তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়
বিকেল থেকেই তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। থামতে বেশ রাত হয়ে গেল। যে গ্রামটা থেকে কিলোমিটার খানেক দূরের ফেরিঘাটের দিকে রওনা দিয়েছি সেটাকে গণ্ডগ্রামই বলা যায়। সাইকেলটা চেনা এক বাড়িতে রেখে জনবসতিটা ছেড়ে নদীর দিকের রাস্তায় কিছুটা এগোতেই দেখি চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। আশপাশ একেবারে শুনশান, একটি জনপ্রাণীও নজরে পড়ছে না। জলকাদা খানাখন্দে ভরা রাস্তা এগোতে গিয়ে নাকানি-চোবানি অবস্থা। কিন্তু কিছু করার নেই, নদী পেরিয়ে আমাকে ওপারে যেতেই হবে। যত রাতই হোক আমায় বাড়ি ফিরতেই হবে। আগামীকাল সকালের ট্রেন ধরে লাহিড়িদার দোকানের অর্ডারি মাল আনতে কলকাতায় যাওয়া আছে। কোনও ভাবেই মিস করা যাবে না। হাঁটু অবধি জলকাদা মেখে নাস্তানাবুদ হয়ে ফেরিঘাটে তো পৌঁছোনো গেল, কিন্তু ঘাটে নৌকা কোথায়? আধঘণ্টার ওপর ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেও নদীর বুকে একটা নৌকাও চোখে পড়ল না। কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর থমথমে রাত, এত ঝড়জল হয়ে যাওয়ার পরেও আকাশ মেঘলাই রয়েছে, কেমন একটা ভ্যাপসা গুমোট আবহাওয়া। কিন্তু আর কতক্ষণ অপেক্ষা করা যাবে? এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে রাত কাবার হয়ে গেলেও যদি নৌকা না পাওয়া যায় তাহলে কী হবে? সেরকম হলে না হয় গ্রামটায় ফিরে গিয়ে কারও বাড়িতে রাতটা কাটানোর জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজা যাবেখন কিন্তু কাল কলকাতায় যে না গেলেই নয়। শুধু লাহিড়িদার দোকানের জন্যেই না, নিজের ব্যাবসার স্বার্থেও যাওয়াটা খুব জরুরি।
পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে দেখি রাত সাড়ে দশটা বেজে গেছে। এখন কী করা উচিত ভেবে ঠিক করতে পারছি না। একভাবে কালো জলস্রোতের দিকে তাকিয়ে আছি পাড়ে দাঁড়িয়ে, হঠাৎ নদীর বুকে অনেকটা দূরে একটা আলো চোখে পড়ল। দৌড়ে এগিয়ে গেলাম বাঁশের পাটাতনের সামনের দিকে। মনে হল একটা নৌকাই যেন। হ্যাঁ হ্যাঁ, সেরকমই তো মনে হচ্ছে, ছই ছাড়া ন্যাড়া নৌকাই ঠাহর হচ্ছে এখান থেকে। ওপার থেকে আড়াআড়ি এদিকে এগিয়ে আসছে তা ঠিক না, বরং জলধারা বরাবর এগোচ্ছে স্রোতের অনুকূলে। যাত্রী পারাপার করার বড় নৌকা না, মাছ ধরার ছোট ডিঙি নৌকাই তো মনে হচ্ছে। তবু যদি সাহায্য করে। মরিয়া হয়ে হাওয়ায় হাত ছুঁড়ে চিৎকার করে উঠলাম, 'এই যে ভাই, এই দিকে এই দিকে...'
সাড়া এল না ওদিক থেকে। কিন্তু আমার ঠিক পিছন দিক থেকে কে যেন ঠিক আমার মতোই ওই নৌকার দিকে হাত তুলে চিৎকার করে উঠল, 'এদিকে এদিকে, দু'জনে আছি এদিকে।' চমকে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখি দোহারা চেহারার আমারই মতো উচ্চতার একটা মাঝবয়সি লোক, কোমরের গামছাটা খুলে মাথার ওপর নাড়াচ্ছে আর গলা ছেড়ে মাঝিটাকে ডাক দিচ্ছে। আমার দিকে চোখ টেরিয়ে তাকিয়ে বলল, 'আপনিও কি ওপারে যাবেন নাকি?'
'হ্যাঁ হ্যাঁ, ওপারে ওপারে। যাক আপনাকে দেখে স্বস্তি হল, আমি ভাবছিলাম আমি বুঝি একাই। কিন্তু ওই নৌকাটা কি এদিকে আসবে, কোনও সাড়াশব্দ তো দিচ্ছে না!'
লোকটা ঢাল বেয়ে নেমে গেল নদীর একেবারে কিনারে, গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল মাঝিটাকে। কাজ হয়েছে মনে হল, নৌকাটার গলুই সহসা আমাদের দিকে বাঁক নিল, ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলে এগিয়ে আসতে লাগল জলযানটি। হৃদপিণ্ড নেচে উঠল আমার। একেই বলে একা মানে বোকা, আরেকজন না এসে জুটলে নৌকাটাকে কিছুতেই এদিকে নিয়ে আসতে পারতাম না হয়তো।
লোকটা আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে হাত নেড়ে ডাকল। আমি হরষিত ভঙ্গিতে ওর দিকে পা বাড়ালাম দ্রুত। ভিজে কাদাময় ঢালটায় ভয়ানক পিছল। পা দিয়ে নামতে গিয়ে স্লিপ কেটে মারাত্মকভাবে পড়ছিলাম আর কী, মোক্ষম সময় লোকটা ছুটে এসে জাপ্টে ধরেছিল তাই বাঁচোয়া, না হলে মুখ থুবড়ে পড়ে এক্ষুনি কী যে কেলেঙ্কারি কাণ্ড হত! 'কী বলে ধন্যবাদ দেব জানি না দাদা।' লোকটার দিকে সকৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে হাসলাম একমুখ।
'কী যে বলেন, আমার জায়গায় আপনি থাকলে কী করতেন শুনি?' লোকটাও হাসল। আন্তরিক সুরে জিজ্ঞাসা করল, 'তা ভাইয়ের থাকা হয় কোথায়?'
'থাকি মুড়াগাছারও তিন কিলোমিটার ভেতরে একটা গ্রামে।'
'সে তো অনেক দূর। ওপারে নেমে পায়ে হেঁটে অদ্দুর যাবেন নাকি?'
'না না, হেঁটে যাব মুড়াগাছা বাজার অবধি। তারপর ওখান থেকে সাইকেল নিয়ে বাড়ি।'
'এদিকে কি আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি এসেছিলেন, নাকি কাজে?'
'হ্যাঁ, কাজ ছাড়া আর কী? সপ্তাহে এক-দেড়দিন করে আসি। অন্যদিন বিকেল গড়াতে ফিরে যাই কিন্তু আজকের দুর্যোগটার জন্য এত রাত হয়ে গেল।'
'দুর্যোগ বলে দুর্যোগ। এরকম ঝড়-বৃষ্টি বহুত বছর পর দেখলাম।'
বলতে বলতে নৌকাটা অনেকটা কাছে চলে এসেছে, লোকটা মাঝিটার উদ্দেশে গলা ছেড়ে বলল, 'ঘাটটা পার করিয়ে দাও গো কত্তা, আমরা দু'জনা দু'দশ টাকা না হয় বেশি ধরে দেব।'
কোনও জবাব দিল না মাঝিটা, এগিয়ে আসতে লাগল আরও কাছে। ছোট ডিঙিগুলো সাধারণত বাঁশের পাটাতন বা মাচানের গায়ে না ভিড়ে জলের কিনারেই ভেড়ে। লোকটা হাত ধরে কাদা পেরিয়ে আমায় নিয়ে এল যেখানে নৌকাটা আসার কথা। এসে থামতে আমাকে উঠতেও সাহায্য করল নিজে আগে ওঠে। মাঝির উলটোদিকের গলুইয়ের ওপরে ওঠে বসল নিজে, আমাকে বসতে বলল মাঝখানে।
দাঁড়ে চাপ দিয়ে মাঝি নৌকা ছাড়লে লোকটা আমায় জিগ্যেস করল আমি কী কাজ করি। শুরুতে কিছুটা ইতস্তত করলেও কিছুটা ঘুরিয়ে হলেও আমার কথা জানালাম। ওষুধের ব্যাবসা করি বা কম্পাউন্ডারি সে ওকে যাই বলি আমি আসলে এইসব গণ্ডগ্রামের কোয়াক ডাক্তার। এমনিতে মুড়াগাছা বাসস্ট্যান্ডের কাছে কার্তিক লাহিড়ির খুচরো ওষুধের দোকানের মাস মাইনে করা কর্মচারী হলেও ছুটিছাটা ফাঁকফোকর পেলেই আমি এইভাবে এই পারের গ্রামগুলোর ভিতরে যাই। ব্যাগ ভরতি করে ওষুধ-পত্তর, ইঞ্জেকশন, তুলো, গজ, ব্যান্ডেজ ইত্যাদি নিয়ে কোথাও একটা বসে জ্বরজ্বালা, গ্যাস, অম্বল, পেটখারাপ, ছোটখাটো কাটা-ছেঁড়ার চিকিৎসা করি। ওইসব গাঁয়ে আস্তে আস্তে আমার বেশ পশার হয়ে উঠছে। লাহিড়িদার ওষুধের দোকানে ওষুধ ঘাঁটতে ঘাঁটতে চোস্ত হয়েছি অনেক, প্যাঁচাল জটিল কেসেও কোথায় কী ওষুধ দিতে হয় জেনেছি। সেই ভাঙিয়েই চালাচ্ছি, পেটের দায় বড় দায়। তাছাড়া তিন-চারটে চেম্বারের ডাক্তারের সঙ্গে চেনা আছে, ওঁদের কাছ থেকে হাফেরও কম দামে স্পেসিমেন কপি ওষুধ কিনে এসব জায়গায় বেচে ভালোই কামাই।
সবটা খুলে না বললেও লোকটা ঘাড় নাড়ল, বিজ্ঞের মতো বলল, 'বুঝতে পেরেছি, হাতুড়ে তো বুঝতে পেরেছি। তা ভুলভাল চিকিচ্ছা করে লোক মারেন না তো?'
'না না, তবে একবার রোগ চিনতে না পেরে ভুল ওষুধ দিয়ে ফেলেছিলাম, সেই লোকটার কেসটা গুবলেট হয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে আর অদ্দূর যাই না। তেমন কেস বুঝলে সোজা রেফার করে দিই টাউনের ডাক্তারের ঠিকানায়।'
'তাহলে ঠিক আছে। তা ভাই এসব করে মাস গেলে কেমন কামাই হয়?'
'ওই চলে যায় আর কী। বিয়ে-থা এখনও করিনি, বাড়িতে মা-বাবা আর একটা ছোট বোন। তাই কোনওরকমে ডাল-ভাত খেয়ে চলে যায়। দেখি ভবিষ্যতে এসব দিকে কিছুটা উন্নতি করতে পারলে ওষুধের দোকানের ঠিকে কাজটা ছেড়ে দেব। এসব দিকে একটা দোকান দিয়ে বসব। রক্ত, স্টুল, থুথু, কফের স্যাম্পেল নিয়ে পরীক্ষা করিয়ে আনব টাউন থেকে।'
'সে ভালো কিন্তু এসব গাঁয়েগঞ্জে ওসব করে কি সুবিধে করতে পারবেন? এসব জায়গার লোকের পকেটে পয়সা কোথায়?' লোকটা সামনের দিকে এগিয়ে এসে ঝুঁকে বসল। 'তার চেয়ে আমাদের ব্যবসায় চলে আসুন, বছর ফিরতে না ফিরতে দেখবেন কোথা থেকে কোথায় চলে গিয়েছেন।'
'আপনাদের ব্যাবসা বলতে, আপনাদের কীসের ব্যাবসা?'
ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা হাসি জেগে ওঠল লোকটার। নৌকার হ্যারিকেনের পাঁশুটে হলদে আলোয় জ্বলজ্বল করে ওঠল চোখ দুটো। 'বলতেই পারি, শুনে যদি ঘাবড়ে না যান। তবে আমাদের ব্যাবসার কিন্তু অল ইন্ডিয়া মার্কেট, যারা এ লাইনে এসেছে সব মালামাল হয়ে গেছে। একটু ধৈর্য ধরে কাজ করতে পারলে আপনাকে আর দেখে কে?'
'ঘাবড়ানোর কী আছে, কীসের ব্যাবসা? ব্যাবসাটা কীসের?' উৎসুক সুরে বলে ওঠলাম আমি, লোভাতুর হয়ে ওঠল আমার চোখ।
'আমিও এক সময়ে পেটের ভাত জোগাতে আপনার মতো সারাদিন গাধার মতো খেটে মরতাম। তারপর একদিন পরিচয় হল রুকুমপুরের চরণ ঘোষের সঙ্গে, ওই আমায় নিয়ে এসেছিল এই ব্যবসায়। সেই থেকে আর পিছন ফিরে চাইনি...।'
'তাই নাকি?' নড়েচড়ে বসলাম আমি, এগিয়ে গেলাম খানিকটা, 'ব্যাবসাটা কী বলুন না, সেই ছোটবেলা থেকে পথেঘাটে ঘুরছি দাদা, আমি ঘাবড়াই না, কিছুতেই আমার কিছু যায়-আসে না।'
বড় বড় চোখ করে তাকাল লোকটা, মণি দুটো ঠিকরে বেরিয়ে এল যেন সামনে। 'তাহলে তো বলাই যায়, আসলে আমাদের ব্যাবসাটা কঙ্কালের।'
'মানে...!' আঁতকে ওঠলাম আমি।
'মানে আর কী, আমরা কঙ্কালের বিজনেস করি।' মুখ মুচড়ে হাসল লোকটা, 'অন্ধকার হলে বেরিয়ে পড়ি, বন-জঙ্গল আদাড়-বাড়াড় এই সব নদীর পাড়ে বেওয়ারিশ লাশ খুঁজে বেড়াই। পেলে তুলে নিয়ে যাই আমাদের ফ্যাক্টরিতে। সেখানে বড় বড় সব চৌবাচ্চায় কস্টিক সোডা ফুটছে। লাশগুলোকে ওর মধ্যে ফেললে মাংসগুলো সব খুলে বেরিয়ে আসে হাড় থেকে। পড়ে থাকে শুধু কঙ্কালটা, তখন আমরা সেটাকে সাঁড়াশি দিয়ে তুলে আনি। তারপর সেটাকে ধুয়ে-মুছে পালিশ করে সাপ্লাই করা হয় কলকাতার মার্কেটে।'
'বলেন কী, এরকম ব্যাবসাও আছে নাকি?'
'না থাকার কী আছে, এমন লাভজনক বিজনেস খুব কম আছে। ইস্কুল, কলেজ, ল্যাবরেটরি, মেডিকেল কলেজে হেবি ডিমান্ড। আজকাল প্লাস্টিকের কঙ্কালও খুব উঠেছে, কিন্তু আসল মানুষের কঙ্কাল আর নকলের কি আর কোনও তুলনা হয়, বলেন ভাই।' চোখ নাচিয়ে তোলে লোকটা, 'তাই বলছি ওসব হাতুড়ের কারবার বাদ দিয়ে আমাদের ব্যবসায় চলে আসেন। এত পয়সা করতে পারবেন, তিন পুরুষ বসে খাবে।'
হাঁ হয়ে গিয়ে তাকিয়ে আছি লোকটার দিকে, লোকটা বলল, 'কপালের দয়ায় আমাদের এই সোনার বাংলায় বেওয়ারিশ লাশের অভাব হয় না। আর ভোটের আগে তো পার্টি-ফার্টিগুলোর দৌলতে কুপিয়ে ফেলে বা পুঁতে রেখে যাওয়া লাশের অভাব ছিল না কোনওদিনই। রাতটা ঠিক মতো খুঁজতে পারলে আপনার মালের কোনও অভাব হবে না বুক ঠুকে বলতে পারি। কী বুঝছেন, আসবেন নাকি আমাদের লাইনে?'
আমার মুখে কথা নেই, লোকটা তেরছা চোখে তাকায়, 'তবে নেহাত যদি অভাব হয় চিন্তা করবেন না। সব গাঁয়েগঞ্জে ছোট টাউন বড় টাউনে পাগলা খ্যাপা ভবঘুরে লোকজনের তো আর অভাব নেই। মরা বা জ্যান্ত তুলে এনে আমাদের ওইসব চৌবাচ্চায় ফেলতে পারলেই তো কাজ হাসিল। কে আর দেখতে যাচ্ছে কোথাকার আমদানি, কঙ্কালের গায়ে তো আর লোকের ঠিকানা লেখা থাকে না, কী বলেন?'
গলা শুকিয়ে আসে আমার, ঢোঁক গিলে তাকাই চোখ পিটপিটিয়ে। লোকটা মাথা বাড়িয়ে দেয় সামনে, ফিসফিস করে ওঠে, 'আর যদি তাও না পান, আপনার মতো একা অসহায় নাচার মানুষ পেলেও চলবে। এইরকম কোনও ঝড়-জল বা কোনও দুর্যোগে আটকে পড়া মানুষের তো পথে-ঘাটে বাজে একটা দুর্ঘটনা হয়েই যেতে পারে, সে তো আর বাড়ি ফিরতে নাই পারে, কী বলেন?
'মানে, কী বলতে চাইছেন?' নৌকার পাটাতনের ওপর সটান দাঁড়িয়ে ওঠি আমি।
'ও কী দাঁড়িয়ে পড়লেন কেন? আমি তো আপনাকে ছুঁইওনি, তাতেই এত ঘাবড়ে গেলেন তো এরপর কী করবেন। হ্যাঁ, তবে মিথ্যে কথা বলব না, সত্যি আমাদের একটা লাশ খুব দরকার। আপনার মতো খোলতাই চেহারার একটা পুরুষ মানুষের কঙ্কাল। কী বল হারান?'
শুনে খিকখিক করে হেসে উঠল আমার পিছনের গলুই-এ বসে থাকা মাঝিটা। হৃৎপিণ্ডটা ধড়াস করে উঠল আমার, চেঁচিয়ে উঠলাম, 'মানে, তার মানে আপনারা একে অপরকে চেনেন? তার মানে আপনারা সাঁট করে আমাকে এই নৌকায় তুললেন?'
'হ্যাঁ, সেরকমই বলতে পারেন। আমরা দু'জন আজ রাতে এই রকমই কিছু একটা খুঁজতে বেরিয়েছিলাম, পেয়েও গেলাম।'
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল আমার, সারা শরীর থরথরিয়ে কাঁপতে শুরু করল, মাথা কাজ করছে না। লোকটা শান্ত গলায় বলল, 'চিন্তা করবেন না, আপনাকে আমরা জ্যান্ত অবস্থায় কস্টিক সোডার চৌবাচ্চায় ফেলব না, একটুও কষ্ট না দিয়ে মেরে তবেই ফেলব। আরে ভাই একটু তলিয়ে ভেবেই দেখুন না, আমরা সবাই কিন্তু আসলে কঙ্কাল। এই জীবন আর কদ্দিনের তারপর সবাই আমরা এক একটা আস্ত কঙ্কাল। মরার পর যখন সবাইকেই কঙ্কাল হতেই হবে তখন দু'দিন আগে বা পরে তাতে কী এসে যায়।'
গলুই-এ বাঁধা দড়িটার গিঁটটা খুলে হাতে নিল লোকটা, ওঠে দাঁড়াল হাসিমুখে। শ্বাস আটকে এল আমার, নদীতে যে ঝাঁপ মারব কিন্তু আমি যে সাঁতার জানি না। নৌকাটা ওপারে ঘাটের দিকে না এগিয়ে অন্যদিকে বাঁক নিয়েছে। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, 'কী হচ্ছেটা কী, এসব কী হচ্ছে?'
'কী আবার হচ্ছে, বললাম তো কী হতে চলেছে। কিছু করার নেই দাদা, ব্যাবসা বাঁচানোর খাতিরে সবাইকে কী না করতে হয়, নিজে ব্যাবসা করেন যখন ভালোই তো বোঝেন।'
'তাই বলে মানুষ মারবেন? মানুষ হয়ে নির্দোষ মানুষ মারবেন, আপনারা কি মানুষ?'
'কে বলল আমরা মানুষ?' খয়াটে চাঁদের আলোয় লোকটার চেহারাটা নিমেষে কেমন যেন বদলাতে শুরু করল, বীভৎস হয়ে উঠল মুখটা। 'হ্যাঁ, তবে একসময় মানুষ ছিলাম। তারপর আমাদের ঠিক এইভাবেই মেরে নদীর পাড়ে ওইসব কস্টিক সোডার ধোঁয়া ওঠা চৌবাচ্চায় ফেলা হয়েছিল। সেই থেকে আমরা তো আর মানুষ না, আমরা কঙ্কাল, আমরা দুজনেই কঙ্কাল।'
মুহূর্তের মধ্যে আমার চোখের সামনে দাঁড়ানো মানুষটা আপাদমস্তক পুরো পালটে গেল। খয়াটে চাঁদের ক্ষীণ আলোয় দেখলাম আমার সামনে-পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে দু'দুটো কঙ্কাল। কালো অন্ধকারের বিপরীতে ধপধপে সাদা হাড়ের দুটো পূর্ণ দৈর্ঘ্যের কঙ্কাল। রক্ত ঠান্ডা হয়ে আসা ভয়াল স্বরে দড়ি হাতে দাঁড়ানো সামনের কঙ্কালটা বলে উঠল, 'সেই থেকে আমরা এইভাবেই আমাদের দলভারী করে চলেছি। আসুন না, আমাদের দলে চলে আসুন। জীবনের মায়া রেখে কী হবে ভাই, আরে বাবা সবাইকেই যখন একদিন না একদিন আমাদের দলে ভিড়তেই হবে তখন কীসের ভয়, এত ভয় কেন বুঝতে পারছি না!'
আমার আর কিচ্ছু করার থাকল না। আপৎকালে মানুষের সাহস হাজার গুণ বেড়ে যায় শুনেছি, আজ আমারও তাই হল। নদীটা কতটা গভীর জানি না, যা হয় হোক আমি এভাবে মরতে পারব না। ইষ্টদেবতার নাম নিয়ে ঝাঁপ মারলাম জলে।
তারপর যখন জ্ঞান ফেরার পর চোখ খুললাম দেখি এপারের কাদায় মাখামাখি হয়ে পড়ে আছি। আমার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়া অনেক লোকজনের মুখ। মনে হল মাঝি-মাল্লারাই সব। ভোরের আলো ফুটেছে বেশ কিছুক্ষণ হল। জড়ানো গলায় বলে উঠলাম, 'আমি বেঁচে আছি তাহলে...।' তাতে হৃষ্টপুষ্ট একজন আমার চোখে-মুখে জলের ছিটে দিতে দিতে তুলে বসিয়ে বলল, 'ভাগ্যিস চরার ধারে রাখা আমাদের পাতা জালে আটকে গিয়েছিলেন...!' হাত জোড় করে ডুকরে উঠলাম, 'কী বলে যে আপনাদের ধন্যবাদ দেব জানি না দাদা...।' লোকটা বলল, 'কিন্তু জলে ডুবলেনটা কী করে?' ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললাম, 'কী জানি দাদা, মনে পড়ছে না।' সত্যি কথাটা বলে লাভ নেই কারণ ওদের কাউকে বললেই আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না, তাই ওদের আবারও ধন্যবাদ জানিয়ে ওঠে দাঁড়ালাম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন