ আনতে। ফিরে এসে দেখি খেল খতম। আমার তো প্রায় চোখে জল আসে আর কী! রাগ, অপমান আর খিদের জ্বালায় সেদিনই ঠিক করে ফেললাম, আজ যে করেই হোক, আমাকে একটা এসপার নয় ওসপার করতে হবে। কাকা নেই তো কী, আমার সঙ্গেও তো কম আলাপ নেই শিবুরামের। সূর্য অস্ত যেতে না— যেতেই একা-একাই রওনা দিলাম শিবুরামের বাগানের দিকে।
শিশুবন ভেদ করে সোজা গিয়ে পৌঁছে গেলাম বাড়িটার ভিতর সেই বেদিটার সামনে। হাতজোড় করে কাতর গলায় বসে বসলাম, 'শিবুদাদু, আপনি হয়তো জানেন, ছোটকাকা এখানে নেই কিন্তু একটা বিশেষ জরুরি দরকারে আমি আপনার কাছে না এসে পারলাম না। আমি আপনাকে ডাকার মন্ত্রতন্ত্র কিছুই জানি না। শুধু জানি এই মুহূর্তে আমার আপনাকে বড্ড দরকার। রোজ-রোজ আমার হেনস্থা হচ্ছে, সারাদুপুর অভুক্ত থাকছি। ক্লাসমেটদের কাছে হাসির বস্তু হয়ে উঠছি। দয়া করে আমাকে এই সমস্যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার একটা উপায় বলে দিন। আপনি আর কতদিন এই নিপাট, গোবেচারা নাতির অপমান সহ্য করবেন? প্লিজ দাদু, আপনি যদি এই ঘরের হাওয়ায় কোথাও থেকে থাকেন আমায় দেখা দিন।'
হঠাৎ কোথা থেকে কী হল জানি না, ঘরের ভিতরের হাওয়াটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। কেমন একটা ঘোলাটে হয়ে উঠল সামনের সব দৃশ্য। ঘরের ভিতর ছড়িয়ে পড়তে লাগল হলদেটে সবুজ একধরনের বিটকেল গন্ধওয়ালা গ্যাস। আচমকা চোখ জ্বালা করে ওঠায় বাধ্য হয়ে চোখের পাতা বুজলাম তৎক্ষণাৎ। চোখ খুলে দেখি, বেদির ওপর বেঁটেখাট বছর আশির একজন বুড়ো বসে আছেন। মুখে মৃদু হাসি। গায়ে মাথায় ওসব কম্বল-ফম্বল কিছুই নেই। অবাক হয়ে বললাম, 'আপনিই কি শিবুরাম চক্রবর্তী?'
জবাবে বৃদ্ধ বললেন, 'কী আর করা যায় বলো, তোমার সমস্যা এমনই...'
আমি সমস্যাটা খুলে বলতে যাচ্ছি, বৃদ্ধ হাত নেড়ে আমায় থামালেন, 'ওসব কিছু আমার বলতে হবে না, আমি সব জানি। এসো, আমার কাছে এসো কানে-কানে কিছু টিপস দিয়ে দিই, মনে হয় কাজে লাগবে।'
শিবুরাম কানে-কানে ফিসফিসিয়ে আমায় যেসব মন্ত্রণা দিলেন, সে সব শুনে আমি তো আনন্দে আটখানা। মহানন্দে লাফাতে-লাফাতে বেরিয়ে এলাম বাগান থেকে। ওঁর কথা শুনে শুরুতে তো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, এই ক্লাসমেটরা আমার টিফিন চুরির পিছনে থাকতে পারে! ভাবতেই পারিনি প্রীতম মজুমদার হল নাটের গুরু! পরের দিন ক্লাসে তক্কেতক্কে ছিলাম, শিবুদাদুর বাতলানো চালে ব্যাটা ধরা পড়ল হাতেনাতে। টিচারকে বলে শাস্তি দেওয়াতে পারতাম, কিন্তু ঠিক রুচি হল না।
ধরা পড়ে ওরা যে লজ্জাটা পেয়েছে সেটাই ওদের শাস্তি। তার চেয়েও বড় কথা সমঝে দেওয়া গিয়েছে। তোমরা আমাকে যতটা ক্যাবলা ভাব বাপু, আমি মোটেও তেমনটাই নই।
একেবারে মুখিয়ে ছিলাম। ছোটকাকা ফিরতেই ওকে আমার শিবুরামের সঙ্গে দেখা করা থেকে শুরু করে পুরো ঘটনাটা বলতেই ও আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল। তারপর হো-হো করে অট্টহাসি হাসতে-হাসতে বলল, 'শিবুরামের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা করেছিস, বাহ হেবি গুলগপ্প দিতে শিখেছিস তো?'
শুনে আমি চেঁচিয়ে উঠে বললাম, 'গুলগপ্প মানে? তুমি জান আমি তোমায় অন্তত কখনও মিথ্যে কথা বলি না। তুমি তার মানে আমার কথায় বিশ্বাস করছ না। আমার কথায় সন্দেহ করছ? তুমি এমন বলবে ভাবতে পারিনি। যাও তোমার সঙ্গে আমার কথা নেই।' অভিমান করে ওঠে চলে যাচ্ছি, ছোটকাকা আমার হাত চেপে ধরল পিছন থেকে। 'আরে অত চটছিস কেন? ভুলটা কী বললাম? না মানে, আসলে তো শিবুরামের সঙ্গে দেখা করা বাস্তবে সম্ভব না। আমার পক্ষেও না, তোর পক্ষেও না। দুনিয়ার কারও পক্ষেই না!' 'মানে, কী বলতে চাইছ? তুমি বলতে চাইছ তা হলে তোমার সঙ্গে ওই যে শিবুরামের দেখা করতে যেতাম, ওর সঙ্গে কথা বলতাম, ওগুলো সব গুলগপ্প?'
মুখে হাত দিয়ে হাসতে থাকে কাকা, 'কিছু মনে করিস না পকাই, ওগুলো সত্যিই গুলগপ্প ছিল। তোর ভূতে ভয় ভাঙানোর একটা চাল বলতে পারিস। উলটোমুখ করে বসা যে মূর্তিটা দেখতিস, ওটা আসলে ছিল খড়ের কাঠামোর ওপর কম্বল মুড়ি দেওয়া, আর ওই খিনখিনে গলাটা ছিল আমারই। তোকে বেদিটার সোজাসুজি দাঁড় করিয়ে আমি এক ফাঁকে সুট করে চলে যেতাম পাশের ঘরের ভাঙা দেওয়ালের পিছনে। আর ওখান থেকেই উত্তর দিতাম।' ছোটকাকা আমার কাঁধে হাত রাখে, 'আসলে বুঝলি তো ভূত বলে কিছু হয় না, হতে পারে না, তাই না?'
'সে সব জানি না, কিন্তু আমি তোমায় কী করে বিশ্বাস করাব বলো তো যে, আমি গুলগপ্প দিচ্ছি না।' প্রাণপণে চিৎকার করে উঠলাম আমি, 'যা হয়েছে সব এই আমার চোখের সামনে হয়েছে। যা শুনেছি, সব এই কানে শুনেছি। উনি যদি ভূত না হবেন, তা হলে কী করে আমার টিফিন চুরির কেসটা জানবেন, কী করেই বা আমায় ওদের শায়েস্তা করার উপায় বাতলে দেবেন?'
'ধুর-ধুর যতসব গাঁজাখুরি। ভেবেছিস এসব বলে আমায় ভড়কে দিতে পারবি, পলু রক্ষিতকে ভড়কে দিবি? আচ্ছা বল তো দেখি লোকটাকে দেখতে কেমন ছিল?' ছোটকাকা আমার দিকে বড়-বড় চোখ করে তাকাল। আমি একটুও না ঘাবড়ে খুঁটিনাটি বর্ণনা দিতে শুরু করলাম সেই বৃদ্ধের, যা শুনে ক্রমশ আরও গোল-গোল হতে লাগল কাকার চোখ। বিড়বিড় করতে লাগল নিজের মনে, 'কে জানে ছাই আসলে কেমন দেখতে ছিল, সে তো কবেই মরে ভূত হয়ে গেছে। আমার জন্মেরও আগে।' তারপর আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে-টানতে নিয়ে চলল বড়জেঠুর কাছে। বড়জেঠু ছেলেবেলায় শিবুরামকে স্বচক্ষে দেখেছিলেন। তা ছাড়া ওঁর কাছে দাদুর আমলের পুরনো দিনের অনেক সব অ্যালবাম আছে।
সব শুনে জেঠু তো থ। অনেক খুঁজে পেতে একটা অ্যালবাম বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, 'এর মধ্যে একটা শিবুরামের ফোটো আছে। বের কর তো দেখি কোন বৃদ্ধটি শিবুরাম?'
অ্যালবামটার ধুলি-ধুলি সব পাতা উলটোতে-উলটোতে একটা ফোটো দেখে উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠলাম আমি।
'এই তো সেই বৃদ্ধ! এই তো শিবুরাম, এই তো সেই চেহারা। হ্যাঁ-হ্যাঁ এক্কেবারে এই লোক। ঠিক এইরকম হেঁটো ধুতি পরা। পায়ে, মাথা-ছুঁচোলো নাগরা জুতো!'
'কই দেখি-দেখি,' আমার নির্দেশ করা ফোটোটি দেখে দরদরিয়ে ঘেমে উঠলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ বড়জেঠু। আর ওঁর ওইরকম রিঅ্যাকশন দেখে মুহূর্তে ছোটকাকার মুখটা থমথমে হয়ে গেল। চোখদুটো সোজাকপালে উঠে গিয়েছে। আমার দিকে ভ্যালভেলিয়ে তাকিয়ে শুকনো গলায় ঢোক গিলল একবার। ইশারা করে ওর দিকে জলের বোতলটা এগিয়ে দিতে বলল বটে, কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরল না। ঘরটা আচমকা এমন নিঝুম হয়ে গেল যে, মেঝের ওপর দিয়ে আমাদের ছোঁচা বিড়ালটার চলে যাওয়ার শব্দও এসে পৌঁছাল কানে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন