খাদের কিনারে

তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়

দোকানটার নাম 'ধৌত নিলয়'। শহরতলির একসময়ের জামাকাপড় কাচার পুরোনো, বনেদি দোকান। বাইরে থেকে দেখতে খুব একটা ঝাঁ চকচকে না হলেও, সাইনবোর্ডটা সাবেকি ধরনের। অনুজ্জ্বল কিন্তু রুচিশীল। দোকানটির নতুন মালিক সৈকত রক্ষিত বছর আটাশের তরুণ। নিতান্ত অনিচ্ছাতেই তার আচমকা মালিক হয়ে বসা। আর কোনও উপায়ও ছিল না। ওর বাবা সুনীল রক্ষিত, যাঁর নামে এখনও টাউনের লোকজন দোকানটাকে চেনে, হঠাৎই মারাত্মক অসুস্থ হয়ে মাস-চারেক হল পুরোপুরি বিছানা নিলেন। বাড়ির একমাত্র ছেলে হওয়ার কারণে, তাই পুরো দায়িত্বটা সৈকতের ঘাড়ে এসে পড়ল হুড়মুড়িয়ে।

এমনিতে সৈকত বেশ স্ফূর্তিবাজ ফান্টুসগোছের ছেলে। দামি-দামি জুতো, জামা, ঘড়ি, গগলস পরে, পকেটে লেটেস্ট মডেলের স্মার্টফোনটি নিয়ে, একখানা লাখ-টাকা দামের বাইক হাঁকিয়ে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোটাই এতদিন ছিল তার জীবন। বাবা যতদিন সুস্থ ছিলেন, কোনও কিছু নিয়েই কোনও চিন্তাভাবনা ছিল না। কিন্তু এখন হাড়ে-হাড়ে বুঝছে, কত ধানে কত চাল! বাবার বয়স হয়েছিল, ওঁকে তো একদিন সবকিছু থেকে অবসর নিতেই হত। আর সৈকতকেই বসতে হত সেই চেয়ারে। তবু তার জন্য তৈরি হওয়ার একটা ব্যাপার থাকেই। এত খাটাখাটনির অভ্যেস নেই, তাই কিছুদিন হল রীতিমতো দমবন্ধ করা অবস্থা দাঁড়িয়েছিল। খালি মনে হচ্ছিল, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে একটা সপ্তাহ অন্তত দূরে কোথাও ঘুরে আসতে পারলে কী যে ভালো হত। ভাইপোর মনের কথা বুঝে কাকাও ওকে পরামর্শ দিলেন, ক-টা দিনের জন্য বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে কাছাকাছি কোনও একটা টুরিস্ট স্পটে ঘুরে আসতে। এদিকটা না হয় সেই ক-দিনের জন্য যা হোক করে উনি সামলে দেবেন।

বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করতেই ওরা তো সব লাফিয়ে উঠল। দোকানে বসেই সব ঠিক করে ফেলল। সাতদিনের জন্য ওরা এবার উত্তরবঙ্গে যাবে। আগে দু-বার গিয়েছে, কিন্তু এবার যাবে লাভা-লোলেগাঁওয়ের দিকটা। এখন মার্চ মাস। অতএব পারফেক্ট ওয়েদার। বন্ধু শান্তনুদের গাড়ির ব্যাবসা। ওদের বড়সড় গাড়িটাতেই ওরা সাতজন রওনা দেবে আগামী শনিবার। হাতে আর মাত্র তিনদিন সময়। তাই সৈকতের গোছগাছ শুরু হয়ে গেল সেই রাত থেকেই। পোশাকের ব্যাপারে শৌখিন, তাই ওর ঢাউস ব্যাগের বেশিরভাগটাই জুড়ে বসতে লাগল নিত্যনতুন সব জামাকাপড়। এক-একদিন এক-একটা করে পরবে, আর নানান পোজে ছবি তুলবে। পূর্ব হিমালয়ের কোলে বেশ ক-টা দিন যতদূর সম্ভব মাথা থেকে বের করে দেবে এদিককার সব ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট।

পরের দিনই দুপুরবেলা দোকান থেকে ফেরার সময় দোকানের শোকেস থেকে বাড়ি নিয়ে এসেছিল চকোলেট রঙের ফেব্রিকের দারুণ একটা কোট। কোটটা ওদের না। কোনও খদ্দেরের হবে নিশ্চয়ই। যবে থেকে ও দোকানে আসা শুরু করেছে, তবে থেকেই ওটাকে দেখছে কাচের শোকেসের হ্যাঙারে টাঙানো রয়েছে। কর্মচারী ছেলেটা বলছিল, ওটা নাকি এক বছরেরও বেশি হল এখানেই পড়ে আছে। ড্রাই-ওয়াশ করতে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আজ পর্যন্ত ওটা কেউ নিতে আসেনি। শুনে দুষ্টুবুদ্ধি খেলে গিয়েছিল সৈকতের মাথায়। কে জানে কবে ওটা কে নিতে আসবে, যবে আসে আসবে! ক্যাশমেমোতে যখন লেখাই থাকে এক বছরের বেশি যদি কোনও জিনিস আনডেলিভারড পড়ে থাকে, তা হলে সেটা হারিয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়, তখন কার কী বলার থাকতে পারে?

কোটটা ভীষণই পছন্দ হয়েছিল সৈকতের। মাল্টিন্যাশনাল ব্র্যান্ডের দুর্দান্ত একটা আপার সুট। ভালো ড্রেসের উপর চিরকালই ওর খুব লোভ। এদিক-ওদিক অনেক কথা ভেবেও শেষমেশ কিছুতেই সামলাতে পারেনি নিজেকে। ওটাকে শোকেসে থেকে বের করে দোকানের ভিতরের ঘরে লম্বা আয়নার সামনে নিয়ে গেল একান্তে। গায়ে চাপিয়ে নিজেকে অনেকক্ষণ ধরে ঘুরে ফিরে দেখতে লাগল। বাঃ দারুণ ফিট করেছে, মানিয়েছেও বেশ। নিজে মালিক, তাই কাউকে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করেনি সে। একটা বিগ শপারে পুরে সোজা নিয়ে চলে এসেছিল বাড়িতে। প্যাক করে ফেলেছিল বেড়াতে যাওয়ার ব্যাগে।

সত্যিই অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বটে উত্তরবঙ্গের। যতবারই আসা যাক, নতুন-নতুন ভাবে ভালো লাগে। কালিম্পং থেকে লাভা হয়ে ওরা এসেছে লোলেগাঁওতে। ছোট্ট একটা পাহাড়ি লেপচা গ্রাম। এমন শান্ত-স্নিগ্ধ ছবির মতো আঁকা চারদিক দেখতে-দেখতে মনে হচ্ছিল যেন স্বপ্নের দেশ। আকাশছোঁয়া সব ওক, পাইন, ফার আরও কতসব নাম না-জানা গাছ, ফুল, অর্কিডের সমারোহ যেন দু-চোখের মহাভোজ, ঝান্টিধারা বলে একটা সানরাইজ পয়েন্ট থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘায় সূর্য ওঠা দেখার অভিজ্ঞতা তো কখনও ভোলার নয়। তুলনা হয় না, ঝুলন্ত কাঠের ফুটব্রিজটার ওপর দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হইহই করতে-করতে হাঁটা, জিপে করে ঘুরতে যাওয়া নেওড়াভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক।

কৌশিক গিটার এনেছে। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর হোটেলে বসে জমিয়ে গানবাজনার পর বিকেল পর্যন্ত চলল তুমুল আড্ডা। তারপর যথারীতি কাছেপিঠে ঘুরতে বেরল ওরা। চলল ছবি তোলা আর অনর্গল বকরবকর। বিকেলের আলোটা এতই ভালো লাগছিল যে, ছবি তোলার পক্ষে আইডিয়াল, কী পরি-কী পরি করতে-করতে অবশেষে চকোলেট কালারের ওই কোটটা পরে বেরল সৈকত। সঙ্গে হালকা জিনস। অন্যবার বেড়াতে এসে সৈকত বাকিদের মতোই হাসিঠাট্টা করতে-করতে ঘোরে। কিন্তু এবার যেন ও কিছুটা চুপচাপ। পারিবারিক ব্যাবসার দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার পর আগের চেয়ে অনেকটাই সিরিয়াস হয়ে গিয়েছে। নাকি বাবার শরীর খারাপ নিয়ে মন খারাপ, কে জানে! আপন মনে প্রকৃতির ছবি তুলে যাচ্ছে। পাহাড়, ঝরনা বা সেরকম কোনও অসামান্য দৃশ্যের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ছে এখানে-ওখানে। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে হাঁটছে। ওর হাবভাব দেখে বন্ধুরা তো সব ফিসফিস করতে শুরু করে দিয়েছে, 'সাকিটার হলটা কী!'

কিছুক্ষণ বাদে এসে প্রবীর জিজ্ঞেস করল, 'কী ব্যাপার, দূরে-দূরে থাকছিস? মুখে বিশেষ কথা নেই, কী হয়েছে? এনি প্রবলেম?'

শুনে সৈকত মৃদু হাসে। যতদূর চোখ যায় ছড়ানো ভ্যালিটার দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে, 'দেখেছিস, কী অসম্ভব সুন্দর। এখানে দাঁড়িয়ে কি কারও কথা বলতে ইচ্ছে করে।'

'সে তো বটেই,' কথা না বাড়িয়ে চলে যায় প্রবীর। গল্পে মশগুল বাকিরা এগোচ্ছে আগে-আগে। আর তন্ময় হয়ে হাঁটতে-হাঁটতে সৈকত মাঝে-মাঝেই পিছিয়ে পড়ছে। যে রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, সেটার উপর দিয়ে একটা ছেঁড়া মেঘের টুকরো ভেসে চলে গেল এইমাত্র। মিনিটখানেক সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। মেঘটা পেরিয়ে চলে যাওয়ার পর চোখে কেমন একটা ধোঁয়াশা লাগছিল। চোখের পাতা পিটপিট করে ভিশনটা অ্যাডজাস্ট করে সামনে এগোতে যাচ্ছে, আচমকা ধাক্কা লাগল একটা সুদর্শন, কাঁচাপাকা দাড়িওয়ালা লম্বা লোকের সঙ্গে।

লোকটা উলটো দিক থেকে ওর মতোই বাহ্যজ্ঞানশূন্যের মতো হেঁটে আসছিলেন। জোর ধাক্কা খেয়ে, বিরক্ত সৈকত লোকটার উদ্দেশে চেঁচিয়ে বলল, 'এ কী! দেখে হাঁটতে পারেন না?'

লোকটা নিজের দু-হাত ঘষতে-ঘষতে অপরাধীর মতো মুখ করে ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'সরি ভাই, বুঝতে পারিনি। মেঘটা এমনভাবে পাস করল, আমি ঠিক আঁচ করতে পারিনি। তোমার লাগেনি তো? অ্যায়াম এক্সট্রিমলি সরি...'

'ঠিক আছে, ঠিক আছে। ইটস ওকে!' লোকটার বিনয়ী চোখমুখ দেখে সৈকত বলে উঠল।

'তুমি তো ভাই, আমার মতোই বাঙালি দেখছি, ওয়ান্ডারফুল! তা কোথা থেকে আসা হচ্ছে?' একমুখ হাসি নিয়ে লোকটি জিজ্ঞেস করলেন।

সৈকত নিজের শহরের নাম, ঠিকানা বলাতে লোকটি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন, 'সে কি! চাকরিসূত্রে তো আমার ওখানেই বছরতিনেক পোস্টিং ছিল। তখন ডেলি প্যাসেঞ্জারি করতাম।'

'আর আপনার বাড়ি?' সৈকত জিজ্ঞেস করল।

লোকটা ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলেন, 'বাড়ি জিনিসটা সবার মতো আমারও ছিল ভাই। কিন্তু এখন সে-সব পাট উঠে গিয়েছে। এখন বলতে পার, আমি একজন ভবঘুরে। যখন যেখানে ইচ্ছে হয়, চলে যাই। আপন খেয়ালখুশি মতো ঘুরে বেড়াই। শেষ দু-তিন মাস এখানেই আছি। তাই এখন এটাই আমার বাড়ি বলতে পার।'

'তা হলে তো আপনাকে বেশ লাকি বলতে হয়,' সৈকতের কথা শুনে লোকটি হো হো করে হেসে উঠলেন। ওঁর হাত দুটো ধরে খুব করে শেক করতে-করতে বললেন, 'এইরকম সব অভাবনীয় মহলে থাকতে পারার সৌভাগ্য আর ক'জনার কপালে জোটে বলো? আমি তো এখানকার লেপচা ভাইবোনদের বলি, তোমরা জন্মে থেকেই কত লাকি, সেটা তোমরা নিজেরাই জান না।' লোকটি বুক ভরে শ্বাস নিয়ে চনমনে ঢঙে আবার বলে ওঠেন, 'পাবে? তোমাদের ওই সব এঁদো টাউনে কোটি টাকা দিয়েও, এই হাওয়া পাবে? আহা! একেই তো বাংলায় বলে মলয় বাতাস। বাই দ্য ওয়ে, ফরচুনেটলি আমার বাবা, মা আজ থেকে তিপান্ন বছর আগে আমার নাম রেখেছিলেন মলয়। ওয়েল, মাই ফুল নেম ইজ মলয়কান্তি বাগচি।'

'সুন্দর নাম,' সৈকত হাসে কিন্তু লক্ষ করে লোকটি ওর গায়ের কোটটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। চোখে-চোখ পড়ে যাওয়ায় কিছুটা অপ্রস্তুতভাবে লোকটি বললেন, 'তোমার কোটটা তো খুব সুন্দর। খুব পছন্দসই কালেকশন। কোথা থেকে কিনলে? তোমাদের টাউন না কলকাতা?'

'কেন বলুন তো?' ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে সৈকত।

'না-না, আমার কৌতূহল মার্জনা করো। আমি আসলে জানতে চাইলাম কারণ, আমার নিজেরও অবিকল এই ধরনের একটা কোট ছিল। কলকাতার নিউমার্কেট থেকে কেনা। তোমারটা দেখে ওটার কথা পড়ে গেল। আমি আসলে পোশাকের ব্যাপারে খুব শৌখিন ছিলাম। আমার হবি বা প্যাশন যাই বলো, ওটাই ছিল। আর এখন দেখো, সেই আমি এসব ছেঁড়া, ফুটো, সব গায়ে চাপিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কত পালটে গিয়েছি ভাবাই যায় না,' বলতে-বলতে লোকটি কেমন উদাস হয়ে গেলেন। বাঁহাতের সরু রাস্তাটা ধরে আপন মনে হাঁটতে লাগলেন।

পিছু নিল সৈকত, 'কেন? পালটালেন বলতে, কী হয়েছিল?'

'আর বোলো না। আমার ছিল ঘোরার ভয়ানক নেশা। ঘর-সংসারে মন ছিল না। টানা তিনদিন ছুটি পেলেই বাসে, ট্রেনে চেপে পাখি ফুড়ুৎ। তা শেষবার যখন এই লোলেগাঁওতে এলাম, কী জানি, কেন যে এত ভালো লেগে গেল! এখানকার পরিবেশে এত মায়া। আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করল না। এখানেই ঘাঁটি গেড়ে ফেললাম। ঠিক করলাম, বাকি জীবনটা এখানেই কাটিয়ে দেব। এখন এখানকার লোকজন, এই হাওয়া, আলো, মেঘ, পাহাড়, ভ্যালি, ঝরনা, গাছপালা, ফুল, পাখিদের এতই ভালোবেসে ফেলেছি যে, আর ছেড়ে যাওয়ার কোনও উপায় নেই। এই জায়গাটার নেশা খুব ভয়ানক। একবার ভালোবেসে ফেললে আর ফিরতে পারবে না। মনে হবে এটাই আমার জায়গা, আমার ঘরবাড়ি।'

ঢালু রাস্তা দিয়ে নামছেন লোকটি। সৈকত পিছন-পিছন এগোচ্ছে তাল মিলিয়ে, 'কিন্তু, আপনার ফ্যামিলি?'

'আছে। ওরা আমাদের দমদম পার্কের বাড়িতে আছে। মাঝে-মাঝে ওদের ওখানে যাই। দেখা করে আবার চলে আসি। আসলে এখানে আমার বাড়িটা এত সুন্দর।'

'কোথায়? এখানে আপনার বাড়িটা কোথায়?'

'এই তো এই রাস্তায়। তুমি যাবে?' লোকটি পিছন ফিরে আড়চোখে দেখলেন। সৈকত মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

'তা হলে এসো, এই তো কাছেই। এই তো প্রায় চলেই এসেছি। শর্টকার্টটা ধরলে আর সাতমিনিট।'

লোকটি বেশ জোরেই হাঁটছেন। আর পিছন-পিছন সৈকতও আসছে নানা প্রশ্ন করতে-করতে। লোকটি উত্তর দিতে-দিতে চলেছেন ঢালু পাথুরে রাস্তাটা দিয়ে। লোকটি দারুণ ইন্টারেস্টিং। সত্যিই নেশা ধরে যাচ্ছে কথা বলতে-বলতে।

সৈকত বলে উঠল, 'এদিককার রাস্তা কিছুই চিনি না। ফেরার সময় সন্ধে হয়ে গেলে তো আরও চিনতে পারব না।'

'ডোন্ট ওরি, কোন হোটেলে আছ বলো, আমি নিজে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসব।'

'ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি চলুন,' রুদ্ধশ্বাসে লোকটাকে ফলো করে হাঁটতে থাকে সৈকত।

'সৈকত...' হঠাৎ পিছন থেকে ভীষণ জোরালো তীক্ষ্ন একটা চেনা গলা শুনে থমকে গেল সৈকত। পিছন ফিরে তাকাল। দেখল প্রবীর আর শান্তনু দাঁড়িয়ে আছে একটা ঢিবির উপর। ওদের চোখেমুখে আতঙ্ক। দু'হাত সামনে বাড়িয়ে প্রাণপণে চিৎকার করে কী যেন বলছে ওরা। সৈকত শোনার চেষ্টা করতেই, শুনতে পেল ওরা বলছে, 'কোথায় নামছিস তুই... কোথায় দাঁড়িয়ে আছিস... এসব কী পাগলামি হচ্ছে?'

সৈকত কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল যেন। এক ঝটকায় সংবিত ফিরে পেয়ে সামনে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে সে। হৃৎপিণ্ডে খামছে ধরেছে ভয়... এ কী! আর-এক পা বাড়ালেই অতল খাদ! নির্ঘাত মৃত্যু! পা হড়কে গেল নার্ভাস হয়ে। কোনও রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে পিছনে ঝাঁপ মারল সৈকত। একটা পাথরকে জাপটে ধরল প্রাণের দায়ে। বন্ধুরা দৌড়ে এসে ওকে টেনে তোলার পর, চারদিকে উদভ্রান্ত চোখে কাকে যেন খুঁজতে থাকে সৈকত, 'কিন্তু মলয়বাবু কোথায় গেলেন?'

'কে মলয়বাবু?'

'আরে, এই তো রাস্তায় দেখা হল। ওঁর পিছন-পিছনই তো যাচ্ছিলাম ওঁর বাড়ি।'

'কী যা তা বলছিস, মাথাটাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? কোথায় কে? কার বাড়ি? এদিকে কি আর রাস্তা আছে যে, কারও বাড়ি থাকবে?'

শিরদাঁড়া শিরশিরিয়ে ওঠে সৈকতের। আপাদমস্তক ঘেমে, নেয়ে সারা। প্রবীর বলল, 'পিছন ফিরে তাকিয়ে তোকে না দেখে, ভাগ্যিস এই রাস্তা ধরে খুঁজতে নেমেছিলাম।'

উত্তরবঙ্গ থেকে বাড়ি ফিরে ব্যাগটা নামিয়ে সে আগে পড়ি কী মরি করে ছুটে গেল দোকানে।

পুরোনো কর্মচারী তারকদাকে সঙ্গে নিয়ে আতিপাতি করে খুঁজতে থাকে একবছর হবে। ড্রয়ারে নিজে হাতে রেখে দেওয়া ওই কোটটার গায়ে সুতো দিয়ে লাগানো রসিদের যে নম্বরটা ছিল, ওটার ডুপ্লিকেট রসিদটায় ওটার মালিকের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর তাকে পেতেই হবে।

রাত তখন প্রায় দেড়টা। মেমো নম্বর মিলিয়ে তারকদা খুঁজে পেল সেই রসিদের কপিটা। বাবার হাতে লেখা কোটটার মালিকের নাম, ঠিকানা পড়ে আবার আঁতকে উঠল সৈকত। একেবারে গোটা-গোটা করে লেখা সেই নাম। এম কে বাগচি, বাড়ির নম্বর দেওয়া দমদম পার্কের ঠিকানায়।

সকালে ওঠে ক্যাশমেমোর তলায় দেওয়া ফোন নম্বরটায় ফোন করল সৈকত। ফোনটা রিসিভ করল পাতলা গলার এক কিশোর। নরম গলায় বলল, 'কী দরকার বলুন, আমি মলয়বাবুর ছেলে।'

ওদের দোকান থেকে মলয়বাবুর আনডেলিভারড জিনিস ফেরত দেওয়ার আছে জানিয়ে ছেলেটার কাছ থেকে ঠিকানার ডিটেলসটা নিল সৈকত। পলিথিন প্যাকে কোটটা ঢুকিয়ে সাড়ে আটটার ট্রেনে চেপে সোজা রওনা দিল ওই ঠিকানার উদ্দেশে। বিধাননগর স্টেশনে নেমে অটোতে করে দমদম পার্কে নেমে, বাড়ি খুঁজে পেতে অসুবিধে হল না। কিন্তু বাড়িটার সামনে পৌঁছে দেখল, কাঁধে ব্যাগ নেওয়া এক ভদ্রমহিলা বাইরে কোথাও বেরনোর আগে মেন গেটে তালা দিচ্ছেন। পাশে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে স্কুল ইউনিফর্ম পরা এক বছর তেরো-চোদ্দোর ছেলে।

বাইরের গেটের ছিটকিনি খুলে ওদের দিকে এগিয়ে যায় সৈকত। ছেলেটাকে বলে, 'এই যে, আমিই তোমায় ফোন করেছিলাম। তোমার বাবার একটা কোট একবছরের ওপর আমাদের দোকানে পড়ে ছিল। সেটা ফেরত দিতে এলাম।'

ছেলেটা হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নিয়ে বলল, 'থ্যাঙ্কস।'

ভদ্রমহিলা ওর দিকে ম্লান হেসে বললেন, 'আপনাদের চার্জটা কত হয়েছে?'

সৈকত হাসিটা ফিরিয়ে দিয়ে বলল, 'না-না, ওটা মলয়বাবু পুরোটাই মিটিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু জিনিসটা আর নিতে আসেননি। উনি বোধ হয় ভুলে গিয়েছিলেন। নাকি অন্য কোথাও আবার বদলি হয়ে গিয়েছেন?'

ভদ্রমহিলার মুখ ফ্যাকাশে দেখাল। খুব নিচু স্বরে ঢোক গিলে বললেন, 'না মানে, উনি আসলে এক্সপায়ার করেছেন। উত্তরবঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তখন, ওখানে একটা দুর্ঘটনায়...'

'ঠিক আছে। বুঝতে পেরেছি, আর বলতে হবে না। অ্যায়াম সরি।' শূন্যে হাত নেড়ে ভদ্রমহিলার কথা থামিয়ে দেয় সৈকত। কাঁচুমাচু মুখ করে মা আর ছেলের দিকে তাকায়। ছেলেটা কোটের প্যাকেটটা বুকে চেপে ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ওর ঘাড়ে আলতো করে একটা টোকা মেরে বলে, 'ভালো থেকো, আসছি।'

ছেলেটা আবার বলল, 'থ্যাঙ্কস।'

চকিতে পিছন ফিরে, হনহনিয়ে বাইরের গেটের দিকে হাঁটা লাগায় সৈকত।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%