কালীকিংকরের সাজা

তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়

বিশাল বপু লোমশ দেহ লোকটা যে কটকটে দিনের আলোয় এভাবে বেমালুম হাপিস হয়ে যাবে, কেউ কোনও দিন ভাবতে পেরেছিল? আজ পাক্কা আড়াই দিন হল, জলজ্যান্ত জাঁদরেল লোকটা একেবারে বেপাত্তা। মানুষ তো আর যা হোক কর্পূর নয় যে, ফুস করে উবে যাবে। তন্নতন্ন করে খোঁজ চলছে চতুর্দিকে। গোয়েন্দা পুলিশ গুপ্তচর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে রাজ্যজুড়ে কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনওরকম খবর হাতে আসেনি। মুক্তিপণ চেয়ে কিডন্যাপার বা টেররিস্টদেরও কোনও ফোন আসেনি বাড়িতে। রেডিয়োতে আপৎকালীন বিজ্ঞপ্তি, টিভির পর্দায় ওর সহাস্য ফটো দেখিয়ে ঘনঘন ব্রেকিং নিউজ ঝলকাচ্ছে— 'বাংলা সিনেমার প্রখ্যাত ভৌতিক ফিল্মনির্মাতা শ্রী কালীকিংকর কোলে নিরুদ্দেশ।' তার ওপর আজ সকালে স্ত্রী রুদ্রনীলার ঘোষণা সন্ধান দিতে পারলে হাতে হাতে দশ লাখ হার্ড ক্যাশ...।

হাঁড়ির খবর যাদের জানা তারা বলছে, নতুন ছবির লোকেশন বাছার কাজে সে একাই নিজের গাড়ি ড্রাইভ করে গিয়েছিল নদিয়া জেলার ঘন বাঁশবনে ভরা এক প্রত্যন্ত গ্রামে। জলঙ্গী নদীর ধারে, এক দু'আড়াইশো বছরের জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ির ভেতর-বাইরে খুঁটিনাটি দেখে উচ্ছ্বসিত কালীকিংকর ফোন করেছিল তার প্রোডাকশন টিম মেম্বারদের। সেদিন রাতেই কলকাতায় ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু পরদিন রাত কেটে যাওয়ার পরেও যখন সে ফিরল না, যোগাযোগ করা গেল না মোবাইলে হাজার বার কল করেও, তখন টিমের লোকজন দল বেঁধে সেই কুখ্যাত বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সেখানে কালীকিংকরকে পাওয়া যায়নি, কিন্তু বাড়ির নীচে পাওয়া গেছে কালীবাবুর শখের মার্সিডি বেনজ, দোতলার কোণের দিকের একটা ঘরের মেঝেতে শতরঞ্চির ওপর থেকে উদ্ধার হয়েছে তার পার্সোনাল ল্যাপটপ, মোবাইল, ব্যাগ ভরতি মোটামোটা বাঁধানো খাতা আর ছেড়ে রাখা জুতো জোড়া। স্পটটায় সরেজমিনে ইনভেসটিগেট করে এসে পুলিশের বক্তব্য, কালীকিংকরকে ডেফিনিটলি কিডন্যাপ করা হয়েছে। কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার, ওই ঘরটার ধুলো ভরা মেঝেতে কালীবাবুর জুতো ছাড়া অন্য কারও পায়ের ছাপ নেই।

খবরটা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে শোরগোল পড়ে গেছে ভক্ত অনুরাগীদের মধ্যে, হইচই শুরু হয়েছে ছবিপাড়ায়। টেকনিশিয়ান ডিস্ট্রিবিউটরা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছে, মাথায় হাত ওর নতুন ছবি 'গুম ঘরে ঘুম'-এর প্রোডিউসারের। কালীকিংকর ইন্ডাস্ট্রিতে নিঃসন্দেহেই একটা হেভিওয়েট নাম। শহুরে দর্শকদের জন্য ছবি তৈরি করা আঁতেল পরিচালকরা যদিও তাকে ঠিক ডিরেক্টরের মর্যাদা দিতে নারাজ, তবু তার গুরুত্ব অস্বীকার করে, কার ঘাড়ে ক'টা মাথা! শেষ কুড়ি বছরে তিরিশটার ওপর সুপার ডুপার হিট ছবি ইন্ডাস্ট্রিকে উপহার দেওয়ার রেকর্ড আর কারই বা আছে? ছবির বাজারে খরা চলুক বা বন্যা, কালীকিংকরের ছবি কোনওদিন মার খায়নি। প্রোডিউসারদের লাইন পড়ে তার বাড়ির গেটে, তার গোটা আষ্টেক ছবির রিমেক হয়েছে হিন্দি, তামিল, তেলেগু, মালয়লম ও কোঙ্কনি ভাষায়। বলিউডের হরর ফিল্মের একচেটিয়া কারবারি মুন্দ্রা অ্যান্ড মুন্দ্রা ব্রাদার্সদের সঙ্গে তার সেয়ানে সেয়ানে টক্কর চলে, মুম্বই-এর বিখ্যাত ফিল্ম ম্যাগানি মুন-ডাস্টে তার আট পাতা জুড়ে সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল তিন মাস আগে, আর লোকাল পুরস্কারগুলোকে রাখার তো আর তিলমাত্র জায়গা ফাঁকা নেই তার সল্টলেকের বাড়ির তিরিশ ফুট বাই তিরিশ ফুট ড্রইংরুমের দেওয়ালগুলোয়।

তবে ওসব ঠুনকো পুরস্কারের তোয়াক্কা সে কোনওকালেই করেনি। আসল পুরস্কার হল পাবলিকের বাম্পার রেসপন্স, পাবলিকই মা-বাবা, ইষ্ট-কেষ্ট, আল্লা, জিশু যা বলো তাই। আজকালকার কিছু অকালপক্ক পরিচালক যতই হলিউড থেকে টুকে ওসব বুদ্ধি-বুদ্ধি ভূত দেখাক— কালীকিংকর তার টার্গেট অডিয়েন্সদের বিলক্ষণ চেনে। তাই তার ভূতেরা এখনও সেই আদি সনাতন ভয়াল ভয়ংকর, তাদের নাক খসে পড়ে, কান খসে পড়ে, চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসে গলে। এখনও যখন তার হাড় হিম করা ডায়লগ, গায়ের লোম খাড়া করে দেওয়া ব্যাকগ্রাউন্ড মিউকি, নিশুতি রাতের সেটিং-এ আলো আঁধারি খেলা, কালো বিড়ালের চোখ, শুকনো পাতার খসখসানি, ভাঙা বাড়ির ভেতর থেকে আসা আর্তনাদ, জঙ্গল থেকে ভেসে আসা কান্নার রোল, আচমকা হাওয়ায় খুলে যাওয়া দরজার ক্রী-আঁ-আঁ-চ-চ আওয়াজে প্রেক্ষাগৃহে হাউসফুল বোর্ড পড়ছে, তখন ট্রেডমার্ক পাল্টানোর প্রশ্নই ওঠে না। ওসবই যখন তাকে কোটিপতি করেছে, তখন বাকি জীবনে ওসব থেকে সরে আসতে হারগিস রাজি নয় কালী।

সে সব তো ঠিকই আছে, কিন্তু আদতে কালীবাবুর হলটা কী? দেখতে দেখতে আরও তিনটে দিন কেটে গেল, লোকটার টিকিটি পর্যন্ত উদ্ধার করতে পারল না এমনকী কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সও। ওদিকে যখন লোকের মুখে মুখে কালীবাবুর অন্তর্ধান রহস্য দানা বাঁধতে বাঁধতে মোহনপুরের দানাদার হয়ে উঠছে কলকাতার হাটে বাজারে, এদিকে কালীকিংকর পড়েছে মহা ফ্যাসাদে।

সেদিন জলঙ্গীর ধারের ওই ভূতুড়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে সে তো দিব্যি মৌজ করে একটা কিং সাইজ সিগারেট ধরিয়ে কোণের ওই ঘরটায় বসেছিল শতরঞ্চি পেতে। ওই রকম নির্জন গা ছমছমে পরিবেশে ভূতের সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখার মেজাজটা জমে খাসা। কালীকিংকর তার ল্যাপটপটা খুলে বসেছে ঠ্যাং ছড়িয়ে, দারুণ একটা আইডিয়া খেলে গেছে মাথায়, লাইনগুলো আসছিল তড়তড়িয়ে। হঠাৎ যন্ত্রটা বেগড়বাই করতে শুরু করল। যা যা লিখেছিল সে, সব অক্ষরগুলো পেছন দিকে দৌড়তে শুরু করে মুছে যেতে আরম্ভ করল বেমক্কা। সেভ করতে যেতেই ফাইল উড়ে গেল। তড়িঘড়ি আগের সেভ করা ফাইলগুলো চেক করতে গিয়ে দেখে সবকটা উড়ে গেছে। কী করে উড়তে পারে— মাই কম্পিউটারে সেভ করা ফাইল কী করে উড়তে পারে বাজ পড়ল কালীবাবুর মাথায়। এতদিনের সব পরিশ্রমের ফসল সব জলে। কী সব অসামান্য লাইন লেখা হয়েছিল— সে সব কি আর ফিরে পাওয়া যাবে?

কালীকিংকরের তো কাঁদো কাঁদো অবস্থা— আচমকা কিছু উদ্ভট মুখ ভেসে উঠল মনিটরের স্ক্রিনে। শরীরটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল— কারা যেন তাকে মেঝের সঙ্গে বেঁধে ফেলেছে। চেঁচাতে গিয়ে লাভ হল না—গলা দিয়ে ফ্যাঁসফেঁসে কিছু শব্দ বেরিয়ে এল মাত্র। চোখের সামনে সব কেমন আবছা হয়ে আসছে—তবু স্পষ্ট দেখতে পেল, মেঝে ফুঁড়ে দুটো বিশালাকার ছায়ামূর্তি ওঠে এল সামনে। কালীকিংকরের হাতদুটো ধরে হ্যাঁচকা টান মারল ওপর দিকে—সে শূন্যে ওঠে গেল ফুট চারেক। সারা শরীরে ফোর ফর্টি ভোল্ট কারেন্ট খেলে যেতে সে অচিরেই জ্ঞান হারাল।

জ্ঞান ফিরল চারদিক দিয়ে বাঁশবনে ঘেরা একটা অদ্ভুত জায়গায়। চোখ খুলে ভ্যাবলার মতো চারদিকে তাকিয়ে ঢোক গিলল কালীকিংকর। সামনে বসে একজন নধর চেহারার বয়স্ক লোক, মাটির সঙ্গে যোগাযোগ নেই, ঘাসের বনের চার ইঞ্চি মতো ওপরে ভেসে রয়েছে শূন্যে। পাশে আরও দশ-বিশটা মোটা শুঁটকো ত্যাড়া বেঁকা ত্রিভঙ্গমুরারি গোছের লোক বেদম লাফাচ্ছে— দু'জন গৌর নিতাই-এর মতো বাহু তুলে নাচছে মাটি থেকে ইঞ্চি দুয়েক ওপরে। ওরা মহা উল্লাসে বলল— জেগেছে ব্যাটা জেগেছে— শুরু হোক, তাহলে বিচারসভা শুরু হোক। বাকিরা সমস্বরে বলল— হোক হোক শুরু হোক।

—'কীসের বিচার? আমার...? আমার কেন খামোখা...? তোমরা কারা— আমার বিচার করার তোমরা কে হে?' কালীকিংকর গা ঝাড়া দিয়ে উঠল।

খিকখিক করে হেসে উঠল নধরকান্তি লোকটা— আমাদের নিয়ে সিনেমা করিস— আমাদের দৌলতে করে খাস আর আমাদেরই চিনতে পারছিস না? এর চেয়ে বড় দোষ আর কী হতে পারে?'

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চোখ পিটপিট করতে লাগল কালীকিংকর কোলে। লোকটা বলল— 'দোষ কী তোর? একটা ফিরিস্তি দিতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে। তবে আজ আমরা তোর মেন মেন দোষগুলো নিয়ে বিচার করব। আমি হলাম গিয়ে ভূতেদের এ গাঁয়ের মোড়ল— গোড়ার বিচারটা করার দায়িত্ব পড়েছে আমার ঘাড়ে। কে রে ফর্দ হাতে? কে আছিস-এর দোষগুলো পয়েন্ট ওয়াই পড়তে শুরু কর।'

অসমসাহসী কালীকিংকর গলা খাঁকরে উঠল— 'মোড়ল তো কী- আইনি বিদ্যের তুমি কতটা কী বোঝ হে? বিচার যদি করতেই হয়, করতে হবে বিচারক বা কাজির কাছে। আনপড়া যে-সে বিচার করতে এলে তার বিচার আমি মানব কেন?'

মোড়ল ভূত মুখ চুন করে সে প্রস্তাব মেনে নিলে, কালীকিংকরকে সযত্নে তুলে আনা হল এক মান্ধাতা আমলের বিশাল বিশাল সব ঝুরি নামা বটগাছের নীচে। আইনজ্ঞ বিচারক ভূতের এজলাসে বিধিবদ্ধ সব নিয়মকানুন মেনে শুরু হল বিচার। বটতলাটাকে গোল করে ঘিরে কাতারে কাতারে ভূত সাধারণ জড়ো হয়েছে বিচার দেখতে। মাথায় সাহেব আমলের উইগ পরা অতি বৃদ্ধ জজ ভূত ট্যাঁক ঘড়ি দেখে ঘণ্টা বাজালেন, আর খুনখুনে গলায় বলে উঠলেন— 'শোনো হে কালীকিংকর কোলে, আমাদের ভূত সমাজ থেকে নানা কারণ দেখিয়ে তোমার বিরুদ্ধে দশ দফা নালিশ জানানো হয়েছে, গুরুতর সব অভিযোগ। এই সেশনে সেই সব নিয়ে তোমার বিচার হবে। আত্মপক্ষ সমর্থনে তোমার কিছু বলার থাকলে বলতে পারো তবে এখানে কোনও বাদী বা বিবাদী পক্ষের উকিল রাখার ব্যবস্থা নেই— নালিশের ফিরিস্তি শুনে তোমাকে নিজেই নিজেকে ডিফেন্ড করতে হবে। আমাদের এখানে বিচার তোমাদের ওখানকার মতো বছরের পর বছর ধরে চলে না— আজকের কোর্ট আওয়ারের মধ্যেই ফয়সালায় এসে ফাইনাল ভারডিক্ট জানানো হয়ে যাবে। কী তুমি তৈরি তো?'

—'নালিশ? আমার বিরুদ্ধে নালিশ—আচ্ছা নেমকহারাম তো আপনারা। আমি কোথায় দিনরাত প্রাণপাত করে আপনাদের নিয়ে অ্যাদ্দিন ধরে একের পর এক ছবি নামিয়ে এলাম, মনুষ্যসমাজে আপনাদের পপুলার করতে অর্ধেক জীবন খরচ করে ফেললাম, মানুষেরা যাতে কোনও দিন আপনাদের ভুলে না যায় তার ব্যবস্থা করতে কোটি কোটি টাকা ঢেলে মলাম— আর আপনারাই শেষে আমায় কাঠগড়ায়...!' মোড়ল তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল— 'সেন্টু দিস না— যা যা করেছিস সব নিজের ধান্দায়। না হলে আমাদের চিন্তায় যেন তোর ঘুম আসছিল না। আমরা নির্বিবাদী লোকজন— ধৈর্যের সীমা না ছাড়ালে আমরা কারও বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিই না...।'

বিচারক বিরক্ত গলায় বললেন, 'বিচার চলাকালীন নো ইন্টারভেনশন— নো ডিস্টারবেন্স। কী গো কোথায় গেলে হে বিধুচরণ? ফর্দ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলে কেন? এগিয়ে এসে পড়া শুরু করো।'

ঢ্যাঙা লম্বা প্যাকাটির মতো চেহারার এক লোক হোঁচট খেয়ে হুমড়িয়ে সামনে এসে দাঁড়াল পেল্লাই এক ফর্দতে আতশ কাচ তাক করে— 'আজ্ঞে, অভিযুক্ত শ্রী কালীকিংকর কোলে, পিতা ভূতলোকবাসী শ্রীযুক্ত করালিবদন কোলে, পেশায় চিত্রপরিচালক, অধুনা নিবাস সল্টলেক কলকাতা থানা, ওই হ্যাড্ডাব্যাড্ডা মহাশয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ নাম্বার এক : উনি কয়েক ঘণ্টা আগে ব্যতীত আজীবতকাল কোনওদিন ভূতেদের স্বচক্ষে দেখলেনই না, তাদের সম্পর্কে ল্যাজামুড়ো কিসসু জানলেনই না, অথচ তাদের নিয়ে গোটা চল্লিশেক পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি বানিয়ে ফেলে দিলেন। অভিযোগ নাম্বার দুই : উনি ভূতেদের ভয়াবহ প্রতিহিংসাপরায়ণ আর ক্ষতিকারক হিসাবে দেখিয়ে আমাদের যারপরনাই অপমান ও চরিত্রহনন করেছেন। তিন : আমাদের যতদূর সম্ভব কুৎসিত বীভৎস বিতিকিচ্ছিরি সব চেহারায় দেখিয়ে উনি আমাদের জাতির মর্যাদাহানি করেছেন। চার : আমরা রক্ত চুষে খাই, ঘাড় মটকে দিই— মনুষ্যসমাজে ভূতেদের সম্পর্কে এইসব ভুল তথ্য পরিবেশন করে ও আমাদের সম্পর্কে নিরেট আরও সব ভ্রান্তধারণা তৈরি করে এঁদের মতো কিছু পরিচালক আর লেখক ভূতেদের রীতিমতো আতঙ্কের বস্তুতে পরিণত করেছেন। পাঁচ : ...'অবজেকশন ইওর অনার' বলে চিৎকার করে উঠলেন কালীকিংকর। 'এসব কী হচ্ছে? এসব যে ভূতেদের চোখে দোষের তা আমি কী করে জানব? তাছাড়া আমি নতুন কী করেছি... হাজার হাজার বছর ধরে যেসব চিন্তা-ভাবনা আমাদের বাপ ঠাকুরদা চোদ্দোপুরুষ ধরে করে এসেছেন, আমি সেগুলোকেই একটু আধটু মেলোড্রামা দিয়ে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছি। আমি শিল্পী মানুষ— আমাদের কাছে সত্যি মিথ্যেটা বড় কথা নয়— বড় কথা হল পরিবেশনটা বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে কি না, পাবলিকের মনোরঞ্জন হচ্ছে কি না।'

মোড়ল চিল্লিয়ে ওঠে, 'শিল্পী বলে মাথা কিনে নিয়েছে নাকি? আমাদের মতো এত বড় জাতের এত বড় সব অবমাননা আর আমরা কদিন সহ্য করব? একবার যখন বাগে পেয়েছি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই— এমন শাস্তি যাতে তামাম দুনিয়ার ভূতের সিনেমার ডিরেক্টর আর লেখকরা ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে কস্মিনকালে আর ওসব জঘন্য অপরাধমূলক কাজ করার সাহস না পায়।' চারপাশ থেকে উত্তেজিত জনতা তার সঙ্গে গলা মেলায় 'শাস্তি চাই, শাস্তি চাই, শাস্তি চাই।'

মোড়লকে থামিয়ে বিচারক বিধুবাবুকে পাঁচ নম্বর পয়েন্টে ফিরে যেতে বলেন। বিধুবাবু পড়ে চলেছেন, কিন্তু কিছুই যেন মাথায় ঢুকছে না কালীকিংকরের। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কথা শোনার পর থেকে গলা শুকিয়ে আসছে তার। সে এক গেলাস জল খেতে চেয়ে অপেক্ষাকৃত নরম করে বলে— 'আপনাদের পয়েন্টগুলো মোটামুটি বুঝতে পেরে গেছি— কিন্তু আগে তো আমাকে কেউ এভাবে ওয়ার্নিং দেয়নি। বিনা ওয়ার্নিং-এ শাস্তি হয় নাকি? এমনিতে আমারই বা কী করার ছিল বলুন— ভূতের ছবি বানানোটা আমার পেশা। পেশায় ন্যায়-অন্যায় দেখাটা কি ঠিক? হাওড়া জেলার ধ্যাতধেড়ে গোবিন্দপুর থেকে কলকাতায় কাজের জন্য এসে টালিগঞ্জের বস্তিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই জুটেছিল। ওখান থেকেই ছবিপাড়ায় যাতায়াত শুরু কালক্রমে ভূতের ছবির মার নেই বুঝে এ লাইনে ঢুকে পড়া—নিজের যোগ্যতা আর হাড়ভাঙা পরিশ্রমে নিজস্ব ঘরানা তৈরি করে ফুলে-ফেঁপে ওঠা। তাছাড়া কেবল আমিই তো নই, সারা পৃথিবীতে আমার মতো আরও তো অনেক ভূতের ছবির পরিচালকও লেখক আছে— তাদের ছেড়ে খামোখা আমাকে ধরা কেন?'

মোড়ল গর্জে ওঠে— 'ধরপাকড় শুরু হয়েছে— ভারতবর্ষে তোকে দিয়ে শুরু— ওদিকে একই সঙ্গে কানাডায় কিডন্যাপ হয়েছে হলিউডের স্টিভেন রুকস্যাক। আস্তে আস্তে সবার সাজা হবে— কাউকে ছাড়ান নেই...।'

মোড়লের এহেন ঘনঘন নাকগলানিতে বিরক্ত কালীকিংকর আবার অবজেকশন জানায়। বিচারক আবার মোড়লকে দাবড়ে বসিয়ে কালীবাবুকে নম্র গলায় বললেন— 'দ্যাখো বাবা কালী, তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি না তা নয়, কিন্তু কিছু কথা তোমায় খোলসা করে বোঝালে তুমি নিশ্চয়ই বুঝবে তোমার অপরাধের বহরটা আসলে কত বড়। প্রথমেই একটা বেসিক কথা বুঝে নাও— তোমরা যাকে ভূত বলে ভুল করো সেটা আদতে তোমাদেরই মনের জমাট ভয়— আমরা কিন্তু মোটেও ভয়াবহ নই। বাস্তবে আমাদের চেয়ে নিপাট ভদ্র-শান্ত-নির্ঝঞ্ঝাট আর বিদ্বেষহীন জাত এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আর দু'টি পাবে না। মোদ্দাকথা কী জানো, আমরা যখন মর্ত্যলোকের মানুষ ছিলাম তখন আমাদের শরীরে বাসা বেঁধেছিল কাম ক্রোধ লোভ ঈর্ষা মোহ মাৎসর্য ভংচং ইত্যাদি প্রভৃতি অনেক কিছু। কিন্তু একবার শরীর ছেড়ে বেরিয়ে আসা সে যে কী মহামুক্তি তোমাকে বাবা কী বোঝাব।

এখন আমাদের আর আমিত্ব বলে কিছু নেই— তাই কোনও প্রত্যাশা নেই, দুঃখ যন্ত্রণা, ভয় সংশয় অনুশোচনা হার জিত জরা ব্যাধি কিচ্ছু নেই— এখানে আমাদের যে কী আনন্দ— কী তুরীয় সুখ তা তোমরা কোনও দিনও বুঝবে না। কিন্তু তার উলটোদিকে তোমরা যেভাবে তোমাদের সিনেমা বায়োস্কোপ আঁকাজোকা লেখাপত্তরে আমাদের ওরকম জটিল কুটিল বিকৃত ভয়াল ভয়ঙ্করভাবে পরিবেশনা করো, তাতে আমাদের ভূতলোককে অপমান করা হয় বইকি। সত্যের বিকৃতিও একরকমের খুন। এখন তুমি যদি বলো খুনটা তোমার পেশা তাই সেটা বৈধ, আমার কী বলার থাকতে পার?'

'কিন্তু কথাগুলো কেমন একটু স্ববিরোধী হয়ে গেল না? এই যে বললেন, আপনাদের আমিত্ব বলতে আর কিছু নেই— তাহলে তো আপনাদের ভালোলাগা, মন্দলাগা রাগ, বিদ্বেষ বলেও কিছু থাকার কথা নয়। আপনাদের পঞ্চায়েতের মোড়ল যেভাবে আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ওঠেপড়ে লেগেছেন— আপনি যেভাবে আমার শাস্তির সপক্ষে যুক্তি সাজাচ্ছেন, তাতে কিন্তু মোটেও মনে হচ্ছে না আপনারা আপনাদের ষড়রিপু মুক্ত।'

'ভালো বলেছ বাপ, যুক্তির কথা বলেছ। আসলে কী জানো, এটাও তো একটা সমাজ সব সমাজেরই কিছু রীতিনীতি আইন-কানুন আছে। কোথাও কোথাও কঠোর না হলে তো আর সমাজ চালানো যায় না— তাই আমাদের বিভিন্ন রোলে অভিনয় করতে হয়— ও এখন মোড়লের ভূমিকায় অভিনয় করছে আর আমি জজের ভূমিকায়। এমনিতে এরা তো কেউ আমরা নই। আমরা তো হাওয়া— তোমার বিচারের আগে আমরা বেলুনের মতো এক ধরনের জিনিস পরে নিয়ে শরীর পরিগ্রহ করেছি— বুঝতেই পারছ শরীর পেলে রিপুগুলো আপনা-আপনি আবার কেমন জেগে ওঠে।'

'কিন্তু আমাকে শাস্তি দেওয়াটা কি খুব দরকার হয়ে পড়েছিল? আপনাদের যদি খুব একটা সমস্যা না হয় তাহলে বেকসুর ছেড়ে দিন না— দিব্যি তো করেকম্মে খাচ্ছিলাম— অন্য অনেককে খাওয়াচ্ছিলাম। আমি না থাকলে আমার ইউনিটের শ'খানেক লোক না খেয়ে মরবে। এমনিতে তো আপনারা অহিংস— তাহলে আমার ওপরেই এই অবিচার কেন?'

'সে সব তো ঠিকই আছে, তবু তোমার শাস্তিটা জরুরি— হাজার হাজার বছরের জমে ওঠা অভিযোগের তুমি হবে বলির বখরা। কাউকে না কাউকে তো সাজাটা পেতেই হবে, না হলে তোমরা শুধরোবে না— নরমপন্থার সুযোগ নিয়ে আমাদের টেকেন ফর গ্রান্টেড করে নেবে। আমি নিরূপায় কালী— আমার জায়গায় তুমি থাকলেও একই কাজ করতে। তুমি নিজেই একবার দেখো— এই নাও, এই স্পেশাল চশমাটা পরে একবার আমাদের ভূতলোকটা একচক্কর ঘুরে এসে দেখো। ফিরে এসে যদি মনে হয় তোমার শাস্তি পাওয়াটা অন্যায়, তাহলে আমি দায়িত্ব নিয়ে তোমায় ছেড়ে দেব।'

কালীকিংকর চশমাটা পরে এক ভূতের পিঠে চেপে চারদিক একপাক মারতে গিয়ে তো রীতিমতো বেকুব বনে গেল। এ কী জগৎ রে বাবা— এত আনন্দ, এত শান্তি, বাসিন্দাদের চোখে-মুখে এত প্রসন্নতা, এত সদ্ভাব দুনিয়ায় আর কোথাও সম্ভব নাকি? এখানে কোনওমতেই দুঃখ অভাব হিংসা দ্বেষ চক্রান্ত নিষ্ঠুরতা থাকতে পারে না। কাছেই দলে দলে ভূত হাত ধরাধরি করে মাদলের তালে তালে নাচছে। অদূরে একদল আপন মনে গাইছে কোরাসে। আশ্চর্য সুরেলা হাওয়ায় ভেসে ভেসে কী এক পরম তৃপ্তিতে বাকিরা সব বিভোর। চশমা খুললে দেখা যাচ্ছে না— কিন্তু পরলেই প্রাণ জুড়িয়ে যায়। এদেরই সারাজীবন ওরকম জঘন্য বিচ্ছিরি দগদগেভাবে পর্দায় আনা সত্যিই যে কী ভীষণ অপরাধ হয়েছে— লজ্জায় কুঁকড়ে যেতে থাকে কালীকিংকর। ওদের পবিত্র মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে নিজের ওপর প্রচণ্ড এমন এক ঘেন্না হয় যে, নিজের ফোলাফোলা দু'গালে দু'হাত দিয়ে অনবরত চড় কষাতে থাকে।

বিচারসভায় ফিরে সে হুড়মুড়িয়ে ছুটে ঝাঁপিয়ে গিয়ে পড়ে জজের পায়ে। তারপর সে কী কান্না আর বারবার সেই একই কথা, আমায় শূলে দিন জজ সাহেব, ফাঁসি-শিরচ্ছেদ বা আপনাদের পেনাল কোডে চরমতম যে শাস্তি আছে দিন, আমি মাথা পেতে নেব। মরে ভূত হয়ে আমি আপনাদের জগতে আসতে চাই— নিন জজ সাহেব আপনি নিদান হাঁকুন— আমি তৈরি।'

'আবার ভুল করছ কালী— এতক্ষণে তোমার বুঝে যাওয়া উচিত ছিল, কোনওরকম সহিংস সাজা দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। এতক্ষণের বিচার সভাটাই ছিল ফলস— জাস্ট তোমায় ভড়কে দেওয়ার জন্য ফাঁদা। তোমার বোধোদয় হয়েছে, অতএব এসবের আর প্রয়োজন নেই।'

লাফিয়ে ওঠে কালীকিংকর— 'তার মানে আমি মুক্ত? তাহলে আমি আসি— আমাকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।'

'আসি মানে?' নিমেষে কঠোর হয়ে উঠল বিচারকের মুখ— 'তোমাদের মানুষদের এই হল সমস্যা— সামান্য লাই পেলেই মাথায় ওঠে বসা। যাই হোক, তোমার সাজা হল মর্ত্যে ফিরে আমাদের নিয়ে একটা জম্পেশ ছবি বানাতে হবে। চশমা পরে আমাদের যেমন দেখলে তার ওপর ছবি, দরকার হলে আরও দু'দিন এখানে থাকো—আরও ভালো করে অবজার্ভ করো।'

'এ তো বড্ড কঠিন সাজা হয়ে গেল জজ সাহেব—বাস্তবে আপনাদের নিয়ে ছবি করা কী করে সম্ভব? আপনারা এতই গুডিগুডি, এতোই নির্বিষ পাপ-তাপহীন আর নিরুপদ্রব যে, গপ্পোই তো জমবে না। নো খারাপি মানে নো কনফ্লিক্ট নো ড্রামা, নো অ্যাকশন, নো উত্তেজনা, নো সাসপেন্স, নো ক্লাইম্যাক্স-মানে ছবি মায়ের ভোগে। আমাকে জানে মারুন ঠিক আছে, কিন্তু মার্কেটে আমার রেপুটেশনের এভাবে তেইশ মেরে দেবেন না।' ককিয়ে ওঠে কালীকিংকর।

'কিছু করার নেই ভাই— তোমার পাপস্খালনের এই একটাই রাস্তা। সুপার ডুপার ফ্লপ তো কী? সমস্ত ট্রেন্ড সেটিং জিনিসই প্রথমে ফ্লপ হয়— শুরুরও তো একটা শুরু থাকবে। ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শোয়ে লোকে এসে ঝটকা খাবে— হুজ্জুতি করে উঠে চলে যাবে— কিন্তু একটা অ্যাওয়ারনেস তো তৈরি হবে। চিন্তা নেই হলের ফাঁকা সিটগুলো জুড়ে আমরা থাকব— ছবি কানায় কানায় হাউসফুল।'

বিরক্ত কালীকিংকর কোলে অস্ফুটে বিড়বিড়িয়ে ওঠে— 'আমিত্ব মুক্তি না ছাই পাবলিসিটি পাওয়ার এত লোভ। কেন নেপথ্যে থাকা আর পোষাচ্ছিল না?'

হো হো করে হেসে ওঠে বিচারক ভূত— 'ভেবো না তোমার কথা আমার কানে আসেনি। কী আর করি বলো, পাবলিসিটির যুগ। কেউ যদি আমাদের নিয়ে ভাবে— আমাদেরই একটা কোনও ব্যবস্থা করে নিতে হবে বাধ্য হয়ে।'

দুশ্চিন্তা করো না, সারাজীবনে আমাদের দৌলতে যত পয়সা কামিয়েছ দু'একটা ছবিতে ঝাড় খেলেও তোমার কিসসু এসে যাবে না। তবে সব কিছুরই কিছু ভালো দিক থাকে— তোমার নতুন ছবিগুলোকে স্যুররিয়াল মুভি বলে ভুল করে তোমাদের ইন্ডাস্ট্রির আঁতেল পরিচালকেরা তোমায় জাতে তুলতেও পারে, ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কারও জুটে যেতে পারে আট দশটা। কিছুই অসম্ভব নয়...।'

মনটা হঠাৎ এক দুর্দান্ত খুশিতে ভরে ওঠে কালীকিংকরের। মনের পাঁক থেকে একটা লুপ্ত আশা তড়াক করে কুনো ব্যাঙের মতো লাফ দিয়ে পড়ে ডাঙায়। কারা যেন কানের কাছে ফিসফিসিয়ে ওঠে— অব অস্কার দূর নেহি!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%