তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ যেটুকু মনে আছে তাতে শান্তিনিকেতনে যাওয়ার পথে নির্জন রাস্তাটার ধারে ওদের গাড়িটা আমার গাড়িটাকে বিচ্ছিরিভাবে ডানদিকে চেপে দিয়ে দাঁড় করিয়েছিল।
'কী হল এটা, এটা কী হল!' বলে রেগেমেগে গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে আসতেই ওরা পাঁচ-ছ'জন মিলে আমায় চারদিক থেকে ঘিরে ধরল। সবার মুখগুলো কালো কাপড় দিয়ে মোড়া। ওদের একজন পিছন থেকে একটা তোয়ালে আমার নাকে-মুখে চেপে ধরতেই আমি তার কাঁধে এলিয়ে পড়লাম। চোখের নিমেষে ওই সাদা রংয়ের গাড়িটার স্লাইডিং দরজা খুলে ওরা আমায় ভিতরে ঢোকাল। তারপর আর কিছু মনে নেই।
জ্ঞান ফিরে পেয়ে যখন চোখ খুললাম দেখলাম আমার হাত-পা বাঁধা। মুখের ওপর এসে পড়েছে একটা জোরালো আলো। অপারেশন থিয়েটারের মতো চারদিকে প্রচুর যন্ত্রপাতি সাজানো একটা চেম্বার। বেডের ওপর শুয়ে আছি, মাথার কাছে একটা মনিটর, পায়ের দিকে একটা ভিডিয়ো ক্যামেরা। ঘরে বেশ কয়েকজন লোক রয়েছে, কিন্তু মুখের ওপর আলোটা ফিক্সড হয়ে থাকায় আমি ওদের দেখতে পাচ্ছি না, মনে হচ্ছে বেশ কিছু ছায়ামূর্তি। মুখে সার্জিকাল মাস্ক, আর গায়ে অ্যাপ্রন পরা একজন এগিয়ে এসে দাঁড়াল পাশে। খুব নম্র উচ্চারণে বলল, 'হ্যালো মিস্টার, তীর্থঙ্কর বোস।'
'কী হচ্ছেটা কী এসব, আপনারা কারা? কী করতে চাইছেন, আমি কোথায়, এখানে কেন এনেছেন? এভাবে বেঁধে রেখেছেন কেন, কী করতে চান আমার সঙ্গে?'
'টেক ইট ইজি মিস্টার বোস,' লোকটা আমার ডান হাতের বাঁধন খুলতে খুলতে হিন্দি-ইংরেজি মিশিয়ে বলে চলল, ''আপনার বাঁধন খোলার জন্যই তো আমি এলাম। দু'হাতই খুলে দেব, কিন্তু অনুগ্রহ করে খুলে দেওয়ার পর ঝটাপটি করতে যাবেন না। আমাদের সঙ্গে একটু সহযোগিতা করবেন। আমরা যা করতে চাইব দয়া করে বাধা দেবেন না, তা হলে কিন্তু ভীষণ বিপদে পড়ে যাবেন।'
লোকটা চাকা লাগানো একটা টেবিল কাছে টেনে আনল, তার ওপর ট্রেতে সাজানো বেশ কিছু ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ, অ্যাম্পুল। ঝটকা দিয়ে উঠে বসলাম বেডটার ওপরে।
'নিশ্চিন্ত থাকুন, অপারেশন-কাটা-ছেঁড়া কিচ্ছু করা হবে না। জাস্ট একটা ইঞ্জেকশন পুশ করা হবে, দ্যাটস অল।'
'মানে, এসব কী হচ্ছেটা কী? রাস্তা থেকে কিডন্যাপ করে তুলে এনে বেঁধে ফেলে রাখলেন, এখন বলছেন ইঞ্জেকশন! কেন, কী করতে চাইছেন?' আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে উঠলাম।
'ডোন্ট প্যানিক, আমি একজন ট্রেইনড ডক্টর, অতএব এমন কিছু করব না যাতে আপনার প্রাণ সংশয় হয়। খুব সাবধানে, চিকিৎসাবিদ্যার সব নিয়মকানুন মেনে আপনার শরীরে ট্রুথ সেরাম প্রয়োগ করা হবে।'
'ট্রুথ সেরাম মানে?' আঁতকে উঠলাম। বাঁ-পাশ থেকে আরও 'একটা মাস্ক পরা লোক এগিয়ে এসে বলল, 'যা করা হবে আপনাকে জানিয়েই করা হবে। আমরা আপনার নারকো-অ্যানালিসিস টেস্ট করতে চলেছি। চিন্তা করবেন না, আমরা এ ব্যাপারে এক্সপার্ট। আপনার শরীরে আমরা পর্যায়ক্রমে কিছু ইন্ট্রাভেনাস হিপ্নোটিক ওষুধ ইনজেক্ট করব, তাতে কিছু সময়ের জন্য আপনি একধরনের প্রায় অচেতন অবস্থার মধ্যে চলে যাবেন এবং আপনার মস্তিষ্ক এমন একটা নিরপেক্ষ পরিস্থিতিতে চলে যাবে যে, তার কল্পনাশক্তি লোপ পাবে। ফলত আপনি বানিয়ে কিছু বলতে পারবেন না, অর্থাৎ যা বলবেন সত্যি কথাই বলবেন...'
'কিন্তু এ তো ভয়ানক অন্যায়, চরম বেআইনি কাজ। এ তো শুনেছি ক্রিমিনালদের ওপর প্রয়োগ করা হয়, আপনারা আমার সঙ্গে এতবড় অন্যায় করতে পারেন না...'' অসহায় আর্তনাদ করে ওঠি।
'কী আর করা যাবে, আমাদের যে সত্যিটা জানতেই হবে। ন্যায়সঙ্গত পথে এগোলে তো আপনাকে দিয়ে সত্যিটা বলাতে পারব না। আইনি রাস্তায় তো আপনি আমাদের সত্যিটা বলতে বাধ্য নন।' ডান পাশের লোকটা ট্রে থেকে কাচের অ্যাম্পুলটা তুলে নিয়ে তার মাথাটা ভেঙে ফেলল, তাতে সিরিঞ্জটা ডুবিয়ে কেমিক্যালটা টেনে নিয়ে হাসল।
'না, না, কিছুতেই না। আমি কিছুতেই আপনাদের ইনজেক্ট করতে দেব না।' পা-দুটো বাঁধা তাই দু'হাত বেপরোয়াভাবে ছুড়ে আমি প্রাণপণ আত্মরক্ষার চেষ্টা শুরু করলাম।
'সরি মিস্টার বোস, উই কান্ট হেল্প ইউ। আমাদের যা করতে বলা হয়েছে আমরা তাই করব, আমরা প্রফেশন্যাল লোক।' সাদা অ্যাপ্রনের পকেট থেকে একটা রিভলভার বের করে আমার মাথায় ঠেকিয়ে বাঁ-পাশের লোকটা বলে উঠল, 'যেন তেন প্রকাবেন, আমাদের আপনার কাছ থেকে সত্যিটা বের করতেই হবে।'
পায়ের কাছে ফিট করা ভিডিয়ো ক্যামেরাটা চালাল কারা যেন, তার পিছন থেকে জ্বলে উঠল দুটো স্পট লাইট। আমি চোয়াল শক্ত করে চোখ সরিয়ে নিলাম, দাঁতে দাঁত চেপে নিশ্চল পড়ে রইলাম।
'দ্যাটস লাইক আ গুড বয়!' ডান পাশের লোকটা আমার হাতে স্পিরিট ভেজানো তুলো ঘষতে ঘষতে বলল আর প্রশিক্ষিত দক্ষতায় আমার শরীরে ইঞ্জেকশনের ছুঁচটা ঢুকিয়ে দিল। আস্তে-আস্তে চোখের পাতা বুজে আসতে শুরু করল, একটু-একটু করে ঢুকতে শুরু করলাম আশ্চর্য একটা ঘোরের মধ্যে। তারপর কী-কী হল আমার আর কিছু মনে নেই।
সেই রাতেই আমার চোখ-মুখ বেঁধে একটা বড়সড় গাড়ির পিছনে ফেলে পাচার করে দেওয়া হল। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বোঝার উপায় নেই, কিন্তু নারকো টেস্ট করার ওই জায়গা থেকে এই জায়গাটা কমপক্ষে দশ বারো ঘণ্টার দূরত্বে কোথাও। এনে ফেলে রেখেছিল একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে। ঘরটায় এসি চলছিল, যে বিছানার ওপর পড়েছিলাম সেটা খুবই আরামদায়ক, রুম ফ্রেশনারের গন্ধটা বেশ সুন্দর। দিন কি রাত বুঝতে পারছিলাম না। দরজা খুলে ভিতরে এসে ঢুকল দু'জন, আলো জ্বেলে আমার সামনে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানাল। 'স্যার' সম্বোধন করে নম্রস্বরে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে নিতে বলল। তোয়ালে সাবান নতুন কুর্তা পাজামা তুলে দিল আমার হাতে। পাশেই বাথরুম। শাওয়ার খুলে স্নান সেরে বেরিয়ে এলে ওরা আমায় খেতে দিল। বেশ উচ্চমানের সুখাদ্য বটে, খিদের পেটে অখাদ্য দিলেও অবশ্য পরম উপাদেয়ই মনে হত। হাজার হোক আমি তো আর যে-সে লোক নই। ইন্ডিয়ান মিউজিক জগতের নতুনতম সেনসেশন। বছর দেড়েকের মধ্যেই আমার সাফল্য-খ্যাতি-অর্থ- প্রতিপত্তি আকাশছোঁয়া। আমার মিউজিক শোরগোল ফেলে দিয়েছে সারা দেশে। ফিল্ম মিউজিক করি না, শুধু নন ফিল্ম মিউজিকের তিনটে অ্যালবাম রিলিজ করেছে। তার মধ্যেই বলা শুরু হয়ে গিয়েছে এই তিনটে অ্যালবাম নাকি সারা পৃথিবীর মিউজিকের দুনিয়ায় রেভলিউশন নিয়ে আসতে চলেছে। সঙ্গীতবোদ্ধা আর গবেষকরা তো বলা শুরু করে দিয়েছে আমি নাকি বিস্ময়কর প্রতিভা, প্রডিজি, ওয়ান্ডার ম্যান অফ মিউজিক। বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ওড়ে এসে হাফডজন জার্নালিস্ট টিম ইতিমধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করে গিয়েছে, ইন্টারভিউ নিয়েছে, প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছে আমার এই ধরনের আশ্চর্য মিউজিক তৈরির পিছনের গল্প, কিন্তু কায়দা করে ওদের বেশিরভাগ প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েছি। ভারতবর্ষ ওদের কাছে রহস্যের দেশ, তাই রহস্য জিইয়ে রাখাই ভালো। ইতিমধ্যে ওরা আমায় বেশ কয়েকটা আন্তর্জাতিক পুরস্কারে সম্মানিত করে ফেলেছে, শুনছি নাকি সামনের বারের গ্র্যামির জন্য কারা যেন আমার নাম প্রস্তাব করেছে।
যাই হোক, এই দু'জন ওয়েটার জাতীয় লোক যথোপযুক্ত সম্মানের সঙ্গে আমাকে পাশের একটা ঘরে নিয়ে এল। ঘর বলতে একটা দুর্দান্ত কনফারেন্স রুম। কাজেই একটা সুদৃশ্য রিভলভিং চেয়ার পাতা, ঠিক তার মাথার ওপর সিলিং থেকে একটা আলো এসে পড়েছে সেটার ওপর। পাশে দাঁড়ানো ওয়েটারটা বলল 'টেক ইওর সিট স্যার।'
দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে বসলাম ওই চেয়ারটায়। চারদিকে আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। অন্ধকারে চোখ সয়ে যেতেই বুঝতে পারলাম খানিকটা দূরে পাতা একটা ওভাল শেপ টেবিলের ওপারে তিনটে চেয়ারে তিনজন বসে আছে।
'গুড মর্নিং, মিস্টার তীর্থঙ্কর বোস...' ওদিক থেকে একটা কণ্ঠ বেজে উঠল সারা ঘরে অনুরণন তুলে।
'গুড মর্নিং....' সৌজন্যের সুরে বললাম আমি।
'ইচ্ছের বিরুদ্ধে আপনাকে এইভাবে জোর করে এখানে নিয়ে আসার জন্য আমরা দুঃখিত কিন্তু কী করি বলুন। গত দেড়বছর ধরে বেঙ্গলের বুকে বসে আপনি যে সব অসম্ভব কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছেন সেগুলো আদৌ কী করে সম্ভব আমরা বা আমাদের এক্সপার্টরা সারাদিনরাত ভেবেচিন্তেও কোনওরকম কূলকিনারা করতে পারছি না, তাই অগত্যা এইভাবে অপহরণ।'
'কেন, এখনও কূলকিনারা করতে পারছেন না কেন? কূলকিনারা করার জন্য আপনারা আমাকে এইরকম জঘন্যভাবে কিডন্যাপ করলেন, অত্যন্ত অন্যায় পদ্ধতিতে মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে নারকো অ্যানালিসিস টেস্ট করালেন। সেখানে তো নিশ্চয়ই আমি যা-যা বলার বলেছি, সেখানে তো বানিয়ে বলার উপায় নেই, অতএব যা বলেছি নিশ্চয়ই সত্যিই বলেছি।'
'হ্যাঁ, বলেছেন। নারকো অ্যানালিসিসের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মনে যদিও অনেক রকমের সংশয় আছে, কিন্তু আমরা যে পদ্ধতিটা কাজে লাগিয়েছিলাম সেটা একেবারে লেটেস্ট, মোস্ট সফিস্টিকেটেড ইকুইপমেন্টস আর ড্রাগস ব্যবহার করা হয়েছে। তাছাড়া আমাদের এক্সপার্ট টিমে খুবই দক্ষ সব লোক ছিলেন, ছিলেন খুবই হাইরেটেড একজন সাইকো অ্যানালিস্ট।'
'তা হলে কাজ নিশ্চয়ই খুব ভালো হয়েছে, ওরা নিশ্চয়ই আমায় নির্ভুলভাবে সত্যিগুলো বলিয়ে নিয়েছেন। তা হলে তো কোনও সমস্যা থাকার কথা নয়, আপনারা সব সত্য জেনেই গিয়েছেন।'
'হ্যাঁ, জেনেছি, আপনি আমাদের নারকো অ্যানালিস্টিক এক্সপার্টদের বারবার জিজ্ঞেস করে যাওয়া কিছু সেট অফ কোয়েশ্চেয়েনের উত্তরে যা যা বলে গিয়েছেন সবই আমরা অনেকবার করে শুনেছি। এক্সপার্ট রিপোর্টও আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে কিন্তু...'
'তা হলে আবার কিন্তু কীসের? কী-কী বলেছি তা তো আমার জানার কথা নয়, সে তো সব এখন আপনাদের জিম্মায়।'
'হ্যাঁ, সে তো বটেই, কিন্তু সেসব শোনার পর আমরা কনফিউজড, আমাদের এক্সপার্টরাও নট ফুললি কনভিন্সড।'
'কেন? কনফিউশন কীসের? কী এমন বলেছি?'
'যা-যা বলেছেন সেগুলো তো অবিশ্বাস্য, আই মিন ইনক্রেডিবল, বাস্তবে কিছুতেই হতে পারে না। অসম্ভব, গাঁজাখুরি গপ্পো। আপনার কথাবার্তা শুনে আমাদের এক্সপার্টরা বলছে দেয়ার মাস্ট বি সামথিং রং।'
মাঝখানে বসা ছায়ামূর্তিটা হাতের রিমোটটা টিপে ডানদিকের বিশাল একটা এল ই ডি মনিটর অন করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটা ভিডিয়ো ফাইল প্লে করতেই স্ক্রিনে ফুটে উঠল আমার সেই নারকো টেস্টের ভিডিয়ো। লম্বা সেই এক্সপার্ট একই প্রশ্ন বারবার করে যাচ্ছে আর আমি আধো তন্দ্রা আধো চেতনায় জড়িয়ে জড়িয়ে যাওয়া গলায় উত্তর দিয়ে যাচ্ছি।
পর্দায় নারকো এক্সপার্ট সেই লোকটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে চলেছে, 'আপনি যে ধরনের মিউজিক তৈরি করে চলেছেন এর নমুনা নজিরবিহীন। মিউজিক এক্সপার্টরা বলছে দুনিয়ায় যত ধরনের মিউজিক আছে, যতরকমের মিউজিক সম্ভব, আপনার তৈরি মিউজিকের সঙ্গে তার কোনও মিল নেই। ভিজুয়াল বা প্রিন্ট মিডিয়ার বিভিন্ন লোকজন আপনাকে যতবার আপনার মিউজিক তৈরির ব্যাকগ্রাউন্ড, প্রেরণা, পরম্পরা, কার্যপ্রণালি নিয়ে প্রশ্ন করেছেন আপনি সেগুলো এড়িয়ে গিয়েছেন। প্রচলিত যত ধারার মিউজিক আছে তাদের গ্রামার, স্কেল, মেলডি, রিদম সাউন্ড প্যাটার্নের সঙ্গে আপনার তৈরি সুরের বিন্দুমাত্র মিল নেই... এটা কী করে সম্ভব? এই সঙ্গীতের সোর্সটা কী মিস্টার বোস? আপনি এই মিউজিক কোথা থেকে শিখলেন? কোথা থেকে পেলেন এই আশ্চর্য সুর? বলুন মিস্টার বোস, বলুন...।'
শুনে আমি আঁতকে উঠলাম। আচ্ছা, তাহলে এই কথা বের করতেই আমার এই অপহরণ। বুঝতে পারছি, ওদের মতলবটা পরিষ্কার বুঝতে পারছি। আমার মিউজিক রিলিজের পর থেকে সারা ভারত তথা বিশ্বের সংগীত দুনিয়া জুড়ে তলায়-তলায় কী ধরনের আলোড়ন তৈরি হয়েছে বুঝতে পারছি।
ওদিকে পর্দায় আমার চেতনা নিভে আসছে আর ওই দু'জন এক্সপার্ট আমার চোয়ালে আলতো টোকা মেরে-মেরে আমায় জাগিয়ে রাখছে... 'মিস্টার বোস, বলুন মিস্টার বোস, কী বলছেন, আর-একবার বলুন? বছরকুড়ি আগের একদিন রাতে আপনি আপনাদের টাউনের নদীর বাঁধের উপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে ফিরছিলেন, তারপর?'
'হ্যাঁ, সেদিন বেশ রাত করে সুমন্তদের বাড়ি থেকে ফিরছিলাম। সামনে আমাদের বারোয়ারির দুর্গাপুজো, কালচারাল প্রোগ্রামের সব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে। তখন আমি সরকারি কলেজে পড়ি ফিজিক্স অনার্স, গান বাজনা জীবনের সবচেয়ে বড় প্যাশন কিন্তু সেসব নিয়ে একদিন কেরিয়ার করব ভুলেও ভাবিনি। দেরি হয়ে গিয়েছে তাই শর্টকাটে মারতে বাঁধের ঢাল দিয়ে নেমে হেলাবটতলা মহাকাল মন্দিরের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। অমাবস্যার রাত, ঘুটঘুটে অন্ধকার...' বলতে-বলতে আবার তন্দ্রার মধ্যে চলে গেলাম।
'ঘুটঘুটে অন্ধকার, তারপর? মিস্টার বোস তারপর...?'
'হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওদিকে বড় একটা কেউ আসে না, মন্দির বলতে তেমন কিছু আর নেই, ভাঙা দেওয়ালগুলোই দাঁড়িয়ে আছে খালি। কোনওরকমে মোবাইল টর্চ জ্বালিয়ে এগোচ্ছিলাম ওটার পিছন দিয়ে যাওয়া রাস্তাটা ধরে। বটগাছটা বিশাল জায়গা নিয়ে ভেঙে পড়ে আছে, অনেক ঝুরি অনেক ডালপালা। আচমকা থমকে দাঁড়ালাম সাইকেল থেকে নেমে, মন্দিরটার অর্ধেকটা ভেঙে যে বিশাল ডালটা পড়ে আছে তার ফাঁকে মন্দিরের একটা থামের পাশে হঠাৎ দেখি ফ্যাকাশে নীল রংয়ের অদ্ভুত একটা আলো...'
'আলো বলতে, কীসের আলো?'
'আমি এগিয়ে গেলাম, ভয়ে-ভয়ে আস্তে-আস্তে এগিয়ে গেলাম। কাছে গিয়ে দেখি ইট বেরনো থামটার নীচে থকথকে জেলির মতো কী যেন একটা পড়ে আছে। তার ভিতরে ডালের দানার মতো নীলচে আলোর অসংখ্য পুঁতি, জ্বলছে-নিভছে জ্বলছে-নিভছে।' 'জেলি! কী ধরনের জেলি? জেলির মধ্যে আলো জ্বলছে!'
'হ্যাঁ আলো, ওরকম জিনিস আমি জন্মে দেখিনি। ভয়ে-ভয়ে কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পা দিয়ে সামান্য ছুঁতেই জেলিটা থরথরিয়ে কেঁপে উঠে পিছনে সরে গেল। বেলুনের মতো ফুলে ফেঁপে উপর দিকে উঠতে লাগল, চোখের নিমেষে অনেকটা আমার মতোই একটা মানুষের চেহারা নিতে শুরু করল।'
'সে কী, তাই নাকি! তারপর?'
'তারপর...'
পর্দায় আমার কথা চলছিল, মাঝখানের চেয়ারে বসা লোকটা রিমোট টিপে স্ক্রিন অফ করে দিল। আমার উদ্দেশে কিছুটা গলাটা উঁচিয়ে বলল, 'এরপর থেকে যা যা বলেছেন তা আর দেখে কী করবেন, সব যখন আপনারা জীবনের গল্প...'
'না, না, তবু চালান না, শুনি কী কী বলেছি।'
'না, এরপর থেকে আপনার মুখেই শুনব। নারকো টেস্টে যা বলেছেন সে তো বলেইছেন, সে সবটা আমরা শুনেছি।'
'আচ্ছা বুঝতে পারছি, আপনারা আমার মুখ থেকেও আরও একবার সবটা শুনতে চাইছেন তাই তো? এখন স্বাভাবিক অবস্থায় আমি যা যা বলব তা যদি নারকো টেস্টে দেওয়া বয়ানের সঙ্গে না মেলে, দুটো বক্তব্যের মধ্যে যদি কোনও ফারাক বা অসঙ্গতি ধরা পড়ে, তাহলে আপনাদের পক্ষে সত্যিটা যাচাই করে নিতে সুবিধে হবে, তাই তো?'
'বুঝছেনই যখন, তা হলে বলুন? তারপর কী ঘটল বলুন?' একেবারে ডানপ্রান্তের চেয়ারে বসা ছায়া মূর্তি বলে উঠল।
'তারপর আর কী, সেই জেলি-মানুষটার সঙ্গে আমার বেশ খানিকক্ষণ কথা হল। ওর আশ্চর্য ক্ষমতা, যার সঙ্গে কথা বলছে মুহূর্তে তার শেপ আর ল্যাঙ্গোয়েজ রিড করে সেই অনুযায়ী নিজেদের কনভার্ট করে নিতে পারে। পরিষ্কার বাংলায় জানাল ওরা এসেছে অন্য একটা গ্যালাক্সি থেকে, যে গ্রহটার নাম বলল সেটার উচ্চারণ এমনই জটিল যে কিছুতেই মনে রাখতে পারি না।
'যাই হোক, ওরা যারা আমাদের গ্রহে একটা প্রোজেক্টের কাজে এসেছে, তাদের মধ্যে ওর কাজ আমাদের এই গ্রহে যতরকমের মিউজিক আছে, তার যত বেশি সম্ভব স্পেসিমেন সংগ্রহ করে নিয়ে ফেরা। এই কাজে ও আমার সাহায্য চায় আর আমি প্রাণপাত করে খেটে আমার জেঠুমণির কালেকশন থেকে দেশ-বিদেশের প্রচুর গান-বাজনার নমুনা ওকে জোগাড় করে দিতে থাকি। তখন ইন্টারনেটের এত রমরমা হয়নি, তাই জেঠুই ভরসা। ওঁর সাহায্যে টানা তিন মাস ধরে সারা বাংলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জেঠুর গান-পাগল বন্ধুদের কাছ থেকে হরেক কিসিমের মিউজিক, এমনকী নানা উপজাতিদের গান-বাজনার রেকর্ডিং এনে দিতে থাকি আর ও সেগুলোর আত্তীকরণ করতে থাকে। তারপর ওর যেদিন ফেরার সময় আসে, সেই রাতে ও আমায় প্রচুর ধন্যবাদ দেয়, আর আমার হাতে একটা অদ্ভুত জিনিস দেয়। একটা ব্যান্ডএডের মতো দেখতে খুব পাতলা জেলি জাতীয় একটা স্ট্র্যাপ বা ফিতে। নিজের হাতে ও আমার কপালে সেটা লাগিয়ে দেয় আর আমার মাথার ভিতর কেমন যেন একটা ঝিলিকমতো খেলে যায়।'
'মাই গুডনেস, হাউ ক্যান ইট বি পসিবল?' ডান প্রান্তের লোকটা কিছুটা যেন হতাশা মেশানো বিস্মিত স্বরে বলে উঠল।
'বুল শিট, কক অ্যান্ড বুল স্টোরি। জাস্ট ইম্পসিবল!' বাঁদিকে চেয়ারে বসা লোকটা বিরক্ত ভঙ্গিতে চাপড় মারে ওভাল টেবিলে।
'কিন্তু কথা তো সব মিলে যাচ্ছে, নারকো টেস্টে যা-যা বলেছে, এখনও মোর অর লেস সেই কথাগুলোই বলছে!' মাঝের চেয়ারে বসা লোকটা বলে।
'হ্যাঁ, আমাদের এক্সপার্টদেরও ওপিনিয়ন ও সত্যি কথাই বলছে।'
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে ডানদিকের চেয়ারের লোকটা গলা ঝাড়ল, 'তাহলে মিস্টার বোস, আপনার বিস্ময়কর মিউজিক তৈরির রহস্যটা তাহলে এই। আপনার সেই ভাঙা মন্দিরের এলিয়েন ফ্রেন্ড আপনার কপালে একটা মিউজিক স্ট্র্যাপ লাগিয়ে দিল, তাতে আপনার আপনার মাথা জুড়ে একটা ভাইব্রেশন খেলে গেল আার সঙ্গে-সঙ্গে আপনার ব্রেন ওদের প্ল্যানেটের মিউজিকের ব্যাপারে অটোমেডিক্যালি প্রোগ্রামড হয়ে গেল, তাই তো?'
'হ্যাঁ, আমারও ধারণা তাই। স্ট্র্যাপটা লাগিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটা কপালের চামড়ার মধ্যে মিশে গেল। তারপর বাড়ি ফেরার পথে খেয়াল করলাম, অদ্ভুত একটা সম্পূর্ণ অচেনা অজানা সুর গুনগুন করতে করতে ফিরছি। বাড়ি ফিরে আমাদের হারমোনিয়ামে বা জেঠুমণির পিয়ানোতে সুরটাকে ধরতে গিয়ে দেখি কিছুতেই ধরা যাচ্ছে না। কিন্তু মুখে-মুখে শব্দ করে দিব্যি ধরতে পারছি। জেঠু তো শুনে আত্মহারা, নিজের বিলেত থেকে আনানো মিউজিক প্লেয়ারে সুর রেকর্ড করে নিল। তারপর থেকে কত সুর যে ওভাবে রেকর্ড করেছি। যতবার করেছি, জেঠুর সেই এক প্রশ্ন এই সুর আমি কোথায় পেলাম। কাউকে বলিনি, এই ব্যাপারে ভুলেও কারও কাছে কোনওদিন মুখ খুলিনি, কিন্তু আপনারা বাধ্য করলেন।'
'করলাম, করতে হল। না করলে যে জানা যেত না, আপনার মিউজিক কম্পোজিশনের ব্যাপারটাই আসলে চৌর্যবৃত্তি। আপনি গ্রহান্তরের গান চুরি করে নিজের গান বলে চালিয়ে আসছেন। কখনও কোথাও ঋণ স্বীকার করেননি, তিনটের মধ্যে একটা অ্যালবামের কফারে একটা শব্দও উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করেননি। এতগুলো ন্যাশনাল ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন, সামনে শুনছি গ্র্যামির নমিনেশন পেতে চলেছেন, অথচ পিছনের গল্পটা বেমালুম চেপে যাচ্ছেন। তাই আমরা বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনি একজন ঠগ, আপনি সারা দুনিয়ার গানের জগৎকে ঠকিয়েছেন, সবার জানা উচিত আপনার মিউজিক আসলে একটা ধাপ্পাবাজি।'
'আই অবজেক্ট ইয়োর অনার, চুরি কিন্তু করিনি, বলতে পারেন পেয়েছি। তবে যা-যা পেয়েছি, একেবারে যে ফ্লুকে পেয়েছি সেটা বললেও অন্যায় হবে। ওই মিউজিক কানে শোনা যায়, কিন্তু জাগতিক কোনও বাদ্যযন্ত্র দিয়ে বাজানো প্রায় অসম্ভব! তাই দিনের পর দিন প্রাণপাত করে খেটে হাইলি সফিস্টিকেড সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং শিখেছি। সাউন্ড সিস্টেম ডিজিট্যাল ফরম্যাটে আসার পর অনেকরকম প্যাঁচ-পয়জার ব্যবহার করে তবে এই মিউজিক বানিয়েছি।''
'পেলেই তো সেটা আপনার সম্পত্তি হয়ে গেল না, কোথা থেকে পেয়েছেন সেটা না জানালে হরেদরে তো সেই চুরিই হয়ে গেল।'
'হয়তো ঠিকই বলছেন। সত্যিই হয়তো আমার উচিত ছিল, প্রেস কনফারেন্স করে পুরো বিষয়টা সবাইকে জানিয়ে দেওয়া। কিন্তু তা হলেই কি আমার কথা লোকে বিশ্বাস করবে? একজনকেও বিশ্বাস করাতে পারব, যা বলছি তার প্রতিটি বর্ণ সত্যি? সবাই একবাক্যে বলবে এটা একটা পাবলিসিটি স্টান্ট, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটেনশন পাওয়ার জন্য নিজের মিউজিককে নিয়ে বিশ্বজুড়ে শোরগোল ফেলার ফণি।'
ওপারের ওরা তিনজন নিশ্চুপ বসে রইল খানিকক্ষণ। এদিক থেকে অস্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ওরা তিনজন ছায়ামূর্তি মাথাগুলো কাছাকাছি এনে ফিসফিসিয়ে কী সব আলোচনা করছে।
'তবে আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ, আমাকে এভাবে কিডন্যাপ করে এনে নারকো টেস্ট করিয়ে আপনারা আমার প্রভূত উপকার করলেন। টেস্টের ভিডিয়োটা থাকাতে এখন মানুষকে বিশ্বাস করাতে সুবিধে হবে যে, আমি নেহাৎ পাগলের প্রলাপ বকছি না। আমি রাজি, আপনারা যদি একটা প্রেস কনফারেন্স অ্যারেঞ্জ করে দেন, আমি কালই প্রেল মিডিয়ার সামনে সবটা কনফেস করতে রাজি আছি। আপনারা যদি অনুগ্রহ করে নারকো টেস্টের ভিডিয়োটা টেলিকাস্ট করার অনুমতি দেন, তাহলে তো আরও ভালো হয়, তা হলে মনে হয় ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্য হবে।'
টেবিলের ওপারে বসা ওরা তিন ছায়ামূর্তি কথা বলে না। মিনিট তিন-চারেক পর মাঝের জন ওঠে দাঁড়ায়, 'ভিডিয়ো দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। না, না, আপনাকে আর কিছুই করতে হবে না। আপনি বাড়ি যান, আমাদের লোকজন আপনাকে কালকের মধ্যে আপনার বাড়ির সামনে নামিয়ে নিয়ে আসবে। আমাদের যা জানার জেনে নিয়েছি, আপনি এবার যেতে পারেন।'
''জো হুকুম, সরকার! থ্যাঙ্কস, মেনি মেনি থ্যাঙ্কস!'' রসিকতার সুরে বললেও স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম।
ওরা আর একটাও কথা বাড়াল না। মুহূর্তের মধ্যে সারা ঘর নিশ্ছিদ্র অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় বুঝতে পারলাম, এটা ওদের তিনজনের নিঃশব্দে আর পরিচয়ের গোপনীয়তা অটুট রেখে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যেই করা। কিন্তু আমি মনে হয় ওদের একজনের গলা চিনতে পেরেছি। খুব যদি ভুল না করে থাকি, তাহলে মাঝখানের ওই লোকটা প্রিয়ঙ্কর ডামলে, মুম্বই তথা ইন্ডিয়ান মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির খুব বড়ো একটা নাম। ওর সঙ্গে আগে যদিও কখনও সাক্ষাৎ হয়নি, কিন্তু টিভিতে বা ইন্টারনেটে আমি ওর ইন্টারভিউ শুনেছি। মিউজিক ওয়ার্ল্ডের লোক, তাই নিশ্চয়ই ভুলেও চাইবে না আমাকে অহেতুক পাবলিসিটি দিতে। দিনটা ছিল ২৬ জুলাই, আমাকে একটা বিলাসবহুল গাড়িতে করে ড্রাইভারসহ আর একজন লোককে সঙ্গে দিয়ে বাড়ির পথে ছেড়ে দেওয়া হল। মোবাইলটা ফেরত পেতেই লোকেশন দেখে বুঝলাম এটা মুম্বইয়ের আন্ধেরি ওয়েস্ট এলাকার রাস্তা। মুক্তি পাওয়ার অনুভূতির সঙ্গে তুলনা হয় না দুনিয়ার আর কিছুরই, তাই আকুলবিকুল ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছিল মন।
তাই বলে বিবেকের কামড় থেকে রক্ষা কোথায়? কলকাতামুখো সারা রাস্তা অদ্ভুত একধরনের আনন্দ আর অস্বস্তির মধ্যে দুলতে দুলতে ফিরতে লাগলাম।
না, অনেক দেরি হয়েছে আর নয়, এবার সময় হয়েছে সবকিছু সবার সামনে খুলে বলার। আসতে আসতে ঠিক করে ফেললাম সামনের অ্যালবামের নাম রাখব, 'গিফট অফ দ্য এলিয়েনস'। অ্যালবাম প্যাকের সঙ্গে পুস্তিকা আকারে জুড়ে দেব আমার গান পাওয়ার গল্প।
আমি জানি কেউ আমার কথা বিশ্বাস করবে না। কেউ হয়তো পাগল বলবে, কেউ বা ফন্দিবাজ। সে যা বলে বলুক, যা ভাবে ভাবুক, আমাকে এবার বলতেই হবে। অন্য কারও জন্য নয়, সেই ওদের জন্য বলতেই হবে। কারণ বলা তো যায় না, কোন গাছের গা থেকে অদৃশ্য জেলির মতো কারা যে সব চেয়ে থাকে, কোন দেওয়ালের গা থেকে কারা যে সব কান পেতে থাকে...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন