তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়
নেশাটা ইদানীং একেবারে জাঁকিয়ে বসেছে। মাস ছয়েক আগেও মোটেও এই জায়গায় ছিল না। তারপর কোত্থেকে কী করে যে আজকাল বিষয়টা ওকে এভাবে এতটা পেয়ে বসল কে জানে? এখন তো দিনরাত যাকে বলে একরকম মুখিয়ে থাকা। একটু ফুরসত পেলেই হল ব্যস! বাবুটিকে আর পায় কে? শেষ তিন-চার মাসে যেভাবে তার বন্ধুর সংখ্যা লাফিয়ে-লাফিয়ে বেড়েছে, তাতে ও রীতিমতো আহ্লাদিত। ভাবতে অবাক লাগে এখন তার ফ্রেন্ডলিস্টে বন্ধুর সংখ্যা কালকেই দেড় হাজার ছাড়িয়ে গেল। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের ভারচুয়াল দুনিয়া তো কী! বন্ধু তো বন্ধুই। বন্ধুর চেয়ে ভালো জিনিস আর কী থাকতে পারে এই দুনিয়ায়। প্রজ্ঞান ছোটোবেলা থেকেই নিঃসঙ্গ। বাবা-মা দুজনেই চাকরিজীবী হওয়ার জন্য ওকে নিজের সঙ্গেই সময় কাটাতে শিখতে হয়েছে কিছুটা দায়ে পড়েই। মিশনারি স্কুলের পড়াশোনার ভয়ানক চাপ সামলে নির্বিকল্প সঙ্গী ছিল দেওয়াল আলমারিতে সাজানো থরে-থরে বই, গান শোনা আর কিছুটা বড়ো হওয়ার পর থেকেই এই কম্পিউটার, ল্যাপটপ, তার সঙ্গে বছরখানেক হল এসে জুটেছে একখানা জম্পেশ স্মার্টফোন। ছোটো থেকেই অন্তর্মুখী স্বভাবের ঘরকুনো ছেলেটার স্কুলের বা বাইরের বন্ধু একেবারেই সেভাবে জোটেনি। তাই ব্যক্তিগত কত সব আনন্দ-দুঃখ, হাজার রকমের সব মনের কথা ভাগ করে নেওয়ার মানুষের অভাব একটা ছিলই, অনেক আক্ষেপও। কিন্তু সে সব ইদানীং আর বিশেষ নেই।
রাতে শুতে যাওয়ার আগে বিছানায় ল্যাপটপটার স্ক্রিনে মুখ গুঁজে এইভাবে আধশোয়া অবস্থায় কাটানো সময়টা ওর বড্ড প্রিয়। ঘড়িতে রাত সাড়ে বারোটা মতো হবে। খাওয়া-দাওয়ার পর নিজের ঘরে এসে রোজকার রুটিন মতো বারোটা পর্যন্ত পড়াশুনো সেরে দরজা বন্ধ করে একান্তই নিজস্ব এই সময়টুকুতে ফেসবুক বা মুখবই সে যাই বলা যাক এই মিডিয়া সাইটে অনলাইন হয়ে বসা। এখন একের পর এক বন্ধু-বান্ধবীরা চ্যাটে ঢুকতে থাকে। তারপর দেদার গপ্পো শুরু, কোথা দিয়ে যে সময় বেরিয়ে যায় কে জানে? আজও একসঙ্গে পাশাপাশি চারজনের সঙ্গে কথা চলছে পুরোদমে। এমনিতে লাজুক, চুপচাপ স্বভাবের প্রজ্ঞান কিন্তু ফেসবুকে চ্যাটিং-এর সময় যথেষ্ট নিঃসংকোচ। এমনিতে মেয়েদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না, কিন্তু ফেসবুকে ফ্লার্ট করার সময় ভোল পালটে এক অন্য মানুষ! ওপারের বন্ধু-বান্ধবীগুলোও সাহস ও স্মার্টনেসের ব্যাপারে কেউ কারও চেয়ে কম যায় না। তাই অল্প সময়ের ভিতরেই কথোপকথনগুলো একটা দারুণ ছন্দ পেয়ে গিয়েছে, টাইপিং-এ আঙুল চলছে ঝড়ের বেগে।
আচমকা তীক্ষ্ন শব্দে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট ঢুকল। চ্যাটিং-এ মশগুল, তবুও কী মনে হল প্রোফাইলটা খুলে এক ঝলক চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। পছন্দ হলে ফ্রেন্ডশিপ অ্যাকসেপ্ট করবে, না হলে ওয়েটিং-এ পড়ে থাকবে, যেভাবে এসে পড়ে আছে শ-খানেকের বেশি অনুরোধ। একটি মেয়ের রিকোয়েস্ট, বাংলা অক্ষরে নাম লেখা তমসা, ছবিটা খুব সুন্দর কায়দায় তোলা। একটা আলগা ওড়নার বা জাল-জাল ঘোমটার ওপারে দেখা যাচ্ছে একটা আড়াআড়ি মুখের আভাস। মুখটার প্রান্তীয় রেখাটি দেখে যেটুকু আন্দাজ করা যাচ্ছে, ছবিটা যদি আদৌ ওই মেয়েটির হয়, তাহলে সে নিঃসন্দেহে সুন্দরী। অভিজাত কপালের ঢাল, টিকালো নাক, পাতলা ঠোঁট, নিখুঁত একটি থুতনি। কিন্তু ছবিটা বেশ অস্পষ্ট, কেমন একটা ছায়া-ছায়া, প্রেক্ষাপটটা অদ্ভুত ধরনের ধোঁয়াটে। ছবিটা বড়ো করে দেখলেও এই অস্পষ্টতাটা যাচ্ছে না। ফোটোগ্রাফারের মুনসিয়ানা বলতে হবে, শটটার তারিফ না করে পারা যাচ্ছে না।
ফেক প্রোফাইল না তো? হলে আর কী করা যাবে! কিন্তু প্রেরিকা যদি সৌভাগ্যক্রমে ছবির এই মেয়েটিই হয়, তবে সে রুচিশীলা মনে হচ্ছে। কমন ফ্রেন্ড দু-একটা, বেশি নেই, 'অ্যাবাউট' অপশনে প্রায় কোনও তথ্যই দেওয়া নেই, 'ফোটোজ' অপশনের সবগুলোই প্রাকৃতিক দৃশ্য, বেশিরভাগই চাঁদনি রাত, অন্ধকার বা কুয়াশা-ঘেরা বনবনানীর অসামান্য কিছু ছবি। টাইম লাইনের সব পোস্টগুলোই কোনও না কোনও কোটেশন। কতজনের কত বিচিত্র পছন্দ-অপছন্দ, ও সব যদিও তেমন কোনও ফ্যাক্টর নয়, কিন্তু প্রোফাইল পিকচারটাকে এড়ানো যাচ্ছিল না কিছুতেই। সুন্দরী মেয়েদের প্রতি ওর এমনিতেই চাপা দুর্বলতা একটা তো রয়েছেই। ওটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন একটা হল, রিকোয়েস্টটা অ্যাকসেপ্ট করা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না।
রিকোয়েস্টটা কনফার্ম করার সঙ্গে-সঙ্গে যান্ত্রিক নিয়মেই তমসা নামটি জুড়ে গিয়েছে ওর ফ্রেন্ড লিস্টে। মিনিট তিনেকও কাটেনি মেয়েটি চ্যাটে ঢুকল, স্ক্রিনে দেখাচ্ছে ছোট্ট মেসেজটা 'হাই প্রজ্ঞান'। এদিকে চ্যাটিংগুলো যেরকম জমে উঠেছে, আপাতত ওদিকে মন দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এইরকম পিক আওয়ারে অচেনা অজানা নতুন কারও সঙ্গে কথা শুরু করতে যাওয়াটা রসভঙ্গ ছাড়া আর কী? মেসেজটাকে এড়িয়ে গেল প্রজ্ঞান। মিনিট দুয়েক বাদে আবার তমসার মেসেজ, 'কী হল? কথা বলার মুডে নেই?' রাত কম হল না। একটু-একটু করে ঘুমের আবুলি আসছে। একেবারেই অপরিচিত কারও সঙ্গে চ্যাটে ঢোকার উৎসাহ নেই সেভাবে, এই মেসেজটাকেও অ্যাভয়েড করে গেল সে। যাদের সঙ্গে কথা চলছিল তাদের সঙ্গে কথা গুটিয়ে আনার চেষ্টা করছে। আবার মেসেজ, 'খুব ব্যস্ত? দু-একটা কথাও বলা যায় না কি?'
রিপ্লাই দিতে আঙুলগুলোর যে আগ্রহ নেই তা না, কিন্তু এখন উত্তর দিলে যদি অনেক কথা বলতে হয়। ঘড়িতে একটা বেজে গিয়েছে। এখনই ল্যাপটপ শাট-ডাউন না করে শুয়ে না পড়লে মুশকিল। কাল সকালে ওঠে আবার প্রাইভেট টিউশনের ব্যাচে যেতে হবে। সব দিক বিবেচনা করে চ্যাটে থাকা বন্ধু-বান্ধবীদের শুভ রাত্রি জানিয়ে সাইন-আউট করতে যাচ্ছে, আবার একটা মেসেজ এসে ঢুকল, 'এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না।'
মন্তব্যটায় খোঁচা লাগল। মানে? কী বলতে চাইছে মেয়েটা? কিছুটা কৌতূহলী হয়ে রিপ্লাই করে বসে প্রজ্ঞান, 'কী ঠিক হচ্ছে না?'
'এই যে একটি মেয়ে তোমার সঙ্গে বারবার কিছু বলতে চাইছে আর তুমি এড়িয়ে যাচ্ছ। ইজন্ট ইট আ বিট রুডনেস উইথ আ গার্ল?'
'না, আসলে একসঙ্গে বেশ কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে কথা চলছিল। তাই একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম আর কী! হ্যাঁ, তুমি যেন কী বলছিলে? বলো...'
'তেমন কিছু না। বলছিলাম আমাকে তোমার বন্ধুদের মধ্যে একজন করে নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। ওহ! বাই দ্য ওয়ে আর যেটা বলার ছিল, তোমার প্রোফাইলের ছবিটা বেশ ইমপ্রেসিভ। চোখ দুটো বেশ ইনটেন্স আর ব্রাইট লুকিং। কুল!'
'তাই নাকি? থ্যাঙ্কস। আসলে ছবিটা ভালো উঠেছে। তবে যার ছবি, বাস্তবে সে কিন্তু অতটা ইমপ্রেসিভ নাও হতে পারে।'
'সেটা তো নির্ভর করছে যে দেখছে তার চোখের ওপর। যদিও তোমায় নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি না, তবু ছবি দেখে কিছু-কিছু জিনিস আন্দাজ করতে পারি।'
'কী-কী আন্দাজ করতে পার?'
'এই যে তুমি এমনিতে কল্পনাপ্রবণ, একা-একা নিজের মতো থাকতে ভালোবাস, তোমার অন্য সব বন্ধু-বান্ধবীরা যখন লাফালাফি, হই-হুল্লোড় করছে, তুমি তখন এককোণে চুপচাপ বসে থাকতে, বই পড়তে বা সফট মেলোডিয়াস গান শুনতে ভালোবাস, ফেসবুকে মেয়েদের সঙ্গে সড়গড় ঠিকই, কিন্তু এমনিতে ওদের একটু এড়িয়ে চলো। খুব সাবধানী, তাই ভয় পাও কাছে গেলে ওদের কোনও বিরূপ আচরণে পাছে তোমার ইগোয় ঘা লাগে...।'
'সে কী! তুমি কী করে জানলে? তুমি কে বলো তো? সত্যি করে বলো তো কে? আমার চেনা কেউ? আমাদের ক্লাস বা ব্যাচমেট কেউ? অন্য প্রোফাইল থেকে অপারেট করছ?'
'না, না, একেবারেই না। বিশ্বাস করো আমি তোমার চেনা কেউ নই। আমরা কেউ কোনও দিন একে অপরকে দেখিনি। দেখা সম্ভবও না। আমার বাড়ি অনেক দূরে...'
'তাহলে এত কথা কী করে জানলে? সত্যি-সত্যি বলো কিন্তু...'
'মিথ্যে বলব কেন? মিথ্যে জিনিসটা আমি পছন্দ করি না। অ্যাকচুয়ালি এটা পিওরলি গেস ওয়ার্ক। আমি কিছুটা হলেও ফেস রিডিং ব্যাপারটা জানি। ছবি দেখে মানুষের স্বভাব চরিত্র কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারি।'
'কিন্তু আমার প্রোফাইল পিকচারটা তো ক্যামেরার কারসাজি, একটু অ্যাঙ্গেল থেকে তোলা। তুমি তো আমার সামনাসামনি ছবি দ্যাখোনি!'
'কেন? তোমার ফেসবুকে অ্যাকাউন্টের অ্যালবাম দেখে নিয়েছি। ওখানে তো তোমার বেশ কিছু ছবি আছে। ওগুলো থেকে গেস করা অসম্ভব কিছু না। তবে আমার ভুলও হতে পারে, আচ্ছা আমি কি খুব ভুল গেস করছি?'
'না, না, ভুল না। তাই একটু অবাক হলাম।'
'অবাক হওয়ার কিছু নেই, এটাও এক ধরনের বিদ্যে বলতে পার। ওহ! আয়াম সরি। একটা কথা বলব বলে ঢুকে একগাদা বকে যাচ্ছি। অনেক রাত হল। তোমার নিশ্চয়ই রাত জাগার অভ্যেস নেই। আমার বোধ হয় এবার চ্যাট থেকে বেরিয়ে যাওয়াটাই উচিত। স্পিক উইথ ইউ লেটার, গুড নাইট।'
'না, না। আমার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না। এই তো দিব্যি কথা চলছে, চলুক না। তোমার কোনও সমস্যা নেই তো?'
'না, না। রাতটা আমার খুব প্রিয় সময়।'
'হ্যাঁ, তো বলো, কী যেন বলছিলে! আমার ছবি দেখে আর কী-কী গেস করলে?'
ঘুম কোথায় চলে গিয়েছে। নিমেষে আরও আধঘণ্টা যে কোথা দিয়ে বেরিয়ে গেল! ল্যাপটপের বোতামগুলোর উপর আঙুল চলছে অনবরত। মেয়েটার সঙ্গে কথোপকথন যে এত কম সময়ের ভিতর এই রকম জমে উঠবে ভাবতেও পারেনি প্রজ্ঞান। কথা তো অনেক মেয়েদের সঙ্গেই হয়েছে। কিন্তু এর কথাবার্তার ধাঁচটাই আলাদা, অসাধারণ বাকপটুত্ব। একটা আকর্ষক পার্সোনালিটির আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
চ্যাটিং শেষ হল তখন রাত আড়াইটে। শেষে প্রজ্ঞান বলেই ফেলল, 'কাল আবার চ্যাটে আসছ তো? যদি সম্ভব হয় কাল একটু তাড়াতাড়ি, আই মিন সাড়ে এগারোটা নাগাদ ঢুকলে খুশি হব। তাহলে অনেকক্ষণ কথা বলা যাবে। আমি কিন্তু অপেক্ষা করব।'
সম্মতি জানাল মেয়েটি। ঘুমোতে যাওয়ার আগে আশ্চর্য একটা ভালো লাগা জড়িয়ে রইল। মেয়েটার মৃদু প্রশংসায় যে ওর অহম তোল্লা খেয়েছে শুধু সেইজন্যই নয়, আগে কখনও কোনও মেয়ের সঙ্গে কথা বলে এতটা ভালো লাগেনি।
পরের দিন কাঁটায়-কাঁটায় ঠিক সাড়ে এগারোটায় চ্যাটে ঢুকল মেয়েটা। আবার শুরু হল কথোপকথন। কিছুক্ষণ চলার পর কথার কী একটা চোরা টানে প্রজ্ঞানকে টেনে নিল মেয়েটা। যে-যে প্রসঙ্গে কথা বলতে শুরু করল, সেগুলো বিলক্ষণ খুবই ভাল লাগতে শুরু করল ওর। অন্য বন্ধু-বান্ধবীরা চ্যাটে ঢুকছে একের পর এক, কিন্তু ওদের এড়িয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। ওরা যা ভাবে ভাবুক, যা বলে বলুক, মন সরাতে ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া ফুরসত কোথায়? মেয়েটা যেন তড়িৎ গতিতে টাইপ করে। ভাবনাগুলো আছে যেন সব ওর আঙুলের মাথায়। ওর তালে তাল মিলিয়ে কথা চালাতে হলে মনোযোগ সরলেই মুশকিল। তাছাড়া ইচ্ছেও করছে না। আজ যথারীতি দুটো বেজে গেল গপ্পো শেষ হতে। বেরিয়ে যাওয়ার আগে প্রজ্ঞান তমসাকে জিজ্ঞেস করে ও দিনের বেলাতেও কখনও অনলাইনে থাকে কিনা? ও বলে রাত ছাড়া ওর সময় হয় না। ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই। সারাদিন পর ওইটুকুই যা একটু নেটটা অন করে বসার সুযোগ।
'তাহলে তো আমিই তোমার সবটা সময় কেড়ে নিলাম? এত রাত হয়ে গিয়েছে। এর পরেও কি অন্য কারও সঙ্গে কথা বলবে?'
'না। আমি এমনিতে কিছু-কিছু ব্যাপারে খুব পার্টিকুলার। এক রাতে একজনের বেশি কারও সঙ্গে কথা বলি না, একজনের সঙ্গে চ্যাট চলাকালীন অন্য আর-একজনের সঙ্গে কথা বলা পছন্দ করি না।'
'দ্যাটস গ্রেট। তোমার সঙ্গে কথা বলে আমারও সেটা মনে হচ্ছে। তুমি এমনভাবে কথা বলো যে, অন্যদিকে মন যাওয়া খুব কঠিন। এমন একটা গতিতে এতক্ষণ কথা চলছিল, আমার এতদিনের প্রিয় অনেক বন্ধু-বান্ধবীই চ্যাটে ঢুকতে চাইছিল। কিন্তু আমি অ্যালাউ করার কোনও ফাঁক ফোকরই পেলাম না। মাত্র এই দু-দিনে এমন মজা পেয়ে গিয়েছি, অভ্যেস এত খারাপ হয়ে গেল, অন্য কারও সঙ্গে দু-এক মিনিটের বেশি চ্যাটে থাকতে ইচ্ছেই করছে না। বাই দ্য ওয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে তোমার ভালো লাগছে তো? তোমাকে আবার বোর করছি না তো?'
'ভালো না লাগলে কথাই এগোতাম না। দ্বিতীয় দিন আর চ্যাটে ঢোকার প্রশ্নই উঠত না।'
'ওহ! থ্যাঙ্কস। তাহলে কাল আবার আজকের মতো, আজকের সময়ে ঢুকছ তো?'
আবার সম্মতি জানাল মেয়েটি। পরের দিনও একইভাবে চ্যাটে ঢুকল। দুটো-আড়াইটে পর্যন্ত কথা চলল পুরোদমে। চ্যাটিং জিনিসটা যে হঠাৎ এমন মাদক নেশার মতো মনে হবে, মেয়েটা যে সামান্য বিষয়টাকে এই জায়গায় এনে তুলবে ভাবতেও পারেনি। একইভাবে কেটে গেল আরও তিনটে দিন। বন্ধু-বান্ধবীরা বারবার জিজ্ঞেস করছে কী ব্যাপার! রাতে একনাগাড়ে চ্যাটে ব্যস্ত দেখছি, অথচ একটা মেসেজেরও উত্তর পাচ্ছি না! এই নিয়ে ওদের যাবতীয় কৌতূহল কৌশলে এড়িয়ে যায় প্রজ্ঞান। প্রিয় কিছু জিনিস ব্যক্তিগত হওয়াই শ্রেয়, তাছাড়া ওদের আর কী করেই বা বোঝাবে কী মজাতে সে মজেছে।
এত তাড়াতাড়ি যে এমন একটা সখ্য গড়ে উঠবে ভাবাই যায়নি। এক সপ্তাহ কাটতে না কাটতেই মেয়েটা যে কী করে ওর এতটা জায়গা জুড়ে বসে পড়ল! নিজেকে ভয়ানক লাকি মনে হয়। প্রাণ খুলে মনের গলিঘুঁজি কুড়িয়ে কথা বলার মতো একজন সঙ্গিনী কে না চায়? পুরো ব্যাপারটা কেমন স্বপ্নের মতো লাগছে আবার বেমক্কা একটা ভয় পেয়ে বসল দু-দিন হল। মেয়েটা যদি একদিনও চ্যাটে ডুব দেয়, তাহলে ও কী করবে? ভাবতেই আকুল হয়ে ওঠে মন। কেউ যখন ভিতর-ভিতর এত অপরিহার্য হয়ে ওঠে, তখনই বোধ হয় এভাবে তাকে হারানোর ভয় পেয়ে বসে।
শুধু সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে কথা বলে তুষ্ট না। মন চাইছে আরও ঘনিষ্ঠতা, তাই আর কিছুক্ষণ কথা চালানোর পরেই প্রজ্ঞান বলে, 'অনেকদিন তো এভাবে হল, আর না। আজ তোমার গলা শুনতে খুব ইচ্ছে করছে। আজ বাকি কথাগুলো ফোনে বলব। যদি কিছু না মনে করো তোমার ফোন নাম্বারটা দেবে? এক্ষুনি একটা কল করব। চিন্তা নেই, আমি একেবারেই ডিস্টার্বিং এলিমেন্ট নই। এই সময় ছাড়া কখনও ফোন করে জ্বালাব না। নাম্বারটা দেবে প্লিজ?'
বলতে-বলতে ফোনটা বেজে উঠল প্রজ্ঞানের একটা অচেনা নাম্বার ভেসে উঠছে সায়লেন্ট করে রাখা সেটটায়। রিসিভ করতেই কানে এ সুরেলা একটি নারীকণ্ঠ, 'হ্যাঁ, বলো কী বলছিলে?'
'কে? কে বলছ?'
'কে আবার? আমি। এই তো এক্ষুনি ফোনে কথা বলতে চাইলে। আবার বলছ কে?'
'সে কী! আমার নাম্বার কোথায় পেলে?'
'কেন? তোমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে।' টাইম বেলের মতো একটা রুনঝুন হাসি বেজে উঠল কানের পরদায়। গভীর রাতের ঘন নিঃশব্দের ভিতর স্পষ্ট, নিখুঁত করে কাটা কাচের টুকরোর মতো মেয়েটার উচ্চারণগুলো শুনতে পাচ্ছে সে। এমন মিঠে ও মোলায়েম গলার স্বর শেষ কোন মেয়ের গলায় শুনেছে মনে পড়ে না, 'কী হল? চুপ করে গেলে কেন?'
'না, না, চুপ করে যাইনি। ভাবছিলাম আমিই ফোনটা করব। ফ্র্যাকশন অফ সেকেন্ডে তুমি কলটা করে দেবে বুঝতে পারিনি। যাইহোক খুব ভালো হল। গ্রেট টু হিয়ার ইয়োর ভয়েস। ইটস নাইস।' আবার সেই মিহিন হাসিটা ছড়িয়ে পড়ল। মাথার ভিতর মুগ্ধতা, কী বলে কথা ভাঙবে বুঝে উঠতে পারছে না প্রজ্ঞান। মেয়েটা বলে ওঠে, 'চ্যাটে টাইপ করার সময় যতটা চটপটে, কথা বলার সময় তেমন প্রম্পট নয় মনে হচ্ছে। গলাও বেশ নার্ভাস লাগছে, নতুন আলাপ তো না। কী বলতে চাইছিলে বলো, নাকি আমাকেই বলতে হবে?'
'না, ঠিক যে বিশেষ কিছু বলার ছিল তা না, আসলে তোমার গলাটা শোনার লোভেই ফোনের বিষয়টা বলা। তুমিই বলো না, আমি বরং শুনি।'
এক ফোঁটা সময় নষ্ট না করে রেডিয়ো জকিদের মতো অনায়াস দক্ষতায় প্রসঙ্গ নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল মেয়েটা, তারপর অনর্গল কথা। কী আশ্চর্য ব্যাপার। সারা জীবনের কথা বলতে গিয়ে চোদ্দোবার হোঁচট খাওয়া, কথা খুঁজে না পাওয়া ছোকরার মুখে আজ কী দারুণ বুলি ফুটেছে। কোথাও আটকাচ্ছে না, ভাবতে হচ্ছে না একেবারে। শুতে-শুতে আবার সেই দুটো, আড়াইটে। সকালে ওঠা যথারীতি দেরিতে। কিন্তু ক্লান্তির প্রশ্নই ওঠে না, এখন বাকি সময়টা শুধু সেই সময়টার অপেক্ষা, রাতে আবার কখন ওই গলাটা শোনা যাবে। দিনের বেলায় নাম্বারটায় কল করলে সুইচড অফ। এমনকী সাড়ে এগারোটার কিছুটা আগে ট্রাই করলেও বলছে দিস নাম্বার ইজ আউট অফ রিচ। তবে গতকালের কথামতো ঠিক সাড়ে এগারোটাতেই ওই নাম্বারটা থেকে ফোনটা ঢুকল। আবার বেজে উঠল সেই চেনা রুনঝুন গলা। আহ্লাদে আটখানা প্রজ্ঞানের খুশি আর ধরে না। সারা দিনের জমানো সব কথা হুড়হুড় করে বলতে থাকে। ফোনালাপ চলতে থাকে অনেক রাত অবধি।
মেয়েদের গলার স্বর জিনিসটার একটা তীব্র আকর্ষণ ক্ষমতা আছে। সেটা তাদের রূপের চেয়ে কোনও অংশে কমজোরি না। কী এক অদ্ভুত সম্মোহনি ক্ষমতা আছে মেয়েটার গলায়! যতদিন গলা শোনেনি, ততদিন একরকম ছিল। কিন্তু কথা শোনার পর থেকে সমীকরণটা অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। অন্য আর কিচ্ছু ভাল লাগছে না। শুধুই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে, পড়াশুনোয় মন বসছে না, লেকচারারের পড়ানো কানে ঢুকছে না, খুব কাছের হাতে গোনা কিছু বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গও অস্বস্তিকর লাগছে, গান, বই, গেম, প্রিয় রেস্তোরাঁর মটন বিরিয়ানি সবই কেমন বিস্বাদ লাগছে। এ তো আচ্ছা ঝামেলায় পড়া গেল। এমন তো জীবনে আর কখনও হয়নি। শেষ তিন-চারদিন কথা বলার সময় মেয়েটাকে নানা কায়দায় নিজের মনের এই সব অস্থিরতার কথা জানাতে চেষ্টা করে প্রজ্ঞান। বারবার অনুরোধ করে দিনের বেলাতেও ফোনটা কোনও একটা সময় অন্তত খোলা রাখতে কিন্তু মেয়েটা প্রসঙ্গটা এড়িয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়। মেয়েটি ব্যক্তিত্বময়ী। উপায় যখন নেই আর কী করা যাবে! বরং সারাদিনের রুটিনটাই বদলে ফেলেছে প্রজ্ঞান। এখন ও যেন প্রায় একজন নিশাচর। দিনের বেলায় একা-একা নির্জন সব গলির ভিতর দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে ভাবতে থাকে মেয়েটা হয়তো তন্বী, উজ্জ্বলবর্ণা, দিঘল চোখ, উন্নত নাক, সরু পাতলা ঠোঁট, হাসলে কচি-ভুট্টার দানার মতো সাজানো দাঁত দেখা যায়, ছোট্ট কপালে হালকা চুল এসে পড়ে অথবা অন্যরকমও হতে পারে। যেমনই হোক ওই রকম শ্রুতিসুখকর গলা যার, ওই রকম বাকপটুত্ব, তার চেহারায় নিশ্চয়ই তেমন একটা ব্যাপার থাকবেই। একটানা অনেক দিন ফোনে কথা তো অনেক হল, কিন্তু মেয়েটা যেমন দিন-দিন ওর অবসেশন হয়ে উঠছে, তেমনই রোজ আরও প্রবল হয়ে উঠেছে মেয়েটাকে একবার চাক্ষুষ দেখার ইচ্ছে। একবার ইচ্ছেটা যখন মাথায় চেপে বসেছে, না মেটা অবধি কিছুতেই শান্তি নেই। কিন্তু মেয়েটা এই ব্যাপারে একেবারেই নারাজ। অনেকবার অনুরোধ করেও যখন ফল হল না, তখন প্রজ্ঞান ফেসবুক মারফত অন্তত একটা ছবি পাঠাতে বলে। জবাবে মেয়েটা হাসে, 'কেন প্রোফাইলে তো আমার ছবি আছে।'
'কিন্তু ওটা তো খুব অস্পষ্ট, যদিও খানিকটা আন্দাজ করা যায় যে তোমার মুখের ফিচারগুলো বেশ শার্প! সত্যি কথা বলতে কি ওই ইঙ্গিতপূর্ণ ছবিটার জন্যই তোমাকে দেখার ইচ্ছেটা আরও বেড়ে গিয়েছে।'
'ওর চেয়ে স্পষ্ট ছবি আমার নেই। তাছাড়া স্পষ্ট ছবি দেখলে আর দ্বিতীয় দিন আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইবে না। আসলে কিন্তু আমাকে দেখতে এতই খারাপ, চোখে দেখলে এতদিনের সব বন্ধুত্ব রাতারাতি শেষ। তার চেয়ে এই তো বেশ ভালোই চলছে।'
'বাজে কথা বোলো না। ওই ছবিটা তোমার হলে তোমায় কিছুতেই খারাপ দেখতে হতে পারে না।'
'ছবি জিনিসটা আমার ঠিক পছন্দের না। তাছাড়া ওটা তো অনেক বছর আগে তোলা ছবি। তখনকার ব্যাপারটাই ছিল আলাদা, এখন ও সব আর কিছুই নেই।'
'ভণিতা করো না প্লিজ। তোমাকে ঠিক বোঝাতে পারব না তোমাকে একবার দেখার জন্য ভিতর-ভিতর কতটা ডেসপারেট হয়ে উঠেছি। একবার চোখের দেখা না দেখলে একটা অস্থির ভাব থেকেই যাচ্ছে। সার্কলটা কিছুতেই কমপ্লিট হচ্ছে না। আমার পরিস্থিতিটা একটু বোঝার চেষ্টা করো।'
'না দেখাটাকে তোমরা এত গুরুত্ব দাও কেন বলো তো? ভেবেছিলাম তুমি কিছুটা অন্য রকম হবে। এখন তুমিও দেখছি বেশিরভাগের মতো।'
'মোটেও না, আমি ঠিক অন্যদের মতো নই, কিন্তু কী করে বোঝাই বলো তো এই ক-দিনে তুমি আমার কাছে এতটাই হয়ে উঠেছ একবার না দেখলে আর কিছুতেই পারা যাচ্ছে না। একবার প্লিজ, একবার। কথা দিচ্ছি কিছুতেই কিছু এসে যায় না। সুন্দর, কুৎসিত, সহনীয়, অসহনীয় সে তুমি যা-ই হও, যেমনই হও আমার কিছু এসে যাবে না। তুমি আমার কাছে সেই অসামান্যাই থাকবে।'
'কী বলি, বলো! সওয়া-না-সওয়াটা যখন তোমার ব্যাপার আমার কী আর বলার থাকতে পারে, বলো?'
'হ্যাঁ, ওটা কোনও ব্যাপার না। ঠিক আছে। ছবি ব্যাপারটা পছন্দ না হলে ভিডিয়ো চ্যাটিং-এ এসো। তুমি তোমার ল্যাপটপের ওয়েবক্যামটা অন করো, আমি আমারটা অন করছি। মুখোমুখি বসে কথা বলা যাবে।'
'আরও একবার ভেবে দেখো সহ্য করতে পারবে তো? চূড়ান্ত হতাশ হলে কিন্তু দায় আমার নয়।'
'ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে। ও সব আমার ওপর ছেড়ে দাও। তুমি ওয়েবক্যামটা তো আগে চালু করো। এই আমি আমারটা চালু করলাম।'
সেকেন্ডের ভগ্নাংশে চালু হয়ে গেল ভিডিয়ো চ্যাট অপশন। ওপার থেকে মেয়েটি বলে ওঠে 'বাহ! এই তো তোমায় দেখতে পাচ্ছি। এই তো তুমি নীল টি-শার্ট পরে, স্ক্রিনের উপর ঝুঁকে বসেছ। পিছনে তোমার বইয়ের আলমারি, এ তো বিশাল কালেকশন!'
'হ্যাঁ কিন্তু আমি তো তোমায় দেখতে পাচ্ছি না। আমার স্ক্রিনটা এইরকম বিচ্ছিরি ঝিরঝির করছে কেন? কিছু দাগ ওঠানামা করছে। কী ব্যাপার? তোমার ওয়েবক্যামটার কোনও সমস্যা হচ্ছে না তো?'
'কিন্তু আমি তোমায় পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, মুখটা এখন একটু অস্থির দেখাচ্ছে। দাঁত দিয়ে তলার ঠোঁটটা কামড়ে ধরে চুলের ভিতরে বাঁ-হাত চালাচ্ছ। তোমার যন্ত্রটার বোতামগুলো টেপাটেপি করছ।'
'হ্যাঁ। কিন্তু আমি তোমায় দেখতে পাচ্ছি না কেন? তুমি তোমার সেটের ক্যামেরাটা একটু চেক করে দ্যাখো তো। একবার বন্ধ করে চালাও দেখি। আমার মনে হয় কোনও যান্ত্রিক সমস্যা হচ্ছে।'
'উঁহু! যান্ত্রিক গোলযোগের প্রশ্নই ওঠে না। আমার ল্যাপটপটা একেবারে ব্রান্ড নিউ, ক্যামেরাটাও খুব হাই রেসলিউশনের। তোমার ছবি দিব্যি দেখতে পাচ্ছি মানে তোমারটাতেও কোনও সমস্যা নেই।'
'তাহলে হলটা কী? এ তো আজব কাণ্ড! একবার বন্ধ করে চালিয়েই দ্যাখো না, নেট ওয়ার্কের কোনও সমস্যা হলে তো দু-দিকেই হত। দিব্যি তোমার গলা শুনতে পাচ্ছি, শুধু ছবিটাই ডিস্টার্ব করছে।'
মেয়েটা আর প্রজ্ঞান দু-জনেই ওদের ল্যাপটপের ভিডিয়ো ভিউ বন্ধ করে আবার চালায়। কিন্তু দিশেহারা হয়ে ওঠে প্রজ্ঞান। ইচ্ছেটা দোরগোড়ায় এসেও এভাবে বাধা পাওয়ায় হতাশ শূন্যে হাত ছোঁড়ে। খামচে ধরে চুল, 'এমন কেন হচ্ছে মাথায় ঢুকছে না। সত্যি করে বলো তো তুমি কি চাইছ না আমি তোমায় দেখি? যদি তাই-ই হয়, প্লিজ আমার সঙ্গে এমনটা করো না। তুমি হয়তো ঠিক বুঝে উঠতে পারছ না তোমায় এক ঝলক দেখার জন্য কতটা মরিয়া হয়ে উঠেছি। তোমার কাছে ব্যাপারটা জাস্ট একটা মজা হতে পারে, কিন্তু আমি যে এ ব্যাপারে কতটা সিরিয়াস বলে বোঝাতে পারব না।'
'সিরিয়াস বলতে তুমি কি আমার প্রেমে পড়েছ নাকি?'
'প্রেম কী জিনিস? কাকে বলে? আমি জানি না। কিন্তু হ্যাঁ, শেষ কয়েক সপ্তাহে তুমি আমার কাছে যেভাবে অনিবার্য হয়ে উঠেছ, এমনভাবে আমার সব চিন্তাভাবনার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়েছ, এখন আর তোমার কাছ থেকে আমার রেহাই নেই। বাইরে থেকে দেখে বুঝতে পারবে না ভিতরে-ভিতরে আমি ঠিক কেমন। একবার যা চেয়ে বসি এমন ভয়ানকভাবে চেয়ে বসি যে, সেটা থেকে রক্ষা করে কার সাধ্য। আমাকে এখন তোমায় দেখতেই হবে। আজ না হয় কাল, যে করে হোক দেখতেই হবে। না হলে তিষ্ঠতে পারছি না। যদি বন্ধু বলে মনে করো, বন্ধুর প্রবলেমটা বোঝার চেষ্টা করো।'
'প্রবলেমটা বুঝতে পারছি, সেই জন্য খারাপ লাগছে কিছুটা। এই আশঙ্কাটাই করছিলাম।'
'মানে? কী বলতে চাইছ বুঝতে পারলাম না। আশঙ্কা মানে? কীসের আশঙ্কা?'
'বোধ হয় আমার আর তোমার এই সম্পর্কটা শেষ হওয়ার সময় এসে গিয়েছে।'
'কেন? এমন বললে কেন?'
আঁতকে ওঠে প্রজ্ঞান, কাতর হয়ে ওঠে গলা, 'কেন হঠাৎ কী এমন হল? আমি এমন কী করলাম! সম্পর্ক শেষ বলতে, এ কী বলছ? এমন বলো না তমা... সারাজীবন ধরে আমি নিঃসঙ্গ। তুমি আসার আগে পর্যন্ত কখনও এমন একজনকেও পাইনি যার সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে আমি আসলে একা নই। আমাদের সম্পর্ক হয়তো অল্পদিনের কিন্তু তুমি জানো না এই আমার কাছে তোমার মূল্য কতখানি।'
'এতটা মূল্য দিয়ে ফেলেছ বলেই তো বিপদ। সমূহ সেই বিপদটা ঘটুক, জেনেশুনে সেটা কী করে চাইতে পারি বলো?'
'মানে? এ সব কী হেঁয়ালি করছ? আচমকা এইরকম নিষ্ঠুরের মতো কথা বলছ কেন? অনুগ্রহ করে আমার অত্যন্ত সৎ এই মানসিক দুর্বলতাটা নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলো না। আমি ঠিক আর দশটা ফ্লার্টেশাস ছেলের মতো না। আমি কষ্ট পাচ্ছি।'
'কিছু করার নেই প্রজ্ঞান, আমি দুঃখিত। আমিও প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি তুমি হুট করে ব্যাপারটাকে এতটা ভিতরে নিয়ে ফেলবে! দোষটা আমারই। পারলে ক্ষমা করো। যাইহোক আর দেরি করলে বড়ো কোনও ক্ষতি হয়ে যেত। তার চেয়ে ছোটো একটা ধাক্কা। আই মিন তার চেয়ে দেখা দেওয়াই ভালো। কিন্তু তুমি তৈরি তো?' ভ্যাবাচাকা খেয়ে কী বলবে বুঝে উঠতে প্রজ্ঞান 'হ্যাঁ, হ্যাঁ। দেখি, একবার অন্তত দেখি, কিন্তু ঠিক বুঝলাম না... ধাক্কা? দেখা দেওয়া? কী বলতে চাইছ বুঝতে পারলাম না।'
'না বোঝাই ভালো। বলছি কী যে আমায় দেখা মানেই তো আমাদের সব সম্পর্ক শেষ। কিছু মনে করো না ধাক্কাটা সামলে নিও।' শেষ কথাগুলো এত অস্পষ্ট করে বলা, উত্তেজনায় ঠিকমতো কানে ঢোকেনি প্রজ্ঞানের।
'কী বললে? বুঝতে পারলাম না। আর-একবার বলো।'
'বলার আর কী আছে? তুমি তো আমায় দেখতে চাইছিলে।'
'হ্যাঁ হ্যাঁ।' বলতে না বলতেই ঘরের আলোটা নিভে গেল ঝপ করে। হঠাৎ একটা স্যাঁতসেঁতে ঠান্ডা হাওয়া দৌড়ে গেল গায়ের ওপর দিয়ে। শিরশিরিয়ে উঠল শিরদাঁড়া। ঘরময় একটা অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ। গা ছমছমিয়ে উঠল প্রজ্ঞানের। কম্পিউটার স্ক্রিনটা তখনও আগের মতো ঝিরঝির করছে। ওইদিকে একদৃষ্টে তাকিয়েছিল প্রজ্ঞান। চেনা গলাটা কানে আসায় চমকে উঠছে সে, 'স্ক্রিনে কী দেখছ? আমি তো তোমার পিছনে।'
'মানে!' গলা আটকে এল ভয়ে, বুকের রক্তে চুমুক মারল ভয়। হৃদযন্ত্রের ধড়াস-ধড়াস শব্দ আসছে কানে। সারা শরীর অসাড় হয়ে আসছে, তবুও তাগিদটা প্রবল। সে আস্তে-আস্তে মুখ ঘোরাতে লাগে পিছনে। আলোর অভাবে কিছুই দেখা যাচ্ছে না প্রায়। তবু অন্ধকারে চোখ সইয়ে নেয় সে। কম্পিউটারের স্ক্রিনের মৃদু আলোয় যেটুকু বোঝা যাচ্ছে সেটা একটা ওড়নার মতো। ওড়নার প্রান্তের উজ্জ্বল পাড়টা পাখার হাওয়ায় কাঁপছে। তার পিছনে গাঢ় অন্ধকারের একটা অবয়ব। বোঝা যাচ্ছে না একেবারে, কিন্তু একটা উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে— দেড়, দু'হাত দূরে। দরদরিয়ে ঘেমে ওঠে প্রজ্ঞান, থরথরিয়ে ওঠে আপাদমস্তক। সুষুম্না বরাবর একটা ঠান্ডা স্রোত চকিতে ওপর দিকে ওঠে ধাক্কা মারল আর ট্রান্সফর্মারের ফিউজ ওড়ার মতো হল মাথার ভিতরে। বিন্দু-বিন্দু আলোর ফুলকি ছড়িয়ে পড়তে লাগল চারদিকে। কয়েক মুহূর্তের ভিতরে চেতনা নিভে এল। সব অন্ধকার, কমপ্লিট ব্ল্যাক আউট।
সকালে জ্ঞান ফেরার পর বেশ কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে শুয়ে রইল প্রজ্ঞান। তারপর ধড়মড়িয়ে উঠে ল্যাপটপটা খুলে ফেসবুকে নিজের লম্বা ফ্রেন্ডলিস্টটা খুঁজতে লাগল স্ক্রিনে চোখ গেঁথে দিয়ে। কিন্তু কোথাও নেই। তমসা নামের সেই অ্যাকাউন্টটাই আর নেই কোথাও। বারবার চেক করতে লাগল আগাপাছতলা। কমন দু-চারজন ফ্রেন্ডলিস্টও সার্চ করা হল কিন্তু বৃথা চেষ্টা। নিশ্চয়ই কাল রাতেই ওর সঙ্গে ওদেরও আনফ্রেন্ড করে বেরিয়ে গিয়েছে। হাজার খুঁজে আর ওকে পাওয়া যাবে না, কোত্থাও না, কোনও দিনও না। ভিতরটা হু-হু করে ওঠল, চিনচিন করে ওঠল পাঁজর। বুকের ভিতর মহাকাশ জোড়া শূন্যতা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন