তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়
'বলো ভাই সুমন্ত, কেমন আছ? বহুদিন পরে ফোন, ভুলেই গিয়েছ...?'
ফোনের ওপারের গলাটা কানে বাজতেই শিউরে উঠলাম আমি। কার গলা, এ কার গলা শুনছি!
'কে, কে-কেক-কে বলছ?' চূড়ান্ত অবিশ্বাসে গলা কেঁপে উঠল আমার, স্বর আটকে এল কণ্ঠার কাছে।
'ভুল করে কল করে ফেলেছ মনে হচ্ছে? যাক, ভুল করে, তা-ই সই, ফোনটা তো করলে! কী খবর বলো, সব ঠিকঠাক আছে তো? আমাদের ছেলেপিলে সব ঠিক আছে তো, জয়, ইন্দ্র, বিশু, অতনু, শুভ? কেউ তো আর খোঁজ নেয় না, তুমি তাও নিলে।'
পূর্ণিমার রাত, অসহ্য গুমোট গরম। আমাদের এলাকার মোবাইল নেটওয়ার্ক কয়েকদিন ধরে খুব ডিস্টার্ব করছে, তাই টাওয়ার পেতে ছাদে এসেছিলাম কিছু জরুরি ফোন করতে। দু-চারটে ফোন করার পর এই নাম্বারটার ওপর আঙুল ছোঁয়াতেই এই কাণ্ড! খুলির মধ্যে ঝিলিক দিয়ে উঠেছে, চুলসুরকির চিলেকোঠার গায়ে ঠেকে গিয়েছে পিঠ। দেওয়াল ঘষটে নামতে-নামতে বসে পড়েছি ছাদে।
গায়ের জোরে মাথা নাড়িয়ে ঘিলুর মধ্যে একটা ঝাঁকি তৈরি করার চেষ্টা করি। না না, ভুল হতে পারে না! এই গলা অন্য কারও হতে পারে না। সেই এক উচ্চারণ, অবিকল সেই আধো-আধো, শব্দের শেষে টেনে-টেনে বলার সেই টিপিক্যাল ভঙ্গি। 'বলো ভাই' বলে ওই সুরে শুরু করা কারও পক্ষেই নকল করা সম্ভব না। ওপার থেকে গলাটা বেজে উঠল আবার, 'কী হল, কথা বলছ না কেন? বলো, কেন ফোন করেছিলে? কী হল, বলো?'
'না, মানে আমি, মানে তুমি কী করে, এ কী করে সম্ভব? আমার মাথা কাজ করছে না, কেউ কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছে? আশপাশের সবাই তো নাটকের ছেলে, কী জানি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।'
'কেন ঠাট্টা করতে যাব কেন, এতে না বোঝা কী আছে? তুমি তো আমাকেই ফোন করেছিলে নাকি? আর যদি বাই মিসটেক কল করে ফেলে থাকো, তা হলে ছেড়ে দাও, আমি কিছু মনে করব না, লাইন কেটে দাও, কথা বলার ইচ্ছে না থাকলে বলতে হবে না,' অভিমানে গুমরে ওঠে গলাটা।
'না, না, আসলে কী হচ্ছে কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না! তুমি কি দেবা বলছ, কিন্তু কী করে?'
'কেন, আমি বলছি, সে নিয়ে কোনও সন্দেহ আছে?'
'না কিন্তু ...' গলা শুকিয়ে আসে আমার, 'মিথ্যে কথা বলব না, ভুল একটা হয়েছে, একটু আগে ফোন করতে গিয়ে দেখি কনট্যাক্টে পরপর তিনটে দেবাশিস নামের এন্ট্রি রয়েছে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে সব ক'টারই পদবি বা অন্য কোনও ডিটেল ছাড়াই সেভ করা। সামনের মাসে নাট্যোৎসব, দেবাশিস বিশ্বাস বলে একটা নতুন ছেলে আমাদের নাটকটার একটা মেন রোলে অভিনয় করছে, কিছুদিন ধরে ও রিহার্সালে আসছে না তাই খোঁজ নিতে ওকে ফোন করতে গিয়ে ধন্দে পড়ে গিয়েছিলাম। আন্দাজে সব ক'টাকে ট্রাই করতে গিয়ে প্রথমটায় পেলাম আউট অফ সার্ভিস, দু'নম্বরটা বেজে-বেজে কেটে গেল আর তিন নম্বরটা রিং হতেই তোমার গলা...'
'বুঝতে পারছি, দেবাশিস নামটা আসলে এমনই কমন। তবে এই নাম্বারটা থেকে তোমায় মাত্র দু-তিনবারই ফোন করেছিলাম, সাল দু'হাজার ছয়-সাত মতো হবে, তখন সিডিএম-এ সিম লাগানো একটা কম দামি মোবাইল মাসখানেকের জন্য নিয়েছিলাম। স্কিমটা ওঠে যাওয়ার পর সেটসুদ্ধু ফেলে দিয়েছিলাম, ওসব জঞ্জাল মা যে কেন এখনও আলমারিতে তুলে রেখেছে কে জানে!'
'ওহ, তখনই সেভ করেছিলাম তা হলে!'
'আর লাস্টে জিরো ফাইভ দেওয়া আমার সেই রেগুলার নাম্বারটা, ওটা নিশ্চয়ই এত দিনে মুছে ফেলেছ?'
'হ্যাঁ মানে, না মানে, আর রেখেই বা কী করব! আর তো কোনওদিন যোগাযোগ করা যাবে না, আর কোনও কথা। চার বছর আগের সেই বিকেলটা এখনও চোখের ওপর ভাসে। সেই পাবলিক লাইব্রেরির মাঠ, জেলা বইমেলার মঞ্চ, গৌতমদার লেখা সেই একাঙ্ক নাটক। প্রম্পট করার দায়িত্বটা সমীরকে দিয়ে তুমি গিয়ে বসলে স্ক্রিনের ঠিক পাশে, তারপর হঠাৎ ঘামতে শুরু করলে, শ্বাসকষ্ট, বুক চেপে ধরে শুয়ে পড়লে মাটিতে, ছটফট করতে লাগলে, চোখ উলটে এল, হড়হড় করে বমি...'
'হ্যাঁ, ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক, একেবারে সময় দেয়নি, এই অ্যাটাকগুলো এক্কেবারে সময় দেয় না। অন দ্য স্পট শেষ, পনেরো থেকে পঁচিশ মিনিটের মধ্যে শেষ।'
'হ্যাঁ শেষ, মেলা কমিটির দেওয়া একটা গাড়িতে তুলে নিয়ে তোমায় হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার রাস্তাতেই সব শেষ। আমরা ভেবেছিলাম অ্যাসিডিটি বা ঊর্ধ্বমুখী গ্যাসের সমস্যা, কিন্তু ব্যাপারটা যে এতখানি কিছু একটা হয়ে উঠতে চলেছে, আমরা সেদিন ঘুণাক্ষরেও বুজতে পারিনি! কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল কিছু ধরতেই পারলাম না, আজও পারি না! গাড়িতে তোমার মাথাটা ছিল আমার উরুর ওপর, হিসেব মতো তোমার শেষ নিঃশ্বাসটা পড়েছিল আমার এই কোলের ওপরেই।
'আমরা ক'জন যারা তোমার খুব ক্লোজ ছিলাম, পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। সবাই তখন গড়ে বাইশ-তেইশ-চব্বিশ, তুমি আমাদের চেয়ে কিছুটা বড় হলেও ছাব্বিশের বেশি নও, কিছুতেই বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। পরদিন ভোরে শ্মশান থেকে ফিরে নিয়তির ওপর রাগে, অভিমানে মোবাইল থেকে তোমার নাম্বারটা ডিলিট করে দিয়েছিলাম, সোশ্যাল নেটওয়ার্কের অ্যাকাউন্ট-ফ্যাকাউন্ট সব ব্লকও করে দিয়েছিলাম। যে গিয়েছে সে পুরোপুরিই যাক, রাখতে চাই না, তার আর কোনও চিহ্ন রাখতে চাই না! অবশ্য রাখলেই বা কী হত, আর তো কোনওদিন কথা হবে না।'
'কিন্তু কথা তো হচ্ছে! এই যে আমরা কথা বলছি, বলছি না কি?'
'বলছি? হ্যাঁ, বলছিই তো, কিন্তু কী করে বলো তো? আমার তো কিছুতেই কিছু মাথায় ঢুকছে না!'
'মাথার ওপর এত ভরসা রাখো কেন? মাথার দৌড় আর কত দূর, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব কিছু কি ওইটুকু মাথা দিয়ে বুজতেই হবে?'
'না, কিন্তু আর কীভাবে বুঝব? মানুষ আর কীভাবে বোঝে?'
'বোঝার তো দরকার নেই, কথা বলছ, বলে যাও না, যেভাবেই হোক কানেকশনটা যখন লেগেই গিয়েছে, সেটাই চালিয়ে যাও না! তোমার কেমন লাগছে জানি না, আমার ভালো লাগছে, বহুকাল পর কী যে ভালো লাগছে!'
'আমারও ভালো লাগছে, ভালো লাগারই কথা, কিন্তু এসব প্রলাপ নয় তো? আমার কী হল বলো তো! আমি কী হুঁশে নেই? হুঁশে থাকলে এ কী করে সম্ভব, আট বছর আগের সেই বিকেলেই তো সব শেষ হয়ে গিয়েছিল, হয়নি কি?'
'কী জানি, শেষ, শুরু ওসব আমি আর কিছু বুঝি না, অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ! কী আর বলি বলো, বললেও তুমি বুঝবে না জানি, তাই বলে কী হবে!'
'বুঝব না বলতে? কী বুঝব না?'
'আসলে তোমাদের দোষ নেই। টাইম, তোমাদের এই সেন্স অফ টাইম— এটা এমনই একটা নাছোড়বান্দা কুসংস্কার! ওই খপ্পর থেকে তোমাদের রেহাই নেই, এ জন্মে আর মুক্তি নেই।'
'মানে! কী বলতে চাইছ?'
'কঠিন কিছু না, বলছিলাম গিয়ে এখন ক'টা বাজে, আজকের বার, তারিখ, সালটা ঠিক কত বলো তো?'
'কেন, এখন বাজে সন্ধে সাতটা পঁয়ত্রিশ মতো, বৃহস্পতিবার, সাতাশে সেপ্টেম্বর, দু'হাজার আঠারো!'
'কে বলল? কী সব ভুলভাল বলছ! ঘড়ি দেখে ঠিকঠাক করে বলো!'
'এ আবার ভুলের কী আছে, হাতে ঘড়ি নেই, কলটা করার আগে এই মোবাইলেই দেখেছি এগজ্যাক্টলি সাতটা কুড়ি, থার্সডে, মান্থ নাইনথ, টু থাউজ্যান্ড এইন্টিন।'
'মাথাখারাপ হয়ে গেছে, না কি তোমার মোবাইলটা বিগড়েছে? লাইনটা কেটে ভালো করে দেখে আবার আমায় ফোন লাগিয়ে কনফার্ম করো।'
'মানে! কীসব গাঁজাখুরি বকছ!' গলা খাঁকরে ওঠি।
পরক্ষণে লাইনটা কেটে মোবাইল স্ক্রিনে চোখ লাগাতেই ঠিকরে বেরিয়ে আসে চোখ, থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে সারাশরীর, ডান হাতের যে মুঠোর মধ্যে মোবাইলটা পাকড়ে ধরা সেটা আলগা হয়ে আসে একেবারে, শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায় বরফ জল। এ কী দেখছি, ডিজিট্যাল ঘড়ি এ কী দেখাচ্ছে! সময়টা একই, কিন্তু মাস, সাল তো অনেক পুরানো! চোখ কচলে তাকাই আবার, নাহ, যে কে সেই! এ কী ধরনের ভোজবাজি! এ তো আট বছর আগের আর-একটা দিন! হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, হাতের মধ্যে মোবাইলটা আচমকা বেজে উঠল। ঘোরের মধ্যে হকচকিয়ে কেঁপে উঠতেই সেটটা পড়ে গেল হাত থেকে। ছাদের মেঝের উপর সশব্দে পড়ে গোঁ গোঁ করছ, কিন্তু আমার হাত পা ঠাণ্ডা অবশ হয়ে গেছে। নিচু হয়ে হাত বাড়াচ্ছি বারবার, কিন্তু তুলে নেওয়ার সাহস করে উঠতে পারছি না কিছুতেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন